রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০

ভুল ভুলাইয়া (২য় তথা শেষ পর্ব ) || কাশীনাথ সাহা || প্রতি রবিবার

রম্য রচনা

ভুল ভুলাইয়া (২য় তথা শেষ পর্ব ) 
কাশীনাথ সাহা 

বিনোদবাবু দুর্গাপূজার সময় নবমীর সন্ধ্যায় বোনকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ছিলেন। প্রচন্ড ভিড়। পথে নিজের মর্জি মতোন হাঁটা দায়। ভিড়ের ঠ্যালায় সামনে ভেসে চললেন পাল বিহীন নৌকার মতো। নিয়ে বেরিয়ে ছিলেন বোনকে নিয়ে, ভিড়ের চাপে হাত ছাড়াছাড়ি শুধু নয়,হাত পাল্টাপাল্টি হয়ে বাড়ি ফিরলেন অন্য এক মহিলাকে নিয়ে। মারাত্মক ভুল। সেই ভুল থেকেই গিয়েছে বিনোদ বাবুর জীবনে। মহিলা তার হাত আর সরিয়ে নেয় নি, বিনোদ বাবুও হাত ছাড়েনি। এখন বেশ জমিয়ে সংসার করছে দু'জনে। বেশ সুখী দম্পতি। সংসারে ছোটখাটো ভুল হলে ওরা ঠিক মানিয়ে নেয়। কারণ ভুলের হাত ধরেই তো ওদের সংসারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন!
অতনুবাবুর চশমার কাঁচ বহুদিন হলো ভেঙে গেছে। চশমা ছাড়া তিনি স্পষ্ট দেখতে পান না। গিন্নিকে বহুবার বলেছে কাঁচ পাল্টে দিতে, গিন্নীর সময় হয়নি। ইতিমধ্যে এক আত্মীয়ের মেয়ের বিয়ে বাড়িতে দু'জনেই গেলেন ঘাটাল।বিয়ে ভালো ভাবেই মিটে গেল। হলঘরে টানা বিছানা। মাঝরাতে অতনুবাবু একে ওকে ডিঙিয়ে মাড়িয়ে বাথরুম গেলেন। ফিরে এসে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়লেন। স্ত্রী অনেক রাতে উঠে দেখেন স্বামী পাশে নেই। ঘুম চোখে স্বামীকে খোঁজ করতে গিয়ে দেখেন কিছুদূরে অন্য এক মহিলাকে ধরে বেশ আরামে তিনি ঘুমিয়ে আছেন। পরদিনই চশমার কাঁচ পাল্টে গেল। অবশ্য  এখনও বোঝা যায়নি, অতনুবাবুর ভুলটা সত্যি ভুল না ইচ্ছাকৃত অপরাধ!  এই নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মাঝে মাঝেই ঠোকাঠুকি হয়।
অফিস টাইমে বাসের কি রকম ভিড় ভুক্তভোগীরা নিশ্চয় জানেন। শিব্রাম চক্রবর্তীর কথায়, এমন ভিড় বাসে সামনে একজন প্যাসেঞ্জার উঠলে পেছনের গেট থেকে একজন টুপ্ করে খসে পড়ে।
সেই ভিড় বাসে বহুক্ষণ পা চুলকচ্ছি কিন্তু কোন অনুভূতি টের পাচ্ছি না। যেন পায়ে কোন সাড় নেই। ক্রমাগত চুলকেই যাচ্ছি। অনেকক্ষণ পরে পাশ থেকে এক ভদ্রলোক বললেন, ঠিক আছে দাদা আর চুলকাবেন না,অনেকক্ষণ হলো এবার জ্বালা করছে!
রাতে টর্চ ভুল করে ফেলে আসা আর বর্ষাকালে ছাতা ফেলে আসার ভুল মানুষ মাত্রেই হয়। এ ভুলের শাস্তি নেই। বাজারে গিয়ে সবজি বিক্রেতাকে টাকা দিতে ভুলে বেশ অপ্রস্তুতে পড়তে হয়। ব্যাঙ্কে গিয়ে নিজের কলম অন্যকে দিয়ে ফেরৎ নিতে ভুল অহরহ হয়। যারা ভুল করে জীবনে একটা কলম বা ছাতা হারায়নি এমন হিসেবী মানুষ খুব একটা সহজ সরল হয় না। এদের বউদের জিজ্ঞেস করুন বুঝতে পারবেন ওদের বউরা কেউ সুখী নয়!  এটা আমার দর্শন।
কিছু মানুষ টাকা ধার নিয়ে ফেরত  দিতে ভুলে যান।বাবা ভোলানাথ!  এইসব মানুষকে টাকা ধার দেওয়ার আগে দশবার ভেবে দেখতে ভুলবেন না।
তারাপদবাবু ইদানিং বেশ নামী গল্পকার ও কবি। লেখক হিসেবে গোটা দশ বারোটা পুরস্কার পেয়ে গেছেন। পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর লেখার ব্যস্ততাও বেড়ে গেছে। রেগুলার দু তিনটে গল্প আর গোটা দশেক গল্প ডেলিভারি করছেন। ব্যাপারটা আমাদের বেশ আশ্চর্যই লাগে। কারণ ইতিপূর্বে তিনি তেমন লেখালেখি করতেন বলে শুনিনি। অবশ্য আমরা শুনিনি বলে প্রতিভাবানের প্রতিভা থেমে থাকবে এমন কোন কথা নয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন তারাপদবাবু ধরা পড়ে গেলেন। খুব প্রতিষ্ঠিত একজন সাহিত্যিকের গল্প হুবহু টুকলি করে নিজের নামে অন্য একটি পত্রিকায় ছাপিয়ে দিলেন। কিন্তু কথায় আছে চোরের দশদিন গেরস্তের একদিন। ধরা পড়ার পর তারাপদবাবু অম্লান বদনে বললেন, আমার একটা ছোট্ট ভুল হয়ে গেছে। মানে পত্রিকার সম্পাদক বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, শারদ সংখ্যার জন্য ভাল গল্প চাই। গল্প পাঠান। সেই দেখে ওই লেখকের গল্পটা আমি পাঠিয়ে দিলাম, গল্পটা বেশ ভালোই। কিন্তু গল্পকারের নামের জায়গায় ভুল করে আমার নামটা দিয়ে দিয়েছি। সামান্য ভুল!  পরে দেখা গেল এই সামান্য ভুলটা উনি প্রায় সর্বত্রই করেন। কি আর করা যায় ভুল তো মানুষ মাত্রই করে। লেখক লেখিকারাও তো মানুষ? তাই না!
বিশিষ্ট সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন একবার ভারতবর্ষ সম্বন্ধে একটা ভুল বার্তা বিদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ভারতবর্ষে এসে দেখলেন যে মেয়েরা পাথরের উপর আছড়ে আছড়ে কাপড় কাচছে। উনি দেশে ফিরে লিখলেন, ভারতের মেয়েরা কাপড় দিয়ে পাথর ভাঙে। ভাবুন অবস্থা।
কিছুূদিন আগে খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন বের হয়েছিল। নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে আগামীকাল শহীদ মিনার থেকে একটা যৌন মিছিল বের হবে। দলে দলে যোগ দিন। পরদিন যথাসময়ে শহীদ মিনার চত্তরে মানুষে মানুষে ছয়লাপ। উদ্যোক্তারা এতো ভিড় প্রত্যাশাই করে নি।সেইসময় উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হলো, দেখুন গতকালের বিজ্ঞাপনে একটা ছোট্ট ভুল হয়ে গেছে। মৌন মিছিলের বদলে প্রিন্টিং মিস্টেক হয়ে ওটা যৌন মিছিল হয়ে গেছে , এজন্য আমরা ক্ষমা চাইছি। ব্যস, মুহূর্তে ভিড় ফরসা। ওই এক ঘোষণায় জনগণ সব উৎসাহ হারিয়ে ফেললো। উদ্যোক্তাদের তখন  আফশোস কেন যে সামান্য ভুলটা সংশোধন করতে গেলাম!
সেদিন বিউটি পার্লার থেকে এক সুন্দরী মহিলাকে বের হতে দেখে চোখে বেশ ঘোর লাগলো। আহা কি দারুণ দেখতে,  চোখ দুটি টানা টানা মনে হয় যেন কাছে ডাকছে.... । কোন মহাপুরুষের ভাগ্য কে জানে!  আমি তাকিয়েই রইলাম। চোখের পলক আর পড়ে না। ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন। ওরকম অসভ্যের মতো কি দেখা হচ্ছে? ছিঃ লজ্জা করেনা।
আমি আধহাত জিব কাটলাম। না মা জননী আপনি যা ভাবছেন তা নয়, আমি মা জননীর মতোই আপনাকে...
বাকী কথা আর শেষ হলো না। মহিলা ধমকে উঠলেন। চোপ আর একটা কথাও না। নিজের বউকে মা জননী বলতে তোমার লজ্জা করছে না। বুড়ো ভাম কোথাকার!  ঘরে চলো তোমাকে কি করে  শায়েস্তা করতে হয় দেখাবো।
ভুলটা বুঝতে পেরে আরও একবার আধহাত জিব কেটে বললাম,  যাঃ মনীষা তুমি বড্ড বেরসিক, সামান্য রসিকতাটাও বোঝ না! 😀😀😀😀

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~১৪/৫ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems, Debjani Basu

  আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~১৪/৫ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems, Debjani Basu আটপৌরে  ১৪/৫ ১. লোডশেডিং হবে অজানিত পতিত...