সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২০

অল্প পরিসরে, আজকের সাহিত্য ও আমরা || অমিতাভ দত্ত || গদ্য

অল্প পরিসরে, আজকের সাহিত্য ও আমরা
অমিতাভ দত্ত


সারা পৃথিবীটাই হচ্ছে গিয়ে; একটা বাজার। এই কথাটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এবং, আজকের দিনের সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি, তা ও হচ্ছে গিয়ে এই বাজারেরই বিশাল মার্কেটিংয়ের মার্কেট। এ বাজারজাত সমস্যা সারা পৃথিবী জুড়েই , আগেও ছিল,
আর, তা কিন্তু এখনো রয়েছে। কারণ, সারা পৃথিবীর রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত একটা সিস্টেমের মধ্য দিয়েই চলে। সে সিস্টেমের বাইরে কিছুই নয়। আমরা আমাদের চারপাশে যে সিস্টেমটাকে দেখে আসছি, সেটা হচ্ছে গিয়ে লাভ ভিত্তিক; বা মুনাফা ভিত্তিক। টাকা লাগাও ; পুঁজি লাগাও ; বিক্রি কর ; আর লাভ কর ; মুনাফা কর ; আর যত খুশি কামাও। এই হচ্ছে গিয়ে সিস্টেম। তা ; সাহিত্য কি এই সিস্টেমের বাইরে নাকি!? সারা বিশ্ব জুড়েই সাহিত্যও এক বিশাল বাজার। কিন্তু সাহিত্য ক্ষেত্রে ; ইদানিং  মারাত্মক ভয়ঙ্কর আকারের রূপ ধারণ করেছে এই বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ; এবং  সাহিত্য ব্যবসায়ীদের লোভ। মারাত্মক অবস্থা। আচ্ছা বলুনতো , মানুষ তাহলে বাঁচবেনই বা কি করে!? মিথ্যে চাকচিক্যময় শঠতার ইমিটেশন ভাষা এবং শব্দের ব্যবহারে নিত্য নতুন নতুন বাঁধনে আমাদের বেঁধে ফেলছে এবং অল রেডি বেঁধে ফেলেছে। না না, শুধু আমাকেই নয়, সব্বাইকেই , এবং সমস্ত ক্ষেত্রেই বলা যায়, আমাদের বেঁধে ফেলেছে। লাভ ; মুনাফা মানেই লোভ , এবং সেখান থেকেই বৈষম্যের জন্ম। কারণ যারা বেঁধেছে , তারা তো মাত্র হাতেগোনা গুটিকয় মাত্র ! বাকি সবটাই ক্রেতা। এ তো গেল ধনবাদী সিস্টেমের সমস্যার কথা। কিন্তু এ কি শুনছি! ট্রেন বাসে ফিসফাসে প্রায়ই শুনি, কবির কবিতা চুরি হচ্ছে, কবি কণ্ঠের স্বরচিত কবিতা পাঠের ; বা, আবৃত্তির ভিডিও চুরি হচ্ছে, কবিতা ছেপে দেবো বলে , টাকা মেরে দিয়েছে , বই ছেপে দেবো বলে টাকা নেওয়া হয়েছে , অথচ বই ছাপানো হয় নি, আজীবন সদস্যের নাম করে আড়ালে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে , ইত্যাদি ইত্যাদি আরো কতশতই শুনি। আরো বাকি বন্ধুরা যারা যতটুকুই জানেন , তা সিরিয়াস সাহিত্যের স্বার্থে প্রবন্ধ আকারে বা আর্টিকেল হিসেবে লিখুন, এবং তা সৎ সাহিত্যেরই উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরই স্বার্থেই লিখুন। শক্তিশালী বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে সাহিত্যকে বাঁচিয়ে তুলতে দৃঢ়তার সাথে কলম ধরুন। ভাঙচুর না করলে , নূতন ভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে জায়গাটা তৈরি করে না নিলে , কোন ভালো নতুন কিছুই নির্মাণ করা সম্ভব নয়। যিনি যতটুকুই জানেন, সর্বত্র সেই গোপন কথা ছড়িয়ে দিন, এবং মানুষের সর্বসমক্ষে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করুন। ইদানিং নয়, বেশ কিছু কাল যাবৎ ধরেই লিটিল ম্যাগাজিনের নামের আড়ালে লোভের লাভের মুনাফার , এবং প্রতারণা ঠগবাজির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।  আমাদের মনে রাখা উচিত, লিটিল ম্যাগাজিন শঠতার প্রতারণার প্রবঞ্চনার মুনাফার জায়গা নয়, লিটিল ম্যাগাজিন একটা সিরিয়াস সাহিত্যের প্লাটফর্ম, লিটিল ম্যাগাজিন একটি আন্দোলনের মঞ্চ। লিটিল ম্যাগাজিনের জন্মের একটা ইতিহাস আছে, লিটিল ম্যাগাজিনের একটা প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার একটি স্বর্ণোজ্জ্বল চরিত্রের লিখিত ইতিবৃত্ত আছে। লিটিল ম্যাগাজিন হলো গিয়ে সিরিয়াস সাহিত্য আন্দোলনের এক ধারাবাহিক বহতা নদী। যেখানে নূতন লেখক লেখিকারা যাঁরা তাঁদের লেখনী শক্তির দ্বারা অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে কলম ধরবেন , এবং এই নোংরা সমাজকে ভেঙে নতুন সমাজ নির্মাণের পথ দেখাবেন। এছাড়াও, যেখান থেকে উঠে আসবেন নূতন নূতন প্রতিবাদী লেখক লেখিকাদের মুখ, এবং প্রতিবাদী লেখক লেখিকাদের এবং লেখা। সাহিত্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করে, সাহিত্য নির্বাক মানুষের মুখে ভাষা এনে দেয়, সাহিত্য মনুষ্য সমাজের বুকে সাহস এনে দেয়, সাহিত্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে পথে নামায়, এবং মিছিলে পথ হাঁটায়। রাষ্ট্র সৎ সাহিত্যের সাহিত্যিককে লেখক লেখিকাদের জেল খাটায় ; এমনকি বহু লেখক লেখিকাদের মৃত্যুও বরণ করতে হয়েছে , এবং সে ইতিহাসও লিখিত সাহিত্যের প্রতি পাতায় পাতায়। এ কথা ঐতিহাসিক সত্য, এবং তা শুধুমাত্র আমার দেশেই নয়, সারা পৃথিবীব্যাপী এই ইতিহাস লিখিত রয়েছে। আসলে কি জানেন ; সারা বিশ্বব্যাপী সমস্ত রাষ্ট্র নায়কেরা এই লোভ সর্বস্ব লাভ এবং মুনাফা ভিত্তিক সিস্টেমটাকে চালাতে গিয়ে ; বহু অকর্ম কুকর্ম করতে হয় , এবং এ কারণেই ওরা ভীষণ আতঙ্কে থাকে। ফলশ্রুতিতে এরা লিটিল ম্যাগাজিনের লেখক লেখিকাদের , এবং সৎ সাহিত্যের লেখক লেখিকাদের ভীষণ ভয় পায়। এ কারণেই , সে ভয় থেকেই এই অমানবিক সিস্টেমের চালক রাষ্ট্র নায়কেরা লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের লেখক লেখিকাদের, এবং সিরিয়াস সৎ সাহিত্যিকদের গারদে পাঠিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তাঁদের লেখনী বাজেয়াপ্ত করা হয়। সাহিত্য আন্দোলন নিছক খেলা নয়, সাহিত্য আন্দোলন আগুন। সাহিত্য সমাজের বুকে প্রেম ভালোবাসা মানবতা জাগিয়ে তোলে, এবং , সাহিত্য মানুষকে ভাবতে শেখায়। সাহিত্য আগুন, অতএব আগুন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার ফল মনুষ্য সমাজকেই ভুগতেই হবে।  সাহিত্যকে মুদ্দা করে নাম সুনাম কেনা, একে ফেলে দিয়ে, তাকে ল্যাং মেরে ফেলে সরিয়ে দিয়ে উত্তরীয় পরা ; ছবির তোলা, সাহিত্য নয়। শিল্প সংস্কৃতি সাহিত্য , এবং লিটিল ম্যাগাজিনের আড়ালে ঠগবাজির ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া, আমাদের যে ভাবেই হোক রুখতেই হবে। নইলে সিরিয়াস সাহিত্য চাকচিক্যময় ইমিটেশন শব্দের মিথ্যা সাতকাহন কথার ভীড়ে হারিয়ে যাবে, এবং মৃত্যু ঘটবে। শুকিয়ে যাবে সাহিত্যের বহতা নদীর জল।
কড়া বুড়ি গন্ডা কাহন ইত্যাদি ইত্যাদি শব্দগুলো আমরা ষাট পঁয়ষট্টি বছর আগেকার ধারাপাতে পেয়েছি। তা আমার বলবার বক্তব্য হলো গিয়ে, আজকাল বেশ কিছু শঠ প্রতারক সাহিত্যের অঙ্গনে ঢুকে লিটিল ম্যাগাজিনের নামের আড়াল নিয়ে ; ভয়ঙ্কর রকমের ঠগবাজির খেলায় মেতে উঠেছে , এবং সে কম্ম তারা বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে ; মিথ্যা সাতকাহন কথার চাকচিক্যময় জড়ির পর্দার আড়ালে। লেখাজোকাও গতিপথ হারিয়েছে , এবং বিষয় হারিয়ে ফেলেছে। বহু নূতন নূতন লেখক লেখিকা এই ঠগবাজি চক্রান্তের জালে পড়ে ; এই সমস্ত ব্যওসাদারদের পাল্লায় পড়ে ঠকেছেন। লিটিল ম্যাগাজিন এখন আর সাংগঠনিক সিস্টেমের কাঠামো নয়, ভালো মানুষকে ঠকানোর মাধ্যম মাত্র। লিটিল ম্যাগাজিন আসলে সাংগঠনিক কাঠামো, একক ব্যবস্থা নয়। লিটিল ম্যাগাজিন মানে হচ্ছে গিয়ে , রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কলম ধরা, লিটিল ম্যাগাজিন মানে হচ্ছে গিয়ে কারাবাস করা, লিটিল ম্যাগাজিন মানে হচ্ছে গিয়ে মৃত্যু বরণ করা, লিটিল ম্যাগাজিন মানে হচ্ছে গিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মিছিলে
হাঁটা, লিটিল ম্যাগাজিন মানে উত্তরীয় নয়, ফুলের মালা নয়, সার্টিফিকেট নয়, মেমেন্টো নয়, লিটিল ম্যাগাজিন হচ্ছে গিয়ে , সততা সত্য, এবং একটা সাংগঠনিক সিস্টেম।  গুটিকয় সৎ সাহিত্য পত্রিকা যে নেই, তা কিন্তু নয়, আছে, কিন্তু তাতে করে, সেই শক্তি নিয়ে আসলে কাজের কাজ কিছুই হয় না। প্রবাহমান ধারা কোথায়!? মিথ্যা বিজ্ঞাপনের জৌলুসে, মিথ্যা সাতকাহন কথার ভীড়ে , সাহিত্যের আসল কাজটাই বিঘ্নিত হচ্ছে। সাহিত্যের বাজারে সারা পৃথিবী জুড়েই এই লিটিল ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার আন্দোলন আজও পর্যন্ত চলেই আসছে। ক্ষীণ দূর্বল আকারে হলেও , সবটাই এখনো শেষ হয়ে যায় নি। লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলন আবার জাগবেই, এবং জাগিয়ে তুলতেই হবে।  কারণ, আমরা সবাই-ই এই শোষণ জুলুম অত্যাচার নির্যাতনের সিস্টেমের সাথেই জড়িয়ে রয়েছি , আসলে লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলন বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আমার বাংলাতেও এই আন্দোলন আজও জারী রয়েছে, কিন্তু অল্প সংখ্যক কতিপয় সৎ লিটিল ম্যাগাজিন সংগঠন দিয়ে এ লড়াইয়ের ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আমার তো মনে হয় না। লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ভাস্বর করে তুলতে যৌবন দ্যুতিময় যুবক যুবতীরা সাংগঠনিক বলিষ্ঠ চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এগিয়ে না এলে, এ লড়াইয়ে জেতার সম্ভাবনা খুবই কঠিন। লিটিল ম্যাগাজিনের অর্থই হচ্ছে গিয়ে, গ্রুপ লিডার শীপের সিস্টেম। কোন একক ব্যক্তির নয়। একক ব্যক্তির পরিচালনার মানেই হচ্ছে গিয়ে, ব্যক্তিগত মালিকানার সিস্টেম। অর্থাৎ , লাভ এবং লোভ।  সাহিত্যের এ গ্লানিময় তাপ উত্তাপ থেকে মুক্তি পেতে, এই কদর্য সাহিত্যাকাশের আজকের যোধন থেকে বাঁচতে ,বা মুক্তি পেতে,  আমাদের এই লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনকে আরো গতিশীল করতে, যৌথ সাংগঠনিক সিস্টেম ডেভেলপ করেই এগিয়ে আসতে হবে।  একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, লিটিল ম্যাগাজিন নাকি ক্ষণজন্মা, কিন্তু, লিটিল ম্যাগাজিন আন্দোলনের ক্ষেত্রে তা প্রাণের অনুরণন , এবং জীবনের লক্ষণ। ঠিক যেমন বহতা নদীর জলে ময়লা ভেসে চলে যায়, ঠিক তেমনিই। আমি ট্রেনে বাসে চায়ের দোকানে আড্ডায়, এই আজকের সাহিত্যের অবস্থার অ-কথা কু-কথা প্রায়ই শুনে থাকি, এবং তা শুনে মনে ভীষণ কষ্টও পেয়ে থাকি। এবং, এও সত্য যে, ম্যাজিকের মতো ফুস করে ঠিক হয়ে যাবে এ বিশ্বাস করি না। কিন্তু বদলটা মানুষকেই করতে হয়, সেটা খুব ভালো করেই জানি। অতএব সাধু, সাবধান সাবধান সাবধান , লিটিল ম্যাগাজিনের নামে ব্যবসা বন্ধ আমাদের করতেই হবে । লিটিল ম্যাগাজিনের আড়ালে, ঠগবাজি চক্রান্তবাজি ভেদাভেদ মুনাফাবাজি, নাম কেনা, মালা পরা , উত্তরীয় পরা ইত্যাদি ইত্যাদি নয়, লিটিল ম্যাগাজিন
আসলে সিরিয়াস সাহিত্যের একমাত্র সার্বজনীন প্লাটফর্ম।
🌑🌕🌑🌕🌅🌱🌳🌹🎻🦚🌄⛵🛶⛵🛶🛶
    শেয়ার করুন দয়া করে।
                     অমিতাভ দত্ত।
৯৪৭৫২৩৩

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিক্ষা-জীবন || চার্লস মিথুন || অন্যান্য কবিতা

শিক্ষা-জীবন চার্লস মিথুন জগৎ মাঝে জন্ম নিয়েই, শিক্ষা জীবন শুরু। শেখার বয়স শেষ হবে না, হও না যতই বড়॥ মায়ের কাছে শিখবে প্রথম, প্রাণের কথা বলা।...