Monday, August 3, 2020

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি ৯ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || নদী বিষয়ক গদ্য

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি ৯
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি


এ ব্যাপারে পুরাতত্ত্ববিদরা এবং পুরাতত্ত্ব সম্বন্ধীয় লেখক-লেখিকারা কী বলছেন একটু দেখে নেওয়া যাক। “নাককাটি দেবী নয় – দেবমূর্তি” এই শিরোনামে আমার লেখা একটি বিশেষ নিবন্ধ ‘টেরাকোটা’ পত্রিকার জৈষ্ঠ-১৪১৭-এর দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এটি প্রত্নতত্ত্ব-নৃতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা। যার সম্পাদনা করেন তুলসীদাস 
মাইতি এবং প্রদীপ কর। যাই হোক পত্রিকাতে নিবন্ধটি প্রকাশ হওয়ার পর বিশিষ্ট পুরাতত্ত্ববিদেরা যা বলেছেন, এবং লিখিতভাবে মতামত দিয়েছেন   তা হুবহু তুলে ধরছি।

‘টেরাকোটা’ পত্রিকার শ্রাবণ ১৪১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘নাককটি’ মূর্তি প্রসঙ্গে চিঠি 
“চিঠিপত্র – ১ 
Dr. Tapas Bandyopadhyay
Keeper
State Archaeolojical Museum, West Bengal
Director of Archaeolojy and museums,
Government of West Bengal
1, Satyen Roy Road, Behala,
Kolokata-700034
Dated-09.07.2010

মাননীয় যুগ্ম সম্পাদক মহাশয়, টেরাকোটা
প্রত্নতত্ত্ব-নৃতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা,
বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া
মহাশয়, 
   আপনাদের উদ্যোগে প্রকাশিত তথ্যবহুল সুমুদ্রিত পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা হাতে পেলাম। “নাককটি দেবী নয় – দেবমূর্তি” শীর্ষক রচনা প্রসঙ্গে জানাই সেটা সূর্যদেবের বিগ্রহ। এই ধরনের বিগ্রহ সাধারনভাবে সপ্তাশ্ব বাহিত রথে সম্পদস্থানক ভঙ্গিতে প্রস্ফুটিত পদ্মফুল দুই হস্তে ধরণ করে দন্ডি-পিঙ্গল, ছায়া-সংগা, ঊষা-প্রত্যুষা সহ দন্ডায়মান অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। পদদ্বয় জুতার দ্বারা আচ্ছাদিত। দুই পায়ের মাঝে দণ্ডায়মানা পৃথিবী ও সম্মুখে রথের সারথি অরুণ। কটিদেশে ছুরি। জুতা ও অস্ত্রের সংযোজনা সম্ভবত: অগ্নি উপাসক পশ্চিম এশীয় জনগণের প্রভাব সঞ্জাত। বিগ্রহে দাড়িযুক্ত প্রতিকৃতিটি পিঙ্গলের। অপর পার্শ্বস্থ প্রতিকৃতিটি দন্ডির। দন্ডি এবং পিঙ্গলের পাশে যথাক্রমে ছায়া ও সংগা দণ্ডায়মানা। ধনুকে তির ছুঁড়ে ঊষা এবং প্রত্যুষা অন্ধকার দূর করছেন। অবশিষ্ট সবকটি রচনাই আমার আনন্দ ও বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে। আপনাদের পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি। 
   ভবিষ্যতে পত্রিকা উপরোক্ত ঠিকানা পাঠালে প্রাপ্তিযোগ সুনিশ্চিত হবে। 
                                                       ধন্যবাদান্তে-
                                                      তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়
পুনশ্চ – সূর্য মূর্তিটি সম্ভবত পালযুগের। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রচুর বিগ্রহ অষ্টম-দ্বাদশ শতকে নির্মিত হতে দেখা গেছে”।

 “চিঠিপত্র – ২

শ্রী প্রদীপ কর,
সম্পাদক ‘টেরাকোটা’
বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া, পিন-৭২২১২২

প্রিয়বরেষু,
      আপনাদের ‘টেরাকোটা’ পত্রিকার ২য় সংখ্যায়(জুন,২০১০; জৈষ্ঠ,১৪১৭), শ্রী মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি লিখিত “নাককাটি দেবী নয় – দেবমূর্তি” প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলতে চাই। 
১৪
   মূর্তিটির আলোকচিত্র খুব সুস্পষ্ট না হলেও মঙ্গলপ্রসাদবাবুর বিবরণ সহযোগে নিরীক্ষণ করলে বুঝতে পারা যায় যে, মূর্তিটি আসলে কালো কোষ্ঠীপাথরে তৈরি সূর্যবিগ্রহ। তবে মূর্তিটি ভগ্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত। 
   বলা বাহুল্য, পূর্বভারতে সূর্যবিগ্রহের পূজা খ্রি: নবম-দশ-একাদশ শতকে প্রচলিত ছিল। আজকের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া-হুগলি-পশ্চিম মেদিনীপুর সহ এক বিস্তীর্ণ এলাকায় সূর্যপূজার ‘পাথুরে প্রমাণ’ পাওয়া গিয়েছে, অর্থাত্‍ নানা আকারের সূর্যবিগ্রহ ভাস্কর্যের সন্ধান মিলেছে। বিহার ও ঝাড়খন্ড রাজ্যেও সূর্যপূজার প্রমাণ হিসাবে সূর্যবিগ্রহ ভাস্কর্য নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। এমনকি ‘সূর্যপুত্র রেবন্ত’র অশ্বারোহী ভাস্কর্যের সন্ধানও পাওয়া গিয়েছে। 
   সূর্যমূর্তি ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রস্ফুটিত বিশ্বপদ্মের উপর ঋজুভাবে দণ্ডায়মান সূর্য, তাঁর দুই হাতে ধরা সনাল পদ্ম, পদ্ম দুটি মূর্তির মাথর দু’পাশে সমান্তরাল সমদূরত্বে থাকে; পায়ে থাকে রণপাদুকা অর্থাত্‍ হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা জুতার মতো আবরণ; পরণে থাকে উদীচ্য বেশ; কটিদেশ(কোমর) ঢাকা থাকে সূক্ষ্ম ও অলঙ্কৃত ‘অব্যঙ্গ’; গলায় থাকে স্বর্গীয় পারিজাত কুসুমের মালা এবং উপবীত সদৃশ বস্তু; বিগ্রহের পায়ের নিচে বা কাছে থাকে সপ্ত-অশ্ববাহিত ‘একচক্র’ রথের সারথি কশ্যপ-তনয় ‘অনরু’(যার ঊরুদ্বয় নাই); মতান্তরে ‘অরুণ’, এবং অনরু চালিত রথ, বিগ্রহের উভয়পার্শ্বে থাকে সূর্যপত্নীদ্বয় ধনুর্বাণধারী ঊষা এবং প্রত্যুষা, এছাড়াও বহুসময় অপরাপর সূর্যপত্নী ছায়া ও সংজ্ঞার মূর্তিও থাকে, অবশ্যই থাকে দণ্ডধারী দন্ডী এবং মসীপত্র ও লেখনী সহ কুন্তী মূর্তি। সূর্যমূর্তির মাথার উপর আকাশদেশে, উভয়দিকে , থাকে স্বর্গীয় পুষ্পমাল্য হস্তে উড়ন্ত গন্ধর্ব বা বিদ্যাধর। সাধারণভাবে এইসব বৈশিষ্ট্যই সূর্যমুর্তি ভাস্কর্য চেনার অন্যতম সহজ উপায়। 
   আলোচ্যক্ষেত্রে, সমগ্র ভাস্কর্যটি খোদাই করার ক্ষেত্রে তিন ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। মূর্তির দেহকাণ্ড বা ‘টরসো’ খোদাই করা হয়েছে ত্রিমাত্রিকভাবে (‘স্কাল্পচার-ইন-দ্য-রাউণ্ড’ পদ্ধতিতে); মূর্তির মাথা এবং পা-ভাগ, পার্শ্ব সহচরীদ্বয় খোদাই করা হয়েছে উচ্চাবচ(হাই রিলিফ) পদ্ধতিতে; আর অপরাপর অংশ কোথাও ‘হাই-রিলিফ’,কোথাও নতোন্নত বা ‘লো-রিলিফ’পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। 
   এছাড়া আলোকচিত্রটি থেকে যতদূর বোঝা যাচ্ছে, সমগ্র ভাস্কর্যটি ‘ত্রিরথ’ পাদপীঠের উপর বিন্যস্ত। সালঙ্কারা বিগ্রহের মাথায় রয়েছে কিরীটমুকুট, দুইকানে কুণ্ডল, দুই বাহুতে বাজুবন্ধ। প্রচলিত শিল্পরীতি অনুসৃত হয়েছে আলোচ্য মূর্তির ক্ষেত্রে।
   আলোচ্য সূর্যবিগ্রহ  ভাস্কর্যটির প্রাপ্তিস্থান পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা জনপদ হওয়ায়, এই ধারণা দৃঢ়মূল হল যে, হাজার বছর পূর্বে আজকের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নানান অংশে, সূর্যবিগ্রহের পূজার্চনার প্রচলন ছিল। খ্রি: ১৯৮২-৮৩ সনে ঝাড়গ্রাম মহকুমার থানাধীন দোলগ্রাম এলাকায় বন-ঝোপের মধ্যে সূর্যপুত্র অশ্বারোহী রেবন্তমূর্তির ভগ্নাবশেষ দেখতে পেয়েছিলাম। সম্ভবত তার কাছাকাছি একটি সূর্যমূর্তির মতো অবশেষ ছিল। ভগ্ন মূর্তির মাথাটি, স্থানীয় আদিবাসী ছাত্রাবাসে হলুদ-লঙ্কা মসলা পেশায় করার কাজে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। 
   পরিক্রমাকালে বহু জায়গাতেই দেখেছি, গ্রামবাসীরা এ ধরণের প্রাচীন মূর্তি ভাস্কর্য বা বিগ্রহাদি পাওয়ার পর সিঁদুর লেপে পূজার্চনা করছেন, নতুবা ধান্দাবাজ ফড়ে দালাল মারফত কালোবাজারে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনা তামাম ভারতবর্ষে ঘটে চলেছে অবিরাম ধারায়। আমরা পাঠ্যপুস্তকে প্রাচীন ইতিহাস পড়ি বটে, কিন্তু ছাত্র-শিক্ষক কোনও পক্ষের মনেই ইতিহাস চেতনা জাগ্রত হয় না। নিজ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আমরা হতচেতন। হাল আমলে মার্কিনি কালচারে তো গোটা দেশ আচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেক্ষেত্রে ‘টেরাকোটা’ সম্পাদকমণ্ডলী ও কর্মীবৃন্দ এবং সুলেখক শ্রী  মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি ধন্যবাদের পাত্র, কারণ তাঁরা আপন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যধারার সন্ধান নিচ্ছেন ও দিচ্ছেন, অন্তত তাঁদের সীমিত ক্ষমতায় নথিবন্ধকরণের প্রাথমিক কাজটুকু আন্তরিকভাবে করছেন। এ কাজ অব্যাহত থাকুক, এই প্রার্থনা রইল। 
                                                         শুভেচ্ছাসহ,
তাং-১৯ আগস্ট, ২০১০                                      শিবেন্দু মান্না 
                                                      কদমতলা, হাওড়া – ৭১১১০১”

No comments:

Post a Comment

বিশ্বজিৎ || ঘোড়া || কবিতা

  বিশ্বজিৎ ঘোড়া তুমি বরাবর শিক্ষা নিতে ভালবাসো।শিক্ষার ভেতরেও একটা শিক্ষা থাকে।অচেনা গলির ঘ্রাণ... রক্ত আছে মাংস আছে তুমিও বোঝ নদী কীভাবে বা...