রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২০

অবুঝ দিনের গল্প || তাসফীর ইসলাম (ইমরান) || বাংলাদেশের গল্প

অবুঝ দিনের গল্প
তাসফীর ইসলাম (ইমরান)




বিঃ দ্রঃ- বেশ কয়েক বছর আগের (সৃজনী বিদ্যানিকেতন পবিপ্রবি স্কুল & কলেজ) শিক্ষার্থীর বাস্তবতার কাহিনী অবলম্বনে আমার এই কাল্পনিক গল্প- ভুল ত্রুটি হলে মার্জিত করবেন।
-সময়টা ছিলো ২০১৭ সাল।
সকাল থেকেই অনেক বৃষ্টি। মেঘাচ্ছন্ন আকাশটাকে কুয়াশায় যেন চারদিক থেকে ডেকে রেখেছে। আজ কিভাবে কলেজে যাবো?
কলেজের সময়টাও যে হয়ে গেছে। ৮ টায় ক্লাস শুরু। ৭ টা ৩০ এর আগে যদি না যেতে পারি তাহলে তো গেট বন্ধ করে দিবে আর ভিতরে যেতে পারবো না। যাইহোক, কলেজ তো ফাঁকি দেয়া যাবে না। সকাল থেকে এই ভাবনা নিয়ে বিছানায় বসে আছেন আমাদের এই গল্পের নায়ক আফরান জিয়াউল (অনন্ত)। অনন্ত মধ্যবিও পরিবারের সন্তান। নিজের স্বপ্ন পূরনের জন্য পড়াশুনা করতে নিজের স্মৃতির শহর থেকে অন্য শহরে এসেছে। অনন্ত বরিশালের সেরা ও অন্যতম স্কুল এন্ড কলেজ সৃজনী বিদ্যানিকেতনের ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাএ। বিছানা থেকে উঠেই দাঁত ব্রাশ করে কিছু না খেয়েই রওনা দিলো কলেজের উদ্দেশ্য। কি খাবে? ব্যাচেলর মানুষ হোটেলের খাবার ছাড়া তো তাঁদের পেটে অন্য কিছু যায় না। তাড়াহুড়া করে বৃষ্টির মধ্যে ধেয়ে চলেছে কলেজের দিকে। গেটের কাছে যেতেই একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা। ধাক্কাটা ও অবশ্য ইচ্ছা করে দেয় নি। তবুও মেয়েটার কাছে সরি বলে। সরি বলতেই মেয়েটা বলে উঠে সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ধাক্কা দিতে ইচ্ছা করে আর বলেন সরি! সব ছেলেরাই এক রকম। অসভ্য যওসব।  অনন্ত কিছু না বলে চুপ হয়ে ক্লাসে চলে যায়। ক্লাসে গিয়ে আনমনে এক কোনায় বসে থাকে। আর চিন্তা করে আমি কি ইচ্ছা করে মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়েছি? মেয়েটি কি আসলেই সুন্দর?  মনের মধ্যে আজেবাজে চিন্তা ঘুরপাক করতে আছে। জানতে হবে মেয়েটার নাম কি,কোন ক্লাসে পরে। হঠাৎ তার বন্ধুু এসে বললো কিরে অনন্ত তোর মন খারাপ কলেজে আসার পর থেকে তোকে দেখছি আনমনা, চুপচাপ কি হয়েছে?
অনন্তঃ বলিস না, আমি অসভ্য!
বন্ধুুঃ কি আবোল-তাবোল বলো? কে বলছে তুই অসভ্য?
অনন্তঃ একটা মেয়ে।
বন্ধুুঃ নাম কি? পরে কিসে?
অনন্তঃ জানিনা কিছু। তবে, জানি আমাদের স্কুল শাখায় পরে।
বন্ধুুঃ আচ্ছা, টিফিন সময়ে দেখলে আমাকে দেখিয়ে দিস। নাম, ঠিকানা, সব তথ্য তোকে এনে দিবো।
অনন্তঃ আচ্ছা ঠিক আছে।
এই বলে শেষ হয় দুই বন্ধুুর আলাপন। টিফিনের সময় চলে এলো। ঘন্টা পরতেই অনন্ত দৌড়ে চলে যায় মাঠের দিকে। ঐ মাঠের ভিতর দিয়েই তো মেয়েটা বাহিরে বের হবে। কিন্তু মেয়েটার তো কোনো দেখা নেই। টিফিন টাইম শেষ হয়ে ক্লাস বসানোর ঘন্টা পরে গেল। কিন্তু সেই সুন্দরী মেয়েটার সাথে অনন্তের দেখা মিললো না। সেদিনের মতো কলেজ ছুটি হয়ে গেল। অনন্ত আর তার সেই বন্ধুু আস্তে আস্তে বাসার দিকে ফিরে যাচ্ছে।  ও আচ্ছা, বন্ধুুর নামটাই তো বলা হলো না। বন্ধুুর নাম সাইফুল। সাইফুলও তার স্বপ্ন পূরনের জন্য তার স্মৃতির শহর ছেড়ে এই ব্যাস্তনগরীতে আসছে পড়াশোনা করতে। তাই দুই বন্ধুর মধ্যে খুব ভালো মিল। দুইজন একসাথেই থাকে। দুজনের মনের খবরই দুজন জানে। বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পরে অনন্ত। আবার বিকালে যে তার টিউশনি, প্রাইভেট আছে। মধ্যবিও অনন্তের টিউশনি করেই  তো নিজেকে চলতে হয়। সেদিন রাতে দুই বন্ধুু পড়াশোনা রেখে ভালোবাসার কথা বলে। কাকে বলে ভালোবাসা? কেন হয় ভালোবাসা? নানা অহেতুক চিন্তা করে দুজন ঘুমিয়ে পরে। সকাল সকাল আবার কলেজে যেতে হবে। তাদের প্রতিদিনের সবকিছুই তো নিয়ম মাফিক রুটিন করা। পরেরদিন কলেজে গিয়েই আবার সেই মেয়েটাকে প্রথম খোঁজ করলো। কিন্তু আজও মেয়েটার দেখা মিললো না। এভাবে ৩/৪ দিন কেটে যায়। কোনো খবর নেই মেয়েটার। নাম ঠিকানাও অজানা। একদিন টিফিন সময়ে অনন্তেরা মাঠে বল খেলে হঠাৎ বল গিয়ে সেই মেয়েটার পায়ের সামনে পরে। বল নিয়ে আসতে যায় অনন্ত। সামনে গিয়ে তাকাতেই দেখে সেই সুন্দরী। অনন্ত দেখে চুপ হয়ে গেল। হঠাৎ  বলে ওঠে তোমার নাম কি? তোমাকে অনেক খোঁজ করছি। মেয়েটা কিছু না বলে শুধু মুচকি একটা হাসি দিয়ে চলে গেল। পাশ থেকে একটা মেয়ে বলে উঠলো মেঘবালিকা তুই বলটা দিয়ে দিলি। অনন্ত শুনে যায় নাম মেঘবালিকা।
এখন, আপনাদের বুঝতে তো কোনো অসুবিধা নেই, মেঘবালিকা কে? হ্যাঁ বলছি মেঘবালিকা হচ্ছে এই গল্পের উন্মাদ নায়ক অনন্তের অবুঝ নায়িকা।
কেন জানি সেদিনের পর থেকে মুচকি হাসিটার উপর ক্রাশ খেয়ে মেঘবালিকার প্রেমে পরে যায় অনন্ত। মেয়েটা তখন দশম শ্রেনিতে পরে। সব তথ্য জেনে নেয় অনন্ত। দিন দিন মায়াটা বাড়তে থাকে। কিন্তু মেঘবালিকাকে সে বলে উঠতে পারে না সে তাকে ভালোবাসে। শুধু টিফিন সময়ে মাঠের ভিতরে দাঁরিয়ে থেকে মেঘবালিকাকে একনজর দেখে। এভাবে কেটে যায় কয়েকমাস। মেঘবালিকা কিছুটা বুঝতে পারে যে অনন্ত তাকে পছন্দ করে। তাই মেঘবালিকাও প্রতিদিন টিফিন সময়ে মাঠের এক কোনায় এসে দাঁড়াতো যাতে অনন্ত তাকে একনজর হলেও দেখতে পায়। অনন্ত ঠিক করে একটা চিঠি দিবে মেঘবালিকাকে। খুব যতনে একটা চিঠি লিখে -
প্রিয় মেঘবালিকা,
কেমন আছো তুমি?
আমার মনের ভিতরে জমিয়ে রাখা কিছু না বলা কথা তোমাকে বলছি।
আজ শেষ বিকেলের পাহাড় ছুঁয়ে ছুটে আসা দমকা হাওয়ার জড়িয়ে দেয়া মেঘের মতো ছোট্ট একটি ঘটনা আমার সব দ্বিধাকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো! বুঝলাম, মহাকাল যে হাস্যকর ক্ষুদ্র সময়কে “জীবন” বলে আমাকে দান করেছে। সেই জীবনে তুমি-ই আমার একমাত্র মানুষটি, যার পাঁচটি আঙ্গুলের শরণার্থী আমার পাঁচটি আঙ্গুল, যার বুকের পাঁজরে লেগে থাকা ঘামের গন্ধ আমার ঘ্রাণশক্তির একমাত্র গন্তব্য। যার এলোমেলো চুলে আমি-ই হারিয়ে যাবো। আর আমি হারিয়ে যাবো ভালবাসতে বাসতে!!!
যার দুটো অদ্ভুত সুন্দর মধুভরা ঠোঁটের উষ্ণতায় আর তাই জীবনটা আজ ঠিক সেই অদ্ভুত ফুলগুলোর মতই সুন্দর, যা দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। আর তুমি আমায় পরম মততায় আলতো জড়িয়ে ধরে তোমার ঠোঁটের সেই খুব মিষ্টি ছোঁয়ায় ভরে দিয়েছিলে সেই পুরোটা পাহাড়ি বিকেল। আর তখন সেই দূর পাহাড়ের দুষ্ট বাতাস এসে আমাকে চুপি চুপি কানে কানে বলে দিলো, “তোমার বাম পাঁজরের হারেই আমার এই দেহটি তৈরি, যাকে স্বামী বলে!”
আজ প্রতিটি ক্ষণ হৃদয়ে যে পরম সত্য অনুভব করলাম- আমি শুধুই তোমার। সে শেষ ঠিকানা আমি পেলাম। কখনই তা মিথ্যা হতে দিওনা, কখনই ছেড়না আর। আজ আমার ভীষণ সুখী হাত দু’টো, আর দৃষ্টি ঘুরিও না ঐ অদ্ভুত সুন্দর চোখজোড়ার, সেখানে অপলক তাকিয়ে বৃষ্টির সাথে আমিও আনন্দ হয়ে ঝরেছিলাম!
তোমাকে ভালবাসি প্রচন্ড- এরচেয়ে কোনও সত্য আপাতত আর জানিনা!!
ভালবাসি তোমায়!
জীবনের থেকেও অনেক বেশি।
ইতি
সেই অসভ্য ছেলেটি অনন্ত।
এখন কিভাবে চিঠিটা মেঘবালিকার কাছে পাঠাবে। আর পাঠানোর পরে যদি মেঘবালিকা আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয় নানা দূরশ্চিন্তা ঘিরে ফেলছে অনন্তকে।
এদিকে অনন্তের ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসছে। কি করবে সে বুঝতে পারছে না। চিন্তা করে পরীক্ষার পরেই ভালো একটা জায়গায় ভর্তি হয়ে মেঘবালিকা সবকিছু জানাবো। পরীক্ষা দেয় অনন্ত পরীক্ষাও খুব ভালো হয়। ভর্তি পরীক্ষা দেবার পরে ভালো একটা ভার্সিটি চান্স পায়। হাতে সেই যত্নে পোষা পুরনো চিঠিটাকে নিয়ে ছুটে চলে যায় ক্যাম্পাসে আজ সবকিছু প্রানখুলে মেঘবালিকা বলবে। গিয়ে দেখতে পায় মেঘবালিকা আর তার বান্ধবী কথা বলছে। দুজনের কথাই শুনতে পায় অনন্ত। অনন্তকে নিয়েই কথা হতে ছিল। মেঘবালিকাকে তার বান্ধবী বলতে ছিলো আজ অনন্ত ভাইকে ক্যাম্পাসে দেখছি। তোর সাথে দেখা হয়েছিল। অনন্ত ভাই মনে হয় তোকে ভালোবাসতো। মেঘবালিকা মৃদু স্বরে বলে উঠলো শুধু অনন্ত না আমিও তাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু বলে উঠতে পারি নি। কারন, ভালোবাসা আমার জন্য না। কেউ বুঝবে না আমাকে। মাঝপথে অনন্তের জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। আমি না হয় অভিমানের দেওয়ালটাকে পুষে রেখে বাঁচতে পারবো। কিন্তু সে তো পারবে না। সে তো আমায় বড্ড ভালোবাসতে। বান্ধবী বলে উঠলো আজ তাহলে তার সাথে দেখা কর একটু সে তো চলে যাবে আর আসবে না।
অনন্ত কথা গুলো শোনার পরে চলে যাবার সময় হঠাৎ মেঘবালিকার সাথে দেখা হয়।
কিছু কথা হয়,
কেমন আছো মেঘবালিকা?
আমি খুব ভালো আছি।
আপনি?
অনন্ত বলে উঠে আমি তোমাকে অনেক পছন্দ করতাম। কিন্তু মেঘবালিকা বলে উঠলো ওগুলো আবেগ ছিলো। আমি সবকিছু মজা মনে করতাম।
-পরে অনন্ত গাড়িটা নিয়ে চলে গেল দূরে, অনেক দূরে......ওরা চলে যেতেই মেঘবালিকার বুকটা হাহাকার করে উঠল, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হলো- "আমি মিথ্যে বলেছি অনন্ত। আমিও তোমাকে জীবনের থেকে বেশি ভালোবাসি। তোমার ধারণা ঠিক অনন্ত , আমি মানসিক ভাবে আসলেই দুর্বল। আমি ভালো নেই অনন্ত , আমি ভালো নেই।
জানি না কেন, এরপর আমি আর সামনে দাঁড়ানো অনন্ত মুখটা দেখতে পাব না। শুধু আমার নিজেকে দেখতে পাব। যেন চারদিকে আয়না। আয়না নাকি প্রতারণা করে না—যা সামনে থাকে, তা-ই ফুটিয়ে তোলে। নিজের অবয়ব হারিয়ে আমি তাকে খুঁজে ফিরব যেন কতকাল। জানি না কোন ভঙ্গি অদেখা মুখটাতে মানাবে। সেই ভঙ্গিটা আমি পাগলের মতো খুঁজে ফিরব। খুঁজতেই থাকব। সেই পর্যন্ত অনন্ত তুমি ভালো থেকো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শব্দব্রাউজ ২১৫ ৷। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse, Nilanjan Kumar

  শব্দব্রাউজ ২১৫ ৷। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse, Nilanjan Kumar শব্দব্রাউজ ২১৫ || নীলাঞ্জন কুমার বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা ১৭।...