শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে (১৫) || কান্তিরঞ্জন দে || সিনেমা দেখুন মগজ দিয়ে ।

 সবাই মিলে সিনেমা হলে  (১৫)

কান্তিরঞ্জন দে



সিনেমা দেখুন মগজ দিয়ে ।


       সিনেমা দেখতে গেলে চক্ষুষ্মান তো হতেই হবে।  কিন্তু , শুধু একজোড়া চোখ থাকলেই ঠিকঠাক সিনেমা দেখা যায় না । তার জন্যে চাই অন্তর্দৃষ্টি । এই অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয় মগজ আর হৃদয়ের ঠিকঠাক মেলবন্ধনে । 


        বিশ্ব  , ভারত   এবং বাংলা  সিনেমার আদিযুগ থেকে তৈরি সিনেমাগুলি  ধারাবাহিক ভাবে আপনার দেখা আছে ? তাহলে আপনি সিনেমার শিল্পরূপের রসগ্রহণে অনেকটা তৈরিই আছেন , বলা চলে । যে সব ছবিগুলি আপনার ইতিমধ্যেই ভালো লেগেছে , সেগুলো বারবার দেখুন । কম্পিউটারে কিংবা স্মার্টফোনে ফ্রেম থামিয়ে থামিয়ে দেখুন । কোনও একটি নির্দিষ্ট দৃশ্য , কেন আপনার ভালো লেগেছে ও লাগছে , সেটা অনুভব করবার চেষ্টা করুন । মগজ  অর্থাৎ , বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করবার চেষ্টা করুন । এই  মুঠোবন্দি সিনেমার যুগে  এইভাবে খণ্ড খণ্ড করে সিনেমা দেখা অসম্ভব বা কঠিন কিছু নয় । চল্লিশের দশকের গোড়ায় চ‌লচ্চিত্র- উৎসাহী সত্যজিৎ রায় তার অফিসের টিফিন টাইমে, ম্যাটিনি শো শুরুর অনেক আগে , ধর্মতলা পাড়ার সিনেমা হলগুলোতে গিয়ে ( মূলত , লাইটহাউস সিনেমা হলে ) প্রোজেক্টরম্যানকে " খুশি " করে একেকদিন একেকটা রিল বারবার চালিয়ে চালিয়ে দেখতেন ।


         সিরিয়াসলি যদি সিনেমা দেখতে চান, তাহলে আপনার পছন্দমতো , অথবা কোনও অভিজ্ঞ- সিনেমা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো আগাম একটি লিস্টি বানিয়ে নিন । মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ জীবনে চলচ্চিত্রে উৎসাহী মৃণাল সেন , তার দৈনন্দিন ডায়েরিতে এ রকম একটা তালিকা তৈরি করে রাখতেন । কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় বার করে এই ভাবে তালিকা মিলিয়ে সিনেমা দেখতেন ।


        ১৯৪৭/ ৪৮ সাল বা তার পরবর্তী বেশ কিছু বছরে ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হিসেবে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল, চিদানন্দ দাসগুপ্ত, বংশী চন্দ্রগুপ্তেরা তাদের সোসাইটির শো-তে একটি ছবি একবার দেখে ভালো লাগলে , নির্দিষ্ট দৃশ্যের রীলগুলো বারবার বারবার চালিয়ে চালিয়ে দেখতেন ।

          সেই ৭০ /৭২ বছর আগে কোথায় ভিডিও ক্যাসেট ? কোথায় সিডি ? কোথায় ডেস্কটপ- ল্যাপটপ আর কোথায়ই বা মুঠোফোনে ইউ টিউব ?? কি অদম্য উৎসাহ  আর তীব্র আগ্রহ একবার ভাবুন ।

     এদের মধ্যে পরবর্তী কালে সবাই তো আর পরিচালক হন নি । কিন্তু অনেকেই বিখ্যাত চলচ্চিত্র গবেষক , তাত্ত্বিক, প্রাবন্ধিক হয়েছেন । যারা তা হন নি , তাদের   মধ্যেও অনেকেই পরবর্তী কালে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের গুণী সংগঠক অথবা সরকারের বিভিন্ন চলচ্চিত্র কেন্দ্রের প্রশাসক হিসেবে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন । যারা সে-সবও হন নি, তারা খাঁটি গুণী চলচ্চিত্র-রসিক দর্শক হয়েছেন ।


       আপনি সিনেমা মাধ্যমের সিরিয়াস দর্শক হতে চাইলেও আপনাকে মন-হৃদয়-মনন দিয়েই  সিনেমা দেখতে শিখতে হবে।


         কিন্তু প্রিয় সিনেমাটি ফ্রেম থামিয়ে থামিয়ে ( ফ্রিজ বা স্টিল করে ) আপনি কি দেখবেন ? সেটা আগে ঠিক করে রাখবেন । কোনওদিন শুধু চিত্রনাট্যের চলনের দিকে মনোযোগ দিলেন । পর্দায় গল্পটা কিভাবে বলা হচ্ছে , সেটা খেয়াল করতে করতে গেলেন ।

       এইভাবে , কোনওদিন দেখলেন শুধু ক্যামেরার কাজের দিকটা । কোনওদিন দেখলেন শুধু দৃশ্য কাটাছেঁড়া , অর্থাৎ সম্পাদনা-র  দিকটা । কোনওদিন শুধু অভিনয় । কোনওদিন শুধু সংগীতের  বা পোশাক-আশাক কিংবা লোকেশনের ব্যবহার । প্রথম প্রথম আপনার একটু অসুবিধে হবে, সম্পূর্ণ মনসংযোগর । বিশেষত , ছবিটি যদি চিরায়ত ক্লাসিক ফিল্ম হয় , তাহলে তো হবেই । কিন্তু কিছুদিন পর দেখবেন ,আপনি অভ্যস্ত হয়ে গেছেন । আপনার নেশা লেগে যাবে ।

      সিনেমার সব ক'টি বিভাগ আলাদা করে দেখতে দেখতে আপনি পরিচালকের  গুণপনা এবং বিশেষত্ব ও নিজস্বতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবেন । তখন আপনি হয়তো টাইটেল কার্ড না দেখেও ,  এটি কার তৈরি সিনেমা, সেটা ধরতে পারবেন । যেমন গলা শুনেই আপনি ধরতে পারেন, এই গানটা কোন শিল্পীর গাওয়া । কিংবা ভাষা এবং গদ্যভঙ্গি দেখেই বুঝতে পারেন, এই গল্প বা উপন্যাসটি কোন সাহিত্যিকের লেখা ।


       প্রতিটি বিভাগ খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে আপনি পরিচালককে যেমন চিনতে পারবেন , তেমনি শিল্প মাধ্যম হিসেবে সিনেমা-র সঙ্গেও আপনার নিবিড় পরিচয় হবে ।

      

     আমাদের দেশে গত ১১৫ বছর  যাবৎ প্রতি বছর সিনেমা তৈরি হয় প্রচুর । হাজার হাজার । নানান ভাষায় । কিন্তু , খুব দুঃখের হলেও এটা নির্মম সত্যি যে , আমাদের দেশ চলচ্চিত্র সাক্ষরতায় পৃথিবীর বহু ছোট ছোট দেশের তুলনায় আজও অনেক অনেক পেছিয়ে । এ দেশে প্রতি বছর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে " শিক্ষিত " যুবক-যুবতী   হয়তো বেরোচ্ছে প্রচুর । কিন্তু , সত্যিকারের সিনেমা রসিকের জন্ম হচ্ছে কই ??

    নইলে , ভাবুন না , শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ পশ্চিমবঙ্গে আজও শিক্ষিত সম্প্রদায় সিনেমাকে " বই" বলে ?


      হায় !! এ অন্ধকার কাটবে কবে ? কিভাবে ??

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নিউ নরমাল আই ফেস্ট ২০২০ || বিশেষ প্রতিবেদন

দারুণভাবে সফল হল "নিউ নরমাল আই-ফেস্ট ২০২০ " বিস্তারিত প্রতিবেদন পড়তে দয়া করে আজ রাত ৯টার পর রিফ্রেশ করুন... বিশেষ প্রতিবেদন, দৈনিক...