বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২০

একজন বুড়ো মানুষ-৩ ।। নিরুপমা বরগোহাঞি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস

 একজন বুড়ো মানুষ || নিরুপমা বরগোহাঞি



মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ~ বাসুবেদ দাস



(৩)

‘বাঃ ফিলসফার। আমি ফিলসফি না পড়ে তোমার পড়া উচিত ছিল দেখছি,আর আমার হওয়া উচিত ছিল ইঞ্জিনিয়ার।অন্তত আমি ইঞ্জিনিয়ার হলে এতদিনে গুয়াহাটিতে একটা বাড়ির মালিক হতে পারতাম।?

তিক্ত বিদ্রপের হাসিতে কথাটা বলে কমলা সেদিন খুব বিরক্তির সঙ্গে সঞ্জয়ের সামনে থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। সংসার ধর্ম করা মানুষের মুখে এরকম উচ্চাকাঙ্থা রহিত তত্ত্বকথা শোনার ধের্য কমলার ছিল না। কথার ধরন দেখনা --সে যেন অপ্রাপ্য জিনিসের আকাঙ্খা করছে। প্রয়োজনীয় জিনিসটা জোগাড় করে নেবার কোনো চেষ্টা নেই,উৎসাহ নেই,কিছুই নেই,তা না করে তাকেই কিনা এখন উপদেশ দিতে আসছে।

অবশ্য সঞ্জয়ের একটা জিনিস খুবই ভালো,সে মনে মনে হলেও তা স্বীকার না করে পারে না। কমলার কোনো ইচ্ছাতেই সঞ্জয় কখনও বাধা দেয় নি,কেবল তাই নয়,তার দাবী,অনুরোধ প্রত্যেকটিই যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সঞ্জয় পালন করে এসেছে। তাই-জীবনে সে বেশ ঠকেছে ‘তার মতো মেয়ের প্রাপ্য সে বিবাহিত জীবনে একেবারেই পেল না-এরকম ভেবে নিজেকে খুব অসুখী বলে ভাবতে গিয়েও সে যেন নিজের মধ্যে তার পূর্ণ সমর্থন খুঁজে পায়না।

এভাবেই বাড়ি তৈরির কথাতেও কমলার ইচ্ছাকেই সঞ্জয় জয়ী হতে দিল। নাহলে বাড়ি তৈরির প্রসঙ্গ যখন উত্থাপিত হয়েছিল,তখন তাতে তার অসম্মতি না থাকলেও,এত দ্রুত তার বাড়ি তৈরির কাজে হাত দেবার ইচ্ছা ছিল না।আরও দুই চার বছর যাক না।জীবনের সমস্ত কিছুই এত দ্রুত লয়ে কেন সংগঠিত হতে হবে।মাঝে মধ্যে তার কিছুটা অবসরের প্রয়োজন।এই সেদিন মাত্র সে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে এসেছে,এত দূর বিদেশ ঘুরে এসেছে,এসেই চাকরিতে ঢুকেছে,তারপরেই বাবা বিয়ে দিয়ে দিল।এখন আবার একই দ্রুততার সঙ্গে শুরু করতে হবে বাড়ি তৈরি করার কাজ। সে নিঃশ্বাস নেবার মতো সময় কোথায় পেল? শৈশব থেকে সে যে পারিবারিক জীবন যাপন করে এসেছিল ,তা ছিল খুবই মন্থর গতির।একমাত্র সন্তানকে নিয়ে একটা সংসার।সেখানে ঘটনার অধিক্য একেবারেই ছিল না। তাই তার অনভ্যস্ত মন সাংসারিক দুই একটি কর্তব্যে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল । সংসারের কাজকর্ম ধীরে ধীরে চলতে পারেনা কি?

কিন্তু কমলার মতে পারে না। ধীরে ধীরে বলতে বলতে তো একদিন জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে,তাঁরা বুড়ো হয়ে যাবে। তখন কি আর যৌবনের এই উৎসাহ উদ্দীপনা কর্মপ্রেরণা থাকবে?

তাই কমলার মতে সায় দিয়ে একদিন সঞ্জয় বলল,হ্যাঁ,বাড়ি একটা তৈরি করা দরকার । সে খুব তাড়াতাড়ি সিমেন্ট ইত্যাদি জিনিসগুলোর জন্য আবেদন করবে । কেবল একটাই কথা। বাবার অনুমতিটা আগে নিতে হবে। কিন্তু সে কাজটা সে করতে পারবে না,কমলাকেই বাবার অনুমতিটা নিতে হবে।

তারপর একদিন রবিবারের সকালবেলা কমলা শ্বশুরের বই পড়ার বারান্দা এবং ড্রইংরুম সংলগ্ন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বাড়ি তৈরি করার প্রসঙ্গটা উত্থাপন করেছিল । তার সঙ্গে শ্বশুরকে এই কথাও মনে করিয়ে দিতে ভূলে যায় নি যে আগেই বাড়িটা তৈরি না করে তিনি বিরাট ভুল করেছেন। বিজয় ভরালী তখন নিজের প্রায় টাক মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলোতে বুলোতে অপরাধীর সুরে পুত্রবধূর অভিযোগটা মেনে নিয়ে স্বীকারোক্তি করেছিল-‘হ্যাঁ,আমি বড় ভুল করে ফেলেছি। এতবছর জমিটা এমনিতে পড়ে রইল।একটা বাড়ি তৈরি করা হল না।’

ড্রইং রুমে বাবার মতামত শোনার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকা সঞ্জয়ের মনটা কেমন যেন ভিজে উঠল--কমলা কি বাবার কাছে এই সময় অভিযোগটা না করলেই হত না?‘আমি বাড়ির প্ল্যানটা নিয়ে এসেছি বাবা,আমার আর্কিটেক্ট দাদা করে দিয়েছেন। আপনি একবার দেখে  দিন।’সঞ্জয় বসে থাকা অবস্থায় ড্রইংরুম থেকে দেখতে পেল ,বাবা বাড়ি তৈরি করার ব্যাপারে সম্মতি জানাতেই কমলা হাতের সেই কাগজটা বাবার দিকে এগিয়ে দিয়েছে। সেই একই কাগজ। সঞ্জয় দূর থেকে কাগজটা দেখেই চিনতে পারল। কমলা তাকেও দেখিয়েছিল। দুকাঠা জমি । দুটো ঘরের নক্সা। দোতলা বাড়ি। সঞ্জয় দেখে প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছিল-‘বলছ কি কমলা? একটা ঘরই তৈরি করা কষ্টকর,তুমি আবার দুটো ঘরের নক্সা করে এনেছ ,সেটাও আবার দোতলা?’

কমলা সঞ্জয়ের ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথমে হেসে উঠেছিলপরমুহূর্তেই গভীর কণ্ঠে বলে উঠেছিল – তুমি যেভাবে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠেছ,মানুষ ভাববে আমি বোধহয় তোমাকে বাড়ি তৈরি করার কথা বলছি না,তোমার বুকে বজ্রাঘাত করেছি। তবে এতটা ভয় পাবার মতো কিছু নেই,বুঝেছ কর্মবীর। দুটো ঘর আমি তোমাকে এখনই তৈরি করতে বলছি না,প্রথমে একটা তৈরি করে পরেরটা ধীরে ধীরে করলেই চলবে । আজকের দিনে দুকাঠা জমিতে একটা ঘর তৈরি করার প্রশ্নই উঠে না। আজকাল অনেক লোকই তো এক কাঠা জমিতেই দুটো তিনটে ঘর তৈরি করে বাড়ি ভাড়া দিয়ে দিচ্ছে। তোমরা তো আর সেসব খবর রাখ না।’

সেই একই কাগজটা এখনও বের করেছে কমলা । সঞ্জয় কাগজটা দেখেই চিনতে পারল।‘ও,একেবারে নক্সাও এঁকে এনেছ? খুব ভালো কথা,খুব ভালো কথা।’ বিজয় ভরালী কথার মধ্যে খুব আগ্রহ ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করলেন।প্রকৃতপক্ষে তিনি মনে মনে খুশিই হয়েছিলেন। তাঁর ছেলে বাড়ি বানাবে,তাঁর ছেলের একটা নিজস্ব বাড়ি হবে-কী আনন্দের কথা।সত্যি সত্যিই তাঁর বৌমা নামে এবং কাজে কমলা।

কমলার মুখটা উৎসাহে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।যাইহোক -আজ এতদিন পরে শ্বশুরের মনে বাড়ি তৈরি করার প্রতি একটা আগ্রহ জেগেছে, নিজে তৈরি না করলে কী হবে।

‘এই যে দেখুন বাবা-খুব উৎসাহের সঙ্গে কমলা শ্বশুরের চোখের সামনে নক্সাটা তুলে ধরে-‘এটা আমাদের জমির চার সীমানা। উত্তরে বংশী বরুয়ার বাড়ি,দক্ষিণে হরিপ্রসন্ন রাজখোয়ার বাড়ি,আর এই যে পূর্বে আর পশ্চিমে শরৎ চৌধুরী এবং অকণ বরুয়ার বাড়ি।’কাগজটিতে একটা আঙ্গুল বুলিয়ে কমলা বলতে থাকে-এই যে দুটো ঘরের নক্সা। দুকাঠা জমিতে দুটো ঘর। তিনটেও তৈরি করা যেত। কিন্তু আপনার ছেলে যে ধরনের অলস-একটা তৈরির কথা শুনেই ভয় পেয়েছে। সেইজন্য আমি দাদাকে দিয়ে কেবল দুটো ঘরের নক্সা করিয়ে নিয়েছি।নক্সা তৈরি করতে আজকাল ইঞ্জিনিয়াররা নাকি লোকের থেকে অনেক টাকা নেয় বাবা।তবে দুটো ঘর কংক্রিট দিয়ে তৈ্রি করতে হবে,কংক্রিটের ঘরে যদিও আসাম টাইপের থেকে বেশি খরচ পড়ে,একটা কথায় কিন্তু কংক্রিটের ঘর বেশি লাভজনক।কয়েক তলা করা যায়।এক একটি তলা এক একটি ঘরের মতোই ভাড়া দেওয়া যায়।কংক্রিটের ছাদের উপরে এক একটি তলা তৈরি করা যেতে পারে-নিজেদের ইচ্ছানুসারে।আসাম টাইপের ঘরে কিন্তু সে সুবিধা নেই।

কমলার বাড়ির নক্সা দেখে সঞ্জয় সরবে আর্তনাদ করে উঠেছিল,আর এখন বিজয় ভরালী সেই একই নক্সা দেখে নীরবে আর্তনাদ করে উঠলেন।

কিনে রাখা জমিতে কমলা আজ বাড়ি তৈরি করতে চলেছে --দুটো ঘর? তারমানে ইলার জমিটাতে আজ এতদিন পরে বাড়ি ঘরে ভরে যাবে? কেবলই ঘর?

পুত্রবধূর হাত থেকে নক্সাটা বিজয় ভরালী নিজের হাতে নিয়েছিল,হয়তো অতীতের কোনো স্বপ্নের হারানো ছবি  সেখানে ফুটে উঠেছিল নাকি তা দেখার জন্য,কিন্তু এখন তিনি সেটা ধীরে ধীরে বৌমাকে ফিরিয়ে দিয়ে নিস্তেজ মুখটাতে হাসির রেখে ছড়িয়ে বললেন – ‘তোমরা এত শিক্ষিত মা,তোমরা সবাই মিলে শলা পরামর্শ করে যে নক্সা তৈরি করেছ তা কি কখনও খারাপ হতে পারে? সঞ্জয়কে বল টাকার হিসেবটা করে রাখতে,আমিও বেঙ্ক থেকে টাকাগুলো উঠিয়ে নেব।’

কমলা নক্সাটা হাতে নিয়ে সন্তুষ্ট মনে ভেতরে চলে গেল,বাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখা মেয়েটির পর্দার আড়ালে ক্রমে অপসূয়মান মূর্তিটার দিকে বিজয় তাকিয়ে রিলেন,তাকিয়েই রিলেন,আঙ্গুলের চিহ্ন দিয়ে বন্ধ করে রাখা বইটা সেই একইভাবে বন্ধ হয়ে রইল তাঁর হাতে। রবিবারের সকালটা ক্রমশ এগিয়ে যেতে লাগল,বিজয় ভরালী কিন্তু একই ভাবে বসে রইলেন।

এভাবেই একদিন বাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখেছিল আর ও একটি মেয়েকিন্তু সত্যিই কি একইভাবে?.....

বিজয় ভরালীর নিজের বাড়ি দরং জেলার কোনো একটি অখ্যাত প্রামে। পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন বলেই তখনকার যুবক বিজয় গ্রামের চারসীমা অতিক্রম করে শহরে এসেছিল কলেজের শিক্ষা লাভ করার জন্য । সেই যে একবার বাড়ি থেকে বের হতে হল ,তারপরে আর বাড়ি ফিরে যাবার কোনো সুবিধেই পেল না বিজয় । কলেজের বন্ধে বা সরকারি চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে দুদিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে যাওয়া নয়,তার বাড়ির প্রধান দরজাটা তার কাছে চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তারজন্য দায়ী কিন্তু বিজয় নিজেই। পড়াশোনা শেষ করে মাঝারি ধরনের একটা সরকারি চাকরি একটা পেয়ে এই গুয়াহাটি শহরে তাকে প্রথম কাজ করতে হয়েছিল । সেখানেই ইলার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল।

গুয়াহাটি শহরে বিজয় তার কলেজ জীবনের চারটে বছর কাটিয়ে দিল। সেই চারবছর মেয়েদের সঙ্গে একত্রে ক্লাসও করেছে,দুই একজনের সঙ্গে পরিচয়ও হয়েছিল,কয়েক জনকে ভালোও লেগেছিল। ওদের প্রতি মনে মনে এক ধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতিও জেগেছিল। কিন্তু ঠিক ঘর বাঁধার  স্বপ্ন তাদের মধ্যে কোনো একটি মেয়েকে নিয়ে কোনোদিনই প্রবল হয়ে উঠে নি।

বন্ধুরা সেদিন তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল । সে ইলার মধ্যে কী দেখতে পেয়েছিল? কী পেয়েছিল সে ইলার মধ্যে ? জীবনের এমন কী স্বপ্নের ছবি তার চোখের সামনে ইলা তুলে ধরেছিল ? যার জন্য তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল ঘরের বাধা,সমাজের বাধা,এবং তারই সঙ্গে তার হিতাকাঙক্ষী বন্ধুদেরও বাধা।

সেদিন বন্ধুদের সেইসব প্রশ্নের কোনো একটির ও সে দিতে পারেনি।আর সে কি নিজেই তার উত্তর খুঁজে পেয়েছে?ইলা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে তার একদিন দেখা হল,তাকে তার ভালো লাগ্ল,খুব ভালো লাগল।কলেজে এক সঙ্গে পড়াশোনা করা কোনো মেয়েকেই এত ভালো লাগেনি। তার সঙ্গে কলেজে পড়া মেয়েদের মধ্যে আরতি নামের মেয়েটির চোখের অতল গভীরতা মাঝে মধ্যে তাঁর বুকে কম্পনের সৃষ্টি করত,গীতা নামে মেয়েটির কণ্ঠস্বর তাঁর প্রাণে পুলক জাগিয়েছিল,বিভা নামে মেয়েটির সৌন্দর্যের সামনে সে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। রঙ কালো হওয়া সত্তেও গালে টোল পড়া হাসি নিয়ে অর্চনা নামের অদ্ভুত মোহময়ী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলার পরে বিজয়ের মাঝেমধ্যে তাকে নিয়ে কবিতা লেখার সখ জেগেছিল। কিন্তু ইলার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরে তাঁর জীবনে বেঁচে থাকার প্রবল উৎসাহ জেগেছিল।

অথচ ইলাকে কেন সে এত গভীরভাবে ভালোবেসেছিল ,তার কারণ খুঁজতে গেলে সে ও হয়তো বিষুঢ় হয়ে যাবে।আসলে বোধহয় কোনো কারণ নেই। কোনো যুক্তির জন্য,কারণের জন্য জীবনে বোধহয় কেউ কাউকে ভালোবাসে না। আর হয়তোবা কোনো কারণ থাকতেও পারে,কিন্তু সেই যুক্তিবোধের দ্বারা কেউ বোধহয় ভালোবাসার ক্ষেত্রে জ্ঞাতসারে পরিচালিত হয় না।

বিজয় অন্ততঃ ইলার প্রতি তার প্রেমের কোনো কারণ কখনও খুঁজে পায় নি। হৃদয়বৃত্তিকে যুক্তির সংকীর্ণতায় টেনে নেবার ইচ্ছাও তার কোনোদিন ছিল না। কিন্তু তার সমাজ তাকে, তার প্রেমকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে বাধ্য করেছিল।

কিন্তু ইলাকে সে কেন ভালোবেসেছিল তার সদুত্তর সে যে কখনও কাউকে দিতে পারবে না সেটা সে ভালো করেই জানত। তাঁর অশিক্ষিত গ্রাম্য মা-বাবাকে বা শিক্ষিত শহরের বন্ধুদের কাউকেই সে এর কারণ দর্শাতে পারবে না। তাদের সবার মনেই এই প্রশ্নটা চিরন্তন হয়ে থাকবে--বিজয়ের মতো এত বুদ্ধিমান,এত সুন্দর, ভালো ছেলেকে কীভাবে কিসের জোরে এই নীচকুলের সাধারণ মেয়েটি আকর্ষণ করতে সমর্থ হল ?

সত্যিই ইলা সাধারণ চেহারার সাধারণ একটি মেয়ে ছিল। বিজয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় কোনো একটি স্কুলে পড়ত।প্রথম দেখার স্মৃতিটি আজও তার মনে অম্লান হয়ে রয়েছে। খুব লম্বা বা খুব বেঁটেও নয়--এমন একটি মেয়ে। রঙ একটু কালো,চোখউজ্জ্বল ,নাক সাধারণ,ঠোঁট দুটো এত পাতলা যে দেখলে মনে হয় মেয়েটি এখনই কথা বলতে শুরু করবে। অন্ততঃ সেদিন মেয়েটিকে দেখে বিজয়ের এরকমই মনে হয়েছিল। তারপর বিজয়ের সঙ্গে পরিচিত হতেই মেয়েটি হাসল আর সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ের মনে হল --এত সরল,এত পবিত্র হাসি সে আর জীবনে দেখে নি। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আজও সে একই কথা ভাবে এত সরল এবং পবিত্র হাসি সে জীবনে আর কারও মুখে দেখতে পেল না।

তারপর সেই প্রথম দেখা হওয়ার পরে আরও অনেকবার সে মেয়েটিকে দেখতে পেয়েছে ,সেই পবিত্র হাসির মেয়েটিকে আর শেষ পর্যন্ত একদিন সে নিজের মনের মুখোমুখি হয়ে গভীরভাবে একটা সত্য উপলদ্ধি করল যে সেই মেয়েটির বাইরে আর অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে তাঁর ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয়।

হিতাকাঙ্খী বন্ধুরা তাকে বাধা দিয়েছিল। ‘তুই পাগল হয়েছিস নাকি বিজয় ? আমাদের এই রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে ,তোর বাড়ির বিরুদ্ধে গিয়ে সামান্য নিচ কুলের মেয়েকে বিয়ে করে তুই কী সাংঘাতিক মূর্খামি করতে চলেছিস,তা কখনও ভালোভাবে ভেবে দেখেছিস কি?’

কিন্তু বিজয় কারও বাধা মানল না,কারও কথা শুনল না। বাড়ির অভিভাবকদের সে এই বলে জবাব দিল –‘তোমরা আমাদের মঙ্গলাকাঙ্খী নয় কি? তোমরা কি আমার সুখ চাও না? তাহলে যে পথে আমার সুখ হবে,তাতে তোমরা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছ কেন?’

মাকে সে সবার নিভৃতে অন্য একটি কথাও বোঝাতে চেষ্টা করল। ‘দেখ মা,তোমার এই ছেলেকে নিয়ে তোমার মনে বড় গর্ব,--এত সৎ স্বভাবের ,এত ভালো ছেলে বলে মনে মনে তোমার বেশ গর্ব, আমি তো তা জানি। কিন্তু সেই ছেলে যদি বিনা অপরাধে আজ একটি মেয়েকে ঠকায়,তোমার সেই পুত্র গর্ব তখন কোথায় থাকবে?’

মা ছেলের কথায় কী বুঝতে পেরেছিল,কিছু সময় কোনো কথা না বলে চোখের জল মুছতে মুছতে শেষে বলেছিল –‘ঠকাতেই যদি না পারিস তাহলে সেই নিচ বংশের মেয়েটির কাছে কেন গিয়েছিলি?’

মুখে যদিও হাসি ছিল কিন্তু বিজয়ের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ইলা তার মুখের সামনে অমৃতের পাত্র ধরে দাঁড়িয়েছিল,কিন্তু সে দেবতা নয়,সামান্য মানুষ,সেই অমৃতের স্বাদ গ্রহণ করার সাধ্য কোথায়?

সেদিন কেবল তার নিজের দিকের বন্ধু বান্ধব ,হিতাকাজ্ক্মী এবং অভিভাবকদের প্রশ্ন এবং সমালোচনার সম্মুখীন হয় নি বিজয়,স্বয়ং ইলা এবং ইলার অভিভাবকদেরও প্রশ্নের উত্তরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হয়েছিল তাকে । ইলা তাকে বলেছিল –‘আমার মতো একটি সামান্য মেয়েকে বিয়ে করতে গিয়ে আপনাকে খুব বেশি মূল্য দিতে হয়েছে । এই সমস্ত জেনে আমি এই বিয়েতে কীভাবে রাজি হতে পারি। আপনি যে জীবনে কোনোদিনই সুখী হতে পারবেন না।’ সহজ সরল ভাষায় কথাগুলো বলে ইলা কেঁদে ফেলেছিল। ইলাকেও আবার আলাদা ভাবে বোঝাতে হয়েছিল—‘তুমি যদি সত্যিই আমার সুখের কথা চিন্তা করছ,তাহলে একথাটা ভাবছ না কেন যে তোমাকে বিয়ে করে দুঃখ পাওয়ার চেয়ে তোমাকে বিয়ে করতে না পারার দুঃখ আমার অনেক গুণে বেশি হবে।’এর পরে ইলা আর বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় নি। সে কেবল নীরবে চোখের জল মুছেছিল। ইলাকে বিয়ে করতেগিয়ে বিজয়কে সবার মুখোমুখি হতে হয়েছিল,সবাইকে কৈফিয়ৎ দিতে হযেছিল। সেসব যেন জীবনের এক একটি পরীক্ষা । আর সেই সমস্ত কঠিন পরীক্ষা গুলির মধ্যে সবচেয়ে কঠিনতম পরীক্ষাটা দিতে হল স্বয়ং ইলার বাবার কাছে।

বিজয় জীবনে শ্রদ্ধেয় মানুষ খুব কমই দেখতে পেয়েছে--এখনও,এই বুড়ো বয়সেও বিজয় ভরালীর এই ভাবনার কোনো পরিবর্তন হয় নি। ইলার বাবা কিন্তু তার মধ্যে ছিল একজন ব্যতিক্রম । বিজয় বি.এ পাশ করার পর ইলার বাবার অফিসে তারই অধীনে একটি চাকরি পেয়েছিল। রোহিনী দাস অর্থাৎ ইলার বাবার সংস্পর্শে প্রথমে সে এভাবেই এসেছিল । ধীরে ধীরে কোনোভাবে এই দুই ভিন্ন বয়সের,ভিন্ন চাকরির মানুষ পরস্পরের কাছাকাছি চলে এসেছিল।রোহিনী দাস বিজয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তার কাজ কর্মের প্রতি নিষ্ঠা দেখে। এত ভালো ইংরেজি লিখতে পারা,কাজে কোনোরকম ফাঁকি না দিয়ে এত মনোযোগের সঙ্গে কাজ করার মতো আর কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তি তাঁর অফিসে ছিল না। তিনি নিজেও ইংরেজিটা বেশ ভালোই জানেন,তাঁর নিজের কাজ-কর্মও খুব পরিপাটি করে করা,এই গুণের জন্যই তিনি খুব দ্রুত তাঁর ইংরেজ ওপরওয়ালার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফলস্বরূপ খুব দ্রুত তিনি সঙ্গের সবাইকে ছাড়িয়ে একটা উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর অফিসে অসৎ উপায়ে ধন উপার্জন করার অনেক ফাঁক-ফোকর ছিল। অফিসের কাজ কর্মে নয়,সাধারণ জীবনেও মানুষটা কখনও কোনো অন্যায় করেননি,কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি ।সুযোগ পেলেই পরোপকার করতেন,তাঁর আশ্রয়ে অনেক দুঃখী কিন্তু মেধাবী ছেলে পড়াশোনা করে মানুষ হয়েছিল। এইসমস্ত কারণেও তাঁর নিজের উপার্জন যথেষ্ট হওয়া সত্তেও বিশেষ কোনো সম্পত্তি রেখে যেতে পারেননি। তাই জুহুরি রত্ন চেনার মতো রোহিনী দাসও বিজয়ের প্রতি আকৃষ্ট হল। শেষে তাঁর বিজয়ের প্রতি এতই ভালোবাসা জন্মাল যে একদিন তাকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলেন। বিজয়েরও এই মানুষটার প্রতি অনেকদিন থেকে অন্তরে বেশ গভীর শ্রদ্ধা জন্মেছিল,সে এভাবে মানুষটার ভালোবাসা জয় করতে পেরে বেশ খুশি হয়েছিল৷

এভাবেই একদিন বিজয় রোহিনী দাসের বাড়িতে এসেছিল । তারপর আরও একদিন,তারপরেও আরও একদিন এবং শেষপর্যন্ত নিয়মিতভাবে সে রোহিনী দাসের বাড়িতে আসা যাওয়া করতে লাগল। শেষপর্যন্ত সে অবশ্য আর রোহিনী দাসের কাছে আসত না,আসত রোহিনী দাসের মেয়ে ইলার কাছে।

ইলার মায়েরও এই অমায়িক সুন্দর চেহারার ছেলেটির প্রতি অন্তরে গভীর স্নেহ ভালোবাসা সঞ্চিত হয়েছিল। শেষে একদিন তিনি স্বামীর কাছে মনের ইচ্ছাটা মুখ ফুটে বলেই ফেললেন –‘আমাদের ইলাকে যদি বিজয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে  পারতাম’

রোহিণী দাস গম্ভীর হয়ে উঠেছিলেন। প্রথমে কিছুক্ষণ স্ত্রীর কথার কোনো জবাব দিলেন না। তারপর মুখে ম্লান হাসির রেখা ফুটিয়ে বললেন--আমাদের সমাজে বৈদিক আচার অনুষ্ঠান মেনে চলা হলেও সমস্ত কিছুতে তা অনুসরণ করা হয়না। তা নাহলে আর্য সমাজে একটা বিধি ছিল যে ‘স্ত্রী রত্নং দুষ্কুলাদপি –’, নিচকুলের মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে আনার বিধি তখন ছিল। এখনও সেরকমটা হলে আমাদের ইলাকেও বিজয় প্রহণ করতে পারত। কিন্তু আজকের সমাজ ব্যবস্থা মতে তো তা সম্ভবপর নয়।তবে একটা কথা বিজয়কে জামাই হিসেবে পেলে আমিও খুব সুখী হতাম।’

কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ইলার মা--বাবার আশা কোনোভাবে ফলবতী হওয়ার আশা তারা দেখতে পাননি সেই আশার গোড়ায় জলসিঞ্চন করে তাকে পুনরায় সঞ্জীবিত করে তুলল স্বয়ং বিজয়। এবং তাকে সহায়তা করল তাদের মেয়ে ইলা।

কিন্ত এর ফলে রোহিণী দাস বা তার স্ত্রী কি সুখী হতে পেরেছিল? অবশেষে বিজয়কে একদিন রোহিণী দাস ডেকে পাঠিয়েছিল।বিজয়ের মনে হয়েছিল এবার তাকে কঠিনতম পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে হবে। যেনতেন ভাবে উত্তর দিয়ে সে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে না।

তারপর সেই পরীক্ষাও শেষ হয়ে গিয়েছিল। বিজয়ের ধারণা হয়েছিল খুব বেশি কৃতকার্য হতে না পারলেও একেবারে খারাপও হয়নি। রোহিণী দাস বলেছিল –‘সমাজের কথা বাদ দিলেও বাড়ির কথা তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। বাড়ির আশীর্বাদ না পেলে যে সংসার নতুন করে পাতা হবে তা তো কখনও শুভ বা মঙ্গলময় হতে পারে না।'বিজয় সেদিন সমস্ত লাজ লজ্জা পরিত্যাগ করেছিল, করতে বাধ্য হয়েছিল। সে রোহিণী দাসের কথার উত্তর দিয়েছিল এভাবে –‘বাড়ির অনুমোদন না পেলে বা আশীর্বাদ না পেলে নিজে যে সম্পূর্ণ সুখী হতে পারব না সেটা আমিও জানি। তারজন্য আমি প্রস্তত রয়েছি ,ইলাকেও প্রস্তুত করে নিয়েছি। আমাদের নতুন সংসারের একটা অংশ চিরকাল অসুখী হয়ে রইবে—তার কোনো প্রতিকার নেই। কিন্তু শুভ হবে না,মঙ্গলময় হবে না সেটা আমি মেনে নিতে প্রস্তুত নই--সেটা সম্পূর্ণ অন্ধবিশ্বাসের কথা৷ শুভ মঙ্গলময় জীবন লাভ করার জন্য আমি নিজে যতটুকু সম্ভব সচেতনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করব,যতটুকু পারব না  আমি ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেব। সেখানে বাড়ির সম্মতি বা আশীর্বাদের কোনো হাত নেই --আমি সেসব বিশ্বাস করি না।যুক্তির দ্বারা আমি সবসময় পরিচালিত হই না,কিন্তু এই কথাটিকে আমি সবসময় যুক্তির দ্বারাই বিচার করব।এতক্ষণ পর্যন্ত রোহিণী দাস বিজয়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল,এবার সে ল্লান হাসি হাসল --বিজয় তুমি দেখছি অগ্র পশ্চাৎ ভেবে ইতিমধ্যে মন স্থির করে ফেলেছ। কিন্তু তবু স্বার্থের খাতিরে একটা কথা তোমাকে বলছি। কথাটা খুবই স্বার্থপরের মতো শোনাবে--কারণ আমি কেবল নিজের দিকের কথা ভেবেই কথাগুলো বলছি। তোমার কথা,তুমি অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে এই কয়েকদিন ধরে যে কষ্ট পাচ্ছ ,সেসব কিছুই না ভেবে কেবল নিজের কথা ভেবে কিছু কথা বলে,একটা আপত্তি তুলে তোমাকে দুঃখের উপর আরও দুঃখ দেব। কথাটা হল এই--ইলা আমাদের পাঁচটি ছেলের মধ্যে একমাত্র মেয়ে। তাকে যে আমরা খুবই আদর যত্ব করে লালন পালন করেছি তা বলাই বাহুল্য। ও জীবনে দুঃখ পাবে --এটা আমরা ভাবতেই পারি না। কিন্তু বিয়ের পরে,পরিবারের লোকেরা যদি তাকে আদরের সঙ্গে গ্রহণ না করে --সাদরে গ্রহণ করা দূরের কথা --সে যদি সারা জীবনের জন্য শ্বশুর বাড়ির আদর আহ্লাদ থেকে চিরাকলের জন্য বঞ্চিত হয় ,সে দুঃখ আমরা কীভাবে সহ্য করব? ইলা নিজে অন্তরে যে আঘাত পাবে তাই বা আমরা নীরবে কীভাবে সহ্য করব?’

সেদিন সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যাওয়া উত্তরটা বিজয় কিন্তু তৎক্ষণাৎ দিতে পারে নি। কিন্তু উত্তর একটা তো দিতেই হবে ।সেজন্য প্রথম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেও অবশেষে সে রোহিণী দাসের দিকে একবার মুখ তুলে দেখে আর একবার মুখ নিচু করে ধীরে ধীরে বলে ফেলেছিল। --‘আপনাদের তো নিজের মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করতেই হবে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ইলার সুখের কথা ভেবে আপনাদের এই বিয়েতে আরও সহজে সম্মতি দেওয়া উচিত। আমি তো সেই আশাতেই রয়েছি--আপনারা ইলার সুখের কাছে বাকি সমস্ত কিছুকেই তুচ্ছ ভাববেন বলেই তো অনেক আশা করে আমি এগিয়েছি | অন্য কোনো একজনের সঙ্গে ইলার বিয়ে হলে তার জীবন যে অসুখী হবে ,সে কথা বিবেচনা করবেন ভেবেই আমি মনে সাহস সঞ্চয় করতে পেরেছি ।’



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

অবহেলা || দীপক মজুমদার || অন্যান্য কবিতা

অবহেলা দীপক মজুমদার আর গোপন রাখব না আমাদের সম্পর্কের ইতিবৃত্ত।  শব্দের খাঁজে লুকানো গোলাপের উষ্ণতা। ঝাউবনের নির্জনতায় জৌলুস সম্পৃক্তি। প্রি...