শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

একজন বুড়ো মানুষ-৪ || নিরুপমা বরগোহাঞি || অনুবাদ~বাসুদেব দাস,

একজন বুড়ো মানুষ

নিরুপমা বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ~ বাসুদেব দাস,




 (৪)


এতদিন যে মানুষ চাকরি জীবনে তার উপরওয়ালা হয়ে তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে এসেছে,তারপর

প্রতি স্নেহ ভালোবাসা জন্মানোয় তাকে নিজের বাড়িতে সাদর আমন্ত্রণ করে এনেছে ,আজ সেই

মানুষটির মেয়ের পাণিপ্রার্থী হয়ে খোলাখুলিভাবে তাকে আবেদন জানাতে হওয়ায় বিজয় যেন লজ্জায়

মরে যাবে,কিন্তু তার বিয়েতে যখন দুর্ভাগ্যক্রমে তাকে নিজেই নিজের অভিভাবকের ভূমিকা পালন

করতে হচ্ছে ,এর বাইরে তার আর কোনো উপায় ছিল না।

সেদিন এসব বলেই কিন্তু বিজয় দ্রুত আরও একটা কথা তার সঙ্গে যোগ করেছিল,কারণ সে

বুঝতে পেরেছিল তার এই উত্তর ইলার পিতাকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে ফেলেছে ;কারণ ইলার পিতার

বক্তব্য সে অমোঘ যুক্তিতে খণ্ডন করার পরে তাঁর মনে তৎক্ষণাৎ আর কোনো কথা না আসাটাই

স্বাভাবিক। তাই বিজয় পুনরায় বলল,এবার তার কণ্ঠস্বর আবেগে,সততা এবং নিষ্ঠার ভারে ভারী হয়ে

প্রকাশ পেল—‘আপনি এখন কী বলবেন জানি না,আপনারা সম্মতি দেবেন কিনা জানি না,কিন্তু একটা

প্রতিশ্রুতি আমি এখনই আপনাদের দিয়ে রাখছি--ইলাকে আমি শ্বশুর বাড়ির স্নেহ ভালোবাসা থেকে

বঞ্চিত রাখতে বাধ্য হলেও ,তার সেই দুঃখ ভুলিয়ে দেবার জন্য আমি আশ্রাণ চেষ্টা করে যাব। আমার

পরিবারের স্নেহ ভালোবাসা না পেলেও একটা ছোট্ট সুখী গৃহকোণ তাকে আমি এভাবে তৈরি করে দেব যে

ইলা কখনও শ্বশুরবাড়ির স্নেহ ভালোবাসা থেকে নিজেকে বঞ্চিত ভাবার অবকাশই পাবে না।’

আজ বিজয় ভরালীর সেদিনের কথা মনে পড়লে তার লজ্জা হয়,কত আবেগ ঢেলেই না সে

কথাগুলো বলেছিল,হয়তো দৃশ্যটা বড় নাটকীয় হয়ে পড়েছিল কিন্তু সত্যিই তো আর সেদিন নাটক করার

জন্য কথাগুলো বলেনি,প্রাণের সমস্ত নিষ্ঠা ঢেলে দিয়ে সে কথাগুলি বলেছিল। আজ সেসব ভেবে ভেবে

বিজয় ভরালীর ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে—একদিন যা এত সত্য ছিল আজ যে

কীভাবে সেই সমস্ত কিছু এত অবাস্তব স্মতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।

তার কথা শুনে রোহিণী দাসের মুখে হাসির মৃদু রেখা ফুটে উঠেছিল। তিনি খুব স্নেহের চোখে

বিজয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়েছিলেন ,অন্তত তখন তার সেরকমই মনে হয়েছিল। সে মাথা নিচু করে

ছিল বলে রোহিণী দাসের মুখটা দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু সে সমস্ত অনুভূতি দিয়ে যেন অনুভব করছিল

একজোড়া কোমল চোখের গভীর স্লেহপূর্ণ দৃষ্টির প্রলেপ তার উপর রয়েছে। তারপর সে শুনতে পেল

ইলার বাবা বলছে –‘আমি আর কোনো রকম আপত্তি করব না বিজয়। তোমরা দুজনেই সুখী

হও,তোমাদের জীবন মঙ্গলময় হোক,তোমাদের জীবন সৎ হোক । নিষ্ঠা এবং ঐকান্তিকতার সঙ্গে

তোমরা দুজন যেন সবসময় জীবন পথে চলতে পার আমি সেই আশীর্বাদই করছি। আমি মনে মনে ইলার

জন্য তোমার মতো ছেলের খোঁজই করছিলাম । আমার জামাইয়ের টাকা পয়সা থাকুক বা না

থাকুক,চরিত্র বল যেন থাকে,সৎ সাহস,সাধুতা যেন থাকে এটাই আমার প্রতিদিনের প্রার্থনা ছিল।

আজ ঈশ্বর আমার সেই প্রার্থনা সফল করেছে। অবশ্য জীবনে চিরকাল একটা দুঃখ থেকে

যাবে—তোমার মাতা পিতা ,তোমাদের বাড়ির সবাইকে আঘাত দিয়ে একটা নতুন সংসার গড়ে তুলতে

হল।এটা একটা বিরাট দুঃখ বিজয় । আমি জান তোমার মনের ভেতরে কী হচ্ছে। কত কষ্টে,কত আশায়

মা বাবা ছেলেকে বড় করে তোলে তা নিজেও পিতা হয়ে তা ভালোভাবেই বুঝতে পারছি। তাদের তুমি

মর্মান্তিক আঘাত দিয়েছ বিজয়। আমি আর কী বলব--আমি কেবল এটাই কামনা করি তুমি যদি জীবনে

সত্যিই মানুষ হয়ে উঠ,বড় হও,তোমার গর্বে গর্বিত হয়ে তারা একদিন কিছুটা হলেও মানসিক আঘাত

মুছে ফেলতে সক্ষম হবে।’


ইলার বাবা আরও অনেক কিছু বলেছিল।বিজয় কেবল মাথা নিচু করে শুনে গিয়েছিল এবং বিভিন্ন

আবেগের চাপে তার অন্তরে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছিল।

তারপর একদিন ইলাকে বিয়ে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল।বাড়ি মানে ভাড়া বাড়ি।তিনটি

ঘর,রান্নাঘর আলাদা। খুব একটা খারাপ নয় যদিও খুব ভালোও বলা যাবে না। বাড়িটা নামেই পাকা,এত

পুরোনো যে জায়গায় জায়গায় নিচের ইট বেরিয়ে পড়েছে। একটু স্যাঁতসেতে, আলো নেই,অবশ্য সেই সময়

শুয়াহাটি শহরের খুব কম জায়গাতেই বিদ্যুতের আলো ছিল। এই তিনটে রুম ছাড়াও একটা বাথরুম

ছিল,কিন্তু সেটা ছিল কিছুটা দূরে কুয়োর পাশে। বাথরুমটা ও আধা ভাঙ্গা পাকার,দেওয়ালটা বেড়া দিয়ে

তৈরি। অবস্থা দেখে মনে হয় সেই বাঁশের বেড়ায় কোনোদিনই মাটি-গোবর বা চুণ দিয়ে লেপা হয় নি।

কুয়োটা কিন্তু ভালোই বলতে হবে,পাকা কুয়ো,জলও ভালো।

অনেক চেষ্টা চরিত্র করে বিজয় এই বাড়িটা ঠিক করেছিল। নতুন কনেকে আদর করে বরণ

করে নেবার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিজয়ের--তাই তার ভাবনার আর শেষ ছিল না। তাকে সাহায্য করার জন্য

ছিল ফাইফরমাশ খাটার জন্য থাকা বাদল। সেই বাদলকে সঙ্গে নিয়েই বাড়িটা যতটা সম্ভব সাজিয়ে

গুছিয়ে নতুন কনের উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা করেছিল। সাজানো মানে—তার পড়ার অজন্র বইগুলো

এখানে সেখানে পড়ে থাকত--টেবিলে,বাক্সের উপরে,বিছানায় এমনকি বসার চেয়ারে ও। এখন সমস্ত

বইগুলোকে একত্র করে টেবিলের উপরে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। বাদলকে বলল ঘরটাকে ভালোভাবে

ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখতে । এতদিন বাদল কীভাবে বাড়িঘর পরিষ্কার করত সেই জানে

কিন্তু বিজয়ের বিয়ের সময় ঘরের ভেতর থেকে যত আবর্জনা বের হল তা দিয়ে রাস্তার পাশে রাখা

প্রকাণ্ড আকারের ডাস্টবিনটার প্রায় অর্ধেকটা ভরে গেল।

বিজয় এবং বাদল এভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা ঘরে এসে উঠল ইলা । সঙ্গে নিয়ে এল একটা ঘর

ভরে যাবার মতো যৌতুকের জিনিসপত্র-খাট,পালঙ,আলনা চেয়ার,টেবিল,সোফা,আলমারি,মিটসেফ--

সবকিছু। একটা সংসার পাততে গেলে যে সমস্ত জিনিস পত্রের প্রয়োজন,ইলার সঙ্গে তার মা বাবা তার

প্রায় সমস্ত কিছুই দিয়ে দিয়েছিল।

তারপর বিয়ের তিন চারদিন কেটে যাবার পরেই ইল ঘর সাজানোয় উঠে পড়ে লেগে গেল। শোবার

ঘরে ইলা পালংটা, ড্রেসিং আয়না,আলনা এবং বেতের চেয়ারটা রাখল। এই চেয়ারটা ছিল বিজয়ের নিজের

। তাছাড়া বিজয় ব্যবহার করা খাটটাও ইলা নতুন বিছানার চাদর,বেড কভার দিয়ে ঢেকে পালঙ থেকে

একটু দূরে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। বিজয়ের সময়ে বিছানা চাদর দিয়েই তোষকটা ঢাকা থাকত। খুব

বেশি নোঙরা হলে বিজয় কখনও কখনও বাদলকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিত। বালিশের ওয়ারগুলোর

অবস্থাও ছিল সেরকমই। এখন তার শোবার ঘরটিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ লাভ করতে দেখে সে চমৎ্কৃত

হল।

‘বাঃ’ --বিজয় চারপাশটা দেখতে দেখতে খুশি হয়ে বলল –‘বাড়ির চেহারা দেখছি একেবারে বদলে

দিয়েছ ইলা । কী বাড়ি আমার কী হয়ে গেল?’

প্রশংসায় ইলা খুশি হয়েছিল। সে তৃপ্তির হাসি নিয়ে উত্তর দিয়েছিল –‘গৃহিনী আসার পরে তো

ঘরের আগের দুর্দশা থাকতে পারে না?’শোবার ঘরের সংলগ্ন দুপাশে দুটো ঘর। পথের পাশের ঘরটিকে

সোফা সেট দিয়ে সাজিয়ে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা করে পাশের ঘরটিকে লাইব্রেরি তৈরি করল।বিজয়

অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল কীভাবে তার অযত্ন রক্ষিত বইগুলি ইলা এক এক করে ধুলো ঝেড়ে টেবিলের


ওপর সাজিয়ে রাখল । সেই টেবিলটাও তারই ছিল। এতদিন পর্যন্ত তাতে বিজয়ের সমস্ত কাজই

চলছিল--সেখানেই ভাত খাওয়া বা চা খাওয়া চলত। বাদল টেবিলটির ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বইগুলো

পরম অবহেলায় একপাশে ঠেলে দিয়ে সেখানেই ভাতের থাল এবং চায়ের কাপ-প্লেটের জায়গা করে নিত।

চিঠি-পত্র ইত্যাদি যে কোনো লেখালিখির কাজও বিজয় টেবিলের ওপরেই করে,দাড়ি কাটার সাজ

সরঞ্জাম ও সেখানে রেখে তাতে দাড়ি কাটে। বন্ধুবান্ধব কেউ এলে এ টেবিলেই চা,তামোল দেওয়া হয়।

ইলা যখন টেবিলটার দায়িত্ব নিল তখন সেটা বিচিত্র দাগে পরিপূর্ণ—কালির দাগ,কুপি জ্বালিয়ে

বাদলের নোঙরা পরিষ্কীর করার অভ্যাস না থাকায় কেরাসিনের দাগ এবং মোমবাতির দাগ চুণের দাগ

টেবিলটাকে বিচিত্র রূপ দান করেছিল। ইলা এখন ঘষে ঘষে সেই দাগগুলি পরিষ্কার করল,তারপর

টেবিলে সুন্দর একটা টেবিলক্লথ পেতে দিয়ে বিজয়ের লাইব্রেরি রুম তৈরি করে দিল। টেবিলটা তার

জড়-জীবনে সেদিনই প্রথম আচ্ছাদন পেল।

ইলা বাবার কাছ থেকে ছোট একটা আলমারিও পেয়েছিল। ইলার শৈশব থেকে অনেক পুতুল

জমেছিল—সবগুলোই সেই আলমারিতে রাখা ছিল। মা-বাবা মেয়ের সঙ্গে তার শৈশবের খেলার সাথীদের

সঙ্গে আলমারিটাও পাঠিয়ে দিয়েছিল। ইলা কিন্তু বিজয়ের ঘরে পুতুলগুলি আলমারি থেকে বের করে

খালি বাক্স একটাতে ভরে রাখল। আর আলমারিটা বিজয়ের বইপত্র দিয়ে সাজিয়ে রাখল। সেইঘরে এখন

একটা আলমারি,একটি টেবিল,একটি কাঠের চেয়ার এবং একটি বেতের চেয়ার –এইসবই ইলা এমন

পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখল যে বিজয় মন্তব্য করল –‘ইলা,তুমি এত সুন্দর করে সাজিয়ে তোমার

নিজেরই যে ক্ষতি করলে,সেই কথাটা ভেবে দেখেছেন কি?’

‘তার মানে?’ইলা সত্যিই অবাক হল।

‘তার মানে আর কি? পুরুষ মানুষ বই পত্র পড়লে নাকি মেয়েরা খুব রাগ করে --অর্থাৎ তারা

চায় পুরুষ মানুষদের সম্পূর্ণ আনুগত্য কেবল তাদের প্রতিই থাকবে,অন্য কিছুর প্রতি আকর্ষণ

থাকাটা তারা মোটেই পছন্দ করে না। তা সে বইয়ের মতো অচেতন পদার্থ হলেও । তুমিও তো সেই

মেয়েদেরই একজন-এত সুন্দরভাবে ,আরামপ্রদ করে আমার পড়ার রুম সাজিয়ে দিয়েছ, আগে থেকেই

আমি বই পড়তে ভালোবাসি,এখন তো আর লাইব্রেরি ঘর ছেড়ে বাইরে বেরুতে ইচ্ছাই করবে না’

‘ও,এই ব্যপার। আমি আরও ভাবছিলাম না জানি কী।’ ইলা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল-এর

জন্য আমি খুব একটা ভয় করি না--আমি খুব একটা বিদ্বান নই ,শিক্ষা-দীক্ষা তো জানই--কিন্তু

পড়াশোনার প্রতি আমার ভীষণ আগ্রহ রয়েছে, আমি পড়াশোন করতে ভীষণ ভালোবাসি । এখন আপনি

যখন পড়াশোনা করবেন আমিও তখন একটা বই নিয়ে আপনার পাশে বসে থাকব।তবে আপনাকে কিন্তু

বিরক্ত করব,কিছু বুঝতে না পারলে জিজ্ঞেস করব,বুঝতে পারলে আপনার কাছে আমার বিদ্যা জাহির

করার জন্য আপনাকেই বোঝাতে শুরু করব। কোনো বই পড়ে ভালো লাগলে আপনাকে সেই বিষয়ে বর্ণনা

দিতে শুরু করব,খারাপ মনে হলে লেখককে সমালোচনা করে আপনার সামনে একটা দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে

বসব। বই পড়ে হাসি পেলে আপনাকেও সেই রসের ভাগ দিয়ে আমার সঙ্গে আপনাকেও হাসাব,বই পড়ে

দুঃখ পেলে হাউমাউ করে কাঁদব-

‘অর্থাৎ-, বিজয় ইলার কথার মাঝখানেই বলে উঠেছিল -সেই পড়ার ঘরটা আমার না হয়ে

তোমার হবে এবং তখন তোমার থিয়োরিটাকেই আমাকে উল্টিয়ে বলতে হবে যে বউ বই পড়লে স্বামীরা

খুব খারাপ পায় –’


হো হো করে ইলা হেসে উঠেছিল।

সেই হাসির ধ্বনি যেন আজও দূর অতীত থেকে ভেসে এসে বিজয়ের বুকে ধাক্কা মারল। ইলার

সেই মন ভুলোনো হাসি। মেয়েটি এত প্রাণখুলে হাসতে পারত। মুখে এমনিতেই সব সময় হাসি লেগেই

থাকত,মনে হত যেন ইলার মুখ হাসির খোরাকের জন্য অপেক্ষা করে থাকত। তারপর সুযোগ পেলেই

হাসির উচ্ছ্বাসে মেতে উঠত। মাঝেমধ্যে বিজয় তার জন্য বিরক্ত ও হত। --এত হাসলে আশেপাশের

মানুষ কী ভাববে? ইলা সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হয়ে পড়ত--ছিঃ,এই বাজে অভ্যাসটা আর কোনোমতেই

ছাড়তে পারলাম না। মা আমাকে সংশোধন করার কত চেষ্টা করেছে আমি যে ছেলেদের মধ্যে বড় হয়ে

অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েসুলভ নম্রতা ভদ্রতা ভুলে যাই সে কথা মা আমাকে কতদিন বলেছে --ছিঃ কেন

যে বারবার ভুলে যাই-'

কিন্তু তারপর ও ইলা বারবার ভুলে যেত,আবার উচ্ছ্বসিত হাসিতে ভেঙ্গে পড়ত,আর মাঝে

মধ্যে বিজয় বিরক্ত হয়ে উঠত। আজ এত বছর পরে সেই হাসিভরা মুখটিকে স্মরণ করে বিজয় ভরালী

অদৃশ্য চোখের জল মুছে চলেছে।

একটা হাসিভরা মুখ। স্ত্রীর যে ছবিটা বিজয়ের চোখের ওপর সবসময় ভাসতে থাকে ,সেটা হল

হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে থাকা মুখের ছবি। একটা গোলাকার মুখ,খুব বেশি ফর্সা নয়,চোখদুটো

উজ্জ্বল,ছোট কপালটিতে একটু বড় টিপ,সিঁথিতে লম্বা করে সিদুরের রেখা । পাতলা ঠোটদুটিতে লেগে

রয়েছে চিরসঙ্গী হাসি।সেই হাসিকে মানুষটা কোনোদিন মলিন হতে দেয় নি। বিজয়ের মনে একটা বড়

কুষ্ঠাবোধ ছিল যে ভালো বাড়ি ঘরে প্রতিপালিত হওয়া ইলা এই আধা ভাঙ্গা ঘরে একটু হলেও

অসস্তুষ্ট হবেই।

প্রথমে না হলেও পরে নিশ্চয় তাকে বলবে যে বাড়িটা ভালো নয়। অসুবিধের লিস্ট দিন দিন

দীর্ঘ হতে থাকবে,হয়তো শেষ পর্যন্ত একটা ভালো দেখে ঘর খুঁজে নিতে বলবে। সেজন্যই ইলা যখন

তার সঙ্গে আনা নতুন চকচকে খাট পালঙ ,চেয়ার-টেবিল অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এবং খুব পরিপাটি

করে সাজাতে শুরু করল,বিজয় নিজেই কিছুদিন পরে যে প্রসঙ্গ শীঘ্রই অবতারণা করার সম্ভাবনা

রয়েছে তা শুরু করে দিল—

‘এই আধা ভাঙ্গা ঘরগুলো আর নতুন করে কী সাজাবে ইলা?’

আধা ভাঙ্গা হলেও অনেক চেষ্টা চরিত্র করে বাড়িটা পেয়েছ তাই নয় কি? আগে তো এর

থেকেও একটা খারাপ বাড়িতে ছিলে। আমাকে বিয়ে করার জন্যই তো এই বাড়িটা আগের চেয়ে অনেক

বেশি ভাড়া দিয়ে নিয়েছ। পাওয়া গেলে তো আর ও বেশি ভালো একটি ঘর নিতে--নয় কি ?বিজয়ের মুখের

দিকে তাকিয়ে ইলা হাসল।

কী প্রসঙ্গের অবতারণা করতে গিয়ে কী উঠে এল!

এই সমস্ত তথ্য তৃমি কোথা থেকে পেলে?’

‘কোথা থেকে আর-।বাদল বলেছে।সে আরও বলেছে-আপ্নি নাকি তাকে বলেছেন,আমি বেশিদিন

এই শহরে থাকতে চাইব না।আপনাকে আরও একটা ভালো বাড়ি খুঁজে বের করতে হবে।আপনি তো বেশ


বড়লোকের মনের খবর জেনে বসে আছেন।আমি এই ঘরে বাস করার আজ দুই সপ্তাহ পরেও আপনি

আমার মনের খবরটা জানেন না কিন্তু আমি এখানে আসার অনেকদিন আগে থাকেই আমার মনের সেই

খবর জেনে বসে আছেন।’

‘তারমানে এই বাড়িতে থাকতে তোমার আপত্তি নেই-’-বিজয় দ্রুত জিজ্ঞেস করল। ‘মোটেই না।

বাবা আমাদের শৈশব থেকেই শিখিয়েছেন যে মানুষ যতটুকু পায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। যে জিনিস

পাওয়া সম্ভব নয় তার জন্য হা-হুতাশ করে মনকে অসুখী করে তোলা উচিত নয়। সবদিক দিয়ে মনের

মতো হওয়া ভাড়াঘর পাওয়া তো অসম্ভব ব্যাপার। তাছাড়া আমরা তো এখানে চিরকাল বাস করব না।

আপনার যখন বদলির চাকরি একদিন না একদিন তো এখান থেকে চলে যেতেই হবে।’ তারপর বিজয়ের

দিকে তাকিয়ে হেসে ইলা বলল –‘আমরা যখন নিজেদের বাড়ি তৈরি করব তখন সেখানে নিজেদের মতো

করে সমস্ত কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে নেব।'

সেদিন বিজয় সত্যিই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। স্বভাবে সে অলস। এই সামান্য

জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি বদল করেই তার কেমন যেন হাফ ধরে গিয়েছিল। ইলাকে সন্তুষ্ট করার জন্য

কথাটা বললেও ,এখনই এত জিনিসপত্র নিয়ে পুনরায় একটি নতুন বাড়িতে উঠে যাবার সম্ভাবনার কথা

চিন্তা করেই তার কেমন যেন ভীতিপূর্ণ মনে হচ্ছিল। বদলি হলে তো কোনো উপায় না পেয়ে যেতেই হবে।

ইলার প্রতি মনে মনে বিজয় কৃতজ্ঞ বোধ করল। কিন্তু তবুও তার মনে একটা সন্দেহ থেকেই

গেল যে ইলার মনে একটা ভালো বাড়িতে বসবাস করার আকাঙ্থা রয়েছে। কিন্তু এতদিনের পরিচয়ের

পরেও তার অলস স্বভাবের কথা তো ইলার না জানার কথা নয়। তাই এই বাড়িটিকে সে এক মুহূর্তের

জন্যও ভূলে খারাপ বলে বলে নি। তা নাহলে আর কিছু না হোক অন্তত বাথরুমের ব্যাপারে ইলার

আপত্তি করাটা খুবই স্বাভাবিক ছিল--বেড়াগুলি থেকেও না থাকার মতোই। স্নান করতে গিয়ে

প্রতিদিনই ইলা চাদরটা দিয়ে ঢেকে দেয়,আর সে ও এতটাই মহামুর্খ -এতদিনে বাড়ির মালিককে বলে

কয়ে বেড়াগুলিতে মাটির প্রলেপ তো দিয়ে নিতে পারত। বেশ কিছুদিন এভাবে চলার পরে ইলা মুখ ফুটে

তাকে বলার পরে সে কাজটা করিয়ে নিয়েছিল।

সেদিন বিজয় বড় লজ্জা পেয়েছিল। নিজেকে বড়,অকর্মণ্য,সংসারী হওয়ার অনুপযুক্ত বলে মনে

হয়েছিল। অবশ্য ইলার কাছ থেকে সে এরকম একটা কাজ পাওয়ার ফলেই তার মনে বেশ একটা পৌরষের

গর্ব জেগে উঠেছিল। আধুনিক যুগে প্রাচীন বা মধ্যযুগের মতো পুরুষ অবলা নারীকে নানা বিপদ

আপদ,বিভীষিকা ইত্যাদি রক্ষা করার সুবিধা খুব কমই পায়। টাকার জোগাড় দেওয়া,বাজার করে

দেওয়া,মাঝেমধ্যে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, প্রয়োজনে ডাক্তার ডেকে আনা --এই সমস্ত কিছুতেই তাঁদের

পুরুষের কর্তব্য শেষ হয়ে যায়। নারীর কাছে আর কোনোভাবে তাদের বীরত্ব দেখানোর সুযোগ পায় না।

কিন্তু বিজয় নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করল--যখন বিয়ের পরের দিন রাতে ইলা তাকে ঘুম থেকে

জাগিয়ে তুলে বলল যে সে বাইরে যেতে চায়,কিন্তু বাথরুমটা অনেকটা দূরে,তার খুব ভয় করছে,বিজয়কে

সঙ্গে যেতে হবে। রাতে ঘুম থেকে স্ত্রীর সঙ্গে বাইরে যেতে হবে --এটাই কাজ। স্ত্রী তাকে খুব

কুণ্ঠার সঙ্গে জানায় ,এভাবে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে ইলার খুব খারাপ লাগে । শীতের রাত হলে তো সে

কুগ্ঠা আরও বাড়ে। কিন্তু কী করবে সে,তার যে প্রতিদিনই রাতে বাইরে যাবার অভ্যাস,অথচ এত ভয়

লাগে। এত ভয় যে তাকে রক্ষক হয়ে সঙ্গে যেতে হবে--নব-বিবাহিত যুবকের কাছে তরুণী স্ত্রীর এই

আবদার যে কতটা মাধুর্য বহন করে এনেছিল ,কী এক গৌরুষের গর্বে তার বুক স্ফীত করে

তুলেছিল,আজও সে অনুভূতি যেন নতুন করে বিজয় ভরালী উপভোগ করে৷


ইলার সেই ভয় নিয়ে দিনের বেলা বিজয় তাকে খুব খ্যাপায়। ‘এত ভয় কীসে?’ সে আরম্ত করে।

‘কীসে আর,ভূতে’-বিনা সঙ্কোচে ইলা উত্তর দেয়।

‘ভূত!এই গুয়াহাটি শহরেও ভূতের ভয় কর। তোমার নিজের চোখে কখনও ভূত দেখেছ যে এত ভয়

কর?’

‘বাঃ দেখিনি বলেই তো এত ভয়। বাঘ-সিংহ এরা সব কী কম ভয়ঙ্কর । কিন্তু ওদের দেখেছি

বলে ওদের কে এত ভয় লাগে না। কিন্তু রাতের বেলা ভূতের কথা মনে পড়লেই আমার শরীরের সমস্ত

লোম খাড়া হয়ে যায়।'

বিজয় হেসে ফেলেছিল। তারপর তার মনে হল ইলাকে কিছু তত্ত্বকথা বলা যেতে পারে।

‘ইলা,ভয় কী প্রমাণ করে জান?’

‘কী?’

‘জীবনের প্রতি মানুষের কতটা মায়া,কত মমতা। মত্যুকে ভয় করার মাধ্যমেই তো মানুষের মনে

সাধারণত সকল রকম ভয় সঞ্চারিত হয়েছে। মানুষ মরতে চায় না,বেঁচে থাকতে চায়--সেইজন্যই

পৃথিবীতে এত ভয়।

‘ইস,এ আর নতুন কথা কী। মানুষ তো মরতে চায়ই না। কেউ চায় না। আমিও চাই না।'

ক্ষণিকের জন্য থেমে গিয়েছিল ইলা-তারপর আস্তে করে বলেছিল –এখন আরও বেশি করে চাই

না।’ বিজয় ভালোবাসার দৃষ্টিতে ইলার দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু ইলার কথাটা না বোঝার ভান করে

হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিল –কেন?’

‘এমনিতেই-’, কপট ক্রোধের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল ইলা।

‘কিন্তু ইলা,আমি কিন্তু মরতে চাই। আজকেই। এখনই।’

‘কেন?’ প্রায় আর্তনাদের সুরে বলে উঠেছিল ইলা।

‘মরে ভূত হয়ে আমার প্রমাণ দিতে ইচ্ছা করছে-আমার মত্যুর পরে তুমি কতদিন কাঁদ।'

‘আপনি বড় নিষ্ঠুর।’ ইলার চোখ সেদিন ছলছল করে উঠেছিল। হাসি ঠিক যতটা সহজ আর

অনায়াস ছিল ইলার কাছে ,কাঁদাটাও ঠিক সেরকমই ছিল।

ইলার মৃত্যুর পরে বিজয় নিজে কিন্তু কাঁদে নি। কাঁদতে পারে নি। ইলা ভূত হয়ে সে কয়দিন

কেঁদেছে তা দেখতে চুপিচুপি এসেছিল কিনা,সে বলতে পারে না। ইলা তাকে ছেড়ে চলে যাবার পরে

কোনোদিন সে ইলার ছায়াটুকুও দেখতে পেল না।


জীবিতকালে যতই প্রিয়জন হোক না কেন,অনেকেই মৃত্যুর পরে কিন্তু সেই প্রিয়জনের

সাক্ষাৎ আর চায় না,অর্থাৎ ভূতের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সাহস থাকে না। কিন্তু বিজয় ভেবেছিল

সে যদি জীবনে কখনও ভূত দেখতে পেত--ইলার ভূত না হলেও অন্য কোনো ভূত দেখতে পেলেও সে

জীবনে হয়তো একটা বিরাট সান্ত্বনা লাভ করত ,কারণ তাহলে একটা বড় সত্যের সন্ধান পেত যে

মৃত্যুর পরে সমস্ত কিছু শেষ হয়ে যায় না। মৃত্যু মানে শূন্য নয়,তার মানে তার নিজের মৃত্যুর পরে সে

একদিন হয়তো ইলার দেখা পেলেও পেতে পারে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২৩/৭ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 23/7 Debjani Basu

  আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২৩/৭ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 23/7 Debjani Basu   আটপৌরে ২৩/৭ ১. গোপালভাঁড় বলেছিল ...