বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০

একজন বুড়ো মানুষ- ২ || নিরুপমা বরগোহাঞি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ~বাসুদেব দাস

একজন বুড়ো মানুষ- ২ 

নিরুপমা বরগোহাঞি


মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ~বাসুদেব দাস




(২)

বাবা যে গুয়াহাটি শহরে দুকাঠা জমি কিনে রেখেছে সে কথা সঞ্জয় জানে। কিন্তু কেন জানি তার কোনোদিনই সেখানে একটা বাড়ি তৈরি করার ইচ্ছা জাগেনি। এই সেদিন পর্যন্ত তো সে ছাত্রজীবন কাটাচ্ছিল। সে বিয়ে করেছে এখনও এক বছরও হয় নি। বিয়ের আগেই সে এই কোয়ার্টারটা পেয়েছে। তাই বিয়ের আগে এই প্রশ্ন কখনও ওঠেনি --বিয়ের পরে নতুন বৌকে নিয়ে কোথায় রাখবে। এই কোয়ার্টার পাওয়ার আগে সে আর বাবা তাদের পুরোনো কাজের লোক ভাবিতকে নিয়ে একটা ছোট বাড়িতে ছিল।বাড়িটাতে সুযোগ সুবিধা খুব বেশি ছিল না। সেই বাড়িটায় থাকা অবস্থায় বিয়েটা হলে,কখনও নিজের জমিতে ঘর বাঁধার কথাটা মাথায় আসত নাকি বলা যায়না। কিন্তু এমনিতে সঞ্জয়ের একদিনের জন্যও মনে হয়নি যে একটা বাড়ি তৈ্রি করতে হবে,বা জমিটা পড়ে আছে,এতদিনে সেখানে একটা বাড়ি থাকলে সেখান থেকে অনেক টাকা আয় হত।  

  কথাটা  উত্থাপন করেছিল কমলা। বিয়ের চার পাঁচ মাস পর থেকেই কথাটা নিয়ে পড়েছিল।প্রথমে সাধারণভাবে বলেছিল-মাটি যখন আছে তখন একটা বাড়ি বানালে হয়।সঞ্জয়ও তখন কথাটায় সায় দিয়েছিল-হ্যাঁ,মাটি যখন আছে তখন একটা বাড়ি তৈরি করলে মন্দ হয় না। কিন্তু সঞ্জয়ের কথা সেখানেই থেমে গিয়েছিল।তাকে কার্যে পরিণত করার  মতো সঞ্জয়ের উৎসাহ কোনোদিনই লক্ষ্য করা যায় নি।এমনিতে সঞ্জয়ের প্রকৃতি মোটেই সাংসারিক নয়,বাপের একমাত্র ছেলে,সংসারের কোনো কিছুতেই  কোনোদিন মাথা ঘামাতে হয়নি,তারমধ্যে এখন আবার সারাদিন অফিসে কাজ করে এসে এত ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে অন্য কোনো কিছুর প্রতি নজর দেবার মতো উৎসাহ বোধ করে না।

কিন্তু কমলা ছেড়ে দেবার পাত্রী নয়। প্রথমে সে কথাটা সাধারণভাবে উত্থাপন করে দেখল,কিস্তু তাতে সঞ্জয়ের বিশেষ কোনো উৎসাহ না দেখে সুবিধে পেলেই প্রসঙ্গটা উত্থাপন করতে লাগল। প্রথম প্রথম কমলা বলত-খালি জমি পড়ে আছে যখন সেখানে বাড়ি তৈরি করা উচিত। এখন কমলা এর সঙ্গে যোগ করল, আজকার দিনে গুয়াহাটি শহরে বাড়ি তৈরি না করে জমি ফেলে রাখার মতো মূর্খতা আর নেই। এতদিনে কত টাকাই না রোজগার হতে পারত। সেই সুযোগে কমলা সঞ্জয়ের সামনে শ্বশুরের ও সমালোচনা করতে লাগল। বাবার মতো সংসার অনভিজ্ঞ মানুষ আজকের যুগে একেবারে অচল। সংসারের কী এমন দায়িত্ব ছিল যে একটা বাড়ি তৈরি করতে পারলেন না? অন্যান্যদের মতো তো একপাল ছেলেমেয়ে ছিল না যে তাদের পড়াতে,বিয়ে দিতে গিয়ে  অবসর পান নি,বা টাকার অভাবে হয়ে ওঠে নি। অন্যের কথা বাদ দাও,আমার বাবাকেই দেখ না কেন। তিন ছেলে,পাঁচ মেয়ের বাপ হয়েও তিনি সংসারের কোন দায়িত্বটা পালন করতে বাকি রেখেছেন। ছেলেদের পড়াশোনা শিখিয়েছেন,মেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছেন,ছেলেদের জন্য বৌমা এনেছেন,মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। দাদারা পরবর্তীকালে বাবাকে অবশ্য সাহায্য করেছে। কিন্তু দাদারা উপযুক্ত হওয়ার আগেই তো বাবা বাড়ি তৈরি করে নিয়েছেন। বাবা কতটা দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। একটা সময়ে গুয়াহাটিতে মাটির মুল্য এবং সোনার মুল্য যে একই দাঁড়াবে বাবা তখনই তা বুঝতে পেরেছিলেন। সেজন্যই বাবা তখনই ছয় কাঠা জমি কিনে রেখেছিলেন। অথচ তোমার বাবার চেয়ে আমার বাবা কি খুব উঁচু পদে চাকরি করতেন? তোমার বাবা সেই দুকাঠা জমি নিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে বসে রইলেন,আরও বেশি জমি কেনার কথা ভাবলেন না,একটা বাড়ি তৈরি করার কথা ভাবলেন না। সত্যিই সংসারের প্রায় কোনো কর্তব্য না করে বসে বসেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন বাবা।

এই ধরনের কথাগ্ডলো যখন কমলা বলে যায়,সঞ্জয় কিছু না বলে তখন কমলার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। একনাগাড়ে কিছু বলতে থাকলে সাধারণত কমলা সঞ্জয়ের মুখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে কথা বলে না। দেয়ালের দিকে মুখ করে কথাগুলি বলে যায়। তাই সঞ্জয় নিঃসক্কোচে কমলার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে। সে তাকিয়ে থাকে-আর মনের ভেতরে যেন দুটো মুখের তুলনা শুরু হয়ে যায়। একটি মুখ-কমলার মুখ এত স্পষ্ট,এত জীবস্ত,কিন্তু ওই মুখটা অস্পষ্ট,ধুসর ওই মুখটা চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। তবু তার মনের মধ্যে সেই অস্পষ্ট মুখের সঙ্গে কমলার মুখের তুলনা বারবার ভেসে ওঠে। দুটো মুখই তার জীবনের দুটো পরমাত্মীয় রমণীর-কোন মুখটা বেশি সুন্দর? নিঃসন্দেহে কমলার মুখটা-ওই মুখটা তো এত ফর্সা নয়,এতটা সুগঠিত নয়,এত সুন্দর নয় ,সেই মুখটা কিছুটা কালো,একটু গোল,একটু কম সুন্দর। সেই মুখের সেই একটি নারীকে সে জেনে আসছিল জীবনে-তারপর তার বাবাই একদিন অন্য এক নারীর জীবনও তার সঙ্গে যুক্ত করে দিল। তখন থেকে সঞ্জয় কমলার মুখের সঙ্গে তার মায়ের অস্পষ্ট হয়ে আসা মুখের মিল খুঁজে বেরিয়েছে। কিন্তু সেই মিলতো সে একদিনের জন্যও কমলার মুখে খুঁজে পায় নি।

নারী বলতে জীবনে সঞ্জয় একমাত্র তার মাকেই জানে।তার নিজের কোনো ভাইবোন নেই। পিসিকে সে জানে না। মাসি বা জ্যেঠি বলতে তার কেউ নেই,তার মা ছিল অনেক ভাইবোনের মধ্যে মা-বাবার একমাত্র কন্যা সন্তান। তাই জীবনে একমাত্র পরমাত্মীয়া নারী বলতে মা-ই ছিল। মহিলা বলতেও তার মা। তার মা-একজন অতি সাধারণ মানুষ। বেশি পড়াশোনা করেন নি,ম্যাট্রিকটাও পাশ করেনি। অন্য কোনো বিশেষ গুণ নেই। দেখতেও মোটেই অসাধারণ নন। অন্যান্য অনেকের মতো ঘরোয়া কাজেও খুব একটা দক্ষ ছিল না। কিন্তু সেই সাধারণ মানুষটা তাকে খুব ভালোবাসত,খুব। তার অন্যায়কে প্রায়ই ক্ষমা করে দিত,প্রশ্রয় দিত। সে আব্দার করে কোনো কিছু খেতে চাইলে তাকে করে খাওয়াত। সে খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়াত। কখনও বা সে খুব বেশি দুষ্টুমি করলে তাকে শাসন করত। সে কাঁদলে নিজেও কেঁদে ফেলত। তার মা খুব ভীতু প্রকৃতির ছিলেন। রাতে কখনও বাইরে যাবার প্রয়োজন হলে বাবাকেও জাগিয়ে দিত। কোনোদিন যদি বাবা মফস্বলে গিয়ে কাজে আটকা পড়ে বাড়ি ফিরতে না পারতেন,সেইসব রাতে বাইরে যেতে হলে,তার মা তাকেই ঘুমন্ত অবস্থা থেকে উঠিয়ে সঙ্গী করে নিয়ে গিয়ে সাহস জোটাতেন এবং সেই গল্প তিনি নিজেই পরে নিজের স্বামীকেও শোনায়।

এরকম একজন সাধারণ মহিলা ছিলেন তার মা।কিন্তু সেই সাধারণ মানুষটিকেই সে বিয়ের পরে কমলার মধ্যে পেতে চেয়েছিল।কিন্তু পেল না।কমলার সঙ্গে তার মায়ের কোনোদিকে মিল নেই।কমলা তার মা থেকে সবদিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ।মায়ের চেয়ে সুন্দর,মায়ের থেকে শিক্ষিতা,মায়ের চেয়ে পটু,মায়ের চেয়ে গুণী।এমনকি মায়ের চেয়ে ভালো রান্না বান্নাও জানে,সেলাই জানে।ওদের বাড়িতে রান্নাঘরের কাজটা ভাবিত করে,কিন্তু অতিথি এলে কমলা সুন্দর করে মাংস-পোলাও রান্না করে খাওয়ায়,সেরকম সুন্দর পরিপাটি করে রান্না করা তার মা জানত না। সেলাইয়ের ব্যাপারে ও মায়ের কমলার মতো এতটা দক্ষতা ও সুরুচি ছিল না নিশ্চয়।মায়ের করা হাঁস দুটো অনেক দিন ধরে তাঁদের বসার ঘরের দেওয়ালে ফ্রেম করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল৷ কিন্তু কমলা যেদিন এই বাড়িতে বৌ হিসেবে এল,ঘরের সবকিছু বদলে ফেলা হল। আগের অনাড়ন্বর ঘরটা সুসজ্জিত হয়ে উঠল। কমলার হাতের সেলাইয়ের কাজ চারপাশে ঘরটাকে উজ্জ্বল করে তুলল। সেই সময় কমলা মায়ের করা হাঁসের ফোটোটা বাবার ঘরের দেওয়ালে সরিয়ে নিল। আর সেখানে নিজের করা একটা এমব্রয়ডারি ঝুলিয়ে রাখল। একটা গাছের ভাল.তাতে মুখোমুখি ভাবে একজোড়া পাখি বসে রয়েছে।আগে ছিল জলে চরা দুটো পাখি,এখন রয়েছে গাছের ভালে বসে থাকা দুটো পাখি।পাখি দুটোই,কিস্ত এবার উপরে উঠল। সেদিকে তাকিয়ে সঞ্জয় ভাবল-সঙ্গে ওদের ড্রইং রুমের মানও বেড়েছে। হয়তো সেই একইভাবে তাঁর জীবনের মানদণ্ডও কমলার দ্বারা বেশ কিছু উন্নত হয়েছে। অন্ততঃ বন্ধুরা তো তাকে সেকথাই বলে। বিয়ের পরে কমলাকে দেখে,কমলার বিদ্যা-বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে,কমলার সঙ্গে কথা-বার্তা বলে,কমলা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা ড্রইং রুমে বসে বন্ধুরা তাকে ভাগ্যবান আখ্যা দিয়েছিল ।

কিন্তু সঞ্জয় কি সত্যিই ভাগ্যবান নয়? কমলার মতো সর্বগুণ সম্পন্না মেয়ে তার  বন্ধুদের মধ্যে কেউ পায় নি। তার বাবা তার জন্য অনেক দেখেশুনে কমলাকে পছন্দ করে এনেছে। সেই মেয়েকে নিয়ে অসুখী হওয়ার কোনো মানে হয় না। সে সুখী,কমলাকে নিয়ে সে সত্যিই সুখী । কমলার মতো মেয়েকে পেয়ে সে ধন্য। নিজের মনে সে এই কথাগুলো অনেকবার জপ করেছে। মা হারিয়ে যাক-তার জীবনে কোনো স্মৃতির বেদনা না রেখে।

কিন্ত মাকি সত্যিই এভাবে তার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে? তা নাহলে কেন মনটা মাঝেমধ্যে এভাবে ব্যাকুল হয়ে ওঠে কমলার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মাকে ফিরে পাবার জন্য। কমলার বক্তব্য অনুসারে কেবল তার বাবাই নয়, সে ও বোধহয় আজকের যুগের উপযুক্ত মানুষ নয়,যতই বিলেত আমেরিকা ঘুরে আসুক না কেন ,মনটা এখনও তার পুরোনো দিনের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে রয়েছে। নাহলে কেন বারবার অতীতের সেই পুরোনোদিনের জীবনটাকে সে কমলার সঙ্গে যাপন করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে? কেন তার মন চায় কমলা এত গুণী,এত শিক্ষিতা,এত সুন্দরী না হয়ে মায়ের মতো কম গুণী,কম শিক্ষিতা,কম সুন্দরী হোক।সত্যিই অদ্ভুত তাঁর মনোবৃত্তি। কেন মায়ের সহজ সরল হাসিতে ভরা মুখটা কমলার গান্তীর্ষেভরা সুন্দর মুখের মধ্যে এতদিনেও হারিয়ে যায় নি?কমলাও হাসে,সে হাসি দামি,প্রশ্রয় ভরা নয়। তার কোনো বন্ধু বান্ধব কখনও কমলার কাছ থেকে সীমার বাইরে একটা হাসিও উপহার পায়নি। কমলা কোনোদিন কোনো পরিবারের সঙ্গে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মেলামেশা করে নি। বাড়িতে কোনো ছেলেমেয়ে এলে কমলা প্রয়োজনীয় ভালোবাসাটুকু দেখায়। সামনে বসে দুই একটা কথা বলে,খাবার জন্য বিস্কুট দেয়। সবার সঙ্গে সংযত,সুন্দর,সন্ত্রমপূর্ণ ব্যবহার কমলার। কমলা কোথাও কোনোদিন সীমা লঙ্ঘন করে না। সবার সঙ্গেই একটা সন্ত্রমপূর্ণ দুরত্ব মেনে চলে । কমলার সংস্পর্শে যারাই এসেছে তারা সবাই তাকে সমীহ করে। কিন্তু তার মা কিন্তু কোনোদিন কারও কাছ থেকে শ্রতটা সন্ত্রম আদায় করতে পারে নি। কোনো পরিচিত মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মা প্রাণখুলে হাসত,চোখে-মুখে আগ্রহের চিহ্ন ফুটিয়ে কথা বলত।বাড়িতে কোনো ছোট ছেলেমেয়ে বেড়াতে এলে আদরে আদরে তাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলত-কোলে নিয়ে,গাল টিপে,হেসে,নানা ধরনের খাবার জিনিস দিয়ে,ওদের ছোট জগতের নানা খবরা খবর সংগ্রহ করে বাড়িটাকে তার মা গরম করে তুলত । লোকজন এলে মায়ের ব্যবহারের এই আতিশয্যের জন্য তার গম্ভীর প্রকৃতির বাবাও অনেকদিন ক্রোধ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাতেও মায়ের এই স্বভাব কোনোদিন বদলায় নি। আজ এত বছর পরে এই সীমা ছাড়ানো প্রশ্রয়পূর্ণ হাসিমুখটিকে সঞ্জয় কমলার মুখের মধ্যে খুঁজতে গিয়ে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ছে। সে তো জানে মার কাছ থেকে যা পেয়েছিল কমলার মধ্যে তা পাওয়া সম্ভব নয়,কারণ কমলা বেশি গুণী,বেশি শিক্ষিতা,বেশি সংযত।শৈশবে স্কুলে যাবার সময় মা তাকে ভাত রেঁধে খাইয়ে পাঠাত। খেতে না চাইলে জোর করে সামনে বসে খাওয়াত।স্কুল থেকে ফিরে আসার পরেও সেই একইভাবে জলখাবার নিয়ে সামনে হাজির।কিন্তু কমলার এভাবে ভালোবাসা দেখানোর মতো সময় নেই।এই একটুখানি ভালোবাসার বদলে সে এনে দিয়েছে টাকা,অনেক টাকা।তাই কাজে যাবার সময়ে কমলা তার খাবার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে দেখাশোনা না করে নিজে খেতে বসে যায়,নাহলে তার স্কুলের দেরি হয়ে যাবে।তাদের দুজনেরই দেখাশোনা করে ভাবিত।আর তখন এই সমস্ত সময়ে তার মনটা অতীতের একটি অস্পষ্ট মুখ ব্যাকুল হয়ে খুঁজে বেড়ায়সঙ্গে সঙ্গে সে মনটাকে ভৎর্সনা করে উঠে এই ভেবে যে তার মতো মানুষ আজকের যুগে অনুপযুক্ত,এই ধরনের মান্ধাতা আমলের একটি মন নিয়ে সে কমলার মতো শিক্ষিতা একটি মেয়েকে বিয়ে না করে স্বল্প শিক্ষিতা কোনো মেয়েকে বিয়ে করা উচিত ছিল। সে কথা সে বিয়ের আগে স্পষ্ট করে বাবাকে বলে দেওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু সেকথা সঞ্জয় যে নিজেই জানত না,জানত না যে কমলাকে বিয়ে করে উঠার পরে প্রায় মৃত একটা স্মৃতি আবার এভাবে জেগে ওঠে তার মনে হাহাকারের সৃষ্টি করবে।

কমলার কিন্তু ধারণা তার মতো একজন নারীরত্ব লাভ করে সঞ্জয় মনে মনে ধন্য। সঞ্জয়ের সঙ্গের অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুদের পত্নীদের দেখে তার এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে। সেইসমস্ত মেয়েরা তার সঙ্গে এক দুটো বিষয়ে হয়তো তুলনীয় হতে পারে,কিন্তু সবদিক দিয়ে নয়। কেউ হয়তো তার মতোই সুন্দরী,কিন্ত তার মতো শিক্ষিতা নয়,আবার কেউ হয়তো শিক্ষিতা-এম.এ,বি.এ পাশ ;কিন্ত তার মতো রূপ নেই। কোনো ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রীর হয়তো রূপ,বিদ্যা দুটোই তার সমান থেকেও অন্য একটা বিষয়ে তার সঙ্গে তুলনায় হেরে যায়-কমলার তিন ভাইদের সবাই কৃতি,ভালোভাবে পড়াশোনা করেছে,ভালো চাকরি বাকরি করে,তার সবগুলো বোনেরই ভালো ভালো চাকুরিজীবীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। তার মতো এরকম একটি ঘর কোনো একজন সুন্দরী শিক্ষিতা ইঞ্জিনিয়ার পত্নীরও নেই। তাই তার মতো একজন নারীকে পেয়ে সঞ্জয় গর্ববোধ না করে পারে কি? পারে কি সুখী না হয়ে থাকতে? 

সঞ্জয় যে কমলার দিক থেকে কোনো কারণে অসুখী হতে পারে,সে বিষয়ে কমলার কোনো দিনই কোনোরকম দুশ্চিন্তা ছিল না। কিন্তু সে ভাবে তার মতো একটি মেয়েকে সম্পূর্ণ সুখী করার জন্য এই বাপ বা ছেলের ক্ষমতা নেই। দুজনই আজকের দিনের জন্য অনুপযুক্ত কিন্তু কমলা নিজে মনে মনে আধুনিকা । সে জানে এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে আজকের যুগে কর্মই ধর্ম। স্বগ্নবিলাসী এবং কুঁড়ে লোকের সেখানে কোনো স্থান নেই। সে ধরনের মানুষকে সে পছন্দও করে না। কর্মী পুরুষ হিসেবে তার আদর্শ হল তার পিতা । সংসারের কোনো কর্তব্যই তিনি বাকি রাখেন নি। কিন্তু সেই তুলনায় তার শ্বশুর একেবারে বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। মানুষটা তার বাবার তুলনায় জীবনে কোনো কাজই করলেন না। একটিই মাত্র ছেলে-তাকে পড়াশোনা করিয়ে গুয়াহাটি শহরে কোনোভাবে দুকাঠা জমি কিনে রাখলেন-একজন মানুষের সারা জীবনের কাজ এইটুকু মাত্র? ছেলে পড়াশোনা করে যে মানুষ হয়েছে তাতেও তাঁর পিতার খুব একটা কৃতিত্ব আছে বলে কমলার মনে হয় না,সঞ্জয় নাকি শৈশব থেকেই শ্রেণিতে প্রথম হওয়া ছাত্র,তাই আজ সঞ্জয় যেখানে পৌছেছে তাতে তাঁর পিতার কোনো কৃতিত্ব আছে বলে মনে হয় না। মাঝে মধ্যে কমলার মনে বিরক্তি জন্মায়। তার শ্বশুর আশ্চর্য রকম ভাবে বসে খেলে দিন কাটিয়ে দিতে পারে। দুকাঠা জমি এভাবে সারাটা জীবন ধরে ফেলে রাখল,মানুষটা ছোট খাট একটা বাড়ি ও তৈরি করে যেতে পারল না । বাড়ি যদি তৈরি না-ই করবে তাহলে জমিটা কেন কিনেছিল? বোধহয় ছেলে বাড়ি করবে ভেবে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হাত পা গুটিয়ে বসেছিল। আজ এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ে প্রতিটি মানুষই কীভাবে আরও দুটো পয়সা অতিরিক্ত রোজগার করা যায় বা কীভাবে খরচ বাঁচান যায় সে চিন্তা করে কিন্তু এই বাপ ছেলে সেদিক থেকে একেবারে ব্যতিক্রম। কমলা এইসব নিয়ে বাপ ছেলেকে কোনোদিনই মাথা ঘামাতে দেখে নি। সেই চিন্তা যদি থাকত তাহলে হয়তো বাপটা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এভাবে বসে বসে সময় নষ্ট করত না। বেশি কিছু করার তো দরকার নেই,বাড়ির সামনে পেছনে কিছুটা সব্জির খেত করলেও তো হয়। এদিক থেকে সে খুব অবাক হয়েছে। পেন্সন পাওয়ার পরে অনেকেই বাগানের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে, কিন্ত তাঁর শ্বশুরের এদিকে কোনো লক্ষ্যই নেই। সামনে পেছনে জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে,একটা ফুলের বাগান বা সব্জির বাগান নেই। কাজের ছেলে ভাবিতকে দিয়ে এসব কাজ করানোর সময় কোথায় ? চা করা,ভাত রান্না করা,বাজার করা এই সমস্ত করতে গিয়েই ছেলেটির দিন পার হয়ে যায়। ঘরে বসে থাকা শ্বশুর মশাই তো বাগানের কাজটা করতে পারেন। বাপের বাড়িতে সে কোনোদিন কাউকে এভাবে বসে থাকতে দেখে নি। অশ্চর্য মানুষ। কোনো কিছুতেই নেশা নেই। একটা নেশা অবশ্য দেখেছে কমলা--অসংখ্য,অজস্র বিবিধ বিষয়ের বই। কখনও কখনও সে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বইয়ের দুই একটা পাতা উল্টে দেখেছে,সারাদিন শ্বশুর কী পড়েন তা দেখার জন্য । সে দেখেছে বেশিরভাগই দর্শনের বই,জীবন-মৃত্যুর রহস্য আলোচনায় পরিপূর্ণ বইয়ের সংখ্যাই বেশি। অন্য বিষয়ের বই-পত্রও অবশ্য রয়েছে। ধর্ম অর্থনীতি,পপুলার সায়েন্স,তার শ্বশুর সমস্ত ধরনের বই পত্র পড়েন।কিন্তু তবুও মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটিয়ে তুলে কমলা শ্বশুরের বই পত্রগুলো নেড়েচেড়ে দেখে। শ্বশুর পণ্ডিত হতে পারেন,কিন্তু কমলার কাছে সেরকম পাণ্ডিত্য বা জ্ঞানের কোনো মুল্য নেই। জ্ঞান মানেই আলো,আলোর সার্থকতা কেবল অন্যকে বিলানোতে।তাই যে জ্ঞান কেবল নিজের মধ্যে আবদ্ধ,অন্যকে বিতরণ করা হয় না,সেই জ্ঞানের মূল্য বা সার্থকতা কোথায়?অন্তত কমলার ধারণাটা তাই।সেইজন্য তার নিজের জ্ঞান এবং শিক্ষাকে সে অসার্থক হতে দেয়নি। সে জানে যে শ্বশুর বা স্বামী কারও সম্মতি নেই,তবুও সে একটা স্কুলের চাকরিতে জয়েন করেছিল।সেই অসম্মতিতে শ্বশুর যদিও নীরব ছিলেন,স্বামী কিন্তু সরবেই তা ঘোষণা করেছিল।–

‘আমি তো তোমার স্কুলে চাকরি করার কোনো মানে আছে বলে মনে করি না।আমাদের তো টাকার এত অভাব নেই যে তোমাকে রোজগার করতে হবে।‘সেদিন সঞ্জয় কমলাকে চাকরিতে জয়েন করতে দেখে এভাবেই বলেছিল।

প্রত্যুত্তরে কমলা বিদ্রূপের হাসি হেসে বলেছিল-‘আমার চাকরি করায় তুমি কেবল টাকা রোজগার করার ব্যাপারটাই দেখতে পেলে। এত পড়াশোনা যে আমার কোনো কাজেই লাগল না ,সমস্ত কিছুই বৃথা হয়ে যাচ্ছিল,সে কথাটা একবারও ভেবে দেখলে না? আমি মনে করি যে বিদ্যা অন্যের মাঝে বিতরণ করা যায় না,সেই বিদ্যা অর্জন করায় কোনো লাভ নেই। সেরকম বিদ্যা,সে রকম জ্ঞানের কোনো মানেই হয় না।‘একথা বলে সেদিন কমলা মনে মনে একটা তৃপ্তি অনুভব করছিল,তার মনের অবচেতন সত্তা যেন শ্বশুরের ওপর এক ধরনের প্রতিশোধ নেবার সুখ অনুভব করছিল।

শুধু তাই নয়। সুবিধে পেয়ে কমলা সেদিন সঞ্জয়কে আরও কিছু কথা বলেছিল।–‘আর তুমি যে টাকা উপার্জন করার কথা বলেছ ,সেটাও আজকের দিনে একেবারে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। জিনিসপত্রের আকাশ ছোঁয়া দাম,দিন দিন দাম বেড়েই চলেছে,সেদিকে তো তোমাদের কারোরেই নজর নেই। আমাকেই তো সংসারটা চালাতে হয়। কোনোদিনই কোনোকিছু নিয়ে ভাবলে না।অন্য কিছু না হয় বাদই দিলাম--বাবা যদি আমাদের জমিটার উপর এতদিনে একটা বাড়ি তৈরি করে নিতেন,সেখান থেকে আমাদের না হলেও মাসে দুই তিনশ টাকা উপার্জন হত। ওহো ,উপার্জনের কথা তো তোমরা ভেবে দেখ না,অগচ ব্যয়ের কত রকম রাস্তাই যে তোমাদের জানা । বাবা এত টাকা পয়সা খরচ করে এত দামি দামি বইগুলো অর্ডার দিয়ে আনায়। কিন্তু সেইসব বইগুলো পড়ে কী আর এমন লাভ হয়েছে? আর কিছু না হোক তিনি নিজে যদি দুই একটা বই লিখতেন। বাবা নাহয় বুড়ো মানুষ,তাঁর তেমনভাবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে না ভাবলেও কোনো ক্ষতি নেই,কিন্তু তোমার তো ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করা উচিত। তুমি যে সাংসারিক খরচের কথা সেভাবে ভাব না সেটা খুবই আশ্চর্যের কথা । আমাদের বাড়িতে যেই আসুক না কেন,তুমি তাকে আদর যত্ব করে চা খাওয়াতে বল,অতিথি এলে তুমি একেবারে বিগলিত হয়ে পড়,তাদের কী খাওয়াব কী উপহার দেব তা ভাবতে গিয়ে দিশাহারা হয়ে পড় কিন্তু আজকের দিনে এত বেহিসেবি হলে চলবে কি? তাছাড়া কেবল তোমাকেই আমি এই ধরনের ব্যবহার করতে দেখেছি,তোমার অন্যান্য কোনো বন্ধুরা তো এরকম করে না। অনেকের বাড়িতে তো এক কাপ খালি চা পাওয়াই বেশ শক্ত। সেইজন্যই সেই সমস্ত মানুষেরা সংসারে সমস্ত কিছু করতে পেরেছে--বাড়ি করেছে,গাড়ি কিনেছে,ছেলে-মেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষাদান করে বিলেত আমেরিকাতেও পাঠিয়েছে । তোমাদের মতো দুকাঠা জমি এবং মান্ধাতাযুগের “মরিস” গাড়ি একটা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে বসে নেই।’

সেদিন কমলা একসঙ্গে আরও অনেক কথা সঞ্জয়কে শুনিয়ে দিয়েছিল। সে বিয়ের পরে এত কথা একসঙ্গে শোনানোর সুযোগ পায় নি। সেদিন যেন অন্তরে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ-অসস্তুষ্টির উষ্মাটুকু প্রকাশ করতে পেরে মনটা অনেকটা হালকা লেগেছিল।

কিন্তু তারপরেই পুনরায় কমলার মনটা ক্রোধ এবং বিরক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কারণ এতকিছু বলেও সে কি সঞ্জয়কে তার দলে টানতে পেরেছিল? সঞ্জয় কি সেদিন তার কথার সমর্থন করেছিল? ক্রোধে সমস্ত মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল কমলার—সমর্থন করা তো দূরের কথা --উল্টে কমলাকে বোঝানোর কী প্রবল চেষ্টা সঞ্জয়ের। কমলা যখন বলছিল তখন কিন্তু সে নীরবে সমস্ত কথাই শুনে যাচ্ছিল,তারপরেই গভীর বিষণ্ণ কণ্ঠে সে ধীরে ধীরে বলেছিল --কমলা সংসারে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কি জান? আমরা যা পাই তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা না করে,যা পাইনি তা নিয়ে হা-হুতাশ করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিই |



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২৩/৭ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 23/7 Debjani Basu

  আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২৩/৭ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 23/7 Debjani Basu   আটপৌরে ২৩/৭ ১. গোপালভাঁড় বলেছিল ...