বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৩ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৩

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 




আমার  আজকের মনখারাপের এইসব দুপুরগুলো সাজিয়ে রাখি সময়ের তাকে। খুঁজে ফিরি ফেলে আসা কিশোরী দুপুর। পুরোনো বাড়ির কুলুঙ্গিতে হাতড়াই।আমার ছোটবেলার বাড়ির বারান্দায় তিনটে খিলান ছিল,  দরজার  দুপাশে ছিল দুটো  কুলুঙ্গি। ছোটদের জামা বা প্যান্টের পকেটের মতো তাতে  সংসারের  কত কিছু অদরকারি জিনিস যে থাকতো তার হিসেব নেই। আমাদের পুরোনো ঘরের ভিতরেও আগে তিনটে কুলুঙ্গি আর একটা  দেওয়াল আলমারি ছিল। মা ঠাকুমার আয়ত্তে ছিল এইসব কুলুঙ্গি, হাত দিতে মানা ছিল আমাদের সেখানে। তখন খুচরো পয়সার খুব চল ছিল। আমি এক, দুই,  তিন পয়সায় কিছু পাওয়া যেতে দেখি নি। তবে আমি এক,দুই, তিন, পাঁচ, দশ, কুড়ি পয়সা দেখেছি। পাঁচ পয়সা দিয়ে  অনেক কিছুই কেনা যেত আমার ছোটবেলায়। একটা দুই আর একটা তিন এভাবে পাঁচ পয়সা দিলে দোকানিরা নিত।

 আমরা মশলা মুড়ি, বাদাম চাক, শোন পাপড়ি,ঘুগনি, আলুর দম, জিলিপি, চাটনি লজেন্স, সাধারণ কাঠি আইসক্রিম, নানা রকমের আচার, কুল, কামরাঙা, আখড়া, কাঁচা আম মাখা এইসব অতি প্রিয় সুখাদ্যগুলি সুযোগ পেলেই স্কুলে টিফিন টাইমে কিনে খেতাম। তখন এসব বাইরের খাবার খেলে শরীর খারাপ হতো না তো ! মাঝে মধ্যে বাবা  মাকে লুকিয়ে কুড়ি পঁচিশ পয়সা দিত।দু একবার বাবার অলক্ষ্যেও আমি দশ পয়সা নিয়েছি টেবিল থেকে।  তবে বাবা যদি টের পেয়ে যায় সেই ভয়ে দশ পয়সার বেশি নিতে পারতাম না কখনোই।  মা ছোটদের হাতে পয়সা দেওয়া মোটেই পছন্দ করতো না। রোজ টিফিন বক্স  ভরে রুটি ,লুচি অথবা পরোটা,  আলুভাজা, ডিম সিদ্ধ মাঝেমধ্যে, আর কলা এই টিফিন  বরাদ্দ ছিল আমার। আত্মীয় স্বজন এলে যাওয়ার সময় দশ কুড়ি বা পঞ্চাশ টাকা  দিয়ে যেতেন অনেকেই। মায়ের কড়া নির্দেশ ছিল সেই টাকা না নেওয়ার। যদি জোর করে কেউ দিয়ে যেতেন সেটা মাকে দিয়ে দিতাম আমরা। 

আমার ছোটবেলার দিনগুলো বৈচিত্র্যময় ছিল। তাই এক কথা বলতে বলতে অন্য কত কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের নবাবি আমলে তৈরি  বাড়ির ছাতে ঘরের ভিতরটা ছিল কড়ি বর্গার । বিছানায় শুয়ে আমি আর বোন কত গ্রীষ্মের দুপুরে   সেই কড়ি বর্গা গুনতাম।  সেটাও একটা খেলা ছিল। বারান্দায় চড়াই পাখি বাসা করতো সেই কড়ি বর্গা অথবা দেওয়ালে ভেন্টিলেটরের ফাঁকে। মাঝে মাঝেই চড়াই পাখির ডিম মেঝেতে পড়ে ভেঙে যেত,ছোট্ট পাখির ছানা পড়ে যেত বাসা থেকে। আমরা মই অথবা উঁচু টুলে চড়ে অক্ষত ডিম অথবা পাখির ছানা বাসায় তুলে দিতাম। আমাদের বাড়ির উঠোনের এক পাশে মাধবীলতার ঝোপে প্রায়ই টুনটুনি অথবা বুলবুলি পাখি বাসা করতো। আমার ছুটির  দুপুরে ঘুম আসতো না। ঐ সব পাখির বাসা থেকে ডিম বের করে দেখে আবার সেগুলো বাসায় রেখে দিতাম। এই সব পাখির ডিম চড়াই এর ডিমের মতো সাদামাটা  হতো না, খুব সুন্দর সবুজ, নীল, হলুদ ,ধূসর রঙের অপূর্ব মায়া ঘেরা। একবার মা দেখে ফেলেছিল পাখির বাসা থেকে ডিম বের করে দেখা।বকা খাব বলে ভয় পেয়েছিলাম । কিন্তু মা বকে নি বরং বুঝিয়ে বলেছিল পাখির ডিমে  হাত দিলে সেগুলো থেকে আর বাচ্চা ফুটবে না। অনেক সময় সাপ আসে পাখির বাসায় ডিম খেতে। এসব শুনে আমি আর পাখির বাসার ডিমে হাত দিতাম না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

অবহেলা || দীপক মজুমদার || অন্যান্য কবিতা

অবহেলা দীপক মজুমদার আর গোপন রাখব না আমাদের সম্পর্কের ইতিবৃত্ত।  শব্দের খাঁজে লুকানো গোলাপের উষ্ণতা। ঝাউবনের নির্জনতায় জৌলুস সম্পৃক্তি। প্রি...