ন্যানো টেক্সট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ন্যানো টেক্সট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৪ মে, ২০২১

নস্টালজিয়া ৪৫ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৪৫

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



ছোটবেলা থেকে দেখেছি আমাদের ওখানে হিন্দু মুসলিম বরাবরই  মিলেমিশে থাকতো। আমাদের  বাড়িতে বাবার বন্ধু, অফিসের স্টাফ, প্রতিবেশী অনেকেই আসতেন তাঁরা হিন্দু না মুসলিম এই নিয়ে আলাদা করে কিছু ভাবনা ছিল না। তবে আমার রক্ষণশীল পরিবারের  মা বাইরের লোকজন  চলে যাবার পর চারিদিকে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিতো। বাবা খুব রসিক মানুষ ছিলো,  দূষিত গঙ্গা জলের পবিত্রতা নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঠাট্টা করতো আর মা তাতে খুব রেগে যেতো।
    ছোটবেলায় নবাব পরিবারের মুসলিম মেয়েদের দেখতাম তারা সচরাচর কোথাও যেতো না।সন্ধ্যে হলে  খুব সাজগোজ করে নিজেদের আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কাছাকাছি এ বাড়ি ও বাড়ি যাওয়া আসা করতো। আমাদের বাড়ির সংলগ্ন গলিতে তাদের চলাচল অনুভব করতে পারতাম কাচের চুড়ির শব্দে , বেল জুঁইয়ের মালার সুগন্ধিতে অথবা টুকরো টুকরো উর্দু কথায় ।  গ্রীষ্মকালে চুলে তারা বেল- জুঁই ফুলের মালা জড়াতো। খুব আতর মাখতো। তারা যে সবাই বোরখা পরতো তা নয়, তবে ওড়না দিয়ে নিজেদেরকে ঢেকে রাখতে অভ্যস্ত ছিল। এইসব ক্ষীণকায় মেয়েদের সাদা মোমবাতির মতো  সুন্দর  লাগত আমার।  আমাদের বাড়িতে বাবার কাছে বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে  যাঁরা আসতেন তাঁদের কাকু, জেঠু , দাদা বলতাম। বাবা খুব ভালো উর্দু জানতো। নবাব পরিবারের অনেকের সঙ্গে বাবা সুন্দর উর্দুতে কথা বলতো।

বুধবার, ৫ মে, ২০২১

নস্টালজিয়া ৪৪ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৪৪

পৃথা চট্টোপাধ্যায়




আমার ছোটবেলার দিনগুলোতে দেখতাম পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে একটি সৌহার্দের সম্পর্ক ছিল।
সদ্য বাংলাদেশ থেকে আসা প্রতিবেশী একটি পরিবারের একজন জেঠিমা ( বুন্নাদির মা) আসতো আমাদের বাড়িতে। সব্জি কাটা হলে যে খোসা ছাড়িয়ে ফেলে দেওয়া হতো সেগুলো আর ভাতের ফ্যান নিয়ে যেত। তার বাড়িতে ছাগল ছিল। সেই ছাগলের খাবারের জন্য সেগুলো নিয়ে যেত। একদিন হঠাৎ করে আমি কোনো কারণে তার বাড়িতে গিয়ে দেখি সেই জেঠিমা আমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া বিভিন্ন সবজির খোসা কুচিকুচি করে কাটছে। আমাকে বলেছিল এগুলো তারা ভেজে বা বেঁটে কড়াইতে তেল দিয়ে নেড়েচেড়ে ভাতে মেখে খায়। আমি মাকে এসে কথাটা বলেছিলাম। তারপর থেকে মা ইচ্ছাকৃতভাবে ঐ জেঠিমাকে শুধু সব্জির খোসা না, অনেক সময় আলু, পটল, লাউ ,কুমড়ো দিয়ে দিত। তখন জিনিসপত্র এত অগ্নি মূল্য ছিল না। আমার বাবা বরাবর বেহিসেবি বাজার করত। ঐ পরিবারের সঙ্গে একটা সৌহার্দের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
আমাদের বাড়ি ছিল বেশ পুরোনো, দাদুর আমলের। বাংলা ইঁটের , খিলানের বারান্দা। কড়ি বর্গার ছাদ। আগেকার চুন সুরকির গাঁথুনি। বর্ষাকালে প্রতিবছর ছাদ সারাতে হতো না হলে ঘরে জল পড়তো ।এছাড়াও বারোমাস রাজমিস্ত্রির কিছু না কিছু কাজ লেগেই থাকতো।কাপাসডাঙার আবের, মান্নান এইসব মিস্ত্রিরা কাজ করতো।তারা আমাদের ঘরের লোকের মতো ছিল। বাড়ি থেকে ভাত তরকারি আনলেও মা তাদের তরকারি, মাছ ইত্যাদি দিত। বারবার চা ,বিস্কুট । লোকজনকে খাওয়াতে বাবা মা দুজনেই খুব ভালো বাসতো। মেঘুকাকু ছিল আমাদের বাড়ির ধোপা।একদিন পরপর আসতো কাপড় নিতে। বাবা তখন আদ্দির ধুতি আর হাফ সার্ট বা ফুল সার্ট পরতো। মেঘুকাকু আমাদের স্কুল ড্রেস বাবার জামা কাপড়, মায়ের তাঁতের শাড়ি একগাদা করে রোজ নিয়ে যেত, একটা খাতা ছিল হিসেবের। মা খুব গম্ভীর মুখে এই সব হিসেব রাখতো আর মাসের শেষে মেঘুকাকুকে টাকা দিতো। মেঘুকাকু ছিল আমাদের বাড়ির পুরোনো ধোপা। তার বাবা আগে আসতো। আমি মেঘুর ছেলেকেও দেখেছি মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে সে আসতো। মেঘুকাকু প্রায়ই ভাত খেতো আমাদের বাড়িতে। আমার মা সকলকে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতো। কোনো জাতপাতের কথা এ প্রসঙ্গে ছিল না। বহরমপুর গার্লস কলেজে হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছি। আমার প্রিয় বন্ধুদের বাড়িতে ঈদের সময় গেছি ভাবতায়। ওদের বাড়িতে আদর যত্ন আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়েছি। সায়রা, সরিফার মায়ের স্নেহ আর আমার মায়ের স্নেহের মধ্যে কোনো তফাৎ খুঁজে পাই নি। লালগোলায় বেগমপারা(জলি)র দিদির বিয়েতে গিয়ে কত আনন্দ করেছি। প্রায় সব বন্ধুই আমার বাড়িতে আসতো। বন্ধু বিষয়ে আমি বরাবরই খুব দুর্বল। তাদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে আমার চিরকালই ভালো লাগে।সেখানে হিন্দু মুসলিম এইসব ভাবনা জীবনে মনেই আসে নি কখনো। 


মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২১

নস্টালজিয়া ৪৩ পৃথা চট্টোপাধ্যায়

নস্টালজিয়া ৪৩

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



কৈশোরের দিনগুলো কি শুধুই পড়াশোনা আর মায়ের স্নেহ, বাবার আদরে মাখা ছিল? তা মোটেই না। একটু একটু করে যত বড়ো হয়েছি ফুলের মত জীবনও পাঁপড়ি মেলে ধরেছে। ডালে কাঁটা ছিল অনক। সজাগ হয়েছে মন। মা চারপাশের পরিবেশ, জীবন সম্পর্কে কিছু কিছু বিষয়ে শেখাতো।কোনোটা শুনতাম ,কোনোটা ভালো করে শুনতাম না। বড়ো হয়ে বুঝতে পেরেছি ঐ বয়সে মায়ের কথাগুলো কতটা মূল্যবান ছিল। আমার পিরিয়ড হবার পরে মা বলেছিল মেয়ে হিসেবে সতর্ক থাকতে হয় জীবনে।ছেলেদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা মা পছন্দ করতো না। তবে ছেলে বা মেয়ে সব বন্ধুর সঙ্গে একটা স্বচ্ছ সাবলীল সম্পর্ক থাকা দরকার একথা মা-ই আমাকে বলেছিল। আমি সাইকেল চালতে খুব ভালোবাসতাম। পিরিয়ডের সময় বেশ কয়েক দিন সাইকেল চালাতে দিতো না বলে রাগ করতাম মায়ের উপরে।
ক্রমশ চারপাশের মানুষ,পরিবেশ আত্মীয় স্বজন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভাবে ধরা দিয়েছে আমার মনে।ছোট থেকেই সবকিছু অবজার্ভ করতে ভালো লাগত আমার।আমাদের বাড়িতে মা সবসময় একটা মার্জিত রুচিশীল পরিবেশ বজায় রাখতো। তবে কাজের লোকের বিষয়ে খুব খুঁতখুঁতে ছিল। বাবার সঙ্গে মতের অমিল হতো সাংসারিক অনেক বিষয়ে। কাজ কর্মে ব্যস্ত মা রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ যেমন পড়তো তেমনি ভালোবাসতো রবীন্দ্রনাথের গান। সঞ্চয়িতা আর সঞ্চিতা থেকে আমি আর বোন খুব কবিতা পড়তাম, আর মা শুনতে ভালোবাসতো। ছোটদের সিনেমা দেখা মা মোটেই পছন্দ করতো না। আমাদের ওখানে তখন ছায়াবাণী একটি মাত্র সিনেমা হল।ঠাকুমার সঙ্গে সম্পূর্ণ রামায়ণ আর মহাভারত এই দুটো ছাড়া আর কোনো সিনেমা আমি ছোটবেলায় দেখি নি।বড়ো হয়ে প্রথম ভালো সিনেমা বলতেদেখেছিলাম বাবা মায়ের সঙ্গে 'হংসরাজ' বহরমপুরে কল্পনা হলে।
আমাদের পাড়ায় সব ঠিকঠাক হলেও একটা জিনিস সব মাটি করে দিয়েছিল বলে মনে হতো। সেটি হলো একটি দেশি মদের দোকান। বড়ো হবার পরে মা বেশি বাড়ি থেকে বেরোতে দিত না এই দোকানটির জন্য। যদিও আমাদের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে ছিল দোকানটি। গঙ্গাস্নানের যাতায়াতের পথে ছিল সেই দোকান। অনেকটা দূর থেকেই ঐ দ্রব্যের মদির গন্ধ বাতাসে ভাসত। আমাদের বাড়িতে বাবাকে জীবনে মদ্যপান করতে দেখি নি, কিন্তু ঐ বস্তুর গন্ধের সঙ্গে খুব ছোটবেলা থেকেই পরিচিত হয়েছিলাম। ঐ দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা আড়চোখে দেখতাম কাচের খালি শিশি স্তূপাকারে পড়ে থাকতে। আর অনেককেই নেশা করে রাস্তায় ধুলোর মধ্যে পড়ে থাকতে দেখতাম। পাড়ার মধ্যে সেই দোকানটি নিয়ে কারো তেমন মাথা ব্যথা ছিল না। আজও ঐ দোকানটি পুরোনো নেমপ্লেট নিয়েই বহাল তবিয়তে আছে। 

রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

নস্টালজিয়া ৪১ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৪১

পৃথা চট্টোপাধ্যায়




নস্টালজিয়া ৪১
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

ব্যক্তিগত জীবনের ছবি নিছকই নিজের কাছে জমা করে রাখার। পুরোনো অ্যালবাম খুলে দেখতে তো নিজেরই বেশি ভালো লাগে। তাকে সবার সামনে আনার তেমন তো কোনো প্রয়োজন থাকে না। তবুও আমার অতীতের কথা লিখতে ভালো লাগে, ইচ্ছে করে সবাইকে বলতে। যত বড় হয়েছি ততই বুঝতে পেরেছি যা আমার মনে হয় তা সবসময় আমার হয় না। অনেকের তাতে অধিকার থাকে। যে সমাজের ছবি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে, ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে মূল্যবোধ, দ্রুত বয়ে চলেছে যে সময় নদীর স্রোতের সাথে- তাকে ধরে রাখার একটা ক্ষীণ আশা থেকে আমার এই নস্টালজিয়া লেখা। লিখতে বসে যখন কত কিছু মনে পড়ে যায় তখন খুব অবাক হয়ে যাই।
ক্লাস ফাইভে যখন পড়ি আমাদের পড়াতে আসতেন গৌরাঙ্গ মাস্টার। টিউশনি ছিল তাঁর পেশা। তখন গৃহশিক্ষক প্রতিদিন আসতেন পড়াতে এবং তাঁকে খুব যত্ন করে নিত্য নতুন জল খাবার ও চা খাওয়াতো মা। প্রথম দিকে লুচি তরকারি, চপ,সিঙাড়া, মিষ্টি এবং ক্রমশ পুরোনো হলে বাড়ির সদস্য হয়ে যেতেন তিনি। তখন মা অনায়াসে রুটি তরকারি দিতেও সঙ্কোচ বোধ করত না। বাড়ির পুজো পার্বণ অনুষ্ঠানে তাঁর আমন্ত্রণ থাকতো। গৌরাঙ্গ মাস্টারের কাছে পাড়ার অনেকেই পড়তো। তখন আমার বোন পড়তো ক্লাস টু তে। আমাদের দুজনকেই তিনি প্রত্যেকটি বিষয় পড়াতেন। বিকেলে ঠিক খেলার সময়ে পড়াতে আসতেন বলে আমার খুব রাগ হতো। কিন্তু কিছু বলার উপায় ছিল না আমাদের। দু'ঘণ্টা সময়ের মধ্যে আমাদের দু'জনকে সব বিষয় কীভাবে পড়াতেন এখন তাই ভেবে আশ্চর্য হয়ে যাই। তিনি সাইকেল নিয়ে আসতেন। পোশাক-পরিচ্ছদ পরিষ্কার হলেও একটা মালিন্য ছিল তাতে। কঠিন জীবন সংগ্রামের একটা ছবি মিশে থাকত তাঁর চোখে মুখে। ঝড় বৃষ্টি শীত গ্রীষ্ম কামাই ছিল না তাঁর। আমার মনে আছে কোনো পড়া তেমন বোঝানোর বালাই ছিল না। অঙ্ক বাড়িতে করতে দিতেন। রিডিং পড়তে বলে নিজেই সবটুকু পড়ে দিতেন। মা আমাদের পড়াশোনা কঠিন শাসনে তৈরি করিয়ে রাখতো। তিনি শুধু মুখস্থ ধরতেন। তাঁর কাছে বিশেষ কিছু শেখা হচ্ছিল না বলে মাত্র এক বছরই পড়েছিলাম। তবুও বরাবরের জন্য একটা পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল এই মাস্টার মশায়ের সঙ্গে। 

মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০২১

নস্টালজিয়া ৪০ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৪০

পৃথা চট্টোপাধ্যায়




আমাদের জীবনের যে মুহূর্তটি চলে যায়, তা আর কখনোই ফিরে আসে না। কিশোরীবেলার কত ছোট ছোট মুহূর্ত এইভাবেই আমার হারিয়ে গেছে। আজকাল কেন যে  একটা শূন্যতাবোধ ক্রমশ ঘিরে ধরে মনকে। আবার এক অসম্ভব ভালবাসাকে আঁকড়ে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে সেই মুহূর্তেই । কোনো ফাঁক না রেখে তোমাকে পরিপূর্ণ করে পেতে চেয়েছিলাম। আমারও দিতে কোনো কার্পণ্য ছিল না । কিন্তু সে সুযোগ আসে নি কখনো। এখন নিজেকে বড্ড নির্বোধ মনে হয়। অবশ্য কড়া গন্ডি ছাড়িয়ে বের হবার সাহস ছিল না আমার সেদিন। আজ তাই হয়তো  এইসব ভাবলে এক অনন্ত সুন্দর সমস্ত বিষাদকে মুছে দেয়। আমার এই ভাবনা কোনো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে নি কখনোই। আমি ছিলাম আমার গন্ডিতে, সে তার প্রিয়জনের বেষ্টনীতে আবদ্ধ। সেখানে কারো নিবিড়তার ফাঁকি ছিল না, তবু আমাদের মন কোন এক ফাঁক ফোকর গলে মুহূর্তের জন্য এক নির্জন বনস্থলীতে চলে আসত। তখন ফোন বা মোবাইল ছিল না আমাদের। সে এক অদ্ভুত টেলিপ্যাথি। ঠিক দেখা হয়ে যেত তার সঙ্গে। এক অন্তর্মুখিনতার সঙ্গে বাহির আমাকে বরাবর ডাকে। কোনো এক মুহূর্তের নির্জনতায় সে আর আমি মুখোমুখি হয়েছি কতবার। সেটা যে প্রেম বুঝতেই পারি নি।কিন্তু একটা টান। এক প্রতিশ্রুতিহীন ভালবাসার মুহূর্তে আমি তোমাকে চাই একথা মুখ ফুটে বলতে পারি নি। তার মধ্যে যে সুন্দরের সন্ধান আমি পেয়েছিলাম তাকে অস্বীকার করার সাধ্য আমার আজও নেই। এক নিজস্ব গহনলোক এতদিন আমার অগোচরে ছিল। নিজেকে ফাঁকি দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছিলাম কি? আজ আবার সে এক বিস্ময় চিহ্ন হয়ে এসেছে আমার কাছে। আজকের এইসব কথা লেখার মুহূর্তটি এক নিজস্ব বিন্যাসে ধরা দেয়। মনে হয় সেখানে আর কেউ নেই শুধু সে আমি মুখোমুখি বসে আছি অনন্ত স্তব্ধতায়। ভালবাসা এক অন্তহীন যাত্রা। কোনো পাত্রে আবদ্ধ করতে চাওয়া বৃথা। সত্যিকারের ভালবাসা হৃদয় উপচে পড়ে। তাকে অপচয় না করে অন্য পাত্রে ঢালতে তো কোনো ক্ষতি কিছু নেই। 

শনিবার, ১৩ মার্চ, ২০২১

ন্যানো টেক্সট ৩৯,পৃৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায়

 নস্টালজিয়া ৩৯

পৃথা চট্টোপাধ্যায়

নস্টালজিয়া ৩৯
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

বসন্তের দিন এলে এক অপূর্ব অনুভূতি হয় মনে। সেই অনুভব যে কী বলতে পারি না, শুধু বুঝতে পারি। দখিন হাওয়ায় ভেসে আসা লেবুফুলের গন্ধ আমাকে টেনে নিয়ে যায় শৈশবের বেড়ার ধারে যেখানে ফুলের ভারে নুয়ে পড়ে বাতাবিলেবু আর সজনের ডাল। আমের গাছে থোকা থোকা মুকুল ঘিরে মৌমাছিদের ওড়াউড়ি। শিবরাত্রির সময় এলে মসজিদের পাশে আমাদের বেলতলার সেই ফাঁকা জায়গায়, তেওয়ারিদের বাগানে অথবা মাঠে ঘাটে ফুটে থাকত ভাটফুল, আকন্দ। গঙ্গার ঘাটে স্নান করতে যাওয়ার পথে মা আমাকে সাদা দ্রোণপুষ্প চিনিয়েছিলো। এই সময় হাবুলকাকুদের বাড়ির গেটে থাকত বোগেনভেলিয়ার বাহার আর ছন্দাপিসিদের সদর দরজায় মালতীলতার শোভা। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনের ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতাম। কখনো সাজি নিয়ে ফুল তুলতে যেতাম দীপককাকুর বাড়ির বাগানে। অনেক জবা, গন্ধরাজ, বেলফুলের গাছ ছিল সেখানে। শরতে ঘাসের উপর বিছিয়ে থাকত শিউলি। নিঃসন্তান দীপককাকুর স্ত্রী বেশ সুন্দরী ছিলেন। আমরা তাদের বাগানে ফুল তুলতে গেলে কিছু বলতেন না। বরং অনেক সময় জবা গাছের উঁচু ডাল নুইয়ে দিতেন আমাকে। সুন্দরী সেই মহিলার মুখে সবসময় একটা দুঃখের ছায়া ঘিরে থাকতো।
                 খুব ছোটবেলায় বহুরূপী দেখেছিলাম আমি সাগরদিঘিতে থাকার সময়ে। পরে লালবাগে, বহরমপুরে, শক্তিপুরে মাসতুতো দিদির বাড়িতে যাওয়ার সময় ট্রেনে বহুরূপী দেখেছিলাম মনে আছে। বাড়ি বাড়ি ঘুরত তারা কোনো দিন শিব, কোনো দিন কালী, কোনো দিন বা কৃষ্ণ, হরগৌরী অথবা হনুমান সেজে। এই বহুরূপীরা দরিদ্র মানুষ হলেও তখন তাদের মধ্যে কী এক প্রাণের স্পন্দন ছিল বলে আমার মনে হতো। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার সঙ্গে তাদের জীবন ও জীবিকার বিষয়টি যে বহুরূপী সাজের অন্তরালে ছিল একথা একটু বড়ো হয়ে বুঝতে শিখেছি ; বাবা বলেছিল সে কথা। এইসব বসন্তের দিনে বহুরূপী আসত বেশি। প্রথম যখন বহুরূপী দেখেছিলাম তখন আমি বেশ ছোট। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের ছিনাথ বহুরূপীর কথা তখনো পড়ি নি। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ছিনাথ বহুরূপীর কথা পড়ে খুব ভালো লেগেছিল। আমাদের সময় পাঠ্য বিষয়টিকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারতাম বলে এত দাগ কাটতো মনে। পড়তে ভালো লাগতো সাহিত্যের বিষয়গুলি। এখনকার ছাত্র ছাত্রীরা বাতানুকূল ঘরের আরামে বসে গ্রামের মানুষের কথা অথবা জীবনের ছোট ছোট দুঃখ সুখ আনন্দ বেদনার কথা পড়লেও সেগুলো তাদের মনকে ছুঁতে পারে না। এখনকার অধিকাংশ গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরাও সেই অর্থে কষ্ট করে কম। তাদের মা বাবারাও সন্তানদের সাধ্যমতো আরামের জীবন দিতে চেষ্টা করে। বহির্বিশ্বের রঙিন জীবনের দুনিয়া তাদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। আমাদের দেশের মানুষের কথা, বাংলার প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের কথা, ক্ষুদ্রের মধ্যেও যে মহত্ত্বের গৌরব লুকিয়ে থাকে তার সন্ধান দিতে হবে আমাদের আজকের শিশু কিশোরদের মনে।

মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩৮ || পৃথা চট্টোপাধ্যায়

 নস্টালজিয়া ৩৮

পৃথা চট্টোপাধ্যায়


নস্টালজিয়া ৩৮
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

পুজোর ছুটির পরে স্কুল খুললে আমাদের শিক্ষিকারা তখন বেশ গল্প করতেন ক্লাসে। জিজ্ঞেস করতেন ছুটি কেমন কাটল, কোথাও বেড়াতে গেছিলাম কিনা, পুজোয় কেমন আনন্দ হলো,মা দুর্গার সঙ্গে আর কোন্ কোন্ ঠাকুর থাকে , তাদের কার কী বাহন -এইসব অনেক প্রশ্ন। আমাদের শিক্ষিকা মিত্রাদি , ঝর্ণাদি খুব বেড়াতে যেতেন। সেই সব বেড়ানোর গল্প বলতেন আমাদের। খুব ভালো লাগত আমার শুনতে। শেফালিদির মুখটা সবসময় বিরক্তিতে ভরা থাকত কেন জানি না। তবে একবার তিনি বেশ হাসি খুশি ভাবে তাঁর বেড়াতে যাওয়ার গল্প করেছিলেন মনে আছে। আমি পুজোর ছুটিতে বাড়িতেই থাকতাম। বাবা মায়ের সঙ্গে লালবাগে আর বহরমপুরে ঠাকুর দেখা ছাড়া কোনো কোনো বছর মোরগ্রামে মামার বাড়িতে যেতাম। এর বাইরে অন্য কোথাও বেড়াতে যাওয়া হত না আমাদের। বাবার মাইনে পত্র তখন এত বেশি ছিল না যে সংসার চালিয়ে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবে আমাদের।আর এ ভোজন রসিক ছিল আমাদের বাবা কাকা, তাই খাওয়া দাওয়ার জন্য অনেক খরচ করে ফেলত মনে হয়। একথা অবশ্য আমি বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। বন্ধুরা যখন বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার গল্প বলত তখন খুব ভাল লাগত শুনতে। টিফিন টাইমে তার কাছে যেতাম আরো গল্প শোনার জন্য। 'চাঁদের পাহাড়' বইটা পড়েছিলাম ক্লাস এইটে পড়ার সময়। মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম, আর কতবার যে বইটা পড়েছিলাম বলতে পারব না।
স্কুলে আমার বন্ধু ছিল নিষ্কৃতি, জয়ন্তী, তপতী, মানসী, শুভ্রা । তখন সব প্রাণের বন্ধু । অনেক গল্প হত তাদের সঙ্গে।স্কুল থেকে একসঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতাম আমরা। আমার বাড়ি ছিল সবচেয়ে দূরে। কতদিন এমন হয়েছে স্কুল ছুটির পরে ফেরার পথে ওদের বাড়িতে জল খেতে ঢুকতাম। ওদের মাও আমাকে খুব ভালোবাসতেন এবং না খাইয়ে কখনো ছাড়তেন না। এদিকে আমার বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মা খুব চিন্তা করত।আমরা তখন হেঁটে একসঙ্গে দলবদ্ধভাবে স্কুল থেকে ফিরতাম। বয়েজ স্কুলেরও ছুটি হত একই সময়ে। আমাদের স্কুলের কাছেই ছিল 'লালবাগ সিংহী বয়েজ হাই স্কুল'। ছেলেরা অধিকাংশই সাইকেলে ফিরত। ক্লাস এইট নাইন থেকে প্রেমের মুকুলিত অনুভব ছুঁয়ে ছিল আমার মন। ক্রমশ একটু একটু করে অনুভব করতে শিখেছি ভালবাসার অপূর্ব সৌন্দর্য। তখন ছেলেরা যে যাকে পছন্দ করত তার পিছনে অথবা পাশে পাশে সাইকেল চালিয়ে যেত স্কুল ফেরত। চিরকুটে ভালবাসার কথা লিখে বন্ধুর মারফত দিত পছন্দের মেয়েটিকে। এইসব নিয়ে অসাধারণ একটা রোমাঞ্চ ছিল আমাদের মধ্যে। স্কুলে আসার সময় কেউ কেউ প্রেমপত্র পেলে তার চোখমুখের চেহারা অন্যরকমহয়ে যেত। যে যার প্রিয় বন্ধুকে এসব বলত। খুব উৎসাহ ছিল তখন এইসব নিয়ে। কিভাবে যেন শিক্ষিকাদের স্টাফরুম পর্যন্ত পৌঁছে যেত সে খবর। ডাক পড়ত সেই মেয়েটির। বন্ধুদের মুখে মুখে আমাদের কাছে পৌঁছে যেত সে কথা। আমরা টয়লেটে যাবার অজুহাত দেখিয়ে ক্লাসরুমের বাইরে বেরোতাম। দেখতে যেতাম সেই মেয়েটিকে। এসবের মধ্যে যে কী এক নিবিড় ভাল লাগার ব্যাপার ছিল বলে বোঝাতে পারব না। বন্ধুরা যারা এসব পেরিয়ে এসেছে তারা অনুভব করতে পারবে। 

বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩৭ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় ||

 নস্টালজিয়া ৩৭

পৃথা চট্টোপাধ্যায়


নস্টালজিয়া ৩৭
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

খুব ছোটবেলার কথা লিখতে কেন যে এত ভালো লাগে জানি না। টুকটুক করে মনে পড়ে যায় কত কিছু। আমাদের শৈশব ঘিরে বাবা-মায়ের স্নেহ ও সান্নিধ্য খুব বেশি ছিল বলেই হয়তো আমাদের মন  এত কোমল ভাবে গড়ে উঠেছিল। আজকের অধিকাংশ শিশু নানা কারণে বাবা মায়ের মিলিত স্নেহ ভালবাসা থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয় দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। সন্তানকে একটু সময় দিতে হবে এটা অভিভাবকদের মনে রাখা খুব দরকার। আগে যৌথ পরিবার ছিল বলে মা বাবা না পারলেও ছোটদের সঙ্গীর অভাব হত না। দাদু ঠাকুমা এদের কাছে অনেক আদর, প্রশ্রয় ও সুশিক্ষা পেত ছোটরা।
আমার মা ছিল ঘোরতর সংসারী। সংসারের কাজকর্ম, পূজার্চনা, আমাদের পড়াশোনার প্রতি সজাগ দৃষ্টি ছিল তার। বাবার অবশ্য আড্ডার অভ্যাস ছিল। অফিসের পরে অথবা ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতো। এ নিয়ে অনেক সময়ই বাবা মায়ের মধ্যে মতান্তর হতো। আমার ছোটবেলায় দেখেছি বাবার তাস খেলার নেশা ছিল। পরে অবশ্য বাবা আর তাস খেলত না।
একদিনের কথা আমার বেশ মনে পড়ে। সেদিন রাতে খুব লোডশেডিং। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই দুর্যোগের রাতে মা আমাদের দুই বোনকে নিয়ে একা বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমার ভাই তখনো হয় নি।সেইসময় টিভি বা টেলিফোন ছিল না আমাদের মত অধিকাংশ বাড়িতে। মোবাইল তো দেশেই আসে নি। মা ঝড়ের তান্ডবে দুর্গানাম জপ করছিল। ঠাকুর দেবতার উপর মায়ের ছিল অগাধ বিশ্বাস। কত রাত মনে নেই তবে ঝড় একটু কমলে বাবা ফিরতেই মা খুব রাগারাগি করতে লাগল বাবা এই দুর্যোগের রাতে এত দেরিতে আড্ডা দিয়ে ফেরার জন্য। বাবা বেশ রসিক প্রকৃতির মানুষ ছিল। আর মা গম্ভীর রাগী স্বভাবের। বাবা হঠাৎ একটু কেমন জড়িয়ে কথা বলতে লাগল মায়ের সঙ্গে। মা সন্দিগ্ধ ভাবে বাবাকে দেখতে লাগল। বাবা একটা বড় কাচের বোতল বের করে ঢকঢক করে সামান্য কিছুটা খেয়ে মাকে সেটা রেখে দিতে বললো। আমরা জীবনে বাবাকে মদ্যপান করতে দেখি নি। অথচ সেই রাত্রে মা অন্ধকারে সেটা কীসের বোতল না দেখে ভয়ঙ্কর রেগে বোতলের পানিয়টুকু ঢেলে ফেলেছিল উঠোনে। বাবা তখন বুঝতে পারে নি। আমরাও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তারপরে। পরদিন সকালে দেখি উঠোনে সেই পানীয় পদার্থের চারপাশে থিকথিক করছে নানা রঙের পিঁপড়ে। মা যাকে কোনো নেশার দ্রব্য ভেবেছিল সেটা আসলে ছিল অরেঞ্জ স্কোয়াস। সকালে নিজের নির্বুদ্ধিতার কারনে মায়ের মুখ ছিল থমথমে আর বাবা মুচকি হাসছিল। আমি অরেঞ্জ স্কোয়াস নষ্ট হওয়ায় খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। আমাদের বাড়িতে তখন খুব কমই এসব ফলের রস আনা হোতো।আমরা ফলমূল খেতেই অভ্যস্ত ছিলাম। মা বাবাকে শুধু বলেছিল , ঐ দুর্যোগের রাতে এরকম ন্যাকামি না করলে দামি ফলের রসটা এভাবে নষ্ট হতো না। 

শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩৬ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৩৬

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



নস্টালজিয়া ৩৬
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

খুব আশ্চর্য হয়ে যাই আমি নস্টালজিয়া লিখতে বসে, কী করে ছোটবেলার এত কথা আমার মনে পড়ে যাচ্ছে আপনা থেকেই! পুরোন অধিকাংশ কথা বা বিষয় আমি ভুলে যাই। অথচ লিখতে বসলে আজকাল স্মৃতির সরণি বেয়ে আমার শৈশবের অনেক ঘটনা দিব্যি মনে পড়ে যাচ্ছে। তাহলে আমি যাকে ভুলে যাওয়া ভাবি তা হারিয়ে যায় না, মনের মধ্যে কোথাও ঠিক চাপা পড়ে থাকে।
একবার আমার ইচ্ছে হল সাইকেল চালান শিখব। মায়ের আপত্তি ছিল কারণ পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে এই ভয়ে। আমাদের ছোটবেলায় চাইলেই সব কিছু তক্ষুনি পাওয়া যেত না। আর আমি চাইতাম না তেমন কিছু। একটা সাইকেল কিনে দিক বাবা এটা মনে মনে চাইছিলাম কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারি নি । যাই হোক বাবার সাইকেলেই চালানো শিখলাম। প্রথমে হাফ-প্যাডেল তারপরে ফুল প্যাডেল সিটে বসে চালানো। আমার বাবার সাইকেলটা বেশ উঁচু ছিল। প্রথম দিকে সিটে বসে প্যাডেলে পা পেতাম না ,অসুবিধা হত। তাতে অবশ্য কিছু ভ্রূক্ষেপ ছিল না। সাইকেল চালান শেখার সময় একবার হাজারদুয়ারি মাঠে গঙ্গার ধারের রাস্তায় চালাতে চালাতে গড়িয়ে গঙ্গার জলে পড়ে যাচ্ছিলাম প্রায়। বাবা সঙ্গে ছিল। তখনো আমি ব্রেক কষা ঠিকমত শিখিনি। গঙ্গার ধারের পুরোনো রেলিং গুলো অনেক জায়গায় ভাঙা ছিল বলেই এই কান্ড ঘটেছিল। বেশ কয়েক জন ছুটে এসে সাইকেলটা না ধরলে সেই বিকেলে নিশ্চিত একটা বিপদ ঘটত। সাইকেল চালান শেখার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ভাবতাম কখন সাইকেল নিয়ে বেরোব। বাবা সকাল আটটায় অফিসে চলে যেত। মা বেশ রাগী ছিল বলে যথেষ্ট সাবধানে থাকতাম। সকাল থেকে পড়াশোনা ইত্যাদি যা যা আমার করা দরকার তখন মন দিয়ে করে নিতাম যাতে মায়ের কাছে সাইকেল চালানোর অনুমতি পাই। আর একবার সাইকেল নিয়ে বেরোলে সে যে কী মুক্তির আনন্দ তা আজকেও আমার মনে আছে। এক হাত ছেড়ে চালাতে শিখলাম যখন তখন আরো আনন্দ। সাইকেল নিয়ে গঙ্গার ধারে হাজারদুয়ারির মাঠ, দক্ষিণ দরজা, ইচ্ছাগঞ্জ, নশিপুরের দিকে চলে যেতাম। এদিকে তখন বেশ ফাঁকা থাকত রাস্তা। পাঁচরাহা বাজারের দিকে গাড়ি ঘোড়া বেশি ছিল বলে টিউশন পড়তে যাওয়া ছাড়া তেমন যেতাম না। সাইকেল চালানোর আনন্দ ও সেই স্বাধীনতার স্বাদ যে কী মধুর ছিল আমার কাছে তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। আমাকে সাইকেল কিনে দিয়েছিল বাবা ক্লাস এইটে ওঠার পরে। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের পুরস্কার ছিল লাল রঙের হারকিউলিস লেডিজ্ সাইকেল। খুব খুশি হয়েছিলাম সেইদিন। বাবার সাইকেল চালিয়ে অভ্যস্ত আমার কাছে এই সাইকেলটি বেশ নিচু আর চালিয়েও সুখ বলে মনে হত। 

বৃহস্পতিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩৫ || পৃথা চট্টোপাধ্যায়

 নস্টালজিয়া ৩৫

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



নস্টালজিয়া ৩৫
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

ছোটবেলায় অনেক বছর আমার সাগরদিঘিতে কেটেছে ঠিকই কিন্তু বড় হওয়ার পরে আমি আর কখনো সেখানে যাই নি। আমি ক্লাস থ্রি তে পড়ার সময় লালবাগে চলে আসি। বাবার ছিল বদলির চাকরি। এই সময় বাবা ভগবানগোলা বি. ডি. ও অফিসে বদলি হয়ে যায়। আমরা লালবাগের বাড়িতে সেই থেকে থাকতে শুরু করি। বাবা ট্রেনে ভগবানগোলা তার পরে লালগোলা নিত্য যাতায়াত করত। আর মা সেই কোন ভোরে উঠে কয়লার উনানে পাঁচ পদ রান্না করত। তেতোসুক্তো থেকে শুরু করে শাক,ভাজা,মাছ,ডাল, সবজি (যে সময়ের যা), চাটনি সব রান্না হত রোজ। বাবা খুব সকালে পাঁচরাহা বাজার থেকে মাছ কিনে আনত। আর বারোমাস সেই সাত সকালে সব কিছু খেয়ে রুটি- তরকারি টিফিন নিয়ে অফিসে যেত আটটার লালগোলা প্যাসেঞ্জার ধরে। বাবা নিজে খুব ভালো রান্না করতে পারত।খাবারের ব্যাপারেও ভোজন রসিক মানুষ ছিল।
সাগরদিঘি তখন খুব গ্রাম ছিল। লালবাগে এসে প্রথম দিকে বেশ অন্যরকম লাগত আমার মনে পড়ে। লালবাগ নবাবের দেশ তাই নাগরিক জীবনের ছাপ ছিল। আমাদের রাস্তার নাম ছিল সিরাজ-উদ্-দৌল্লা রোড। সাগরদিঘিতে আমাদের কোয়ার্টার সব পাকা হলেও আমার যতটুকু মনে আছে তখন সেখানে প্রায় সবই ছিল মাটির বাড়ি। আমার বাবা খুব ভাল সাইকেল চালাতে পারত। আমাকে আর বোনকে নিয়ে সাইকেলে করে সাগরদিঘি থেকে লালবাগের বাড়িতে আসত মাঝে মাঝে। আবার বোন অনেক সময় আসত না, আমার খুব চৈ চৈ বেড়াতে ভালো লাগে বরাবরই। সবসময় বাবার সঙ্গ ধরতাম। লালবাগে এসে আমার প্রথম আশ্চর্য ছিল হাতি দেখা। তখনও নবাবের একটা হাতি বেঁচে ছিল। সেই গল্পের হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়ার মত। আস্তাবলে তখন অনেক কটা ঘোড়াও ছিল। মহরমের দিন বিরাট তাজিয়া বের করা হত। সেদিন সাজিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো ধবধবে শাদা দুলদুল ঘোড়া। রাস্তায় হাতি নিয়ে যেত মাহুত। হাতির গলায় ঘন্টা বাঁধা থাকত। চলার সময় সেই ঘন্টা বাজত। সপ্তাহে দু-তিন দিন হাতি বের হত রাস্তায়। মনে হয় কোনো বাগানে খাওয়াতে নিয়ে যেত হাতিকে। সকালের দিকে আমরা পরিচিত ঘন্টার আওয়াজ শুনলেই বুঝতে পারতাম হাতি আসছে। ঘরে বেগুন আলু যা সবজি পেতাম নিয়ে রাস্তার ধারে হাজির হতাম। মাহুত হাতিকে দাঁড় করাতো। নিজে হাতে হাতিকে সেই সব সবজি আমরা খাওয়াতাম আর তখন খুব আনন্দ হতো।হাতি দেখার অছিলায় সকালের পড়ায় একটু ফাঁকিও দেওয়া যেত। 

সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩৪ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৩৪

পৃথা চট্টোপাধ্যায়


নস্টালজিয়া ৩৪
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

২০২০ এর মার্চে আমাদের দেশে চিন দেশের য়ুহান থেকে যার উৎপত্তি ও বিশ্ব জুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী সেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আসতে শুরু করেছে শুনে আমরা সবাই আতঙ্কিত হলেও ভেবেছিলাম ধীরে ধীরে নিশ্চয়ই পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে। তারপর যত দিন এগিয়েছে আতঙ্ক আর আশঙ্কা পাকে পাকে ঘিরে ধরেছে গোটা বিশ্বকে। মহামারী ক্রমশ অতিমারীতে পরিণত হয়েছে। বিপর্যস্ত মানুষ কোনমতে বেঁচে থাকতে চেয়েছে সমস্ত প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে। ক্রমশ সমস্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়েছে, লকডাউন কথাটা সবাই শিখে গেছে। আবার আনলক প্রক্রিয়া এসেছে। আবার লকডাউন। অচেনা রোগের সঙ্গে এক নিরুপায় যুদ্ধ বলা যায় এই পরিস্থিতিকে। জীবন ও জীবিকার টানাপোড়েনে এক অসহায় অবস্থার মুখে হঠাৎ করে এসেছে দরিদ্র মধ্যবিত্ত মানুষ। মাস্ক আর স্যানিটাইজার এই দুইকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আর নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষ ক্রমশ কাজের জন্য পথে বেরিয়েছে অসংখ্য মানুষ। কত প্রিয়জন, গুণী ব্যক্তি, ডাক্তার, পুলিশ, সাধারণ মানুষ বিষাক্ত বিশে চলে গেলেন। আমিও আক্রান্ত হলাম কোভিডের কবলে। দেখতে দেখতে ২০২১ চলে এল।প্রায় তিন মাস ধরে ওষুধ পত্র খেয়ে সুস্থ হচ্ছি ধীরে ধীরে। কেন যে এই রোগকে অতিমারী বলা হয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে টের পেয়েছি হাড়ে হাড়ে।
নস্টালজিয়া আমার শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোর কথা। তবু বর্তমান বারবার চলে আসছে লেখায়।কারণ একটাই ,আজ মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। আমার অসুস্থতার জন্য মায়ের মত ভাববে এমন কেউ আর নেই। আমিও মায়ের জন্য মায়ের মত করে কখনো ভাবতে পারি নি।সেভাবে সেবা যত্ন করতে পারলাম কই। ছোটবেলায় খুব ভুগতাম। অপরিণত ছিলাম জন্মকালে। আঠাশে, মানে আট মাস পড়তেই জন্মেছিলাম আমি। তিন বার টাইফয়েড হয়ে শৈশবেই যায় যায় অবস্থা হয়েছিল নাকি আমার।জিয়াগঞ্জ মিশন হাসপাতালের তখন ব্যবস্থা পত্র খুব ভাল ছিল। সেখানেই জন্মেছিলাম আমি। ছোট্ট পাখির মত নাকি হয়েছিলাম।সরু দড়ির মত হাত-পা। একমাস সর্বাঙ্গে তুলো জড়িয়ে রাখা হয়েছিল আমাকে। খুব যত্নে আমাকে বড় করে তুলেছিল বাবা- মা।একটু অসুখ বিসুখ হলেই যাই যাই অবস্থা হতো আর চিন্তার রেখা দিত তাদের মুখে। বাবার চাকরির উপরে পুরো সংসারটা নির্ভর শীল ছিল তখন। বাবার মাইনে পত্রও সেই সময় খুব বেশি ছিল না পরে তাদের মুখ থেকেই এসব কথা শুনেছি অনেকবার। 

সোমবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩৩ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৩৩

পৃথা চট্টোপাধ্যায়


নস্টালজিয়া ৩৩


শৈশবে কাটানো সাগরদিঘির দিনগুলো লিখতে শুরু করে এত কিছু মনে পড়ে যাবে ভাবতেই পারি নি। সেটা ছিল আমার খুব শৈশব। আশ্চর্য এই যে লেখাপড়া করতে ভাল লাগত আমার প্রথম থেকেই। এর কারণ হয়তো মায়ের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল। ম্যাট্রিকুলেশনের পরে মায়ের আরো পড়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু পিতৃহীন আমার মায়ের বিয়ে হওয়ার পরে সংসারের বোঝা সামলে আর প্রথাগত লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি। তবুও মা পড়তে ভালবাসত। রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, পুরাণ, মঙ্গলকাব্য এসব সুর করে সুন্দর উচ্চারণে পড়ত। আমাদের বাড়িতে বিকেলে কতজন আসত মায়ের কাছে এইসব পাঠ শুনতে।
আমার ছোটবেলায় দেখা সাগরদিঘি খুব গ্রাম ছিল। চারদিকে ফসলের খেত। বারোমাস চাষাবাদ হত সেই সব জমিতে। আমাদের কোয়ার্টারের সামনের রাস্তা পেরিয়ে জমিতে শীতের সময় আলু উঠত। মাটির সঙ্গে মিশে থাকত সেই আলু। চাষিরা বড় আলু জমি থেকে তুলে নেওয়ার পরে অনেক ছোট ছোট আলু পাওয়া যেত। আমরা তখন খুব আনন্দের সঙ্গে জমিতে সেই আলু কুড়োতে যেতাম।আমাদের মধ্যে যারা একটু বড় ছিল জমিতে এক ধারে আগুন জ্বেলে আলু পোড়াতো। আমরা ছোটরাও সেই আলু পোড়া খেতাম। কী অপূর্ব তার স্বাদ এখনো মনে আছে।
আমাদের কোয়ার্টার থেকে বাজারে যাতায়াতের পথে একটা গোরস্থান পড়ত। আমি বরাবরই বাবার সঙ্গে সাইকেলে চড়ে সব জায়গায় যেতাম। হেথা হোতা ঘুরে বেড়াতে আমার ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো লাগে। সেই কবরখানার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাবা নাকি সুরে কথা বলে ভয় দেখাতো। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ঐ রাস্তাটুকু পার হতাম। ওখানেই পোপাড়া বলে একটা পাড়ায় খুব যেতাম বাবার সঙ্গে সনাতন সিংহ জেঠুর বাড়িতে। বাবা ওখানে তাস খেলতে যেত। সেই সনাতন জেঠুর পরিবারের সঙ্গে আমাদের একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ওদের বাড়িতে অনেক সঙ্গী ছিল খেলার, আমি তাদের সঙ্গে খুব খেলা করতাম। ছোটবেলায় দুর্গাপুজোর সময় মা আমাদের নিয়ে মোরগ্রামে আমার মামার বাড়ির পুজোতে যেতে কোনো কোনো বছরে। একবার আমরা পুজোর সময় সাগরদিঘিতে ছিলাম আর সেবার মায়ের খুব মন খারাপ ছিল। 

মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৩২

পৃথা চট্টোপাধ্যায়


নস্টালজিয়া ৩২
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 

আমার শৈশবের বেশ কিছুটা সময় কেটেছিল সাগরদিঘিতে। বাবা তখন ওখানে  বিডিও অফিসে চাকরি করত। আমরা ওখানে কোয়ার্টারে থাকতাম। আমার বেশ মনে আছে আমাদের কোয়ার্টারের সামনেই ছিল রাস্তা, তার একধারে গাছপালা। ওখানে তখন রাস্তার ধারে সারি দিয়ে বাবলা গাছ ছিল, তাতে হলুদ রঙের বাবলা ফুল ফুটে থাকত। ছিল সাদা রঙের সুগন্ধি তে-চোখা ফুলের গাছ।নিশিন্ধা বলে একধরনের গাছ ওখানে অনেক ছিল। আর ছিল অনেক  তাল ও নিমগাছ। রাস্তার পাশেই ফসলের খেত - যেখানে আলু, আখ,সরষে, ছোলা এসবের চাষ হত। সেই মাঠের শেষে এক মস্ত দিঘি।এই দিঘির নামেই এই জায়গার নাম সাগরদিঘি তাই সবাই বলত। অনেক পদ্মফুল ফুটতো এই দিঘিতে। একবার হঠাৎ করে শোনা গেল  সেই দিঘির জলে মন্দির জেগেছে, তাই দেখতে  অনেক মানুষের ভিড়। দিঘির মাহাত্ম্যের কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল আশেপাশের গ্রামে।দলে দলে মানুষ এসেছিল সেই মন্দির দেখতে। কোন দেবতার মন্দির সঠিকভাবে কেউ বুঝতে পারছিল না। কারণ মন্দিরের  পুরোটা দেখা যাচ্ছিল না। শুধু চূড়া আর সামান্য কিছু অংশ। নৌকা করে সেই মন্দিরের কাছে অনেকেই যেত। আমার মা ঐ মন্দিরকে নিয়ে পরে একটা খুব সুন্দর কবিতা লিখেছিল। মায়ের কবিতা লেখার  বাঁধানো লাল রঙের লম্বা বড় মোটা একটা খাতা ছিল। তাতেই মা কবিতা, ছড়া লিখত। সেইসব লেখা মা আমাদের পড়ে শোনাতে খুব ভালোবাসত। পরে একজন মায়ের কাছ থেকে খাতাটা নিয়ে গেছিল,আর ফেরত দেয় নি। সাগরদিঘির দিনগুলো কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল যেন আমার মনে। আমি প্রাইমারি স্কুলে ওখানে কিছুদিন পড়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে  ব্রাহ্মণীগ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম।আমাদের কোয়ার্টার থেকে একটু দূরে ছিল সেই স্কুল।  সেখানে সিস্টারের মত সাদা শাড়ি পরিহিতা একজন শিক্ষিকা আসতেন আজিমগঞ্জ থেকে। তিনি স্কুলে যাওয়ার পথে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। তখনই তাঁর যথেষ্ট বয়স হয়েছিল। আমি স্কুলে  সবে ছোট ওয়ানে(নার্সারি ক্লাস) ভর্তি হয়েছি,তবুও আমার মনে পড়ে  অনেকটা মাদারের মত ছিলেন তিনি,সাদা কাপড় পরতেন। পরে কথা প্রসঙ্গে মা বলেছিল উনি গুরুমা ট্রেনিং করা ছিলেন বলে অনেক বয়সেও চাকরি করতেন। আজ অতীতের কথা লিখতে বসে এসব কীভাবে যেন মনে পড়ে যাচ্ছে। এখন আমার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই, তাই নিজের স্মৃতির পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা ছবিকেই মেলে ধরছি মনের আয়নায়। কী যে অপূর্ব সোনালি আনন্দের  অনুভূতিতে মন আজ পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে নিজেও বুঝতে পারছি না!

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩১ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৩১

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



শীত ঘনিয়ে এলেই আমার মনে পড়ে ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির উঠোন জুড়ে ফুটে থাকা গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা ফুলের কথা । একটা কুন্দফুলের গাছ ছিল বাড়ির উঠোনের ঠিক মাঝখানে। হেমন্ত ঋতু থেকেই ছোট ছোট সাদা ফুলে ভরে থাকত সেই গাছ। শীতের কুয়াশাভেজা সকালে গাছ ভরে ফুটে থাকা কুন্দ ফুলের স্নিগ্ধ মাধুর্যে আমার মন প্রসন্ন হয়ে যেত। আমরা বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতাম।বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা মা মোটেই পছন্দ করত না। ঘুম থেকে উঠেই আমি গাছের কাছে যেতাম। পাতায় পাতায় হিমের পরশ, কুয়াশার জল ছুঁয়ে দেখতাম। এখনও আমি ছোটবেলার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য টবে কুন্দ ফুলের গাছ লাগিয়েছি, কিন্তু সেরকম ফুল আর ফোটে কই! আমি ছাড়া সেই গাছের প্রতি আগ্রহ আর কারো তেমন নেই।
এই শীতের অনুসঙ্গে মিশে আছে নতুন ওঠা খেজুর গুড়ের(নলেন গুড়) সুগন্ধ। লালবাগে আমার ছোটবেলায় শীত পড়ত জাঁকিয়ে। সেই সঙ্গে ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকত চারধার। পায়েস, পিঠে, পুলি সবই নতুন গুড়ের। আমাদের বাড়িতে এই শীতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো খাবার তৈরি করত মা, আর খেজুর গুড়ের সুগন্ধে ঘরবাড়ি ম' ম' করতো। বাবা চেনা লোকের কাছ থেকে খেজুরের আসল ঝোলা এবং পাটালি গুড় কিনে আনত।আমাদের ওখানে গোবিন্দভোগ নয়, কামিনীভোগ চালের চল ছিল। নতুন চাল আর নতুন গুড়ের পায়েসের স্বাদ ছিল অনন্য। তবে মায়ের একটা বিষয় ছিল এই , যা কিছু মিষ্টান্ন দ্রব্য বাড়িতে তৈরি হবে দেবতাকে নিবেদন না করে খাওয়া যাবে না। যতই লোভাতুর চোখে আমরা তাকিয়ে থাকি না কেন মা তাকে মোটেই গুরুত্ব দিত না।বাবা ইশারায় বলত মা রেগে যাবে আগে খাওয়ার কথা বললে। সব তৈরি হলে আগে ঠাকুরকে নিবেদন করে তবে খাওয়া যেত। ততক্ষণ আমরা অপেক্ষা করতাম। আমাদের বাড়িতে চারটে নারকেল গাছ থাকায় পিঠে -পুলি- পাটিসাপ্টা তৈরির জন্য নারকেল কিনতে হতো না। আমার ঠাকুমা আবার চাল অথবা ময়দা গুঁড়ো মেখে চুষি তৈরি করে রাখতো। সাংসারিক কাজকর্ম শেষ করে গল্প করতে করতে কী অনায়াসে দ্রুত হাতে সমান মাপের এই চুষি তৈরি করত আমার ঠাকুমা( আমি অবশ্য তাকে' দাদা' ডাকতাম) দেখে তখনো খুব অবাক হয়ে যেতাম। খুব সময় সাপেক্ষ আর ধৈর্যের ব্যাপার এই চুষি তৈরি করা, কারণ হাতে করে সরু সরু চালের মত তৈরি করতে হয়। তারপর রোদ্দুরে শুকিয়ে রাখতে হয়। আমিও ছোটবেলায় শীতের রোদ্দুর গায়ে মেখে ঠাকুমা, মা এদের কাছে বসে চুষি তৈরি করতাম। এই সময় কখনো ছোট্ট পাখি তৈরি করে মা আমাদের উৎসাহিত করত, পিঠে পায়েসে আমরা সেই পাখিটি ভাগে পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে যেতাম। এইরকম কত তুচ্ছ বিষয় ঘিরে আমাদের আনন্দ ছিল আজ সেই সব কথা মনে পড়ে। 

বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ৩০|| পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৮

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


কয়েকদিন ধরে লেখায় মন বসছে না। এই লেখা আমার অতীতের ঘটনা প্রবাহ হলেও লিখে চলেছে বর্তমানের আমি।মন ভাল না থাকলে কখনো লিখতে পারি না। আমার মন ভাল নেই মানে অনেক কারণে তা হতে পারে। আজ আমাদের ছোট্ট ডালি, আমার ভাই এর পাঁচ বছরের ছোট্ট  মেয়েটি যখন জীবন মৃত্যুর সাথে তার ক্ষুদ্র প্রাণটুকু নিয়ে লড়াই করে চলেছে শিশু হাসপাতালে ভর্তি থেকে তখন আমার লেখা আসছিল না। একটু আগে যখন শুনলাম ভালো আছে , ওর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে তখন লেখা এলো।
আমার জীবন বৃত্তে ভাই অনেকটা পরে এসেছে, মানে আমার থেকে অনেকটাই ছোট। আমাদের খুব আদরের  ছিল ভাই।  আর দুুই বোন ছোটবেলায় বন্ধুর মত বড় হয়েছি। খুব খেলাধূলা করতাম দুই বোনে। আমাদের পড়াশোনা নিয়ে মা বাবাকে কখনো উদ্বিগ্ন হতে হয় নি।খুব সাবলীলভাবে মন দিয়ে পড়াশোনা করতাম। স্কুলে বরাবরই ভাল রেজাল্ট হতো আমাদের। মা কিভাবে যেন বুঝিয়েছিল পড়াশোনা করাটা আমার দায়িত্ব, মারধোর করে হয় না। ভালবেসে পড়তে হয়। আমিও ছোটদের এভাবেই বোঝাতে চেষ্টা করি। মা খুব কড়া শাসনে বিশ্বাসী ছিল, তাই মাকে ছোট থেকেই আমি ভয় করতাম। বোন অবশ্য একটু ডাকাবুকো ছিল, তেমন ভীতু ছিল না। আমরা দুই বোন খেলার সময় নিজেদের নতুন নামে খেলতাম। আমার নাম তখন জুঁই, আর ও করবী। এই নামেই ডাকতাম তখন। দুজনের দুটো অ্যলুমিনিয়ামের বাক্সে পুতুলের সংসার ছিল। তাই নিয়ে আমরা কত কত গ্রীষ্মের দুপুর, বর্ষার সন্ধ্যা, শীতের রাতে খেলা করতাম। আমাদের এই নিজস্ব দেওয়া নাম মা বাবাও অনেকদিন পর্যন্ত জানত না। ভাই হওয়ার পর আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। তখন পড়াশোনার থেকে ভাই এর দিকে মন থাকত বেশি। ওকে একটা ছোট্ট পুতুল বলে আমার মনে হত। খুব তাড়াতাড়ি পড়া করে নিতাম ভাই এর সঙ্গে খেলতে পারব বলে। ভাইকে প্রথম রাখি পরানো আর প্রথমবার ভাইফোঁটা দেওয়ার আনন্দের স্মৃতি আজও মনে আছে। আর এখন যান্ত্রিক জীবনে সবকিছুই কোথায় হারিয়ে গেছে। বড্ড দূর হয়ে গেছে মনে হয় সবই।

মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৯ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৯

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



প্রবহমানতাই জীবন।যে জীবন নদীর মত বাঁকে বাঁকে বইতে পারে, সইতে পারে দুঃখ কষ্ট   সেই জীবনেরই তো  উত্তরণ ঘটে। শোক যন্ত্রণা বিচ্ছেদ মৃত্যু দুঃখ দারিদ্র্য চলার পথে বারবার আসে, পথ রোধ করতে চায়, তবু থেমে গেলে তো চলে না। এসবের মধ্যেই আমাদের নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজে নিতে হয়। শৈশবের কথা লিখতে বসে এইসব কথা বারবার চলে আসছে, কারণ আমারও অতীত জুড়ে রয়েছে নিরন্তর আনন্দ ও ব্যথার অজস্র ঘটনা। এখন পরিস্থিতি এমনই আনন্দ করতে চাইলেও ঠিক সেই আগের মত খুশিতে ভরে উঠছে না মন।  কত কত মুখ, কত সুখ স্মৃতি এসে ভিড় করছে যাদের আর কখনো ফিরে পাব না। কিছু মানুষ দেখি যারা সব কষ্ট খুব দ্রুত ভুলে, মৃত্যু ঝেড়ে ফেলে আনন্দে মেতে ওঠে, তারা এক বিশেষ গোত্রের। এরা সুখী।আমি তেমন নই। আমি ভিতরে ভিতরে ক্ষয় হই। পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে অনেক সময় লাগে। 

       আমার শৈশব ও কৈশোর ঘিরে আছে আমার বাবা মা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন। বাবা মা আজ আর নেই। ভাই বোনের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ। আমি কাউকে হারাতে চাই না।সবার সঙ্গে সম্পর্কের সুতোয় জড়িয়ে থাকতে চাই। এই সবের মধ্যে এক নিবিড় যন্ত্রণা আছে। সব কিছু দূরে সরিয়ে আমি সাগর তীরে ঝিনুকের খোঁজে বেরিয়েছি। আমরা যখন ঝিনুক কুড়োয় কোনো বাজ বিচার করি না, যা পাই কুড়িয়ে আনি। পরে সেগুলো থেকে বেছে জায়গা মত রাখি, কিন্তু ফেলতে পারি না একটাও।আমার অতীত  জীবনের ঘটনাগুলোও তাই সবই মনের কুঠুরিতে জমে আছে আপনার ঔজ্জ্বল্যে। লিখতে বসে যখন যেটা মনে আসে লিখে ফেলি।

          আগেই বলেছি আমাদের পুরনো আমলের বাড়িতে কড়ি- বরগার ঘর ছিল। গরমের সময় লিচু কিনে আনত বাবা। আমি মুর্শিদাবাদের আম জাম লিচু কাঁঠালের দেশের মানুষ। এইসব ফল কখনো অল্প কেনা হতো না আমাদের বাড়িতে তখন। আমরা সব ভাই বোন লিচুর ভক্ত ছিলাম। লিচু লোভনীয় ফল হলেও বেশি খেলে পেটে ব্যথা করে। বাবা বাগান থেকে  লিচুর থোকা কিনে পাটের দড়িতে ঘরের কড়িকাঠের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখত যাতে আমরা ইচ্ছে মতো বেশি না খেয়ে ফেলি। সবুজ পাতায় গোলাপি আভার লিচুর থোকাগুলো ঝুলতো ঘরে, তার একটা দারুণ সৌন্দর্য ছিল। বাবা অফিসে চলে যেত। আমরা অপেক্ষা করতাম মাএর ঘুমানোর। মা ঘুমিয়ে পড়লেই চেয়ারের উপর টুল দিয়ে তাতে চড়ে সারা দুপুর লিচু চুরি করে খেতাম। বাবা অফিস থেকে ফিরে বলতেন ,"লিচু কম কম মনে হচ্ছে যেন !" আমরা সে কথায় কান না দিয়ে আরো গভীর মনোযোগের সাথে পড়ার ভান করতাম।

শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৮ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৮

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



লিখতে বসেছি কিন্তু ভালো লাগছে না। বিষণ্ণতা ঘিরে রেখেছে যেন। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মৃত্যু সংবাদ আমার লেখার উৎসাহ দমিয়ে দিচ্ছে। আমি তো আজকের কথা নয়, স্মৃতির গভীরে ডুব দিয়ে কুড়িয়ে আনতে চাইছি মণিমাণিক্যর মত আমার শৈশবের কত উজ্জ্বল স্মৃতি । আসলে আমি তো লিখি না ,লেখে আমার মন। মন না চাইলে এক বর্ণও লিখতে পারি না।  হেমন্তের শূন্যতাকে এবার ছাপিয়ে গেছে মৃত্যুর বিষণ্ণতা। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, কবি নাসের হোসেন,  কবি গৌরাঙ্গ মিত্র,ফুটবলের কিংবদন্তি মারাদোনা আরো কত কত মানুষ চিরতরে  চলে গেলেন। এঁরা সবাই আমার মনের কত  কাছে ছিলেন চলে যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছি। আমিও কোভিড থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি। সব কিছু থেকে উত্তীর্ণ হয়ে আপাতত আমি লিখতে চাই,  নস্টালজিয়ায় ডুবে থাকতে চাই। এত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে চলা খুব দুঃসহ। 

 মৃত্যু ছাড়াও কত ছোট ছোট বিচ্ছেদ আমাদের মনে গভীর শূন্যতাবোধ সৃষ্টি করে। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব অনেক সময় কত সামান্য কারনে ক্রমশ দূরে সরে যায় । একবার ভেঙে গেলে যে কোনো সম্পর্ক অথবা মন জোড়া বেশ কঠিন। এ আমার জীবনের অভিজ্ঞতা। আমি কোনদিনই কোনো  সম্পর্ক নষ্ট করে দেওয়া ভালো বাসি না। ভুল তো হতেই পারে। মিটিয়ে নিতে চাই সবসময়। 

এখন ছোটবেলার একটা মজার ঘটনা বলি। তখন  আমি ক্লাস সিক্সে  আর আমার বোন প্রাইমারিতে ক্লাস ফোরে পড়ে । আমাদের নতুন পড়াতে আসছেন অমল মাস্টার। খুব শৌখিন অনেকটা যাত্রার নায়কের মত চেহারা আর হাবভাব ছিল তাঁর। আমার বোন খুব সামান্য কারনে বকা খেত তাঁর কাছে। ঘেরা বারান্দার চৌকিতে বসতাম আমরা, অমল মাস্টার সামনে হাতলওলা কাঠের চেয়ারে। বোন পা গুটিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারত না। পা নামিয়ে বসলেই বকতেন ।বলতেন একদম পা দোলাবি না।সব পড়া ঠিকঠাক করে রাখলেও নতুন কিছু জিজ্ঞাসা করতেন আর না পারলে ধমক দিতেন। একদিন মা কিছুক্ষণের জন্য পাশের প্রতিবেশির বাড়িতে নারায়ণ পুজোয় গেছিল, আমি আর বোন অপেক্ষা করছি স্যার আসবেন। বোন স্যারের বসার চেয়ারটা পাল্টে একটা পা ভাঙা চেয়ার এনে রেখে দিল। অমল মাস্টার এসে অহেতুক গাম্ভীর্য নিয়ে চেয়ারে বসতেই চেয়ার ভেঙে ধপাস করে পড়ে গেলেন। 'বাবা গো মা গো' বলে প্রায় কাঁদতে লাগলেন। আমরাই হাত ধরে তাঁকে ওঠালাম। বোন খুব গম্ভীর মুখ করে ছিল। আমি কিছুতেই হাসি চাপতে পারছিলাম না। স্যার বোনকে বারবার বলছিলেন, 'এ সব তোরই কারসাজি'। মা এলে নালিশও  জানালেন বোনের নামে।

শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৭ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ২৭

পৃথা চট্টোপাধ্যায়




আমার ছোটবেলার দিনগুলো পাতাবাহারের রং বাহারি সৌন্দর্যে ঘেরা ছিল। বাবা ভালো সরকারি চাকরি করত বলে সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল, কিন্তু আমাদের কখনো প্রাচুর্যের সন্ধান দেয় নি তারা।যেটুকু প্রয়োজন অনায়াস পেতাম, তাই বলে বিলাসিতা বা বাহুল্য শৈশব ও কৈশোরের দিনে কখনই ছিল না। কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট বিলাসিতা ছিল আমাদের বাড়িতে। ভোজন রসিক ছিল বাবা, কাকা, ঠাকুমা ( যাকে আমি আদর করে 'দাদা' বলতাম)। রোজকার মেনুতে ভোজবাড়ির মত পাঁচ পদ রান্না হত। শাক,ভাজা, ডাল, সিজন অনুসারে দুটো সবজি ,মাছ অথবা খাসির মাংস , চাটনি। রাতে রোজ মিষ্টি খেতাম আমরা। চমচম, ছানাবড়া, রসগোল্লা, রাজভোগ, কমলাভোগ- এর যে কোনো একটা থাকতই। মাঝে মাঝেই পায়েস হত। আমের সময় একসাথে দশ- বারোটা আম সবাই মিলে খাওয়া হত। মা বাবা পাকা কাঁঠাল খেতে খুব ভালোবাসত। বোন কাঁঠাল পছন্দ করত না।
ছোটবেলায় আমি স্বপ্ন দেখতাম খুব। সত্যিকারের স্বপ্ন ছিল সেসব। কত অজানা দেশে বেড়াতে চলে যেতাম। মনে আছে একবার স্বপ্নে একটা হাতি আমাকে খুব তাড়া করেছিল। ঘুম ভেঙে যাবার পর অনেকক্ষণ সেই ভয় ছিল ।সকালে ঘুম থেকে উঠে মাকে স্বপ্নের কথা বললে মা বলেছিল হাতির স্বপ্ন দেখা ভালো।স্বপ্নে আমি কিছুতেই দৌড়াতে পারতাম না। প্রায় সময়ই ছুটতে চাইতাম অথচ পারতাম না বলে খুব কান্না পেত। পরীক্ষার আগে প্রায় প্রত্যেক রাতে স্বপ্ন দেখতাম আমার কলমের নিব্ ভেঙে গেছে লেখা যাচ্ছে না,পরীক্ষার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে অথচ আমার লেখা শেষ হয় নি। এইসব স্বপ্ন দেখে খুব মন খারাপ হয়ে যেত ঘুম ভেঙে গেলে। আমার বোন তুতুলও খুব স্বপ্ন দেখত। ওর স্বপ্ন আবার আশ্চর্য রকমের ধারাবাহিক ছিল। আগের রাতের স্বপ্নটা continue হত পরের এবং তার পরের রাতে। ঘুম থেকে উঠেই ও নির্বিকার ভাবে ওর এই ধারাবাহিক স্বপ্নের কথা গল্পের মতো বলতো। মা,বাবা, আমি সবাই মন দিয়ে শুনতাম। কেউ অবিশ্বাস করতাম না ওর কথা। বাবা কেবল মুচকি মুচকি হাসত আর পরদিন সকালে জিজ্ঞেস করত ও আগের স্বপ্নটার নতুন কিছু দেখল কি না। বোন গম্ভীর হয়ে বলত ,"এটা কী গল্প যে রোজ দেখব?" এখন বুঝতে পারি এইসব ছোট ছোট বিষয়ে মা বাবা আমাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনে কীভাবে আমাদের মনের আনন্দ প্রকাশের জগৎ খুলে দিয়েছিল কত সুন্দর ভাবে। আর এখন আমরা সন্তানের কথা একটু ধৈর্য ধরে শোনার প্রয়োজন বোধ করি না, আর শুনতে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারি না। তাই এই শিশুরা বড়ই একা হয়ে যায় জীবনের শুরুতেই। 

সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৬ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৬

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



'তুমি পারবে না ' এই কথাটা ছোটদের কখনই বলতে নেই। বিশেষ করে মা যদি শিশুকে বারবার বলতে থাকে 'তুমি পারবে না' শিশুর মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ধারণা জন্মে যায় যে মা যখন বলছে তখন আমি পারব না। যত কঠিন কিছু হোক শিশুটিকে যদি বারবার উৎসাহিত করা হয় 'তুমি পারবে'  তাহলে অনেক সাহস আর মনোবল খুঁজে পায় সে, জীবনের কঠিন বাধা অনায়াসে অতিক্রম করতে শেখে। এই  'আমি পারি'(I can) মন্ত্রে শৈশব ও কৈশোর থেকেই শিশু কিশোরদের দীক্ষিত করে তুলতে হয় এই অভিজ্ঞতা আমার ব্যক্তিগত  জীবন সঞ্জাত। 

খুব শান্ত আর ভিতু ছিলাম ছোটবেলা থেকেই। শান্ত শিষ্ট আমার স্বভাব, কিন্তু অহেতুক  ভয়টা মা নিজের অজান্তেই আমার  মনের মধ্যে  তৈরি করে দিয়েছিল এটা আমি বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি । আমার আগে ও পরে যে দুটি সন্তান মায়ের জন্মেছিল  তাদের শৈশবই মৃত্যু হয়েছিল।  একটির জন্মের পরেই আর একজনের তিনমাসে পক্স হয়ে। আমিও প্রি ম্যাচিওর বেবিছিলাম,  আট মাসের শুরুতেই জন্মেছিলাম। সময়ের আগেই এত শান্ত মেয়েটি কীভাবে যে ছটফট করে পৃথিবীর আলো দেখতে বেড়িয়ে এসেছিল জানি না। অনেক যত্নে সাধ্য সাধনা করে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল মা- বাবা। ছোটবেলায় টাইফয়েড হয়েছিল তিন বার। বারবার জ্বর হতো আর তখন ডাক্তার কিছুতেই ভাত খেতে দিত না বলে আমার খুব খারাপ লাগত। যাই হোক  এইসব কারণে  আমাকে মা পক্ষীমাতার মত ডানা দিয়ে  আগলে বড় করে তুলেছিল। পরে অবশ্য এই আমাকেই জীবনের অজস্র ঝড় ঝামেলা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে  বারবার  অনেক বেশি আর আমার  'পারব না'  এই গন্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসতে খুব কষ্ট হয়েছে । আসলে ছোটবেলা থেকেই  মায়ের মনে আমার জন্য সবসময় একটা ভয় ছিল ,যদি কিছু হয়ে যায়! খুব আলতো করে রাখতে চেষ্টা করত আমাকে সবরকম বিপদ আপদের হাত থেকে।  পড়াশোনা ছাড়া কোনো কাজ আমাকে করতে দিত না মা। ফলে আমি অনেক বড় পর্যন্ত ভয়ে দেশলাই জ্বালাতেও পারতাম না। চা ছাড়া আর কোনো কিছু করতে পারতাম না বিয়ের সময়েও আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা একথা জানে। যে কোনো কাজ করতে গেলেই মা বলত 'তুই পারবি না', এটা অতিমাত্রায় স্নেহের বশে বলা, কিন্তু সেটা আমার মনে গেঁথে বসেছিল। আমি সব কাজ থেকে গুটিয়ে রাখতাম নিজেকে 'পারব না' ভেবে। পড়াশোনার ক্ষেত্রে কখনো "পারবে না" এই কথা মা বলত না। তবুও  মায়ের অজস্র  'না' আমার জীবনে সব কাজের মধ্যেই  কিছুটা নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া করেছিল , আমার মনোবল নষ্ট করেছিল বড় হয়ে তা উপলব্ধি করেছি। পড়াশোনা ও জীবনের শিক্ষায় এই 'না'-এর গন্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করেছি।  মাকেও বলতাম সে কথা, মাও পরে বুঝতে পেরেছিল।

রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৫ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ২৫

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



আকাশ দেখতে ভালবাসি সেই কবে থেকে তা আমার মনে পড়ে না। ঘরের মধ্যে বিছানায় শুয়ে আকাশ দেখার নেশা খুব ছোটবেলা থেকেই। এসব ছিল  আমার একান্তই ব্যক্তিগত ভালো লাগা । আমাদের বাড়ির চারপাশে এত ঘরবাড়ি ছিল যে বিছানায় শুয়ে তেমনভাবে আকাশ দেখতে পেতাম না। কিন্তু আমাদের একটা ঘরের দরজা দিয়ে খাটে শুয়ে  প্রতিবেশী গণেশদাদের একতলা বাড়ির ছাদ টপকে ফটো প্রেমের মতো একফালি  আকাশ তখন  দিব্যি  দেখা যেত। আমি আর বোন সেই খাটে শুয়ে  বর্ষার আকাশে  মেঘে মেঘে  কত ছবি আঁকতাম !  ভাগ্যিস আমরা বড় হবার পরে গণেশদার বাড়িটা দোতলা হয়েছিল না হলে আকাশ উপভোগের  ঐটুকু আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতাম। 

বাবার কথা বলতে গেলেই আমার একজন হাসিখুশি  কর্মী মানুষের মুখ ভেসে আসে। আমার ছোটবেলায় বাবা অফিস , সংসারের বাইরের কাজকর্ম নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকত । তবে  অফিস থেকে ফিরে অঙ্ক আর ইংরেজি পড়াতো আমাদের।  ভাইবোনদের মধ্যে  আমাকে বাবা একটু বেশি ভালোবাসত বলে আমার মনে হতো। ছুটির দিনে বাবা আমাদের সঙ্গে সারাক্ষণ কাটাতো, সময় দিত আমাদের। বিকেলে আমরা বাবার সঙ্গে  গঙ্গার ধারে হাজারদুয়ারির মাঠে  বেড়াতে যেতাম। গঙ্গার পারে বসে সূর্যাস্ত দেখতাম আর দেখতাম দলে দলে আকাশপথে বাসায় ফিরে চলেছে পাখির ঝাঁক। অনেক দূরে দূরে ভেসে যেত খেয়া পারাপারের নৌকা। 

ছোটবেলায় মনের ভাবনার কোনো পরিধি থাকে না বলে  মন যা ইচ্ছে তাই ভাবতে পারে। তখন আমিও কত কিছু ভাবতাম এই সব পাখিদের সারাদিনের উড়ে চলা নিয়ে।  সম্ভব অসম্ভবের বেড়াজালে মানুষ আটকে যায় বড় হয়ে বুঝতে শেখার পর। আমার ছোটবেলায় কোনো  জিনিসের চাহিদা ছিল না। কখনও কোনো জিনিসের জন্য আবদার করেছি বলে মনে পড়ে না।  আজও সেই অভ্যাস থেকে গেছে। কোন কিছুই আমার বলে জোর করে  চাইতে পারলাম না বলে বঞ্চিত থেকে গেলাম অনেক কিছু থেকেই ।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...