পৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৫ মার্চ, ২০২১

"যুগ সাগ্নিক" সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক মুখপত্র || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || বাংলার গর্ব ছোটো পত্রিকা

"যুগ সাগ্নিক" সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক মুখপত্র

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনা ও সুন্দর ভবিষ্যতের পথ চলায় বুক বেঁধে ২০২০র অতিমারীকে জয় করে প্রকাশিত হয়েছে "যুগ সাগ্নিক" নবম বর্ষ শারদ সংখ্যা ২০২০ । এই সংখ্যাটি বৈশাখ-শ্রাবণ-শারদীয়া
একত্রে তিনটি সংখ্যার মুদ্রিত সংস্করণ। করোনার কারনে ২০২০র মার্চের শেষদিকে সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে আমাদের দেশেও আচমকাই লকডাউন ঘোষণা করা হয়। লক এবং আনলকের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে অন্যান্য পত্রিকার মত যুগ "সাগ্নিক পত্রিকা"পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করা সম্ভব হয় নি। অনেক পত্রিকা পি ডি এফ ফর্মে প্রকাশ করা হলেও "যুগ সাগ্নিক" পত্রিকা তাদের লেখক ও পাঠকের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে চিরাচরিত ভাবে মুদ্রিত পত্রিকা প্রকাশ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। "যুগ সাগ্নিক" পত্রিকাটি খুব সমৃদ্ধ একটি সাহিত্য পত্রিকা। এই পত্রিকার সম্পাদক শ্রী প্রদীপ গুপ্ত মহাশয় সারা বছর নানান রকম সামাজিক গঠন মূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও অত্যন্ত যত্ন সহকারে এই পত্রিকাটি করেন। "যুগ সাগ্নিক" একটি সম্মিলিত প্রয়াস বলে আমার মনে হয়েছে। এই পত্রিকার সহ- সম্পাদক হলেন নন্দিনী সেনগুপ্ত, জয়তী বসু,মমতা ভৌমিক, সুজিত সরকার এবং শুভাশিস সরকার। এ ছাড়াও পত্রিকাটির সম্পাদক মন্ডলী, বার্তা সম্পাদক এবং সদস্য বৃন্দে অনেক কবি সাহিত্যিক আছেন। " যুগ সাগ্নিক" পত্রিকার মুখ্য উপদেষ্টা হলেন কবি কৃষ্ণা বসু ও কবি রত্নেশ্বর হাজরা। পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সকলের নাম উল্লেখ করে আমার লেখার মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারি না। সবার নাম বলতে পারলাম বলে মার্জনা করবেন। তবে এই পত্রিকা আরো অন্যান্য লিটিল ম্যাগাজিনের মতোই একটি সমষ্টিগত প্রয়াস একথা অনস্বীকার্য।
"যুগ সাগ্নিক" পত্রিকায় অনেক বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক যেমন লেখেন তেমনি অনেক তরুণ কবি ও লেখকদেরও লেখার সুযোগ দেওয়া হয়। এই পত্রিকাটিতে কবিতাকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে স্থান দেওয়া হয়েছে। কবিতা লিখেছেন পবিত্র মুখোপাধ্যায়,মৃণাল বসু চৌধুরী, কৃষ্ণা বসু, ব্রত চক্রবর্তী, অজিত বাইরী, অজিতেশ নাগ, দুর্গাদাস মিদ্দা, তাপস মহাপাত্র,শ্রী সদ্যোজাত,দয়াময় পোদ্দার, পিয়াংকী, অমৃতা রায় চৌধুরী ,অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়,অংশুমান চক্রবর্তী, সাহাবুদ্দিন ফিরোজ, কৌশিক চক্রবর্তী, জারা সোমা,মৈত্রেয়ী ঘোষ,সফিকুজ্জামান,চিরঞ্জীব হালদার, অতীশ দীপঙ্কর,দীপশিখা পোদ্দার, কাকলি মুখার্জি প্রমুখ অসংখ্য কবি।
গল্প লিখেছেন মনোরঞ্জন ব্যাপারী, রিয়া ভট্টাচার্য, হেমন্ত সরখেল, অর্পিতা বোস,সুজিত চট্টোপাধ্যায়, দীপঙ্কর বেরা, সুব্রত মুখোপাধ্যায়,শ্যামশ্রী চাকী, প্রমুখ আরো অনেক লেখক।
যুগ সাগ্নিক পত্রিকাটি সাহিত্যের প্রতিটি বিষয়কে পত্রিকার অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই এখানে আছে গদ্য, প্রবন্ধ, রম্য রচনা, ভ্রমণ বিষয়ক লেখা, অনুবাদ সাহিত্য এবং পুজোর রান্না। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারকে নিয়ে সুন্দর প্রবন্ধ লিখেছেন ড.অশোক কুমার ভট্টাচার্য,"শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও কয়লাকুঠির দেশ" প্রবন্ধ লিখেছেন ইন্দ্রাণী বিশ্বাস মন্ডল।রয়েছে করোনা পরিস্থিতি ও দেবী দুর্গা বিষয়ে লেখা। এই পত্রিকার সব কবি ও লেখকের নাম উল্লেখ করতে পারলাম না বলে মার্জনা করবেন। সবার লেখা ও মিলিত প্রয়াস পত্রিকাটিকে সমৃদ্ধ করেছে বলে আমি মনে করি।
ভ্রমণ কাহিনিগুলি খুব সুন্দর। যুগ সাগ্নিক পত্রিকাটি নামেই লিটিল ম্যাগাজিন, কলেবরে যথেষ্ট ওজনদার এবং অধিকাংশ লেখাই খুব ভালো লেগেছে। অবসর সময় অনায়াসে সুন্দর ভাবে কেটে যায় এই পত্রিকাটি পড়ে। সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন অসিত পোদ্দার,তানিশা সাহা ও তপবর্ণা ভট্টাচার্য। আপনারা সংগ্রহ করে পড়লে নিশ্চয় ভালো লাগবে এই পত্রিকাটি।
পত্রিকা -যুগ সাগ্নিক
সম্পাদক- প্রদীপ গুপ্ত
বিনিময়-১৮০টাকা

মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৯ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৯

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



প্রবহমানতাই জীবন।যে জীবন নদীর মত বাঁকে বাঁকে বইতে পারে, সইতে পারে দুঃখ কষ্ট   সেই জীবনেরই তো  উত্তরণ ঘটে। শোক যন্ত্রণা বিচ্ছেদ মৃত্যু দুঃখ দারিদ্র্য চলার পথে বারবার আসে, পথ রোধ করতে চায়, তবু থেমে গেলে তো চলে না। এসবের মধ্যেই আমাদের নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজে নিতে হয়। শৈশবের কথা লিখতে বসে এইসব কথা বারবার চলে আসছে, কারণ আমারও অতীত জুড়ে রয়েছে নিরন্তর আনন্দ ও ব্যথার অজস্র ঘটনা। এখন পরিস্থিতি এমনই আনন্দ করতে চাইলেও ঠিক সেই আগের মত খুশিতে ভরে উঠছে না মন।  কত কত মুখ, কত সুখ স্মৃতি এসে ভিড় করছে যাদের আর কখনো ফিরে পাব না। কিছু মানুষ দেখি যারা সব কষ্ট খুব দ্রুত ভুলে, মৃত্যু ঝেড়ে ফেলে আনন্দে মেতে ওঠে, তারা এক বিশেষ গোত্রের। এরা সুখী।আমি তেমন নই। আমি ভিতরে ভিতরে ক্ষয় হই। পূর্বাবস্থায় ফিরে আসতে অনেক সময় লাগে। 

       আমার শৈশব ও কৈশোর ঘিরে আছে আমার বাবা মা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন। বাবা মা আজ আর নেই। ভাই বোনের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ। আমি কাউকে হারাতে চাই না।সবার সঙ্গে সম্পর্কের সুতোয় জড়িয়ে থাকতে চাই। এই সবের মধ্যে এক নিবিড় যন্ত্রণা আছে। সব কিছু দূরে সরিয়ে আমি সাগর তীরে ঝিনুকের খোঁজে বেরিয়েছি। আমরা যখন ঝিনুক কুড়োয় কোনো বাজ বিচার করি না, যা পাই কুড়িয়ে আনি। পরে সেগুলো থেকে বেছে জায়গা মত রাখি, কিন্তু ফেলতে পারি না একটাও।আমার অতীত  জীবনের ঘটনাগুলোও তাই সবই মনের কুঠুরিতে জমে আছে আপনার ঔজ্জ্বল্যে। লিখতে বসে যখন যেটা মনে আসে লিখে ফেলি।

          আগেই বলেছি আমাদের পুরনো আমলের বাড়িতে কড়ি- বরগার ঘর ছিল। গরমের সময় লিচু কিনে আনত বাবা। আমি মুর্শিদাবাদের আম জাম লিচু কাঁঠালের দেশের মানুষ। এইসব ফল কখনো অল্প কেনা হতো না আমাদের বাড়িতে তখন। আমরা সব ভাই বোন লিচুর ভক্ত ছিলাম। লিচু লোভনীয় ফল হলেও বেশি খেলে পেটে ব্যথা করে। বাবা বাগান থেকে  লিচুর থোকা কিনে পাটের দড়িতে ঘরের কড়িকাঠের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখত যাতে আমরা ইচ্ছে মতো বেশি না খেয়ে ফেলি। সবুজ পাতায় গোলাপি আভার লিচুর থোকাগুলো ঝুলতো ঘরে, তার একটা দারুণ সৌন্দর্য ছিল। বাবা অফিসে চলে যেত। আমরা অপেক্ষা করতাম মাএর ঘুমানোর। মা ঘুমিয়ে পড়লেই চেয়ারের উপর টুল দিয়ে তাতে চড়ে সারা দুপুর লিচু চুরি করে খেতাম। বাবা অফিস থেকে ফিরে বলতেন ,"লিচু কম কম মনে হচ্ছে যেন !" আমরা সে কথায় কান না দিয়ে আরো গভীর মনোযোগের সাথে পড়ার ভান করতাম।

মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৪ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৪

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



এই সময়টা সিজন্  চেঞ্জ- এর। বাংলায় ছটি ঋতুর সৌন্দর্য আমরা উপভোগ করলেও শীতের স্থায়িত্ব  খুব কম এখানে। গ্রীষ্মপ্রধান দেশ আমাদের। এই শরৎ আর শীতের মাঝে হেমন্তে বরাবরই আমার জ্বর, সর্দি কাশি হতো ছোটবেলায়। অনিয়ম করতাম উপযুক্ত পোশাক- আশাকের। গরম জামা ঠিক মত পরতাম না বলে ঠান্ডা লেগে যেত আমার এই সময়। মুর্শিদাবাদে খুব ঠান্ডা পড়ে যেত কালীপুজোর সময়ে। আমাদের বাড়িতে কালীপুজো হতো ভাই হবার পরে। মা কালীর কাছে মা মানত করেছিল দুটি কন্যার পরে একটি পুত্র জন্মালে "মা"কে ঘরে আনবে। কেন যে আমার কু- সংস্কারমুক্ত ধর্মপ্রাণ  মা এমন মানত করেছিল জানি না।  হয়তো ভেবেছিল ভবিষ্যতে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে একাকীত্বের কথা  চিন্তা করে। পরে বাবার মৃত্যুর পর যখন  সব কিছু  থেকেও ক্রমশ  একা হয়ে গেছিল সাংসারিক তুচ্ছতায়, অনেক আফসোস করত এই নিয়ে পুত্র সন্তান নিয়ে। যাই হোক আমার বাবা  মায়ের এই কালী পুজোর  মানত- এ মোটেই খুশি হয় নি ।  খুব নিয়ম করে ধূমধামের সঙ্গে আমাদের বাড়িতে পরপর ন'বছর মা কালীর পুজো হয়েছিল। আমার ছোটবেলায় খুব আনন্দ হতো এই কালীপুজোর সময়। আমাদের পাড়ার সবাইকে নেমন্তন্ন করা হতো।  সারারাত জেগে খুব আনন্দ হতো তখন। কিন্তু তারপরই আমার জ্বর হতো অনিয়ম হতো বলে। আমাদের বাড়ির কাছেই চক কালীবাড়ি। মা খুব জাগ্রত সেখানে। ভর দুপুরে বা অমাবস্যার রাতে ঐ মন্দিরের পাশ দিয়ে আসতে আমাদের গা ছমছম করতো। এবছরটা কোভিড এর কারণে খুব খারাপ যাচ্ছিল।  আরও খারাপ হয়ে গেল আমি যথারীতি জ্বরে পড়লাম।  চারিদিকে পরিস্থিতি খারাপ, আমার জ্বরের লক্ষণটাও ভালো না, স্বাদ গন্ধ রহিত হয়ে বাধ্য হয়ে কোভিড পরীক্ষা করলাম।  জানলাম আমিও পজিটিভ এখন। আপাতত ঘরেই বন্দি এখন।  এরকম জ্বর আগেও তো হতো কিন্তু এবার কিছু জিনিস অন্যবারের মতো না। হোম আইশোলেশন, ড্রপলেট,  মাস্ক, স্যানিটাইজার, অক্সিমিটার  কোভিডের কচকচি। শ্বাসকষ্ট নেই তাই এ যাত্রা বেঁচে যাবো নিশ্চয়ই।

সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২০

নস্টালজিয়া ১৯ || পৃথা চট্টোপাধ্যায়

নস্টালজিয়া ১৯

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



আজকাল পুজোর দিন যত এগিয়ে আসে ততই আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে তাদের কথা যারা স্নেহে মমতায় আদরে আবদারে বড় করে তুলে তারপর ...তারপর একদিন নিজেরাই কোথায় চলে গেল। 'মৃত্যুরে লহো  সহজে'  বলা হলেও , আমি কোনো মৃত্যুকেই সহজে মেনে নিতে পারি না। যে চলে  যায় সে  যে চিরতরে হারিয়ে যায় এটা আমার কাছে খুবই বেদনার। একটা ভাষাহীন কান্না আমাকে চেপে ধরে মৃত্যুর প্রসঙ্গ এলেই।

  আমার বাবার কথা খুব  মনে পড়ে। বাবা নেই এ কথাটা যত সহজে বলি মন তত সহজে মানে না। বাবার মৃত্যুর পর খুব একা অসহায়  মনে হয়েছিল সেই রাতে।  ছোটবেলায় বাবা ছিল আমার কাছে এক প্রশ্রয় স্থল। বাবা দূরে দূরে চাকরি করত বলে মাকেই সামলাতে হত আমাদের তিন ভাই বোনকে।মা তাই হয়তো  একটা শাসনের  আবরণে ঘিরে রাখত আমাদের। বাবা সকালে অফিসে  বেড়িয়ে রাতে ফিরতো।আমার মনে আছে মা খুব সকালে উঠে বাবা অফিসে যাবার আগে সব রান্না সেরে ফেলতো।খাওয়া দাওয়ার শৌখিনতা ছিল আমাদের বাড়িতে। তখন রান্নার গ্যাস ছিল না। আঁচে রান্না হত, অথচ মা কত যত্ন করে তেতো সুক্তো ,শাক,রকমারি সব্জি,  ডাল, মাছ, চাটনি ইত্যাদি সব পদ রান্না করে ফেলত সকাল আটটার মধ্যে। বাবাও সেই সাত সকালে সব রকম পদ গুছিয়ে তৃপ্তি করে খেয়ে দুপুরের টিফিন বাক্সে গরম রুটি তরকারি ইত্যাদি নিয়ে নির্দিষ্ট  ট্রেন ধরত অফিসে যাবার। বাবা পরবর্তীকালে প্যান্ট সার্ট পরলেও  আমার শৈশবে ও কৈশোরে বাবা  ধবধবে সাদা ধুতি হাফসার্ট, ফুলসার্ট অথবা পাঞ্জাবি পরত। বাবা অফিস থেকে ফিরলে নিশ্চিন্ত হতাম আমরা। বিকেল থেকেই বারবার ঘড়ি দেখতাম,  উৎকর্ণ হয়ে থাকতাম ট্রেনের শব্দ শুনতে। বাবা মা সন্তানের সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধন ছিল আমাদের শৈশবে।বাবার অফিস থেকে ফেরার ট্রেন লেট করলে কতবার ঘর বার করতাম আমি। মা ও চিন্তা করত । গরমের সময় বেলা বড় বলে অসুবিধা হত না, কিন্তু শীতের রাতে কনকনে ঠান্ডায়,  বর্ষার রাতে বৃষ্টিতে ভিজে বাবা বাড়িতে ফিরলে বাবার জন্য আমার খুব কষ্ট হত। বাবা অফিস থেকে ফিরলে খুব নিশ্চিন্ত হতাম আমি। ক্লান্ত থাকলেও খুব আদরের সঙ্গে আমাদের সমস্ত দিনের কার্যকলাপের খোঁজ নিত। বাবা  অফিস থেকে ফিরে ইংরেজি পড়াত আমাদের। আর ছুটির দিনে নিজের হাতে খাসির  মাংস রান্না করত। মা সব জোগাড় করে দিত। বাবার রান্নার স্বাদই ছিল আলাদা। বাবা রান্না করার  সময় আমরা ঘুরঘুর করতাম কখন ছোট্ট বাটিতে করে আমাদের একটুকরো মাংস দেবে সেদ্ধ কতটা হয়েছে দেখতে, এর যে কী আনন্দ বলে বোঝাতে পারব না।  বাবার কাছে আনন্দের অনেক প্রশ্রয় ছিল। কোনো ছুটির দিনে, বৃষ্টির সন্ধ্যায় বাবা আমাদের অনেক মজার ঘটনা,  গল্প বলত।বাবার গল্প বলার মধ্যে এমন একটা আকর্ষণীয় ভঙ্গি ছিল যে আমরা খুব উপভোগ করতাম। কত গল্প বাবার কাছে বারবার শুনেও পুরোনো মনে হত না।

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ১৮ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ১৮

পৃথা চট্টোপাধ্যায়




পুজোর দিন এগিয়ে এলেও  এবার এই করোনার আবহে কারোরই সেই ভাবে পুজোর অনুভব আসছে না। এ এক অদ্ভুত সময়। কখনো কেউ এইরকম সময়, এরকম  আতঙ্কিত দিন  যে আসতে পারে আমরা হয়ত কল্পনাও করি নি। বরাবরই পুজোর সময় এগিয়ে আসা মানেই খুশি খুশি ভাব। নতুন জামা কাপড়ের গন্ধ। আলমারি খুললেই ন্যাপথালিনের গন্ধ। এখনও ন্যাপথালিনের গন্ধের সাথে আমার ছোটবেলার অনেক কথা ,অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমাদের নতুন জুতো মোজা কেনা হতো পুজোর সময়।আমরা পুজোর সময় জুতোর সাথে অবশ্যই মোজা কিনতাম।জুতো, জামা সব এক সাইজ করে বড়ো কেনা হতো আমাদের।জুতোর ক্ষেত্রে শৌখিনতার চেয়ে টেকসই যাতে হয় সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিত মা।বেল্ট দেওয়া জুতো অথবা এখন যাকে ব্যালেরিনা বলে সেই ধরনের জুতো কেনা হতো ছোটবেলায়।   মোজা যদিও শীত কালে পারতাম তবু পুজোর সময়ই কেনা হতো।ছোটবেলায় পুজোতে নতুন জামার সাথে নতুন জুতো পরে প্রতিবছর  পায়ে ফোস্কা পড়ত। ঠাকুর দেখতে বেড়িয়ে হাঁটতে কষ্ট হতো। পুজোর আগে জুতো পরে একটু অভ্যাস করে রাখলে এটা হয় না তখন জানতাম না। আর তখন ধারণা ছিল আগে ব্যবহার করা মানেই তো  পুরোনো হয়ে যাওয়া। পুজো শেষ হলে সব  নতুন জামা কেচে মা আলমারিতে অথবা ট্রাঙ্কে রেখে দিত,আর গতবছরের জামা বের করে দিত পুজোর পর ব্যবহারের জন্য।  নতুন প্রসাধন সামগ্রীও কেনা হতো পুজোর সময়। আমার মা তেমন সাজগোজ করত না। সিঁদুরের টিপ আর সাধারণ আটপৌরে শাড়িতে মাকে কী সুন্দর লাগত! আমি আর বোন যেতাম বাবার সঙ্গে  বাবার  বন্ধু ভবাকাকুর দোকানে সাজগোজের  জিনিস কিনতে।তখন সেই দোকানের নাম ছিল উর্বশী।অনেক দিন লালবাগ ছেড়ে কলকাতায়। জানি না সেই দোকান এখন আছে কি না। খুব প্রথাগতভাবে প্রতি বছর একই জিনিস কেনা হতো। চুলের তেল ডাবর আমলা, পন্ডস্ পাউডার, ভিকো ক্রিম, ফেমিনা ক্রিম, ক্লিনিক প্লাস শ্যাম্পু, পন্ডস্ কোল্ড ক্রিম,সিঁদুর, আলতা, একটা নেলপালিশ, দুটো টিপের পাতা নানারঙের, সিঙ্গার টিপ,ওলি সেন্ট। যদিও আমাদের কাজল পাতা হত কাজল লতায় তবু  সিঙ্গার কাজলের ছোট্ট  কৌটো, আমাদের চুলের ক্লিপ আর কাচের চুড়িও কিনতাম । সামনে শীতকাল আসবে তাই ভেবে একটা বসন্ত মালতি আর বোরোলীনও পুজোর সময়ই কেনা হতো। একটু বড় হবার পর আমরা পাড়ার চুড়িওয়ালির বাড়িতে কাচের চুড়ি পরতাম  পুজোর নতুন জামার  সঙ্গে রং  মিলিয়ে। মা আমার হাত কেটে যাওয়ার ভয়ে কাচের চুড়ি পরা পছন্দ করতো না। পুজোর সময় শুধু ঠাকুর দেখা আর খাওয়া এই নিয়মে চলতাম না। তখন অবাধ মুক্তি। আমার মায়ের কড়া শাসন থাকলেও এই দিনগুলোতে  মা একটুও বকতো না।পুজোর ক' দিন তো মোটেই পড়াশোনা করতাম  না। মহালয়ার  পর থেকেই আকাশে বাতাসে খুশির সুর ধ্বনিত হতো। খুব ছোটাছুটি খেলতাম আমরা।একবার দেওয়াল বা কোথাও ধাক্কা লাগলে অথবা হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে কাচের চুড়ি  সত্যিই ভেঙে যেত। মন খারাপ হলেও সেদিকে বিশেষ ভ্রূক্ষেপ থাকত না। আবার খেলায় মেতে যেতাম।

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ১৭ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ১৭

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



"আশ্বিনের মাঝামাঝি   উঠিল বাজনা বাজি / পূজার সময় এলো কাছে" এ শুধু নিছকই কবিতা ছিল না আমার ছোটবেলায়, এই কবিতার অনুভবের ব্যাপ্তি ছিল শৈশবের মন জুড়ে। এই বছরটা (২০২০)আমাদের সবার  জীবনেই  সমস্ত অভিজ্ঞতার  বাইরে। তাই এবারের সঙ্গে কোনো সময়ের তুলনা করা যায় না। তখন  আশ্বিন মাস এলেই আকাশের রং কেমন পাল্টে যেত,বাতাসে শিউলির সুবাস, কাশের বনে লাগত দোলা।আমার  ছোটবেলার একটা স্বভাব ছিল কবিতায় প্রকৃতির যে রূপ বর্ণনা পড়তাম তার সঙ্গে বাস্তবকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম। এটা শিশুকাল থেকে আপনা হতেই গড়ে উঠেছিল। "এসেছে শরৎ হিমের পরশ" পড়তে পড়তে "আমলকি বন কাঁপে যেন তার বুক করে দুরু দুরু " পড়লেই অপূর্ব অনুভবে রোমাঞ্চিত হতাম। আমলকি গাছ তখন দেখি নি , অথচ সেই গাছের পাতা খসে যাওয়ার সময় সমাগত জেনে  আমার মন কী এক বিষণ্ণতায় ছেয়ে যেত যেন। 

   এই আশ্বিনে মনে পড়ে ঘাসের  বনে,  গাছের পাতায় খুব ফড়িং এর ওড়াউড়ি হত। তখন নানা রঙের প্রজাপতিও দেখতাম ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াতে। আগে ই বলেছি আমাদের বাড়িতে অনেক  ফুলগাছ ছিল। তাই হয়ত প্রজাপতি আসত সেই সব ফুলের মধু পান করতে ।আমার ছোটবেলায় ফড়িং ধরার নেশা ছিল। তাই বলে কখনই তাদের  ধরে ডানা ছিঁড়ে ফেলতাম না। পুজোর আগে এ এক আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। তখন আমাদের  এ এক খেলা ছিল। চারিদিকে পুজো পুজো ভাব জাগলে মনেও লাগত খুশির ছোঁয়া। আমরা তখন  জানতাম কোথায় বেশি ফড়িং ওড়ে। আমাদের বাড়ির কাছে  ফাক্কু নবাবের একটা মস্ত বাগান ছিল।  সেখানে  আম, জাম  কাঁঠাল, ফলসা এসব অনেক বড় বড় গাছ ছিল। সেখানে ঘাসের জমিতে অনেক ফড়িং উড়ত। আমরা ছেলে মেয়ে অনেকে মিলে সেখানে ফড়িং ধরার খেলায় মাততাম। ফড়িং ধরে তাদের কচি ঘাস খাওয়াতাম।খেলি হলে আবার তাদের উড়িয়ে  দিতাম । এই সময়ে আমরা ঘুড়িও  ওড়াতাম খুব। আমরা খোলা ছাদে ঘুড়ি ওড়াতাম বলে মা ঠাকুমার কাছে বকাও খেতাম । আমাদের বাড়িতে নারকেল গাছ থাকায় ঘুড়ি ওড়ানোর অসুবিধা হত। তাই ঘুড়ি লাটাই নিয়ে চলে যেতাম  প্রতিবেশী বন্ধু তেওয়ারিদের বাগানে। তবে সত্যি বলতে কি  আমার এসবের আয়োজনটাই ছিল বেশি,  আমার ঘুড়ি বেশি উঁচুতে উড়ত না। আমার ঘুড়ি লাটাই অন্যরা নিয়ে ওড়াতো আর আমি ঘাসের জমিতে বসে দূর আকাশে রং বেরং এর  ঘুড়ির ওড়া দেখে মুক্তির আনন্দ উপভোগ করতাম।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ১৫ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ১৫
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


'ছোট প্রাণ ,ছোট কথা ,ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা'দিয়ে ঘেরা ছিল আমার শৈশব। মধ্যবিত্ত সংসারে সেখানে অভাব যেমন ছিল না,  তেমনি প্রাচুর্যও ছিল না খুব একটা। ছোটবেলায় আমাদের কোনো আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা হতো না। একটু বড় হলে বুঝতে শেখার বয়স হলে মাসের শেষে বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখতাম  আজও মনে আছে। বাবা সরকারি চাকরি করলেও তখন মাইনে পত্র খুব বেশি ছিল না।আমার মায়ের জীবনযাপন  ছিল সাদাসিধে। শৌখিনতা কখনই দেখি নি আমার মায়ের মধ্যে। আমার মায়ের বাপের বাড়ির অবস্থা যথেষ্ট ভালো ছিল। কিন্তু মা আমার বাবার সঙ্গে স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত সংসারে আনন্দে মানিয়ে নিয়েছিল।  আমাদের বেড়ে ওঠার দিনগুলোও ছিল চাহিদা মুক্ত। নিত্য প্রয়োজনীয়  কিছু জিনিস আমরা না চাইতেই পেতাম। এখনকার মত এত যান্ত্রিক ছিল না আমার শৈশব ও কৈশোর।  জিনিসের প্রাচুর্যে নষ্ট করা হয় নি আমাদের শিশুমন।দোষ করলে বকাঝকা শুনতে হত, সেরকম অন্যায় করলে বেদম প্রহারও করা হতো ছেলেদের। এই মার খেয়ে ছেলেরা কিছু যদি করে এই ভাবনার কোনো প্রশ্নই ছিল না কারো মনে। মেয়েরাও মায়ের হাতাখুন্তির আওতা থেকে বাদ পড়ত না।একবার মিথ্যে কথা বলার জন্য আমাকে নারকেল গাছে বেশ কয়েক ঘন্টা মা বেঁধে
রেখেছিল। সেদিন আমার জন্য কষ্টে মাও সারাদিন কিছু খায় নি ।কখনও কোনো জিনিস  আমাদের খুব পছন্দ হলে মা -বাবাকে বলতে হত না, তারা কী ভাবে যেন টের পেয়ে যেত।  তখনই সেটা না পেলেও পরে ঠিক সান্টাক্লসের মত উপহার পেয়ে যেতাম বাবা মায়ের কাছ থেকে।সেটা যে খুব দামি কোনো  উপহার তা কিন্তু নয়।  সেই  পাওয়ার আনন্দ প্রকাশের কোনো ভাষা জানি না,  এখনও  শুধুই অনুভব করতে পারি।  আজ সংসারের চাকায় পিষ্ট হয়ে ভাবি সেটা জোগাড় করতে সেদিন কত ত্যাগ স্বীকার করেছিল  তারা। ছোট ছোট অনুভূতিগুলো গড়ে উঠেছিল আমাদের এভাবেই।
           একবার একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। বিকেল বেলা আমরা উঠোনে কুমির ডাঙা খেলছি বেশ কয়েক জন , হঠাৎ নারকেল গাছ থেকে ঝুপ করে কিছু পড়ার শব্দ হলো। প্রথমে ভয়ে বারান্দায় উঠে গেলেও একটু পরে কাছে গিয়ে দেখি কাঠবেড়ালির বাচ্চা। নারকেল গাছে তাদের বাসা থেকে একসাথে তিনটে জড়াজড়ি করে পড়েছে। গ আমার মাও ছুটে এসে বাচ্চাগুলো বেঁচে আছে কিনা আগে দেখল। তারপরে তাদের একটা বড় বেতের ঝুড়ি ঢাকা দিয়ে রাখা হল, বেড়ালের হাত থেকে বাঁচাতে । তখন সন্ধে হয় হয়। এমন সময় দেখি সেই ঝুড়ির কাছে ঘোরাফেরা করছে তাদের মা।ঝুড়ির নিচে দিয়ে ভেতরে ঢুকতে চেষ্টা করছে।আমি এগিয়ে গিয়ে ঝুড়িটা খুলে দিতেই মা  কাঠবেড়ালি বাচ্চাগুলোর কাছে গিয়ে লেজ উঁচিয়ে ঘুরপাক  খেতে লাগল। এই হলো অপত্য স্নেহ! এরপর আমরা যা দেখলাম আরও আশ্চর্যের ঘটনা। মা কাঠবেড়ালি তার আর একটি বাচ্চাকে মুখে করে গাছ থেকে নামিয়ে এনে ওদের কাছে পৌঁছে দিল। চারটে কাঠবেড়ালি আমাদের কাছে থেকে গেল। রাতটা ঝুড়ি ঢাকা দিয়ে রাখা হত।ভোর হতেই মা কাঠবেড়ালি সেখানে হাজির হয়ে  ডাকাডাকি শুরু করে দিত।ঝুড়ির ঢাকা খুলে দিতেই মা কাঠবেড়ালি খুব খুশি।কুটকুট করে গাজর কেটে খাওয়া শিখিয়ে দিত বাচ্চাদের।আমরা পাকা পেয়ারা , বাদাম দিতাম ওদের।  দুই হাতে ধরে ওরা খেত সব।আমাদের খেলার নতুন সাথি জুটে গেল। বাচ্চাগুলো  একটু  বড় হতে থাকল। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম ঝুড়ির  ঢাকা খোলা। বাচ্চাগুলো একটাও  সেখানে নেই ।কিচমিচ শব্দে তাকিয়ে দেখি মা কাঠবেড়ালি তার বাচ্চাগুলো মুখে নিয়ে তরতরিয়ে  উঠে যাচ্ছে নারকেল গাছের উপরে।বাচ্চাগুলো আনন্দে তাদের  মায়ের কাছে ফিরে যাচ্ছে ।আমার খেলার নতুন সঙ্গী চলে যাওয়ার জন্য খুব মন খারাপ হয়ে গেছিল সেদিন।

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ১৪ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ১৪
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 

ছোটবেলার এক একটা ঘটনা বড় বেলায় কেমন করে গল্প হয়ে যায়। এই রকম কত ঘটনা মনে পড়ছে আজ। আমাদের বাড়ির উঠোনে ছিল চারটে নারকেল গাছ। ভাদ্র মাস এলেই  সেই গাছ কাটার লোক আসত। গাছ কাটা মানে নারকেল গাছের পাতা কাটা, পাকা পরিণত নারকেল পাড়া, ডাবের কাঁদি নামানো ইত্যাদি।  পুজোর আগে এই সময় নারকেল গাছগুলোকেও  সাফ সুতরো করা হতো। পুজোয় অনেকগুলো  কাচের বয়াম ভরে চিনির নাড়ু, গুড়ের নাড়ু ও নারকেলের নানা রকম মিষ্টি তৈরি করা হত। আমাদের বাড়ির অধিকাংশ রান্নাতেও নারকেল দিত মা। আমার বাবা কাকা খুব ভালো ডাব চিংড়ি করতে পারতো। শুধু পুজোর সময় বলে না বারোমাস আমাদের ঘরে নারকেল নাড়ু থাকতো। এটা আমাদের খুব প্রিয় একটি খাদ্যবস্তু ছিল। অনেক নারকেল হতো এই চারটে গাছে। একটা মস্ত বড় সাঁড়াশি ছিল নারকেল ছাড়ানোর জন্য। ঐ সাঁড়াশি দিয়ে আমরা ছোট বড় সবাই খুব তাড়াতাড়ি নারকেল ছাড়াতে পারতাম। নারকেল পাতা থেকে কাঠি ছাড়িয়ে তাই দিয়ে ঝাঁটা তৈরি হত।কতজন নারকেল পাতা আর শুকনো ডালপাতা, বাগরা  নিয়ে যেত জ্বালানির জন্য। এখনকার শহরের ছেলেমেয়েরা এইসব আনন্দের গভীরতা অনুভব করতে পারবে না। পাকা ঝুনো  নারকেল ছাড়াও বাবা দোমালা আর ডাবও পাড়াতো এই দিন।  আমরা তখন প্রতিদিন বাড়ির ডাবের জল খেতাম। ইচ্ছে হলেই নারকেল খেতাম।কিছুদিন আগে আমার allergy test হলে জানতে পারলাম  আমার নারকেলে নাকি allergy , নারকেল খেতাম আগে এতো কই কিছু তো অসুবিধে কখনও বুঝতে পারি নি।  আত্মীয়- স্বজন, পাড়া- প্রতিবেশীদের মা এইসময় বাড়ির গাছের নারকেল দিত। তবে আমাদের পাড়ায় তখন অধিকাংশ বাড়িতেই  নারকেল গাছ ছিল। নারকেল গাছ কাটানোর দিন খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার মন খুশিতে পূর্ণ হতো, কারণ আমাদের বাড়িটা  তখন খুব খোলামেলা লাগতো। পুজো এসে গেছে এই অনুভূতিটা আরও গাঢ় হত যেন । উঠোনে দাঁড়িয়ে  নীল আকাশ দেখতে পেতাম। এমনিতেই অনেক গাছপালা তার সাথে উঁচু নারকেল গাছের পাতার জন্য বাড়ি থেকে  আকাশ দেখতে হতো পাতার ফাঁকে ফাঁকে অথবা ছাদে গিয়ে। বাড়ির উঠোনে একটা পেয়ারা গাছ আর একটা শিউলি ফুলের গাছ  পাশাপাশি ছিল। বর্ষায় যেমন  গাছ ভরে দারুণ পেয়ারা হতো তেমনই শরৎকাল জুড়ে  আমাদের বাড়ির বাতাসে শিউলির গন্ধ ভাসত। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম কেমন  সাদা চাদর বিছিয়ে  আছে শিউলি গাছের তলায়। পাড়ার অনেকেই সেই ভোরে ফুল কুড়োতে আসতো। কে কত  তাড়াতাড়ি কত বেশি ফুল কুড়াতে পারে তার এক নীরব প্রতিযোগিতা চলতো যেন। সেই আনন্দের স্মৃতি আজও মনে আছে, হাতে লেগে আছে শিউলির সুগন্ধ। আর সাজি নিয়ে ফুল কুড়োনোর আনন্দময় দিনগুলো  সময় কখন যে  কুড়িয়ে নিয়ে গেছে জানতেই পারি নি। আজ সে বাড়ি আমার নেই,  সেই গাছ হয়তো আছে কিন্তু আমার সেই সাজি কোথায় যেন  হারিয়ে গেছে।

বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

নস্টালজিয়া ১৩ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ১৩
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


ছোটবেলায় ভাদ্র মাসের দুপুরে রোদের তীব্রতা খুব টের পেতাম। শরতের সকালের স্নিগ্ধতা,  শিশির ভেজা  শিউলির সুরভি বেলা বাড়ার সাথে সাথে উধাও হয়ে  যেত। আমার ঠাকুমা বলতো তাল পাকা গরম এই ভাদ্দর মাসে। কেন জানি না আজ ঠাকুমার কথা মনে পড়ছে খুব। আমাকে খুব ভালোবাসত।আমি তাকে 'দাদা' বলতাম। আমার দেখাদেখি অন্য ভাইবোনরাও তাকে দাদা বলেই ডাকতো। আমার প্রথম উচ্চারিত 'দাদা ' শব্দটি তার জন্য নিবেদিত হয়েছিল।ভাইফোঁটায় তাকে ফোঁটা দিতাম, রাখী বাঁধতাম ছোটবেলায়। এই ভাদ্রমাসে পুজোর আগে ঘরদোর বিশেষভাবে ঝাড়ামোছা করা হত।'দাদা' এই সময় তার মস্ত লোহার ট্রাঙ্ক খুলে  একান্ত নিজস্ব সম্পদগুলি রোদে দিত।এই ট্রাঙ্কটিকে ঘিরে আমার কৌতুহলের অন্ত ছিল না।  কিন্তু ঠাকুমা এটা খুব যত্ন করে রাখত ও যখন তখন খুলতো না। খুব ভারি ছিল বলে সেটি ঘরের মধ্যে খুলে ভেতরের জিনিসপত্র একে একে বের করে উঠোনে মাদুর বিছিয়ে রোদ্দুরে দিত সব কিছু।  আমি ও অন্যান্য ভাইবোন সবাই ব্যস্ত হতাম সেগুলি বয়ে নিয়ে রোদে দিতে।ট্রাঙ্কটা খোলার সময় অপলক চোখে তাকিয়ে থাকতাম। খুব কম খোলা হত বলে আর ডালাটা খুব ভারি ছিল বলে খোলার সময়  কচ্ করে শব্দ হত এখনও মনে আছে। তাতে থাকত আমার দাদামশাই এর ব্যবহৃত কিছু কাগজপত্র, জামা কাপড়, কাঁসা পিতলের বাসন,হরেকৃষ্ণ লেখা নামাবলি,ঠাকুমার সেমিজ, বই রেখে পড়ার কাঠের তৈরি একটা ছোট ফোল্ডিং টেবিল।  এরপর বের হত   আমার বহু অপেক্ষিত সেই আশ্চর্য বাঘের মাথা  উজ্জ্বল পাথরের চোখ বসানো, বাঘের চামড়া, নখ, হরিণের শিং। এসবই দাদামশাই এর শিকার করা। সেই  কত বছর আগে শিকার করা জ্যান্ত বাঘের মাথা কীভাবে আস্ত থাকতে পারে ছোটবেলায় আমি সেকথা ভেবে পেতাম না।  বিস্মিত হয়ে আমি সেগুলো দেখতাম। খুব ছোটবেলায় ভয় পেতাম সেই বাঘের মাথা দেখে। ঠাকুমা গর্বের সাথে বলত ' তিনি তো ভালো শিকারী ছিলেন,  এ বাঘ হরিণ সব তাঁর নিজে হাতে শিকার করা'। ইতিমধ্যে আমি জ্যোতিদাদার শিকারের গল্প পড়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের লেখায়, তা সাথে আমার দাদামশাই এর শিকার কাহিনিকে মিলিয়ে নিতে চেষ্টা করতাম। আমার দাদামশাই এত সাহসী ছিলেন ভেবে আমি তখন বেশ অবাক হয়ে যেতাম। আমার বাবা কাকাও একবার করে ঐ বাঘের মাথা হাতে নিয়ে দেখত। আজকে বুঝতে পারি  ঠাকুমার কত ভালবাসার স্মৃতি জড়িয়ে ছিল  এইসব বহু যত্নে রাখা জিনিসগুলির সাথে।

শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২০

নস্টালজিয়া ১২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ১২
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


এইরকম একটানা বৃষ্টি হলে আমার ছোটবেলার কথা খুব  মনে পড়ে। তখনও এইরকম একনাগাড়ে বৃষ্টি হলে ঘরে বসে কাটতো ভাই,বোন, মায়ের সঙ্গে লুডো, দাবা, ব্যাগাডুলি খেলে আর কবিতা পড়ে। তখন আমাদের কারো বাড়িতেই টিভি ছিল না। টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হলে আমরা স্কুলেও যেতাম না। অনেক সময় স্কুলে গিয়ে রেইনি ডে হয়ে যেত। সঙ্গে ছাতা থাকলেও কিছুটা ইচ্ছে করেই  চুপচুপে হয়ে ভিজে বাড়ি ফিরতাম।বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালো লাগত আমার।  বাবা অফিসে যেত। ছুটির দিন সবাই ঘরে গল্প গুজবে কাটত।বাবা তাস খেলা শিখিয়েছিল এইরকম এক বৃষ্টির দিনে। আমরা সবাই খিচুড়ি পছন্দ করতাম বলে যে কোনো ছুঁতোয় আমাদের বাড়িতে  খিচুড়ি হতো , আর এরকম বৃষ্টির দিন হলে তো কথাই নেই। এখনকার মত তখন সব সবজি বারোমাস পাওয়া যেত না বিশেষ করে  শীতকালের সবজি। মা বর্ষার জন্য  শীতের বাঁধাকপি খুব সুন্দর কেটে শুকিয়ে যত্ন করে কাচের বয়ামে রেখে দিত, একটুও নষ্ট হতো না।  বৃষ্টির দিনে খিচুড়ির সাথে সেই বাঁধাকপির তরকারিতে বেশ স্বাদবদল হত মনে পড়ে, সেই সাথে থাকত পাঁপড় ভাজা। আমাদের বাড়িতে অনেক গাছপালা ছিল।  নারকেল,  সুপারি,  কাঁঠাল, পেয়ারা, শিউলি, কুন্দ, জবা, কাঞ্চন, করবী,টগর ইত্যাদি। বর্ষাকালে নানা রঙের দোপাটি ফুল ফুটতে আমাদের উঠোন জুড়ে। এত গাছ পালায় বৃষ্টির দিনে আরও অন্ধকার হয়ে থাকত চারপাশ। অনেক সময় বৃষ্টি থেমে গেলেও গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে জল ঝরতো। একটানা ব্যাঙ ডাকত। কাকগুলো গাছের ডালে বসে অকাতরে ভিজতো। তখন খুব  লোডশেডিং হতো। বৃষ্টির রাত্রে ঠাকুমার কাছ ঘেঁষে বসে কত গল্প শুনতাম। তখন বাবা মাও আমাদের অনেক গল্প বলতো।একটানা বৃষ্টি হলে এক অকারণ  মন খারাপ ঘিরে থাকত আমাকে। আনন্দ ,মজা ,গল্প সবই হতো কিন্তু  কিসের জন্য  মনের  সেই বিষণ্ণতা বুঝতে পারতাম না। এখনও বৃষ্টি হলে আমার মন খারাপ করে ।এখন মায়ের কথা,  বাবার কথা ,হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার কথা মনে পড়ে খুব কান্না পায়।

এইরকম একটানা বৃষ্টি হলে আমার ছোটবেলার কথা খুব  মনে পড়ে। তখনও এইরকম একনাগাড়ে বৃষ্টি হলে ঘরে বসে কাটতো ভাই,বোন, মায়ের সঙ্গে লুডো, দাবা, ব্যাগাডুলি খেলে আর কবিতা পড়ে। তখন আমাদের কারো বাড়িতেই টিভি ছিল না। টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হলে আমরা স্কুলেও যেতাম না। অনেক সময় স্কুলে গিয়ে রেইনি ডে হয়ে যেত। সঙ্গে ছাতা থাকলেও কিছুটা ইচ্ছে করেই  চুপচুপে হয়ে ভিজে বাড়ি ফিরতাম।বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালো লাগত আমার।  বাবা অফিসে যেত। ছুটির দিন সবাই ঘরে গল্প গুজবে কাটত।বাবা তাস খেলা শিখিয়েছিল এইরকম এক বৃষ্টির দিনে। আমরা সবাই খিচুড়ি পছন্দ করতাম বলে যে কোনো ছুঁতোয় আমাদের বাড়িতে  খিচুড়ি হতো , আর এরকম বৃষ্টির দিন হলে তো কথাই নেই। এখনকার মত তখন সব সবজি বারোমাস পাওয়া যেত না বিশেষ করে  শীতকালের সবজি। মা বর্ষার জন্য  শীতের বাঁধাকপি খুব সুন্দর কেটে শুকিয়ে যত্ন করে কাচের বয়ামে রেখে দিত, একটুও নষ্ট হতো না।  বৃষ্টির দিনে খিচুড়ির সাথে সেই বাঁধাকপির তরকারিতে বেশ স্বাদবদল হত মনে পড়ে, সেই সাথে থাকত পাঁপড় ভাজা। আমাদের বাড়িতে অনেক গাছপালা ছিল।  নারকেল,  সুপারি,  কাঁঠাল, পেয়ারা, শিউলি, কুন্দ, জবা, কাঞ্চন, করবী,টগর ইত্যাদি। বর্ষাকালে নানা রঙের দোপাটি ফুল ফুটতে আমাদের উঠোন জুড়ে। এত গাছ পালায় বৃষ্টির দিনে আরও অন্ধকার হয়ে থাকত চারপাশ। অনেক সময় বৃষ্টি থেমে গেলেও গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে জল ঝরতো। একটানা ব্যাঙ ডাকত। কাকগুলো গাছের ডালে বসে অকাতরে ভিজতো। তখন খুব  লোডশেডিং হতো। বৃষ্টির রাত্রে ঠাকুমার কাছ ঘেঁষে বসে কত গল্প শুনতাম। তখন বাবা মাও আমাদের অনেক গল্প বলতো।একটানা বৃষ্টি হলে এক অকারণ  মন খারাপ ঘিরে থাকত আমাকে। আনন্দ ,মজা ,গল্প সবই হতো কিন্তু  কিসের জন্য  মনের  সেই বিষণ্ণতা বুঝতে পারতাম না। এখনও বৃষ্টি হলে আমার মন খারাপ করে ।এখন মায়ের কথা,  বাবার কথা ,হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলার কথা মনে পড়ে খুব কান্না পায়।

শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০

নস্টালজিয়া ১১ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ১১
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


এবারের মত বিষণ্ণ স্বাধীনতা দিবস জন্মাবধি আমি কাটিয়েছি বলে মনে পড়ল না। একদিকে করোনার আবহ আর অন্যদিকে জীবন ও জীবিকার সঙ্কটে মানুষ আজ বড়ই নাজেহাল। আজ সারাদিন বৃষ্টি মন খারাপকে আরও বাড়িয়ে দিল। বারে বারে মনে পড়ছিল ছোটবেলার জাতীয় পতাকা উত্তোলনের রোমাঞ্চ, স্কুলের প্যারেড, ভোরবেলায় স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আনন্দ ঘেরা দিনগুলোর কথা। খুব নিচু ক্লাসে সাদা স্কার্ট আর একটু বড় হলে আমাদের লালপাড় সাদা শাড়ি পরতে হতো। এই দিন পাড়ায় পাড়ায় শোভাযাত্রা বের হতো।সব পেয়েছির আসর থেকে  ব্যান্ড বাজিয়ে পথ পরিক্রমা বের হতো। প্রত্যেক বাড়ির সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে এই কুচকাওয়াজ দেখত। পাড়ায় প্রায় সবার বাড়িতে এদিন ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকা  উত্তোলন করা হত।  পাড়ায় পাড়ায় মাইক্রোফোনে বাজত দেশাত্মবোধক গান। ঐ সময় বন্দেমাতরম্ গানটির মধ্যে কী এক উদ্দীপনা জাগাত আমার মনে !  একটু বড় হলে আনন্দমঠ পড়ে দেশপ্রেমের রোমাঞ্চ অন্তরে অনুভব করেছিলাম। স্বাধীনতা  দিবসে 'একসূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন ' এই গানটি আমরা স্কুলের সবাই মিলে একসাথে  গাইতাম ।পতাকা উত্তোলনের সময় দেশমাতার আশীর্বাদ হয়ে যেন  ঝরে পড়ত পতাকায় জড়ানো গোলাপের পাঁপড়ি। একবার এই স্বাধীনতা দিবসে  মা বেশ সহজ করে বলেছিল 'স্ব' এর অধীনতা মানে কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতা নয়। বাবা বলেছিল  স্বাধীনতার অর্থ অন্যের যাতে ভালো হয় সেটা দেখতে হয়। এখন চারিদিকে ঘৃণ্য স্বার্থপরতা,  নিজের আখেরটুকু গোছাতে ব্যস্ত অধিকাংশ মানুষকে দেখে ছোটবেলায় শেখা স্বাধীনতার অর্থবহ কথাগুলো আরো বেশি করে মনে বাজে।

শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২০

নস্টালজিয়া ৯ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৯
পৃথা চট্টোপাধ্যায়


আমার ছোটবেলার দিনগুলো নিত্য নতুন আনন্দের আয়োজনে আপনা থেকেই সাজতো। প্রায় প্রতিটি দিনেই কী ভাবে যে আনন্দের উৎস মুখ খুলে যেত আজও তার হদিস মেলেনি।  রাত্রে শুতে যাওয়ার সময় ভাবতাম কাল তো  নতুন কিছুই নেই,  শুধু পড়াশোনা,  স্কুল আর বাড়ি। কিন্তু,  পরদিন ঘুম থেকে উঠতেই মা  যখন  বলতো , আজ থেকে ঝুলনযাত্রা শুরু হচ্ছে। ব্যস ! মনের আগল যেত ভেঙে , তোলপাড়  শুরু হতো আনন্দে। ঝুলন সাজাতে হবে, চার-পাঁচ দিন ধরে ঝুলন থাকবে! আমাদের দেওয়াল আলমারিতে যত খেলনা পুতুল সেই সকালেই সব নামাতাম। বিভিন্ন মেলা থেকে কেনা অনেক ধরনের মাটির পুতুল ছিল আমাদের। লালবাগকে মেলার শহর বললে কিছু ভুল বলা হতো না। তখন সারা বছর জুড়ে কত রকমের মেলাই না হত আমাদের ওখানে।  রথের মেলা, মহরমের মেলা, বেড়ার মেলা, ঈদের মেলা,স্নানযাত্রার মেলা, শ্মশান কালীর মেলা ইত্যাদি। জানলার কাছে একটা চৌকিতে ঝুলন সাজাতাম।সেখানে মাটি মাখানো কাপড় দিয়ে পাহাড় তৈরি করে নিচে গাছের ডালপালা পুঁতে বনভূমি করতাম। ঘাসসুদ্ধ মাটির চাপ তুলে এনে বসাতাম খেলার মাঠ,  জমি করতে।  বাটিতে জল দিয়ে পুকুর করতাম।  তাতে কিছু জলজ পাতা রাখতাম।  প্লাস্টিকের হাঁস সেই জলে ভাসাতাম, কলসি কাঁখে মেয়ে বসাতাম সেখানে জল আনতে। এই ঝুলনে অনেক দৃশ্য সাজাতাম আমরা, যার যেমন খেলনা পুতুল থাকত সেইমত। বাজারে ফলমূল,  শাকসবজি বিক্রেতা, বিয়ে বাড়ি, ফুটবল খেলা, গ্রামের দৃশ্য , জুতোর দোকান ইত্যাদি। এখানে প্রতিটি দৃশ্যই আমাদের চেনা জীবন থেকে নেওয়া হতো। একটা সুন্দর দোলনায় ঝোলানো হত রাধাকৃষ্ণকে।দোলনাটি আমরা ফুল দিয়ে সাজাতাম আর একটা দড়ি বেঁধে মাঝে মধ্যে আড়াল থেকে সুতো দিয়ে টানতাম সেই দোলনাটি।বন্ধুরা পাড়ায় একে অন্যের ঝুলন সাজান  দেখতে যেতাম। কার ঝুলন বেশি সুন্দর সাজানো হয়েছে দেখতাম।আমার মামার বাড়ি গোকর্ণে মানুষ ঝুলন হতো, তাও দেখেছি। নশিপুরের রাজবাড়িতে সুন্দর ঝুলন সাজান হত এবং সেই সময় ভিতরটা দর্শকের জন্য খুলে রাখা হতো।নশিপুরে খুব বড় ঝুলনের মেলা হত। এই রাজবাড়ির ভিতরে দশদিকে ছিল দশাবতারের মূর্তি আরও অনেক দেবতার মূর্তি। এইদিন আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখতাম। রাজবাড়ির নির্দিষ্ট পুরোহিত থাকতেন এবং তখন নিয়মিত পূজার্চনা হত দেখে বোঝা যেত। এরপর আমরা মেলায় পাঁপড়,  জিলিপি, বাদামভাজা আরও টুকটাক কত কি খেতাম। কোনো কিছু কেনাকাটার বায়না ছিল না আমাদের। দু একটা  মাটির পুতুল ছাড়া কিছু কিনতামও না। মেলায় বেড়ানোর নির্মল আনন্দে মন প্রাণ ভরিয়ে আমরা যখন  ঘরে ফিরতাম তখন ঝুলন পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চরাচর ভেসে যেত।

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

সুপ্রভা আলোয় || পৃৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায় || কবিতা

সুপ্রভা আলোয় 
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


মন কেমন করা রোদ্দুরের জন্য অপেক্ষা করি
         পুবদিকের জানলা দিয়ে বাতাস আসে
                    নিঝুম চারিধার
ভোরের সুপ্রভা আলোয়
 কতদিন দেখি  নি তোমার মুখ
                                   মনে করতেই
   একটা বসন্তবৌরি শিস্ দিয়ে উড়ে চলে গেল
ভেসে যাওয়া এক টুকরো মেঘে
                ক্রমশ ফুটে ওঠো তুমি
                       বড়ো বিষণ্ণতা ঘেরা 
হিমশীতল নির্জন হাত ছুঁয়ে যায় শূন্য দেওয়াল
      ভেসে যেতে দেখি
                                 আমার  ইহকাল পরকাল

শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২০

নস্টালজিয়া ৮ || পৃথা চট্টোপাধ্যায়

নস্টালজিয়া~ ৮
পৃথা চট্টোপাধ্যায়


আমার ফিরে দেখার আনন্দের স্মৃতির কুলুঙ্গিতে একটি মধুর সঞ্চয় বড়নগরে মাসির বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া। ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরের ছায়া সুনিবিড় স্নিগ্ধ এই গ্রামটি ছিল একসময়ে নাটোরের রানি ভবানীর জমিদারির অন্তর্গত। বড়নগর জায়গাটি রানির খুব প্রিয় ছিল বলে তিনি  জীবনের শেষ ভাগ এখানেই কাটিয়েছিলেন।  শুনেছি সেকালে বড়নগর  ছিল মুর্শিদাবাদের বারাণসী। ঐ রাজবাড়ির ছোটছেলে (প্রমিতি  মেসোমশাই) সঙ্গে আমার মায়ের খুড়তুতো বোন  মনামাসির বিয়ে হওয়ার সুবাদে আমাদের সেখানে যাতায়াত ছিল।  মেশোমশাইও  প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়িতে।  খুব শান্ত শিষ্ট অমায়িক ব্যবহার ছিল এই সুপুরুষ স্নেহময় মানুষটির। মা খুব যত্ন করত প্রমিতি মেসোমশাইকে। আমার মা বাড়িতে  আত্মীয় স্বজন এলে খুব খুশি হত এবং ভালো ভালো পদ রান্না করে খাওয়াতে ভালবাসত।  আমার মায়ের সঙ্গে তার খুড়তুতো, পিসতুতো ভাইবোনদের এতটাই আন্তরিকতা ছিল যে কাউকেই  আমার দূরের বলে মনে হয় না আজও। যদিও তখন এই রাজবাড়ির ঐশ্বর্য তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল তবু একটা আভিজাত্য ছিল মেসোমশাই এর মধ্যে। বড়নগরে যেতে আমার ভালো লাগার আর একটা কারণ ছিল আমরা  গঙ্গা নদীতে নৌকা করে যেতাম।  অনেকটা পথ নৌকায় যেতে আমার অপূর্ব অনুভূতি হতো। আমরা খুব সকালে সবাই মিলে রওনা হতাম।  সারাদিন সেদিন অফুরান  আনন্দের মুক্তি। অনেক সময় আমরা জিয়াগঞ্জ বা আজিমগঞ্জ দিয়েও গেছি।  তবে যে পথেই যাই নৌকা যাত্রা থাকতই। গ্রাম্য পরিবেশে একটা বিরাট অট্টালিকা দেখে প্রথমদিন সত্যিই একটু অবাক হয়েছিলাম, তবে সেই রাজবাড়ির তখন ভগ্নদশা প্রায়। মাসির দুটি ছেলেমেয়ে,  তারা আমার ছোট । মাসি -মেসোমশাই  খুব আদর যত্ন করতো আমাদের। মাসির মেয়ে গোপা আমাকে খুব ভালোবাসত। ওখানে পৌঁছে কিছু জলখাবার খেলেই চলে যেতাম  বাড়ি সংলগ্ন মস্ত বাগানে।  সেখানে আমি প্রথম জোড়বাংলা মন্দিরে টেরাকোটার অপূর্ব চিত্র শৈলী দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এই জোড়বাংলা মন্দিরটি গঙ্গেশ্বর শিবের। প্রথমবার মেসোমশাই ঘুরে ঘুরে সব দেখিয়েছিল। আমার এখনও মনে আছে  টেরাকোটার কাজে ঐ  মন্দিরগাত্রে রামায়ণের কাহিনি, কৃষ্ণলীলার দৃশ্য,  সমকালীন সমাজ চিত্র কী নিপুণ দক্ষতায় অপূর্ব নির্মাণ করা হয়েছিল। আমি ঐ সুন্দর পরিবেশের জন্য বড়নগরে মাসির বাড়ি যেতে খুব ভালোবাসতাম।

বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০

নস্টালজিয়া ৭ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৭
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 


সেই কত আগে  ছোটবেলায় মনের আনন্দে ছন্দের দোলায়  পড়তাম "ঋণ জর্জর জীর্ণ জীবনে শরতের উঁকিঝুঁকি /পারে না করতে সুখি/ শ্রাবণের কালো এখনি আলোয় গলবে/ বৃষ্টি শেষের নীল বন্যায় জ্বলবে/ ছিন্ন মেঘের ছন্নছাড়ার দল...'' খুব ভালো লাগত পড়তে, কিন্তু  সেই সময় কিছুতেই  বুঝতে পারতাম না এমন  উজ্জ্বল দিনে কবি কেন সুখি নন! আজ তা অনুভব করতে পারি।  ভাদ্রের  সোনারোদে ঝলমল করতো সকাল, দিন গুনতাম পুজোর । আমাদের বাড়ির কাছেই  ছিল কালীবাড়ি, সেখানেই দুর্গাপুজোও হতো খুব ধুমধাম করে।  এখনকার মতো তখন বারোমাস জামা কাপড় কেনা হতো না আমাদের।  দুর্গাপুজোর সময় নতুন  জামা জুতো, তার সাথে বিছানার চাদর,  ঘরের পর্দার ছিট ইত্যাদিও কেনা হতো। মা সুন্দর ছিটকাপড় কিনে নিজে হাতে সেলাই করে পর্দা তৈরি করত।পুজোর আগে কোনো একটা রবিবারে বাবার সঙ্গে আমরা সবাই যেতাম পুজোর কেনাকাটা করতে। সেদিনটা থাকত উৎসাহে ভরা । লালবাগে তখন খুব বেশি দোকান ছিল না, আর সেখানকার জামা কাপড় আমাদের মনোমত হতো না। খাগড়ায় নির্দিষ্ট কিছু দোকান থেকে পছন্দসই বাজার করে আমরা ভাই বোন অপেক্ষা করতাম বাবা কখন খাওয়ার কথা বলবে!মিষ্টির দোকানের সামনে আমাদের গতি বেশ ধীর হয়ে যেত, ভাই এর পা ব্যথা করতো। বাবা আমাদের মনোভাব বুঝতে পারত। পুজোয় বাজার করতে যাওয়ার অন্যতম আকর্ষণই ছিল এইদিন  বাইরে খাওয়া। এখনকার মতো  ফার্স্ট ফুড রেস্টুরেন্টের চল তখন ছিল না, ছিল অসংখ্য ভাল ভাল মিষ্টির দোকান।  সেখানে আমরা ইচ্ছে মতো কচুরি, সিঙাড়া, ছানাবড়া, চমচম , রাজভোগ ইত্যাদি পেটপুরে খেয়ে বহরমপুর থেকে ট্রেনে চড়ে  বাড়ি ফিরতাম। মনে আছে এই মুক্তির আকাশটুকু পেয়ে সেদিন মা ও বেশ খুশি হতো।           
পুজোর আগে প্রতিদিন একবার করে মন্দিরে প্রতিমা তৈরি দেখতে যেতাম। কাপড়ের টুকরো, জরির টুকরো, চুমকি সংগ্রহ করে পরম যত্নে পুতুলের বাক্সে রেখে দিতাম।  যেদিন প্রতিমার  চোখ আঁকা হতো সেদিন আমার একটা আলাদা অনুভব হোতো।  মহালয়ার পর থেকেই উৎসাহের পারদ চড়তো আমাদের, অনেকেই জুটে যেত তখন খেলার সাথি। মাও পুজোর আগে সংসারের  অনেক কাজে ব্যস্ত থাকায় শাসনে শিথিলতা থাকতো আর সেই সুযোগে  আমি  রোদে এতো ছুটোছুটি আর খেলাধুলো করতাম যে  ঠিক সপ্তমী পুজোর দিন জ্বরে পড়তাম। সব আনন্দ মাটি করে ম্লান মুখে রোগশয্যায় সেবার আমার পুজো কাটতো।

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০

নস্টালজিয়া ৬ || পৃথা চট্টোপাধ্যায়

নস্টালজিয়া ৬
পৃথা চট্টোপাধ্যায়


জীবনের  এই এলোমেলো দিনে আরো বেশি করে মনে পড়ে  শৈশব ও কৈশোরের মুহূর্তগুলো । সেই আনন্দের দিনগুলো আজ বারবার  আমাকে পিছু ডাকে। এখন ঘরবন্দি এই শ্রাবণের বৃষ্টিঝরা সন্ধ্যায় সেই ডাক আরও নিবিড় ভাবে মনে বাজে। আমাদের শহরটা একসময়ে নবাবের রাজধানী ছিল বলেই হয়তো নদীর ধারে হলেও এর অবস্থান বেশ উঁচুতে। চারদিকে বন্যা পরিস্থিতি হলেও আমাদের লালবাগে কখনও বন্যা হতো না। তখন  কালবৈশাখীর ঝড় হতো আর বৃষ্টি হলে শিল পড়ত  খুব মনে আছে । পাড়ার ছেলেমেয়েরা ঝড় উঠলেই  ঘরে থাকতাম না, একটু এদিক ওদিক কাছাকাছি বেরিয়ে পড়তাম আম কুড়োনোর লোভে। ওখানে তখন অনেক আমবাগান ছিল পা বাড়ালেই । আমাদের বাড়ির কাজের মাসির মেয়ে মালতির সঙ্গে একবার  অনেকটা দূরে আম কুড়াতে গিয়ে মায়ের কাছে খুব মার খেয়েছিলাম।পরে 'আম আঁটির ভেঁপু'' পড়ার সময় এক নিঃশ্বাসে  গোগ্রাসে পড়েছিলাম বইটা, আর গল্পের  কোনো জায়গা বুঝতে কোনো হোঁচট খেতে হয় নি আমাকে।  মালতি আমাদের বাড়িতেই থাকত তখন সবসময়,  ও যে বাড়ির কেউ নয় তা  কখনোই মনে হতো না। মা মানুষকে খাওয়ানো বা আদর যত্ন করতে কোনো ত্রুটি রাখত না ; আমাদের সঙ্গে একই খাবার দাবার খেতো সেও।  শ্রাবণ মাস শেষ হলে রোদ্দুরের রংটা কেমন পাল্টে যেত বেশ বুঝতে পারতাম ।তখন আমাদের আনন্দের অবধি থাকতো না দুটো কারণে । এক , দুর্গা পুজোর সময় এগিয়ে আসা আর অন্যটা হোলো পুঁটুদিদের বাড়ির মনসা পুজো । পুঁটুদির বোন বুড়ি আমার বন্ধু হলেও ওদের সব ভাই বোনের সাথে আমার খুব ভাব ছিল। ওদের বাড়ির বাগানে আমরা প্রতিদিন বিকেলে  সবাই মিলে খেলা করতাম ।পুঁটুদির কাছে সরস্বতী পুজোর সময় শাড়ি পারতাম। ছোটবেলায় আমার  নিত্য অবাধ যাতায়াত ছিল ওদের বাড়িতে। ওদের বাড়ির মনসা পুজো হতো ভাদ্রমাসে। পুজোর অন্যতম বড়ো আকর্ষণ ছিল মনসার গান । সাতদিন ধরে চলতো সেই মনসামঙ্গল পালা। মজার বিষয় হলো বেহুলা,  মনসা, সনকা এসব চরিত্রে ছেলেরা মেয়ের সাজে অভিনয় করতো আর অভিনয়ের সময় তাদের একটুও ছেলে বলে মনেই হতো না। এই তেওয়ারি বাড়ির মনসা পুজোর কথা আশেপাশের এলাকায় অনেকেই জানতো। খুব ভিড় হতো লোকজনের। ইলেকট্রিক আলোর জোর বেশি থাকতো না এবং ঘনঘন লোডশেডিং হতো বলে হ্যাজাক জ্বালিয়ে চারিদিক আলোকিত করে সন্ধ্যার সময় পালা শুরু হতো আর রাত্রি দশটা পর্যন্ত চলতো। ওদের  চর কুঠিবাড়ির শিষ্যরা আসতো এই মনসা গান করতে একথা ওরাই বলতো। একটা জীর্ণ ম্যাটাডোর করে সবাই আসতো আর আলাদা একটা  সাজের গাড়ি আসতো। পালা সুরুর আগে ওদের গ্রিনরুমের দরজায় আমরা ছোটরা  ভিড় করতাম। একজন হনুমান সেজে আমাদের খুব আনন্দ দিত। আমার ঐ কিশোরী  বয়সে বেহুলার দুঃখ গাথা  মনকে খুব ছুঁয়ে যেত এখনও মনে পড়ে।

বুধবার, ১৭ জুন, ২০২০

নস্টালজিয়া ৩ || পৃৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৩ || পৃৃথা চট্টোপাধ্যায়


আজ লিখতে বসে অনুভব করছি আমার জীবনের শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলোতে শীতকালের আনন্দ ও ব্যাপ্তি কতখানি ছিল । এই শীতের কথা নিয়েই পাতার পর পাতা অনায়াসে লিখে ফেলতে পারি । শীত পড়লেই পিকনিক আর বনভোজনের হিড়িক লাগত আমাদের মনে । শীতকালের  কুল আমার একটি  প্রিয় ফল ছিল । তখন আমাদের কাছে কোনো টাকা পয়সা থাকত না।আত্মীয় স্বজন বেড়াতে এলে যদি দশ বিশ টাকা দিয়ে যেত সেটাই জমিয়ে রাখতাম। তার থেকে কুড়ি ,পঁচিশ বা পঞ্চাশ পয়সা নিয়ে  জুম্মানের  বাগানের কুল কিনে খেতাম বন্ধুদের সাথে । সরস্বতী পুজোর আগে অবশ্য কখনোই কুল খেতাম না।  আমাদের ছোটবেলা এখনকার বাচ্চাদের মতো গৃহবন্দি নির্বান্ধব ছিল না। পাড়ায় অনেক বন্ধু  ছিল । আমরা প্রায় সমবয়সী বা একটু বড় ছোট ছেলে মেয়ে  সবাই মিলে খুব খেলাধূলা করতাম। প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে খেলতাম নানাধরনের খেলা। মা খুব রাগী ছিল বলে মন দিয়ে পড়াশোনা করতেই হতো না হলে খেলার অনুমতি মিলত না। শীতে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বনভোজনের আনন্দই ছিল আলাদা। সবাই বাড়ি থেকে চাল,ডাল, আলু,তেল ,নুন, লঙ্কা, তেজপাতা আর ডিম সংগ্রহ করে একসাথে কাছাকাছি তেওয়ারিদের,সুলতানের অথবা মসজিদের পিছনে ফাক্কু নবাবের বাগানে  বনভোজন করা  হতো। হরেক রকমের চাল ডালের মিশ্রণে সেই খিচুড়ির স্বাদ অমৃত লাগত আর  আমাদের  অপটু হাতের  ডিমের কারির স্বাদের তুলনা মেলা ছিল ভার। পুরো ডিসেম্বর-জানুয়ারি ধরে আমরা যে কতবার বনভোজন করতাম তার হিসাব থাকতো না। আমাদের মায়েরাও সেই সময় এতে বাধা দিত না, বরং উৎসাহ দিত আর মাঝে মাঝেই বড়রা দেখে আসত রান্নার সময়  আমাদের যেন আগুনে কোনো বিপত্তি না ঘটে। এখনকার ছোটদের জীবনযাপন দেখে ,ওদের শৈশবের অনেক আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে দেখে খুব কষ্ট হয়।   শীতকালে ছুটির দিনে বাবার সঙ্গে বাজারে যেতাম। সবজির বাজারে যেতে আমার খুব ভালো লাগত। টাটকা পালং-পিড়িং-মটর-ছোলার শাক, ফুলকপি,বেগুন,বাঁধাকপি,কড়াইশুঁটি,বিট,গাজর,
টমেটো ইত্যাদি শাক সবজির  রঙিন সমাহার আমার মন ভরিয়ে দিত। মাছের বাজারে জ্যান্ত ছোট মাছ ট্যাংরা, শোল, মৌরলা,  কই,খয়রা,রায়খয়রা,  পুঁটি, দেশি রুই, কাতলা, চিংড়ি  এসব দেখেশুনে কিনত। বাবা খুব ভালো রান্না করতে পারত আর ভোজন রসিক ছিল বলে বেশ গুছিয়ে বাজার করতো। আমার এখনো বাজার করতে ভালো লাগে তবে এখন বারোমাস সবকিছু পাওয়া যায় বলে শীতের বাজারের আর  আলাদা কোনো আকর্ষণ নেই আমার কাছে ।রবিবার খাসির মাংস ছিল বাঁধা, হবেই।ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে  মুরগির মাংস হতো না,বাবা মোটেই পছন্দ করতো না বলেই হয়তো । খুব  মশলাদার ঝাল রান্না হত আমাদের বাড়িতে । এদেশের মানুষ হলেও আমাদের বাড়ির রান্না একটু ভিন্ন নবাবি ধরনের ছিল ।পোলাও,  বিরিয়ানি, চিংড়ির মালাইকারি  আমার ঠাকুমা, বাবা,  কাকা সবাই অসাধারণ  রান্না করত। বাবা মারা যাওয়ার পর মা সেভাবে আর রান্না করতে পারত না । সবকিছু বাবার মতে হতো বলে মা  প্রায়ই ভুলে যেত রান্নার উপাদানগুলো । তবে মা ঘিভাত খুব ভালো  রান্না করতো।   আমাদের ওখানে তখন গোবিন্দভোগ নয় , কামিনীভোগ চালের চল বেশি ছিল ।  মা পুষ্পান্ন বলতো  ঘিভাতকে আর  গোপাল ঠাকুরকে  প্রায়ই এই পুষ্পান্ন ,পায়েসের ভোগ দিত তাতে আমাদেরও ভালই পেটপুজো  হতো।

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

নস্টালজিয়া ২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ২
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



ঐতিহাসিক এই শহরের কথা ভাবলেই চোখের সামনে যেমন মসজিদ, মন্দির,কালীবাড়ি, ইমামবাড়া, হাজারদুয়ারির ছবি ফুটে ওঠে, কানে ভেসে আসে আজানের সুর তেমনি মনে পড়ে স্রোতস্বিনী গঙ্গার কথা। গঙ্গা নদীর জলস্ফীতি দেখা যেত বর্ষাকালে। কিন্তু বর্ষা  নয় ,আমার মন জুড়ে আছে শীতকাল। এই সময় কুয়াশাঘেরা  ভোরবেলায়  শীতে কাঁপতে কাঁপতে  আমরা প্রায়ই টাটকা ঠান্ডা খেজুরের রস খেতাম।বাগানের গাছ থেকে  মাটির কলসিতে সদ্য পেড়ে আনা সেই খেজুর রসের স্বাদ ও খাওয়ার আনন্দ  ছিল অতুলনীয়। হাড় হিম করা ঠাণ্ডা পড়ত এখানে। আমরা খুব মোটা আর ভারি লেপ গায়ে দিতাম আর মা দুপুরে প্রতিদিন ঐ ভারি লেপ টেনে ছাদে রোদ্দুরে দিত গরম হতে।এখানকার পুরোনো বাড়িগুলোর দেওয়াল ছিল বাংলা ইঁটের তৈরি চওড়া,  কড়ি বারগার সিলিং,খিলানের বারান্দা মোটা থামওয়ালা। আমাদের ঘরগুলো শীতের সময় ফ্রিজের ভেতরের মতো ঠান্ডা হয়ে থাকত। বাবা বরাবর মর্নিংওয়াকে যেত।শীতের হি হি ঠাণ্ডায় এই মর্নিংওয়াকে যাওয়া নিয়ে বাবার সাথে মায়ের প্রায়ই ঝামেলা হত। শীতে সকালে বিছানায় শুয়ে শুয়েই আমরা শুনতে পেতাম  রাস্তায় দলে দলে লোকজনের  চলাচলের শব্দ। রাস্তার ধারে বাড়ি হওয়ায় কানে আসত তাদের টুকরো কথাবার্তা বা গানের কলি। ক্রমশ ঘোড়ার গাড়ির আওয়াজ আর রিক্শার শব্দ বাড়তে থাকত। শীতকালে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসতো এই অতি প্রাচীন ঐতিহাসিক জায়গায় বেড়াতে,  পিকনিক করতে। যাত্রীবোঝাই টাঙাওয়ালা তার হাতের চাবুকের লাঠিটা চাকায় লাগিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ তুলে মনের আনন্দে সেই সাতসকালেই খুব জোরে  গাড়ি ছোটাতো আর শহুরে যাত্রীরা আর্তনাদ করে উঠতো প্রথম টাঙায় চাপার ভয় মিশ্রিত  আনন্দে। পঁচিশে ডিসেম্বর, পয়লা জানুয়ারি বা শীতকালের শনি-রবিবারগুলো  কাটত আমাদের প্রকৃত ছুটির আনন্দে মেলার মজায়। গাছপালায় ঘেরা এই শহরের শীতের  দিনগুলো আরও মোহময় হয়ে উঠত নতুন গুড়ের সৌরভে।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...