বুধবার, ৫ মে, ২০২১

নস্টালজিয়া ৪৪ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৪৪

পৃথা চট্টোপাধ্যায়




আমার ছোটবেলার দিনগুলোতে দেখতাম পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে একটি সৌহার্দের সম্পর্ক ছিল।
সদ্য বাংলাদেশ থেকে আসা প্রতিবেশী একটি পরিবারের একজন জেঠিমা ( বুন্নাদির মা) আসতো আমাদের বাড়িতে। সব্জি কাটা হলে যে খোসা ছাড়িয়ে ফেলে দেওয়া হতো সেগুলো আর ভাতের ফ্যান নিয়ে যেত। তার বাড়িতে ছাগল ছিল। সেই ছাগলের খাবারের জন্য সেগুলো নিয়ে যেত। একদিন হঠাৎ করে আমি কোনো কারণে তার বাড়িতে গিয়ে দেখি সেই জেঠিমা আমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া বিভিন্ন সবজির খোসা কুচিকুচি করে কাটছে। আমাকে বলেছিল এগুলো তারা ভেজে বা বেঁটে কড়াইতে তেল দিয়ে নেড়েচেড়ে ভাতে মেখে খায়। আমি মাকে এসে কথাটা বলেছিলাম। তারপর থেকে মা ইচ্ছাকৃতভাবে ঐ জেঠিমাকে শুধু সব্জির খোসা না, অনেক সময় আলু, পটল, লাউ ,কুমড়ো দিয়ে দিত। তখন জিনিসপত্র এত অগ্নি মূল্য ছিল না। আমার বাবা বরাবর বেহিসেবি বাজার করত। ঐ পরিবারের সঙ্গে একটা সৌহার্দের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
আমাদের বাড়ি ছিল বেশ পুরোনো, দাদুর আমলের। বাংলা ইঁটের , খিলানের বারান্দা। কড়ি বর্গার ছাদ। আগেকার চুন সুরকির গাঁথুনি। বর্ষাকালে প্রতিবছর ছাদ সারাতে হতো না হলে ঘরে জল পড়তো ।এছাড়াও বারোমাস রাজমিস্ত্রির কিছু না কিছু কাজ লেগেই থাকতো।কাপাসডাঙার আবের, মান্নান এইসব মিস্ত্রিরা কাজ করতো।তারা আমাদের ঘরের লোকের মতো ছিল। বাড়ি থেকে ভাত তরকারি আনলেও মা তাদের তরকারি, মাছ ইত্যাদি দিত। বারবার চা ,বিস্কুট । লোকজনকে খাওয়াতে বাবা মা দুজনেই খুব ভালো বাসতো। মেঘুকাকু ছিল আমাদের বাড়ির ধোপা।একদিন পরপর আসতো কাপড় নিতে। বাবা তখন আদ্দির ধুতি আর হাফ সার্ট বা ফুল সার্ট পরতো। মেঘুকাকু আমাদের স্কুল ড্রেস বাবার জামা কাপড়, মায়ের তাঁতের শাড়ি একগাদা করে রোজ নিয়ে যেত, একটা খাতা ছিল হিসেবের। মা খুব গম্ভীর মুখে এই সব হিসেব রাখতো আর মাসের শেষে মেঘুকাকুকে টাকা দিতো। মেঘুকাকু ছিল আমাদের বাড়ির পুরোনো ধোপা। তার বাবা আগে আসতো। আমি মেঘুর ছেলেকেও দেখেছি মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে সে আসতো। মেঘুকাকু প্রায়ই ভাত খেতো আমাদের বাড়িতে। আমার মা সকলকে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতো। কোনো জাতপাতের কথা এ প্রসঙ্গে ছিল না। বহরমপুর গার্লস কলেজে হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছি। আমার প্রিয় বন্ধুদের বাড়িতে ঈদের সময় গেছি ভাবতায়। ওদের বাড়িতে আদর যত্ন আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়েছি। সায়রা, সরিফার মায়ের স্নেহ আর আমার মায়ের স্নেহের মধ্যে কোনো তফাৎ খুঁজে পাই নি। লালগোলায় বেগমপারা(জলি)র দিদির বিয়েতে গিয়ে কত আনন্দ করেছি। প্রায় সব বন্ধুই আমার বাড়িতে আসতো। বন্ধু বিষয়ে আমি বরাবরই খুব দুর্বল। তাদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে আমার চিরকালই ভালো লাগে।সেখানে হিন্দু মুসলিম এইসব ভাবনা জীবনে মনেই আসে নি কখনো। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Anandamangal, আনন্দমঙ্গল ।। সৌমিত্র রায়

 Anandamangal, আনন্দমঙ্গল