মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩১ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৩১

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



শীত ঘনিয়ে এলেই আমার মনে পড়ে ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির উঠোন জুড়ে ফুটে থাকা গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা ফুলের কথা । একটা কুন্দফুলের গাছ ছিল বাড়ির উঠোনের ঠিক মাঝখানে। হেমন্ত ঋতু থেকেই ছোট ছোট সাদা ফুলে ভরে থাকত সেই গাছ। শীতের কুয়াশাভেজা সকালে গাছ ভরে ফুটে থাকা কুন্দ ফুলের স্নিগ্ধ মাধুর্যে আমার মন প্রসন্ন হয়ে যেত। আমরা বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতাম।বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা মা মোটেই পছন্দ করত না। ঘুম থেকে উঠেই আমি গাছের কাছে যেতাম। পাতায় পাতায় হিমের পরশ, কুয়াশার জল ছুঁয়ে দেখতাম। এখনও আমি ছোটবেলার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য টবে কুন্দ ফুলের গাছ লাগিয়েছি, কিন্তু সেরকম ফুল আর ফোটে কই! আমি ছাড়া সেই গাছের প্রতি আগ্রহ আর কারো তেমন নেই।
এই শীতের অনুসঙ্গে মিশে আছে নতুন ওঠা খেজুর গুড়ের(নলেন গুড়) সুগন্ধ। লালবাগে আমার ছোটবেলায় শীত পড়ত জাঁকিয়ে। সেই সঙ্গে ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকত চারধার। পায়েস, পিঠে, পুলি সবই নতুন গুড়ের। আমাদের বাড়িতে এই শীতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো খাবার তৈরি করত মা, আর খেজুর গুড়ের সুগন্ধে ঘরবাড়ি ম' ম' করতো। বাবা চেনা লোকের কাছ থেকে খেজুরের আসল ঝোলা এবং পাটালি গুড় কিনে আনত।আমাদের ওখানে গোবিন্দভোগ নয়, কামিনীভোগ চালের চল ছিল। নতুন চাল আর নতুন গুড়ের পায়েসের স্বাদ ছিল অনন্য। তবে মায়ের একটা বিষয় ছিল এই , যা কিছু মিষ্টান্ন দ্রব্য বাড়িতে তৈরি হবে দেবতাকে নিবেদন না করে খাওয়া যাবে না। যতই লোভাতুর চোখে আমরা তাকিয়ে থাকি না কেন মা তাকে মোটেই গুরুত্ব দিত না।বাবা ইশারায় বলত মা রেগে যাবে আগে খাওয়ার কথা বললে। সব তৈরি হলে আগে ঠাকুরকে নিবেদন করে তবে খাওয়া যেত। ততক্ষণ আমরা অপেক্ষা করতাম। আমাদের বাড়িতে চারটে নারকেল গাছ থাকায় পিঠে -পুলি- পাটিসাপ্টা তৈরির জন্য নারকেল কিনতে হতো না। আমার ঠাকুমা আবার চাল অথবা ময়দা গুঁড়ো মেখে চুষি তৈরি করে রাখতো। সাংসারিক কাজকর্ম শেষ করে গল্প করতে করতে কী অনায়াসে দ্রুত হাতে সমান মাপের এই চুষি তৈরি করত আমার ঠাকুমা( আমি অবশ্য তাকে' দাদা' ডাকতাম) দেখে তখনো খুব অবাক হয়ে যেতাম। খুব সময় সাপেক্ষ আর ধৈর্যের ব্যাপার এই চুষি তৈরি করা, কারণ হাতে করে সরু সরু চালের মত তৈরি করতে হয়। তারপর রোদ্দুরে শুকিয়ে রাখতে হয়। আমিও ছোটবেলায় শীতের রোদ্দুর গায়ে মেখে ঠাকুমা, মা এদের কাছে বসে চুষি তৈরি করতাম। এই সময় কখনো ছোট্ট পাখি তৈরি করে মা আমাদের উৎসাহিত করত, পিঠে পায়েসে আমরা সেই পাখিটি ভাগে পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে যেতাম। এইরকম কত তুচ্ছ বিষয় ঘিরে আমাদের আনন্দ ছিল আজ সেই সব কথা মনে পড়ে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নস্টালজিয়া ৩২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

  নস্টালজিয়া ৩২ পৃথা চট্টোপাধ্যায় নস্টালজিয়া ৩২ পৃথা চট্টোপাধ্যায়  আমার শৈশবের বেশ কিছুটা সময় কেটেছিল সাগরদিঘিতে। বাবা তখন ওখানে  বিডিও অফিস...