পৃৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পৃৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৩ মার্চ, ২০২১

ন্যানো টেক্সট ৩৯,পৃৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায়

 নস্টালজিয়া ৩৯

পৃথা চট্টোপাধ্যায়

নস্টালজিয়া ৩৯
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

বসন্তের দিন এলে এক অপূর্ব অনুভূতি হয় মনে। সেই অনুভব যে কী বলতে পারি না, শুধু বুঝতে পারি। দখিন হাওয়ায় ভেসে আসা লেবুফুলের গন্ধ আমাকে টেনে নিয়ে যায় শৈশবের বেড়ার ধারে যেখানে ফুলের ভারে নুয়ে পড়ে বাতাবিলেবু আর সজনের ডাল। আমের গাছে থোকা থোকা মুকুল ঘিরে মৌমাছিদের ওড়াউড়ি। শিবরাত্রির সময় এলে মসজিদের পাশে আমাদের বেলতলার সেই ফাঁকা জায়গায়, তেওয়ারিদের বাগানে অথবা মাঠে ঘাটে ফুটে থাকত ভাটফুল, আকন্দ। গঙ্গার ঘাটে স্নান করতে যাওয়ার পথে মা আমাকে সাদা দ্রোণপুষ্প চিনিয়েছিলো। এই সময় হাবুলকাকুদের বাড়ির গেটে থাকত বোগেনভেলিয়ার বাহার আর ছন্দাপিসিদের সদর দরজায় মালতীলতার শোভা। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনের ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতাম। কখনো সাজি নিয়ে ফুল তুলতে যেতাম দীপককাকুর বাড়ির বাগানে। অনেক জবা, গন্ধরাজ, বেলফুলের গাছ ছিল সেখানে। শরতে ঘাসের উপর বিছিয়ে থাকত শিউলি। নিঃসন্তান দীপককাকুর স্ত্রী বেশ সুন্দরী ছিলেন। আমরা তাদের বাগানে ফুল তুলতে গেলে কিছু বলতেন না। বরং অনেক সময় জবা গাছের উঁচু ডাল নুইয়ে দিতেন আমাকে। সুন্দরী সেই মহিলার মুখে সবসময় একটা দুঃখের ছায়া ঘিরে থাকতো।
                 খুব ছোটবেলায় বহুরূপী দেখেছিলাম আমি সাগরদিঘিতে থাকার সময়ে। পরে লালবাগে, বহরমপুরে, শক্তিপুরে মাসতুতো দিদির বাড়িতে যাওয়ার সময় ট্রেনে বহুরূপী দেখেছিলাম মনে আছে। বাড়ি বাড়ি ঘুরত তারা কোনো দিন শিব, কোনো দিন কালী, কোনো দিন বা কৃষ্ণ, হরগৌরী অথবা হনুমান সেজে। এই বহুরূপীরা দরিদ্র মানুষ হলেও তখন তাদের মধ্যে কী এক প্রাণের স্পন্দন ছিল বলে আমার মনে হতো। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার সঙ্গে তাদের জীবন ও জীবিকার বিষয়টি যে বহুরূপী সাজের অন্তরালে ছিল একথা একটু বড়ো হয়ে বুঝতে শিখেছি ; বাবা বলেছিল সে কথা। এইসব বসন্তের দিনে বহুরূপী আসত বেশি। প্রথম যখন বহুরূপী দেখেছিলাম তখন আমি বেশ ছোট। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তের ছিনাথ বহুরূপীর কথা তখনো পড়ি নি। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় ছিনাথ বহুরূপীর কথা পড়ে খুব ভালো লেগেছিল। আমাদের সময় পাঠ্য বিষয়টিকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারতাম বলে এত দাগ কাটতো মনে। পড়তে ভালো লাগতো সাহিত্যের বিষয়গুলি। এখনকার ছাত্র ছাত্রীরা বাতানুকূল ঘরের আরামে বসে গ্রামের মানুষের কথা অথবা জীবনের ছোট ছোট দুঃখ সুখ আনন্দ বেদনার কথা পড়লেও সেগুলো তাদের মনকে ছুঁতে পারে না। এখনকার অধিকাংশ গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরাও সেই অর্থে কষ্ট করে কম। তাদের মা বাবারাও সন্তানদের সাধ্যমতো আরামের জীবন দিতে চেষ্টা করে। বহির্বিশ্বের রঙিন জীবনের দুনিয়া তাদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। আমাদের দেশের মানুষের কথা, বাংলার প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের কথা, ক্ষুদ্রের মধ্যেও যে মহত্ত্বের গৌরব লুকিয়ে থাকে তার সন্ধান দিতে হবে আমাদের আজকের শিশু কিশোরদের মনে।

শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

সাহিত্যের ধ্রুবপথে এগিয়ে চলার লক্ষ্যে "মৈত্রীদূত" পত্রিকা || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || বাংলার গর্ব ছোটো পত্রিকা-১

সাহিত্যের ধ্রুবপথে এগিয়ে চলার লক্ষ্যে "মৈত্রীদূত" পত্রিকা

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



২০২১ সালকে স্বাগত জানিয়ে 'চরৈবতি' জীবনের এই মন্ত্রটিকে সঙ্গী করে প্রকাশিত হয়েছে কুশল মিত্র সম্পাদিত চতুর্মাসিক সাহিত্য পত্রিকা "মৈত্রীদূত" জানুয়ারি সংখ্যাটি। নানা রঙ রস রূপের অক্ষরমালা সাজিয়ে "মৈত্রীদূত" পত্রিকা এগিয়ে চলতে ব্রতী সাহিত্যের ধ্রুবপথে । এই পত্রিকার কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, অণুগল্প, ভ্রমণ কাহিনী, গ্রন্থ সমালোচনা সব বিষয়গুলি নির্বাচনে সম্পাদকের সুচারু ও সংবেদনশীল মনের পরিচয় পাওয়া যায়।
"মৈত্রীদূত" পত্রিকার বইমেলা ১৪২৭,জানুয়ারি ২০২১ এই সংখ্যায় লিখেছেন প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিক এবং নতুনেরাও। কবিতা বিভাগে রয়েছেন কবি প্রভাত চৌধুরী, গোলাম রসুল, হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়,এবাদুল হক, সুবীর ঘোষ, মন্দিরা রায়, আরণ্যক বসু,দেবার্ঘ্য সেন,তাপস গুপ্ত, সন্দীপন বেরা তাজিমুর রহমান, জগন্ময় মজুমদার,বিধানেন্দু পুরকাইত,গোবিন্দ ব্যানার্জি, সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, অভিজিৎ দাস কর্মকার প্রমুখ।প্রবন্ধ লিখেছেন দীপক সাহা, সুধীর চন্দ্র পাল,নীলিমা চক্রবর্তী কাঞ্জিলাল, সৌম্য ঘোষ, দেবনারায়ন মোদক প্রমুখ, গল্পে ও অণুগল্পে আছেন রামামৃত সিংহ মহাপাত্র, দিলীপ রায়, মৈত্রেয়ী পাল, রবীন বসু,সহেলী সেন চৌধুরী, রম্য রচনা লিখেছেন কল্যাণী সেনগুপ্ত, ভ্রমণ কাহিনী পার্থময় চ্যাটার্জি। গ্রন্থ সমালোচনা করেছেন সর্বেন্দু মৈত্র নিলয় নন্দীর কাব্যগ্রন্থ "বাসন্তিকা বাসস্টপ" এবং রণজয় মালাকার শুভাশিস সান্যালের গল্পের বই "নীরব সংলাপ"।
অসংখ্য পত্রিকার মধ্যে "মৈত্রীদূত" পত্রিকাটি পড়ে ভালো লাগল এখানে প্রবন্ধ বিষয়টিকে সম্পাদক বিশেষ গুরুত্ব সহকারে স্থান দিয়েছেন।সম্পাদক কুশল মৈত্র নিজেও একজন কবি। তাই কবিতাগুলি নির্বাচনে তিনি বিশেষ যত্নবান বলে মনে হয়েছে। ২০২০ সালটি আমাদের স্মৃতিতে ভয়াবহ বিষময় তিক্ততা নিয়ে থেকে যাবে। মৈত্রীদূত পত্রিকার এই সংখ্যায় অনেকের কবিতায় করোনার আতঙ্কের কথা থাকলেও বিভিন্ন বিষয়ে লেখা থাকায় পত্রিকাটি পড়তে একঘেয়েমি মুক্ত বলে মনে হয়। এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে সব লেখক কবির নাম হয়তো করতে পারলাম না এবং সব লেখা নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হলো না বলে আমাকে মার্জনা করবেন।পত্রিকার সম্পাদকীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুশল মৈত্রের প্রাঞ্জল সম্পাদকীয় পড়ে ভালো লাগল। পত্রিকাটিতে বানানের দিকেও বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছে। প্রচ্ছদটিও খুব সুন্দর এবং অর্থবহ। সম্ভব হলে পত্রিকাটি সংগ্রহ করে পড়লে আপনাদেরও ভাল লাগবে।
মৈত্রীদূত:সম্পাদক কুশল মৈত্র
প্রচ্ছদ:অদ্রিজ সরকার
বিনিময় ৬০ টাকা 

শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩৬ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৩৬

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



নস্টালজিয়া ৩৬
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

খুব আশ্চর্য হয়ে যাই আমি নস্টালজিয়া লিখতে বসে, কী করে ছোটবেলার এত কথা আমার মনে পড়ে যাচ্ছে আপনা থেকেই! পুরোন অধিকাংশ কথা বা বিষয় আমি ভুলে যাই। অথচ লিখতে বসলে আজকাল স্মৃতির সরণি বেয়ে আমার শৈশবের অনেক ঘটনা দিব্যি মনে পড়ে যাচ্ছে। তাহলে আমি যাকে ভুলে যাওয়া ভাবি তা হারিয়ে যায় না, মনের মধ্যে কোথাও ঠিক চাপা পড়ে থাকে।
একবার আমার ইচ্ছে হল সাইকেল চালান শিখব। মায়ের আপত্তি ছিল কারণ পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে এই ভয়ে। আমাদের ছোটবেলায় চাইলেই সব কিছু তক্ষুনি পাওয়া যেত না। আর আমি চাইতাম না তেমন কিছু। একটা সাইকেল কিনে দিক বাবা এটা মনে মনে চাইছিলাম কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারি নি । যাই হোক বাবার সাইকেলেই চালানো শিখলাম। প্রথমে হাফ-প্যাডেল তারপরে ফুল প্যাডেল সিটে বসে চালানো। আমার বাবার সাইকেলটা বেশ উঁচু ছিল। প্রথম দিকে সিটে বসে প্যাডেলে পা পেতাম না ,অসুবিধা হত। তাতে অবশ্য কিছু ভ্রূক্ষেপ ছিল না। সাইকেল চালান শেখার সময় একবার হাজারদুয়ারি মাঠে গঙ্গার ধারের রাস্তায় চালাতে চালাতে গড়িয়ে গঙ্গার জলে পড়ে যাচ্ছিলাম প্রায়। বাবা সঙ্গে ছিল। তখনো আমি ব্রেক কষা ঠিকমত শিখিনি। গঙ্গার ধারের পুরোনো রেলিং গুলো অনেক জায়গায় ভাঙা ছিল বলেই এই কান্ড ঘটেছিল। বেশ কয়েক জন ছুটে এসে সাইকেলটা না ধরলে সেই বিকেলে নিশ্চিত একটা বিপদ ঘটত। সাইকেল চালান শেখার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ভাবতাম কখন সাইকেল নিয়ে বেরোব। বাবা সকাল আটটায় অফিসে চলে যেত। মা বেশ রাগী ছিল বলে যথেষ্ট সাবধানে থাকতাম। সকাল থেকে পড়াশোনা ইত্যাদি যা যা আমার করা দরকার তখন মন দিয়ে করে নিতাম যাতে মায়ের কাছে সাইকেল চালানোর অনুমতি পাই। আর একবার সাইকেল নিয়ে বেরোলে সে যে কী মুক্তির আনন্দ তা আজকেও আমার মনে আছে। এক হাত ছেড়ে চালাতে শিখলাম যখন তখন আরো আনন্দ। সাইকেল নিয়ে গঙ্গার ধারে হাজারদুয়ারির মাঠ, দক্ষিণ দরজা, ইচ্ছাগঞ্জ, নশিপুরের দিকে চলে যেতাম। এদিকে তখন বেশ ফাঁকা থাকত রাস্তা। পাঁচরাহা বাজারের দিকে গাড়ি ঘোড়া বেশি ছিল বলে টিউশন পড়তে যাওয়া ছাড়া তেমন যেতাম না। সাইকেল চালানোর আনন্দ ও সেই স্বাধীনতার স্বাদ যে কী মধুর ছিল আমার কাছে তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। আমাকে সাইকেল কিনে দিয়েছিল বাবা ক্লাস এইটে ওঠার পরে। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের পুরস্কার ছিল লাল রঙের হারকিউলিস লেডিজ্ সাইকেল। খুব খুশি হয়েছিলাম সেইদিন। বাবার সাইকেল চালিয়ে অভ্যস্ত আমার কাছে এই সাইকেলটি বেশ নিচু আর চালিয়েও সুখ বলে মনে হত। 

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩১ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ৩১

পৃথা চট্টোপাধ্যায়



শীত ঘনিয়ে এলেই আমার মনে পড়ে ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির উঠোন জুড়ে ফুটে থাকা গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা ফুলের কথা । একটা কুন্দফুলের গাছ ছিল বাড়ির উঠোনের ঠিক মাঝখানে। হেমন্ত ঋতু থেকেই ছোট ছোট সাদা ফুলে ভরে থাকত সেই গাছ। শীতের কুয়াশাভেজা সকালে গাছ ভরে ফুটে থাকা কুন্দ ফুলের স্নিগ্ধ মাধুর্যে আমার মন প্রসন্ন হয়ে যেত। আমরা বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতাম।বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা মা মোটেই পছন্দ করত না। ঘুম থেকে উঠেই আমি গাছের কাছে যেতাম। পাতায় পাতায় হিমের পরশ, কুয়াশার জল ছুঁয়ে দেখতাম। এখনও আমি ছোটবেলার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য টবে কুন্দ ফুলের গাছ লাগিয়েছি, কিন্তু সেরকম ফুল আর ফোটে কই! আমি ছাড়া সেই গাছের প্রতি আগ্রহ আর কারো তেমন নেই।
এই শীতের অনুসঙ্গে মিশে আছে নতুন ওঠা খেজুর গুড়ের(নলেন গুড়) সুগন্ধ। লালবাগে আমার ছোটবেলায় শীত পড়ত জাঁকিয়ে। সেই সঙ্গে ঘন কুয়াশায় ঢাকা থাকত চারধার। পায়েস, পিঠে, পুলি সবই নতুন গুড়ের। আমাদের বাড়িতে এই শীতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো খাবার তৈরি করত মা, আর খেজুর গুড়ের সুগন্ধে ঘরবাড়ি ম' ম' করতো। বাবা চেনা লোকের কাছ থেকে খেজুরের আসল ঝোলা এবং পাটালি গুড় কিনে আনত।আমাদের ওখানে গোবিন্দভোগ নয়, কামিনীভোগ চালের চল ছিল। নতুন চাল আর নতুন গুড়ের পায়েসের স্বাদ ছিল অনন্য। তবে মায়ের একটা বিষয় ছিল এই , যা কিছু মিষ্টান্ন দ্রব্য বাড়িতে তৈরি হবে দেবতাকে নিবেদন না করে খাওয়া যাবে না। যতই লোভাতুর চোখে আমরা তাকিয়ে থাকি না কেন মা তাকে মোটেই গুরুত্ব দিত না।বাবা ইশারায় বলত মা রেগে যাবে আগে খাওয়ার কথা বললে। সব তৈরি হলে আগে ঠাকুরকে নিবেদন করে তবে খাওয়া যেত। ততক্ষণ আমরা অপেক্ষা করতাম। আমাদের বাড়িতে চারটে নারকেল গাছ থাকায় পিঠে -পুলি- পাটিসাপ্টা তৈরির জন্য নারকেল কিনতে হতো না। আমার ঠাকুমা আবার চাল অথবা ময়দা গুঁড়ো মেখে চুষি তৈরি করে রাখতো। সাংসারিক কাজকর্ম শেষ করে গল্প করতে করতে কী অনায়াসে দ্রুত হাতে সমান মাপের এই চুষি তৈরি করত আমার ঠাকুমা( আমি অবশ্য তাকে' দাদা' ডাকতাম) দেখে তখনো খুব অবাক হয়ে যেতাম। খুব সময় সাপেক্ষ আর ধৈর্যের ব্যাপার এই চুষি তৈরি করা, কারণ হাতে করে সরু সরু চালের মত তৈরি করতে হয়। তারপর রোদ্দুরে শুকিয়ে রাখতে হয়। আমিও ছোটবেলায় শীতের রোদ্দুর গায়ে মেখে ঠাকুমা, মা এদের কাছে বসে চুষি তৈরি করতাম। এই সময় কখনো ছোট্ট পাখি তৈরি করে মা আমাদের উৎসাহিত করত, পিঠে পায়েসে আমরা সেই পাখিটি ভাগে পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে যেতাম। এইরকম কত তুচ্ছ বিষয় ঘিরে আমাদের আনন্দ ছিল আজ সেই সব কথা মনে পড়ে। 

রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৫ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

নস্টালজিয়া ২৫

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



আকাশ দেখতে ভালবাসি সেই কবে থেকে তা আমার মনে পড়ে না। ঘরের মধ্যে বিছানায় শুয়ে আকাশ দেখার নেশা খুব ছোটবেলা থেকেই। এসব ছিল  আমার একান্তই ব্যক্তিগত ভালো লাগা । আমাদের বাড়ির চারপাশে এত ঘরবাড়ি ছিল যে বিছানায় শুয়ে তেমনভাবে আকাশ দেখতে পেতাম না। কিন্তু আমাদের একটা ঘরের দরজা দিয়ে খাটে শুয়ে  প্রতিবেশী গণেশদাদের একতলা বাড়ির ছাদ টপকে ফটো প্রেমের মতো একফালি  আকাশ তখন  দিব্যি  দেখা যেত। আমি আর বোন সেই খাটে শুয়ে  বর্ষার আকাশে  মেঘে মেঘে  কত ছবি আঁকতাম !  ভাগ্যিস আমরা বড় হবার পরে গণেশদার বাড়িটা দোতলা হয়েছিল না হলে আকাশ উপভোগের  ঐটুকু আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতাম। 

বাবার কথা বলতে গেলেই আমার একজন হাসিখুশি  কর্মী মানুষের মুখ ভেসে আসে। আমার ছোটবেলায় বাবা অফিস , সংসারের বাইরের কাজকর্ম নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকত । তবে  অফিস থেকে ফিরে অঙ্ক আর ইংরেজি পড়াতো আমাদের।  ভাইবোনদের মধ্যে  আমাকে বাবা একটু বেশি ভালোবাসত বলে আমার মনে হতো। ছুটির দিনে বাবা আমাদের সঙ্গে সারাক্ষণ কাটাতো, সময় দিত আমাদের। বিকেলে আমরা বাবার সঙ্গে  গঙ্গার ধারে হাজারদুয়ারির মাঠে  বেড়াতে যেতাম। গঙ্গার পারে বসে সূর্যাস্ত দেখতাম আর দেখতাম দলে দলে আকাশপথে বাসায় ফিরে চলেছে পাখির ঝাঁক। অনেক দূরে দূরে ভেসে যেত খেয়া পারাপারের নৌকা। 

ছোটবেলায় মনের ভাবনার কোনো পরিধি থাকে না বলে  মন যা ইচ্ছে তাই ভাবতে পারে। তখন আমিও কত কিছু ভাবতাম এই সব পাখিদের সারাদিনের উড়ে চলা নিয়ে।  সম্ভব অসম্ভবের বেড়াজালে মানুষ আটকে যায় বড় হয়ে বুঝতে শেখার পর। আমার ছোটবেলায় কোনো  জিনিসের চাহিদা ছিল না। কখনও কোনো জিনিসের জন্য আবদার করেছি বলে মনে পড়ে না।  আজও সেই অভ্যাস থেকে গেছে। কোন কিছুই আমার বলে জোর করে  চাইতে পারলাম না বলে বঞ্চিত থেকে গেলাম অনেক কিছু থেকেই ।

বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৩ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৩

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 




আমার  আজকের মনখারাপের এইসব দুপুরগুলো সাজিয়ে রাখি সময়ের তাকে। খুঁজে ফিরি ফেলে আসা কিশোরী দুপুর। পুরোনো বাড়ির কুলুঙ্গিতে হাতড়াই।আমার ছোটবেলার বাড়ির বারান্দায় তিনটে খিলান ছিল,  দরজার  দুপাশে ছিল দুটো  কুলুঙ্গি। ছোটদের জামা বা প্যান্টের পকেটের মতো তাতে  সংসারের  কত কিছু অদরকারি জিনিস যে থাকতো তার হিসেব নেই। আমাদের পুরোনো ঘরের ভিতরেও আগে তিনটে কুলুঙ্গি আর একটা  দেওয়াল আলমারি ছিল। মা ঠাকুমার আয়ত্তে ছিল এইসব কুলুঙ্গি, হাত দিতে মানা ছিল আমাদের সেখানে। তখন খুচরো পয়সার খুব চল ছিল। আমি এক, দুই,  তিন পয়সায় কিছু পাওয়া যেতে দেখি নি। তবে আমি এক,দুই, তিন, পাঁচ, দশ, কুড়ি পয়সা দেখেছি। পাঁচ পয়সা দিয়ে  অনেক কিছুই কেনা যেত আমার ছোটবেলায়। একটা দুই আর একটা তিন এভাবে পাঁচ পয়সা দিলে দোকানিরা নিত।

 আমরা মশলা মুড়ি, বাদাম চাক, শোন পাপড়ি,ঘুগনি, আলুর দম, জিলিপি, চাটনি লজেন্স, সাধারণ কাঠি আইসক্রিম, নানা রকমের আচার, কুল, কামরাঙা, আখড়া, কাঁচা আম মাখা এইসব অতি প্রিয় সুখাদ্যগুলি সুযোগ পেলেই স্কুলে টিফিন টাইমে কিনে খেতাম। তখন এসব বাইরের খাবার খেলে শরীর খারাপ হতো না তো ! মাঝে মধ্যে বাবা  মাকে লুকিয়ে কুড়ি পঁচিশ পয়সা দিত।দু একবার বাবার অলক্ষ্যেও আমি দশ পয়সা নিয়েছি টেবিল থেকে।  তবে বাবা যদি টের পেয়ে যায় সেই ভয়ে দশ পয়সার বেশি নিতে পারতাম না কখনোই।  মা ছোটদের হাতে পয়সা দেওয়া মোটেই পছন্দ করতো না। রোজ টিফিন বক্স  ভরে রুটি ,লুচি অথবা পরোটা,  আলুভাজা, ডিম সিদ্ধ মাঝেমধ্যে, আর কলা এই টিফিন  বরাদ্দ ছিল আমার। আত্মীয় স্বজন এলে যাওয়ার সময় দশ কুড়ি বা পঞ্চাশ টাকা  দিয়ে যেতেন অনেকেই। মায়ের কড়া নির্দেশ ছিল সেই টাকা না নেওয়ার। যদি জোর করে কেউ দিয়ে যেতেন সেটা মাকে দিয়ে দিতাম আমরা। 

আমার ছোটবেলার দিনগুলো বৈচিত্র্যময় ছিল। তাই এক কথা বলতে বলতে অন্য কত কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের নবাবি আমলে তৈরি  বাড়ির ছাতে ঘরের ভিতরটা ছিল কড়ি বর্গার । বিছানায় শুয়ে আমি আর বোন কত গ্রীষ্মের দুপুরে   সেই কড়ি বর্গা গুনতাম।  সেটাও একটা খেলা ছিল। বারান্দায় চড়াই পাখি বাসা করতো সেই কড়ি বর্গা অথবা দেওয়ালে ভেন্টিলেটরের ফাঁকে। মাঝে মাঝেই চড়াই পাখির ডিম মেঝেতে পড়ে ভেঙে যেত,ছোট্ট পাখির ছানা পড়ে যেত বাসা থেকে। আমরা মই অথবা উঁচু টুলে চড়ে অক্ষত ডিম অথবা পাখির ছানা বাসায় তুলে দিতাম। আমাদের বাড়ির উঠোনের এক পাশে মাধবীলতার ঝোপে প্রায়ই টুনটুনি অথবা বুলবুলি পাখি বাসা করতো। আমার ছুটির  দুপুরে ঘুম আসতো না। ঐ সব পাখির বাসা থেকে ডিম বের করে দেখে আবার সেগুলো বাসায় রেখে দিতাম। এই সব পাখির ডিম চড়াই এর ডিমের মতো সাদামাটা  হতো না, খুব সুন্দর সবুজ, নীল, হলুদ ,ধূসর রঙের অপূর্ব মায়া ঘেরা। একবার মা দেখে ফেলেছিল পাখির বাসা থেকে ডিম বের করে দেখা।বকা খাব বলে ভয় পেয়েছিলাম । কিন্তু মা বকে নি বরং বুঝিয়ে বলেছিল পাখির ডিমে  হাত দিলে সেগুলো থেকে আর বাচ্চা ফুটবে না। অনেক সময় সাপ আসে পাখির বাসায় ডিম খেতে। এসব শুনে আমি আর পাখির বাসার ডিমে হাত দিতাম না।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...