পৃৃৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পৃৃৃৃৃথা চট্টোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩৮ || পৃথা চট্টোপাধ্যায়

 নস্টালজিয়া ৩৮

পৃথা চট্টোপাধ্যায়


নস্টালজিয়া ৩৮
পৃথা চট্টোপাধ্যায়

পুজোর ছুটির পরে স্কুল খুললে আমাদের শিক্ষিকারা তখন বেশ গল্প করতেন ক্লাসে। জিজ্ঞেস করতেন ছুটি কেমন কাটল, কোথাও বেড়াতে গেছিলাম কিনা, পুজোয় কেমন আনন্দ হলো,মা দুর্গার সঙ্গে আর কোন্ কোন্ ঠাকুর থাকে , তাদের কার কী বাহন -এইসব অনেক প্রশ্ন। আমাদের শিক্ষিকা মিত্রাদি , ঝর্ণাদি খুব বেড়াতে যেতেন। সেই সব বেড়ানোর গল্প বলতেন আমাদের। খুব ভালো লাগত আমার শুনতে। শেফালিদির মুখটা সবসময় বিরক্তিতে ভরা থাকত কেন জানি না। তবে একবার তিনি বেশ হাসি খুশি ভাবে তাঁর বেড়াতে যাওয়ার গল্প করেছিলেন মনে আছে। আমি পুজোর ছুটিতে বাড়িতেই থাকতাম। বাবা মায়ের সঙ্গে লালবাগে আর বহরমপুরে ঠাকুর দেখা ছাড়া কোনো কোনো বছর মোরগ্রামে মামার বাড়িতে যেতাম। এর বাইরে অন্য কোথাও বেড়াতে যাওয়া হত না আমাদের। বাবার মাইনে পত্র তখন এত বেশি ছিল না যে সংসার চালিয়ে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাবে আমাদের।আর এ ভোজন রসিক ছিল আমাদের বাবা কাকা, তাই খাওয়া দাওয়ার জন্য অনেক খরচ করে ফেলত মনে হয়। একথা অবশ্য আমি বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। বন্ধুরা যখন বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার গল্প বলত তখন খুব ভাল লাগত শুনতে। টিফিন টাইমে তার কাছে যেতাম আরো গল্প শোনার জন্য। 'চাঁদের পাহাড়' বইটা পড়েছিলাম ক্লাস এইটে পড়ার সময়। মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম, আর কতবার যে বইটা পড়েছিলাম বলতে পারব না।
স্কুলে আমার বন্ধু ছিল নিষ্কৃতি, জয়ন্তী, তপতী, মানসী, শুভ্রা । তখন সব প্রাণের বন্ধু । অনেক গল্প হত তাদের সঙ্গে।স্কুল থেকে একসঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতাম আমরা। আমার বাড়ি ছিল সবচেয়ে দূরে। কতদিন এমন হয়েছে স্কুল ছুটির পরে ফেরার পথে ওদের বাড়িতে জল খেতে ঢুকতাম। ওদের মাও আমাকে খুব ভালোবাসতেন এবং না খাইয়ে কখনো ছাড়তেন না। এদিকে আমার বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মা খুব চিন্তা করত।আমরা তখন হেঁটে একসঙ্গে দলবদ্ধভাবে স্কুল থেকে ফিরতাম। বয়েজ স্কুলেরও ছুটি হত একই সময়ে। আমাদের স্কুলের কাছেই ছিল 'লালবাগ সিংহী বয়েজ হাই স্কুল'। ছেলেরা অধিকাংশই সাইকেলে ফিরত। ক্লাস এইট নাইন থেকে প্রেমের মুকুলিত অনুভব ছুঁয়ে ছিল আমার মন। ক্রমশ একটু একটু করে অনুভব করতে শিখেছি ভালবাসার অপূর্ব সৌন্দর্য। তখন ছেলেরা যে যাকে পছন্দ করত তার পিছনে অথবা পাশে পাশে সাইকেল চালিয়ে যেত স্কুল ফেরত। চিরকুটে ভালবাসার কথা লিখে বন্ধুর মারফত দিত পছন্দের মেয়েটিকে। এইসব নিয়ে অসাধারণ একটা রোমাঞ্চ ছিল আমাদের মধ্যে। স্কুলে আসার সময় কেউ কেউ প্রেমপত্র পেলে তার চোখমুখের চেহারা অন্যরকমহয়ে যেত। যে যার প্রিয় বন্ধুকে এসব বলত। খুব উৎসাহ ছিল তখন এইসব নিয়ে। কিভাবে যেন শিক্ষিকাদের স্টাফরুম পর্যন্ত পৌঁছে যেত সে খবর। ডাক পড়ত সেই মেয়েটির। বন্ধুদের মুখে মুখে আমাদের কাছে পৌঁছে যেত সে কথা। আমরা টয়লেটে যাবার অজুহাত দেখিয়ে ক্লাসরুমের বাইরে বেরোতাম। দেখতে যেতাম সেই মেয়েটিকে। এসবের মধ্যে যে কী এক নিবিড় ভাল লাগার ব্যাপার ছিল বলে বোঝাতে পারব না। বন্ধুরা যারা এসব পেরিয়ে এসেছে তারা অনুভব করতে পারবে। 

মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০২১

নস্টালজিয়া ৩২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ৩২

পৃথা চট্টোপাধ্যায়


নস্টালজিয়া ৩২
পৃথা চট্টোপাধ্যায় 

আমার শৈশবের বেশ কিছুটা সময় কেটেছিল সাগরদিঘিতে। বাবা তখন ওখানে  বিডিও অফিসে চাকরি করত। আমরা ওখানে কোয়ার্টারে থাকতাম। আমার বেশ মনে আছে আমাদের কোয়ার্টারের সামনেই ছিল রাস্তা, তার একধারে গাছপালা। ওখানে তখন রাস্তার ধারে সারি দিয়ে বাবলা গাছ ছিল, তাতে হলুদ রঙের বাবলা ফুল ফুটে থাকত। ছিল সাদা রঙের সুগন্ধি তে-চোখা ফুলের গাছ।নিশিন্ধা বলে একধরনের গাছ ওখানে অনেক ছিল। আর ছিল অনেক  তাল ও নিমগাছ। রাস্তার পাশেই ফসলের খেত - যেখানে আলু, আখ,সরষে, ছোলা এসবের চাষ হত। সেই মাঠের শেষে এক মস্ত দিঘি।এই দিঘির নামেই এই জায়গার নাম সাগরদিঘি তাই সবাই বলত। অনেক পদ্মফুল ফুটতো এই দিঘিতে। একবার হঠাৎ করে শোনা গেল  সেই দিঘির জলে মন্দির জেগেছে, তাই দেখতে  অনেক মানুষের ভিড়। দিঘির মাহাত্ম্যের কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল আশেপাশের গ্রামে।দলে দলে মানুষ এসেছিল সেই মন্দির দেখতে। কোন দেবতার মন্দির সঠিকভাবে কেউ বুঝতে পারছিল না। কারণ মন্দিরের  পুরোটা দেখা যাচ্ছিল না। শুধু চূড়া আর সামান্য কিছু অংশ। নৌকা করে সেই মন্দিরের কাছে অনেকেই যেত। আমার মা ঐ মন্দিরকে নিয়ে পরে একটা খুব সুন্দর কবিতা লিখেছিল। মায়ের কবিতা লেখার  বাঁধানো লাল রঙের লম্বা বড় মোটা একটা খাতা ছিল। তাতেই মা কবিতা, ছড়া লিখত। সেইসব লেখা মা আমাদের পড়ে শোনাতে খুব ভালোবাসত। পরে একজন মায়ের কাছ থেকে খাতাটা নিয়ে গেছিল,আর ফেরত দেয় নি। সাগরদিঘির দিনগুলো কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল যেন আমার মনে। আমি প্রাইমারি স্কুলে ওখানে কিছুদিন পড়েছিলাম। যতদূর মনে পড়ে  ব্রাহ্মণীগ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম।আমাদের কোয়ার্টার থেকে একটু দূরে ছিল সেই স্কুল।  সেখানে সিস্টারের মত সাদা শাড়ি পরিহিতা একজন শিক্ষিকা আসতেন আজিমগঞ্জ থেকে। তিনি স্কুলে যাওয়ার পথে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। তখনই তাঁর যথেষ্ট বয়স হয়েছিল। আমি স্কুলে  সবে ছোট ওয়ানে(নার্সারি ক্লাস) ভর্তি হয়েছি,তবুও আমার মনে পড়ে  অনেকটা মাদারের মত ছিলেন তিনি,সাদা কাপড় পরতেন। পরে কথা প্রসঙ্গে মা বলেছিল উনি গুরুমা ট্রেনিং করা ছিলেন বলে অনেক বয়সেও চাকরি করতেন। আজ অতীতের কথা লিখতে বসে এসব কীভাবে যেন মনে পড়ে যাচ্ছে। এখন আমার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই, তাই নিজের স্মৃতির পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা ছবিকেই মেলে ধরছি মনের আয়নায়। কী যে অপূর্ব সোনালি আনন্দের  অনুভূতিতে মন আজ পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে নিজেও বুঝতে পারছি না!

শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৮ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৮

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



লিখতে বসেছি কিন্তু ভালো লাগছে না। বিষণ্ণতা ঘিরে রেখেছে যেন। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মৃত্যু সংবাদ আমার লেখার উৎসাহ দমিয়ে দিচ্ছে। আমি তো আজকের কথা নয়, স্মৃতির গভীরে ডুব দিয়ে কুড়িয়ে আনতে চাইছি মণিমাণিক্যর মত আমার শৈশবের কত উজ্জ্বল স্মৃতি । আসলে আমি তো লিখি না ,লেখে আমার মন। মন না চাইলে এক বর্ণও লিখতে পারি না।  হেমন্তের শূন্যতাকে এবার ছাপিয়ে গেছে মৃত্যুর বিষণ্ণতা। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, কবি নাসের হোসেন,  কবি গৌরাঙ্গ মিত্র,ফুটবলের কিংবদন্তি মারাদোনা আরো কত কত মানুষ চিরতরে  চলে গেলেন। এঁরা সবাই আমার মনের কত  কাছে ছিলেন চলে যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছি। আমিও কোভিড থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছি। সব কিছু থেকে উত্তীর্ণ হয়ে আপাতত আমি লিখতে চাই,  নস্টালজিয়ায় ডুবে থাকতে চাই। এত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে চলা খুব দুঃসহ। 

 মৃত্যু ছাড়াও কত ছোট ছোট বিচ্ছেদ আমাদের মনে গভীর শূন্যতাবোধ সৃষ্টি করে। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব অনেক সময় কত সামান্য কারনে ক্রমশ দূরে সরে যায় । একবার ভেঙে গেলে যে কোনো সম্পর্ক অথবা মন জোড়া বেশ কঠিন। এ আমার জীবনের অভিজ্ঞতা। আমি কোনদিনই কোনো  সম্পর্ক নষ্ট করে দেওয়া ভালো বাসি না। ভুল তো হতেই পারে। মিটিয়ে নিতে চাই সবসময়। 

এখন ছোটবেলার একটা মজার ঘটনা বলি। তখন  আমি ক্লাস সিক্সে  আর আমার বোন প্রাইমারিতে ক্লাস ফোরে পড়ে । আমাদের নতুন পড়াতে আসছেন অমল মাস্টার। খুব শৌখিন অনেকটা যাত্রার নায়কের মত চেহারা আর হাবভাব ছিল তাঁর। আমার বোন খুব সামান্য কারনে বকা খেত তাঁর কাছে। ঘেরা বারান্দার চৌকিতে বসতাম আমরা, অমল মাস্টার সামনে হাতলওলা কাঠের চেয়ারে। বোন পা গুটিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারত না। পা নামিয়ে বসলেই বকতেন ।বলতেন একদম পা দোলাবি না।সব পড়া ঠিকঠাক করে রাখলেও নতুন কিছু জিজ্ঞাসা করতেন আর না পারলে ধমক দিতেন। একদিন মা কিছুক্ষণের জন্য পাশের প্রতিবেশির বাড়িতে নারায়ণ পুজোয় গেছিল, আমি আর বোন অপেক্ষা করছি স্যার আসবেন। বোন স্যারের বসার চেয়ারটা পাল্টে একটা পা ভাঙা চেয়ার এনে রেখে দিল। অমল মাস্টার এসে অহেতুক গাম্ভীর্য নিয়ে চেয়ারে বসতেই চেয়ার ভেঙে ধপাস করে পড়ে গেলেন। 'বাবা গো মা গো' বলে প্রায় কাঁদতে লাগলেন। আমরাই হাত ধরে তাঁকে ওঠালাম। বোন খুব গম্ভীর মুখ করে ছিল। আমি কিছুতেই হাসি চাপতে পারছিলাম না। স্যার বোনকে বারবার বলছিলেন, 'এ সব তোরই কারসাজি'। মা এলে নালিশও  জানালেন বোনের নামে।

সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২৬ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২৬

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



'তুমি পারবে না ' এই কথাটা ছোটদের কখনই বলতে নেই। বিশেষ করে মা যদি শিশুকে বারবার বলতে থাকে 'তুমি পারবে না' শিশুর মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ধারণা জন্মে যায় যে মা যখন বলছে তখন আমি পারব না। যত কঠিন কিছু হোক শিশুটিকে যদি বারবার উৎসাহিত করা হয় 'তুমি পারবে'  তাহলে অনেক সাহস আর মনোবল খুঁজে পায় সে, জীবনের কঠিন বাধা অনায়াসে অতিক্রম করতে শেখে। এই  'আমি পারি'(I can) মন্ত্রে শৈশব ও কৈশোর থেকেই শিশু কিশোরদের দীক্ষিত করে তুলতে হয় এই অভিজ্ঞতা আমার ব্যক্তিগত  জীবন সঞ্জাত। 

খুব শান্ত আর ভিতু ছিলাম ছোটবেলা থেকেই। শান্ত শিষ্ট আমার স্বভাব, কিন্তু অহেতুক  ভয়টা মা নিজের অজান্তেই আমার  মনের মধ্যে  তৈরি করে দিয়েছিল এটা আমি বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি । আমার আগে ও পরে যে দুটি সন্তান মায়ের জন্মেছিল  তাদের শৈশবই মৃত্যু হয়েছিল।  একটির জন্মের পরেই আর একজনের তিনমাসে পক্স হয়ে। আমিও প্রি ম্যাচিওর বেবিছিলাম,  আট মাসের শুরুতেই জন্মেছিলাম। সময়ের আগেই এত শান্ত মেয়েটি কীভাবে যে ছটফট করে পৃথিবীর আলো দেখতে বেড়িয়ে এসেছিল জানি না। অনেক যত্নে সাধ্য সাধনা করে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল মা- বাবা। ছোটবেলায় টাইফয়েড হয়েছিল তিন বার। বারবার জ্বর হতো আর তখন ডাক্তার কিছুতেই ভাত খেতে দিত না বলে আমার খুব খারাপ লাগত। যাই হোক  এইসব কারণে  আমাকে মা পক্ষীমাতার মত ডানা দিয়ে  আগলে বড় করে তুলেছিল। পরে অবশ্য এই আমাকেই জীবনের অজস্র ঝড় ঝামেলা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে  বারবার  অনেক বেশি আর আমার  'পারব না'  এই গন্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসতে খুব কষ্ট হয়েছে । আসলে ছোটবেলা থেকেই  মায়ের মনে আমার জন্য সবসময় একটা ভয় ছিল ,যদি কিছু হয়ে যায়! খুব আলতো করে রাখতে চেষ্টা করত আমাকে সবরকম বিপদ আপদের হাত থেকে।  পড়াশোনা ছাড়া কোনো কাজ আমাকে করতে দিত না মা। ফলে আমি অনেক বড় পর্যন্ত ভয়ে দেশলাই জ্বালাতেও পারতাম না। চা ছাড়া আর কোনো কিছু করতে পারতাম না বিয়ের সময়েও আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা একথা জানে। যে কোনো কাজ করতে গেলেই মা বলত 'তুই পারবি না', এটা অতিমাত্রায় স্নেহের বশে বলা, কিন্তু সেটা আমার মনে গেঁথে বসেছিল। আমি সব কাজ থেকে গুটিয়ে রাখতাম নিজেকে 'পারব না' ভেবে। পড়াশোনার ক্ষেত্রে কখনো "পারবে না" এই কথা মা বলত না। তবুও  মায়ের অজস্র  'না' আমার জীবনে সব কাজের মধ্যেই  কিছুটা নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া করেছিল , আমার মনোবল নষ্ট করেছিল বড় হয়ে তা উপলব্ধি করেছি। পড়াশোনা ও জীবনের শিক্ষায় এই 'না'-এর গন্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করেছি।  মাকেও বলতাম সে কথা, মাও পরে বুঝতে পেরেছিল।

বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

 নস্টালজিয়া ২২

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



এখন হেমন্ত। সদ্য শেষ হলো আমাদের শ্রেষ্ঠ শারদীয় উৎসব দুর্গাপুজো। কেমন যেন উৎসাহহীন উৎসবের মধ্যে কাটল এবারের পুজো। অতিমারীর পরিস্থিতিতে এখন আন্ লক পর্ব চলছে। এই করোনা আমাদের অনেক নতুন কিছু শেখালো। পুজোর কদিন ছুটির পর এখন  আবার অন লাইনে পড়াশোনা শুরু হলো। লক্ষ্মী পুজোও হয়ে গেল চড়া বাজার দরের মধ্যেই শুনশান ভাবে। এইসময় আমার খুব মনে পড়ে ফেলে আসা ছোটবেলার দিনগুলো। একমাস পুজোর ছুটি থাকতো আমাদের তখন। কালীপুজো দীপাবলির পর স্কুল খুলতো। কদিন স্কুলের পরেই  হতো বার্ষিক পরীক্ষা। উজ্জ্বল প্রজাপতির ডানার রঙে চঞ্চল ছিল  তখন উৎসবের রঙ। নতুন জামার গন্ধ লেগে থাকত গায়ে, মনে ছড়িয়ে থাকত কোজাগরীর আলো। সদ্য কিশোরী কাল। পুজোর প্যান্ডেলে বাজতে থাকা পুজোর গানগুলো ... কিশোর কুমারের 'আমার পূজার ফুল ভালবাসা হয়ে গেছে', মহম্মদ রফির , 'পাখিটার বুকে যেন তির মেরো না' , আশা ভোঁসলের ' তোমার ঐ ঝর্ণা তলার নির্জনে' মনে গুনগুনিয়ে সদ্য  অনুরণন তুলতে শুরু করেছে। কী যেন পেতে চায় মন তা মন জানত  না ! এ এক অপূর্ব মুগ্ধতা ছিল আমার। 

চিরকালই প্রকৃতির সাথে সখ্যতা ছিল। প্রত্যেকটি ঋতুর পৃথক সৌন্দর্য আমি খুব ছোট বেলা থেকেই অনুভব করতাম। হেমন্তের হালকা হিমেল বাতাসে কুয়াশার চাদরে মোড়া দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে আজ। আমাদের বাড়িতে কোজাগরী  লক্ষ্মী পুজো হতো না। ঠাকুমা বলতো ঐ দিন কোনো নবজাতক  আমাদের পরিবারে জন্মগ্রহণ করলে লক্ষ্মীপুজো করা যাবে। অধিকাংশ বাড়িতে খুব ধুমধাম করে মা লক্ষ্মীর পুজো হতো। পাড়ার অনেকের বাড়িতে আমাদের  পুজোর নিমন্ত্রণ থাকতো।প্রথমদিকে যাদের বাড়িতে যেতাম সেখানে ফল প্রসাদ খেয়েই পেট ভরে যেত। অনেক রকম নারকেল নাড়ু করত এই পুজোয় সবাই। তাছাড়া  লুচি, খিচুড়ি,  তরকারি, ভাজাভুজি,  চাটনি,  পায়েস। কাদের বাড়িতে কী প্রসাদ খেতাম সেসব এখনও মনে পড়ে।

বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২১ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ধারাবাহিক গদ্য

 নস্টালজিয়া ২১

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



খুব দোলাচলে কাটছে দিন। ছুটি আছে অথচ ছুটির আনন্দ নেই। অন্য বারের বিজয়া দশমীর শূন্যতা এবার আগমনীর পূর্ণতাকে ছাপিয়ে গেছে। কী এক বিষাদের ছায়া সবার মুখে। মনে আছে, যে বার পুজোর ঠিক আগে  আমার মেজমামা মারা গেছিল সেই বার মায়ের মুখে এই বিবর্ণ পুজোর ছবি দেখেছিলাম। মা তার মেজদাকে খুব ভালো বাসত।ছোটবেলায় পিতৃহারা আমার মা তার দাদা ভাইদের আদরে বড় হয়েছিল। মা খুব কাঁদত মেজদার  জন্য।  মায়ের মন খারাপের জন্য  আমাদের সে বছর পুজো খুব বিষণ্ণতায় কেটে ছিল। সংসারে  গৃহকর্ত্রী মা যদি কোনো কারণে আনন্দে না থাকে, তাহলে সেই সংসারে আনন্দ থাকে না। মায়ের মনের আনন্দ আমাদের মনেও   আনন্দের উৎস মুখ খুলে দিত। মাকে মাঝে মাঝে আমার নদী বলে মনে হত। সে সংসারের সব  দুঃখ কষ্টকে অনায়াসে বয়ে নিয়ে যেতে পারত আবার আনন্দে দু'কুল ছাপিয়ে যেত। শরতের  ভোরের হাওয়ায় শিউলির গন্ধে মায়ের আগমনের সুগন্ধি ছড়িয়ে যেত।ভোরের শিশির ভেজা ঘাসে আলতা রাঙা পায়ে মা গঙ্গা স্নান করে ঘরে এলে কত কচি ঘাস মায়ের ভিজে পায়ে জড়িয়ে থাকত।পুজোর খুশির ছোঁয়ায় মা  কাজের মাঝে মাঝেই গুনগুন করে গান গাইত। সেদিন মায়ের খুশির আলাদা কোনো কারণ আমি খুঁজে পেতাম না। সারাদিন তো আর পাঁচটা দিনের মতোই কাটত তবু কী যেন একটা ভালো লাগা মনকে স্পর্শ করত বুঝতে পারতাম না। মায়ের একবার ইচ্ছে হলো চরকায় সুতো কাটা শিখবে।আমাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে কাটরা মসজিদের কাছে একটা চরকা সেন্টার ছিল। মা খুব উদ্যোগের সাথে সেখানে ভর্তি হলো। খুব তাড়াতাড়ি শিখেও গেল তুলো থেকে  সুতো তৈরি করতে। এইরকম শরৎকালের দুপুরে মা সব কাজকর্ম সেরে যেত সেখানে। আমিও মাঝে মধ্যে যেতাম মায়ের সঙ্গে। দুপাশে মাঠে অজস্র কাশফুলে চারদিকে পুজোর সাজ ,সবুজ ধানখেত। 

সেন্টারে দেখতাম অধিকাংশই দুঃস্থ, দরিদ্র মেয়েরা সুতো কাটছে। আমার মা কত অনায়াসে তাদের সঙ্গে বসেই নিজের কাজ করত। তুলো থেকে সুতো তৈরির বিনিময়ে মা সামান্য হলেও কিছু টাকা পয়সা মা পেত এবং তাতে খুব খুশি হতো। মায়ের এই আগ্রহ দেখে বাবা সেখানে permission করিয়ে বাড়িতেই একটা চরকা আনিয়েছিল। খুব খুশি মনে মা ঘর্ঘর শব্দে তাতে সুতো তৈরি করতো।পরে আমি সবরমতী আশ্রমে চরকা দেখে খুব উৎসাহিত হয়েছিলাম। আর আমি যে চরকায় কীভাবে সুতো কাটতে হয় জানি এটা ভেবে মায়ের জন্য  কী জানি কেন খুব গর্ব বোধ হচ্ছিল।

সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২০

নস্টালজিয়া ২০ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ধারাবাহিক বিভাগ

 নস্টালজিয়া ২০

পৃথা চট্টোপাধ্যায় 



 আর পাঁচটা শিশুর মতোই আমার শৈশব ও ছিল মায়ের আদর স্নেহ ভালবাসায় সিক্ত,  কিন্তু যত বড় হয়েছি মা ততই শাসনের মাত্রা বাড়িয়েছে। আমাদের তিন ভাই বোনকে বড় করতে মায়ের এই শাসনের কড়াকড়ির অর্থ আজ বুঝতে পারি। মায়ের কথা বলতে গেলেই আমার সরল সাদাসিধে আটপৌরে মাকে মনে পড়ে যে সারাদিন কাজের মধ্যে থাকতে ভালবাসত। সংসারের সব কাজ দশভূজার মত সামলাতে অভ্যস্ত ছিল।সংসারের সব কাজ সামলেও মা আচার তৈরি করত, বড়ি দিত, নাড়ু,  মুড়কি এসব ঘরেই বানাত। আম, লেবু, কুল,তেঁতুল, লঙ্কা, এঁচোর,  সজনে ডাঁটা সব রকমের আচার করত মা।আমাদের বাড়িতে বার মাস মায়ের তৈরি  আচার খাওয়া হত। বাড়িতে নারকেল গাছ থাকায় মা সবসময় নারকেল নাড়ু করে রাখতে ভালবাসত। ঠাকুর দেবতাকে প্রতিদিন মা ঘরের তৈরি নারকেলের চিনি অথবা গুড়ের নাড়ু দিত পুজোর সময়। মায়ের কোনো কাজেই অলসতা ছিল না। আমার শৈশবের মা ছিল হাসিখুশি, খুব অল্পে সন্তুষ্ট এক নারী যার জীবনের লক্ষ্য ছিল সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের সত্যিকারের মানুষ করে গড়ে তোলা।আমাদের বাড়ির উঠোনে বিকেলে সব বন্ধু মিলে খেলাধূলা করতাম। আমার ছোটবেলায় মাও অনেক সময় আমাদের সঙ্গে খেলত।পুতুলের বিয়ে দিলে লুচি আলুভাজা করে দিত।কিন্তু  পড়াশোনায় ঢিলেমি করলে বা  সময় মত পড়তে না বসলে  মা খুব বিরক্ত হতো। মা নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল। একমাত্র মায়ের উৎসাহেই আমাদের পড়াশোনায় আগ্রহ জন্মেছিল।বাবা নিজের চাকরি নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকত। বেশি বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকাটা মোটেই পছন্দ করতো না । নিজে খুব সকালে উঠে গঙ্গাস্নান করতে যেত । পূজার্চনা করতে ভালবাসত।মাসের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই সকালে উঠে শুনতাম  সেদিন বিশেষ কোনো তিথি তাই মা ভাত খাবে না অথবা উপবাস থাকবে। মা যেদিন ভাত খেত না সেদিন দিনে লুচি হত আর আমাদের সেদিন খুব আনন্দ। আমরাও মায়ের সাথে মঙ্গলচন্ডী, বিপত্তারিণী এইসব পালন করতাম। আমার মামার বাড়িতেও পূজার্চনার খুব প্রচলন ছিল। এখনও আছে সাবেকি আমলের দুর্গাপুজো, নারায়নের নিত্যসেবা,  রাধামাধব বিগ্রহ। এই রাধামাধবের বিগ্রহ মায়ের মামার বাড়ির। দুর্গাপুজোর সময় মা খুব  বিমর্ষ হয়ে থাকত। নিজের বাড়ির পুজোর  জন্য, ভাইবোনদের জন্য  মায়ের মন খারাপ করত। বাবা শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া বিশেষ পছন্দ করত না বলে মায়েরও যাওয়া হত না। যে বার আমরা মোরগ্রামে মামার বাড়িতে দুর্গাপুজোর সময় যেতাম সেবার মা খুব খুশি হত। আমারও গ্রামের বাড়ির পুজোয় অন্য রকমের  আনন্দের স্বাদ পেতাম।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...