রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

ভোরবেলা || মনোজ কুমার গোস্বামী || বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস

 ভোরবেলা

 মনোজ কুমার গোস্বামী 

বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস 





‘উঠুন, পেশেন্টের কাছে যান।’ 

দরজার পাশেই  বেঞ্চটাতে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে ধীরে ধীরে বেণুর ঘুমের ভাব এসেছিল, ডাকে এবং হাতের স্পর্শে সে জেগে উঠল।

-‘উঠুন, পেশেন্টের কাছে যান।’

চোখ মেলে বেণু দেখল সামনে বেঁটে, কালো ক্ষীণাঙ্গী নার্সটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেহের ক্লান্তি এবং আলস‍্য ভেঙ্গে সে উঠে দাঁড়াল। একপা দুপা করে বাবার কাছে গেল। ঘরের একেবারে শেষমাথার বেডটিতে   বাবা শুয়ে আছে। তাঁর শীর্ণ হাত দুটি বুকের উপর পড়ে রয়েছে।  ক্ষীণ সামান্য দেহটা কাপড়ের নিচে, বুকের ওঠানামা এত ক্ষীণ যে বোঝা যায় না। বালিশের উপরে মাথাটা সোজা হয়ে আছে। চোখ দুটো বন্ধ, ঠোঁট দুটি সামান্য খোলা-। বেণু বুঝতে পারে যে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। বাবা কখনও এভাবে ঘুমোয় না। নিয়ন লাইটের নীলাভ আলো ঘরটির সাদা দেওয়ালে প্রতিফলিত হয়েছে, ঘরের মাঝখানে দুটো পুরোনো মলিন ফ্যান ধীরে ধীরে ঘুরছে। রাত হয়তো অনেক হয়েছে। ঘরের রোগিদের কোনো একজন এটেনডেন্ট ঘুমিয়েছে, কেউ জেগে আছে,অন্যপ্রান্তে একটি বেডে এক বৃদ্ধা রোগি মাঝেমধ্যে অস্ফুট ভাবে কাশছে, পাশে বসে থাকা বৃদ্ধটি গভীর মমতায় তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চারপাশের শব্দহীনতা। জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখা যায়। আকাশ মানে রাতের পারাপারহীন অন্ধকারে ভরা বিশাল শূন‍্য- কারও জুতোর মৃদু শব্দ এগিয়ে আসছে। ক্ষীণ নার্সটি ফিরে এল। সঙ্গে একজন ডাক্তার- তার স্থূলাকৃতি গোলাকার মুখে চাপা বিরক্তি, তিনি কানে স্টেথোস্কোপটা লাগিয়ে বেণুর বাবার বুকের স্পন্দন শোনার চেষ্টা করেন। তাঁজ মুখের রেখাগুলির কোনো পরিবর্তন হয় না,বাঁ হাতের আঙ্গুলে তিনি কেবল চশমা জোড়া চোখের সঠিক অবস্থানে ঠেলে দেন। বেণু অনুমান করে ডাক্তারের বয়স তার মতোই হবে। কিন্তু যত্ন এবং পরিপাটিতে ডাক্তারের বয়স অনেক কম বলে মনে হচ্ছে। দেখলেই বুঝা যায় তিনি একজন সফল মানুষ। তার মসৃন দীর্ঘ আঙ্গুলগুলিতে একটি করে আংটি, চশমার রূপোলি   ফ্রেম থেকে ছিটকে আসছে আলোর ঝিলিক, গলায় একটা সোনার ছোট চেইন, হয়তো শহরের কোনো ব্যস্ত চৌমাথায় ইতিমধ্যে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার জন্য চেম্বার খুলে বসেছে। বেণুর বাবার একটা হাত তিনি তুলে নিলেন, হয়তো পালস খুঁজলেন। তারপর যেভাবে ছিল, সেভাবেই বাবার বুকে রেখে দিলেন। 

‘এটেনডেন্ট কে আছে? স্টেথোস্কোপটা হাতের মুঠিতে ধরেই ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন।নার্সটি বেণুর দিকে তাকাল। ‘পেশেন্ট মারা গেছে’-বিরস অনার্দ্র কণ্ঠে তিনি বললেন, আপনি আমার রুম থেকে ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে যাবেন।’ 

বাবার বিছানার কাছে একটি ছোট টেবিল, তার ওপরে বিভিন্ন আকৃতির আর রঙের ঔষধের বোতল, একটি অর্ধেক খাওয়া পাউরুটি, দুটো অর্ধেক নিভে যাওয়া ধূপকাঠি। রাতের একটি প্রজাপতি এইসবের উপরে ধীরে ধীরে উড়ে বেড়াচ্ছে। ডাক্তারের জোতার শব্দ দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়।

হঠাৎ মাথা তুলে বেণু দেখে নার্স তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আশ্চর্য হয়ে সে দেখে এমনিতে যাকে খুব রুক্ষ কঠোর যেন বলে মনে হয়েছিল, তার মুখে কৃশ করুন পবিত্রতা, আরতির ধূপের ধোঁয়ার মতো। বেণুর মনে হল প্রতিমার মত নির্লিপ্ত তার এই মুখ, যে মুখে ট্র্যাজিডির  প্রচ্ছন্ন ছায়া পড়েছে। জিজ্ঞেস করার মতো কিছুই নেই বলেই যেন বেণু জিজ্ঞেস করল-‘ এখন রাত কত?’

‘দুটো বাজতে চলেছে-দশ মিনিট বাকি।’ সে বলল। ইঞ্জেকশনের ট্রেটা বাইরে বের করে নিয়ে যাবার আগে নার্স এক মুহূর্ত দাঁড়াল, ‘ডেড বডি রুম থেকে বাইরে বের করে রাখতে হবে।’- অনুচ্চস্বরে সে বলল, সেটাই নিয়ম।’ 

রুমের বাইরে বেরিয়ে এসে বেণু একটা সিগারেট জ্বালাল। বাবার মুখটা সম্পূর্ণভাবে ঢেকে দেওয়া উচিত ছিল কি? প্রজাপতিটা উড়ে এসে বাবার মুখে বসেছে কি? তবুও সে রুমের ভেতরে যেতে চাইল না, বাবার মৃতদেহ থাকা ঘরটিতে ক্লোরিনের অত্যন্ত তীব্র গন্ধ বিরক্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে, অবশ্য হাসপাতালে সমস্ত পরিবেশে সেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু মাঝেমধ্যে কোথা থেকে  ভেসে আসা এক ঝলক বাতাস বারান্দার দূষণ হালকা করে দেয়। ভোর হতে আর কত বাকি রয়েছে সে মনে মনে হিসেব করল। হাসপাতালের শুদ্ধ সাদা দেওয়াল, স্তব্ধ বারান্দা এবং নিরন্ধ্র অন্ধকার। আকাশের পরিসীমায় সময়ের  গতি রুদ্ধ হয়ে আছে।

তখন সে শুনল জুতোর হালকা শব্দ। দুইজন নার্স ,আগের জনের সঙ্গে আরও একজন রুমের ভেতরে প্রবেশ করেছে। সিগারেটটা পুড়ে শেষ হয়নি। কিন্তু বেণু ভাবল ডেড বডিটা তুলে আনায় তাদেরকে সাহায্য করতে যাওয়া উচিত হবে। মানুষের মৃত্যুর পর শরীরের ওজন বেড়ে যায়। এই ধরনের কথা একটা তার মনে পড়ল। একজন ওয়ার্ডবয় এবং একজন নার্সের সাহায্যে ডেডবডিটা বারান্দার এক কোণে এনে রাখা হল।ঔষধের বোতল, কাপড়চোপড় সে গুছিয়ে রাখল।

মৃদু কথোপকথন, বিছানার টানা নেওয়া করার শব্দে দুজনের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। বেণুর নিজেকে বড় অপরাধী মনে হল। বৃদ্ধ লোকটিকে পাহারা দিতে থাকা মানুষটা তার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। পাশের বিছানার রোগিটি অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘মারা গেল নাকি?’

‘দুটো বেজে দশ মিনিট থাকতেই’- বেণু দ্রুত বলল। ‘শুভরাত্রি’ তারপরে সে দ্রুত গতিতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

বাবার কাছে দুটো ধূপ জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা ভাবল। কিন্তু একটি মৃতদেহের কাছে ধুপ জ্বালানোর যুক্তিও সে খুঁজে পেল না।

‘আপনি ভোর পর্যন্ত থাকবেন তো?’ বাবার মৃতদেহ বারান্দার এক কোণে রেখে আসা নার্স দুজন  তার কাছে এসে দাঁড়াল। হাসপাতালে অসংখ্য জরা মৃত্যুতে ওদের সহানুভূতি হারিয়ে যায়নি।

সে মাথা নাড়ল। ‘এই গন্ধটা ক্লোরিনের নয় কি?’-সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল। সামান্য বিব্রত ভাবে নার্স দুজন তার দিকে তাকাল। সে ভাবল যে এই সময়ে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করা উচিত হয়নি। দ্রুততার সঙ্গে সে বলল-‘ডেথ সার্টিফিকেটটা এখনই নিয়ে রাখব কি?’ কিছুক্ষণ পরে বেণুর আর কিছু করার রইল না। সমস্ত নিঃসার, এমনকি নার্স দুজনও শুয়ে পড়েছে বোধহয়। নিয়নের আলোকে বারান্দা দিয়ে বেণু হাঁটতে থাকে। নির্মল নিশ্চিত মন্থরতায়  উদ্দেশ্যহীনভাবে যেতে যেতে সে দেখে হাসপাতালের ঘরে ঘরে জীবন এবং মৃত্যুর বিচিত্র সহাবস্থান। একজন বৃদ্ধা বুক খামচে ধরে অবিরতভাবে কেশে চলেছে, স্যালাইন এবং অক্সিজেনের পাইপ নাসারন্ধ্রে নিয়ে একজন ক্ষীণ মহিলা, একটি আধপোড়া শিশুর কাছে উদ্বেগ বিহ্বল মাতৃ। সেই বারান্দা দিয়ে শেষের বহু সাড়ি বেণু সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়। স্বল্পালোকিত দীর্ঘ বারান্দা। পেছনের আলো সামনে তার বিকৃত দীর্ঘ ছায়া সৃষ্টি করেছে। তখনই সে শুনতে পায় কোথাও একটা চিৎকারের মতো- প্রচন্ড ক্লেশে দীর্ঘ বিকৃত কোঁকানির মতো চিৎকারটা বেণুকে তাড়া করে আসে।নিচের  বারান্দায় পা দিয়ে সে দেখে একজন মহিলা উন্মাদের মতো চিৎকার করছে, তার চুল অগোছালো, চোখ উদভ্রান্ত, মহিলার শরীর থেকে কাপড় খসে পরছে, বিমর্ষ মুখের বর্ষিয়ান মানুষ তাকে জড়িয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এগিয়ে গিয়ে বেণু দেখতে পেল  মহিলার সামনে একটি মৃতদেহ, একটি কিশোরের, হয়তো মহিলার সন্তান, খুব অবোধ মুখ তার, খুব সতেজ, যেন এখনই সে ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙ্গে বসবে। বেণু কিছুক্ষণ দাঁড়াল। দুঃখের অসহ্য যে সুখ,যন্ত্রণায় যে সংগীত অনুরণিত হয়ে ওঠে তা বেণুকে স্পর্শ করে। তার মধ্য দিয়ে সে মৃত্যুকে দেখে, বিশাল অন্ধকার ভরা সেই দৃশ্য, যেন ক্লাসের ছাত্র স্কুলের জানালা দিয়ে বাইরের বিস্তীর্ণ মাঠের মুক্তি প্রত্যক্ষ করছে।

এই সমস্ত কিছু থেকে সরে এসে বেণু একটা সিগারেট জ্বালায়। বারান্দার একটি মোড় ঘুরে গিয়ে হাফ ওয়ালে হেলান দিয়ে সে সিগারেটে একটা সুখটান দেয়, নিচে বহু নিচে কয়েকটি স্তব্ধ গাড়ি মোটর, দুটো গরু,  ফার্মাসিটা আধা খোলা, রিক্সা গুলি এক সারিতে রাখা হয়েছে এবং রিক্সাওয়ালারা এখনও দলবেঁধে আড্ডা মারছে- রাস্তার দু'পাশে হ্যালোজেন লাইটের ফ্যাকাশে আলোর প্লাবন, দূরের মহানগরের প্রধান রাস্তা দেখা যায়, প্রথম  তন্দ্রাচ্ছন্ন মহানগরী মাঝে মধ্যে হঠাৎ কেবল একটি দুটি গাড়ি মোটর পার হয়ে যাচ্ছে। রাস্তার পাশের বিশাল বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংগুলি  আলোতে জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু এখান থেকে অক্ষরগুলি অস্পষ্ট, পড়া যায় না।কেবল একটি বিজ্ঞাপন হোর্ডিংয়ের একটি বিশাল অস্পষ্ট প্রোফাইল অনুমান করা যায়। একটি স্ট্রেচার ঠেলে ঠেলে বারান্দা দিয়ে একজন ওয়ার্ডবয় পার হয়ে যায়। বেণু দেখে একটি খালি স্ট্রেচার, কিন্তু অনুমান করা যেতে পারে যে কিছুক্ষণ আগে তাতে কেউ ছিল।সেই শূন্যতা ঠেলে ঠেলে ওয়ার্ড বয়টি ক্রমে বারান্দার অন্যপ্রান্তে লুকিয়ে যায়। রুগ্ন নর-নারী এবং মৃত্যু পথযাত্রীর এটা যেন এক অদ্ভূত বেদনাক্রান্ত ক্লান্ত মিছিল। সে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা উচিত হয়নি,দুই পা এগিয়ে সে দেখে লিফটের দরজা খোলা, একটা টুলে বসে লিফটম্যান ঘুমোচ্ছে। পুনরায় সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে বেণু দেখল দিয়াশলাইয়ের কাঠি শেষ হয়ে গেছে। অন্তত সে লিফটম্যানকে ডাকার একটা অজুহাত পেল। 

-‘দিয়াশলাই আছে?’ 

‘ওহো-নেই’।-লিফটম্যান টুলে বসে লিফটের দেওয়ালে হেলান দিয়ে অর্ধেক বন্ধ চোখে উত্তর দিল-আসলে আমি সিগারেট খাই না।’

‘কোনো কথা নেই’-বেণু বলল। ‘নিচে যেতে পারব না?’

বেণু লিফটে ওঠার পরেও লিফটম্যান ভাল করে চোখ খুলল না। ‘সবুজ সূইচটা টিপুন।’ তিনি বললেন। এখন এক নম্বর সুইচটা টিপুন।’ 

মুহূর্তের এক ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ সময়ের জন্য শরীরকে নির্ভার যেন বোধহয় বেণুর, যেন শরীরের অস্তিত্বতাই,যেন তার অস্তিত্ব নেই।লিফটটা  নিচে নেমে যায়। প্রথম মহলায় থামে। লিফটম্যান কে ধন্যবাদ দিয়ে বেণু লিফট থেকে নেমে যায়। হাতে না জ্বলা সিগারেট।

শূন্য দীর্ঘ বারান্দা। আলোর বাইরে যেখানে কিছু নেই। চারপাশে অন্ধকার এবং নৈঃশব্দ। নিজের পায়ের শব্দ বেণুর কাছে অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে। একটা খুঁটির কাছে একটা ছায়া উঠে এল যেন মনে হল। একজন মানুষ। দেওয়ালে হেলান দিয়ে সে নিচের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

‘দেশলাই আছে নাকি?’

‘ও।’ মানুষটা বেণুর  দিকে ঘুরে তাকাল। তাঁর মুখে এক মুখ ছায়া। খুঁটিটার আড়াল থেকে তিনি বেরিয়ে এলেন না। শার্টের পকেটটা খুঁজে দেখল। দিয়াশলাইটা বেণুর দিকে এগিয়ে দিল। আপনার কোনো রোগী ছিল নাকি এখানে?

বেণু বলল-‘আমার বাবা।’ 

‘কেমন আছে এখন?’

‘তিনি মারা গেছেন,কিছুক্ষণ আগে।’

‘ওহো।

‘ আমি রোগি।’ মানুষটা নিঃশব্দে হাসল,হয়তো কারণ ছায়াটা তার মুখে এখনও স্থির হয়ে রয়েছে।

সিগারেট জ্বালিয়ে দিয়াশলাইটা ফিরিয়ে দিয়ে বেণু এগিয়ে যায় পুনরায় সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে। নিজের পদক্ষেপগুলোকে গোনার চেষ্টা করে সে-এক,দুই,তিন- ব্যর্থ হয়, এলোমেলো হয়ে যায় সব কিছু। 

কোনো একটি তলায় এসে সে দাঁড়ায়। কত তলা এটি? তার বাবার মৃতদেহ থাকাটাই কি? পুনরায় নিচে নামে। বেণু বুঝতে পারে, সে পথ ভুল করেছে। আবার দুটো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসে। এভাবে অনেক্ষণ উঠানামা করায় তার ক্লান্ত লাগে। সেই সময় হঠাৎ বেণু শুনতে পায় একটা চিৎকার- আদিম, বন্য। একটি বন্ধ দরজার কাছে যায় সে। ভেতরে একটি মানুষ চিৎকার করছে। একটি দীর্ঘ চাপা চিৎকার। নিজের শরীরের ভর দরজায় হেলান দিয়ে বেণু দাঁড়িয়ে থাকল। একজন গর্ভিনী মানুষ প্রসব বেদনায় চিৎকার করে উঠছে।

কত দুঃখ, কত বেদনা, কত যন্ত্রনা মানুষের। কিন্তু বেণুর আপাত নিস্পৃহ নির্বিচার মুখে এই অনুভূতি গুলি কোনো ভাবান্তর আনতে পারল না। তার মুখের একটা রেখাও পরিবর্তিত হল না। সে অনুভব করে ক্লান্তি এবং তন্দ্রায় তার দেহ মন আচ্ছন্ন হয়ে এসেছে। এর মধ্যে তাঁর মনে পড়ে যে তার একটা দায়িত্ব আছে। একটা ট্যাক্সি ঠিক করতে হবে,ডেড বডিটা থেকে গন্ধ বের হতে পারে, কিছু ধূপ ধুনো কিনতে হবে। এখনও ভোর হয়নি। কিন্তু পাশের একটি গাছে কয়েকটি কাক কলরব করছে। দূরের বস্তি থেকে রাতের বেলা শোনা গিয়েছিল কুকুরের ঘেউ ঘেউ,  সেদিকে এখন নীরবতা। অন্ধকার হালকা হয়ে এসেছে। কংক্রিটের দুটো বিশাল দালানের মধ্য দিয়ে উঠে আসছে লাল আলো, হয়তো ভোরের কিছু সময় পরে- তখনও বেণু শুনতে পায়- বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে একটা নতুন কান্না। জন্মের পরে একটি শিশু পৃথিবীতে তার আগমন বার্তা জানাচ্ছে। তার মাতা- মহিলাটি এখন নীরব। শিশুটি তার শীর্ণ গলায় তীব্রস্বরে অবিরত কাঁদছে। এইমাত্র দরজা খুলে সে অপরিচিত পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে, যে পৃথিবী ধীরে ধীরে  আলোকিত হয়ে উঠছে, সূর্য উঠছে….।

বেনু কতক্ষন এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সে বলতে পারে না। কিন্তু বুকের কাছে ধরে রাখা তার হাতে হঠাৎ একফোঁটা জল গড়ায় বেণু চমকে উঠল- তার চোখে জল। সে কাঁদছে। বেণুর সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে বেরিয়ে আসছে সেই কান্না।

নিজেকে সে যেন বাধা দিতে পারল না। হাহাকার ভঙ্গিতে দু'হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে তুফানের মত আসা অপ্রতিরোধ্য কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। সেই নতুন শিশুর কান্নার সঙ্গে তার কান্না ক্রমশ মিলে গেল।

-----


লেখক পরিচিতি-১৯৬২ সনে অসমের নগাঁও জেলায় গল্পকার,লেখক,সাংবাদিক মনোজ গোস্বামীর জন্ম হয়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র শ্রীগোস্বামী অসমের প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ‘নতুন দৈনিক’,‘আজির বাতরি’, ‘আমার অসম’, ‘দৈনিক জনসাধারণ’ ইত্যাদি পত্র পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।বর্তমানে ‘আমার অসম’ পত্রিকার মুখ্য সম্পাদক। ‘সমীরণ বরুয়া আহি আছে’,‘মই রাজেন বরুয়াক সমর্থন করো’,’এলুমিনিয়ামর আঙ্গুলি’লেখকের অন্যতম গল্প সংকলন।

















কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নস্টালজিয়া ৩২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

  নস্টালজিয়া ৩২ পৃথা চট্টোপাধ্যায় নস্টালজিয়া ৩২ পৃথা চট্টোপাধ্যায়  আমার শৈশবের বেশ কিছুটা সময় কেটেছিল সাগরদিঘিতে। বাবা তখন ওখানে  বিডিও অফিস...