রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে (২৪) || কান্তিরঞ্জন দে || ধারাবাহিক বিভাগ

সবাই মিলে সিনেমা হলে (২৪)

কান্তিরঞ্জন দে



বাংলা সিনেমা ও বাংলাদেশ (২)


         মুক্তিযুদ্ধের পরে পূব বাংলার   বাঙালির  এতদিনের অবরুদ্ধ প্রাণ যেন  প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারল । নতুন গঠিত দেশে সামাজিক- অর্থনৈতিক হাজার সমস্যা । কিন্তু এর মধ্যেও বাঙালির সংস্কৃতি চর্চায় নতুন বাতাস এল ।  বাংলা সিনেমাও তার বাইরে রইল না ।

       ১৯৭০ সালে জহির রায়হান পরিচালিত " জীবন থেকে নেয়া " সিনেমাটি সাংস্কৃতিক জগতে এক ঝড় তুলে দিয়েছিল । ছবিটায় কারিগরি অনেক ত্রুটি আছে । কিন্তু বিষয় যদি জোরদার এবং প্রাণবন্ত হয়  তাহলে , টাকা পয়সার দৈন্য কিংবা কারিগরি সীমাবদ্ধতা যে কোনও ব্যাপারই নয় , এ ছবি তা প্রমাণ করে দিয়েছিল । একটি পরিবারের দৈনন্দিন সাংসারিক গল্পের মধ্যেও যে দেশ- জাতি-কালের প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তোলা যায় , জীবন থেকে নেয়া তারই জ্বলন্ত উদাহরণ ।


        এই রকম সময়ে ১৯৭৩ সালে এবং ১৯৭৬ সালে ঋত্বিক ঘটক এবং রাজেন তরফদারের " তিতাস একটি নদীর নাম " এবং " পালঙ্ক " সিনেমা দুটি বাংলাদেশের সিনেমা জগতে যেন নতুন ঢেউ নিয়ে এল ।

        বাণিজ্যিক সিনেমাতেও এল নতুন জোয়ার ।  অবিভাজ্য বাঙালি জাতি বরাবরই রূপকথা , লোককথা ভালো বাসে । ১৯৬৫ সালে লোককথা ভিত্তিক সিনেমা " রূপবান " পূব বাংলায় ব্যাপক হিট করেছিল । তবে স্বাধীনতার পরে ১৯৮৯ সালের " বেদের মেয়ে জোসনা " পুরনো দিনের সব রেকর্ড ভেঙে দিল । এমন কি , সিনেমাটি কলকাতাতেও  রি-মেক হয়ে সুপার ডুপার হিট হয়ে   অবিভাজ্য বাংলা সিনেমার ইতিহাসে জায়গা করে নিল । দুই বাংলার বুদ্ধিজীবীরা মাথা চুলকে এই ছবির তুমুল জনপ্রিয়তার রহস্য খুঁজতে লাগলেন । বাংলা সিনেমায়  এ যাবৎ সর্বকালীন হিট ছবি ছিল গুপী গাইন বাঘা বাইন । বেদের মেয়ে জোসনা গুগাবাবা-র রেকর্ডকেও ছাপিয়ে গেল ।


           তার মানে অবশ্য এ নয় যে, বাংলাদেশের সিনেমা থেকে যাবতীয় সমস্যা- দুর্দশা এক লহমায়  ভ্যানিশ হয়ে গেল। আসলে দুই বাংলাতেই সিনেমা তৈরির সমস্যা একই ধরণের । ১) টাকা পয়সার সমস্যা । ২)  রুচিহীন অপরিণত দর্শক আধিক্যের সমস্যা । কলকাতার মতো ঢাকাতেও সুস্থ রুচির সিনেমাকে  প্রতিনিয়ত মোটা দাগের বিনোদনের সঙ্গে নিয়মিত লড়াই চালিয়ে যেতে হয় ।


       এরই মধ্যে আশির দশকের শুরুর দিক থেকে আমজাদ হোসেন , তারেক মাসুদ , তানভীর মোকাম্মেল , মোরশেদুল ইসলাম সহ বেশ কয়েকজন মেধাবী পরিচালক ব্যাতিক্রমী সিনেমা বানাতে শুরু করলেন । তারেক মাসুদ-এর  " মাটির ময়না " সিনেমাটি  ফ্রান্সের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আন্তর্জাতিক  চলচ্চিত্র রসিকদের সম্ভ্রম আদায় করে নিল । দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এক মোটর দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ মারা গেছেন ।


      টিভি , ভিডিও , ডিজিটাল প্রযুক্তি কলকাতার মতো ঢাকার বাংলা সিনেমার জগতেও একই রকমের  ঝামেলা এনে ফেলেছে । ওখানেও প্রচুর সিনেমা হল একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । এককালে বাংলাদেশের টিভি ধারাবাহিক গুলোর খুব সুনাম ছিল । কিন্তু হায়, ঢাকার টিভি ধারাবাহিকের মানও আজ ক্রমশ নীচের দিকে নামছে । বাংলাদেশের টেলিফিল্ম গুলো খুবই উন্নতমানের । সেখান থেকে গত কয়েকবছরে নতুন নতুন অনেক অভিনেতা অভিনেত্রী , পরিচালক উঠে এসেছেন ।


       স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে চলচ্চিত্র উন্নয়ন পর্ষদ তৈরি হয়েছিল । কিন্তু সরকারি উদ্যোগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিকতা একটা প্রধান বাধা । আজ ওই উন্নয়ন পর্ষদ সম্পর্কে দুর্নীতি ও সরকারি টাকার অপব্যবহারের অনেক অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায় । 


        কিন্তু এরই মধ্যে বাংলাদেশের সিনেমার যে জিনিসটি আমাদের নজর কাড়ে , তা হচ্ছে , গল্পের বিষয় বস্তুর নতুনত্ব , সোনার বাংলার অপরূপ প্রকৃতির অসামান্য চিত্রায়ণ এবং একঝাঁক প্রতিভাবান অভিনেতা অভিনেত্রীর দুর্দান্ত অভিনয় । চঞ্চল চৌধুরী কিংবা জয়া আহসানের অভিনয়ের খ্যাতি আজ কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে দুই বাংলাতেই সমান জোরদার । জয়া আহসানের অভিনয় সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আঙিনাতেও নজর কেড়েছে ।


         এক কথায় , হাজার সমস্যা সত্ত্বেও কলকাতার সিনেমার পাশাপাশি ঢাকার বাংলা সিনেমাও কিন্তু সমানতালে এগিয়ে চলেছে । বরং সিরিয়াস সিনেমা নিয়ে ওখানকার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ এবং ধারাবাহিক চর্চা অনেক জোরালো । কলকাতার চেয়ে একটু বেশিই জোরালো । সিরিয়াস সিনেমা নিয়ে কলকাতায়  বছরে যত বই প্রকাশিত হয় , ঢাকায় প্রকাশিত হয় , তার চেয়ে অনেক বেশি ।  গৌতম ঘোষ- বুদ্ধদেব দাশগুপ্তদের পরে কলকাতা থেকে খুব বেশি বাংলা সিনেমা কিন্তু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করে আনতে পারে নি । আগামী কয়েক বছরে  বাংলাদেশের কোনও পরিচালক যদি বার্লিন-ভেনিস-কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে সর্বোচ্চ  সম্মান অর্জন করে নিয়ে আসে , আমি কিন্তু অবাক হব না ।


       এই সব নানা কারণে , যারা সব দিক দিয়ে বাংলা সংস্কৃতির , বিশেষত , বাংলা সিনেমার উন্নতি চান , তাদের বাংলাদেশের  বাংলা সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার কোনও উপায় নেই ।


       সুখে দুঃখে , সমস্যায়- সম্ভাবনায়  কলকাতা এবং ঢাকার বাংলা সিনেমার মধ্যে আরও কিছু মিল অমিল আছে । বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে আরও কিছু কথা বাকি রয়ে গেল । পরের সপ্তাহে সেগুলো নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে রইল ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...