রবিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২১

বেইমানের ঠিকানা সন্ধান || উদয়াদিত্য ভরালি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

 বেইমানের ঠিকানা সন্ধান 

উদয়াদিত্য ভরালি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস 










দর্পণ

নিজেরই মুখটা দেখে হঠা চমকে উঠার মত হল। সবার চেয়ে পরিচিত মুখ। দেখে চমকে ওঠার প্রশ্নই উঠেনা। যদি কোনো কারনে চমকে উঠার মত পরিবর্তন অকস্মাত্ দেখা দেয় তাহলে সেটা আলাদা কথা। তবে সব সময় দেখে আসা মুখটাই, যার প্রতিটি খুঁটিনাটি ততটাই পরিচিত। অন্তত সেরকমই তো মনে হয়।কুসিত হলেও  যা আপ্ন।যার খুঁতটাও সহ্যকর। সেই একান্ত পরিচিত মুখটা দেখে চমকে উঠার কোনো প্রশ্নই উঠেনা।সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনা সর্বদা স্বাভাবিকতার নিয়ম মেনে চলে না। এই মুহূর্তে যেমনই চলুক না কেন।

ধারণাটার জন্ম হল অকস্মা। ব্যতিক্রম রূপে। নিজের চিরপরিচিত নিখুঁত মুখটাকেই পরিচিত আয়নায় দেখে হঠা চমকে যাওয়ার মতো।

রক্তের রং লাল। জানা কথা। সবসময় দেখে আসছি। প্রত্যেকের রক্তের রঙই যে লাল তা নিয়ে কখনও  চিন্তান্বিত ছিলাম না। এটা এতটাই স্বাভাবিক যে এটা কখনও চিন্তার কারন হয়ে উঠেনি।নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো। অনবরত নিয়ে থাকি। নেওয়াটাই অলঙ্ঘনীয় নিয়ম। নিঃশ্বাস কেন নিই আমার মতই অন্য মানুষেরা অম্লজান সেবন করে না করেনা, আমার ফুসফুস অন্য মানুষের মত না কি- সেই সমস্ত কি ভাবার কথা? জীবনের সবার চেয়ে দুরদৃষ্ট কথাটি হল- জীবন প্রক্রিয়ার যে সমস্ত নিয়ম অলঙ্ঘনীয় সেগুলি এতই অলঙ্ঘনীয় যে সে সবের কথা কদাচিই ভাবা হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটাই হল।

সবসময় দেখে আসা, অথচ আগে কখনও চিন্তার কারণ হয়ে না উঠা জিনিসটা দেখে এই মুহূর্তে আমি অসহ্য তাড়নায় ভুগছি।মানুষগুলির কী হয়েছে? আমার কি হয়েছিল? নাকি এখন আমার কিছু হয়েছে? আমি কি জানতাম না- রক্তের রং লাল! মানুষ কি জানেনা রক্তের রং লাল!

আমার সামনের টেবিলে রক্তে মাখামাখি হয়ে মৃতদেহটা চি হয়ে পড়ে রয়েছে।একটা মাঠের মাঝখানে। ঠিক যেভাবে চাঙের উপরে আমার সোনা চি হয়ে পড়েছিল। মৃতদেহটার থেতলে যাওয়া মাথা থেকে ঝলকে ঝলকে রক্ত বেরিয়ে আসছে তার মুখমন্ডলের উপর দিয়ে।পাকা বাঙীর মতো। রক্তের চাকা চাকা ঢেকে থাকা সত্ত্বেও বোঝা যায় সেটি কোনো একটি শক্তিশালী যুবকের মুখ। যেভাবে রক্ত জমাট বাধা সত্ত্বেও আমি আমার সোনার মুখটা ঠিক বুঝতে পেরেছিলাম।গতবার বিহুতে জামাইবাবু দেওয়া প্রিয় শার্টটা সোনা পরে গিয়েছিল। যে শার্টটা সোনার  নিজের কাঁচা রক্তে ভিজে উঠা আমি একটু আগে দেখে এসেছি।আমার সামনে পড়ে থাকা মৃতদেহটাও একটি শার্ট পরে আছে। কেউ আদর করে দিয়েছিল কিনা জানিনা। মাত্র দেখেছি, আমার সোনার শার্টটার মতোই তার শার্টটাও নিজের রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। সোনা চাঙে যেভাবে পড়েছিল যেন প্রচন্ড গরমের দুপুরে একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে শুয়ে রয়েছে। বয়ে আসা ঘাম তার মুখমন্ডল ঘিরে ধরেছে।তবে আজকের ঘামের রং ছিল লাল। ডুবন্ত সূর্যের চেয়েও লাল। আমার সামনে পড়ে থাকা মৃতদেহটার মুখটা ছেঁকে ধরা রক্তের মতো লাল।

ইস এই মুহূর্তে আমার কী হয়েছে? আমি কী কথাগুলি ভাবছি? কিছু সময় আগে পর্যন্ত আমি তো এরকম ছিলাম না। সামনের টেবিলে চি হয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহটি গত তিন মাস ধরে সেখানে পড়ে আছে। সেই একই মৃতদেহ। সেই একই মাসিক পত্রিকা।সেই একই প্রচ্ছদ। সেই একই ফোটো। জীবন্ত রং মাখানো। একটি মাঠের মাঝখানে মৃতদেহটি পড়ে রয়েছে। হত্যাকারী যেভাবে ফেলে রেখে গিয়েছিল ঠিক সেভাবেই পড়ে রয়েছে।

প্রথম যেদিন সেই ফোটোটা দেখেছিলাম,আমি গর্জে উঠেছিলামঃ বাইরের রিপোর্টারগুলির কাজ দেখ তো!  প্রচ্ছদে দেবার মতো আর ফোটো পেলেনা?এই সমস্ত দেখলে অন্য মানুষ আমার বিষয়ে কী ভাববে! আমার বদনাম করাটাই যেন এই রিপোর্টারদের কাজ!

সোনার পড়ার টেবিলে গত তিন মাস ধরে পড়ে থাকা ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদটা দেখলেই আমার মনে কিছু ভাব এলে এই ধরনের ভাব আসত।এমনকি কিছু সময় আগে পর্যন্ত। তখন পর্যন্ত মৃতদেহটি আমার জন্য কোনো পিতার  বুকের ধন ছিল না। সে কেবল ছিল বিপক্ষের একটি মৃতদেহ।যে সমস্ত কিছুর সংখ্যা যতই বাড়ে ততই যেন আনন্দের কথা। ঠিক বল খেলার মতো। বিপক্ষ যত গোল খায় ততই ভালো লাগে। নিজের পক্ষ গোল খাওয়াটা বেদনাদায়ক। মৃতদেহটি যে কোনো পিতার সন্তান, তাকেও যে কোনো হত্যাকারী নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে, তার মৃত্যুও যে পিতার হৃদয়ে হাহাকার তুলেছে- সেই সমস্ত কথা আমার মনে ছিলই না।

অথচ এই মুহূর্তে আমার কী হয়েছে? সেই একই মৃতদেহ। সেই একই ম্যাগাজিন। সেই একই প্রচ্ছদ। সেই একই ফোটো। গত তিনমাস পরিবর্তন হওয়ার মধ্যে কেবলমাত্র ম্যাগাজিনটির বয়সের পরিবর্তন হয়েছে। বার্ধক্য ত্বকের  উপরে ছাপ রাখার মত পাতাগুলির মসৃণতা কমে এসেছে। পাতাল কোনগুলি ধীরে ধীরে খসে পড়ছে।কোণগুলি  কুঁচকে যাচ্ছে।প্রচ্ছদে ঘন হয়ে উঠেছে ধুলোর আস্তরণ।ফোটোটার জীবন্ত কিছুটা মলিন হয়ে এসেছে।

যেভাবে মলিন হয়ে পড়েছে টেবিলের কাছের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখা সোনার ফোটোটার রঙ।প্রথম যখন সাজিয়েছিল তখন সেটা ছিল স্পষ্টতায় উজ্জল। যা ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্নতার অনাদরে হয়ে উঠেছিল মৃত মাছের ফুলের মতো নিস্তেজ। আর এই মুহূর্তে?সোনার সেই ফোটোটা ঝকমক করে উঠছে।কখনও না ওঠা ঝলমলানিতে।কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সেটা ছিল আমার সোনার একমাত্র ফোটো।জীবন্ত সোনার প্রাণহীন ফোটো।ওটা  আমার মৃত সন্তানের জীবন্ত ফোটো। লুপ্ত অস্তিত্বের দীপ্ত স্মৃতি।ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে থাকা ফোটোটার গায়ে যেন নতুন রঙের উজ্জলতা এসেছে।কখনও না ওঠা সজীবতায়। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সেটি ছিল বিপক্ষের একটি মৃতদেহ মাত্র। যার মৃত্যুতে,যার যন্ত্রণায় কষ্ট পাবার মতো আমার কিছুই ছিল না। ঠিক বল খেলার মতো। আর এখন? এটা হয়ে পড়েছে একটি মৃত সন্তানের প্রতিচ্ছবি। যার পিতা আছে।যে পিতার পুত্র শোকের বেদনা আছে।

ইস আমার কি হয়েছে? আমি কি কথাগুলি ভাবছি? তবে কথাগুলি আমি জানি বলে ভাবছি। ভাবনাগুলি  দেখছি না ভেবেই আসছে! আজকের দিনটা আমি কি ভুলতে পারব? কিন্তু আজকের দিনটাও দেখছি অন্য দিনগুলির মতোই ছিল। সূর্য উঠেছিল,পাখি ডেকেছিল,বাতাস বইছিল,ফুল ফুটেছিল, আমি খাবার খেয়েছিলাম, নিঃশ্বাস নিয়েছিলাম- সমস্ত কিছু অন্য দিনের মতোই ছিল। তুফান,বন্যা, ভূমিকম্প,মহামারী-কিছুই ছিল না। তবে একটি মাত্র ঘটনা সমস্ত ওলটপালট করে দিল। সমস্ত পরিবর্তিত হয়ে গেল। আমার সত্তা, চিন্তা,বিবেক- সমস্ত কিছুই একটিমাত্র খবরে।

অন্য দিনের মতোই আজও বিকেলে প্রতিবেশী কয়েকজনকে নিয়ে আড্ডা মারছিলাম। আড্ডার বিষয়বস্তু আজও সেই একই ছিল-বর্তমানে শুরু হওয়া যুদ্ধ। আজ কিছুদিন ধরে সেটাই আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্য কয়েকদিনের মতো আজও বিপক্ষেকে অভিশাপ দিয়েছিলাম,অকুণ্ঠ আবেগে আত্মপক্ষকে সমর্থন করেছিলাম। বল খেলার গোলের হিসেব নেওয়ার আদর্শে যুদ্ধটির লাভ লোকসানের হিসাব করছিলাম। তখনই তুফানের বেগে,বন্যার নিষ্ঠুরতম গ্রাসে,ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে,মহামারীর সমস্ত ভয়াবহতা নিয়ে খবরটা এসেছিল।

তার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত বর্তমানে শুরু হওয়া যুদ্ধটা আমার জন্য ছিল বল খেলার মতো। যে খেলায়  আমি ছিলাম একজন অতি উসাহী দর্শকমাত্র। জিতলে ভালো লাগে, হারলে খারাপ লাগে। কিন্তু খেলার মাঠ  অতিক্রম করে এলেই সেই অনুভূতিরও  অন্ত পড়ে। খেলা এবং আমার মধ্যে একটা ব্যবধান ছিল। বাস্তব এবং কল্পনার ব্যবধান।যুক্তি এবং আবেগের ব্যবধান। খেলোয়াড় এবং দর্শকের ব্যবধান।

কিন্তু ঘটনাটা হঠা আমাকে দর্শকের আবেগিক গ্যালারি থেকে উঠিয়ে এনে খেলোয়াড়ের বাস্তব অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিল। এই কয়েকদিনের মতোই সকালবেলা ভাত খেয়ে সোনা বেরিয়ে গিয়েছিল।আমারই পরোক্ষ উৎসাহে  বর্তমানের যুদ্ধে সে উঠে পড়ে লেগেছিল।এটা সর্বগ্রাসী যুদ্ধ। এখন প্রতিটি লোক কোনো না কোনো পক্ষে। এমনকি ন্যায়-অন্যায়েরও নিজের নিজের পক্ষ আছে। কিন্তু এই জীবন্ত খেলায় সোনাও যে একজন খেলোয়াড়,যার একটা বিপদসংকুল অবস্থান আছে, সেই কথা উপলব্ধি করিনি। হয়তো ভেবেছিলাম, কিন্তু উপলব্ধি করিনি। কারণ এটা এমন একটি খেলা যেখানে সমস্ত গণনা আবেগে বহমান।তাছাড়া ভেবেছিলাম,এই খেলায় আমি একজন অতি উসাহী দর্শকমাত্র, যার উন্মাদনায় খেলা জমে, যার নিরুসাহে খেলা নিস্তেজ হয়, কিন্তু যিনি নিজে খেলেন না। যদিও এটি আমার দলেরই খেলা তবুও একটি ব্যবধান রয়েছে। দর্শক এবং খেলোয়াড়ের। যুক্তি এবং আবেগের। বাস্তব এবং কল্পনার।

খবরটা বাস্তবের সমস্ত নগ্নতা নিয়ে এল। তেমনি নগ্ন রুক্ষতা। আমার সোনা বিপক্ষের আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছে। খবরটা আমাকে একটানে দর্শকের নিরাপদ দূরত্বে থেকে ছেঁচড়ে নিয়ে গেল খেলোয়াড়ের বিপদসংকুল অবস্থানে।রামচন্দ্রের অবস্থা যেভাবে দশরথকে অন্ধমুনির অবস্থানে ছেঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল। আর তারপরে?

হাসপাতাল। আমার হৃদয়ের টুকরো। চাঁঙ। মূর্ছিত। আত্মপক্ষ। প্রতিপক্ষ।বিপক্ষকে অভিশাপ।কুঁজী বুড়ির কুটিলতা।কৈ্কেয়ীর চক্রান্ত। সান্ত্বনা-বাণী।

অনেক কিছু। তার বেশির ভাগেরই অর্থ আমি হয়তো উপলব্ধি করতে পারিনি। এখনও সেইসব বাস্তব বলে মেনে নিতে পারিনি। আমার হৃদয়ের টুকরো, আমার সোনা চাঙেশুয়ে রয়েছে। আমি যে তাকে নিজের কলিজার  এক টুকরো ভেবেছিলাম সে কথা কি সোনা জানত? সোনা কত আদরের ছিল সে কথা কি আমি জানতাম। সে যদি চাঙে না শুয়ে থাকত আমরা কি নিজের অনুভূতিকে উপলদ্ধি করতাম? হারানোর পরে যত আশার,থাকতে কি তত আশার  মায়ের অবস্থার কি হয়েছে?মায়ের শোকের সঙ্গে পিতার শোক তুলনা করা যায় কি?সন্তান শোকে উদ্বেল না হওয়া পিতা হয়তো আছে,মাতা আছে কি?

ভাবতে চেষ্টা না করেই আমার মনে ভাবনাগুলি আসছে। সান্ত্বনা দিতে আসা বন্ধুরা কখন বাড়ি ফিরে গেছে। আমাকে দেখাশোনা করতে থাকা ছেলে দুটিও বসে থাকা চেয়ার দুটিতে শুয়ে পড়ল। কিন্তু আমি জেগে আছি। হয়তো মাও জেগে আছে। হয়তো তার জ্ঞান ফিরে আসেনি। একটা সময় আমার ঘুমের ভাব এসেছিল। মনের ক্লান্তিতে। কিন্তু এখন আমি সম্পূর্ণ জেগে আছি।

দেওয়ালের ঝুলিয়ে রাখা সোনার ফোটোটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছি। তার শৈশব,তার কৈশোর, একের পর এক দৃশ্য হয়ে আমার চোখের সামনে দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। আমরা যেন সোনাকে আগে ভালো করে লক্ষ্য করিনি। হাসলে তার চোখ দুটি নেচে উঠত কি? গালে টোল পড়ত কি? তার নাক-মুখ আমার মতো ছিল, না মায়ের মতো ছিল? সোনার চেহারাটাই তো দেখছি ভালো করে মনে করতে পারছিনা। সোনার চেহারাটা এখন মাত্র ফোটোটাই নাকি? ফোটোটা কি কথা বলতে পারে? হাঁটতে পারে,ভাত খাবে? লড়াই ঝগড়া করবে? হাসবে? কাঁদবে? একের পরে এক দৃশ্যের মতো ভাগগুলি না ভাবতেই মনের মধ্যে চলে আসছে। বুকে ব্যথা হচ্ছে। কীসে যেন চেপে ধরেছে বলে মনে হচ্ছে। আমি সোনার ফোটোটার দিকে তাকাতে পারছিনা।

নিঃশ্বাস সহজ করার জন্য আমি চোখ জোড়া জোর করে সরিয়ে আনলাম। ঘরের অন্য জিনিস গুলোর উপরে আমার চোখ দুটি ঘুরে বেড়াতে লাগল। সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যহীনভাবে। তেমনই অসতর্কতায়। চোখদুটি এবার সোনার পড়ার টেবিলে পড়ে থাকা মৃতদেহটার উপরে গিয়ে পড়লল।দেখব বলে দেখছিলাম না।এমনিতেই চোখ পড়ে গেল।ধীরে ধীরে আমার দৃষ্টিতে সতর্কতা ফিরে এল। আমি যতই দেখব না বলে ভাবছি আমার অবাধ্য চোখজোড়া ততই মৃতদেহটার উপর গিয়ে পড়ছে।ওটা বিপক্ষে একটি মৃতদেহ-মনকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।কিন্তু আমার চোখজোড়া  আরও অবাধ্য হয়ে উঠেছে।একটা সময়ে চোখদুটি মৃতদেহটার উপরে স্থির হয়ে রইল।

  যুবকটির চোখজোড়া অর্ধ মুদিত। মাংসল ঠোঁটদুটির ফাঁক দিয়ে একটা সামনের দাঁত চোখে পড়ছে। আমি ঠোঁটদুটির দিকে আবার তাকালাম।একটা সময়ে আণুবীক্ষণিক দৃষ্টিতে। কিছু একটা দেখে আমার শরীরটা শিউরে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে আমার দৃষ্টি সোনার ফোটোর দিকে ছিটকে গেল। একটা দৃশ্য মনে পড়ল।গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সোনার মুখ। যে মুখ দুই একবার দেখা আমার মনে পড়ছে। অর্ধমুদিত চোখ, মাংসল ঠোঁট গুলির ফাক দিয়ে দেখা না দেখা যেন সামনের দাঁত একটির আভাস।

আমি পুনরায় শিউরে উঠলাম। সোনার ফোটো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে আমি যুবকটির মুখের দিকে তাকালাম। তারপরে আমার চোখ জোড়া সোনার ফোটোটা এবং যুবকের মুখের উপর দিয়ে আসা-যাওয়া করতে লাগল।

এখন গভীর রাত। আমি জেগে আছি। নিজের সঙ্গে কথা বলছি। এই কথোপকথনে ফাঁকির কোনো অবকাশ নেই। নিজেই নিজের জবাবদিহি।আমি সম্পূর্ণ একা রয়েছি। সতর্কতার প্রয়োজন নেই। আমার চোখ জোড়া একবার সোনার ফোটো আরেকবার যুবকের মুখের উপরে আসা-যাওয়া করছে। তেমনই এক অসতর্ক মুহূর্তে আমি প্রশ্নটা করে ফেললাম। নিজেকে।

এই যুবকটির বাবা ছিল কি? মা একা? তার মৃত্যুতে তাদের কি অবস্থা হয়েছিল? প্রশ্নটি মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত কিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। আমার মাথা ঘুরতে লাগল। নিজের চিরপরিচিত নিখুঁত মুখটা পরিচিত আয়নায় দেখে আমি যেন হঠা চমকে উঠেছি। আমি আমাকে যেন চিকার করে জিজ্ঞেস করবঃ আমি কি জানতাম না রক্তের রং সব সময় লাল? আমি কি জানতাম না বেদনার রং সবসময় নীল?

ইস আমার কি হয়েছে? সোনার ফোটোটা, যুবকের ফোটোটা রুমের সমস্ত জিনিস ঘুরতে আরম্ভ করেছে। দেওয়ালের ফোটোতে, ওই যে আমার সোনা।

সোনার পড়ার টেবিলে পড়ে আছে বিপক্ষের এই মৃতদেহ। দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত মেরু। কিন্তু এসব কি হচ্ছে? সমস্ত জিনিস ঘুরতে আরম্ভ করেছে কেন? আমার সোনা দেখছি দেওয়ালের ফোটো থেকে বেরিয়ে এল। প্রচ্ছদের ফটোতে মৃতদেহটা যে জায়গায় পড়েছিল সেই জায়গায় দেখছি আমার সোনা শুয়ে পড়ল!ঠিক  চাঙে শোবার মতো করে।প্রচ্ছদের শক্তিশালী যুবকটি দেখছি উঠে এসেছে। সে দেখছি সোনার ফোটোটার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে!সোনা খালি করে দিয়ে আসা জায়গাটা সে দেখছি ঘিরে ধরেছে।ওদের দুজনের গায়ের রংটা দেখছি ঘুরে ঘুরে মিশে যাচ্ছে। 

এত লাল! জবা ফুলের মতো!

এত নীল। সাগরের মতো।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতা ৫০২-৫০৪ || অলোক বিশ্বাস || "i-যুগ"-এর কবিতা

     আটপৌরে  কবিতা ৫০২-৫০৪ || অলোক বিশ্বাস || "i-যুগ"-এর কবিতা  আটপৌরে কবিতা : অলোক বিশ্বাস ------------------------ ৫০২. দু'প...