বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৭, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

  একজন বুড়ো মানুষ-১৭,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(১৭)

সঞ্জয় আর কিছু বলল না, চোখ দুটো বুজে  মনে মনে পড়ে রইল.। আর সে দিকে তাকিয়ে বিজয় ভরালীর বুকটা একটা অব্যক্ত বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। সঞ্জয়ের এত কম অসুখ-বিসুখ হয় যে তাকে এভাবে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখা দৃশ্যের কথা মনেই পড়ে না। সেইজন্য যেন এখন তাকে একটা বড় অসহায় শিশু বলে মনে হতে লাগল। তাঁর বড় ইচ্ছে হল যেন তিনি উঠে গিয়ে সঞ্জয়ের কপালে একটু হাত বুলিয়ে দেয়,, কিন্তু ইচ্ছে হলেও তিনি চেয়ার থেকে নাড়াচাড়া করতে পারলেন না, সামনে বইটা মেলে নিয়ে সেখানে তিনি পাথরের মূর্তির মত বসে রইলেন আর তারপরে তার মনের চোখের সামনে এসে দাঁড়ালো একটি নারীমূর্তি। ইলা। কিন্তু আজ সেই মুখ হাসি ভরা নয়, উদ্বেগে কাতর। পোনার যখন ছয় সাত  বছর বয়স তখন তার বোধহয় একবার এভাবে সর্দি জ্বর হয়েছিল। বিজয় ভরালীর মনে পড়ে গেল। তিনি এখন  দেখা এই উদ্বিগ্নতায় ভরা মুখ নিয়ে ইলা পোনার বিছানার কাছে বসে ছিল। বিছানা কিন্তু তখন এত ধবধবে পরিস্কার ছিল না। এমনকি পোনাকে দেখার জন্য তখন কোনো ডাক্তার ও আসেনি। ইলা দিন-রাত তার কাছে বসে বসে গরম তেলে রসুন ভিজিয়ে সেই তেল তার বুকে পিঠে মালিশ করে দিয়েছিল ।বিকেলবেলা গরম জলে পা ধুইয়ে সেই গরম তেল দিয়ে সেক দিয়েছিল। মাথা টিপে, হাত পা টিপে, তার কাছে বসে ছিল ইলা। বিজয় ভরালীরও বার দুয়েক সর্দি জ্বর হওয়ার সময় এই একই পরিচর্যায় ইলা তাকে সুস্থ করে তুলেছিল। কিন্তু এখন সেই পরিচর্যার বদলে ডাক্তার এবং প্রেসক্রিপশনে লেখা নানা ওষুধপত্র এসেছে। মাথাটা টিপে দিলে পোনা কিছুটা আরাম পেত নাকি? কিন্তু বিজয় ভরালী নড়াচড়া করতে পারলেন না। চেয়ারে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। বিজয় ভরালীর তন্ময়তা ভাঙলো পুনরায় ছেলের কণ্ঠস্বরে -'তুমি ভাত খাও গিয়ে বাবা-'
' ভাত?ও হ‍্যাঁ, এগারোটা বাজে দেখছি, পোনার টেম্পারেচারটা নেওয়ার সময়ও হয়ে গেছে এখন,  ওর খাবার ব্যবস্থাও করতে হবে-।' বিজয় ভরালী তৎপর হয়ে উঠলেন।
সঞ্জয় কিন্তু প্রায় কিছুই খেতে পারছিল না - না কি খাচ্ছিল না? ভাতের পাতে বসে হাত দিয়ে ভাতগুলি নাড়াচাড়া করতে করতে বিজয় ভরালী ভাবলেন কমলার উপরে অভিমান করেই কিছু খেল না নাকি পোনা? কিন্তু অভিমান কথাটাও আজকের যুগের আধুনিকা মেয়ের ক্ষেত্রে খাটে না নাকি- স্বাধীন দেশের স্বাধীন মেয়ে কমলা। এখনও সে চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থেকে স্বামীর সেবা শুশ্রূষা করে ঘরোয়া জঞ্জাল শেষ করে, ছেলে মেয়ে লালন পালন করে, জীবনটাকে শেষ করে দিতে পারে কি? কখন ও পারে না। তাছাড়া বিজয় ভরালী পুরোনো যুগের মানুষ হলেও সেটা নিশ্চয় চান না।  মেয়েরা চিরদিন বাড়ির চার সীমানার মধ্যে বন্দী হয়ে থাকুক সেটাকে তিনি কখনও  মেনে নিতে পারেন না। আগের দিনে সত্যিই অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের অনেক অত্যাচারে জর্জরিত হতে হত। বউ হিসেবে শাশুড়ি ননদিনীর অত্যাচার, স্ত্রী হিসেবে স্বামীর অত্যাচার বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনো ধরনের সম্বন্ধ না থাকা কোনো বিষয়েই  নিজের মতামত বলতে না থাকা সত্যিই বড় দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হত সেই সময়ের নারীদের। এখন যে তারা মুক্তি পেয়েছে সেটা বড় ভালো কথা। এতে বিজয় ভরালী খুবই সন্তুষ্ট। তাদের সময়ে পথে-ঘাটে মেয়েদের খুব কমই দেখা যেত, যুবতী মেয়েদের তো আর ও কম কম দেখা যেত। অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যেই এই দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হল। এখন যেন ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়েরা, যুবতীরা, আধবয়সী মহিলারা, রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে এখন যুবতী মেয়েদের যেমন সপ্রতিভ পোশাক, সপ্রতিভ চলাফেরা পৃথিবীর কাউকে পরোয়া না করা ভাব নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখে  বিজয় ভরালীর বুড়ো চোখ বিষ্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে যায়। সত্যিই এই দ্রুত নারী জাগরণ বড় শুভ লক্ষ্মণ-কিন্তু-কিন্তু-বিজয় ভরালীর পুরোনো দিনের কুসংস্কারাচ্ছনন্ন মনটা যেন একটু কুঁচকে যায় -প্রকৃত স্বাধীনতা বড় ভালো জিনিস, তা মনের মুক্তি আনে,মনের প্রসারতা বৃদ্ধি করে-কিন্তু স্বাধীনতার নামে তার অপব‍্যবহার?  এই যে মেয়েরা এতটা স্বাধীন হয়েছে- তা মেয়েদের মনকে মুক্ত প্রগতিশীল করে তুলেছে কি? আধুনিক অসমিয়া পত্রপত্রিকায় পড়া কিছু বীভৎস গল্প-উপন্যাসের কথা বিজয় ভরালীর মনে পড়ে যায়। কেবল বই পড়ে জীবন কাটানো মানুষ বিজয় ভরালী, তাই সমস্ত ধরনের লেখা তিনি পড়েন। আর এখনকার পত্রপত্রিকায় কি লিখেছে তা জানার জন্য তিনি অসমীয়া পত্র পত্রিকা পড়েন এবং সেই সব পড়ে তিনি অনেক আধুনিক লেখকের পাণ্ডিত্য  এবং সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ শক্তির  প্রতি সশ্রদ্ধ প্রশংসার ভাবও পোষণ করেন কিন্তু তার মধ্যেও এরকম কিছু গল্প উপন্যাস পড়েছেন যা পড়ে তিনি মাঝেমধ্যে বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন । বিজয় ভরালী তখন  ভেবেছেন -' অসমীয়া যুবতীরা স্বাধীন হয়ে এই মুক্তির জীবন কাটাচ্ছে নাকি? অন্তত রাস্তায় দেখা  যুবক-যুবতীর কিছু অংশ নিশ্চয়  এই জীবনকে বেছে নিয়েছে। সেসব পড়ে তখন তার মনে পড়ে যায় রাসেলের একটা কথা -'two things ,viz . Motor-cars and contraceptives have revolutionized the modern civilization…'
একটুখানি খাওয়া ভাতের থালায় এক গ্লাস জল ঢেলে দিয়ে চেয়ারটা একটু জোরেই টেনে বিজয় ভরালী খাবার টেবিল থেকে উঠে এলেন। তারপরে গামছায় হাতদুটি মুছতে মুছতে মনটাকে খুব কঠোর করার চেষ্টা করে নিজের মনে বিড়বিড় করলেন-’আজ কমলা স্কুল থেকে এলে ওকে কয়েকদিন ছুটি নিতে বলব। স্বামীর অসুখের সময় কোনো মহিলা এভাবে স্বামীকে ফেলে রেখে যাওয়া উচিত নয় ।
কিন্তু সেই ভাবা কথা তার মনের মধ্যেই থেকে গেল।বিকেলে কমলা স্কুল থেকে এসে তাকে সঞ্জয়ের জ্বরের কথা জিজ্ঞেস করল, কী খেয়েছে,না  খেয়েছে জিজ্ঞেস করল, আর তারপরে যখন কমলা সঞ্জয়ের কাছে গিয়ে তার কপালে হাত দিয়ে জ্বরের উত্তাপ পরীক্ষা করল,বিজয় ভরালী  ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। কমলাকে বলার কথাটা তার মনের মধ্যেই অকথিত থেকে গেল। 
তিন চারদিন ধরে জ্বরে ভুগে  সঞ্জয় তারপর একদিন ভালো হয়ে উঠল।...পৃথিবীতে সব কিছুর শেষ আছে। একদিন বিজয় ভরালীরও জীবনের শেষ সময় এসে উপস্থিত হল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পূরবী- ৭০ ।। অভিজিৎ চৌধুরী ।। Purabi- 70

পূরবী- ৭০  অভিজিৎ চৌধুরী  কোজাগরী পূর্ণিমা খুব কাছেই।তারও আগে তুমুল নির্বাচন পর্ব।জোড়াসাঁকোর বাড়িতে যাওয়ার কথা হল।অধ্যাপিকা দেখাবেন।বাইশে শ্...