বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১৪, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

 একজন বুড়ো মানুষ-১৪,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,



(১৪)

‘কিন্তু কমলা, দেশের দুরবস্থার কথা ভেবে তুমি লোকজনকে নিমন্ত্রণ করা থেকে বিরত রয়েছ,, যদি দেশের প্রতি তোমার এতটাই ভালোবাসা তাহলে গৃহ প্রবেশের খরচ করার জন্য রাখা টাকাটা আমরা প্রতিরক্ষা পুঁজিতে দিয়ে দিই এস-'
আজ বোধহয় কমলাকে ভালোভাবে ক্রোধিত করে তোলার জন্য সঞ্জয় উঠেপড়ে লেগেছে .।চিন্তিতভাবে বিজয় ভরালী ভাবলেন। কী হয়েছে আজ পোনার? আগে তো কখনও কমলার সঙ্গে এভাবে সে বাদ প্রতিবাদ করত না।’
 ‘ঠিক বলেছ, প্রতিরক্ষা পুঁজিতে হাত উপুড় করে দিনের পরে দিন দান দক্ষিনা করতে থাকি আর এদিকে আমার ছেলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হোক- তার রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষা-দীক্ষার যা খুশি হোক- আমার ছেলে রক্ষা নাপাক, দেশরক্ষা পেলেই আমার হবে- এত উদার মনের মানুষ হতে পারব না। স্বীকার করছি আমার মন ছোট, আমার মন নিচ।’
‘তোমার ছেলের জন্য বড় চিন্তা, তাই না কমলা? কিন্তু এত চিন্তা কর যে তুমি কী নিশ্চিন্ত মনে একজন অপরিচিত আয়ার হাতে তাকে তুলে দিয়ে সারাদিনের জন্য চলে যেতে পার!’
 তুমি এখাোন  থেকে বেরোও। তোমার চিৎকারে এখন সোনা জেগে যাবে। তোমার অনেক উপদেশ শুনলাম- ছেলে কীভাবে বড় করতে হবে সেই উপদেশ অন্তত তোমার কাছ থেকে না শুনলেও আমার চলবে। তুমি চাও এখন থেকেই আমার আঁচলের নিচে ছেলেকে ঢেকে রেখে তোমার মত অলস ও অসাংসারিক এবং বাজে ধরনের আবেগিক করে তুলি। সেটা আমি কখনও হতে দেব না। চোখের সামনে তোমাকে দেখে আমার ছেলেকে দ্বিতীয় একটি তুমি হওয়া থেকে রক্ষা করার প্রাণপণ চেষ্টা করব। আমি আমার ছেলের জন্য এরকম একটি ঘরের সৃষ্টি করব যেখানে বড় হয়ে এসে জীবনে আলস্য কাকে বলে জানবে না, বেহিসেবি কাকে বলে জানবে না এবং আজেবাজে সেন্টিমেন্টের জন্য কোনো ধরনের কোনো প্রশ্রয় সে আমার কাছ থেকে কখন ও পাবে না। দেখি, তুমি এখন এখান থেকে বের হও।’
 একটা দীর্ঘনিশ্বাস বিজয় ভরালীর অন্তর ভেদ করে বেরিয়ে এল। তিনি আজ তা রোধ করার কোনো চেষ্টাই করলেন না। আসলে তার কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। সঞ্জয়ের আট বছর বয়সে মায়ের মৃত্যু হওয়ার সময় তিনি ভেবেছিলেন এই অতি কোমল বয়সে ছেলেটি ঘরের আসল মমতা, আসল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ল। আজ সুদীর্ঘ ২২ বছর পরে সেই ভাবটা পুনরায় মনে উদয় হল বিজয় ভরালীর। কিন্তু এবার আর সঞ্জয়ের কথা ভেবে নয়, সঞ্জয়ের ছোট্ট শিশুটির কথা ভেবে। অবশেষে কমলারা একদিন সেই রিফাইনারির ঘরটা ছেড়ে দিয়ে নিজের বাড়িতে চলে গেল।
নতুন বাড়িতে মোট সাতটা ঘর। তারই এক প্রান্তের একটি ঘরে বিজয় ভরালীর থাকার ব্যবস্থা করে  দেওয়া হল। ঘরটা ভালোই, বাড়ির একপ্রান্তের মাথায় সেই ঘরটা, তাই সেখান থেকে তিনি সামনের রাস্তার জনসমাগম দেখে  দেখেও এখন অনেক সময় কাটিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু পথের এত মানুষ গাড়ির কোলাহলের এত কাছে থেকেও বিজয় ভরালীর হঠাৎ মনে হল তার নিঃসঙ্গতা যেন বেশি বেড়ে গেল। কমলারা বাড়ির ওপাশে তিনটি রুম নিয়ে থাকত, আর বিজয় ভরালীর রুমটি হল একেবারে এই মাথায়, মাঝখানে ড্রইংরুম এবং করিডর তাকে কমলাদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এখন তিনি সঞ্জয় আর কমলার কথাবার্তা শোনাতো দূরের কথা, বাচ্চার কান্না পর্যন্ত শুনতে পান না। ফলে এক ভীষণ নিঃসঙ্গ এবং অসহায় ভাবে তার মন হাহাকার করতে লাগল। সেই অবস্থায় তিনি নিজের মনকে তিরস্কার করলেন যে ছেলে বৌমার কথা লুকিয়ে লুকিয়ে শোনার শাস্তি ভগবান তাকে এভাবেই দিলেন। 
তারপরে সঞ্জয় এবং কমলার ভেতরে হওয়া কোনো কথার বিজয় ভরালী শুনতে পেলেন না। কিন্তু কানে না শোনা কথা গুলি তিনি এখন কল্পনার শ্রবণেন্দ্রিয়তে জোরে জোরে যেন আঘাত করতে লাগল। আগেই শুনে রাখা কথাগুলোর উপরে নির্ভর করে তিনি যেন কল্পনাতে ছেলে বৌমার প্রতিটি কথাই শুনতে পাচ্ছেন আর তার নিঃসঙ্গ কর্মহীন নিস্তব্ধ জগতে  সেই কাল্পনিক প্রতিবাদের শব্দগুলি তার মনকে খুব রূঢ়ভাবে আঘাত করতে লাগল। কোনো কোনো সময় নিজেকে নিয়ে তিনি খুব অতিষ্ঠ হয়ে উঠেন। এতদিন তার মনে একটা সৌম্য শান্ত কারুণ্য বিরাজ করছিল।,বই পড়ছিলেন,দৈনন্দিন জাগতিক প্রয়োজনের সামান্য কাজগুলি সমাধান করতেন এবং ধীরে মন্থর গতিতে উদাস শান্তির জীবনটা এগিয়ে চলছিল। কিন্তু এখন কমলাদের বাড়ি তৈরি করার সময় থেকে তার মনের সেই শান্তি হারিয়ে গেল। মন নামের আপদ  থেকে ইলার মুক্তির মাধ্যমে চিরদিনের জন্য মুক্তি পাওয়া ভাবা মানুষটার মনটা এখন চিরস্থায়ীভাবে অশান্ত চঞ্চল হয়ে রইল।কী কুক্ষণে যে তার ছেলের বাড়ি তৈরি করার কথাগুলো শোনার জন্য জঘন্য কৌতুহল মনকে চেপে ধরেছিল।কী খুঁজতে গিয়ে কী পেলেন-অমৃতের খোঁজে গিয়ে হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ হতে হয়েছে।
কিন্তু- বিজয় ভরালী ভাবলেন, ছেলের ঘরোয়া জীবনের সম্ভেদ না জানলে তার মন শান্তিতে থাকত সত্যিই কিন্তু সেই শান্তি হত অসত্যের ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত ।মিথ্যা শান্তি, সেই শান্তি তাকে স্বার্থপর তৃপ্তিতে সবসময় ডুবিয়ে রাখতে সত্যি কিন্তু তারই রক্তমাংসের একটা অংশ চিরদিন অশান্তিতে একা একা দিন যাপন করত- কী দরকার এরকম ফাকি এবং প্রবঞ্চনায় ভরা মানসিক শান্তির? নিজের মনেই মাথা নাড়লেন বিজয় ভরালী। তার সামনে বই খোলা পড়েছিল কিন্তু এই চিন্তাগুলি মনটাকে সব সময় এভাবে অধিকার করে রইল যে আজ কাল যেন তিনি আগের মতো আর পড়াশোনায় মনসংযোগ করতে পারেন না। বই নাকি মানুষের জীবনের প্রধান সঙ্গী আর সে কথা বিজয় ভরালীর জীবনে এই সেদিন পর্যন্ত সত‍্য ছিল। কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন বই ও সঙ্গী হতে ব্যর্থ হয়।
নিঃসঙ্গ একটা জীবন না কাটালে বোধহয় চিন্তাগুলি এত বেশি চেপে ধরত না। বিজয় ভরালী ভাবেন, এবং তার প্রতিকার হিসাবেই তিনি এখন নিজের রুমটা যথেষ্ট বড়োসড়ো হওয়া সত্ত্বেও সামনের বারান্দায় বসে প্রায়ই সামনের পথ দিয়ে আসা যাওয়া করা মানুষের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার হাতে এখন আগের মতো বই থাকে না কিন্তু শুধুমাত্র রাস্তার মানুষের ভিড়ের লোভেই নয় অন্য একটি বড় লোভ বারবার বিজয় ভরালীকে সামনের বারান্দায় বের করে আনে। আয়া সামনের বারান্দায় রূপুকে  প্রায়ই প‍্যারাম্বুলেটরে শুইয়ে এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে বেড়ায়। নাতিকে দেখার সেই লোভে তিনি ঘরের ভেতরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেন না। কিন্তু একবার দুবার ওকে কোলে তুলে নেওয়া ছাড়া বেশিক্ষণ মনের আশ মিটিয়ে আদর করার সাহস করেন না। কে জানে হয়তো কমলা অসন্তুষ্ট হবে.. কমলা মনে করে দাদুর কাছ থেকে বেশি আদর পেলে নাতি অলস হয়ে উঠবে, বাস্তব জগতের কঠোরতার সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার জন্য জীবনটাকে উপযুক্ত ভাবে গড়ে তুলতে পারবে না। আধুনিক মানুষ, আধুনিক মানুষের জীবনযাত্রায় কত জটিলতার মারপ‍্যাঁচ-কত সমস্যা দেখা দিয়েছে। আধুনিক মানুষের সামনে, বিজয় ভরালীর মতো পুরোনো কালের বুড়ো মানুষ একজন কী বুঝবে- বোধহয় তার বিষয়ে এভাবেই ভাবে কমলা। বোধহয় ভাবে কেন,কমলা তো বলেই,-’বাবাদের সেই good old days আর নেই,কিন্তু বাবা সেই অতীতের চোখেই আজকের জগৎটাকে দেখছেন,সেইজন্যি বাবা ভাবছেন-বাড়িটা তৈ্রি করতে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়ে পড়ল…’ আচ্ছা কমলা কী কথায় এই কথাগুলি পোনাকে শুনিয়েছিল এখন তাঁর মনে পড়ছে।কমলার বাড়ি তৈ্রি করতে এত বেশি টাকা খরচ হচ্ছিল যে তিনি একদিন কমলাকে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন বাড়িতে এত বেশি খরচ না  করে একটু সাধারণভাবে করলে হয় না কি?হাতে যে আর টাকা নেই।কিন্তু কমলা বলেছিল ,চলে না,কারণ মানুষের জীবনের মান এখন অনেক উন্নত হয়েছে,এখন মানুষ কেবল গ্রু-পশুর মতো সাধারণভাবে খেয়ে -ঘুমিয়ে জীবন কাটাতে চায় না,এখন মানুষ আর্টিষ্টিকভাবে জীবন যাপন করতে শিখেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

চ্যাটমোড লিখনশৈলীতে লেখা কবিতা-৮৪ || সৌমিত্র রায় || "i-যুগ"-এর কবিতা

  চ্যাটমোড লিখনশৈলীতে লেখা কবিতা-৮৪ সৌমিত্র রায়  "i-যুগ"-এর কবিতা মেদিনীপুর; ২৬-০২-২০২১; সন্ধ্যা৬:৪০; কথা বলছে ৷ মাইক ৷ রাজনীতির ক...