রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

জন্মদিন || সৌরভ কুমার চলিহা || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস

 জন্মদিন

সৌরভ কুমার চলিহা

 মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস




কাগজে বলেছে যে আজ একটি রাজ্যের একজন মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর  ৬০ বছরের জন্মদিন, সেই উপলক্ষে সরকারি কর্মচারীদের অতিরিক্ত আড়াই শতাংশ বোনাস ঘোষণা করা হয়েছে এবং সরকারি কার্যালয়গুলি আধা  দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানীর প্রধান রাজপথগুলি শাসক পার্টির পতাকা এবং মহিলার প্রতিকৃতিতে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। সেই জায়গা গুলি রঙ বেরঙের লাইট দিয়ে আলোকিত করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে একটি জাঁকজমকপূর্ণ প্রীতি মিলনের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রী, আমলা, কয়েকজন সাংসদ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, নামকরা চিত্রতারকা এবং খেলোয়াড়, মাফিয়া, ডন, এবং ‘ডিস্ক জ’কি’ ইত্যাদি- খবরের কাগজের অনুমান অনুসারে পুরো কারবারটিতে  কম করেও দুই কোটি টাকা বিলীন হয়ে যাবে। ৬০ বছরের জন্মদিন হেতু ‘মেরিডিয়েন’ 

পের হোটেলের এক বিখ্যাত সুইস শ্বেফ প্রস্তুত করবে ৬০কেজি ওজনের এক বৃহৎ ‘বার্থডে’- কে’ক... 

এই মহিলার বিভিন্ন স্ক্যাম, বিলাসবহুল জীবন ধারণ এবং দুই হাতে জনগণের টাকা উড়িয়ে দেবার কথা প্রত্যেকেই জানে, খবরটা পড়ে খুব বেশি অবাক হলাম না, অবাক হলাম এখন এই কথা মনে পড়ে যাওয়ায় যে আজ দেখছি আমারও জন্মদিন। কী যে এক সমাপতন, একটি যুগপৎ ঘটনা, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় Coincidence।

ভদ্রমহিলার চেয়ে আমার বয়স দশ বছর বেশি হবে, কিন্তু অবশ্যই, আমার ক্ষেত্রে কোন ৭০ কিলোগ্রাম ওজনের কে’কের প্রশ্ন উঠে না। কিন্তু আমাকেও কি কেউ অন্তত ৭০ গ্রামের কে’ক একটুকরো খাওয়ালে আমি খারাপ পাব? জন্মদিনের আয়োজন করব না, কিন্তু কেউ যদি দিনটি স্মরণ করে অন্তরের অন্তস্থলে আমি কি খুশি হব না? কিন্তু তার সম্ভাবনা কতটুকু?

 আমার জন্মদিনের কথা অবশ্য আমার নিজেরই মনে থাকেনা, অন্যের তো দূরের কথা। বস্তুত আমি এবং রীতাও বোধহয়  চট করে বলতে পারব না আমাদের পরস্পরের জন্মদিন কবে কবে। আমাদের গ্রামের বাড়িতে সেভাবে জন্মদিন পালন করার পরম্পরা ছিল না, যদিও শৈশবে দুই একবার জন্মদিন বলে স্মরণ করে কিছুটা খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল, পিকনিকে যাওয়া হয়েছিল। ফোটো তোলা হয়েছিল। শহরে আসার পরে দেখাদেখি আমরাও আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্মদিনের আয়োজন করেছি, আশেপাশের ছেলেমেয়েদের ডেকে এনে আনন্দ-ফুর্তি করেছি- তারপরে ধীরে ধীরে সেইসব বাদ পড়েছে, ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেছে, তারপরে বিয়ে-শাদি করে চাকরির ঠেলায় বিদেশে চলে গিয়েছে

( ছেলে দুটি ইঞ্জিনিয়ার এবং ডাক্তার, দুজনেই এখন আমেরিকায়, মেয়েটি কম্পিউটার বিজ্ঞানী, জামাইয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায়)। আমার নিজের বিয়ে হয়েছে অনেক দেরি করে। কোনো আড়ম্বর না থাকা বাড়ির মেয়ে,কোনো মার প‍্যাঁচ নেই, পরস্পরের জন্মদিনের কথা তো বাদই, বিবাহ বার্ষিকীর দিনটাও আমাদের কারও মনে থাকেনা- কোনো বছর হয়তো রীতার হঠাৎ মনে পড়ে, তখন কিছুটা অপ্রস্তুত ভাবে একটু লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে দিনটিকে কিছু একটা দিন উদযাপন করি, সেই মাত্র, তার বাইরে একটা দিন অন্য একটি দিনের মতোই, সমস্যা এবং শূন্যতায় ভরা, দৈনন্দিনতার আবর্তে অলক্ষিত উপেক্ষিত হয়ে পার হয়ে যায় জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, নববর্ষ- হয়তো সাময়িক দু-একটি ব্যতিক্রমের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে প্রাত্যহিকতা- বাজার-টাজার, বিদ্যুতের সমস্য, জলের পাম্প বন্ধ হল, ফ্রিজের তারটা ইদুরে কেটে দিয়েছে বৃষ্টির ফলে পেছনের উঠানে জল জমেছে, গ্যাস শেষ হয়ে গেছে, টেলিফোন বিকল, লাইটের বিল, মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্স, হঠাৎ একটা ‘বন্ধ’ কারও বিয়ে, কারও আশীর্বাদ, কারও মৃত্যু হল, সর্দি-জ্বর, ডায়াবেটিস, মাথাব্যথা, ভাইরাল ফিভার, কিন্তু তবুও দেখছি সময় কাটে না। একবার পায়চারি করি, একবার চেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ি,আড়মোড়া ভাঙ্গি, খবরের কাগজ পড়ি তার পরে তার ক্রসওয়ার্ড করি, হাইম উঠে,ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাই- পড়ার ইচ্ছে ছিল বিজ্ঞান কিন্তু আইএসসিতে খারাপ করায় বিজ্ঞানের সিট পেলামনা, অর্থনীতি পড়লাম। কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়ে একটা কৌতূহল এখনও রয়েছে, মাঝে মধ্যে জনপ্রিয় বিজ্ঞানের দু-একটি বই পড়ি (গেম’ আসিমভ ইত্যাদি), কল্পবিজ্ঞান কাহিনিও পড়তে ভালোবাসি (এইচ জি ওয়েলস,জুলে ভার্নে, আর্থার সি ক্লার্ক…), একটা আলাদা  জগতে যেন প্রবেশ করি,একঘেয়ে নিরানন্দ সময় যেন বিচিত্র ধরনের সম্ভাবনায় পূর্ণ হয়ে ওঠে...আঃ, ‘সম্ভাবনা’ ‘সম্ভাবনা’র কথাও পড়ে আবিষ্ট হই, ঠিক বুঝিনা, কিন্তু নিজের মনোজগতেই যেন নানা রকমের সম্ভাবনার  উন্মেষ এসে পড়ে- ‘সম্ভাবনা’ কথাটা আজ আরও একটি ধোঁয়াশা,বিমূর্ত জিনিস নয়, গণিতজ্ঞরা সম্ভাবনার ধারণাটা  দিয়ে নাকি একটি প্রণালীবদ্ধ বিজ্ঞানই নির্মাণ করে ফেলেছে, হতে পারে- নাও হতে পারে’ ধরনের অস্পষ্ট অনির্ণেয়তা নয়, কোন ঘটনাটা হতে পারে বা পারেনা তার সম্ভাবনা এখন সংখ্যায় প্রকাশ করা যেতে পারে- অবশ্য আমি কেবল তার ছোট ছোট উদাহরণ দুটি বুঝতে পেরেছি, যেমন- একটা টাকা  যদি উপর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয় (টস করা  করা হয়) তা মাটিতে পড়লে দুটো জিনিস  দেখাতে পারে, এপিঠ বা ওপিঠ (‘হেড’ বা ‘টেইল’), অর্থাৎ ‘হেড’পাওয়ার সম্ভাবনা হল দুটির একটি, অর্থাৎ ১/২,তেমনই,  ‘টেইল’ পাওয়ার সম্ভাবনাও হল ১/২( যাকে বলে ফিফটি-ফিফটি চান্স) তেমনই,৫২ পাতার সাজানো তাস থেকে যদি কেউ একপাতা তাস টেনে নেয়, তাহলে হাতে আসা তাসের ৫২টি সম্ভাবনা আছে, হাতের তাসটা তারই ১টি মাত্র, অর্থাৎ তাসটা ‘হরতনের ছয়’ (বা ইস্কাপনের গোলাম বা অন্য কোনো)হওয়ার সম্ভাবনা হল ১/৫২ আর ‘হরতনের ছয়’ না পাওয়ার সম্ভাবনা হবে ৫১/৫২,কেননা ‘হরতনের ছয় নয়’ এই ধরনের তাস রয়েছে ৫১টি, ইত্যাদি -মোটকথা ‘পাওয়া না পাওয়া’ বা ‘হওয়া না হওয়া’ দুটো সম্ভাবনার ভগ্নাংশ দুটি মিলে হবে ১ (যাকে বলে ‘নিশ্চয়তা’)... আমার এবং মুখ্যমন্ত্রীর জন্মদিন মিলে যাবার সম্ভাবনা কতটা? নিশ্চয় সেটাও সংখ্যা দিয়ে বলা যেতে পারে... এভাবেই অলস অসংলগ্ন চিন্তায় সময় পার হয়ে যায়- দুই একজন অভ্যাগত অবশ্য মাঝেমধ্যে আসে, অন্য নিজের মানুষ বিশেষ আসেন না, আত্মীয়-স্বজন বলতে সেভাবে আজকাল বড় বেশি নেই, থাকেও দূরে দূরে, বয়স্কদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয়েছে, নতুন প্রজন্মের সেভাবে আসা-যাওয়া নেই, বয়স্কদের মধ্যে রয়েছি আমি, যোগেশ কাকা আর মাইকণ মাসি( মেসোর কিছুদিন আগে মৃত্যু হয়েছে)। মাইকণ মাসিকেও বহুদিন দেখিনি- বয়স বা কত হল- এখন কয়েকদিন হল গোলাঘাট থেকে এসেছে রীতার ভাইয়ের মেয়ে রুণুমী, এবার ম্যাট্রিক দিয়েছে্‌,রেজাল্ট বের হয়নি, ঘরটার শূন্যতা কিছু কমেছে, ঘরের আবহে নতুন ধরনের শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে, রুণুমী পিসির এটা ওটা কাজে সাহায্য করে দেয়, দুজনে মিলে সখের বাজার করে, দুই একটা বাড়িতে বেড়াতে যায়, নতুন ক্যাসেট এনে শুনে, আমি তাকে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করি কীসে কীসে লেটার পেতে পারে( ফার্স্ট ডিভিশন তো পাবেই),স্টার মার্ক পাবে কিনা, এখন কী পড়বে-

 কাগজটা ফেলে দিয়ে ভাবছি এখন কোথায় যাই, তখনই দেখি রীতা রুণুমীর দুই কাঁধে হাত রেখে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে,মুখে একটা স্মিত হাসি, রুণুমীকে দেখে মনে হল এইমাত্র স্নান করে ভেজা চুল মেলে এসেছে, কী কথা বলব ভেবে জিজ্ঞাসা মুখে চাইতে যেতেই রুণুমী নিচু হয়ে  আমার পায়ে হাত দিয়ে  প্রণাম করল।

 ‘ও’ রুণুমী - কী হল?

 না, একটু লাজুক হেসে রুণুমী বলল, ‘আজ আমার জন্মদিন।’

 ‘আজ তোর জন্মদিন!’একেবারে অবাক হয়ে গেলাম, একসঙ্গে তিনটি জন্মদিন! বাঃ বাঃ ভালো কথা। মেনি হ্যাপি রিটার্নস- বেশ বেশ -আচ্ছা কত নম্বর জন্মদিন?( সতেরো পার হয়ে আঠারোতে প্রবেশ করল’রীতা বলল) ও তাই নাকি? বেশ বেশ- কালকে কেন বললে না,আজ কিছু একটা আয়োজন-

 ‘সেটাই তো বলতে চাইছি’, রীতা বলল, ‘তোমাকে এখন একবার বেরোতে হবে, রুনুমীকে সঙ্গে নিয়ে যাও, এই যে আমি একটা লিস্ট করেছি- সালোয়ার কামিজের কাপড় পাঁচ  মিটার,রুণুমী পছন্দ করে নিক, ভবানী স্টোর্সে পাবে, আর একটি লেডি ডায়না সেন্ট, সিটি বেকারী থেকে আইসিং দেওয়া একটা ভালো বার্থডে- কে’ক চকলেট এবং বেলুন ও লাগবে, রিংকু বাবলিদেরও  ডাকবতো( প্রতিবেশী ছেলে মেয়ে ) মুরগিও লাগছিল- না লাগবে না। বসুন্ধরা কেবিন থেকে চিকেন কারি নিয়ে আসবে, টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে যাবে আর মিষ্টির মধ্যে…’ আমার জন্মদিনের কথা রীতা উল্লেখ করল না, নিশ্চয়ই মনে পড়েনি।

                     *                           *                     *                               *

রুণুমীর  সঙ্গে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করলাম- ভবানী স্টোর্সে তার পছন্দের কাপড় পাওয়া গেল না, মডার্ণ ক্লথ হাউসে যেতে হল- মাঝখানে আবার মাইকণ মাসির কথা মনে পড়ল,ভাবলাম,বিকেলে  রুণুমীর জন্মদিনে মাসিকেও ডাকব নাকি? কিন্তু মাসির বয়স হয়েছে, কয়েক বছর আগে বুকে একটা পেসমেকার বসিয়ে নিয়েছে, ঘুরে বেড়াতে কষ্ট হয়, এতদূর থেকে আসতে কষ্ট হবে, ছেলেরা গাড়িতে করে নিয়ে না গেলে কোথাও যায় না- আর ডাকলে তো ছেলে বৌমাকেও ডাকতে হবে। রীতা পুরোটা সামলাতে পারবে কিনা- আচ্ছা, বাড়িতে গিয়ে রীতার সঙ্গে আলোচনা করে দেখব… সেই কবে মাইকণ মাসিরা আমার জন্মদিনের অনুষ্ঠান করেছিল, আজ আমার জন্মদিনের তারিখটা মাসির মনে আছে কি?  তার ‘সম্ভাবনা’ই বা কতটা? নিশ্চয় সেটাও একটা সংখ্যা গণনা করে বের করে দেওয়া যেতে পারে?… যদি একটা লুডুর ছক্কা দিয়ে দান ফেলি তাহলে একটা ‘৪’ পাওয়ার সম্ভাবনা হল ১/৬, কেননা ‘৪’ হল পাশাটিতে অঙ্কিত ৬ টি সংখ্যার ১টি- সেভাবে ‘৪’ না পাওয়ার সম্ভাবনা হবে ৫/৬, কেননা ‘৪ নয়’, সে ধরনের সংখ্যা হল ৫টি, অর্থাৎ একবার পাশা ছাড়লে সংখ্যা একটা পাওয়ার চেয়ে না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি আর এখানেও, দুটি সম্ভাবনা মিলে হবে ১, অর্থাৎ দুটি সম্ভাবনার যেকোনো একটি হওয়ার ‘নিশ্চয়তা’… 

…মাইকণ মাসিকে আরও কতদিন পাব বা পাব না তার সম্ভাবনা কত? পরিসংখ্যাবিদরা নাকি এই বয়সের একজন মানুষ আর কতদিন বেঁচে থাকতে পারে তার সম্ভাবনা হিসাব করে বের করে দিতে পারে ( বীমা কোম্পানিগুলি নাকি কোনো মানুষের জীবন বীমা করার সময় এই ধরনের সংখ্যার তালিকা চায়), যে ভাবে গণনা করে সংখ্যা দিয়ে বলে দেওয়া যেতে পারে সম্ভাবনা কতটা,যে আজ বৃষ্টি হবে, আগামীকাল এই গোলাপ গাছে ফুল ফুটবে, আগামী এক সেকেন্ডের মধ্যে এই তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম পরমাণু বিভাজন হবে কিনা …রুণুমী আর আমার জন্মদিন একসঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা কত? জর্জ গেম’এর একটি জনপ্রিয় বিজ্ঞান পুস্তকে এই ধরনের একটি যুগপৎ জন্মদিনের উদাহরণ ছিল- কী ভুলে গেছি- বইটি আরও একবার দেখতে হবে… মাইকণ মাসিকে টেলিফোন করব কি করব না… একটা বিরতি দিই- দুজনেই একটি দোকানে দাঁড়িয়ে দুটো আইসক্রিম খেয়ে নিলাম… এই যে রিডার্স বুক স্টল, এখানেও একবার ঢুকে দেখি, রুণুমীকে আমি একটি বই উপহার দিই,ও বেছে নিক- ও, আমিও একটু খবর করি নতুন কোনো সায়েন্স ফিকশন এসেছে কিনা-

                            *                        *                           *                                *

দুপুর বেলা খেয়ে উঠে ভাবলাম কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিই, তারপরে মাইকণ মাসির কাছে ফোন করব, তখনই মনে পড়ল গেম’এর বইটির কথা, আলমারি খুঁজে  বইটা বের করলাম, পাতা উল্টে গেলাম, ও, এই যে- জন্মদিনের কথা-গেম’ লিখেছেন, ‘মনে করুনতো, কখনও একই দিনে দুটো জন্মদিনের উৎসবে আপনি আমন্ত্রিত হয়েছেন কিনা? আপনি হয়তো বলবেন যে সে ধরনের ডাবল নিমন্ত্রণের সম্ভাবনা বড় কম, কেননা এই ধরনের নিমন্ত্রণ জানাতে পারা আপনার বন্ধুর সংখ্যা প্রায় ২৪ জন, আর বছরটিতে রয়েছে ৩৬৫ দিন, যেগুলিতে তাদের জন্মদিন পড়তে পারে। তাই এতগুলো সম্ভাব্য দিনের মধ্যে আপনার ২৪ জন বন্ধুর ২ জন একই দিনে তাদের কে’ক কাটার সম্ভাবনা খুবই সামান্য- কিন্তু অবিশ্বাস্য যেন মনে হলেও এটা একেবারে সত্যি যে আপনার সিদ্ধান্ত একেবারেই ভুল’-গেম’ তারপরে সংক্ষেপে গণিতের সম্ভাবনার সূত্র প্রয়োগ প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন যে আমাদের এই দুই ডজন বন্ধুর দুজনের জন্মদিন একই তারিখে পড়ার সম্ভাবনা হল ০.৪৬ (অর্থাৎ ৪৬/১০০, মানে আধার চেয়ে অল্প কম) অর্থাৎ সেই দুজন বন্ধুর জন্মদিন একই তারিখে পড়ার সম্ভাবনা  হল ০.৫৪ (মানে, আধার চেয়ে অল্প বেশি, ‘ফিফটি-ফিফটির চেয়ে বেশি!) তাই (গেম’ মন্তব্য করেছেন) আপনি যদি কখনও একই দিনে দুটি নিমন্ত্রণ পাননি, তাহলে আপনি এটাই প্রবল সম্ভাবনা বলে ধরে নিতে পারেন যে হয় তারা ঠিকমতো জন্মদিন পালন করেনা, না হয় আপনাকে ডাকে না।

… তন্দ্রার ভাব এসেছে, চোখ বুজলাম… মানে, আমার পরিচিত মানুষগুলির মধ্যে একই দিনে দুজনের জন্মদিন না পড়ার চেয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি… সবকিছুই সম্ভাবনার কথা- সম্ভাবনাগুলিই নিয়ন্ত্রণ করছে জীবন এবং জগত… আধোঘুম আধো জাগরণের মধ্যে অস্পষ্ট ভাবে মনে পড়ল এক জায়গায় পড়েছিলাম একজন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীর কথা, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল(তিনিই নাকি আবিষ্কার করেছিলেন যে আলো হল এক ধরনের বিদ্যুৎ চুম্বক তরঙ্গ বা রঞ্জন রশ্মি বা রেডিও তরঙ্গের মতো), তার বিভিন্ন গবেষণা গাণিতিক ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট, কিন্তু তিনি এক জায়গায় বলে গেছেন যে বিশ্বের প্রকৃত যুক্তিবিচার নিহিত রয়েছে সম্ভাবনার গণিতে, ‘the true logic of this world is in the calculus of probabilities’… সম্ভাবনার গণিতে… চোখ বুজে আসছে- আধোঘুমে আধো জাগরণে… ক্রিং ক্রিং… জেগে উঠলাম, টেলিফোন বাজছে-

‘হ্যালো’? ও বাপু নাকি ? আমি মাইকণ মাসি বলছি-‘

‘ও, মাইকন মাসি!’ অবাক হলাম, ইস রাম আমিও আপনাকে ফোন করব ভাবছিলাম- ও, আচ্ছা-ও  মাসি শরীর কেমন আছে? বাড়ির সবাই ভালোতো?

ঠিকই আছে । তোদের ?

‘কথাটা হল, তুই এবং রীতা  আজ বিকেলে একবার এখানে আসবি-'

' আজ বিকেলে? কেন?'

'এই- মানে জন্মদিন বলে এবার -'কান থেকে সরিয়ে নিয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমি টেলিফোনটার দিকে তাকালাম- হতে পারে কি যে আজ এত বছর পরে মাইকণ মাসির মনে পড়ল যে আজ আমার জন্মদিন? এরকম একটি আশ্চর্য স্মরণ সম্ভব কি? বললাম, জন্মদিন কার জন্মদিন?'

'কার আর!আমারই।' 

'আপনার?' স্তম্ভিত হলাম 'আপনার জন্মদিনের কথা তো আজ পর্যন্ত কিছু শুনিনি- আজ হঠাৎ কীভাবে-?'

' আর বলিস না'- কথাটা হঠাৎ মনে পড়ল- সঙ্গে সঙ্গে সোনটি  এবং জোনটি জন্মদিনের আয়োজন করে ফেলেছে। মানী এবং ভনটিও এসেছে, (মাইকন মাসির ছেলে মেয়ে), আচ্ছা, আগে তোরা এখানে আয়, এখানেই সব কথা খুলে বলব -'

হতভম্ব ভাবটা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি, তবু চেষ্টা করে স্বাভাবিক কন্ঠে বললাম 'না-  মাসি, হ্যালো কথাটা হল আজ আমরা যেতে পারব না। আমাদের এখানে কিছু একটা আয়োজন করেছি,-মানে,গোলাঘাট থেকে রুণুমী  এসেছে, আজ নাকি তার ও জন্মদিন, তাই আমরাও এখানে বিকালে কিছু একটা পাতব বলে ভেবেছি-'

  ‘রুণুমী এসেছে? কবে ?'

   'আজ এক সপ্তাহ হল।'

  ‘ও তাই নাকি? ও এবার ম্যাট্রিক দেওয়ার কথা ছিল না? পাশকরেছে?'

' না পরীক্ষা দিয়েছে,রেজাল্ট বেরোবে আগামী ২৭ তারিখ।'

  'ও'তাই নাকি? আজ তার ও জন্মদিন?  এভাবে বাড়ির প্রত্যেকেরই জন্মদিন একই দিনে  পড়তে হয়? যাই হোক, ওকে আমার কথা বলিস। আশীর্বাদ জানিয়েছি বলবি।'

 'আচ্ছা বলব'  যাইহোক, তোদেরটা শেষ করে একবার এখানে আয়। রীতাকে নিয়ে আসবি।'

না, সেটা তো হবেনা। আশেপাশের কয়েকজন ছেলে মেয়েকে ডেকেছি,ওদেরকে ফেলে রেখে কীভাবে যাব?-  আগামীকাল- মানে যাব দেখি, হবে কি?

‘ জন্মদিন হল আজ ,কাল এসে কী করবি ?একটু দেরি করে এলেও আজকেই একবার আয়।’

‘ আচ্ছা দেখছি।

ফোনটা নামিয়ে রাখলাম,মনে পড়ল যে এক জায়গায় পড়েছিলাম যে একদিন একটি রাস্তার প্রতিটি ঘড়ির দোকানে যতগুলি মানুষ ঘড়ি মেরামত করাতে এনেছিল সেই প্রতিটি ঘড়িই ছিল কেবল বিভিন্ন মডেলের 'ওমেগা' ঘড়ি। এই ধরনের একটি সমাপতন  বা coincidence  ঘটার 'সম্ভাবনার' সংখ্যাটির নিশ্চয়ই কোনো গণিতজ্ঞ বের করেছেন, কিন্তু ধারণা হচ্ছে, আমাদের জ্ঞাতি  কুটুম্বের মধ্যে একই দিনে তিনটি জন্মদিন পড়ার সম্ভাবনাটা বোধহয় গেম’ দুই ডজন বন্ধুর ক্ষেত্রে হিসাব করে বের করা ০.৫৪ সংখ্যাটাও ছাড়িয়ে গেল, বোধহয় ‘ফিফটি-ফিফটি’র চেয়েও বেশ কিছু বেশি- 

                                *                              *                                      *

রুণুমী একটি বরগীত গাইল, আমি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ভিডিওতে দুটি কার্টুন ছবি দেখালাম, বাচ্চারা খুব মজা পেল, ওদের বিদায় দিয়ে ফ্রী হতে হতে প্রায়  সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেল, রীতাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, রুণুমিরও পেট কামড়ের  মতো কিছু একটা হচ্ছে, ওরা দুজন আর আমার সঙ্গে বের হতে চাইল না-রীতা মিষ্টি আদি কিছুর একটা প্যাকেট বেঁধে দিল, সঙ্গে সে বানানো গাজরের হালুয়া না অন্যকিছু একবাটি, সেটা নিয়ে আমি একাই বেরিয়ে পড়লাম। রাতে আজকাল আমি আর গাড়ি চালাতে পারি না,একটা অটো নিলাম, বিরাট ট্রাফিক জ্যাম, পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে গেল, মাইকণ মাসির ঘর নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে, বেশিরভাগ লাইটই নেভানো,মানী আর ভন্টিরাও চলে গেছে, সোনটি- জোনটি ওদের রেখে আসতে গেছে, এখন ছোট টেবিলের উপরে কয়েকটি উপহারের সামনে মাসি একা  বসে রয়েছেন-

মাইকণ মাসির মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল( দাঁতগুলি এখনও ভালোই রয়েছে, চোখে ক্যাটারাক্ট অপারেশন হয়েছে, কিন্তু চশমা দিয়ে এখনও বইপত্র পড়তে পারেন, অবশ্য আগের চেয়ে চুলগুলি বেশি সাদা হয়েছে), বললেন, ও বাপু এসেছিস, এত দেরি করলি- রীতাদের আনলি না?’

রুণুমীর জন্মদিনের পার্টির কথা বললাম এবং মাসির জন্মদিন- আবিষ্কারের বৃত্তান্তটা শুনলাম। কাল কোনো একটি প্রসঙ্গে জীবন বীমার কথা উঠেছিল (এতদিনে তার কথা ভাবার কোনো প্রয়োজনই হয়নি) সোনটি মেসোর পুরোনো ফাইল থেকে মাসির জীবন বীমার কাগজপত্র বের করল তাতে দেখতে পেল যে মাসির জন্ম তারিখে লেখা আছে আজকের দিনটা। এতদিন মাইকন মাসির জন্মের তারিখ বা জন্মদিনের কথা সোনটি দের কেউ ভাবেনি। এখন যেন ওরা সবাই উপলব্ধি করল যে ওদের মায়ের ও দেখছি একটি জন্মদিন রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ওরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল যে আজ ওরা মায়ের জন্মদিন পালন করবে। তখনই মানী এবং ভন্টিকে ফোন করল- কত বছরের জন্মদিন হতে পারে বলতো মুচকি হেসে মাইক্রোন মাসি বললেন কত আশি  পার হয়ে একাশিতে রেখেছি।'

-‘একাশি!’

-হ্যাঁ, ভাব দেখি, একমুখ হাসি নিয়ে মাসি আমার দিকে তাকালেন, মুখটা যেন আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে, যেন নবজীবন লাভ করেছেন, ‘এটাই আমার প্রথম জন্মদিন’, তারপরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন, বললেন ‘আর শেষ জন্মদিন নাকি-’

‘দূর!’ আমি বললাম, ‘এইতো আরম্ভ। লাইফ বিগিনস অ্যাট এইটটি-’

তোর বা কত হল হিসেবে রাখা হল না- তোর জন্মদিন বা কবে ছিল, তার তো কোনো হিসেব রাখা হল না এতদিনে-’ 

‘আমার?’ দ্রুত প্রসঙ্গ এড়ানোর চেষ্টা করলাম। না,না, আজ সে সমস্ত কথা যেন উঠে না আসে,আজ শুধু আপনার জন্মদিনের কথা-’ কাজ করা মেয়েটিকে ডেকে মাসি চা-জল খাবারের ব্যবস্থা করলেন, জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডায়াবেটিসের ঔষধ খাচ্ছিস কিনা? তোর সুগার  এখন কত?’ ‘ভালো নয়, একটু বরং বেড়েছে।’ ‘তাই নাকি? একটু সাবধানে থাকবি। খুবই খারাপ জিনিস, ডায়াবেটিস। হলেও,ওদের আনা বার্থডে কে’কটার একটুখানি তোর জন্য রেখেদিয়েছি,খুব মিষ্টি কিন্তু, হলেও একটু মুখে দিতে পারবি, একদিন একটু মিষ্টি খেলে কিছু হবে না- মনে কর আজ তোরই জন্মদিন- ও,তাছাড়া আমি নিজেও কিছু ভালো মন্দ তৈরি করেছি, তোদের পছন্দের জিনিস, ভাবলাম ওটাই একটু বানাই, তুইও ভালোবাসিস,এতদিন পরে পারব কিনা-বলতো কী জিনিস?’

‘কী? চমৎকৃত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

‘জিঞ্জার বিস্কুট- তোদের ফেভারিট।’ 

‘ও,  জিঞ্জার বিস্কুট।’ 

চুপ করে গেলাম। মনে হল, আজ হঠাৎ জিঞ্জার বিস্কুটের কথা মায়কণ মাসির মনে পড়ার সম্ভাবনা কতটা? তার নিশ্চয় একটা মান আছে, যা শূন‍্য নয়,মানে আমার জীবনে মনে পড়ে যাওয়া কথাগুলিরও এক একটি সম্ভাবনা আছে, এক একটি সংখ্যা আছে, হয়তো দশমিক শূন্য শূন্য শূন্য কিছু, কিন্তু একেবারে শূন্য নয়… মাইকণ মাসি প্লেটটা সামনে এগিয়ে দিয়ে প্রত্যাশার স্মিত হাসি নিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন- বিস্কুটটা মুখে দিলাম, নাকে এসে প্রবেশ করল তার বিভিন্ন উপাদানের একটি বিমিশ্রিত তীক্ষ্ণ মৃদু গন্ধ,বহুদিন আগের বিস্মৃত একটি সুবাস, চোখদুটি যেন বুজে আসতে চাইল, ধারণা হল যেন এক নিমেষে পার হয়ে গেলাম কৈশোর এবং শৈশব, ঘটনা এবং অভিজ্ঞতার বিভিন্ন ছবির বিচ্ছিন্ন সারি নয়, কিন্তু কোনোভাবে যেন সমস্ত কিছু নিয়ে একটা স্মৃতির সুবাস, একটা স্মৃতি- ‘ক্যাপসুল’ (মনে পড়ল, ফরাসি লেখক মার্সেল প্রুস্তের একটি উপন্যাসের বিষয়বস্তু নাকি এরকমই ছিল)-মাইকণ মাসির সেদিনকার সেই জিঞ্জার বিস্কুটের গন্ধটা এভাবেই ফিরে আসারও একটা ‘সম্ভাবনা’  ছিল নিশ্চয়। নিশ্চয় আছে তারও একটি ছোট দশমিক সংখ্যা- যেভাবে ভেবেছিলেন ম্যাক্সওয়েল, যে জীবন এবং জগতের প্রপঞ্চ রাশির কার্যকারণ নিহিত হয়ে আছে সম্ভাবনার গণিতে, যার ফলে প্রবাহিত হয়ে চলেছে অস্তিত্ব এবং অনুভব, কল্পনা এবং বাস্তব, অতীত এবং ভবিষ্যৎ। সম্ভাবনাগুলি আছে বলেই জীবন আছে। মাথা তুলে মাসির দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির মুচকি হাসি হাসলাম, বললাম, ‘বাঃ সুন্দর হয়েছে, একেবারে আগের মতো’ যেন বোঝাতে চাইলাম যে সম্ভাবনা গণিতে ক্ষুদ্র হলেও একটা সংখ্যা আছে যে মাইকণ মাসির এটাই ‘প্রথম এবং শেষ জন্মদিন’ নয়-

------

লেখক পরিচিতি-১৯৩০ সনে অসমের মঙ্গলদৈ শহরে সৌরভ কুমার চলিহার জন্ম। এটা ছদ্মনাম। প্রকৃত নাম সুরেন্দ্রনাথ মেধি। অসমিয়া ছোটগল্পের নতুন রীতির প্রবর্তক সৌরভ কুমার চলিহা পঞ্চাশের দশকে ‘অশান্ত ইলেকট্রন’ নামে একটি গল্প লিখে সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ গুলি যথাক্রমে ‘অশান্ত ইলেকট্রন’, ‘এহাত দাবা’, ‘গোলাম’ ‘নির্বাচিত সংকলন’, ‘দুপুরিয়া’ ইত্যাদি। ‘গোলাম’ গ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন ।২০১১ সনে মৃত্যু হয়।




1 টি মন্তব্য:

আজ অভিভাবকহীন হলাম || বাসুদেব দাস

আজ অভিভাবকহীন হলাম বাসুদেব দাস   অন্যান্য দিনের মতো আজও সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কম্পিউটারে সৌরভ কুমাৰ চলিহার একটি গল্প বাংলায় অনুবাদ করছিলাম...