বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস ।।২।।


বিদেহ নন্দিনী

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 



 দুই

সন্তান দুটির জন্যই আমি বেঁচে আছি।পিতৃতুল্য বাল্মিকী মাতৃসমা ধরিত্রী এবং আত্রেয়ীর  স্নেহ ভালোবাসা না পেলে হয়তো কোনো একদিন তমসা নদীর জলরাশিতে আমার দেহের অবসান ঘটত।

আমি গত বারো বছর ধরে তপস্বিনী জীবন যাপন করছি।প্রতিদিন অদৃশ্য সেই শক্তির কাছে আমি প্রার্থনা জানিয়ে বলি-‘হে প্রভু আমাকে যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছ, তাই অল্প শক্তি দাও যাতে ছেলে দুটিকে মানুষ করে তুলতে পারি।’আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমার অবিহনেও ঋষি বাল্মীকি ছেলে দুটিকে উপযুক্ত করে তুলতে পারবে। আমার মনে হচ্ছে বৃদ্ধ বয়সে তিনি যেন লব কুশের জন্যই নতুন প্রাণ পেয়েছেন।প্রতিদিন কীভাবে এগিয়ে নিতে হবে তার জন্য ওদের শিক্ষা দিচ্ছেন।কঠোর পরিশ্রম করতে শিখিয়েছেন।অস্ত্র শস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ,সাহিত্য দর্শন সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে দু'জনকেই পূর্ণাঙ্গ করে তোলার জন্য দেহে মনে পরিশ্রম করে চলেছেন। আমার মুখে শোনা সুখ দুঃখের কাহিনি গুলি শ্লোকে রূপান্তরিত করে তাতে সুর দিয়ে লব কুশকে রামায়ণ পাঠ করতে শিখিয়েছেন।

দিনের বেশিরভাগ সময় ছেলে দুটি ঋষির সঙ্গেই থাকে। ওদের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ঋষির। তাই দিনের বেলা আমার কিছুই কাজ থাকেনা। ঋষি যেভাবে কঠোর নিয়মের মধ্য দিয়ে ওদেরকে লালন করছেন তাতে ওদের মনে দুর্বুদ্ধি আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই আমি এই ক্ষেত্রে একেবারে নিশ্চিন্ত।তবু শিক্ষা শেষ হওয়ার পরে ওদের কর্তব্য কীহবে এ কথা চিন্তা করে আমি অশান্ত হয়ে পড়েছি।চিন্তায় আমার রাতে ঘুম আসছে না। আমি দিনের-পর-দিন দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম। মনে ভয় হয়েছিল কে জানে কখন ওরা তাদের পিতৃ পরিচয় জানতে চেয়ে বসে। যা ভয় করেছিলাম একদিন তাই ঘটল।ওদের দুজনেই চূড়াকরণ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরে প্রথমে আমাকে জিজ্ঞেস করল-‘মা   আমরা কে?ব্রাহ্মণ না ক্ষত্রিয়?আমাদের চূড়াকরণ অনুষ্ঠানের কয়েকটি কার্যে দেখছি আচার্য ক্ষত্রিয় রাজকুমারদের যেভাবে করেন সেভাবে অনুষ্ঠিত করেছেন।’

লবের প্রশ্ন শুনে আমি সেদিন থতমত খেয়েছিলাম।কী বলব কী বলব না ভাবতে ভাবতেই কুশ প্রশ্ন করেছিল-‘আমরা আগেও অনেক চূড়াকরণ অনুষ্ঠানে ভাগ নিয়েছি। তখন দেখেছিলাম আচার্য এবং ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা শিষ্যের বিষয়ে জানলেও নিয়ম অনুসরণ করে কুমারের পিতার নাম, গোত্র, বংশের পরিচয় জিজ্ঞেস করে। আমাদের কেন কিছুই জিজ্ঞেস করল না।

ওদের দুজনের প্রশ্নের উত্তরে আমি কেবল একটা কথাই বলেছিলাম-‘তোমরা আমার সন্তান। বর্তমানে এটাই তোমাদের পরিচয়।’কিন্তু লবকুশ এত বুদ্ধি সম্পন্ন এবং অনুসন্ধিৎসু মনের হয়ে উঠেছিল যে ওরা দুজনে একসঙ্গে আমাকে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রশ্ন করছিল।আমি কোনো উত্তর না দিয়ে মৌনব্রত অবলম্বন করেছিলাম।একটা সময়ে ওরা উচ্চস্বরে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল-‘পিতার পরিচয় আমাদের জানাও মা।তিনি জীবিত না মৃত?তিনি আমাদের এবং তোমার প্রতি কেন উদাসীন?আমরা এতই  দুর্ভাগা যে পিতার পরিচয় থেকেও বঞ্চিত?’

 ওদের কথা শুনে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। বোধহয় আমার অবস্থা দেখে ওরা সেখানেই কথার সমাপ্তি ঘটাল।ওরা সেদিন হয়তো এটা বুঝতে পেরেছিল যে পতির পরিচয় জিজ্ঞেস করা মানে আমার অন্তরে দুঃখ দেওয়া।

কিন্তু ঋষি বাল্মীকিকে দুই পুত্র নানা প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে চলেছিল। তিনিও ওদের প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার জন্য অপারগতা দেখানোর সময় লব বলেছিল-‘হে মহাভাগ আপনাকে আর আমাদের পিতৃ পরিচয় দিতে হবে না। হয়তো সেই পরিচয় জানার অধিকার আমাদের নেই। কিন্তু একটা কথা বলুন আপনার সৃষ্টি রামায়ণের শ্লোক সমূহে যে দুটি চরিত্র অঙ্কন করা হয়েছে সেখানে কোথাও আমাদের মা বা এখন পর্যন্ত পরিচয় না জানা পিতার সাদৃশ্য আছে কি?’

 ঋষি শিষ্যের প্রশ্নে যদিও অস্বস্তি অনুভব করছিলেন,তবুও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন দুই শিষ্যকে স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন ‘তোমাদের জন্ম বৃত্তান্ত এবং পিতৃ পরিচয় জানার সম্পূর্ণ অধিকার  আছে কিন্তু তোমরা আমাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে মহাসংকটে ফেলেছ। কারণ তোমাদের জানার অধিকার থাকলেও সে কথা আমার জানানোর অধিকার নেই।’

দুই শিষ্যই বাল্মীকিকে সেই সমস্যা থেকে উদ্ধার করে বলেছিল-‘আচ্ছা গুরুদেব,আমাদের আপনার অনুপম সৃষ্টি রামায়ণের চরিত্রের পরিচয়েরও প্রয়োজন নেই। মাত্র এই কথাটা  বলুন আমাদের কর্তব্য কী হওয়া উচিত? আমরা শিক্ষা সমাপ্ত করে এখন গার্হস্থ্য আশ্রমে পা রেখেছি। আমরা কুল অনুসরণ করে ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়া উচিত? আপনি আমাদের ভবিষ্যৎ বেছে নেবার জন্য কি উপদেশ দিতে চান?

 বাল্মিকী বলেছিলেন- ‘তোমরা সমস্ত কুলের  ঊর্ধ্বে। তোমাদের যে কর্মের প্রতি স্পৃহা হবে তাই হবে তোমাদের ভবিষ্যৎ।’

যদিও ঋষি সেদিন কোনো ভাবে কথাটা সামলে নিয়েছিলেন,ভেতরে ভেতরে তিনি বড় অশান্তি অনুভব করছিলেন।এই সমস্যার কীভাবে সমাধান করা যেতে পারে তার জন্য চিন্তা করতে শুরু করেছিলেন। বোধহয় তাই অযোধ্যা থেকে অশ্বমেধ যজ্ঞের নিমন্ত্রণ আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি লব কুশকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়াটা স্থির করে নিলেন।আমি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি যে ঋষি যে কোনো উপায়ে অযোধ্যার রাজপরিবারকে জানাতে চান যে লব কুশ বিখ্যাত ইক্ষাকু বংশের বংশধর।

 আমাকে যেদিন ঋষি অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্র নৈমিষক্ষেত্রে অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার খবরটা দিয়েছিলেন,আমি দুটি কারণে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলাম।প্রথম কারণটি হল পত্নী বিনা এই উৎসব অনুষ্ঠিত হতে পারে না।আমি বুঝেছিলাম রামচন্দ্র দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন। তাই অল্প সময়ের জন্য আমার মনটা হাহাকার করে উঠেছিল। কিন্তু পরের মুহূর্তে আমি সারাটা জীবন স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া অপমানের কথা স্মরণ করে কঠোর হয়ে পড়েছিলাম।মনটা শক্ত করে ভেবেছিলাম –‘যে ব্যক্তি একজন গর্ভবতী রমণীকে জঙ্গলে নির্বাসন দিয়ে গত বারো বছরে একদিনও খবর করে না তার জন্য মন খারাপ করার কোনো অর্থ থাকতে পারেনা। তাই দৃঢ়তার সঙ্গে ঋষি কে বলেছিলাম –‘হে মহাভাগ, আপনার কথায় বাধা দিয়ে আমি ছেলেদের উপরে মাতৃত্ব দেখাতে চাইনা। কিন্তু এই উৎসবে লব কুশ কে নিয়ে যাওয়াটা সমীচীন হবে না বলেই মনে হয়।আমি জানি আপনার উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ। কিন্তু আপনি যে উদ্দেশ্যে নিতে চাইছেন সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে বলে আমার মনে হয় না। তাছাড়া দ্বিতীয় পত্নীর বর্তমানে প্রথমা পত্নীর সন্তানকে গ্রহণ করাটা সহজ কাজ হবে না। তাছাড়া রামচন্দ্রের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে আমি বিশেষভাবে পরিচিত।তাই আমি ভাবছি সেই উৎসবে লব কুশের অপমান হবে। আমি ওদের অপমান করলে সহ্য করতে পারব না। তাই ওদের উৎসবে নিয়ে যাওয়াটা মঙ্গলজনক হবে না বলে মনে হয়।’

 কিন্তু ঋষি বাল্মীকি নিজের মতে অটল হয়ে রইলেন এবং ওদের দুজনকে সঙ্গে নিয়ে নৈমিষ ক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। মনের মধ্যে কথাগুলি নাড়াচাড়া করার সময় হঠাৎ মাতৃসমা ধরিত্রী এসে উপস্থিত হলেন।তিনি আমার মনে আনন্দ দেবার জন্য বললেন-‘সীতা খুব শীঘ্রই তোমার জীবনটা আনন্দে ভরে উঠবে।তাই তুমি বিষন্ন মনে থাকা উচিত নয়।ঋষি বাল্মিকী নৈমিষক্ষেত্রে লব কুশ এর মাধ্যমে রামায়ণের গান শোনাবে।আমি নিশ্চিত যে রামচন্দ্র ওদের দুজনের গান শুনে অভিভূত হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস রাঘব ওদের পরিচয় পাওয়ার পরে ওদের কাছে টেনে নেবে।’

 আমি ক্ষীণস্বরে বললাম-‘মাতা ধরিত্রী,আমি লব কুশের অপমানে যত কষ্ট পাব ওদেরকে গ্রহণ করলে ততটাই দুঃখ পাব। ওরা আমার কাছ থেকে একেবারে চলে যাওয়ার পরে আমি কি নিয়ে বেঁচে থাকব?’ধরিত্রী বললেন-‘এটা ঠিক জেনো যে ওদেরকে গ্রহণ করার পরে রামচন্দ্র তোমার খোঁজে এসে পুনরায় তোমাকে পত্নীর মর্যাদা দেবে।’

ধরিত্রীর কথাগুলি শুনে আমি চমকে উঠলাম।আমার ঠোটে একটা বাঁকা হাসি খেলে গেল। আমি উপহাসের সুরে ধরিত্রীকে বললাম-‘কী বললে মাতা?পত্নীর মর্যাদা দেওয়ার জন্য রামচন্দ্র আমার খোঁজে আসবে?তিনি এলেও কিন্তু আমি যাব না।তিনি পুনরায় একবার আমাকে পত্নীর মর্যাদা দিতে চাইলেও আমার আর তার সঙ্গে সংসার করার ইচ্ছা নেই।সত্যি কথা বলতে গেলে আমি এমনকি তার চেহারাটাও মনে আনতে ভালো লাগে না।’ 

ধরিত্রীর বাণী কোনোভাবে সত্যি হয় বলে আমার বুকে এক অজানা ভয় প্রবেশ করল।আমি মনে মনে ভাবলাম-‘যদি রামচন্দ্র আমাকে নেওয়ার জন্য মানুষ পাঠিয়ে দেয় আমি কী করব। পুনরায় গ্রহণ করতে পারব কি? গ্রহণ করলেও তার ওপর বিশ্বাস থাকবে কি?পুনরায় যে নির্বাসনে পাঠাবে   না তার কি নিশ্চয়তা রয়েছে?তাছাড়া এখন তাকে মোহিত করার মতো আমার দেহের সৌন্দর্য নেই । কখনও সৌন্দর্য না থাকলেও আচার-ব্যবহার এবং বিশ্বাস মানুষকে সুন্দর করে তোলে। কিন্তু আমাদের মধ্যে আর একের প্রতি অপরের কোনো বিশ্বাস নেই। বেশিরভাগ সময়ই আমার প্রতি তার ব্যবহার ছিল রুক্ষ।তাই পুনর্বার অপমানিত হওয়ার জন্য আমি কখনও আর যাবনা।’- কথাটা বলে জোর করে আমি বসে রইলাম। হয়তো আমার অবস্থা দেখে মাতা ধরিত্রীর হৃদয় কেঁদে উঠল। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন-‘বুঝেছ সীতা, আমরা নারীরা অবস্থার দাস। অনেক ক্ষেত্রে অবস্থা যে কাজ করতে চাইনা তা করতে বাধ্য করে।’

 আমিও আমার ক্ষীণ দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে ধরিত্রীকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললাম –‘মা জননী,আমার আর বেঁচে থাকার মোহ নেই। এই মানুষের পৃথিবী থেকে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করছে।এভাবে কিছুক্ষণ সুখ-দুঃখের কথা বলার পরে ধরিত্রী আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আশ্রমে চলে গেলেন। আমি পুনরায় চিন্তার সাগরে ডুবে গেলাম।


লেখক পরিচিতি-ডঃমালিনীর প্রকৃত নাম নীলিমা শইকীয়া ।উত্তর পূর্ব বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিদ্যার প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক।ইতিমধ্যে রামায়ণী সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন অধিকারে সমর্থ হয়েছেন।মহাকাব্যের নারী চরিত্র নিয়ে সৃষ্টি করা উপন্যাসগুলি হল ‘যাজ্ঞসেনী’, ‘বিদেহ নন্দিনী’, ‘কাশীকন্যা অম্বা’, ‘মন্দোদরী’, ‘ঋষিকন্যা দেবযানী’, ‘উর্বশী’, ‘শকুন্তলা আরু উত্তরা’। চারটি উপন্যাস ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে।‘মন্দোদরী’ উপন্যাসের জন্য ২০১২ সনে অসম সাহিত্যসভার কুমার কিশোর সাহিত্য পুরস্কার এবং ভারতীয় সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৩ সনে বিক্রমশীলা বিদ্যাপীঠ ব্যাসপতি পুরস্কার লাভ করেন।শিশু সাহিত্যে অবদানের জন্য অসম লেখিকা সমারোহ ২০১০ সনে সম্প্রীতি শইকীয়া শিশু সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করেন। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২২/৬ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 22/6 Debjani Basu

  আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ ~ ২২/৬ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু || Atpoure poems 22/6 Debjani Basu   আটপৌরে ২২/৬ আটপৌরে২২/৬ ১. পৃথিবী ...