বৃহস্পতিবার, ২০ মে, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~১০ || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস (দশ)

 বিদেহ নন্দিনী

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 



 (দশ)

(দশ)

ভোর হল। আমরা রানির প্রাসাদের ভেতরে হওয়া ঘটনাগুলি জানতে পারিনি। কেবল আমরাই নয়, রাজপ্রাসাদ এবং রাজ্যের কেউ কোনো কিছু জানত না। দুই এক জন চাকর বাকর কথাটা জানতে পেরেছিল যদিও রাজপ্রাসাদের গোপনীয়তা রক্ষা করা তাদের কর্তব্য ছিল। তাই মন্ত্রী,ধনী ব্যক্তিদের  দ্বারা কথাটা প্রচারিত হওয়ার পরেই তারা মুখ খুলেছিল।

ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিষেকের আয়োজন করার জন্য প্রত্যেকে যে যার কাজে লেগে পড়েছিল। বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি শুনে আমরাও তাড়াতাড়ি জেগে উঠেছিলাম। সেই ধ্বনি ছিল ঋষি বশিষ্ঠ এবং তার শিষ্যদের শোভাযাত্রার বাদ্যযন্ত্রের। শোভাযাত্রা  দেখার জন্য আমি মূল রাজপ্রাসাদের ভেতরের দিকে থাকা জানালাটা খুলে দিয়েছিলাম। আমার চোখে পড়েছিল ঋষি বশিষ্ঠ এবং তার শিষ্যদের শোভাযাত্রার একাংশ। তারা সোনার কলসে পবিত্র নদী গুলির জল রাজপ্রাসাদের দিকে বয়ে নিয়ে আসছিল। সংগীতের ধ্বনি শুনেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে দলে দলে মানুষ শোভাযাত্রায় যোগ দিয়েছিল। তারা হর্ষধ্বনি করে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে রাজপ্রাসাদের দিকে আসতে শুরু করেছিল। আমরাও নিত্যকর্ম সম্পন্ন করে সাজগোজ করে রাজ প্রাসাদে আহ্বান করার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

কিছুক্ষণ পরে শ্বশুর রাজা দশরথের সারথি তথা মন্ত্রী সুমন্ত্র  এসে উপস্থিত হল। ইতিমধ্যে রাজ যোগ্য বস্ত্র এবং অলংকার পরিধান করে স্বামীর আমন্ত্রণের জন্য পথ চেয়ে ছিলাম। তার কথা নিবেদন করলেন-‘হে রাম, আপনি যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তান। আপনার অভিষেকের সময় সমাগত। এই মুহূর্তে  মহারাজ দশরথ রয়েছেন ছোটরানি কৈকেয়ীর বাসভবনে। রাজা আপনাকে একবার দেখতে চাইছেন। তাই দ্রুত আপনি একবার রাজার কাছে চলে আসুন।’ স্বামী আনন্দিত মনে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-মাতা কৈকেয়ী নিশ্চয়ই আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে রয়েছেন। দুজনে হয়তো কিছু আলোচনা করে আমাকে উপদেশ দেবার জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন। তাই আমি দুজনের সঙ্গেই সাক্ষাৎ করে আসি। তুমি এখানেই আমার জন্য অপেক্ষা কর।’ 

আমি স্বামীকে মূল দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আমার অন্তরের ভাব ব্যক্ত করে বললাম-‘হে আর্য পুত্র, আর কিছুক্ষণ পরেই আপনি যুবরাজ পদে অধিষ্ঠিত হতে চলেছেন।সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা যেভাবে ইন্দ্রের অভিষেক অনুষ্ঠিত করেছিল ঠিক তেমনই পিতা রাজা দশরথ আপনার অভিষেক উৎসবের আয়োজন করেছেন। আজ এই শুভক্ষণে  আমি এটাই কামনা করছি যে আপনার পুবদিকে বজ্রধারী ইন্দ্র, দক্ষিণ দিকে ধর্মরাজ যম,পশ্চিম দিকে দেবতা বরুণ আর উত্তর দিকে ধনপতি কুবের অবস্থান করে আপনাকে যেন রক্ষা করে। এটাই আমার কামনা।’ 

আমার কথা শুনে আনন্দিত মনে স্বামী রামচন্দ্র প্রস্থান করলেন। ইতিমধ্যে লক্ষ্ণণও এসে উপস্থিত হয়েছিল। দুজনেই একই রথে পিতার কাছে গমন করলেন। আমি চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্বামী রামের অভিষেকের জন্য এগিয়ে নিতে এসে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অশ্বারোহী, গজারোহী, বাদ্যযন্ত্র সহ জনতার শোভাযাত্রা রথের পেছন পেছন যেতে শুরু করল। তারা ভেবেছিল অভিষেকের জন্যই রাম গন্তব্যস্থানে যাত্রা করছে। শোভাযাত্রার হর্ষধ্বনি, মঙ্গলধ্বনি এবং সঙ্গীত সমগ্র পরিবেশটাকে মুখরিত করে তুলেছিল। কন্যা-বধূরা হাতে তালি দিয়ে  উলুধ্বনি দিয়ে ফুল ছিটিয়ে যাচ্ছিল। রাজপ্রাসাদের সামনে রথ দাঁড়াল। স্বামী রামচন্দ্র রথ থেকে নেমে রাজপ্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ  করলেন। স্বামী বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আমি এমনিতেই এদিক-ওদিক করে তার আসার অপেক্ষা করতে লাগলাম।

আমাদের প্রাসাদের শয়ন কক্ষের দরজা খুলে দিলে ছোট শাশুড়ির প্রাসাদ সুন্দর  দেখতে পাওয়া যায়। আমি দরজাটা খুলে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। চারপাশে জাঁকজমক। প্রজারা ফুল, আম্রপল্লব পতাকা ইত্যাদি দিয়ে প্রবেশপথ গুলি সুন্দর করে সাজিয়েছে। নানা রঙের বস্ত্র এবং অলংকার পরিধান করে উৎসবে আসা প্রজারা শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে শুভ মুহূর্তের জন্য পথ চেয়ে রয়েছে।

এবার ছোট শাশুড়ির রাজপ্রাসাদে যাওয়ার পথে জায়গায় জায়গায় মানুষের ভিড় দেখতে পেলাম।হঠাৎ গম্ভীর একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হল। এদিকে অনেকক্ষণ দেরি হয়ে যাওয়ার পরেও স্বামী ফিরে না আসায় আমি কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লাম।একজন চাকরকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলাম-‘জ্যেষ্ঠ রাজকুমার পিতার কাছে এতক্ষণ ধরে রয়েছে কি? তার কোনো অসুখ-বিসুখ হয়েছে কি? এত দেরি করছেন কেন?’ চাকরটি বলল-‘সঠিক খবর কিছুই জানিনা। আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন, আমি খবর নিয়ে আসছি।’ এই বলে লোকটি প্রস্থান করল। 

চাকরটি ফিরে আসার আগেই লক্ষ্ণণ এল। লক্ষ্ণণের মুখের ভাব গম্ভীর। আমি লক্ষ্ণণের কথার অপেক্ষায় না থেকে জিজ্ঞেস করলাম-‘লক্ষ্ণণ কী হয়েছে? চারপাশে এক ধরনের বিষণ্ণ  ছবি ফুটে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে কেন? রাজা ওকে এই সকালে কেন ডেকে নিলেন?’ কথাটা বলে উত্তরের আশায় লক্ষ্ণণের দিকে তাকিয়ে রইলাম। লক্ষ্ণণ বলল-‘আমি বিশেষ কিছুই জানিনা। কিন্তু সারথি সুমন্ত্রের কাছ থেকে এই ধরনের কথা শুনেছি। ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠ এবং তার শিষ্যরা অভিষেকের ধর্মীয় কাজগুলি সমাধা করার জন্য বাদ্যযন্ত্র এবং গীতে মুখরিত করে অন্তপুরের দিকে আসছিল। শুভ মুহূর্তে শুভ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তাই ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠ মন্ত্রীকে বললেন যে অভিষেকের জন্য আবশ্যকীয় সমস্ত বস্তুর জোগাড় হয়ে গেছে। সবাই আনন্দিত মনে রামের অভিষেকের জন্য এখানে পথ চেয়ে রয়েছে। তাই মহারাজকে একটু তাড়াতাড়ি করতে বলুন।’ 

মন্ত্রী তথা সারথি সুমন্ত্র রাজার শোবার ঘরের কাছে দাঁড়িয়ে সকালের স্তুতি পাঠ করে বশিষ্ঠের সংবাদ জানালেন-‘হে মহারাজ, দেবরাজ ইন্দ্র যেভাবে তার সারথি মাতলির গান শুনে জেগে উঠে,আপনিও আপনার সারথির স্তুতি শুনে নিদ্রা বিসর্জন দিন। সমস্ত দেবতারা আপনার প্রতি  প্রসন্ন হন।  আজ আপনি গুরু দায়িত্ব পালন করতে চলেছেন। তাই আপনি শয্যা ত্যাগ করুন। ঋষি বশিষ্ঠকে মুখ্য করে সমস্ত শিষ্য,ব্রাহ্মণ,প্রজারা আপনার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছেন।’ 

কিন্তু রাজা কিছু বলার আগেই মাসি কৈকেয়ী নাকি সারথি সুমন্ত্রকে বলেন-‘সারা রাত রাজা অভিষেকের চিন্তায় অনিদ্রায় কাটিয়েছেন।এখন তাকে কাল ঘুমে পেয়েছে।তিনি জেগে উঠেই রামের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন। তাই আপনি শীঘ্র রামকে এখানে নিয়ে আসুন।’ একনাগাড়ে কথাগুলি বলে লক্ষ্ণণ থামল। তারপরে কিছু একটা চিন্তা করে লক্ষ্ণণ পুনরায় বলল-‘তাই সুমন্ত্র দ্রুত দাদাকে নিতে এসেছিল।’ তারপরে লক্ষ্ণণ পুনরায় বলল –‘কাজগুলি হতে হয়তো কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। তাই আপনি চিন্তা  করবেন ভেবে আমি খবরটা দিতে এলাম। এখন আমি পুনরায় দাদার কাছে যাই।’- কথাটা বলে লক্ষ্ণণ প্রস্থান করলেন।

আমি পুনরায় স্বামীর ফিরে আসার আশায় রইলাম। মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলাম শুভকাজগুলি যেন নির্বিঘ্নেই পার হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পরে রাম ফিরে এল। সঙ্গে লক্ষ্ণণ। আমি স্বামীর মুখের দিকে তাকালাম। সদা প্রসন্ন  স্বামীর মুখে কোনো দুশ্চিন্তার চিহ্ন দেখতে পেলাম না। তিনি আমাকে কাছে বসিয়ে ধীর-স্থিরভাবে বলতে লাগলেন-‘আমি ছোটমা কৈকেয়ীর অন্তঃপুরে প্রবেশ করে চমকে উঠেছিলাম। পিতা মহারাজ দশরথ তখনও শয্যায়। তার মুখ ফ্যাকাশে,শুকনো এবং বিষণ্ণ। আমি প্রথমে তার চরণ স্পর্শ করে প্রণাম জানালাম। তারপরে মাতা কৈকেয়ীকে প্রণাম জানালাম। পিতা ক্ষীণকণ্ঠে ‘রাম’ বলে কিছু একটা বলতে চাইছিলেন কিন্তু পারলেন না। তাঁর দুই চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল। আমি ছোটমাকে পিতার এই অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন-‘তার কোনো অসুখ-বিসুখ কিছুই হয়নি। কেবল মনের মধ্যে কিছু কথা আছে যে কথা খুলে বললে তুমি আঘাত পাবে বলে ভয় করছেন। সেই ভয়ই তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে।’ 

স্বামী নাকি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন-‘যন্ত্রণা? কেন? আপনি এ সমস্ত কী বলছেন  মাতা? আপনি তো জানেনই মহারাজের কোনো কথার আমি অবাধ্য নই। বিষ খেতে বললেও খাব, সাগরে ডুবে মরতে বললেও মরব। তাই  বিনা দ্বিধায় আপনিই আমাকে বলুন পিতার ইচ্ছা কি?’স্বামী এভাবে সাহস দেওয়ায় ছোট শাশুড়ি বললেন-‘রাজার অনেক বছর আগে আমাকে দুটি বর দেবার কথা ছিল।এখন আমি  বর দুটি চেয়েছি। প্রথম বরে তোমার জায়গায় ভরতকে যুবরাজ করতে হবে এবং দ্বিতীয় বরে তোমার দণ্ডকারণ্যে নির্বাসন হবে। এখন তোমার পিতা বর দুটি দিতে অস্বীকার করছেন। তুমি আঘাত পাবে বলে।’

শাশুড়ি কৈকেয়ীর কথা শুনে স্বামী ধীরে অথচ স্পষ্টভাবে বললেন-‘পিতার দুঃখের কারণ আমি হওয়াটা বড় পরিতাপের কথা হয়েছে। আমি তার দুঃখ দূর করার জন্য নিশ্চয় বনবাসে যাব।  আপনি দ্রুত গতির দূতের সাহায্যে ভরতকে ডেকে পাঠান। আমি একটা কথা ভেবেই দুঃখ পেয়েছি। এই কথাটা পিতা নিজের মুখে আমাকে না বলে কেন আপনার মাধ্যমে জানাচ্ছেন। আমি কি এতটা পর হয়ে গেলাম?’

স্বামীর কথা শুনে রানি কৈকেয়ী নাকি বললেন-‘ রাজা লজ্জায় নিজের মুখে আদেশ দিতে পারেনি। আর তা নিয়ে তোমাকে কোনো কিছু ভাবতে হবে না। এখন তুমি বনবাসে না গেলে পিতা ভোজন করা তো দূরের কথা,স্নানও করবে না।’

শাশুড়ির এই কথা নাকি রাজা সহ্য করতে না পেরে আর্তনাদ করে বলেছিলেন-‘ ইস কী নিষ্ঠুর। কী কষ্ট আমার।’ তারপর নাকি তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন।

পিতার অবস্থা দেখে স্বামী রাম কৈকেয়ীকে বলেছিলেন-‘মা,আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি রাজ্যলোভী পুরুষ নই। আমি ঋষি মুনিদের মতো জীবন নির্বাহ করার শিক্ষাও লাভ করেছি। পিতা যদিও নিজ মুখে আদেশ দেয় নি তবুও আমি আপনার কথা মতো ১৪ বছর বনবাসে কাটাব। আজই আমি বনবাসে যাত্রা করব। আপনি পিতার যত্ন নেবেন বলে আশা রাখছি।’ একথা বলে তিনি নাকি দু'জনকেই প্রণাম জানিয়ে বড় শাশুড়ি কৌশল্যার প্রাসাদে গিয়ে পৌঁছলেন।

স্বামী রাম যখন মায়ের প্রাসাদে গিয়েছিল, তখন নাকি তিনি সাদা পাটের কাপড় পরে ছেলের মঙ্গল কামনার জন্য মহাদেবের পুজো করছিলেন। রামকে দেখেই  তিনি জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করলেন। তারপর উঁচু করে সাজিয়ে রাখা সিংহাসনের মতো একটি আসনের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন-‘বাবা, এই আসনই তোমার যোগ্য। তুমি এখানে বস।’ তখন নাকি স্বামী রামচন্দ্র বলেন-‘মাতা, তুমি হয়তো কিছুই জান না। তাই এই সিংহাসনের মতো আসন এগিয়ে দিচ্ছ। তবে এই সিংহাসন আমার জন্য বড় উঁচু হবে। আমার মাটিতে কুশাসন পেতে বসা উচিত। আমাকে আজ থেকে সন্নাসীর মতো জীবন কাটাতে হবে।’ 

স্বামীর কথা শুনে মা অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।তিনি বলেছিলেন-এ কথা তোমার মুখে শোভা পায় না। তুমি অযোধ্যার ভবিষ্যৎ। প্রজাদের ত্রাণ কর্তা।’ 

স্বামী রাম তখন প্রণাম জানিয়ে বললেন-‘তুমি বলা কথাগুলি শুনতে ভালো লাগছে। তবে সেটা তোমার কল্পনা হয়েই রইল। বর্তমানে আমি যে খবর বলব তা শুনে তুমি দুঃখ পাবে। তবু আমাকে বলতেই হবে। এই বলে স্বামী  সমস্ত কথা বর্ণনা করলেন।

স্বামীর কথ শুনে বড় শাশুড়ি নাকি অচেতন হয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পরে স্বামী রাম  এবং ভ্রাতা লক্ষ্ণণের শুশ্রূষায় তিনি পুনরায় সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি স্বামীকে বলেছিলেন-‘পুত্র রাম, তোমার পিতার রাজত্বকালে আমি জেষ্ঠ্যা  রানি হিসেবে যে সম্মান এবং সুখ পাওয়ার কথা ছিল তা কোনোদিনই পেলাম না। সাড়ে তিনশো রানি থাকা রাজার প্রথম স্ত্রী হিসেবে কতটা নিঃসঙ্গ আর উপেক্ষিতা তা তুমি অনুমান করতে পারবে কি? ভেবেছিলাম তুমি রাজা হলে কিছুটা সুখের মুখ দেখব। তুমি থাকতে আমি ছোটরানির দ্বারা প্রায়ই অশ্রাব্য ভাষায় তিরস্কৃত হই। এখন তুমি চলে গেলে আমার কী হবে ভেবে দেখেছ? তোমার পিতা আমার সঙ্গে কর্কশ স্বরে কথা বলা,রুক্ষ ব্যবহার এবং উপহাস করা ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। এখন তুমি বনে যাত্রা করলে আমার মৃত্যুর সমান হবে । কৈকেয়ীর   পুত্র রাজা হবে তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমি ভয় পাচ্ছি আমার চাকর বাকরেরা আমাকে আরও অনাদর করবে বলে। তুমি সাক্ষাৎ থাকতেই ওরা কৈকেয়ী নন্দনকে দেখলে আমার সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করে না। তাই আমার অবস্থা কি হবে তুমি অনুমান করতে পারছ? এর চেয়েও অধম জীবন-যাপন করার আমার ইচ্ছে নেই। তাই মৃত্যুই আমার কাছে শ্রেয়।’স্বামী তাকে ক্ষান্ত হয়ে ধৈর্য ধরার উপদেশ দিতে শাশুড়ি কৌশল্যা আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন-‘তোমরা আমার হৃদয়টা পাথরে বাঁধানো বলে ভেবেছ নাকি যে আমি এরপরও ধৈর্য ধরে রাখতে পারব।’ কথাটা বলে শাশুড়ি কৌশল্যা নাকি হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন।

দেবর লক্ষ্ণণ সেই দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। সে দুই হাত মুঠো করে ক্রোধের সঙ্গে বলল-‘ বড়মা, সকাল থেকে আমি সমস্ত কথা মনে মনে শুনছিলাম। কিন্তু আর শোনার ধৈর্য আমার নেই।পিতা   এরকম শাস্তি দাদাকে কেন দিলেন? স্ত্রীর বশীভূত পিতা  যুবতি স্ত্রীকে আনন্দ দিতে গিয়ে কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। এই ধরনের পুরুষ রাজা হয়ে থাকার উপযুক্ত নয়।’ তারপর নাকি লক্ষ্ণণ বিলাপ করতে করতে  দাদা রামকে বলেছিল-‘দাদা আপনার মুখের দিকে তাকালে শত্রুর মনও কোমল হবে। সেক্ষেত্রে পিতা রাজা দশরথ কীভাবে আপনাকে বনবাসে যাবার কথা বললেন? কামান্ধ বৃদ্ধ রাজার এই কথা আমি সহ্য করব না। আপনার ভাই রাজা হবে আর আপনি বনে যাবেন- এরকম কথা কখনও হতে পারে না। আমাদের  নিয়ে জগত হাসাহাসি করবে। দাদা, আপনাকে অনুরোধ করছি এই ধরনের গর্হিত কাজে আপনি কখনও সম্মত হবেন না।’ রাজসভায় আপনার অভিষেকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে রাজা অতীতের কথা স্মরণ করে কীভাবে ভরত রাজা হোক,রাম বনবাসে যাক বলতে পারলেন? এই ধরনের অনুপযুক্ত রাজাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে রাজ্য আমাদের হাতে নিয়ে আসব।’ তারপরে লক্ষ্ণণ নিজের বাহু দুটো দেখিয়ে বলেছিল –‘আমার এই দুই বাহু মাত্র সৌন্দর্যের জন্য নয়। বাহুতে ঝুলে থাকা এই ধনু,তীর গুলি এবং তরোয়ালটা আমার দেহের অলংকার নয় বা আমি দেখানোর জন্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি না। এই অস্ত্রশস্ত্র উচিত সময়ে উচিত ব্যবহার করা ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য। আপনি কেবল আদেশ দিন। আমাকে বাধা দিতে কেউ সাহস করবে না। কেউ করলেও আমি তাকে নিপাত করব।

শাশুড়ি কৌশল্যা বোধহয় লক্ষ্ণণের কথাগুলিকে কিছু পরিমাণে সমর্থন করেছিল। তাই তিনি দুই পুত্রের উদ্দেশ্যে বললেন-‘পুত্র লক্ষ্ণণ আমি তোমার কথা সমর্থন করছি। অবশ্য গায়ের জোরে সিংহাসন কেড়ে নেওয়ার আমি পক্ষপাতী নই। রাজ সিংহাসন যেহেতু একজন রাজার বড় ছেলের প্রাপ্য সেক্ষেত্রে অন্য প্রতিবাদের দাবী ন্যায্য হবে না। তাই রাম,তুমি  লক্ষ্ণনের কথাগুলি ভেবেচিন্তে দেখ। তুমি বনবাসে যাবে না। তোমার অবিহনে আমি ক্ষণিকের জন্য বেঁচে থাকব না। হয় আমি তোমার সঙ্গে বনবাসে যাব, না হয় উপবাস করে এই দেহ ত্যাগ করব। মায়ের সেভাবে মৃত্যু হলে পূত্রের ব্রহ্মহত্যা করার মতো দোষ হয়। তাই জেনে রাখবে-এই দোষের ভাগী তোমাকেই হতে হবে।’ 

স্বামী রামচন্দ্র বিন্দুমাত্র ধৈর্য না হারিয়ে শান্তস্বরে মাকে বলেছিল-মা, বনবাসে যাওয়ার কথা তুমি মনের কোণেও ঠাঁই দিয়ো না। আমাকে পিতৃবাক্য পালনের জন্য বনবাসে যেতেই হবে। তুমি বৃদ্ধ স্বামীকে ছেড়ে আমার সঙ্গে বনে চলে গেলে ধর্মবিরোধী কথা হবে। বৃদ্ধ বয়সে তিনি এই বড় শোকটা পেয়েছেন। তোমাকে তার এই দুঃখ লাঘব করতে হবে। তাছাড়া সমস্তই অদৃষ্টের কথা। না হলে এরকম ঘটনা ঘটতে কখনও শুনেছ কি?’

তার পরে ক্রোধে লাল অঙ্গারের মতো হয়ে ওঠা লক্ষ্ণণকে স্বামী রাম এভাবে বোঝাল-‘ভাই লক্ষ্ণণ তুমি কি আমার অংশ নও? আমার আত্মার একাংশ অন্য একটি দেহে  স্থান নিয়েছে আর তা হল তুমি। তাই আমি যে কথা সহজভাবে নিয়েছি তুমি কেন তা নিতে পারছ না? আমি তোমার শক্তি এবং পরাক্রমের কথা ভালোভাবে জানি। তোমার অসাধ্য কিছুই নেই। তাবলে পিতার কাছ থেকে শারীরিক শক্তিতে রাজ্য ছিনিয়ে নেওয়ার কথা তোমার মতো একজন বীরের মুখে শোভা পায় না। বর্তমানে আমার কর্তব্য হল পিতার আদেশ পালন করা। সেই আদেশ ন্যায় হোক অথবা অন্যায়।এটা কিন্তু বিচার করা আমাদের কর্তব্য নয়। পিতা আমাকে নির্বাসনে পাঠাতে গিয়ে নিশ্চয় শোকে দগ্ধ হয়ে পড়েছে। যে কারণেই হোক না কেন তিনি আমার মাসি কৈকেয়ীর কথায় বাঁধা পড়েছেন। তাকে অঙ্গীকার করতে হল। এখন যদি তিনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন তাহলে তাকে পাপ স্পর্শ করবে। পূর্বে করে আসা সমস্ত মহৎ কাজও কলঙ্কিত হবে। তাই আমাদের তাকে উদ্ধার করা উচিত। গায়ের জোরে সিংহাসনে কেড়ে নেওয়ার মধ্যে কি কোনো আনন্দ আছে?’

এভাবে বলে নাকি স্বামী রাম লক্ষ্ণণের চোখের জল মুছে দিয়েছিলেন। তারপর পুনরায় বলেন –‘আমাদের ছোট মা কৈকেয়ীর প্রতি খারাপ মনোভাব রাখা অনুচিত। এতদিন তিনি আমাদের নিজের পুত্রের মতো পালন করে এসেছেন। আজ হঠাৎ যে তিনি আমাদের প্রতি এতটা নির্দয় হয়ে পড়েছেন সেটাও অদৃষ্টের দোষ নয় কি? আসলে প্রতিটি কথা ভগবানের নির্দেশে হয়। তুমি স্থিতপ্রজ্ঞ মুনিঋষিরা কীভাবে সত্যের পথ থেকে খসে পড়ে সে কথা তুমি দেখেছ এবং শুনেছ। তাই আমাদের ছোট মায়ের দোষ আর কতটুকু? তাই আমি ভাবছি পিতার বাক্য পালন করে মায়েদের আশীর্বাদ নিয়ে বনবাসে যাত্রা করে নিরানন্দকে আমি আনন্দে পরিনত করব।’ 

দাদার কথায় লক্ষ্ণণের রাগ মিলিয়ে গেল এবং চোখের জল পড়া বন্ধ হল।

স্বামীর কথাগুলো শুনে আমি শোকে অধীর হয়ে পড়েছিলাম। মহারানি হতে না পারার দুঃখে নয়,স্বামীর মাথার উপরে এত বড় একটি তুফান চলে আসার জন্য। আমি তার বুকের ভিতরে ঢুকে ফুঁপিয়ে উঠেছিলাম।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Anandamangal, আনন্দমঙ্গল ।। সৌমিত্র রায়

 Anandamangal, আনন্দমঙ্গল