বৃহস্পতিবার, ২৭ মে, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~১১ || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস

 বিদেহ নন্দিনী

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 



 

(এগারো)

হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলি আমাকে সংক্ষেপে বলে স্বামী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। আমি তার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম-‘হে নাথ  আপনি দুঃসংবাদটা নিয়ে আসার সময় আপনার মুখে আমি কোনো ধরনের দুঃখের ছায়া দেখতে পাইনি। হঠাৎ আপনার চেহারা এত বিষন্নতা ঘিরে ধরেছে কেন? আমার চোখে চোখ রেখে স্বামী বলেছিলেন-‘প্রিয়তমা, বিচ্ছেদের শোক আমাকে দগ্ধ করছে। আমি এখন তোমার কাছ থেকে চৌদ্দ বছরের জন্য বিদায় চাইব। আগামী চৌদ্দ বছর আমাকে দণ্ডকারণ্যে বাস করতে হবে। তাই তোমাকে কয়েকটি উপদেশ দিতে চাই।’

আমি আগ্রহের সঙ্গে স্বামীর মুখের দিকে তাকালাম।

তিনি আমার দিকে না তাকিয়ে বললেন-‘এখন থেকে অযোধ্যার স্থায়ী রাজা হবে ভরত। তাই  তুমি ভরতকে আগের চেয়ে বেশি ভালবাসার চোখে দেখবে। ভরতের প্রতিটি কথায় তার প্রশংসা করবে। তখন তুমি রাজার প্রিয় পাত্র হয়ে থাকতে পারবে। ভরতের সামনে আমার কোনো গুণ নিয়ে আলোচনা কর না। হিংসা হবে। আমার বিরহে ধৈর্য না হারিয়ে পিতা দশরথ,মাতা কৌশল্যা এবং সুমিত্রার যত্ন নেবে।   মাতা কৈকেয়ির প্রতি কোনো দিন কোনো খারাপ মনোভাব রেখনা।আমার কাছে তিনজন মাতাই সমান। ঠিক সেভাবে তিন ভাইকেও স্নেহ ভালোবাসা দেবে। ব্রত,উপবাস,পূজা নিয়ম মতো কীভাবে করতে হয় তা তুমি জানই।

একনাগাড়ে বলে তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। তারপরে আবার বলতে শুরু করেন-‘ আমি তোমাকে পুনরায় বলছি, ভরতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ কর না। তিনি যেভাবে তোমাকে পেতে ইচ্ছা করেন, সেভাবেই তার সঙ্গে মিলে যেতে চেষ্টা কর।’ 

স্বামীর উপদেশ গুলি শুনে আমার রাগ হল।  বারবার ভরতের নামটা  গুরুত্ব দিয়ে বলায় আমার কান মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল। তাই ক্রোধের সঙ্গে আমি বলেছিলাম-হে রঘুনন্দন, আপনি আমাকে কী ভেবেছেন? আপনার মতো একজন পুরুষকে পতি হিসেবে পাওয়ার পরে আপনার মুখে এই ধরনের কথা শোনাটা দুর্ভাগ্যজনক। এতদিনে আপনি আমাকে বুঝতেই পারলেন না। পরপুরুষের প্রতি দৃষ্টিপাত করার মতো নারী আমি নই। এই ধরনের কথা আপনি কীভাবে বলতে পারলেন সে কথা ভেবে আমি আশ্চর্য হয়েছি। এখন আমার কথা শুনুন- আমি পতি পত্নীর দুজনকে আলাদা বলে ভাবি না। দুইজনের ভাগ্য মিলে একজনের ভাগ্য হয়। সেই ভাগ্যে সুখ-দুঃখ যাই থাকুক না কেন দুজনের সমান ভাবে ভাগ করে নিতে হয়।আজ আপনার রাজ্যাভিষেক হলে যেভাবে আমি  রাজরানী হতাম তেমনই বনবাসের আদেশও আমাদের দুজনের জন্যই। নারীর কাছে পতিই একমাত্র আশ্রয়। তাই আমার সিদ্ধান্ত হল আমিও আপনার সঙ্গে বনবাসে যাব।’ 

আমি গত বারো বছরে স্বামীকে এত ক্রোধের  সঙ্গে এই ধরনের কথা বলিনি। কিন্তু এভাবে না বলে আমার আর কোনো উপায় ছিল না। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম আমার কথা শুনে স্বামীর রাগ হয়েছে।

তিনিও আমাকে বেশ কড়া ভাবেই বললেন-‘বনবাসের জীবন তোমার জন্য নয়। এই জীবন অত্যন্ত কষ্টকর। ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করতে হয়। কখনও কখনও সেই ফলও যথেষ্ট নাও হতে পারে। কারণ গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়াটা বনবাসীদের জন্য নিষিদ্ধ। কেবল মাত্র  গাছ থেকে খসে পড়া ফল বনবাসীদের ভক্ষণ করতে হয়। এমনিতেই আধপেটা খেয়ে থাকতে হয়। তার মধ্যে আবার মাঝেমধ্যে পূর্বপুরুষদের শ্রাদ্ধ, দেবতাদের পূজা আদির ব্রত-উপবাস করতে হয়। তাছাড়া সিংহ, বাঘ,ঘোং, বন্য হিংস্র জন্তু, সাপ,বিছা ইত্যাদি তো আছেই। কখনও কখনও তোমাকে রক্ষা করাই আমার পক্ষে কঠিন হতে পারে। তাই তুমি আমার সঙ্গে বনবাসে যাওয়াটা ঠিক হবেনা। 

স্বামী যে সমস্ত কারণ দেখিয়ে আমাকে সঙ্গে নিতে অস্বীকার করেছিল সেই সমস্ত শুনে আমি ভয় খাওয়া তো দূরের কথা, সেই সমস্ত সমস্যাকে আমি কোনো গুরুত্বই দিই না, তাই আমি স্বামীকে বললাম-‘আর্যপুত্র আমি আপনার কাছে কী অপরাধ করেছি বুঝতে পারছি না। যার জন্য আপনি আমাকে আপনার জীবন থেকে নির্বাসন দিতে চাইছেন। আপনার অবিহনে রাজভোগে আমার কোনো স্পৃহা নেই। আমি ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করব। তাও আপনি খাওয়ার পরে যদি অবশিষ্ট থাকে। আপনার সঙ্গে থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে তাতেই স্বর্গীয় সুখ লাভ করব। আগামী চৌদ্দ বছর আমি নিয়মমতো ব্রত উপবাস করে ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করব। আপনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্য যে সমস্ত কষ্টের কথা বলেছেন আপনার কাছ থেকে একটু ভালোবাসা পেলেই সেই সমস্ত কষ্ট, কষ্ট বলে মনে হবে না। আপনি আমাকে অনেকবার বলেননি কি যে পতিব্রতা নারী পতির কাছ থেকে দূরে গিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। তাই আপনি শুনুন-‘আমি একজন স্ত্রী,যে স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের কথা কখনও মনে স্থান দেয়নি। আমি জন্মে জন্মে সুখে দুঃখে আপনার সঙ্গী হয়ে থাকতে চাই। যদি আপনি আমাকে এখানে ফেলে রেখে বনে চলে যান, তাহলে আমি হয় আগুনে ঝাঁপ দেব, না হলে জলে,না হয় বিষপান করে জীবনের  শেষ সীমা রেখা টেনে দেব।’এই কথা বলে আমি শোকে ভেঙ্গে পড়লাম। স্বামী আমার চোখের জল মুছে দিয়ে তার বিশাল বক্ষের মাঝে জড়িয়ে ধরলেন।

স্বামী রাম আমার দৃঢ়তা দেখে বনবাসে যাবার অনুমতি প্রদান করে বললেন-‘ জানকী, বনবাসে যেহেতু আজকেই যেতে হবে, তাই তোমার এবং আমার যে সমস্ত ধন, সোনা, মনি-মুক্তা আছে সেগুলি ব্রাহ্মণকে দান করে দ্রুত তৈরি হয়ে নাও।

আমরা কথা বলার সময় লক্ষ্ণণ ও উপস্থিত হয়েছিল। লক্ষ্ণণের চোখ তখন ও লাল এবং ছলছলে। লক্ষ্ণণ এসে কোনো কথার ভূমিকা না করে সরাসরি দাদার পা দুটি জড়িয়ে রুদ্ধ কন্ঠে বলতে লাগল-‘দাদা আমিও আপনার সঙ্গে বনবাসে যাব। বন্যপ্রাণী ভরা অরণ্যে আমি আপনাকে একা যেতে দেব না। কিছুক্ষণ আগে আপনি বলেননি কি যে আমি আপনারই অংশ। মাত্র দেহ দুটি আলাদা। তাই আপনি জঙ্গলে থাকার সময়ে আমি রাজসুখে কীভাবে থাকব দাদা? লক্ষ্ণণকে দুই বাহু ধরে উঠিয়ে রামচন্দ্র বোঝালেন-‘লক্ষ্ণণ,  আমার ভাই, তুমিও যদি আমার সঙ্গে বনবাসে চলে যাও, আমার দুই মাতা কৌশল্যা এবং সুমিত্রাকে কে দেখবে? ইতিমধ্যে তুমি সকালে মাতা কৌশল্যার বিলাপের মধ্য দিয়ে জানতে পেরেছ ছোটমা কৈকেয়ী কখনও কখনও দুই মায়ের সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করে। তাই আমার প্রিয় ভাই তুমি আমার সঙ্গে বনবাসে যাবার কথা ভেব না লক্ষ্ণণ।’

লক্ষ্ণণ যুক্তি দেখিয়ে বলল-‘ দাদা, রাজপ্রাসাদে ভরত শত্রুঘ্ন ছাড়া উর্মিলা, মান্ডবী এবং শ্রুতকীর্তি  তিনজন বধূই থাকবে। তাই বড়মা এবং মাতা সুমিত্রার কোনো অসুবিধা হবে না। সবচেয়ে বড় কথা এই যে আপনার প্রভাব আমাদের তিন ভাইয়ের উপরেও পড়েছে। তাই বড়মা কৌশল্যা, সুমিত্রার যত্ন হবেনা বলে আপনি স্বপ্নেও ভাববেন না। ভরত দুজনকেই নিজের মায়ের চেয়েও বেশি যত্ন করবে। এবং কোনোভাবে যদি এর অন্যথা শুনি আমি ভরতকে নিশ্চয়ই বধ করব। তাই দাদা আপনি দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে আমাকে আপনার সঙ্গে যাবার অনুমতি দিন।’-এই কথা বলে লক্ষ্ণণ দাদার মুখের দিকে তাকাল। তারপর পুনরায় বলল-‘দুর্গম অরণ্যের মধ্যে আপনি বৌদির সঙ্গে একা কীভাবে যাবেন? আমি কাঁধে কোদাল- পাচি নিয়ে আগে আগে যাব। বন-জঙ্গল কেটে পথ বের করে দেব। প্রতিদিনই ফলমূল এনে দেব।’ এভাবে নানা কথা বলে লক্ষ্ণণ দাদার সম্মতি আদায় করলেন।

লক্ষ্ণণ আমাদের সঙ্গে বনবাসে যাবার জন্য প্রস্তুত দেখে আমি উর্মিলার কথা ভেবে  চিন্তিত হলাম। চৌদ্দ বছর কাল উর্মিলা লক্ষ্ণণ কে ছেড়ে কীভাবে থাকবে? তাই আমি লক্ষ্ণণকে বললাম-‘সুমিত্রানন্দন তুমি উর্মিলাকে চৌদ্দ বছরের জন্য ছেড়ে যাওয়াটা একপ্রকারের নির্বাসন। আমি আমার বোনের অন্তর  ভালোভাবে জানি। সে প্রতিবাদ করবে না। কিন্তু অন্তরে খুব দুঃখ পাবে। তুমি একবার উর্মিলার  কথা ভেবে এই যাত্রা থেকে বিরত হও।’ 

কিন্তু লক্ষ্ণণ অকাট্য যুক্তি দেখিয়ে বলল-‘বৌদি, আমার জন্ম বৃত্তান্ত হয়তো আপনি ভালো করে জানেন না বা জেনেছিলেন যদিও ভুলে গেছেন। আমি মায়ের গর্ভ থেকেই দাদা রামের অর্ধাংশ। তাই যেখানে রাম সেখানে লক্ষ্ণণ। আমার কর্তব্য হল তাকে অনুসরণ এবং সেবা করা। আমার অন্তরে প্রথম স্থান দাদার দ্বিতীয় স্থান পত্নীর। তাই বনবাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনি আমাকে বাধা না দিলে খুশি হব।’ লক্ষ্ণণের এই কথা শুনে আমি এই বিষয়ে আর কিছু বললাম না।

আমরা ব্রাহ্মণ এবং দরিদ্রদের দান করে ভোজন করিয়ে বনবাসে বেরোনোর সময় উর্মিলা আমাদের কাছে এসেছিল। উর্মিলার মুখ ছিল মলিন। চোখ ঔফুলের মতো হয়ে পড়েছিল। আমাদের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু মুখে একটিও শব্দ করছিল না। আমি উর্মিলার নীরবতাকে সহ্য করতে না পেরে কিছু একটা বলব বলে তার পিঠে হাত রেখেছিলাম। পরে সে বাঁহাতে আমার হাতটা সরিয়ে দিল। আমি বুঝতে পারলাম উর্মিলা এবং আমার মধ্যে একটি অভেদ্য প্রাচীরের সৃষ্টি হল।

আমাদের সমস্ত ঐশ্বর্য দান করে আমরা তিনজন তপস্বীর বেশ ধারণ করলাম। যাবতীয় সামগ্রী কয়েক পদ নিয়ে বিদায় নেবার জন্য প্রথমে পিতা দশরথ থাকা রাজপ্রাসাদে  গেলাম।ইতিমধ্যে অভিষেকের  জন্য পথ চেয়ে থাকা প্রজারা দুঃখের খবরটা জানার পরে কেঁদেকেটে পাগল হয়েছিল। অনেকে  যেখানে ছিল,সমস্ত কিছু নিয়ে  আমাদের সঙ্গে বনে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। আমাদের দেখার জন্য পথগুলিতে এত ভিড় হয়েছিল যে আমাদের চলাফেরা করতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। আমার তপস্বী বেশ দেখে প্রজারা চিৎকার করে কাঁদছিল। আমরা নিঃশব্দে কোনোভাবে শাশুড়ির প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়ালাম।প্রাসাদের  সামনে দুঃখিত মনে দাঁড়িয়েছিল মন্ত্রী তথা সারথি সুমন্ত্র। স্বামী প্রণাম জানিয়ে বলল-‘হে পরম সুহৃদ, মহারাজকে  খবর দিন যে আমরা বনবাসে যাবার জন্য বেরিয়ে এসেছি এবং যাওয়ার আগে তার সঙ্গে একবার দেখা করে যেতে চাই।’ 

মন্ত্রী সুমন্ত্র মহারাজকে আমাদের কথা নিবেদন করে বেরিয়ে এসে বললেন-‘আপনারা কিছুক্ষণ এখানে অপেক্ষা করুন।রাজা তার সাড়ে তিনশো পত্নীর সঙ্গে একসঙ্গে আপনাকে দেখতে চান। তাই আমি তৎক্ষণাৎ সমস্ত রানিকে এখানে আনার ব্যবস্থা করছি।’ 

এভাবে বলে সুমন্ত্র মুহূর্তের মধ্যে দূতের সাহায্যে রানিদের মহলে খবর পাঠালেন। রানি কৌশল্যা এবং মেজোরানি সুমিত্রার কাছে নিজে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সমস্ত রানি রাজার কাছে এসে জমায়েত হলেন। সঙ্গে সঙ্গে পিতা দশরথ আমাদের ডেকে পাঠালেন। স্বামী রামকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরার জন্য বসা থেকে এগিয়ে আসতে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে মাটিতে ছিটকে পড়লেন। স্বামী এবং  লক্ষ্ণণ দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে শুইয়ে দিয়ে শুশ্রূষা করতে লেগে গেলেন। একদিকে সমবেত রানিরা  আমাকে তপস্বীর বেশে দেখে  এবং অন্যদিকে রাজার এরকম অবস্থা দেখে কাঁদতে শুরু করলেন। আমরাও চোখের জল সম্বরণ করতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পরে শ্বশুড়ের চেতনা ফিরে এল। তিনি উঠে পালং এর উপর বসলেন। স্বামী এগিয়ে গিয়ে তাকে প্রণাম জানিয়ে বললেন-‘হে পিতৃ দেবতা, আপনি ছোট মায়ের কাছে করা প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে আমি দণ্ডকারণ্য যাবার জন্য বেরিয়ে এসেছি। আমার সঙ্গে সীতা এবং লক্ষ্ণণও যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছে। আমি এদের বনবাসে যাওয়া থেকে বিরত করতে অনেক চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারলাম না। তাই আপনাকে সীতা এবং লক্ষ্ণণকে বনবাসে যাবার অনুমতি দিতে হবে।’ 

কিন্তু পিতা দশরথ সেই কথার কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল বললেন-‘আমার প্রিয় পুত্র রাম, আমি কৈকেয়ীর কাছে কথার বাঁধনে বাঁধা পড়ে আছি। ভাবতে পারি নি একবারও যে তার এই সুন্দর চেহারার অন্তরালে একটি বিষধর সাপ লুকিয়ে ছিল। তাই যা চাইবে তাই দেব বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। হে, রাম তুমি আমাকে বন্দি করে অযোধ্যার সিংহাসন অধিকার করছ না কেন?’

স্বামী রাম বড় কোমল কন্ঠে পিতার চরণে হাত রেখে বলল-‘ হে আমার পূজনীয় পিতা, আমার রাজ্যের লোভ একেবারেই নেই। বর্তমানে আমার কর্তব্য হল আপনাকে সত্যের পথ থেকে যাতে  সরে আসতে না হয় সে চেষ্টা করা। চৌদ্দ বছর বনবাস খেটে আপনার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করা। আশা রাখছি আপনি আরও একশো বছর এই রাজ্যের অপরাজেয় রাজা হয়ে রাজ্য শাসন করতে থাকবেন। এখন আপনি আমাদের বিদায় দিন।’ 

স্বামীর কথা শুনে  দশরথ বললেন-‘ রাম তুমি যেহেতু বনবাসে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছ, তোমাকে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। ‘হে প্রাণাধিক  পুত্র,অন্তত আজকের দিনটা আমার সঙ্গে থেকে যাও। আমি মনের আশ মিটিয়ে তোমাকে দেখব এবং একসঙ্গে এক বেলা আহার গ্রহণ করব।’ 

পিতার কথা শুনে স্বামী বললেন- ‘হে পিতা, আজ আপনার সঙ্গে যে সুস্বাদু আহার ভক্ষণ করব, তা আগামীকাল বনবাসে গেলে আমাকে কে দেবে? তাই আমাকে ধরে রাখার ক্ষুদ্র দুর্বলতা ত্যাগ করে আজই বনবাসে যাওয়ার জন্য আজ্ঞা দিন।’

স্বামীর কথা শুনে শ্বশুর দশরথ রানি কৈকেয়ীকে পুনরায় আমাদের সামনে তিরস্কার করে কাঁদতে শুরু করলেন আমরা তাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে শোক সম্বরন করার জন্য উপদেশ দিলাম। তারপরে তাকে প্রণাম করে বাকি রানিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরোনোর জন্য প্রস্তুত হলাম। আমাদের বিদায় নিতে দেখে রাজা দশরথ পুনরায় অচেতন হয়ে পড়লেন।রানিরাও চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। ঠিক তখনই  একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটল। সর্বদা নম্র, ভদ্র এবং মধুর বচনে সবার সঙ্গে কথা বলতে অভ্যস্থ মন্ত্রী  সুমন্ত্র, দুঃখ এবং শোকে অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি স্থান,মান,কাল সমস্ত কিছু ভুলে গিয়ে ছোট শাশুড়ি কৈকেয়ীকে  তিরস্কার করতে লাগলেন। আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে মন্ত্রীর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম। তিনি এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন,-‘ রানি কৈকেয়ী শোন, রাজবংশে রাজার  পরে তার জ্যেষ্ঠপুত্রের রাজা হওয়াটাই  নিয়ম। তুমি চালাকি করে নিজের পুত্রকে রাজা করতে চাইছ। রাজাকে এত বছর ধরে ছলনা করলে। তার জীবনে কোনো অঘটন ঘটলে তুমিই তার জন্য দায়ী হবে। তুমিতো হত্যাকারিনী এবং কুলনাশিনী দুটোই। একজন নারীর জন্য পতির জীবন কোটি কোটি পুত্রের চেয়েও বেশি মূল্যবান। এরকম একজন পতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবার জন্য তোমাকে সমগ্র কোশল রাজ্যের তিরস্কার শুনতে হবে। তুমি ভেবেছ ভরত রাজা হবে এবং তুমি রাজমাতা হয়ে পরম সুখে দিন কাটাবে। তবে তোমার পুত্রের শাসনে কুকুর, শিয়ালের বাইরে অন্য কোনো জীব এই রাজ্যে থাকবে না। তোমার রাজ্যে ব্রাহ্মণ, সজ্জন, সাধুসন্ত বাস করবে না। সমগ্র অযোধ্যাবাসী রামের সঙ্গে বনবাসে চলে যাবে।’ কথাটা বলে সুমন্ত্র এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেছিলেন। তারপর পুনরায় আরম্ভ করেছিলেন- ‘যখন রাজা দশরথ তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল আমি তখনই ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়েছিলাম। জানতাম নিষ্ঠুরতা,নির্দয়তা তোমাদের রক্তে রয়েছে। কারণ তোমার মা কেকয় মহারানিও সামান্য একটা কথার জন্য মহারাজ কেকয়কে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। সহস্রজন তোমার মায়ের কাছে কাকুতি-মিনতি করে ছিল অথচ রানি কারও কথাতে কান দেননি। তিনি বলেছিলেন-‘ রাজা মরুক বা বাঁচুক, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। মোটকথা  তিনি হাসার কারণ কী ছিল আমাকে বলতে হবে। শেষে যদিও প্রভুর কৃপায় মহারাজকে মরতে হয়নি। তোমার মাকে দেশান্তরী হতে হল। আজ এই কথা বলার কোনো বাধা নেই বলেই কথাগুলি বললাম। তোমার পতি রাজা দশরথ বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তুমি বিন্দুমাত্র সদয় না হয়ে রামকে বনবাসে পাঠিয়ে ছেলের সঙ্গে রাজত্ব করতে চাইছ। কিন্তু তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হবেনা। তাই বলছি এখনও সময় আছে। তুমি সমস্ত প্রতিজ্ঞা উঠিয়ে নিয়ে রামের অভিষেক সম্পন্ন কর। তখন তোমার নাম কাল জয়ী হবে।’ 

সুমন্ত্রের কথা শুনে সবাই নীরবে ছোটরানির দিকে তাকাল- হয়তো রানির শুভবুদ্ধি হবে। কিন্তু তিনি নির্বিকার। তা দেখে শ্বশুর দশরথ বললেন-‘সুমন্ত্র রামের যাত্রার আয়োজন কর। সঙ্গে যাবে চতুরঙ্গ সেনাবাহিনী, ধন-সোনা, মুক্তায় পরিপূর্ণ রথ, অস্ত্রশস্ত্রের ভান্ডার, সৈন্য-সামন্ত, এবং নগরবাসীর যে বা যারা যেতে চায়।’ 

এবার কিন্তু ছোট শাশুড়ি চুপ করে রইলেন না। তিনি ক্রোধের সঙ্গে রাজাকে বললেন-‘ সম্পত্তি বিহীন রাজ্যকে রাজ্য বলে না। ভরত কখনও সেরকম কোনো রাজ্য গ্রহণ করবে না।’

শ্বশুর দশরথের  রাগ হল। তিনি মুখ ভেংচে বললেন-‘তোমার ছলনাময়ী আচরণে  রামকে বনবাসে পাঠাব বলে বাঁধা পড়েছিলাম। কোনো সম্পত্তি দেব না বলে কখনও প্রতিজ্ঞা করিনি।’ 

ছোট শাশুড়ি কঠিন কণ্ঠে বললেন-‘কেন ভুলে গেলেন নাকি? আপনার পূর্বপুরুষ মহারাজ সগর তার জ্যেষ্ঠপুত্র অসমঞ্জকে পুনরায় রাজ্যে প্রবেশ করার অধিকার না দিয়ে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল।’  ছোটরানির কথা শুনে সমবেত লোকদের রাগ হল। কারণ, কোথায় মহারাজ সগরের পুত্র অসমঞ্জ আর কোথায় রামচন্দ্র। তিনি কীভাবে স্বামী রামচন্দ্রকে সগরেব অসৎ পুত্র অসমঞ্জের সঙ্গে তুলনা করতে পারলেন- একথা ভেবে আমি অবাক হয়েছিলাম। ধৈর্যেরও একটা সীমা থাকে। তথাপি পরিস্থিতি যাতে খারাপ না হয় সেই জন্য সবাই চুপ করে রইল। কিন্তু রাজসভার সিদ্ধার্থ নামের একজন বৃদ্ধ মন্ত্রী স্থির থাকতে পারলেন না। এই মন্ত্রী আবশ্যক না হলে কখনও মুখ খোলেন না বলে সবাই জানত। মন্ত্রী সিদ্ধার্থ  বললেন-‘অসমঞ্জকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল তার অসৎ এবং সমাজ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য। কিন্তু আমাদের রামচন্দ্রের দোষ কোথায়?’

স্বামী রাম বুঝতে পারলেন এখনই বেরিয়ে না পড়লে বাদানুবাদ বেড়েই চলবে। হয়তো আয়ত্বের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই তিনি গুরু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন-‘ হে মহারাজ, আমি রাজভোগ, রাজসুখ ত্যাগ করে বনবাসী জীবন যাপন আরম্ভ করতে চাইছি। সেখানে আমার ধন সম্পত্তি সেনা ইত্যাদির আবশ্যক নেই। এই সমস্ত কিছুই ভরতের হোক।’

  স্বামীর কথা শেষ হওয়ার পরে আমরা যাবার জন্য প্রস্তুত হতেই ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠ  তাঁর ডান হাতে আমাকে কাছে টেনে নিয়ে ছোট শাশুড়ির সামনে উপস্থিত করিয়ে বললেন-‘ তোমার দুষ্টু বুদ্ধি সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। অযোধ্যার রাজা দশরথের শ্রেষ্ঠ পুত্রবধূ সীতা বনবাসে যাবেনা, রামের জায়গায় সিংহাসনে বসবে।’ ব্রহ্মর্ষির কথা শুনে সবাই অবাক হয়েছিল। কিন্তু আমি নম্রভাবে জানালাম যে বর্তমানে আমার ধর্ম হবে দুঃখের দিনে স্বামীর সঙ্গে থেকে তাকে সেবা করা। সেই মুহূর্তে ঋষি বশিষ্ঠের ব্যবহার এবং কথাবার্তায় নারীর প্রতি তার শ্রদ্ধা, উচ্চ চিন্তা ধারার কথা স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর সেই কথাগুলি আজও  আমার কানে বাজে। বোধহয় একটি সমাজে এইধরনের ব্যক্তি থাকার জন্যই এখনও সমাজে নারীর স্থান নিচু হয় না।

এরপরে আর কাউকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমরা জ্যেষ্ঠ মাতা কৌশল্যার কাছে গেলাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন-‘সীতা আমি অত্যন্ত সুখী যে তুমি রাজ্য সুখ ত্যাগ করে এই বিপদের সময় স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের জন্য বনবাসে যেতে প্রস্তুত হয়েছ।এটা তোমার মহত্ত্বের পরিচায়ক। দারিদ্র্য অস্থির করে তুললেও রামকে অনাদর কর না। এই কথা বলে তিনি আমার মাথার ঘ্রাণ  নিলেন এবং হৃদয় উজার করে আশীর্বাদ করলেন। দুই চোখে অবিরাম অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল যদিও মাতা কৌশল্যা শোক সম্বরণ করে ছেলেকে আশীবার্দ করে বললেন-‘ হে মোর বীর পুত্র রাম,আনন্দিত মনে  তুমি পিতৃবাক্য পালন করার জন্য বনবাসে যাও। সমস্ত দেব-দেবতা তোমার পথের সঙ্গী হোক। তুমি এই কঠিন কাজ করে ফিরে আসা পর্যন্ত আমি পথ চেয়ে থাকব।’ ঠিক সেভাবেই লক্ষ্ণেণেরও মাথায় হাত রেখে আশীবার্দ করে বললেন-‘হে সুমিত্রানন্দন, তুমি দাদার জন্য স্বেচ্ছায় যে কঠিন জীবন যাপন করতে এগিয়ে চলেছ সে কথা ইতিহাসে ভ্রাতৃভক্তির প্রতীক হয়ে থাকবে।’ 

মাতা সুমিত্রার কাছ থেকেও আমরা আলাদা আলাদাভাবে বিদায় নিলাম। তারপরে আমাদের তিনজনের হয়ে  স্বামী রাম হাতজোড় করে সাড়ে তিনশো মাকে বললেনঃ ‘হে  মাতৃবৃন্দ, কখনও  জেনে বা না-জেনে যদি দোষ করে থাকি বা কঠিন কথা বলে থাকি আজ সমস্ত ভুলে গিয়ে আমাদের আশীর্বাদ করুন যাতে পিতার আজ্ঞা পালন করে নিরাপদে ফিরে আসতে পারি। স্বামীর বিদায় বচন শুনে রানিদের মধ্যে কান্নার রোল উঠল।

অবশেষে পিতাকে পুনরায় ডেকে স্বামী বললেন-‘হে পিতৃদেবতা, আপনাকে মাত্র একটি অনুরোধ করতে চাই। আমার মাতা কৌশল্যা  কখনও যেন  কোনো আঘাত না পায় সেদিকে  আপনি লক্ষ্য রাখবেন। তিনি এই বৃদ্ধ বয়সে পুত্রকে বনবাসে পাঠাতে হওয়ায় দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছেন। আপনাকে এই সংকটের সময় ছেড়ে যেতে চাইছেন না। না হলে আমার সঙ্গে বনবাসে চলে যেতেন।’ ছেলের কথা শুনে রাজার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিনি কথা বলতে না পেরে শুধু মাথা নাড়ালেন। তারপরে কোনোভাবে সারথিকে আদেশ দিলেন –‘সুমন্ত্র রামের জন্য রথ প্রস্তুত কর।’ স্বামীও বললেন-‘হ্যাঁ মহারাজ, কোশল  রাজ্যের সীমা পার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের রথেই যেতে হবে। না হলে প্রজারা আমাদের এগোতে দেবে না।’ ক্রন্দন, চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে আমাদের বিদায় পর্ব শেষ হল। আমরা চোখের জল ফেলতে ফেলতে রাজপথে পা রাখলাম।


 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কোল উপজাতি হো ভাষার লিপির আবিষ্কারকের জন্ম দিবস উদযাপন ৷৷ সংস্কৃতি সংবাদ, Midnapore

কোল উপজাতি হো ভাষার লিপির আবিষ্কারকের জন্ম দিবস উদযাপন ৷৷ সংস্কৃতি সংবাদ আজ (১৯\৯\২০২১) সকাল ১০ টায় পশিচ্ম  মেদিনীপুরের ডেবরা ব্লকের গোলগ্রা...