রবিবার, ২৭ জুন, ২০২১

স্বাস্থ্য || হোমেন বরগোহাঞি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ- বাসুদেব দাস,Basudeb Das

 স্বাস্থ্য

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ- বাসুদেব দাস




বাড়ি তৈরি করার জন্য একটা ভিত দরকার। সেই জন্য  বাড়ি তৈরি করার আগে মানুষ ভিতটা তৈরি করে নেয়। ভিতটা যত মজবুত হয় বাড়িও  ততই দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাড়ির সঙ্গে ভিতের যে সম্বন্ধ , মানুষের জীবনের সঙ্গে স্বাস্থ‍্যের ও সেই সম্বন্ধ। অর্থাৎ  জীবনটাকে যদি আমরা বাড়ি বলে ধরে নিই , তাহলে স্বাস্থ্য হল তার ভিত। সেই জন্য মানুষ জীবন গড়ার কাজে হাত দেবার আগে প্রথমে নিজের স্বাস্থ‍্যটাকে মজবুত করে নিতে হয় এবং স্বাস্থ্য যাতে  কখন ও নষ্ট না হয় তার প্রতি সতত দৃষ্টি রাখা উচিত। প্রাচীন ভারতের ঋষিরা ও বলে গেছেন - শরীর মাদ‍্যং খলু ধর্ম সাধনম। অর্থাৎ ধর্ম সাধনা আরম্ভ করার আগে মানুষ নিজের শরীরটাকে গড়ে নেওয়া উচিত।

উপদেশের চেয়ে উদাহরণ বেশি ভালো। জীবনে অসাধারণ কৃতকার্যতা লাভ করা লোকেরা নিজের স্বাস্থ্য গঠনের প্রতি কীভাবে মনোযোগ দেয় তার কয়েকটি উদাহরণ নিচে দেওয়া হল।

মানবজাতির ইতিহাসে মহাবীর বললে প্রথমেই যে কয়েকজন মানুষের নাম মনে আসে তারা হলেন আলেকজান্ডার, জুলিয়াস সিজার এবং নেপোলিয়ন। বিশ্ব-বিজয় অভিযানে বাহির হয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তে পৃথিবী রক্তাক্ত করা আর ও অনেক যোদ্ধার  নাম ইতিহাসে পড়তে পাওয়া যায়। তাদের ভেতরে চেঙ্গিস খান, তৈমুর লং এবং আতিলা আদির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য। কিন্তু আসুরিক শক্তিতে দেশ জয় করা এবং ধন সম্পদ লুণ্ঠন করার বাইরে এই রক্তলোলুপ যোদ্ধাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। অন্যদিকে আলেকজান্ডার, সিজার এবং নেপোলিয়ন এই তিনজন মানুষই ছিলেন বিরাট ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন প্রতিভাশালী মানুষ । দেশ জয় করা ছাড়া ও তারা করে যাওয়া অনেক কাজ মানুষের সভ্যতাকে নানা প্রকারে ধনী করেছে এবং আজ পর্যন্ত মানুষ তার ফল ভোগ করে চলেছে ।

প্রথমে আলেকজান্ডারের কথাই ধরা যাক (খ্রিঃপূঃ ৩৫৬-৩২৩)। আলেকজান্ডার তাঁর স্বদেশ গ্রিস থেকে বিশ্ব-বিজয় অভিযানে বের হয়ে ইজিপ্ট মেসোপটেমিয়া, পারস্য এবং আফগানিস্তান জয় করে অবশেষে ভারতে প্রবেশ করেছিল। এ প্রসঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে মাত্র পাঁচশো বছর আগে পর্যন্ত আমেরিকা তথা নতুন মহাদেশের  অস্তিত্ব ও পৃথিবীর বাকি অংশের মানুষের সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল। সে ক্ষেত্রে আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসের মানুষ পৃথিবী বললে কী বুঝত বা পৃথিবীটা তাদের কল্পনায় কত বড় ছিল তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। সেই সময় মানুষ পৃথিবীটাকে একটি থালার মতো চ‍্যাপ্টা বলে ভেবেছিল। পৃথিবীটা যদি চ‍্যাপ্টাই হয় তাহলে এক দিক থেকে এগিয়ে যেতে থাকলে একদিন না একদিন মানুষ পৃথিবীর শেষ সীমায় গিয়ে উপনীত হতে পারবে । আলেকজান্ডারের একজন জীবনী লেখকের মতে তার বিশ্ববিজয় অভিযানের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর শেষ সীমা এবং তার ওপারে কী  আছে সে কথা আবিষ্কার করা। অর্থাৎ কেবল যুদ্ধ জয়ের মাদকতা নয়, অজানাকে জানার অদম্য কৌতুহলও তাকে দূরে, আর ও দূরে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিল। আলেকজান্ডারের শিক্ষা গুরু ছিলেন সেই যুগের এবং সর্বকালের একজন শ্রেষ্ঠ দার্শনিক অ্যারিস্টটল। আলেকজান্ডার যখন নতুন নতুন দেশ জয় করেছিলেন, তখন তিনি সেই সমস্ত দেশ থেকে গাছ ,লতা এবং পশুপক্ষী সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য এরিস্টটলের কাছে পাঠিয়েছিলেন ।সেই সময় গ্রিস ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য দেশ ।আলেকজান্ডারের বিজয় অভিযান গ্রিসের সভ্যতা সংস্কৃতির প্রভাব চারপাশে ছড়িয়ে দিয়ে মানবজাতির ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছিল। তা ছাড়া তিনি নিজে স্থাপন করা আলেকজান্দ্রিয়া নামের নগরটি কাল ক্রমে হয়ে পড়েছিল জগতের জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে বৃহৎ এবং বিখ্যাত কেন্দ্র।

আলেকজান্ডারের মতো জুলিয়াস সিজার(খ্রিঃপূঃ১০০-৪৪) এবং নেপোলিয়ন ও (খ্রিঃ১৭৬৯-১৮২১) কেবল দেশ জয় করে বা সামরিক গৌরব অর্জন করেই ক্ষান্ত হয়ে থাকেন নি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তারা কয়েকটি যুগোত্তীর্ণ কীর্তি ও রেখে গেছেন। মানব সভ্যতায় জুলিয়াস সিজারের যুগোত্তীর্ণ অবদান হল জুলিয়ান ক্যালেন্ডার এবং তার আত্মজীবনী। ঠিক সেভাবে নেপোলিয়ন করে রেখে যাওয়া  আইন সংস্কার আধুনিক ইউরোপের সমাজ এবং সভ্যতার ভিত তৈরি করে রেখে গেছে।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে- স্বাস্থ্যের কথা বলতে গিয়ে এই সমস্ত মহাবীরের নাম টেনে আনার উদ্দেশ্য কি? তাদের সঙ্গে স্বাস্থ‍্যের সম্পর্ক কী ?সম্পর্ক অতি স্পষ্ট। যুদ্ধ করাটা অত্যন্ত কঠিন কাজ ।বিশ্ব-বিজয়ের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করাটা তার চেয়ে হাজার গুণ কঠিন কাজ । বিশ্ব-বিজয়ী মহাবীর হওয়ার জন্য যে জিনিসটার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি সেটা হল মজবুত স্বাস্থ্য । কেবল দেহের স্বাস্থ্য নয়, সঙ্গে মনের স্বাস্থ্য । অসাধারণ চিন্তাশক্তি ছাড়া কেউ সুদক্ষ সেনাপতি হতে পারে না। অন্যদিকে মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে মগজ ঠিক মতো চিন্তা করতে পারে না। সেইজন্য গ্রিক সভ্যতার স্বর্ণযুগে গ্রিকরা স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা দিয়েছিল এভাবেঃ' সুস্থ দেহে সুস্থ মন।' অর্থাৎ একজন মানুষের দেহ এবং মন দুটোই যখন সুস্থ থাকে কেবল তখনই তাকে প্রকৃত স্বাস্থ্যবান বলা যেতে পারে। যেহেতু আলেকজান্ডার, সিজার এবং নেপোলিয়ন তিনজনেই বিশ্ব-বিজয়ী মহাবীর ছিলেন, তাই একথা স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিতে হবে যে তারা ছিলেন অসাধারণ দৈহিক এবং মানসিক শক্তির অধিকারী মানুষ ।অর্থাৎ অন্য ভাবে বলতে গেলে সম্পূর্ণ অর্থে স্বাস্থ্যবান মানুষ। তাই স্বাস্থ্য গঠনের প্রথম পাঠটি আমরা তাদের কাছ থেকে নিলেই ভালো হবে না কি?

মানুষ প্রধানত খাদ্য থেকেই শক্তি আহরণ করে ।তাই মানুষ কী খায় আর কীভাবে খায় তার ওপরে স্বাস্থ্য অনেকখানি নির্ভর করে। যে কথায় আলেকজান্ডার, সিজার, নেপোলিয়নের মধ্যে অদ্ভুত মিল ছিল সেটা হল এই যে তারা জিহ্বার লোভে কোনো কিছু খেতেন না। এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি একেবারেই খেতেন না। তাঁরা তিনজনেই অত্যন্ত সাধারণ আহার খেতেন এবং কখন ও অধিক ভোজন করতেন না।

স্বাস্থ্য গঠনের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে জিহ্বার লোভে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেলে বা বাছবিচার না করে যা খুশি তাই খেলে তার ফলে শরীর রুগ্ন এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় যে কথায় এই তিনজন মহাবীরের মিল ছিল সেটা হল এই যে তারা সব সময় আরাম পরিহার করে চলতেন এবং দেহটাকে মজবুত  করে রাখার জন্য কষ্টকর জীবন যাপন করতেন। অন্য দুজনের তুলনায় সিজারের শরীর একটু  দুর্বল ছিল ।সেই জন্য তিনি শরীরটাকে সবল করে তোলার জন্য সাধারণ আহার খেতেন এবং মুক্ত আকাশের নিচে মাটির উপরে শুয়ে কঠোর  জীবন যাপনের যারা নিজেকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। আলেকজান্ডার এবং নেপোলিয়ন ও সাধারণ সৈনিকের মতো অত্যন্ত কষ্টকর জীবন যাপন করতেন। তাই আমরা তাদের জীবন থেকে এই শিক্ষাই লাভ করি যে স্বাস্থ্য গঠনের প্রথম সোপান হল অতিভোজন পরিহার করে সহজে হজম করতে পারা সাধারণ কিন্তু পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। দ্বিতীয় সোপানটি হল শুয়ে বসে অলস জীবন যাপন না করে কঠোর পরিশ্রম এবং ব্যায়ামের দ্বারা শরীরটাকে মজবুত করে তোলা। নেপোলিয়নের বিষয়ে একটি কথা বলা হয় যে তিনি সম্রাট হয়ে যখন থেকে আরামের জীবন কাটাতে শুরু করলেন এবং বিশেষ করে গরম জলে স্নান করতে লাগলেন তখন থেকেই তাঁর দৈহিক শক্তি এবং চিন্তা শক্তি হ্রাস পেতে লাগল।

ডঃএলেক্সিস ক্যারেল একজন বিশ্ব বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী।১৯৯২ সনে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। মানুষ খুব বেশি আরাম প্রিয় হলে কীভাবে তার দেহ এবং মন উভয়ের ক্ষতি হয় সেকথা ব্যাখ্যা করে তিনি একটি গ্রন্থে লিখেছেন-' মানুষকে যতই জীবনের কঠিন পরিস্থিতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয় ততই তার দৈহিক শক্তি এবং সাহস বৃদ্ধি পায় ।স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের বৈচিত্রহীন এবং আরাম পূর্ণ জীবনযাপন করার করার জন্য শেখানো উচিত। মানুষ যখন সংযম এবং অনুশাসন মেনে চলার জন্য চেষ্টা করে তখন তার স্নায়ুতন্ত্রী, হরমোন উৎপাদক গ্রন্থি এবং মনে।অনেক কিছু পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে এভাবে সমন্বয় ঘটে ফলে মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অধিক শক্তি অর্জন করে।

মানুষের স্বভাবটিই এরকম যে কোনো জিনিসের প্রতি লোভ হলেই সেই লোভটা চরিতার্থ  করার জন্য সে সচেষ্ট হয়। নেশার জিনিস ,তীব্র গতি ,অবিরাম পরিবর্তন- এই সমস্ত কিছুর প্রতি মানুষ সব সময় লোভ অনুভব  করে। কিন্তু লোভ হওয়া মাত্র তা তৃপ্ত করার জন্য সচেষ্ট হলে মানুষের দেহ এবং মন দুটিই দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষুধা- তৃষ্ণা ,ঘুম ,আলস্য ,নেশার জিনিসের প্রতি আকর্ষণ- এই সমস্ত কিছুকে জয় করতে মানুষকে শেখাতে হবে। তখনই মানুষের দেহ এবং মনের শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

আধুনিক মানুষ হয় খুব বেশি করে ঘুমায় অথবা খুব কম পরিমাণে ঘুমোয়। ঘুমোতে ইচ্ছে করলেই জেগে থাকার চেষ্টা করাটা শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী ।এর ফলে ইচ্ছা শক্তিও বৃদ্ধি পায়। আলস্যের বশবর্তী হয়ে যে মানুষ কাজকর্ম না করে বেশিরভাগ সময় শুয়ে বসে কাটায় তাদের দেহ এবং মন পরিশ্রমী মানুষের চেয়ে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ঠিক সেভাবে যে মানুষ মগজের পরিশ্রম একেবারেই না করে কেবল সিনেমা থিয়েটার দেখে সময় কাটায় তাদের মগজ তথা চিন্তা -শক্তির বিকাশ ঘটতে পারে না।

স্বাস্থ্য গঠনের জন্য চারটি জিনিস সবচেয়ে দরকারি বলে ভাবা হয়। সেগুলি হল১) সহজে হজম করতে পারার মতো পুষ্টিকর আহার ২) নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যায়াম ৩) ভালো ঘুম এবং অবসর ৪) মানসিক প্রফুল্লতা। কিন্তু এই চারটির সঙ্গে আরও একটি জিনিস যোগ দেওয়া উচিত বলে আমার মনে হয়। সেটা হল আত্ম-সংযম। উদাহরণস্বরূপ, নেশার জিনিসের প্রতি তোমার লোভ জন্মেছে, সেই লোভপঞণ দমন করার জন্য চাই আত্ম-সংযম তথা ইচ্ছাশক্তি। জিহ্বার লোভে  অপকারী খাদ্য বা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাদ্য খেতে তোমার ইচ্ছা করছে, সেই ইচ্ছা দমন করার জন্য দরকার আত্ম-সংযমের। এক কথায় বলতে গেলে আত্ম-সংযমই হল দৈহিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য- গঠনের প্রথম সোপান। বাল্যকালে জ্ঞানী পিতা মাতা এবং শিক্ষকের শাসনে আত্মসংযমের শক্তি আয়ত্ত করা মানুষকে অনেকখানি সাহায্য করে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

** আনন্দমঙ্গল কথা- ১ ।। Anandamangal, Soumitra Roy

 আনন্দমঙ্গল কথা সৌমিত্র রায়  (১) শুভ সকাল বন্ধুরা- কয়েক বছর আগে মেদিনীপুরে একটি দুর্গা মণ্ডপের সামনে একটি book stall- এ একজন বিজ্ঞান শিক্ষ...