চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০২২

পাখিদের পাড়া পড়শী ২/৬ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda MedhiPakhider Para Porshi


পাখিদের পাড়া পড়শী ২/৬

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi




দ্বিতীয় অধ্যায় ,২/৬

সৌম‍্যদা মৃদু হেসে লীনার কথায় সায় দিল এবং বলতে লাগল– দেখ, চোখ বুজে তুমি তোমার আপনজনকে স্পর্শ করলে তোমার কীরকম মনে হয়। তুমি তোমার মাকে চোখ বুজে স্পর্শ করেও বলতে পার, ওটা তোমার মা। চোখ বুজে দাসকে স্পর্শ করলেও তুমি তাকে অনুভব করতে পার। সেভাবে গাছকেও চোখ বুজে স্পর্শ করে তোমাকে আপনজনের স্পর্শ অনুভব করার মতো অনুভব করতে হবে ।

উদয়শঙ্কর সেই অনুভব কেমন বুঝতে পারে না। করমর্দন করা ছাড়া সে জীবনে কাউকে স্পর্শ করে দেখেনি, কোনো আত্মীয়কে। সেই জন্য তার অনুভবের সঙ্গে অন্য কারও অনুভব কোনোমতেই মিলে না। আর যদি জীবনে কখনও কাউকে জড়িয়ে ধরার উল্লেখ করতে হয়, তাহলে এই গাছটিই উদয়শঙ্করের জন্য প্রথম অভিজ্ঞতা।

অন্যমনস্ক হওয়া উদয়শঙ্কর সৌম‍্যদা কী বলছে মন দিয়ে শুনতে লাগল।

– অসমের অরণ্যভাগের বরিষ্ঠ সংখ্যকই হল বর্ষারণ‍্য। বর্ষারণ‍্যের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। তার মধ্যে অন্যতম এবং প্রধান বৈশিষ্ট্য হল–এই অরণ্যের উদ্ভিদ রাজির চারটি প্রধান স্তর। এই অরণ্যের ভূমিভাগ বিভিন্ন উদ্ভিদে পরিপূর্ণ হয়ে থাকে। সাধারণত বিভিন্ন জাতের ঢেঁকীয়াজাতীয় উদ্ভিদ, গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, বিভিন্ন প্রজাতির কচু, বেত,ঘাস এবং রং বেরঙের পাতাবাহারের মতো গাছে পরিপূর্ণ হয়ে থাকে ।

মেঝেতে একটা পিন পড়লেও শব্দ শুনতে পাওয়া যাবে এরকম একটি নীরব পরিবেশে অংশগ্রহণকারীরা সৌম‍্যদার বক্তব্য শুনে চলেছে। সৌম‍্যদা অংশগ্রহণকারীদের প্রকৃতির প্রারম্ভিক জ্ঞান দানের জন্য এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে বোঝানোর জন্য যত্নবান হয়েছে।

– অরণ্যের ভূমি ভাগ্যের এই উদ্ভিদ স্তরকে প্রকৃতিবিদের  ভাষায় বলা হয় ভূমি সংলগ্ন স্তর  এবং ইংরেজিতে বলা হয় হার্ব লেয়ার। হার্বলেয়ারের উপরে একই উচ্চতার কিছু গাছ পরিলক্ষিত হয়। এই স্তরকে বলা হয় নিম্নস্তর বা আণ্ডারস্টোরি লেয়ার। তার উপরে আরও একটি স্তরে একই মাপের কিছু গাছ বা উদ্ভিদ দৃষ্টিগোচর হয়। এই স্তরকে বলা হয় মধ্যস্তর বা ক্যানোপি লেয়ার এবং সবচেয়ে উচ্চতায় উঁচু উঁচু কিছু  গাছ চোখে পড়ে। সেই স্তরকে বলা হয় শীর্ষস্তর বা ইমারজেন্ট লেয়ার। বর্ষারণ‍্য বা বর্ষা বনের ভূমি ভাগ বেশিরভাগ সময়েই ভিজে থাকে। এই অরণ্যের পাতা, জলীয় বাষ্প এবং দৈনিক জলচক্রের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হয় বছরে আশি ইঞ্চি বা তার চেয়েও অধিক। এই প্রক্রিয়া বর্ষাবনের মাটিকে বেশি উর্বর করে তোলায় সাহায্য করে ।

কথা বলার সঙ্গে সৌম‍্যদা এগিয়ে যেতে বলল । গোলাপ এবং কিশোর সৌম‍্যদার  সঙ্গে এগিয়ে গেল। উদয়শঙ্কর ধীরে ধীরে তাদের অনুসরণ করল।

যাদের মধ্যে পূর্ব পরিচয় এবং সৌহার্দ্য রয়েছে তারা একসঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে । কথাবার্তা বলছে ।ফোটো উঠছে। বাইনোকুলারে চারপাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে ।

– দাদা আপনি যে বর্ষারণ‍্য  বললেন আসলে বর্ষারণ‍্য  মানে কি ?

হাঁটতে হাঁটতেই সুনীল দাসের পত্নী লীনা জিজ্ঞেস করল । যেভাবে একদিন উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করেছিল ।

সৌম‍্যদা দাঁড়িয়ে পড়লেন । তাকে অনুসরণ করা অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যেকেই দাঁড়িয়ে পড়ল এবং তিনি কী বলেন তা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

– জার্মান উদ্ভিদবিদ এ এফ ডব্লিউ চিম্পার প্রথমবারের জন্য বর্ষারণ‍্য  বা রেইনফরেস্ট শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন । এই শব্দটি ব্যাবহারের মাধ্যমে তিনি বর্ষারণ‍্যকে অন্য তিন ধরনের অরণ্য যেমন' মনসুন ফরেস্ট',' সাভানা ফরেস্ট' এবং' থর্ন ফরেস্ট' থেকে পৃথক করতে চেয়েছিলেন। এই অরণ্য সমূহের বিষয়ে পরে একদিন সুবিধা পেলে বলব। মাত্র মনে রাখা ভালো, কিছুক্ষণ আগেই বলে আসা চার ধরনের উদ্ভিদ স্তর বর্ষারণ‍্যের বৈশিষ্ট্য। বর্ষারণ‍্যের ভূভাগে বাতাসের গতি প্রায় থাকে না, জলীয়বাষ্পের পরিমাণ প্রায় সত্তর শতাংশ  এবং উষ্ণতা স্থির হয়ে থাকে। উচ্চ উষ্ণতা এবং জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকার জন্য বর্ষারণ‍্যের ভূমি ভাগে অসংখ্য অনুজীবের জন্ম হয় এবং সেই জন্য বর্ষারণ‍্যের  ভূমিভাগে পচা গাছের পাতা,জীবজন্তুর শবদেহের  অংশবিশেষ গুলি থাকেনা। বর্ষারণ‍্যে প্রতি মাসে মান হিসেবে একশো মিমি  বা তার চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় । বর্ষারণ‍্যে চারটি স্তরের বিভিন্ন গাছপালা ছাড়াও নিযুত সংখ্যক বড় গাছ থাকে, ছোট এবং অনুজীব আকৃতির প্রাণী থাকে। মোটামুটি ভাবে বলতে গেলে এটাই বর্ষারণ‍্য । তাই বর্ষারণ‍্য কী তা এখন নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ।

লীনা সম্মতিসূচক ভাবে মাথা নেড়ে জানালো– হ্যাঁ পেরেছে।

সৌম‍্যদা পুনরায় ধীরেধীরে এগিয়ে যেতে লাগল। অরণের ভেতরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ হল কম শব্দ সৃষ্টি করা। অরণ্যে বিচরণ করার এটা হল প্রাথমিক শর্ত।

কিছু দূর হাঁটার পরেই সৌম‍্যদা হঠাৎ দাড়িয়ে পড়ল।

– শুনতে পাচ্ছেন । এটা হল হলৌ বাঁদরের চিৎকার ।

সবাই কান পেতে শুনতে লাগল সেই চিৎকার–হুক্কু, হুক্কু, হু উক্কু। 

– আমাদের বাঁদর প্রজাতিদের মধ্যে হলৌ বা হলৌ বাঁদর এক বিশেষ স্থান অধিকার করে রয়েছে। বাঁদর গোষ্ঠীর একটি বিশেষ ভাগকে ইংরেজিতে বলা হয় 'এপ' যাকে অসমিয়াতে আমরা কখনও কখনও বনমানুষ বলেও অভিহিত করি। আফ্রিকা মহাদেশের গরিলা, শিম্পাঞ্জি এবং ইন্দোনেশিয়ার ওরাংওটাং নামের বাঁদর জাতীয় প্রানীগুলি এপ বা বনমানুষের সম্প্রদায়ভুক্ত। বনমানুষ বা এপ গুলির অন্য বাঁদরের মতো লেজ থাকে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন অরণ্যে এই ধরনের কিছু এপ বা বনমানুষ দেখতে পাওয়া যায়। সামগ্রিকভাবে ইংরেজিতে এদের বলা হয় গিবন। আমাদের ভারতবর্ষে মাত্র একটি প্রজাতির বনমানুষ বা এপ দেখতে পাওয়া যায়, যার ইংরেজি নাম'হোলোক গিবন'। হলৌ বাঁদরের বৈজ্ঞানিক নাম 'বনপিথেকাছ হলক'।

সৌম‍্যদা অংশগ্রহণকারীদের দিকে একবার তাকাল। প্রত্যেকেই এক মনে তার কথা শুনে চলেছে।

সৌম‍্যদা পুনরায় আরম্ভ করলেন – মাটির ওপর দাঁড়ালে হলৌর উচ্চতা হবে প্রায় তিন ফুট বা তার চেয়ে কিছুটা কম। ওদের হাত দুটির দৈর্ঘ্য পায়ের প্রায় দ্বিগুণ,শরীরের ওজন ছয় থেকে আট কেজি পর্যন্ত হতে পারে। পুরুষ হলৌ বাঁদরের গায়ের রং হয় কালো এবং পূর্ণবয়স্কা মহিলা হলৌর গায়ের রং হয় খয়েরি বা মুগা। কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক মহিলা হলৌর গায়ের রং হয় কালো। হলৌ বাঁদরের মুখের দিকে তাকালে একটা জিনিস প্রত্যেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে – সেটা হল হলৌর এক জোড়া  সাদা ভুরু । এই দুর্লভ বনমানুষগুলি ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবার গঠন করে আমাদের অরণ্যগুলিতে বসবাস করে । একটি দলে দুটি থেকে ছয়টি  হলৌ বাঁদর দেখতে পাওয়া যায় । হলৌ বাঁদরের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলি অরণ্যের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে এক একটি স্বতন্ত্র অঞ্চলে বিচরণ করে । পুরুষ হলৌ তার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে স্ত্রী  হলৌ বেছে নেয় এবং তার সঙ্গে সারাজীবন অতিবাহিত করে । মাতৃ  হলৌ বড় স্নেহপ্রবণ। সন্তান যখন শিশু থাকে তখন মা সন্তানকে নিজের বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।অনেক সময় এক হাতে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে মাকে  গাছের ডালে ডালে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। হলৌ বাঁদর তার কণ্ঠ থেকে সুতীব্র চিৎকার বের করতে সক্ষম হয়। এই চিৎকার প্রথমে পরিবারের কোনো একজন সদস্য আরম্ভ করে, তারপর প্রত্যেকেই চিৎকার করতে শুরু করে।হলৌ বাঁদরের এই ধরনের চিৎকার অনেক দূর থেকে শুনতে পাওয়া যায়। এইমাত্র আপনারা যেভাবে শুনতে পেলেন। যখন হলৌ চিৎকার করতে শুরু করে তখন এরকম মনে হয় যে অনেক হলৌ বাঁদর একসঙ্গে চিৎকার করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। হলৌ সাধারণত একটি করে সন্তান প্রসব করে। ওদের প্রজনন হয় বর্ষার আগে আগে। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাসের ভেতরে মহিলা হলৌকে সন্তান প্রসব করতে দেখা যায়।











     















 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...