চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল, ২০২২

পাখিদের পাড়া পড়শী ২/৭ ।। পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, ।। Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi

 পাখিদের পাড়া পড়শী ২/৭

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi




দ্বিতীয় অধ্যায় ,২/৭

হলৌ পরিবারের সামূহিক চিৎকার অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীদের কানে সুতীব্র হয়ে ধরা দিয়েছে। সৌম‍্যদা মনে-মনে এবং ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। সৌম‍্যদার পাশাপাশি হাঁটতে থাকা লীনা বলল–আপনি হলৌ সম্পর্কে বলা এই কথাগুলিই আমি আপনার লেখায় পড়েছি।

–ও তুমি তার মানে পড়েছ।নামচাঙের অন্তেষপুরে  লিখেছিলাম।

অংশগ্রহণকারী প্রকৃতিকর্মীর দলটি ধীরে ধীরে হলৌ পরিবারের বাসস্থানের প্রায় কাছাকাছি পৌছে গেল। হলৌর দল সামূহিক চিৎকার-চেঁচামেচি বন্ধ করেছে যদিও দলটি থেকে কিছুটা দূরে একটি হলৌ একা হুক্কু হুক্কু বলে চিৎকার করছিল।

গোলাপ এবং কিশোর হাতে থাকা বাইনোকুলার শিবিরের সদস্যদের দিকে এগিয়ে দিল।

উদয়শঙ্কর অপলক নেত্রে লক্ষ্য করছে মানুষের পূর্বজ  বংশধরের বর্তমান সদস্যদের। একজন মহিলা হলৌর কোলে একটি ছোট শিশু। সে দেখতে পাচ্ছে একটি হলৌ অন্য একটি হলৌর উকুন বেছে দিচ্ছে। অবিকল মানুষের মতোই ওদের আচরণ।একদল পর্যটক যে গাছের প্রায়  নিচ থেকে হলৌ পরিবারটিকে নিরীক্ষণ করছে তার প্রতি পরিবারটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।উদয়শঙ্করের মনে হয় পর্যটকের ঘনঘন আসা যাওয়ার জন্যই হয়তো হলৌ পরিবারের এই নির্লিপ্ততা।পর্যটকদের গতিবিধির  বিষয়ে হয়তো হলৌ ভালোভাবেই অভ্যস্ত।

উদয়শঙ্কররা যথেষ্ট সময় হলৌ পরিবারটির সঙ্গে কাটাল।সৌম‍্যদা গভীর অরণ্যের মধ্যে কীভাবে পাখি এবং জীবজন্তুর গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে হয় সেই বিষয়ে দুই চারটা উপদেশ দিলেন।তিনি বললেন অরণ্যের অভ্যন্তরে থাকা সময়ে কী করা উচিত আর কী করা অনুচিত। হিংস্র জন্তু থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার জন্য অরণ্যপ্রেমীরা নিতান্তই সাবধান হওয়া প্রয়োজন। অরণ্যের বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান ছাড়া অরণ্যে প্রবেশ করতে হলে কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তির  নেওয়া প্রয়োজন।অন্যথা বিপদ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

উদয়শঙ্কররা কাজিরাঙ্গা থেকে বেরিয়ে আসার সময় মাথার ওপরের সূর্য  হেলে পড়েছিল।সবার পেটে ক্ষুধা জানান দিচ্ছে।রাষ্ট্রীয় প্রধান পথ দিয়ে বোকাখাতের দিকে এগিয়ে কাজিরাঙ্গার অরণ্য অঞ্চলের শেষ মাথায় প্রকৃ্তি কর্মীরা এসে উপস্থিত হল।সৌম্যদা রাষ্ট্রীয় পথের পাশে বসে পড়ায় দলের অন্যান্যরা সবাই খুশিই হল।হাঁটার অভ্যাস না থাকাদের পায়ের মাংস পেশীতে টান ধরেছে।কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া মানে অনেকটা রেহাই পাওয়া। এখান থেকেও শিবির বেশ কিছুটা দূরে।আরও কিছুটা হাঁটতে হবে।    

শিবিরে পৌঁছে সৌম‍্যদা সবাইকে সন্ধে পাঁচটায় পুনরায় মিলিত হতে বলেন ।

– এখন খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম । মনে রাখবেন ,কেউ শিবির থেকে বাইরে যাবেন না।

পাঁচটার সময় কাজিরাঙ্গার চারপাশ অন্ধকারে প্রায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় । কী যেন এক নিঃসঙ্গতার স্পর্শ কাজিরাঙ্গা গ্রাস করে ফেলবে এমনটাই মনে হতে থাকে উদয়শঙ্করের। একজন দুজন করে অংশগ্রহণকারীরা এসে শিবিরের ঘরের বারান্দায় জমা হতে শুরু করেছে । কারও কারও হাতে চায়ের গ্লাস।

– শিবিরে অংশগ্রহণ করলে যে যেখানে যেভাবে খুশি চা এবং ভাত খাওয়া নিষেধ ।

সৌম‍্যদার  কথা শুনে হাতে চায়ের গ্লাস নেওয়া কয়েকজন অংশগ্রহণকারী চায়ে চুমুক দিতে লাগল। আর ধীরে ধীরে সৌম‍্যদার  কাছ থেকে সরে যেতে লাগল।

– শিবিরে অংশগ্রহণ মানে নিয়মানুবর্তিতার পাঠ  গ্রহণ। প্রতিটি  মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে সচেতনতার প্রতি। অরণ্যের ভেতরে শিবিরের ব্যবস্থা করলে শিবিরের সমস্ত নিয়ম নীতি অত্যন্ত কঠোর ভাবে পালন করি। আপনাদের মধ্যে অরুণ্য শিবিরে অংশগ্রহণ করা একজনও অংশগ্রহণকারী নেই বলে আপনারা অনেক কথাই উপলব্ধি করতে পারেননি । আশা করব পরবর্তী সময়ে আপনারা অরণ‍্য শিবিরে অংশগ্রহণ করবেন । নিজেকে একজন সৎ এবং প্রকৃত অর্থে পরিবেশকর্মী হিসেবে গড়ে তুলবেন ।

সৌম‍্যদার কথা শেষ হওয়ার  আগে হাতে গ্লাস নিয়ে পায়চারি করে চায়ে চুমুক দিয়ে কয়েকজন বারান্দা থেকে সরে পড়ল। লীনাও চায়ের গ্লাসটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এসেছিল,সৌম্যদার কথার সুর শুনে সঙ্গে  সঙ্গে পেছনে চলে এল।

– আমরা ভেতরে বসেই কথা বলব নাকি!

সৌম‍্যদা এভাবে বলায় বারান্দায় যারা ছিল তাদের মধ্যে একজন দুজন করে ভেতরে ঢুকে গেল এবং প্রত্যেকেই একজন দুজন করে এসে বিছানায়  বসে পড়ল।

আপনাদের আজকের অভিজ্ঞতা কীরকম? প্রত্যেকেই সংক্ষেপে কিছু একটা বললে ভালো লাগবে।

উপস্থিত অংশগ্রহণকারী প্রকৃতিকর্মীদের মধ্যে থেকে কয়েকজন সংক্ষেপে বলল–' ভালো খুব ভালো লাগল।

– আপনাদের মধ্যে থেকে কেউ আজকের দিনটির বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন কি?

প্রত্যেকেই মৌন। একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।

– কোনো প্রশ্ন নেই আপনাদের? একেবারে কিছুই জিজ্ঞেস করার বা জানার নেই?

সৌম্যদার প্রত‍্যুত্তরে এবার লীনা বলে উঠল।

– কিছুই নেই এমন নয়। কাজিরাঙ্গায় এসে কাজিরাঙ্গার  বিষয়ে কিছু জানার ইচ্ছে রয়েছে।

সৌম‍্যদা উপস্থিত প্রত্যেকের প্রতিক্রিয়া কেমন জানার জন্য সকলের দিকে একবার তাকাল। হরেন গগৈ হাতের ক্যামেরাটা আলগোছে মুছে  নিচ্ছে।

– উদয়শঙ্কর। আমি জানি তুমি কোথাও বেড়াতে গেলে কিছুটা হোমওয়ার্ক করে নাও।

সৌম‍্যদার কথা উদয়ঙ্করকে কিছুটা বিপাকে ফেলল।সৌম‍্যদা এভাবে সকলের সামনে কেন বলল। এটা ঠিক কথাটা যে সে সৌম‍্যদাকে   বলেনি তা  নয়। তারমানে এখন তাকে কাজিরাঙ্গার বিষয়ে বলতে হবে!

সৌম‍্যদা উদয়শঙ্করের মুখের রূপ পরিবর্তন দেখতে পেয়ে বলল– সবাই আমাদের নিজের মানুষ। মোটামুটি ভাবে একটা আভাস দাও।

উদয়শঙ্কর উঠে দাঁড়াল।

– না সেরকম কিছু নয়।' হোমওয়ার্ক' বলা যায় না। এমনিতেই একটু জানার চেষ্টা করি।

উদয়শঙ্কর লীনার দিকে তাকাল। একজন যুবতির কৌতহলের সঙ্গে তার কথা শোনার জন্য তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার জন্য তাকে এখন কাজিরাঙ্গার বিষয়ে বলতে হচ্ছে। অনিচ্ছার কথা নয়, প্রকৃতপক্ষে উদয়শঙ্কর বলতে নয় শুনতে আগ্রহী। তা সত্ত্বেও সে কাজিরাঙ্গা নামের উৎপত্তি থেকে শুরু করল।

– কাজিরাঙ্গা নামের উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি জনশ্রুতি রয়েছে। কারও কারও মতে কাজি ছিল কারবি পাহাড়ের একজন যুবক। সে ভালোবাসতো পাশের গ্রামের যুবতি রঙাকে। কিন্তু দুইজনেরই ভালোবাসার নাকি ইতি পড়ে অস্বাভাবিকভাবে । ওদের দুজনের সম্পর্ককে পরিবারের লোক মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় দুজনেই ঘন অরণ্যের মধ্যে হারিয়ে যায় । দুজনকে কেউ খুঁজে পেল না । এই দুই যুবক যুবতির নামে অরণ‍্যটির নাম হয় কাজিরঙ্গা। অন্যদিকে,কারবি ভাষায় 'কাজি' মানে ছাগলী 'রাঙ্গি' মানে রঙা অর্থাৎ লাল। জনশ্রুতি অনুসারে রঙা ছাগলীর বসবাস ভূমি কাজিরাঙ্গী  থেকে কাজিরঙ্গা নামের উৎপত্তি । এটা জনশ্রুতি । অন্য একটি জনশ্রুতি মতে কারবি শব্দ কাজির -এ- রঙ্গ, অর্থাৎ কাজিদের গ্রাম, তার থেকে কাজিরাঙ্গা নামের উৎপত্তি হয়েছে। কাজিরাঙ্গা নামের উৎপত্তি কীভাবে হল সঠিকভাবে বলা যায় না। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে কাজিরাঙ্গা নামটা বহু পুরোনো। সতেরো শতকের আহোম স্বর্গদেউ প্রতাপ সিংহের দিনে এই স্থানের নাম কাজিরাঙ্গা ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। 

সংক্ষেপে কাজিরাঙ্গা নামের উৎপত্তির লোক কাহিনি এভাবেই শেষ করে উদয়শঙ্কর সৌম‍্যদার দিকে তাকাল।

– কিশোর। তুমি বল কাজিরাঙ্গা কীভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যানে রূপান্তরিত হল।

কিশোর চৌধুরী হাতের ছোট পুস্তিকাটি নেড়েচেড়ে বলতে শুরু করল।

– কাজিরাঙ্গা অভয়ারণ্য এবং গন্ডারের সংরক্ষণের কথা হলে আমাদের মনে করতে হবে একজন ব্রিটিশ মহিলাকে। একশৃঙ্গ গন্ডার দর্শনের জন্য কাজিরাঙ্গা এসেছিলেন  ব্রিটিশ প্রশাসক লর্ড কার্জনের পত্নি মেরী ভিক্টোরিয়া কার্জন। কিন্তু একশৃঙ্গ গন্ডারের জন্য সেই সময়েই বিখ্যাত হওয়া কাজিরাঙ্গায় তার  গন্ডার দেখার সৌভাগ্য হলনা। তিনি প্রশাসক স্বামীকে অতিশীঘ্র ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কাজিরাঙ্গায় শিকারিদের হাতে  গন্ডারের বংশ বিনাশ হবে বলে দৃঢ়তার সঙ্গে জানালেন। ফলস্বরূপ ১৯০৫ সনের ১ মে তারিখ থেকে ২৩২ বর্গ কিলোমিটার মাটি নিয়ে কাজিরাঙ্গাকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করার জন্য ব্রিটিশ প্রশাসক আগ্রহ প্রকাশ করল।তার পরের তিন বছর বনাঞ্চলটিকে আরও ১৫২ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত করা হল। ১৯০৮ সনে এই সম্পূর্ণ ভূভাগকে কাজিরঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯১৬ সনে দ্য কাজিরঙ্গা গেম সেঞ্চুরি নামে কাজিরঙ্গাকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।









     








কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...