চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০২২

পাখিদের পাড়া পড়শী ৪ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi

পাখিদের পাড়া পড়শী ৪


পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   


মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  


Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi



দ্বিতীয় অধ্যায়, (৪)

উদয়শঙ্কর সুনন্দকে বরকুরিহা  যাবার দিন এবং তারিখ ফোন করে জানিয়েছিল।

সুনন্দ বলেছিল–' আমি আপনার জন্য ভাঙরা গোঁসাইর থানে অপেক্ষা করব। আপনি কোনসময় পৌঁছাবেন?

– নটার সময় পৌঁছানর কথা।

– সেদিন কি রবিবার পড়বে?

– হ্যাঁ রবিবার।

– তাহলে আমার অসুবিধা হবে না।

– অন্যদিন হলে তোমার অসুবিধা হয় নাকি?

–একটু  হয়।কেন জিজ্ঞেস করবেন না? আপনি এলে আমি জানাব। একটা ভালো খবর আমি আপনার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছি।

–শুভ কাজ শীঘ্র হওয়া উচিত, তাই জানাওনি কেন?

– জানাব, জানাব। আপনি এলে জানাব। আপনি কেবল ভুলে যাবেন না।

উদয়শঙ্করকে  কী ভুলবেনা বলল সুনন্দ!কথাটা একটু মনে করার চেষ্টা করতেই উদয়শঙ্করের মনে পড়ল– পাখির বইটা ।

– পাখির বইটার কথা বলছ?

– হ্যাঁ উদয়দা ।

সেটা আমি তোমার জন্য সুন্দরভাবে ভরিয়ে নিয়েছি যাতে বইটিতে থাকা পাখিগুলো আঘাত না পায়।তুমি নিশ্চিতভাবে পেয়ে যাবে ।

কিছুটা ধামালির সুরে উদয়শঙ্কর সুনন্দের সঙ্গে কথা বলতে চাইল যদিও সুনন্দের প্রতিক্রিয়া ছিল ভাব গম্ভীর ।

নির্দিষ্ট দিন এবং সময়ে উদয়শঙ্কর এসে বগলস চকে উইঙ্গার থেকে নামল এবং সোজা এসে হরিণের হোটেলে উঠল। উদ্দেশ্য গরম গরম পুরি এবং চায়ের স্বাদ গ্রহণ। 

উদয়শঙ্করকে দেখে চা দেওয়া ছেলেটি মুচকি হেসে বলল– বসুন।

উদয়শঙ্কর পিঠ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে রেখে সামনে এসে নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে বসল। ছেলেটি দৈনিক খবরের কাগজটা এনে তার হাতে তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল– দাদা, পুরি খাবেন?

–দাও।

উদয়শঙ্কর মেলে ধরা কাগজটির প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ বুলিয়ে নম্রভাবে বলল।

কর্মপটু এবং নম্র স্বভাবের ছেলেটিকে দেখলেই উদয়শঙ্করের তার প্রতি স্নেহের ভাব জাগে। চায়ের দোকানের ছেলে বললে মানুষের মনে আসা স্বভাবের বিপরীত এই ছেলেটি।গরম পুরি-সব্জি, পিয়াজ এবং চায়ের মজা নিয়ে উদয়শঙ্কর থানে এসে দেখতে পেল পর্যটন নিবাসের বারান্দায় সুনন্দ বসে রয়েছে।সুনন্দ সে আশা পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকবে যখন উদয়শঙ্কর চায়ের দোকানে সৌম্যদা  লেখা ' অসমের পাখি পর্যবেক্ষণের হাত পুঁথি' বইটি বের করে হাতে নিয়ে এসেছিল। 

উদয়শঙ্করকে  দেখে সুনন্দ বারান্দা থেকে নেমে এগিয়ে এল।

উদয়শঙ্কর  সুনন্দকে জড়িয়ে ধরল।

–আপনি ভালোভাবে এসে পৌঁছালেন।রাস্তায় কোনো অসুবিধা হয়নি নিশ্চয়?

– না হয়নি।রেলে এসেছি তাই ঘুমও ভালো হয়েছে।

একটা হাতে সুনন্দের একহাত খামচে ধরে থেকেই   উদয়শঙ্কর সুনন্দের হাতে বইটা তুলে দিল।

সুনন্দ উদয়শঙ্করকে ছেড়ে বইটি দুহাত মেলে নিতে চাওয়ায় উদয়শঙ্করও তাকে ছেড়ে দিল।

– ধন্যবাদ উদয়দা। আপনি সত্যি সত্যি কথা রাখলেন। আমি এখন আপনার কথা রাখার চেষ্টা করব। যতটা সম্ভব দ্রুত বইটি থেকে পাখি গুলি চিনে নেবার চেষ্টা করব।

– তোমায় অন্য একটি কথাও এখন আমাকে বলতে হবে। তুমি যে বলেছিলে, তুমি তোমার একটা ভালো খবর আমার কাছ থেকে লুকিয়েছিলে।

–ওহো।বলব নিশ্চয় বলব। কিন্তু কথাটা শুনতে হলে আপনাকে আমাদের বাড়িতে যেতে হবে।

– ছেলে না মেয়ে? সোজাসুজি বল। ভালো খবর মানে ভালোই তো।

উদয়শঙ্করের কথা শুনে সুনন্দ লজ্জিত ভাবে মাথা নিচু করল।

– না দাদা। আপনি যা ভাবছেন তা নয়।আপনাকে সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে আমিই বিপদে পড়লাম।সেসব নিয়ে কোনো খবর নেই।

উদয়শঙ্কর বুঝতে পারল যে সে ভাবা ভালো খবরটা আর  সুনন্দ বলতে চাওয়া ভালো খবর এক নয়। সুনন্দকে  সহজ করার জন্য উদয়শঙ্কর কিছুটা রগড়ের  আশ্রয় নিল।

–তুমি মোটেই এরকম নও, মানে শোল মাছের মতো, এই সাধারণ কথাতে বিপদে পড়বে। বল, বল তোমার ভালো খবরটি বল।

– উদয়দা, আমি টেট পরীক্ষা দিয়েছিলাম, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরি পেয়েছি।

– বাহ, বেশ ভালো খবর সুনন্দ।তারমানে এই খবরটা তোমাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানিয়ে এক কাপ চা মিষ্টির সঙ্গে দিতে চেয়েছিলে।

– হ্যাঁ। আপনার কথা সবসময় বলি বলে মা  আপনাকে একবার দেখতে চেয়েছিল।

– নিশ্চয় যাব।

কথা বলতে বলতে দুজনেই পর্যটক নিবাসের বারান্দায় উঠল।

সুনন্দ ইতিমধ্যে পর্যটক নিবাসের তালাটা খুলে দরজা জানালা গুলি খুলে দেওয়ায় বন্ধ ঘরের গন্ধ উগ্রভাবে উদয়শঙ্করের নাকে লাগল না। অল্প অল্প গন্ধ আছে যদিও কিছুক্ষণ দরজা জানলা খুলে রাখলে সেটুকু নাই হয়ে যাবে।

উদয়শঙ্করকে ঘরের এক কোণে রেখে যাওয়া ঝারুটা এনে মেঝেটা পরিষ্কার করতে দেখে সুনন্দ ঝাড়ুটা উদয়শঙ্করের হাত থেকে নিয়ে নিজে পরিষ্কার করতে চাইল।

– না না।আমার কাজ আমিই করব।তুমি ইতিমধ্যে বইটা একটু নেড়েচেড়ে দেখ।

সুনন্দ হয়তো উদয়শঙ্করের কাছ থেকে এই কথাটির জন্যই অপেক্ষা করছিল।সে কিছুই না বলে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসে পা নামিয়ে  বইটা প্রথম থেকে দেখে যেতে লাগল। সে এতই মনোযোগের সঙ্গে বইটা দেখতে লাগল যে উদয়শঙ্কর ঘর পরিষ্কার করে, জল ছিটিয়ে, বিছানায় চাদর বিছিয়ে দেওয়া পর্যন্ত সে কিছুই বুঝতে পারল না। নিজের টুকটাক জিনিসপত্র ঠিক করে নিয়ে উদয়শঙ্কর সুনন্দকে ডাকল–বইটা কেমন লাগছে?

সুনন্দ মেঝে থেকে উঠে এসে নিতম্বটা মুছতে মুছতে এবার উদয়শঙ্কর পেতে  রাখা বিছানায় বসল।

– বসলাম দাদা।

–কী কথা বলছ হে। কেন বসবে না। বল এখন বইটির কথা বল।

– আমি 'পাখির বিবর্তন' পাঠটা একবার পড়লাম।তখনই পাতা উল্টাতে গিয়ে চোখে পড়ল পাখির রঙ্গিন আলোকচিত্রসমূহ। পাখিগুলির বেশিরভাগই আমাদের পরিচিত। তবে অসমিয়া নামগুলি জানতাম না। ইংরেজি নামগুলি মনে রাখা বেশ কষ্টকর হবে। 

– অনভ্যাসে হত বিদ্যা। অভ্যাস করলে, মনে রাখার চেষ্টা করলে মনে থাকবে না, সেরকম কোনো কথা নেই।

–ইংরেজি নামগুলি একটু দাঁতভাঙ্গা বলে মনে হচ্ছে।

– না না। তুমি কয়েকটি সহজ কায়দা নিজেই আয়ত্ত করে নিতে পার।

উদয়শংকর সুনন্দকে বোঝানোর চেষ্টা করল।

– তুমি  মাছরাঙ্গা পাখির ইংরেজি নামটা জান?

– হ্যাঁ জানি।কিং ফিশার।

– এখন মাছরাঙ্গা পাখির অর্থাৎ কিংফিশারের কতটা প্রজাতি আছে। একটা, দুটো সাতটা। নয় কি? ক্রমিক সংখ্যা তেষট্টি থেকে উনসত্তর।

সুনন্দ মাথা নেড়ে উদয়শঙ্করের কথা মনোযোগ সহকারে শুনে গেল।

– পাখিগুলির মধ্যে কিছু প্রাথমিক পার্থক্য আছে। তার ওপরে ভিত্তি করে নামগুলি দেওয়া হয়েছে। প্রথমটি কমন কিংফিশার। সবার মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় বলে কমন অর্থাৎ সাধারণ। দ্বিতীয়টির নাম ব্লু ইয়ার্ড কিংফিশার। এর –কান থেকে এসেছে নামটা। তুমি কানটার এই জায়গাটা দেখ– বইটিতে থাকা পাখিটার নির্দিষ্ট অংশে অঙ্গুলি নির্দেশ করে উদয়শঙ্কর বলল–গাঢ় নীল। তার ওপরে ভিত্তি করে নামটা রাখা হয়েছে ব্লু ইয়ার্ড। তৃতীর নামটি হল স্টর্ক বিল্ড কিংফিশার। স্টর্ক মানে হাড়গিলা। বিল্ড মানে ঠোঁট। তারমানে এই মাছরাঙ্গা গুলির ঠোঁটটা হাড়গিলার মতো। পরেরটা হল হোয়াট থ্রোটেড কিংফিশার। এই প্রজাতির পাখিদের থ্রোট অর্থাৎ বুকের অংশ সাদা। সেভাবে ব্ল্যাক ক্যাপড  কিংফিশার, এর মাথা বা টুপির অংশ কালো। দেখবে, এভাবে মনে রাখতে সহজ হবে নাকি।

সুনন্দ কথাটা ভেবে দেখল। হয়তো। প্রতিটি নামের অর্থ আছে এবং সেই অর্থ পাখিদের দেহাবয়বের  সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে রংয়ের প্রকৃতি এবং অঙ্গের আকৃতিকে ভিত্তি হিসেবে লওয়া হয়েছে।

হঠাৎ সুনন্দের মনে পড়ল– উদয়শঙ্কর খাওয়া-দাওয়া করেছে কিনা!

– আপনার খাওয়া দাওয়া?

– হরিণের দোকানে পুরি সব্জি খেয়ে এসেছি।

উদয় শঙ্করের কথা বলার ধরনটায় সুনন্দ মজা পেল।

উদয় শঙ্কর মনে মনে ভাবল– সৌম্যদা কি ওভাবে বলতো? মুচকি হাসি হেসে বলতেন– হ্যাঁ, খেয়েছি। হরেণের দোকানে। ব্যস ততটুকুই ।

–আপনিও তাহলে হরেণকে হরিণ বলে জানতে পেরেছেন।

– আগে যখন এসেছিলাম, ওখানেই খাওয়া দাওয়া করেছিলাম। লোকদের বলাবলি করতে শুনেছিলাম। তবে তুমি কিছু খেয়েছ কি?

– কোথায় আর খাওয়া হয়। আমি যখন উঠেছি ঘরের মানুষ উঠেনি। মুখটা ধুয়ে সকালবেলা বেড়াতে আসার মতোই বেরিয়ে এলাম। নদীর দিকে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে এসে বারান্দায় বসে বসেই সময় কাটিয়ে দিলাম। বহুদিন এরকম পরিবেশ পাইনি বলে ভালোই লাগল।

– এটা ঠিক হয়নি। তুমি কিছু খেয়ে এসো। বাড়ির লোক কিন্তু আমাকে দোষ দেবে।

—না না। বাড়ির মানুষ জানে আমার খাওয়া-দাওয়ার কোনো 'টাইম টেবিল' নেই। সেই জন্য খাবার টেবিলে কি খাই  না খাই  সেটা কোনো ব্যাপার না– খাওয়ার জিনিস ঢেকে রেখে দেয়।

– খাওয়া দাওয়া করে এসো। দিনের বেলাটা  ফ্রি আছ নিশ্চয়। যদি ফ্রি থেকে থাক তাহলে আজ তোমার সঙ্গে জায়গাটা ঘুরে ফিরে দেখব।

– আমি ফ্রি। সারাদিন আপনার সঙ্গে কাটাতে পারব।দুপুরে আমাদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করবেন।

সুনন্দ দুপুরের আহারের জন্য উদয়শঙ্করকে  এক প্রকার জোর করেই বলল ।

– আজ থাক। মাত্র তো এসেছি। কিছুদিন তো রয়েছি।এখন যাও । তুমি গিয়ে তাড়াতাড়ি এসো।

– আমি যাব আর আসব। তবে আপনার বন্ধু এসে গেছে দেখছি।

উদয়শঙ্কর জানালা দিয়ে দেখতে পেল বাপুটি ঘটং ঘটং  করে থানের দিকেই আসছে।

সুনন্দকে থান থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে বাপুটি দূর থেকে চিৎকার করল–এই ওটা কে রে?কোথায় যাচ্ছিস? 

সুনন্দ  বাপুটিকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল। আমি সুনন্দ।

বাপুটির সন্দেহ হল।এই সুনন্দ এত ভোরে এখানে কী করতে এসেছে। নিশ্চয কোনো এদিক-ওদিক ব্যাপার আছে। বাপুটি মনে করে তার চেয়ে আগে থানে কারও আসা উচিত নয়। সে দ্রুত সাইকেল চালাতে লাগল। খানের এতটুকু দূরত্ব বাপুটির কাছে অনেক বলে মনে হল।

পর্যটন নিবাসের বারান্দাটা বাপুটির সাইকেল রাখার জন্য স্থায়ী আস্থানা। সে সেখানে সাইকেলটা রাখতে গিয়ে দেখতে পেল ঘরটার দরজা-জানালা খোলা। মানুষটার বুকটা কেঁপে উঠল। বাপুটি ভয়ের ভাব না দেখিয়ে দূর থেকে চিৎকার করতে লাগল– ঘরের ভেতর কে?

উদয়শঙ্কর ইচ্ছা করেই কিছুক্ষণ কোনো জবাব দিল না ।

বাপুটি  নির্দিষ্ট দূরত্বে সাইকেলটা রেখে এগিয়ে আসতে  সাহস করছে না।

সে পুনরায় চিৎকার করল–' ঘরের ভেতর কে?

উদয়শংকর ভাবল আর বেশি দেরি করলে কথাটা খারাপ হবে। বাপুটি চিৎকার চেঁচামেচি করে আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজনকে ডেকে আনতে পারে ।

উদয়শংকর ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।

–ও আপনি। কখন এসেছেন। কখন থেকে চিৎকার করছি, আপনিও বেশ ভালো মানুষ, একটা জবাব তো দেবেন। কথাটা বলতে বলতে বাপুটি সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে পর্যটন নিবাসের বারান্দায় উঠল।

– আপনার এতই ভয়?

–ভয়ের কথা বলছেন। আমাকে এখানে একবার প্রায় মেরেই ফেলছিল।

– মারতে চেয়েছিল? কে?

– আর বলবেন না।

– বলব না।

– আপনি ফাইজলামি করছেন, সেদিন আমি নিঃশ্বাস  নিতে পারছিলাম না।

সাইকেলটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে বাপুটি আড়মোড়া ভেঙ্গে সামনে এসে দাঁড়াল। আড়মোড়া  ভেঙ্গে সে যেন সাইকেল চালিয়ে আসার ক্লান্তিটা ঝেড়ে ফেলল। 

উদয়শঙ্কর ভাবল মানুষটা বলতে চাওয়া কাহিনিটা জেনে নেওয়া ভালো হবে। এই মানুষটাকে কে মারতে আসবে। মানুষটার হাড়  সর্বস্ব দেহটার ওপরে কোনো মতে চামড়াটা ঘিরে  নিয়ে জীবনটা চালিয়ে নিচ্ছে। কথায় চৌকস ছাড়া মানুষটার কিছুই নাই বললেই হয় । গালের হনু দুটো বেরিয়ে পড়েছে । মাথায় চুল প্রায় নেই বললেই চলে। শীর্ণ মণিবন্ধ। নিতম্বে মাংস নেই বলা যেতে পারে । পুরোহিত শর্মা থেকে আরম্ভ করে বরকুরিহা অঞ্চলের প্রত্যেকেই ইচ্ছা করলে সুর না ধরে কথা বলতে পারে কিন্তু বাপুটি কোনোমতেই পারে না।

–নিঃশ্বাস নিতে না পারার মতো কী এমন ঘটনা ঘটেছিল! আপনার মত সহজ মানুষকে কে এভাবে নিরাশ্রয় করতে আসে ? ভেতরে আসুন । বসে নিয়ে কথাটা বলুন ।

– এখনো ভাবলে আমার বুকটা শিউরে উঠে।

উদয়শঙ্কর মানুষটার কথার ওপরে কোনো কথা বলবে না বলে ভেবে না হলে মানুষটা কথাগুলি বলতে অনর্থক সময় নেবে।

–– ভর দুপুর বেলা। লোকজন নেই। পুরোহিতের কোথায় শনি পুজো রয়েছে, তিনিও তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেছেন। আমি চারপাশের জিনিসপত্র গুলি ঠিকঠাক করে রেখে দরজাগুলিতে তালা মারব ভাবলাম, আধ টানা ছিলিটাতে আবার দু এক টান মারব বলে ভাবছি । খারাপ পাবেন না, ভাঙরা গোঁসাইকে সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে মাঝে মাঝে দু এক টান দিতে হয়। ছিলিমটাতে আগুন জ্বালিয়েছি, দুটো জিপের মতো ট্রাকে আর্মি এসে পৌঁছালো। তারপরে দেখি আরও একটি গাড়ি। আর্মি গুলি নেমেই চারপাশে পিত পিত করে তাকাতে লাগল। এই অধমকে দেখতে পেল। দেখে গর্জন করে উঠল। হিন্দিতে কী বলল বুঝতে না পেরে জায়গাতেই বসে রইলাম। আমার হাত পা ভয়ে কাঁপছে। হাতের ছিলিমটা কখন খসে পড়েছে। দেখতে পেলাম গাড়িটা থেকে কয়েকজন আর্মি নেমেছে এবং সঙ্গে সাদা কাপড় পরা একজন।ভাগো ভাগো-একজন আর্মি তেমন করে বলার পরে অন্য একজন মাটি থেকে কুড়িয়ে একটা শুকনো গাছের ডাল আমার দিকে ঞ্ছুঁড়ে মারল।ভাঙরা বাবার কৃপায় গায়ে লাগল না তাই,লাগলে তো ছাল বাকলা উড়ে যেত।আমার ধুতির গিঁট খুলে গেল।কোনোমতে খামচে ধরে দৌড়াতে লাগ্লাম।কিছুটা দূর হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এসে মনে হল সাইকেলটা বারান্দায় থেকে গেল।সাইকেলের কথা ভুলে গিয়ে ভাবলাম জীবনটা যে কোনোরকমে বেঁচেছে।তারপরে তারা কী করল জানেন?

অযথা কথা বেড়ে যাবার ভয়ে উদয়শঙ্কর চুপ করে রইল।

-কী ধরনের মানুষ আপনি,কোনো কথাই বলছেন না।

-না,না।আপনি এত রস লাগিয়ে কথাগুলি বলছেন,আমার কেমন যেন সিনেমা দেখছি বলেই মনে হচ্ছে। 

-ঠিকই বলছেন।সিনেমার মতো কাহিনিই তো।আমি ওরা যাতে দেখতে না পায় গাছপালার মধ্যে এভাবে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম যেখান থেকে ওদের ভালোভাবে দেখতে পাওয়া যায়।ওরা কী করতে শুরু করেছে।কী কারবার।কী কথা।নামঘরের সিঁড়িটা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে ভাঙতে শুরু করেছে।আমার মনে হল আমার কলজেতে যেন আঘাত হানছে।

বাপুটি বুকটা চেপে ধরে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে লাগল।যেন সেদিনের হাতুড়ির আঘাতটা আজ এসে তার বুকে লাগছে।

-তারপরে?

উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করল।

সিঁড়ির জায়গাটা খুঁড়ে অন্য হাতে কোদাল একটা বের করে মাটি খুঁড়তে লাগল।আমি দেখতে লাগলাম।তারপরে আবার তারা বস্তার মতো কিছু একটা বের করল।বস্তাটা দেখলে তার ভেতরে বন্দুক আছে বলে মনে হয়।সেটা তুলে নিয়ে একটা আর্মির গাড়িতে রাখল।এদিকে বাকিরা মাটি খুঁড়েই চলেছে।তারপরে একটা একটা করে দুটো বস্তা দিয়ে মোড়া ট্রাঙ্ক।বড় বড়।তারই একটা আর্মির গাড়িতে,অন্য একটি সাদা কাপড় পরে আসা লোকটির গাড়িতে।

বাপুটি কিছুক্ষণের জন্য থামল।সে নিতম্বটা চুলকে এভাবে তাকাল যেন বন্য লতা-পাতার মধ্যে বসে থাকার সময় তার নিতম্বে জোঁক ধরেছে।

-তারপরে মাটিটা ঠিকঠাক করে ওরা যেপথে এসেছিল সে পথে চলে গেল।আমি কতক্ষণ সেখানে চুপ করে বসে রইলাম বলতে পারি না।বসে বসে ক্লান্ত মনে হওয়ায় মনে হল সাইকেলটা নিয়ে এলে ভালো হবে।ভাঙরা গোঁসাইকে প্রণাম করে কীভাবে সাইকেলটা আনলাম তা আর বলতে পারি না।বাড়িতে ঢুকে দুই লোটা ঠাণ্ডা জল ঘট ঘট করে গলায় ঢেলে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

কথাটা বলে বাপুটি থামল।

মৌনতা ভঙ্গ করে উদয়শঙ্কর বাপুটিকে জিজ্ঞেস করল– আপনি কথাগুলি পরে  কাউকে বলেছেন?

– পুরোহিতকে বলেছি। তিনি চুপ করে থাকতে বললেন। তোর কথা জানাজানি হলে রাতের বেলা বাড়ি  এসে গুলি করে রেখে যাবে। পুরোহিত কাকে কী বলেছে জানি না, পরের দিন দুটো মিস্ত্রি এনে সিঁড়িটা পুনরায় তৈরি করে দিল। আমি ভাঙরা বাবার থানে একটা শরাই দিলাম। মানুষ টানুষ না থাকা জায়গা, টাকা পয়সা পুঁতে রেখেছিল। লোকদের মধ্যে জানাজানি হওয়ায় শুনতে পেয়েছি সারেন্ডার করে টাকা এবং বন্দুক গুলি বের করে আর্মির সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে। আমি কিন্তু ভাঙরা  গোঁসাইর নামে শপথ করে বলছি কথাটা আমি কাউকে বলিনি। আমাকে গুলি করে মারলে স্ত্রী  আর ছেলেমেয়েগুলিকে কে দেখবে।

হঠাৎ বাপুটির কী মনে পড়ল কথাগুলি বলেই তখনই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।

– ইস সর্বনাশ হয়ে গেছে। আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কত সময় পার হয়ে গেল খেয়াল করিনি। পুরোহিত এসে পড়ার সময় হয়ে গেছে। এসেই গালিগালাজ করবে।বলবে– এতক্ষণ কী করছিলি?

কথাটা দ্রুত বলেই বাপুটি দৌড়াদৌড়ি করে বেরিয়ে গেল। উদরশঙ্কর বাপুটি চলে যাবার দিকে তাকিয়ে রইল।

বরকুরিহার পাখির বাসার অলিখিত ইতিহাসের কয়েকটি পৃষ্ঠা বর্ণনা করে রেখে গেল বাপুটি। তার আগেও বাপুটি জলাশয়ে মাছ ধরতে আসার সময় জেলে এক ট্রাঙ্ক  টাকা পাওয়ার কথা বলেছিল– সঙ্গে বলেছিল–ভূতে দেওয়া টাকা দিয়ে এখানে কয়েক ঘর মানুষ ধনী হয়েছে।আগে বাড়িতে কিছুই খাওয়ার মতো ছিল না, এখন দেখবে তাদের ফুটানি। গাড়ি বাড়ি, বউ বাচ্চাদের কাপড়ের বাহার।

উদরশঙ্কর দেখতে পেল সুনন্দ হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে সে থাকা পর্যটন আবাসের দিকে ধীরে সুস্থে আসছে। অন্যদিকে উদয়শঙ্কর শুনতে পেল পুরোহিতের সাইকেলের বেলের শব্দ।

– বড় একা একা লাগছে নাকি?

ঘরে ঢুকেই সুনন্দ উদয় শংকরকে জিজ্ঞেস করল।

– একা শব্দটা আমার অভিধানে নেই সুনন্দ। তোমাকে কখনও আমার কথা বলব । অবশ্য সেইসব জেনে তোমার কোনো লাভ হবে না। এইমাত্র বাপুটি তার জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতার কথা বলে গেল।

–কী বলল?

–বলল আর কী। নামঘরের মেঝে থেকে পয়সা বের করে নিয়ে যাবার কাহিনি।

সাধারণভাবে বলে রাখল উদয়শঙ্কর।

– কথাটা প্রত্যেকেই আলোচনা করে কিন্তু কেউ কিছুই জানে না।যা দেখার কেবলমাত্র বাপুটিই দেখেছে।

সুনন্দ কথাটাতে সাধারণ মন্তব্য দিয়ে বড় একটা গুরুত্ব দেওয়ার বিষয় নয় বলে ভাবল এবং কোন আলোচনা করল না। 

-মা আপনার জন্য পিঠা পাঠিয়েছে।

–কী পিঠা? মা আমার জন্য কষ্ট করার দরকার ছিল না।

সৌজন্যতার খাতিরে উদয়শঙ্কর বলল।

– কষ্ট আর কোথায়।

সুনন্দ কথাটা বলে হাতে করে আনা হট কেসটা  বের করে ঢাকনা খুলে উদয়শঙ্করের সামনে তুলে ধরল। উদয়শঙ্কর ব‍্যাগ থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করে সেটা বিছানার উপর পেতে দিতেই সুনন্দ তাতে হট কেসটা রাখল। তারপর সুনন্দ ব্যাগ থেকে একটা ছোট ফ্লাক্স বের করল। ফ্লাক্সটার ক্যাপাসিটি আধালিটারের মতো হবে।

– আপনি চা-য়ে চিনি খান কি? মা বলেছে বনে জঙ্গলে অথবা বাইরে বাইরে ঘোরাফেরা করা মানুষরা নাকি চিনি এবং নুন কম ব্যবহার করে। সেই জন্য চিনি না দিয়ে পাঠিয়েছে।

– মা কীভাবে জানল? আমার অবশ্য চিনি দিলেও কথা নেই, না দিলেও আপত্তি নেই। অবশ্য পরিমাণ বেশি হলে খেতে পারি না।

উদয়শংকর দেখছে সুনন্দ কীভাবে পিঠা এবং চা পরিপাটি করে বিছানার ওপর সাজিয়ে রাখছে ।

ফ্লাক্সটা খুলে ফ্লাক্সের মুখটাকে সে পেয়ালার মতো ব্যবহার করছে ।

– মায়ের নিজের হাতে করা পিঠা  নাকি মায়ের বৌমার করা পিঠা?

– আপনার জন্য মায়ের নিজ হাতে করা পিঠা। আপনি এসে পড়েছেন বলায় মা বলল– ছেলেটির জন্য দুটো পিঠে ভেজে দিই, তুই নিয়ে যা। ভোর বেলায় এসেছে, কোথাও কিছু খেতে পেয়েছে কিনা কে জানে! বৌমাকে বল বিনা চিনিতে এক কাপ লাল চা করে ফ্লাক্সে ভরিয়ে দেবে। কথামতো কাজ। পিঠা এবং চা প্রস্তুত। 

সুনন্দের মায়ের স্নেহ উদয়শঙ্করের ভেতরে মানসিক শিহরণ জাগিয়ে তুলল। আজ তার মা যদি বেঁচে থাকত কোথাও কোনোদিন হয়তো সুনন্দকে এভাবে আদর যত্ন করত। এক মুহূর্তের জন্য মায়ের ছায়াচিত্রের কাছে গিয়ে উদয়শংকর ফিরে এল।

– এটা কী পিঠা? 

– নলবাড়ীর ভাষায় বলা হয় খ' লাচাপরি পিঠা।হয়তো তাওয়ায় চাপর মেরে মেরে এটাকে তৈরি করা হয় বলে অথবা অন্য কিছু জানিনা। গরম তাওয়ায় কিছুটা তেল দিয়ে কাত করে তাওয়াটা ভিজিয়ে নেওয়া হয়। তারপরে চালের গুড়োর এক হাতা ঘোল তাওয়াটিতে দিয়ে সেটা সুষমভাবে তাওয়াটিতে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে ঘোলটি পাতলা হয়। পাতলা হলে ভালোভাবে ভাজা যায় এবং খেতে বেশি স্বাদ হয়।

উদয়শঙ্কর হাতটা মুছে উপরের পিঠাটি তুলে আনার সময় দেখতে পেল মিহি মিহি গুড়ের গুড়ো। উদয়শঙ্কর সেখান থেকে এক চিমটি এনে পিঠেটার ওপরে ছিটিয়ে দিল। লাল চায়ের সঙ্গে পিঠেটা খেতে বড় ভালো লাগছে।পিঠে খাওয়ার তৃপ্তিতে উদয়শঙ্কর মগ্ন হয়ে পড়ল।

– সুনন্দ কাকু কেমন আছেন ? প্রথমত তার বাড়িতে যেতে হবে । না হলে মানুষটা খুব খারাপ পাবে । বয়স্ক মানুষের সাধারণ কথাতেই রাগ হয়।, গুরুত্ব না দেওয়া বলে ভাবে।

– কাকু এখন ভালোই আছে। নতুন বৌমার হাতের স্পর্শ থাকা রান্না তৃপ্তিতে  খেয়ে কাকুর শরীর এখন একেবারে তরতাজা । মনেও ফুর্তি। কাকুর বাড়িতে সন্ধ‍্যের সময় যাওয়াই ভালো হবে নাকি। আমরা ফিরে আসতে আসতে   দুপুর হয়ে যাবে।

– তুমি যা ভালো মনে কর সুনন্দ।

উদয়শংকর সুনন্দের কথায় সায় দিল।

– তুমিও একটা পিঠা নাও সুনন্দ।

– না না। আপনি খান । আমি বাড়িতে খেয়ে এসেছি । পেট ভর্তি ,একটুও জায়গা নেই।

– বৌমা এভাবে খাইয়ে  পাঠিয়েছে নাকি! 

উদয়শঙ্করের কথা শুনে সুনন্দের মুখে লজ্জা মিশ্রিত একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল।

– তোমার বন্ধুদের কথা বলতো?

– কেন জিজ্ঞেস করলে?

– ওরা কী করে,কী পড়ে, সমাজের জন্য তাদের কি করার ইচ্ছা অথবা তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কী ধরনের ইত্যাদি বিভিন্ন কথাগুলি জানার ইচ্ছা হচ্ছে।

– সত্যি কথা বলতে গেলে আমার সেরকম কোনো বন্ধু তো নেই। বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মারা, ঘুরে বেড়ানো, ভোজ ভাত খাওয়া ইত্যাদি আমার একেবারেই পছন্দ নয়।

– বিয়ের পর থেকে…

– না না ।বিয়ের আগে থেকে। কিন্তু আমার এরকম কয়েকজন বন্ধু আছে যাদের সঙ্গে আমার বিষয়ভিত্তিক বন্ধুত্ব রয়েছে।

– বিষয়ভিত্তিক বন্ধুত্ব কী জিনিস আমি বুঝতে পারছি না সুনন্দ।

মরোয়ার কীচক বৈশ্য, আরিকুছির নবজিৎ বৈশ্য,অররার জয়প্রকাশ কলিতা, টিংকু মহন্ত আদি আমার বিষয়ভিত্তিক বন্ধু। আমি তাদের সঙ্গে বইয়ের কথা বলি।মরোয়ার কীচক আশ্চর্য ছেলে। তার একটি গ্রন্থাগার আছে যেখানে সে নির্দিষ্ট বিষয়ের বই সংগ্রহ করে রেখেছে।

–কী বিষয়ে?

– রচনাবলী। অসমের বিশিষ্ট লেখকদের প্রকাশিত প্রায় প্রত্যেকের রচনাবলী তাঁর গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। আপনাকে আমি এদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব, কথা বলে ভালো লাগবে। অন্তত যারা তরুণ প্রজন্মের উপরে আস্থা হারিয়েছি বলে আক্ষেপ করে তাদের জন্য এই ছেলে কয়েকটি যোগ্য উদাহরণ। 

– আমি ভাবছি আমরা মিলেমিশে কিছু একটা নতুন কাজ করার চিন্তা করতে পারি। বিষয় হিসেবে ধরে নিতে পারি পরিবেশ সংরক্ষণ।

– সময় নষ্ট না করা কোনো ভালো কাজ হলে তো কথাই নেই, তারা এক কথায় সায় দেবে। তবে তারা প্রত্যেকেই নিজের নিজের কাজের জায়গায় ব্যস্ত। তারা তিনজনেই শিক্ষকতা করে।

– দুজনেই এভাবে কী কথায় মশগুল হয়ে আছেন, আমাদের খবরই নেবেন না নাকি?

পুরোহিত শর্মা ঘরের ভেতরে এসে উদায়শঙ্করের উদ্দেশ্যে বলল।

–শর্মাদেব। কুশলেই তো? আপনি এসেছেন বুঝতে পারিনি।

– ঈশ্বর কুশলে রেখেছেন। আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। আপনি এসেছেন বলে বাপুটি বলল যদিও আমি ভাবলাম গোঁসাই মানুষ, হাত পা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলব।

– আপনার কাজ শেষ হল নাকি?

– এখনই! কোথায় আর শেষ হবে। আরম্ভ করেছি মাত্র।

উদয়শঙ্কর যেন ঝামেলার সৃষ্টি করল, পুরোহিত শর্মার কাজ শেষ হল কিনা জিজ্ঞেস করায় মানুষটা চমকে উঠল বলে মনে হল।

– এখনই কোথায় শেষ হবে, ধোয়ার কাজটা কিছুটা এগিয়ে দিয়ে ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। এত দূর থেকে এসেছেন অথচ আমি এগিয়ে এসে আপনাকে সাক্ষাৎ না করলে কেমন দেখা যায় বলুন।

পুরোহিত শর্মার আন্তরিকতায় উদয়শঙ্কর আপ্লুত হয়ে পড়ল। এক বছর আগে সাক্ষাৎ করা মানুষটার সঙ্গে যোগাযোগই নেই, কথাবার্তায় সেই একই রকম রয়েছে।

– আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাব।

উদয়শঙ্কর উঠে দাঁড়িয়ে পুরোহিত শর্মাকে নমস্কার জানিয়ে শির নত করল ।

পুরোহিত শর্মা উদয় শঙ্করের মাথায় হাত রেখে প্রথমবার দেখা হওয়ার মতো বিড়বিড় করে উচ্চারণ করা সংস্কৃত মন্ত্রটি পুনরায় আওড়াতে লাগল। মানুষটার মন্ত্র পাঠ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উদয়শঙ্কর মাথা নিচু করে রইল। উদয় শঙ্করের এই সৌজন্যে বিশ্বাসের চেয়েও ছিল ভক্তির ভাব।

– আপনারা যে বিষয়ে কথা বলছিলেন বলুন। আমি আপনাদের যাবার সময় দেখা করব।

– বিশেষ কোনো কথাবার্তা নেই শর্মাদেব। আমরা এখন একটু বেরিয়ে যাব। 












কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...