চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

রবিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২২

পাখিদের পাড়া পড়শি- ৭ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi

পাখিদের পাড়া পড়শি- ৭

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  


Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi



দ্বিতীয় অধ্যায়, 

(সাত)

সুনন্দের বিদ্যালয়ের বাৎসরিক পরীক্ষা পার হয়ে গেল। সে এখন তার ভাষায় অন্তত কয়েকদিনের জন্য ফ্রি।

উদয়শঙ্কর সুনন্দকে বলল–' তুমি আমাকে সময় দিতে পার যদি!

সুনন্দের তাৎক্ষণিক মন্তব্য–' না পারার কোনো কথাই নেই দাদা। আপনি শুধু বললেই হল।

উদয়শঙ্করের আগ্রহকে অগ্রাহ্য করতে না পেরে সুনন্দ সকালবেলাতেই বেরিয়ে এল। তখনও ঘরের চালে টুপটুপ করে শিশির কণা খসে পড়ছিল। সুনন্দ পরে আসা টুপিটা শিশির কণায় ভিজে গিয়েছিল। তাকে দেখলে কোনো শীতার্ত দেশ থেকে আসার মতো মনে হচ্ছে। যেন একজন এস্কিমো। উদয়শঙ্করের ঘরে প্রবেশ করেই সে টুপিটা খুলে ঝেরে নিল।

– এতটুকু আসতেই এভাবে ভিজে গেছ?

সুনন্দ বলল– বরফ পড়ার মতোই শিশির পড়ছে।

– তাহলে যাওয়া যাবে কি?

উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করল।

‐- আপনার কথা।

‐ আরে ভাই। আমি যাবার জন্যই তো তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

‐ তাহলে চলুন।

সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর শিশির এবং কুয়াশাকে উপেক্ষা করে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। উদয়শঙ্কর সঙ্গে ক্যামেরা এবং বাইনোকুলার নিয়ে নিল। সুুনন্দ বলল‐ আপনি আজ আমার সঙ্গে গিয়ে গ্রামের সমগ্র পরিবেশ ভালোভাবে নিরীক্ষন করে নিতে পারবেন।

উদয়শঙ্কর সেভাবেই ভাবছিল‐ যতদূর সম্ভব পরিবেশ তো একবার পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সে গ্রামটা এখনও ঘুরেফিরে দেখেনি, সব জায়গায় যায়নি। কোথাও না গিয়ে সেই জায়গা সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা করা যায় না। সে না জানা না বোঝা অনেক কথাই হয়তো তার মধ্যে থাকতে পারে।

ওরা দুজনে থানা থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠে সেখান থেকে বাঁধের উপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। এই বাঁধটা একসময় যাতায়াত করার জন্য মূল পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পি ডব্লিউ ডি বিভাগ রাস্তাটা সংক্ষিপ্ত করার জন্য নতুন করে পাকা রাস্তা তৈরি করার পরে বাঁধটা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ল। মাত্র কয়েক ঘর মানুষের‐দুটো পাড়ার মানুষের জন্য রাস্তাটা ব্যবহারযোগ্য হয়ে থাকল। রাস্তাটা যেখানে আরম্ভ হয়েছে সেখানে গঙ্গা পুখুরি হাইস্কুলের খেলার মাঠ অবস্থিত। রাস্তাটা মানে বাঁধের একপাশে খেলার মাঠ অন্যদিকে বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের দিকটায় একটি প্রকাণ্ড শিমূল গাছ। পি ডব্লিউ ডি বিভাগের মানুষ পরিত্যক্ত রাস্তাটার বন জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজ ছেড়ে দেওয়ার পরে রাস্তাটা জার্মান বন এবং বিভিন্ন জংলি গাছে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। বিদ্যালয়ের সামনাসামনি তিন চার ঘর মাত্র মানুষের বসতি।

বগলচকের দিকের থেকে আসা রাস্তাটা বাঁধের যে অংশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থাৎ বিদ্যালয়টির ঠিক সামনের ঘরটির সম্মুখে দাঁড়িয়ে সুনন্দ মৃদু কন্ঠে কাউকে ডাকতে শুনল উদয়শঙ্কর।

‐ জুলিয়েট।

কাচা ঘরের মেঝেতে কাদামাটির লেপ দিতে থাকা একটি মেয়ে সেই অবস্থাতেই বেরিয়ে এল। তার দুহাতে কাদা মাটির লেতি।

‐ এত সকালবেলা এই ঠান্ডায়?

সুনন্দ অবাক হল।

‐ আমি ভেবেছিলাম আমাদের গ্রামের মেয়েরা কাজই করে না। এত হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় তুমি ঘর- উঠানের কাজ করছ। তবে তোমাকে আজকাল দেখাই যায় না।

একটু লজ্জা লজ্জা ভাবে মেয়েটি বলল‐ বাড়ির কাজেই ব্যস্ত।

মেয়েটির দুহাতে কাদার লেতি। সে কাদামাটি দিয়ে মেঝে মুছছিল।

– এদিকে এসেছিলাম। তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে গেলাম। যাও যাও, তুমি কাঁপছ। এই ঠান্ডায় শরীরকে কেন কষ্ট দিচ্ছ?

জুলিয়েট তার দুটো হাত কাঁধের ভাঁজে ঢুকিয়ে নিল।

দুজনের কথাবার্তা শুনে সকালবেলায় কে বলে জুলিয়েটের মা বেরিয়ে এল।

– সুনন্দ, এই ঠান্ডায় এত সকালবেলা কোথায় যাচ্ছ?

– এই দাদার সঙ্গে একটু এসেছি।

– কেমন আছ? আজকাল তোমার ভালো খবরগুলি জানাও না। চাকরি পেয়েছ, সেটাও জানাওনি।

না না সেরকম কোনো কথা নয়। আপনারা এমন ভাবেন। আমি কিন্তু ভাবি না। আমি তো আপনাদের সঙ্গে দেখা করলাম। নেপোলিয়ান বাড়িতে আছে কি?

– না, নেই। বেরিয়ে গেছে। সে টিউশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে।মরোয়ার উদ্দেশ্যে। তারমধ্যে জানই তো তাকে আজকাল কুইজের জ্বর পেয়ে বসেছে।

নেপোলিয়ন জুলিয়েটের ভাই।

জুলিয়েট এবং মায়ের সঙ্গে কথা বলে সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর এগিয়ে গেল।

সুনন্দ জুলিয়েটদের সঙ্গে উদয়শঙ্করকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। সে কেবল উদয়শঙ্করকে বলল- পরিবারটি সমস্ত কাজে অগ্রণী। আপনি যদি কখনও কোনো সামাজিক কাজের কথা ভাবছেন এদের জড়িত করতে পারেন। পারা যেতে পারে।

দেখা যাক– উদয়শঙ্কর সুনন্দকে হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানাল।

গঙ্গাপুখুরী হাই স্কুলের প্রকাণ্ড শিমূল গাছটা পার হয়ে বাঁধটা। স্কুলের সোজাসুজি নতুন পাকা রাস্তাটা তৈরি না হতেই বাঁধটার দুপাশে উঁচু উঁচু সজনে গাছ এবং জার্মানি বনের সমাহার ছিল। এখন ও আছে। তবে রাস্তাটারই গতিপথ বদলে গেল। বাঁধ ছেড়ে এখন সোজাসুজি আসা-যাওয়া করার জন্য পাকা রাস্তা তৈরি হয়েছে। বাঁধটা কয়েকটি পাড়ার লোকজন আসা যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। বাঁধের বাঁ পাশে নেমে যাওয়া খাড়াইর ছোটো ছোটো রাস্তাগুলি এক একটি পাড়ায় আসা-যাওয়া করার পথ।বাঁধের ডান পাশে অর্থাৎ নদীর দিকেও কয়েকটি পরিবারের ঘর-বসতি আছে। বসতিগুলি বাঁশ আর ছোটো বড়ো গাছে পরিপূর্ণ। উদয়শঙ্কর প্রথম দিন এসে যে শিমূল গাছের নিচে বসে জলাশয়ের পাখি গুলি দেখেছিল, এই জায়গাটা সেই জলাশয়ের উত্তর দিকের শেষ অংশ। জলাশয়ের মধ্যে থাকা উঁচু-নিচু মাটির ঢিবি গুলিতে মাটির মালিক সাধারণভাবে বেড়া দিয়ে চাষবাসের জন্য ব্যবহার করছে। নদীটির এই মৃত অংশকে বর্ষাকালের নদীর বন্যার জল ছুঁতে পারে না বলে চাষবাস করার পক্ষে নিরাপদ।

কিছু দূর এগিয়ে সুনন্দরা বাঁধ থেকে নেমে যাওয়া একটা রাস্তা দেখতে পেল। রাস্তাটার বিপরীত দিকে কয়েকটি দোকান। দোকানগুলিতে দুই এক পদ সাধারণ সামগ্রী বিক্রি করা হয়। দোকানগুলি পার হয়ে দুজনেই এগিয়ে গেল।

বাঁধের এই জায়গাটিতে জনবসতি নেই। রাস্তাটাও অব্যবহৃত হওয়ার ফলে দুই দিক থেকে বেড়ে চলা আগাছা রাস্তাটিকে ঘিরে ফেলার উপক্রম করছে। বনানীটিতে উদয়শঙ্কর দু একটি শিমূল, ছাতিম আর কদম গাছ দেখতে পেল। গাছগুলি অপরিণত বয়সের। বাঁধটিকে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ছেড়ে দেওয়ার পরে এই গাছগুলি নতুন করে বেচে উঠছে এবং বনানীটিকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করেছে।

– আগে এই জায়গাটা একেবারে খোলামেলা ছিল। আমাদের শৈশবে কিছুটা আগে নদীর বাঁধ ভেঙ্গেছিল এবং তখনই জায়গাটা উঁচু করে পুতে ফেলল। চাষবাস করা যায় না বলে জমিটা বন্ধ‍্যা হয়ে পড়ে রইল। এক বছর পরে উঁচু উঁচু কাশবন জায়গাটা ঘিরে ফেলল। তখন আমরা দেখেছিলাম কাশফুল ফুটে জায়গাটা একেবারে সাদা ধবধবে হয়ে আছে। আমরা এখানে আসতে ভয় করতাম।

সুনন্দ জায়গাটার পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করল।

– কয়েক বছর পরে দেখলাম কাশবনের মধ্যে দুই একটা গাছ জন্ম নিয়েছে। ধীরে ধীরে কাশবনের বিস্তৃতি কমে এল এবং জায়গাটিতে পরিচিত অপরিচিত কিছু গাছপালা জন্মাতে লাগল। ত্রিশ বছরের মধ্যে জায়গাটার একটি লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন দেখতে পাওয়া গেল।

– প্রাকৃতিকভাবে এভাবেই অরণ্য গড়ে ওঠে। প্রথমে কাশ বা সেই ধরনের বন জঙ্গল। তারপরে ছোটো ছোটো উদ্ভিদ এবং লতাগুলি। তারপরে শিমূল, ছাতিম ইত্যাদি উঁচু এবং স্থায়ী গাছগুলি। এই জায়গাটা নতুন করে গড়ে ওঠা অরণ্যের চাক্ষুষ উদাহরণ।

উদয়শঙ্কর অরণ্য কীভাবে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠে সুনন্দকে তার আভাস দিতে চেষ্টা করল।

– তারমানে ছোটো করে হলেও জায়গাটা একটি অরণ্যে পরিবর্তিত হল।

–হ‍্যাঁ।

উদয়শঙ্কর সুনন্দের কথায় সায় দিল।

– এই জায়গাটির প্রত্যেক পরিবারেই উপার্জন কম হলেও এক একজন চাকরি করা ব্যক্তি আছে। অন্য জায়গায় চাষ করার মতো জমি আছে। তাই এই জায়গাটা নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না।

সুনন্দ অব্যবহৃত মাটিটিতে অরণ্য গড়ে ওঠার কারণ ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করল। বাঁধের ওপর দিয়ে যাওয়া রাস্তাটার কয়েক মিটার ছেঁড়া অংশ আছে। সেখানটায় গিয়ে দুজনেই উপস্থিত হল।

উদয়শঙ্কর সুনন্দকে জিজ্ঞেস করল– বন্যা এই জায়গাটায় বাঁধ ভেঙে ছিল নাকি?

সুনন্দ বলল না।

- তাহলে?

– সংগঠনের ছেলেরা এখানে এম্বুস পেতে সৈনিকদের একটা ট্রাক উড়িয়ে দিয়েছিল। সেই এমবুসে আট জন সৈনিকের মৃত্যু হয়েছিল। ওরে জায়গাটা পুতে ফেলায় বাঁধ থেকে জায়গাটা নিচু হয়ে রইল।

জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে উদয়শঙ্কর জায়গাটা এভাবে নিরীক্ষণ করতে লাগল যেন সে ভারত সরকারের কোনো সংস্থার এমবুস বিশেষজ্ঞ।

– এই ধরনের ঘটনাস্থলী দেখতে পাওয়ার সৌভাগ্য আমার আগে হয়নি।

- সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য?

সুনন্দের প্রশ্নটা শুনে উদয়শঙ্কর কিছুক্ষণ মনে মনে রইল।

– দুর্ভাগ্য।

উদয় শঙ্কর বলল।

– দূর্ভাগ‍্য।

  কেননা এই এমবুস্টার পরে এই বৃহত্তর অঞ্চলে সেনাবাহিনী যে অত্যাচার চালিয়েছিল সকলেই বলছিল– আধুনিক মানের আক্রমণ। কয়েক মাসের জন্য আমরা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকের মতো হয়ে পড়েছিলাম। সেই রাতগুলির কথা এখন এই অঞ্চলের কেউ মনে করতে চায় না। চায়না।

ছিন্ন অংশটুকু থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে ওরা একটি শিবিরের থান পেল। ঘরটা ছোটো অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো। শিব মন্দিরটা থেকে রাস্তা সোজাসুজি এগিয়েছে এবং প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে বাক নিয়ে অন্য একটি রাস্তা এগিয়ে চলেছে। এই জায়গাটাও জনপ্রাণীহীন।

বিছানায় শীতের আমেজ উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসা ২-৪ জন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে ওদের দেখা হয়। তারা গাই বাছুরকে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিতে এনেছে। উদয়শঙ্কর দুজন মহিলাকে বাইরের উঠোন ঝাড়ু দিতে দেখতে পেয়েছে। শীতের দিনেও গ্রামের মানুষরা বেশ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে। সে মনে মনে ভাবল।

উদয়শঙ্কর সুনন্দকে জিজ্ঞেস করল– বাঁধের সোজাসুজি গেলে আমরা কী পাব?

সুনন্দ যেন প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল, সে চট করে উত্তর দিল– ভূটান।

না জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন একটা জিজ্ঞেস করার মতো উদয়শঙ্করের মনে হল। কথার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য সে এবার সুনন্দকে বলল– আমরা বাঁধের ওপরে ওপরে যাব নাকি!

– যাওয়া যেতে পারে। এভাবে যেতে থাকলে মাঝেমধ্যে আমরা নদীর একেবারে কাছে পাব। অর্থাৎ বাঁধটা নদীর প্রায় পাশ দিয়ে এগিয়ে গেছে। তবে আজ আপনি আমি দেখতে পাওয়া পাখিগুলির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেননি। দু'চারটে নতুন নতুন পাখি আমরা দেখতে পাইনি কি?

– পেয়েছি। তুমি তো জিজ্ঞেস করনি। অন্যদিকে আমরাও বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছি যে। দাঁড়াও সুনন্দ। ওই যে পাখিটা দেখছ সেই পাখিটা তুমি চিনতে পারছ কি?

সুনন্দ মনে করিয়ে দিলে যখন উদয়শঙ্কর তাৎক্ষণিকভাবে সুনন্দকে পাখির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এগিয়ে এল।

– হ্যাঁ পারছি তো।ওটা

– ঠিক বলেছ। ওটা রবিন পাখি। ইংরেজিতে ওরিয়েন্টাল ম্যাগপাই রবীন বলে। বৈজ্ঞানিক নাম কপসিসাস সলেরিস।

সুনন্দ জিজ্ঞেস করল – আপনি সমস্ত পাখির বৈজ্ঞানিক নাম কীভাবে মুখস্ত করেন?

- সব পাখির বৈজ্ঞানিক নাম আমার মনে নেই। দু'চারটার নাম মনে আছে। তোমাকে দেওয়া বইটিতে পাখি গুলির ইংরেজি নাম আর বৈজ্ঞানিক নাম গুলি লেখা আছে। বিছানায় শুয়ে থাকলেও আমি সেগুলি দেখতে থাকি আর মুখস্ত করি। তুমিও সেরকম করতে পার। পাখি একটা দেখলেই সেটাকে বইতে থাকা আলোক ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে এবং দুটো নাম মুখস্ত করে রাখবে।মনে রাখা কঠিন হলেও দুদিন পরে সহজ হয়ে পড়বে। পাখিগুলি পুরুষ মহিলা চিনতে পারাটাও গুরুত্বপূর্ণ কথা।

– পাখিদের মধ্যে পুরুষ মহিলা আলাদা নাকি!

সুনন্দ ভাববোধক দৃষ্টিভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।

–হ‍্যাঁ, পাখিদের মধ্যে লিঙ্গ ভেদ স্পষ্ট। রবিন পাখিটাই দেখ। তার মাথা এবং পুচ্ছাংশ কালো। বুক, পেট, ডানা এবং লেজের নিচের অংশ সাদা । ডানায় কালোর ওপরে সাদা সাদা আঁচ আছে। এটা পুরুষ রবিন পাখি।মহিলা রবিন সাদা-কালোর পরিবর্তে ছাইরঙের মতো কালো।

উদয়শঙ্করের কথা একান্ত মনে শুনে সুনন্দ এগিয়ে যাচ্ছে।

– আর ও একটি সুন্দর পাখি দেখছি দাঁড়াও – উদয় শঙ্কর সুনন্দকে পাখিটার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল – ওই পাখিটা দেখছ?

সুনন্দ পাখিটা দেখেনি। সুনন্দকে পাখিটা দেখানোর জন্য উদয়শঙ্করকে কিছুটা কষ্ট করতে হল। পাখিটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর পরেও সুনন্দ দেখছেনা।

– এখন দেখেছ পাখিটা?

– দেখেছি। দেখেছি।

সুনন্দ সম্মতি জানিয়ে বলল।

– প্রথমে তোমার দেখতে অসুবিধা হয়েছিল কেন বলতো?

– গাছের পাতার সঙ্গে একেবারে মিলে আছে যে। বোঝাই যায় না।

– প্রকৃতি তার সন্তানদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করে রেখেছে বুঝেছ। যেভাবে মানুষের মগজ, হৃদপিণ্ডকে যথেষ্ট সুরক্ষিত স্থানে রাখা হয়েছে। এখন বলতো পাখিটার নাম কি? পাখিটা পুরুষ না মহিলা?

- এই সুন্দর পাখিটা আমি প্রায়ই দেখি কিন্তু নামটাই জানিনা। সুনন্দ বলল।

– সুন্দর পাখিটার নামটাও সুন্দর– রূপসী পাখি, স্কারলেট মিনি ভেট। এটি মহিলা পাখি। এর ঠোঁটের নিচ থেকে পুচ্ছাংশ দেখেছ কি কেমন হলদে। ডানাও হলদে। শরীরটা ছাই রঙের। পাখিটার হলদে রঙের জায়গায় লাল রং মানে পাকা আমের শাঁসের মতো হলে ভাববে সেটা পুরুষ পাখি। বাকি মাথা, গলা, পিঠ, ডানা এবং পুচ্ছাংশ কালো। এখন বুঝতে পেরেছ কি পাখির পুরুষ মহিলা আমরা কীভাবে সনাক্ত করতে পারি।

- তবে এবার বৈজ্ঞানিক নামটা বললে না যে–

– মনে থাকলে বলবে। ভুলে গেছি মনে নেই। তুমি মনে রাখতে চাও যদি আমি তোমাকে বই দেখে বলতে হবে।

উদয়শংকর হে হে করে হেসে ফেলল। সেভাবেইনি তার হাসি শুনে যে পাখিটা উড়ে যেতে পারে। আর সেটাই হল। ওদের বিপরীত দিকে পাখিটা উড়ে চলে গেল।

উদয়শঙ্কর এবং সুনন্দ এসে এবার একটি ব্রয়লার পামের সামনে উপস্থিত হল।

উদয়শঙ্কর জিজ্ঞেস করল– এখানে ব্রয়লার ফার্ম আছে!

– দুটো আছে। কয়েকটি ছেলে ফার্ম আরম্ভ করেছিল, লাভ হয় না বলে এখন ছেড়ে দিয়েছে।

–আমাদের ছেলেদের সেটাই সমস্যা। ধৈর্য ধরতে পারে না। উপার্জনের দুুপয়সা হাতে এলেই একই দিনে দামি বাইক এবং মোবাইল নিতে শুরু করে।

উদয়শঙ্কর পামটার সামনে দাঁড়িয়ে পামটা লক্ষ্য করল। চারশো-পাচশো মুরগি রাখার মতো পামটিতে সুবিধা রয়েছে।ব্রয়লার ফার্ম থেকে নির্গত এক বিশেষ ধরনের গন্ধ জায়গাটাতে ছড়িয়ে পড়েছে।

–পামটা বেশ বড়ো।

উদয়শঙ্কর সুনন্দের সামনে মন্তব্য করল। দুজনকে পামের সামনে দেখে ভেতর থেকে একটি ছেলে বেরিয়ে এল।

– সুনন্দ দা। অসময়ে এদিকে যে। আপনাকে বহুদিন ধরে দেখছি না।

–ওঁর সঙ্গে এদিকেই এক পাক ঘুরতে এসেছিলাম। ভালো আছ? ফার্ম কেমন চলছে?

– আছি মোটামুটি। চালাচ্ছে, চলছে, চলছি।

ব্রয়লার ফার্মের মালিক ছেলেটি বলল।

– ইনি উদয়দা। আমাদের এখানে পাখি পর্যবেক্ষণ করে বেড়াচ্ছে। আজ ওকে অল্প সঙ্গ দিচ্ছি।

-আপনাকে আমি দেখেছি। গতবছরেও এসেছিলেন নয় কি?

- হ্যাঁ গতবারও এসেছিলাম। জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। সেজন্য এবারও আবার এলাম। তোমার নামটা জানতে পারি কি?

উদয়শঙ্কর ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিল– সৌরভজ্যোতি কলিতা।

– তোমার ফার্মটার কত বছর হয়েছে?

– দাদা,দশ বছরের মতো হয়েছে।

– তাহলে তোমার ফার্ম করার বেশ কয়েক বছর হয়েছে। ভালোই, লেগে থাকলে মেগে খায় না।

উদয়শঙ্কর আর সুনন্দ কিছুক্ষণ সৌরভের সঙ্গে এটা ওটা কথা বলে ফার্মের সামনে থেকে ফিরে এল।

– যে পথে এসেছিলাম সে দিকে যাব না এই পথে গিয়ে পুনরায় পাকা রাস্তায় উঠব।

শিবমন্দিরের সামনে উপস্থিত হওয়ায় সুনন্দ উদয়শঙ্করকে সামনের পথটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল।

– আমরা পাকা রাস্তায় উঠব আর রাস্তাটা পার হয়ে নদীর তীর ধরে গিয়ে জলাশয়টা পাব।হবে? তোমার ক্লান্ত বা ক্ষুধা লাগছে নাকি। নাকি দুটিই লেগেছে।

– না না। ক্লান্তিও লাগেনি ক্ষুধা ও লাগেনি। আপনার যদি ক্লান্ত লেগে থাকে পিঠের ব্যাগটা আমাকে দিতে পারেন।

ঠোঁট দুটি বাঁকা করে দেখিয়ে ঈষৎ হেসে উদয়শঙ্কর সুনন্দকে বলে উঠল– ভালো বলেছ। যতটা সম্ভব বহন করে নিয়ে যাই।

শিব মন্দিরের সামনে থেকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত আধা কিলোমিটারের মতো দূরত্ব হবে। রাস্তাটার দু'পাশে সবুজ মনোরম বসতি। নির্দিষ্ট সময়ে ফোঁটার জন্য অপেক্ষা করে থাকা তিনটি এজার গাছের একটি সারি। আর দুটো শিমূল গাছ। দেখেই বোঝা যায় গাছ দুটির বয়স হয়েছে। রাস্তাটার নিচে মাটির মালিক লাগানো সেগুন এবং তিতা চপার গাছগুলি বেশ বড়োসড়ো হয়ে উঠেছে। সারি সারি করে লাগানো সোজা গাজ গুলির মধ্য দিয়ে তাকালে অনেক দূর পর্যন্ত সুন্দরভাবে দেখা যায়।

– এই গাছ গুলির মধ্য দিয়ে সোজাসুজি নদী পর্যন্ত এক ফার্লঙের মতো দূরত্ব হবে। তখন আমরা সোণ কুরিহার সেতুর নিচ দিয়ে পার হলেই জলাশয়টা পেয়ে যাব।

– আজ এভাবে যাবনা নাকি সুনন্দ। অন্য একদিন যাব। আজ পাকা রাস্তাটার দিকে যাবার এই পথটার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিই।

দুজনই পাকা রাস্তায় উঠল। এই জায়গাটা থেকে কিছুটা ভাটিতে গেলেই থানে প্রবেশ করার রাস্তাটা পাওয়া যায়। থান হয়ে জলাশয়ে না গিয়ে দুজনেই নদীর তীর ধরে জলাশয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তবে সুনন্দের পছন্দ হল না। পাকা রাস্তাটা থেকে নদীর তীর ধরে যাবার জন্য খারাই অতিক্রম করতে হবে। উদয় শঙ্কর একবার মাত্র এই খারাইটা দিয়ে নেমে গিয়ে নদীর তীরে উপস্থিত হয়েছিল।

–গতবছর আসার সময় আমি এদিকেই নেমে গিয়েছিলাম।

উদয়শঙ্কর সুনন্দকে আশ্বাস দেবার জন্য বলল। কিন্তু সুনন্দের মনে সন্দেহ। ভয় ভীতভাবে সে ওপর থেকে নিচের দিকে তাকাচ্ছে।

– উদয়দা আমি নেমে যেতে পারব কি?

– ইচ্ছা করলে পারবে। একটু সাবধানে নামতে হবে। শিশির পড়ে একদম পিছল হয়ে আছে। প্রথমে আমি নেমে যাই এবং পা রাখার মতো তোমার সুবিধা করে দিই। হবে তো!

সেভাবে উদয়শঙ্কর প্রথমে নেমে গেল এবং নেমে যাবার সময় জুতো দিয়ে খাজ কাটার মতো সাঁচ বসিয়ে দিয়ে গেল। তথাপি সুনন্দ ভয় পেয়ে ইতস্তত করতে লাগল। উদয়শঙ্কর ভাবল এভাবে নামতে হলে সুনন্দ পা পিছলে পড়াটা নিশ্চিত। সুনন্দকে অপেক্ষা করতে বলে সে একটা শক্ত লতার খোঁজে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। একটু খোঁজখবর করে সে একটা শক্ত লতা ছিঁড়ে টেনে আনল। সুনন্দ ভয় না করলে এটা দিয়ে সুন্দর করে নেমে আসতে পারবে। উদয় শঙ্কর লতাটা সুনন্দের দিকে ছুড়ে দিল এবং উদয় শঙ্কর বলা অনুসারে সুনন্দ খাড়াইয়ের কাছের একটা গাছের ডালে লতাটা বেঁধে তার অন্য প্রান্তটা নিচের দিকে নামিয়ে দিল । এখন নিচের দিকে ঝুলে থাকা লতাটা খামচে ধরে উদয়শঙ্কর পা দিয়ে তৈরি করা খাজে খাজে পা রেখে সুনন্দ নেমে এল। মাটির কাছাকাছি পৌঁছে হুড়মুড় করে নেমে পড়ায় শেষ মুহূর্তে সে পিছলে পড়ে গেল যদিও খুব বেশি ব্যথা পেল না।

– ব্যথা পেয়েছ নাকি?

কাপড়ে লেগে থাকা বালি ঝাড়তে ঝাড়তে সুনন্দ বলল– পাইনি উদয়দা। হাতটাতে শুধু –

খসখসে লতাটা সজোরে খামচে ধরে পিছলে পড়ায় বা হাতটা একটু ঘষটে গেছে।

– তোমার প্রশিক্ষণের আজ প্রথম দিন। প্রথম দিনে দুই একটি ছোটোখাটো ঘটনা ঘটলে কোনো ব্যাপার না। তার মধ্যে তোমার হয়তো ক্ষুধা পেয়েছে।

– তাই নাকি? কথাগুলি তাহলে এরকম?

উপহাসের সুরে সুনন্দ উদয়শঙ্করকে প্রতি আক্রমণ করল।

উদয়শংকর প্রথমবার খাড়াই বেয়ে নেমে নদীর তীর ধরে যে পথে গিয়েছিল আজ সেভাবে না গিয়ে সোজাসুজি জলাশয়ের দিকে এগিয়ে গেল। ঢেকিয়া এবং বনে লেগে থাকা শিশির দুজনেরই হাঁটু পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেলল।

সুনন্দ আক্ষেপ করে বলল– একেবারে ভিজে গেলাম উদয়দা।

– অরণ্যের ভেতরে এইসব আক্ষেপ আবদারের কোনো কদর নেই। শীতে শিশিরে ভেজা, গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে ভেজা, জোঁক, মশা, ডাসা,জংলি পাতা– সবকিছুকে নিয়ে মানিয়ে চলা শিখতে হবে। শিখতে জানতে হবে।

সুনন্দ মনে মনে উদয়শঙ্করের পেছন পেছন যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করল। না হলে কথায় কথা বাড়ে। দুজনেই যেতে যেতে জলাশয়ের পাড়ের নির্দিষ্ট জায়গাটায় পৌঁছাল।

হেলানো গাছটা দেখে সুনন্দ খুশি হল এবং ছোটৌ একটি ছেলের মতৌ সে দু পা ঝুলিয়ে গাছটায় আয়েশ করে বসে পড়ল।

– উঠ উঠ। বসলে হবে না। ক্লান্ত লাগছে নাকি?

– এভাবে হাঁটার অভ্যাস নাই যে।

– তাহলে বসো বসো। একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও।

উদয়শঙ্কর সাধারণভাবে রান্নাবান্না করার জন্য একটা তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য উনুন তৈরি করে নিয়েছিল। সে সেই উনুনের ওপরে আশেপাশে থাকা শুকনো কিছু ডাল- পাতা চাপিয়ে দিল। তারপর বেগ থেকে একটা পুরোনো খবরের কাগজ এবং দিয়াশলাই বের করে আগুন ধরানোর চেষ্টা করল। শিশিি পড়ে ডাল গুলি ডিজে থাকার জন্য আগুন জ্বালাতে তার একটু কষ্ট হল যদিও আগুন জ্বালাতে সমর্থ হল। এবার বেগ থেকে স্টিলের একটা পাত্র বের করে তার মধ্যে বোতল থেকেই জল ঢেলে পাত্রটা তাৎক্ষণিক উনুনের ওপর বসিয়ে দিয়ে জলটা গরম হতে দিল।

সুনন্দ উদরশঙ্করের কারুকার্য গুলি নিবিষ্ট মনে দেখতে লাগল। সে মনে মনে ভাবল উদয়দা গরম জল দিয়ে কী করবে!

জলটা একটু গরম হতেই উদয়শঙ্কর ব্যাগ থেকে দুটো মেগীর 'কাপ নুডুলস' বের করল। কাপ দুটির ঢাকনি দুটি খুলে সে তার পাতলা ফয়েলের সুরক্ষা কবচ ছাড়িয়ে হাতের তালুতে মুঠি মেরে গোল করে ব্যাগে ভরিয়ে নিল।

– অরণ‍্যের মধ্যে তুমি ব্যবহার করা কোনো জিনিস ফেলতে পার না। এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কথা। সব সময় মনে রাখবে।

উদয়শঙ্কর কী করছে বলে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা সুনন্দকে উদ্দেশ্য করে বলল।

সুনন্দ সম্মতি সূচকভাবে বলল -হ‍্যাঁ উদয় দা।

তারপর সে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল উদয়শঙ্করের দিকে। উদয়শঙ্কর উনুন থেকে নামানো পাত্রটার জল কাপ নুডলস দুটিতে একটু একটু করে ঢেলে দিল। মেগীর উপরে গরম জল পড়ে মেগীটায় বুদবুদ কাটতে লাগল।

–হো লোয়া।

– এটা কী?

– সুনন্দ কিছুই বুঝতে পারছে না।

– সকালের আহার। মেগী দিয়ে,খাও।ও কীভাবে খাবে চামচ দিইনি।

উদয়শঙ্কর নিজেকে নিজে বলার মতো করে ব্যাগ থেকে দুটি ডিসপোজেবল স্পুন বের করে একটা সে নিল অন্যটি সুনন্দকে দিল। সুনন্দ তখন অবাক হল যে উদয়শঙ্কর এত কম সময়ের মধ্যে তার জন্য খাবার জিনিস তৈরি করে ফেলল। মেগী এরকম প্যাকেটে পাওয়া যায় বলে সে আগে জানত না। সুনন্দ চামচটা মেগীর ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ায় ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা মেগীর মশলা মিশ্রিত গরম ধোঁয়ার ঘ্রাণ লেগে তার পেটের ভেতরে ক্ষুধাটা জেগে উঠল। গন্ধটা সুনন্দের মুখের সন্তুষ্টির ভাব পরিস্ফুট করে তুলল।

উদয়শঙ্করের দিকে না তাকিয়ে সে মেগীর স্বাদ নেওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

– উদয়দা, জল এনেছ নাকি?

উদয় শঙ্কর বেগ থেকে জলের বোতলটা বের করে সুনন্দের হাতে তুলে দিয়ে বলল– আমাকে তোমার বউ পেয়েছ নাকি?

এক ঢোক ঠান্ডা জল গলায় ঢেলে দিয়ে সুনন্দ বলল– উদয়দা স-রি,স-রি।মেগী গলায় আটকে যাওয়ার জন্যই জল–

– আমি কি সিরিয়াসলি বলেছি নাকি। তুমি যে সরি বললে। তবে আমাদের ইংরেজির ব্যবহার একটু বেশি হয়েছে।

– প্রত্যেকেই এরকম বলে দেখছি।

উদয়শঙ্কর ঝোলা থেকে একটা পেপার ব্যাগ বের করে খালি কাপ নুডুলসের পাত্র দুটো এবং ডিসপোজেবল স্পুন আদি নোংরাগুলি পেপার বেগে ভরিয়ে পুনরায় ঝোলাতে ভরিয়ে রাখল। থানের বাকি নোংরাগুলি সে পরে পুড়িয়ে ফেলবে।

– সুনন্দ ক্ষুধা পালিয়েছে তো?

পেটে একটা হাত রেখে ক্ষুধা পালিয়েছে কিনা পরখ করে দেখার ভাবে সুনন্দ বলল– পালিয়েছে।

– অরণ্যের মধ্যে কোথায় ভূরি ভোজন করার সুবিধা পাবে। আমি সঙ্গে মেগীর প্যাকেট এবং বিভিন্ন শুকনো ফল নিয়ে ঘুরে বেড়াই । ক্ষুধা পেলে তা দিয়েই কাজ সেরে নিই।

– একটা নতুন কথা শিখলাম। তিন বেলা মাটিতে পিঁড়ি পেতে ভাত খাওয়া আমাদের কাছে এই ধরনের কিছু 'ফোল্ডিং' খাদ্য স্বপ্নের ও অগোচর। – ফোল্ডিং নয় 'ফাস্টফুড'।

ফাস্টফুড গুলি ফোল্ডিংই ধরে নিন।

দুজনের কথাবার্তায় একটা কাঠঠোকরা পাখি ঠোঁট দিয়ে কাঠের মধ্যে ঠক ঠক করা শব্দ যতি ফেলল। নির্জন অরণ্যের নির্জনতা ভেঙ্গে শব্দটা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

– এটা কি পাখি?

উদয়শঙ্কর পাখি দেখলেই সুনন্দকে একই প্রশ্ন করে।

– কাঠঠোকরা।

– কাঠঠোকরার কয়েকটি প্রজাতি আছে। এই প্রজাতিকে ছোটো সোনা কাঠঠোকরা বলা হয়। ইংরেজিতে বলে ব্লেক- রাম্পড- ফ্লেইমবেক। তুমি জিজ্ঞেস করার আগেই বলে রাখলাম– বৈজ্ঞানিক নামটা কিন্তু আমার মনে নেই। দেখছেন কি পাখিটার মাথার উপরিভাগে কীরকম উজ্জ্বল রং। ঘাড় কালো। ডানা খয়েরি রঙের। কাঠঠোকরা ও তার শক্তিশালী ঠোঁট গাছের পচা অংশে ঠুকরে তাতে পোকামাকড় ভক্ষণ করে ।

সুনন্দ আর উদয়শংকর পাখিটা বিশেষ ভঙ্গিমায় নেচে নেচে পোকামাকড় খেতে থাকা দৃশ্যটা কিছুক্ষণ ধরে দেখতে থাকল।

উদয়শঙ্কররা পাখিদের পাড়াপড়োশিতে উপস্থিত হওয়ার সময় কাঠঠোকরা গুলি খাদ্যের সন্ধানে ওদের বিচরণ স্থলে ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছিল।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...