সোমবার, ২৪ জুলাই, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৩৯ ।। সন্তোষ কুমার কর্মকার ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das ।। Hey Amar Swadesh

হে আমার স্বদেশ- ৩৯

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das




  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।  

   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৩৯)

মহাপুরুষের মানবীয় গুণগুলি মানবীয় চেতনা সম্পন্ন মানুষকে সবসময়ই অনুপ্রাণিত করে।

নৈষ্ঠিক বৈষ্ণব পরম্পরায় গড়ে উঠা পারিবারিক ভিটেতে লক্ষ্মীনাথ জীবনের বাল্য-কৈশোর অতিবাহিত করেছিল। উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় এসে ইংরেজি শিক্ষা এবং বঙ্গের সাংস্কৃতিক পরিবেশে নিজের চেতনা বোধকে সমৃদ্ধ করেও তিনি স্বজাতির অতীত  ঐতিহ্যকে গুরুত্ব প্রদান করেন। ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক চেতনায় অসমিয়া জাতি গঠনের ক্ষেত্রে মহাপুরুষ শংকরদেবের অতুলনীয় অবদানকে তিনি সশ্রদ্ধ বিনম্রতার সঙ্গে স্বীকার করেন। গুরুজনকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই ১৯১১ সনে লক্ষ্মীনাথ 'শ্রীশংকর দেব' গ্রন্থটি লিখেছিলেন। কিন্তু গ্রন্থটি রচনা করে মানসিক ভাবে তৃপ্ত হতে পারেননি।তাঁর অনুভব হল, অসমিয়া জাতি এবং অসমিয়া ভাষা সাহিত্যে গুরুজনের অতুলনীয় অবদানকে যথার্থভাবে তুলে ধরা হল না। তার জন্যই অন্যান্য লেখা এবং 'বাঁহী' সম্পাদনার সামান্তরালভাবে শংকরদেব প্রণয়ন করা পুঁথিগুলি অধ‍্যয়ন করতে লাগলেন ।

এই অবস্থায় একদিন সকালবেলা কোচবিহারের মধুপুর সত্র থেকে সত্রাধিকার নন্দেশ্বর দেব গোস্বামী প্রভু লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।পঁয়ষট্টি বছর অতিক্রম করার পরেও স্বাস্থ্যবান,সুপুরুষ, সাদা পায়জামা পাঞ্জাবির সঙ্গে চেলেং চাদর নেওয়া সৌম্য দর্শন সত্রাধিকার দেবগোস্বামীকে দেখে লক্ষীনাথের মনে শ্রদ্ধা জন্মাল।

' অসমিয়া জাতি তথা অসমিয়া ভাষা সাহিত্যে আপনার অবদানের কথা সব সময় শুনে থাকি । ইতিমধ্যে আপনার রচিত কয়েকটি গ্রন্থ পড়েছি । তাতে আপনার প্রতি আগ্রহ-কৌতূহল বেড়েছে। তারপরে গত মাসে মাজুলীর কমলা বাড়ি সত্র গিয়ে দিন চারেক থাকার সময় মহোদয় ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে রচনা করা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুনলাম । ইতিমধ্যে আমাদের বংশের আদি বাসভুমি বৃন্দাবনে এসেছিলাম। সেখানে থাকার সময় আপনাকে একবার দর্শন করার ইচ্ছে জেগে ছিল। তাই কলকাতায় এসে কলেজস্ট্রীটের অসমিয়া ছাত্রদের একটা মেস থেকে মহোদয়ের বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে আজ আপনাকে দর্শন করতে এসেছি।'

বৈষ্ণবী বিনয় নিয়ে বলা কথা। লক্ষ্মীনাথের শিবসাগরের বাড়িতে প্রতিদিনই  সত্রের গোঁসাই মহন্তরা আসতেন। তাঁরা দীননাথ মহাশয়ের সঙ্গে শাস্ত্র আলোচনা করতেন। তাই লক্ষ্মীনাথ তাঁদের কথা বলার বিশেষ ধরণটির সঙ্গে পরিচিত। অবশ্য তিনি নিজে এভাবে কথা বলতে অভ্যস্ত নন। এভাবে কথা বলতে লক্ষ্মীনাথ কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্তি বোধ করেন। লক্ষ্মীনাথ নিজের মতো করেই তাকে সম্ভাষণ জানিয়ে বললেন,' আমার সৌভাগ্য যে আপনার অনুগ্রহে আপনার দর্শন লাভ করলাম। তবে আমার এখানে তো সত্রের প্রথা অনুসরণ করে বসার সুবিধা নেই। চেয়ারে বসতে আপনার কি অসুবিধা হবে?'

' বিদেশে নিয়ম  নাস্তি। তাছাড়া যুগের পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে জীবনধারণের পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে। আচার–সংস্কারের পরিবর্তন হয়েছে।

সত্রে থাকা নীতি-নিয়মগুলি প্রবাসী গৃহস্থের বাড়িতে এসে চাওয়াটা সমুচিত হবেনা। সাহেবদের মতো চেয়ারে বসতে এই অভাজনের অসুবিধা হবে না।'

অবশেষে লক্ষ্মীনাথ সত্রধিকার নন্দেশ্বর  দেবগোস্বামীকে তাঁর নিজের পড়ার ঘরে নিয়ে গেলেন। সুদৃশ্য চেয়ার,বড়ো টেবিল, টেবিলের ওপরে বইয়ের ওপরে বই চাপিয়ে রাখা, দুপাশে অসমিয়া-বাংলা-ইংরেজি গ্রন্থে পরিপূর্ণ চারটি আলমারি, দেওয়ালে ঝোলানো প্রজ্ঞার আঁকা নৈসর্গিক তৈলচিত্র দেখে সত্রধিকার নন্দেশ্বর দেবগোস্বামী অবাক হয়ে গেলেন। সংকুচিত ভাবে তিনি একটি চেয়ারে বসলেন। লক্ষ্মীনাথ তাকে এই ঘরের অন্ন জল গ্রহণ করবেন নাকি জিজ্ঞেস করলেন। হাত জোড় করে সবিনয়ে নন্দেশ্বর জানালেন যে তিনি এখন জলপান গ্রহণ করবেন না, তিনি কেবল অসমিয়া ভাষার বরেণ্য সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া মহাশয়ের 'দর্শন লাভ এবং দুই একটি কথার মত বিনিময়ের' আশায় এখানে এসেছেন।

' মহোদয়ের পিতৃদেব 'পুণ্যাত্মা দীননাথ বেজবরুয়ার জীবনচরিত' পাঠ করেই আগ্রহ জন্মেছিল। তারপরে' শ্রীশংকরদেব 'বইটি হাতে নিয়ে বিশেষ সন্তোষ লাভ করেছিলাম।' সত্রাধিকার নন্দেশ্বর গোস্বামী বললেন,' আপনি যে আমাদের মহাপুরুষের জীবন এবং তার গুণ মহিমা বর্ণনা করে সর্বসাধারণ জনগণের  মধ্যে তুলে ধরেছেন, তার জন্য আমাদের সত্রের গোঁসাই মহন্তরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।'

' আমার দিক থেকে সেটা একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।' লক্ষ্মীনাথ বললেন,' কিন্তু অপ্রিয় হলেও বলতে হবে আজকের যুগেও গুরু দুজনের কর্মসাহিত্য সৃষ্টি এবং বাণী তারা প্রতিষ্ঠা করা সত্র নাম ঘরেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। সত্র-নামঘরের চার দেওয়ালে থেকে আচার সংস্কারে আবদ্ধ অথবা অবসরের সময় চিন্তা ভাবনার তর্ক-বিতর্ক বিষয়ের মধ্যে সীমিত হয়ে আছে। আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন কথাটা শুনতে কঠিন হলেও বলতে বাধ্য হয়েছি – সেই সমস্ত কর্ম থেকে আমাদের পরাধীন অসমের দুঃখী দরিদ্র অশিক্ষিত জনগণের বিশেষ কোনো উপকার হয়নি। আমাদের এই সমস্ত মানুষের কাছে ধর্ম মানে কিছু আচার সংস্কার। যুগ যুগ ধরে চলে থাকা সেই আচার– সংস্কারের প্রতি এতটাই অন্ধ যে তারা সেইসবের বাইরে বেরিয়ে এসে জীবনটাকে দেখতে চায় না। তাদের মনে আধুনিক জীবনের কোনো চেতনা নেই।'

লক্ষ্মীনাথ কী বলতে চাইছেন সত্ৰাধিকার দেবগোস্বামী বুঝতে পারলেন না।

' তার জন্যই আমাদের মহাপুরুষ দুজনের জীবনের কথা ঘটনা এবং কার্যাবলী প্রত্যেকেই যাতে জানতে পারে এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে আগেরটির চেয়েও আরও বিস্তৃতভাবে পৃথক একটি বই লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু তা করতে গিয়ে দেখলাম, অনেক চরিত্র লেখক প্রকৃত ঘটনা না জেনে নিজের নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য মহাপুরুষ দুজনের বিষয়ে অনেক কথা বিকৃত করে লিখেছেন। সেই সমস্ত বিচার করে গুরু দুজনের জীবনে ঘটা সঠিক ঘটনাগুলি আমাদের সর্বসাধারণ জনগণ বুঝতে পারার মতো করে লিখব বলে ভাবছি।'

' মহাশয়ের উদ্দেশ্য সত‍্যি মহৎ!'

' শংকরদেবও আমাদের, মাধবদেবও আমাদের, বংশী গোপাল দেবও আমাদের এবং হরিদেবও আমাদের। তাদের কৃপাতেই আমরা ধর্ম ,কর্ম, নীতি, সদাচার ,মনুষত্ব পেয়েছি । তাদের আবির্ভাবে অসমিয়া জাতি বিনাশের হাত থেকে উদ্ধার পেয়েছিল। আজ যে আমরা অসমিয়া, আমাদের যে একটা স্বকীয় ভাষা আছে, সমৃদ্ধ সাহিত্য আছে আমাদের যে অতুলনীয় নৃত্য গীত আছে,অসমের সমস্ত জাতি গোষ্ঠী যে একতার বন্ধনে বাধা পড়ে অসমিয়া বলে পরিচয় দিতে পারছে …. এই সমস্ত আমাদের সর্বসাধারণ জনগণ —বিশেষ করে উঠে আসা উদার শিক্ষা পাওয়া তরুণদের সর্বগুণাকর গুরু শ্রী শংকরদেবের মহিমাময় জীবনের কথা গুলি জানা উচিত।

নিশ্চয় নিশ্চয় এটা মহাশয়ের উচ্চ ভাব ,স্বজাতির হিতের জন্য উচ্চ চিন্তা ।'

' সঙ্গে এই গ্রন্থের মাধ্যমে এটাও দেখাতে চাইছি যে আমাদের শংকরদেবই  প্রথম ব্যক্তি, যিনি বৈষ্ণবের অমৃতসুধায় অসমের সমস্ত জাতিকে প্রাচীন ভারতের সনাতন আধ্যাত্মিকতার অমর বাণীর সঙ্গে আত্মিক যোগসূত্র স্থাপন করেছেন।'

' সাধু সাধু!' সত্রাধিকার নন্দেশ্বর দেবগোস্বামী প্রভু বলে উঠলেন,' তবে তার জন্য মহাশয়কে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করতে হবে।'

' নিশ্চয় করতে হবে। লেখার কাজ আরম্ভ করার আগে যোগাড় করতে শুরু করেছি।

' উপাদানগুলির উৎস কি অনুগ্রহ করে জানাবেন কি?'

' মহাপুরুষ শংকরদেব এবং মাধবদেবের কয়েকটি চরিতপুথি  পেয়েছি। দ্বিতীয়ত, মহাপুরুষীয়া সত্রের শাস্ত্রজ্ঞ সাধু-সন্তদের  মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসা চরিত কথা এবং প্রধানত আমার পিতৃদেবের কাছ থেকে শোনা কথাগুলির যতটুকু মনে আছে, সেইসব নিজের মনে বিচার করে নিয়ে গ্রন্থটা রচনা করব বলে ভেবেছি। আর এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমাদের জনগণকে বোঝাতে চাইছি– ভয় নেই আমরা আবার মানুষ নামের উপযুক্ত হয়ে উঠব। সঙ্গে বলতে চাইছি– দেখতো আমাদের শংকরদেবের কী ন্যায় নিষ্ঠা, কী ধরনের স্বার্থত্যাগ এবং স্বধর্মে তার কী অবিচল মতি । আমাদের শংকরদেব শিরোমনি ভূঞা, রাজার মতো তার ক্ষমতা ।ধন-ঐশ্বর্য, দাস- দাসীতে তিনি পরিবৃত থাকতে পারতেন। তাঁর কীসের অভাব পড়েছিল যে এরকম সুখ সম্পদ এবং সম্ভ্রমের জীবন তৃণবৎ পরিত্যাগ করে ধর্ম প্রচারকের বিপদ সকুল জীবন অবলম্বন করলেন? একবার ভাবুন তো কেন তিনি দুঃখী দরিদ্র ভিখারি সর্বজয় বলরামের মতো ভক্তকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে দারিদ্র্যের কঠিন অবস্থাকে আলিঙ্গন করে পরের উপকারের নিমিত্ত এই ধরনের কঠোর ব্রত অবলম্বন করেছিলেন। ভারতবর্ষে রাজপাট এবং সাংসারিক সুখ -ভোগ বিসর্জন দেওয়া একমাত্র সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ ছাড়া এই ধরনের দৃষ্টান্ত আর আছে কি?' 

' মহাশয় তাহলে আমাদের গুরুজন প্রচার করা ধর্মের দর্শনটা খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করতে চাইছেন না?'

' সাধারণ মানুষের জন্য ধর্ম ও দর্শনের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলি নীরস বিরক্তিকর। সেসব তারা খুব একটা বুঝতে পারে না। আর বুঝতে পারে না বলে ভালোবাসে না। সেসব থেকে তারা খুব বিশেষ কিছু শেখেনা। আমি গুরুজনের জীবনটা এভাবে চিত্রিত  করতে চাইছি যে তার কর্মকান্ডে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করা ধর্মীয় দর্শনটা ফুটে উঠে।'

অনুগ্রহ করে একটা উদাহরণ দিয়ে যদি–।

'এই মনে করুন, শংকরদেব অসমের যে সময়ে যে রাজার অধীনে বাস করতেন, তিনি ছিলেন স্বেচ্ছাচারী এবং অসূয়া বৃত্তিতে পরিচালিত পরাক্রমী রাজা। ব্রাহ্মণ পন্ডিতের কুমন্ত্রণায় সেই রাজা আমাদের গুরুজনের বিরুদ্ধবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তার জন্য গুরুজনকে নিজের হাতের মুঠোতে জীবনটা নিয়ে ধর্মমত প্রচার করতে হয়েছিল। সেই কথাগুলি সম্পূর্ণভাবে অনুভব করতে পারলেই তাঁর আত্মত্যাগ, নিরপেক্ষতা, ধর্মপরায়ণতা, ঈশ্বর বিশ্বাসে অটল নিষ্ঠা এবং প্রাণীর আরাধ্য দেবতায় অচলভক্তির মহত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে। এইসব আমি শুধু কথার মাধ্যমে উপস্থাপন করব না। এইসব ঘটনা পরিস্থিতি এবং চরিত্রের মাধ্যমে কথোপকথনের মাধ্যমে সজীব রূপে তুলে ধরার পরিকল্পনা করছি।'

অবাক হয়ে সত্রাধিকার নন্দেশ্বর দেবগোস্বামী লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

'এর দ্বারা আমাদের গুরুজন সত্র- নামঘর থেকে বেরিয়ে সর্বসাধারণ জনগণের মধ্যে আসবে নিজের মধ্যে আপন করে পেয়ে গুরুজনের চারিত্রিক মহিমায়  নিজের চরিত্রকে গড়ে নিয়ে পরাধীন দুঃখী অসম মাতার সেবা করতে পারবে।'

সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার থেকে উঠে সত্রাধিকার নন্দেশ্বর দেবগোস্বামী প্রভু করজোড়ে বললেন, 'মহাশয়ের উদ্দেশ্য এবং কর্ম মহৎ আদর্শে উন্নত। আপনি পুণ্যাত্মা ,আপনি নিশ্চয় গুরুজনের কৃপালাপ করেছেন। সত্যিই আপনি আমাদের অসমের বরপুত্র ।আপনার দর্শন পেয়ে এই অভাজন ধন্য।'

সত্রধিকার নন্দেশ্বর দেবগোস্বামীর সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ অনেকক্ষণ কথা বললেন। এভাবে কথা বলে সসম্মানে সম্মানীয় অতিথিকে বিদায় দেওয়ার পরে তিনি ভেতরে ভেতরে উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। এরকম মনে হল যেন সত্যি তিনি একটি মহৎ কাজ হাতে নিয়েছেন। ব্যবসার নিত্যান্ত প্রয়োজনীয় কাজ করা ছাড়া লক্ষ্মীনাথ তারপরে সকাল থেকে রাত এক প্রহর পর্যন্ত 'মহাপুরুষ শ্রীশংকরদের এবং শ্রীমাধব দেব' গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করার জন্য পরিশ্রম করতে লাগলেন।

তবে এই গ্রন্থটি কবিতা, গল্প ,রূপকথা ,নাটক ,উপন্যাস লেখার মতো  কাজ নয়, শংকরদেব মাধব দেব অসমিয়া জাতীয় জীবনের মহাপুরুষ। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে পূণ্যভূমি অসমে তারা জন্মগ্রহণ করেছিলেন । বিদগ্ধ ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাদের বিষয়ে শুনে, তাদের বিষয়ে বিভিন্নজন লেখা চরিত পুথি পড়ে, তারা প্রণয়ন করা কাব্য ভক্তিতত্ত্ব অংকীয়া নাট, বরগীত,ভটিমা, টোটয় কীর্তন-গুণমালা ইত্যাদি অধ্যয়ন করে সেই সময়ের পরিবেশ- পরিস্থিতি বর্ণনা করে গুরুদুজনকে জীবন্ত রূপে মূর্ত করে তোলাটা অসাধারণ পরিশ্রমী এবং প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তির কর্ম।

তবে কষ্ট হলেও লক্ষীনাথ অসমিয়া জাতীয় জীবনের পরমপুরুষ জনকে নিয়ে কর্মব্রতী হয়েছেন। শংকরদেব বিদগ্ধ পন্ডিত, নতুন ধর্মের প্রবর্তক। তিনি সংগঠক ,নতুন সংস্কৃতির স্রষ্টা। তিনি নাট্যকার, অভিনেতা। বরগীতের  মতো আধ্যাত্মিক গীতের গীতিকার সুরকার নতুন নৃত্যকলার উদ্ভাবক,ওজা-বায়ন। নামঘর,সত্র স্থাপন করে সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র প্রবর্তনকারী, বাস্তব জীবনকে উপেক্ষা না করে গৃহস্থ। অনন্য সাধারণ এক সমন্বয়ে ব্যবহারিক জীবনের সঙ্গে শকরদেবের মানসিক এবং আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার বিকাশ হয়েছে। এই জন গুরুর অকুন্ঠ আশীর্বাদ থাকার জন্যই লক্ষ্মীনাথ প্রেরণাদায়ক শক্তি লাভ করলেন। এটা সাধারণ শক্তি নয়, আধ্যাত্বিক ঐশ্বর্যে মহিমাময় শক্তি। লক্ষ্মীনাথ সর্বশক্তি দিয়ে সর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষের জীবনী এবং কর্মের কথা লিপিবদ্ধ করতে লাগলেন।

বিরামহীন ভাবে পরিশ্রম করতে দেখে প্রজ্ঞা নিঃশব্দে স্বামীর বিশেষ ঘরটিতে প্রবেশ করে তিনি বসে থাকা চেয়ারের পেছনদিকে দাঁড়ান। লক্ষ্মীনাথ পত্নীর উপস্থিতি বুঝতে পারেন। লেখায় যাতে ব্যাঘাত না ঘটে তার জন্যই প্রজ্ঞা টেবিলে খাবার রেখে দিয়ে স্নেহময় কন্ঠে খেতে বলে। কখনও বিরতি নিতে দেখলে প্রজ্ঞা স্বামীকে বিশ্রাম নিতে অনুরোধ করে। লক্ষ্মীনাথ পত্নীর ভালোবাসা অনুভব করেন। পত্নীর এই ভালোবাসাও তার জন্য এক শক্তি । তিনি লেখায় এগিয়ে যান । এভাবে চার মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে গ্রন্থটি সমাপ্ত করেন । কিন্তু চূড়ান্ত হল না। পুনরায় অধ্যায় গুলি দেখতে হবে। প্রথম অধ্যায়ের' পূর্বপুরুষের কথা'র পরে ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়ের 'সমাপ্তি'র ভেতরের কিছু কিছু অধ্যায় সম্পাদনা করতে হবে ।তারপরে বইয়ের আকারে ছাপা… কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলেন না । লক্ষ্মীনাথ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পুনরায় নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হল। এত বেশি রক্তক্ষরণ হল যে বিছানা নিতে হল।

শংকরদেবের জন্মতিথিতে নাম প্রসঙ্গ অনুষ্ঠিত হওয়ার পরে তাঁর নাক দিয়ে রক্ত বের হয়। এবার বেশি মাত্রায় হল। খবর পেয়ে ডক্টর সত্যব্রত মিত্র এলেন। তিনি ঔষধ দিয়ে লক্ষ্মীনাথকে বিশ্রাম নিতে পরামর্শ দিলেন। পাঁচ দিন বিশ্রাম নেওয়ার পরে কিছুটা সুস্থ অনুভব করলেন। ষষ্ঠ দিন অফিসে গিয়ে কাজকর্ম দেখতে লাগলেন। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ার জন্য দেহ  তখনও দুর্বল। ব্যাবসার সব কাজ কর্মচারীকে দিয়ে হয় না। কিছু ক্ষেত্রে নিজে গিয়ে ব্যক্তি বিশেষের সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে হয়। কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়া দেহ নিয়ে লক্ষ্মীনাথ যেতে পারেন না।

তখনই খবর পেলেন, দিল্লিতে মোটর দুর্ঘটনায় ভোলানাথ গুরুতর ভাবে আহত হয়েছেন। ব্যাবসায়িক সম্পর্ক নেই। কিন্তু দুজনের মধ্যে যোগাযোগ আছে। পূর্বের মতো আন্তরিকতা না থাকলেও একসঙ্গে দেশ ভ্রমণ ছাড়াও উৎসবে পার্বণে মিলিত হন। একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন। এখন ,ভোলানাথের সংকটজনক এই অবস্থায় পাশে দাঁড়ানোটা মানবতা। কিন্তু নাক দিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এখনও সম্পূর্ণ সুস্থ নন বলে লক্ষ্মীনাথ দিল্লি যাওয়ায় বাধা দিলেন। তাছাড়া টাকা পয়সারও যথেষ্ট টানাটানি রয়েছে। তথাপি লক্ষ্মীনাথ যাওয়া এবং ফিরে আসার জন্য ৫৬ টাকা আট আনা দিয়ে রেলে দ্বিতীয় শ্রেণির টিকেট কেটে দিল্লি যাত্রা করলেন।

১৯১৪ সনের একুশে ফেব্রুয়ারি রাতে একটার সময় লক্ষ্মীনাথ দিল্লিতে উপস্থিত হলেন। খবর নিয়ে ভোলানাথ থাকা সিভিল এন্ড মিলিটারি হোটেলে এলেন। আঘাত গুরুতর যদিও বর্তমানে তিনি বিপদমুক্ত। খবর শুনেই কলকাতা থেকে লক্ষ্মীনাথ যে  দেখতে আসবে, ভোলানাথ এতটা আশা করেন নি। বিছানার কাছে দাঁড়ানো লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়েই আঘাত জনিত ব্যথায় কষ্ট পেতে থাকা ভোলানাথের চোখ ছলছলে  হয়ে এল। ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে ভোলানাথ একজন সফল ব্যক্তি। এতদিন ব্যাবসা করে কলকাতা তথা পূর্ব ভারত ছাড়াও লন্ডনে ব্যাবসা সম্প্রসারিত করে তিনি এখন বিপুল ধনসম্পত্তির অধিকারী । কিন্তু আঘাতে জর্জরিত দেহটা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী ভোলানাথের দিকে তাকিয়ে লক্ষীনাথের এরকম মনে হল যেন মানুষটা নিঃসঙ্গ, ভেতরে ভেতরে বড় অসহায়। বিছানায় পড়ে থাকা ভোলানাথের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের খারাপ লাগল। তারপর তিনি অনুগত ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। কষ্ট হল যদিও ভোলানাথের সঙ্গে সেই ঘরেই রাত অতিবাহিত করলেন।

সিভিল এন্ড মিলিটারি হোটেলে থেকে লক্ষ্মীনাথ ভোলানাথের সেবা- শুশ্রূষা করলেন। সেখানেই সকাল দুপুর এবং রাতে খাওয়া দাওয়া করলেন। মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পরে লক্ষ্মীনাথ ভোলানাথের দিল্লির জুম্মা মসজিদের কাছের বাড়িতে নিয়ে এলেন। তারপরেও দুদিন দিল্লিতে রইলেন। দিল্লি হল ৬০০ বছরের মোগল শাসনের ঐতিহ্যবাহী নগর। দিল্লির পথঘাটে ইতিহাসের কত ঘটনা, কত কাহিনি। শরীরটা খুব ভালো নয় যদিও লক্ষ্মীনাথ জুম্মা মসজিদ, লালকেল্লা চাঁদনী চক এবং কুতুবমিনার দেখলেন। তারপরে ভোলানাথ বললেন,' সাহেব  দিল্লিতে এসেছ যখন, আগ্রায় গিয়ে তাজমহল দেখে এসো।'

লক্ষ্মীনাথেরও আগ্রায় যাবার ইচ্ছা। কিন্তু পকেটে এত টাকা নেই। যা আছে বাজে খরচ না করে শুধু দেখে আসতে পারবেন। শেষে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। তাকে প্রস্তুত হতে দেখে বালিশের নিচে রাখা মানিব্যাগটা থেকে পঁচিশ টাকা বের করে ভোলানাথকে দিয়ে বললেন,' বুঝেছ সাহেব, আগ্রায় ভালো ভালো খেলনার জিনিস পাওয়া যায়। এই নাও, এই টাকা দিয়ে অরুণা-রত্নাদের জন্য খেলনার জিনিস কিনে নিও।'

লক্ষ্মীনাথ ভোলানাথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই মানুষটিকে অনেক সময় মায়া মমতাহীন কঠোর বলে মনে হয় ,ব্যাবসায়িক স্বার্থ ছাড়া সংসারের কোনো কিছু বুঝতে পারেন না বলে মনে হয় ,সেসব সত্যি নয়। ভোলানাথের অন্তরও মায়া-মমতায় সংবেদনশীল। অনেকদিন পরে লক্ষীনাথের ভালো লাগল। পুনরায় তিনি ভোলানাথের প্রতি একটা আন্তরিক টান অনুভব করলেন। 

' কী হল নাও।'

অবশেষে লক্ষ্মীনাথ ভোলানাথের কাছ থেকে টাকাটা নিল। টাকাটা পকেটে ভরানোর পরে একটা কথা মনে পড়ল।

' পুনরায় চিন্তিত হয়ে পড়লে যে?'

লক্ষ্মীনাথ কথাটা বলতে ইতস্তত করছে। অথচ ভেতর থেকে কথাটা বলার জন্য তার মনের মধ্যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত না বলে থাকতে পারল না,' দাদা গত চার মাস দিন রাত্রি পরিশ্রম করে 'মহাপুরুষ শ্রীশংকরদের এবং শ্রীমাধবদেব' নামে সাড়ে তিনশো পাতার একটা বই লিখেছি।'

' ধর্মগ্রন্থ!'

' শংকরদেব মাধব দেবের জীবনী যখন ধর্ম তো থাকবেই। তবে শুধু ধর্ম নয়। জীবন কর্মের মাধ্যমে তারা কীভাবে অসমিয়া জাতির সাংস্কৃতিক ভিত তৈরি করেছেন তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ। আমাদের গুরু দুজন আমাদের সত্র নামঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে রয়েছেন। আমি তাদের আমাদের সর্বসাধারণ অসমিয়া মানুষের মধ্যে নিয়ে আসার প্রয়াস করছি।

' ভালো কথা।'

তবে আপনি তো জানেন আমার ব্যাবসার অবস্থা ভালো নয়।অনেক টাকা বাকি পড়ায় রানিং ক্যাপিটাল শর্ট পড়ে গেছে।ক্যাপিটেল জোগাড় করার জন্য আমি ‘লরেলস বন্ধক দিতে বাধ্য হয়েছি।এখন আপনি যদি এই বইটী ছাপানোর দায়িত্ব নেন তাহলে—।‘

বিছানায় আধা শোওয়া অবস্থায় ভোলানাথ লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে পড়লেন।সেভাবে তাকিয়ে থাকার সময় তাঁর মুখটা কঠিন হয়ে উঠেছিল।কঠিন কিছু বলবেন বলে মনে হচ্ছিল।তবে বললেন না।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন-,’আচ্ছা হবে,আমি সুস্থ হয়ে কলকাতা যাওয়ার পরে বইটি ছাপানোর জন্য কতটাকা লাগবে আমাকে জানিও।আমি পাঠিয়ে দেব।’

একটা গ্রন্থ রচনা করার পরেই লেখকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটা যাতে বইয়ের আকারে প্রকাশিত হয় সেটা নিশ্চিত করাটাও লেখকের দায়িত্ব।লক্ষ্মীনাথ রচনা করা আগের বইগুলি নিজের খরচে প্রকাশ করেছিলেন।কিন্তু বর্তমান আর্থিক অবস্থায় গুরুদুজনকে নিয়ে লেখা অপেক্ষাকৃত বৃহৎ কলেবরের এই গ্রন্থটি ছাপার খরচ বহন করাটা তাঁর কাছে চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছিল।কিন্তু ভোলানাথ বইটির ছাপানোর দায়িত্ব বহন করায় লক্ষ্মীনাথ বড়ো একটি দুশ্চিন্তা থেকে রক্ষা পেলেন।আনন্দিত মনে তিনি আগ্রা যাত্রা করলেন।

টুণ্ডলা জংশন থেকে সকাল সাতটা পনেরো মিনিটে যাত্রা করে লক্ষ্মীনাথ আগ্রা ফোর্টে এলেন।সেখানে একটা হিন্দু হোটেলে উঠে স্নান করে খাওয়া দাওয়া করলেন।পরের দিন তাজমহল দেখতে বের হলেন।তাজমহল বিশ্বের সৌন্দর্য পিপাসুদের জন্য এক অনুপম স্থাপত্য।তাজমহল মানেই ঐশ্বর্য্যময় মানব হৃদয়ের এক অপূর্ব প্রেমগাথা। অপরূপ সৌন্দর্যের আকর তাজমহলের নয়নাভিরাম চৌহদে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের সম্রাট শা-জাহান এবং মমতাজের প্রেম কাহিনির কথা মনে পড়ল। তারপরে যতই স্থাপত্য শিল্পের কাছে গেল ততই প্রেমিক শা-জাহানের অন্তরের বিশালতা উপলব্ধি করতে লাগলেন ।লক্ষীনাথের তখন প্রজ্ঞার কথা মনে পড়ল। তিনি প্রজ্ঞার অনুপস্থিতিটা ভালোভাবে অনুভব করলেন। এরকম মনে হল যেন প্রজ্ঞা থাকলে তাজমহলের রূপ সৌন্দর্য আরও বেশি করে উপভোগ করতে পারতেন। দু'বছর আগে রবীন্দ্রনাথ শা-হজাহান লিখেছিলেন এই কবিতাটি প্রজ্ঞার খুব প্রিয়। প্রজ্ঞার মুখে কবিতাটা আবৃত্তি শুনে লক্ষ্মীনাথ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাজমহলের দিকে তাকিয়ে লক্ষীনাথের মনে প্রতিধ্বনিত হল প্রজ্ঞা আবৃত্তি করা শা-জাহান কবিতাটির শুরুর অংশটুকু,

' একথা জানিতে  তুমি ভারত ঈশ্বর শা-জাহান,

কাল স্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান।

শুধু তব অন্তর বেদনা 

চিরন্তন হয়ে থাক ,সম্রাটের ছিল এ সাধনা।

রাজশক্তি বজ্র সুকঠিন

সন্ধ্যারক্তরাগসম তন্দ্রাতলে হয় হোক লীন,

কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস

নিত্য- উচ্ছ্বসিত হয়ে সকরুণ করুক আকাশ,

এই তব মনে ছিল আশ।

হীরামুক্তামানিক্যের ঘটা

যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা

যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক,

শুধু থাক

এক বিন্দু নয়নের জল

কালের কপোল তলে শুভ্র সমুজ্জ্বল

এ তাজমহল।।'

অপরূপ এক ঐতিহাসিক কীর্তি তাজমহল দেখে রবীন্দ্রনাথ রচনা করা শা-জাহানের কাব্যিক ভাব স্মরণ করে লক্ষ্মীনাথের অন্তর ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল। তাজমহলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে অদ্ভুত এক ভাবের আলোড়ন উঠল। চারসীমায় সযত্নে লালিত ঘাসের উপরে বসল। তারপরেই তার মনে পড়ল অসমের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা। শা-জাহান কবিতাটির বিশাল মন্ডিত ভাব লক্ষীনাথের অন্তরকে ইন্দ্র বংশীয় আহোম সাম্রাজ্যের পতনের বেদনা ভারাক্রান্ত করল। সম্রাট শা-জাহানের মতোই প্রত্যেকেই জীবন যৌবন চিরন্তন হয়ে থাকাটা কামনা করে। কিন্তু থাকে না। তার জন্যই কবি কামনা করেছেন,

শুধু থাক

 এক বিন্দু নয়নের জল

কালের কপোল তলে শুভ্র সমুজ্জ্বল

এ তাজমহল।

লক্ষ্মীনাথের অন্তরে ব্যঞ্জনাময় সুরে অন্য এক সৃষ্টির জন্য মনটা তৈরি হয়ে উঠল। এত বছরে তিনি প্রহসন লিখেছেন,কৃপাবরী  সাহিত্য লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, জীবনী গ্রন্থ রচনা করেছেন, কবিতা লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, রূপকথা লিখেছেন… কিন্তু নাটক লেখেননি। অসমে 'হীরামুক্তামানিক্যের ঘটা, যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা' হয়ে আহোম রাজত্ব ঝলমল করছিল, সেই রাজত্বের কীভাবে পতন হল সেটাকে লক্ষ্মীনাথ এবার নাটকের বিষয় করে নেবে। এবার আর হালকা রসের প্রহসন নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গহীনভাবের নাটক রচনা করবেন।

মনে মনে এভাবে স্থির করে লক্ষ্মীনাথ তাজমহলের দৃষ্টিনন্দন বিশাল চারসীমা থেকে বেরিয়ে এলেন। বাইরে পথের পাশে দোকান পাট। এই সমস্ত দোকান থেকে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা পছন্দ অনুসারে আকর্ষণীয় জিনিস কিনছে। ভোলানাথ অরুণা- রত্না-দীপিকার জন্য খেলনার জিনিস কেনার টাকা দিয়েছিল। সে সমস্ত কিনতে গিয়ে তার প্রজ্ঞার কথা মনে পড়ল। প্রজ্ঞার জন্য সুন্দর একটা ভ্যানিটি ব্যাগ কিনবে বলে পছন্দ করলেন। কিন্তু ব্যাগটার দাম শুনে লক্ষীনাথের মনটা দমে গেল। হায়, এখন আর আগের মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই। এত টাকার বিনিময়ে ব্যাগটা কিনলে কলকাতায় যাওয়ার পথ-খরচ থাকবে না। অবশেষে তার চেয়ে  কম দামের ব‍্যাগ  এবং মেয়েদের জন্য খেলার জিনিস কিনে মার্চের এক তারিখ সকাল পাঁচটার সময় পাঞ্জাব মেইলে হাওড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেজ্যা

আর্থিক সংকট সৃষ্টিশীল ব্যক্তির সৃষ্টির ধারাকে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারেনা। উল্টো আর্থিক আশঙ্কার  থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য নিজের সৃষ্টি কর্মে স্রষ্টার মগ্ন- বিভোরতা বৃদ্ধি পায়। দ্রুতগামী পাঞ্জাব মেলের দ্বিতীয় শ্রেণির নির্ধারিত আসনে বসে লক্ষ্মীনাথের মন ও এখন নতুন সৃষ্টির পরিকল্পনায় মগ্ন। একটি বা দুটি নয়, তিনটি নাটক রচনা করবেন। আহোম রাজত্বকালের সুবর্ণময় যুগের রাজা  চক্রধ্বজ সিংহের প্রজাদের মঙ্গলকারী কর্মের এবং আক্রমণকারী মোগল সেনাপতি মানসিংকে হারিয়ে অসমিয়া জাতির স্বাধীনতা রক্ষা করা লাচিত বরফুকনের  বীর গাথাকে চিত্রিত করে লিখবেন 'চক্রধ্বজ সিংহ'। দ্বিতীয় নাটকটি হবে আহোম রাজা চুলিকফা (লরা রাজা) রাজার দিন লালুকসোলার  ষড়যন্ত্রের কাহিনিকে উপাদান করে ' জয়মতী কুঁয়রী'। আর তৃতীয়টি হবে – পূর্ণানন্দ ,বদনচন্দ্র, সৎরাম, চন্দ্রকান্ত সিংহ, পুরন্দর সিংহ আদি রাজকার্য এবং প্রজা পালন ভুলে গিয়ে রাজ পাটের অধিকার নিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রতিহিংসা চরিতার্থতার জন্য কুচক্রান্তের দ্বারা আহোম রাজাদের গৌরবময় রাজত্বকালে দুর্ভাগ্যজনক পরিসমাপ্তি ঘটানোর বিষয় নিয়ে 'বেলিমার'।

… এভাবে ভেবে, মনে মনে কেবল এইসব পরিকল্পনা করে লক্ষ্মীনাথ পরের দিন সাড়ে তিন ঘণ্টা দেরি করে হাওড়া পৌছালেন।স্টেশনে নেমেই দেখেন, তাকে নিয়ে যাবার জন্য বাড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে এসেছে রত্না- দীপিকা এবং ভোলানাথের কর্মচারী তরুণ। এতদিন পরে  রত্না দীপিকাকে  দেখেই লক্ষ্মীনাথের ভালো লেগে গেল। ওদেরকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন। তরুণ লক্ষীনাথের সুটকেস ব্যাগ নিয়ে স্টেশনের বাইরে রাখা গাড়িতে তুলে দিল।

কোচওয়ান লরেলসের সামনে গাড়ি রাখতেই গাড়ি থেকে নেমে তরুণ পকেট থেকে টাকা বের করে লক্ষ্মীনাথের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,' স্যার টাকাগুলি রাখুন।'

 লক্ষ্মীনাথ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,' কীীসের টাকা?'

' আপনাকে দেবার জন্য ভোলানাথ স‍্যার আমাকে তার করেছেন । আপনার দিল্লিতে যাওয়া আসার ট্রেভেলিং এক্সপেনসেস–।' 

'ট্রেভেলিং এক্সপেনসেস।'

' হ্যা স্যার ।নিন।'

দুর্ঘটনায় গুরুতর ভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকা ভোলানাথকে দেখতে দিল্লি গিয়েছিলেন। তার জন্য লক্ষ্মীনাথ নিজেই টিকিট কেটেছিলেন। ভোলানাথ লক্ষীনাথের আর্থিক সংকটের কথা জানতে পেরে কর্মচারীর মাধ্যমে এভাবে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। লক্ষ্মীনাথ অনুভব করলেন, টিকেটের টাকা ঘুরিয়ে নেওয়া উচিত হবে না। মানুষের আর্থিক অনটন উচিত অনুচিত বোধগুলি গৌণ করে ফেলে। নেওয়া উচিত নয় জেনেও লক্ষ্মীনাথ তরুণ এগিয়ে দেওয়া ৮০ টাকা হাতে নিলেন। আর্থিক সংকটটা সত্যিই তাকে উপায়হীন করে ফেলেছে।




   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...