রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪২ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪২

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।

   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।


প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(৪২)

ভেতরে প্রবেশ করার সময় লক্ষ্মীনাথ ভাবল,এখনই প্রজ্ঞাকে সম্বলপুরে যাবার কথাটা বলব না। এদিকে তাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই 'পাপা,পাপা' বলে ডেকে উৎসাহে রত্না-দীপিকা দৌড়ে এল। তিনি দীপিকাকে কোলে তুলে চুমু খেলেন, রত্নাকে বুকে টেনে নিয়ে আদর করলেন। মজার কথা বলে, মুখটাকে নানা ধরনে বিকৃত করে, পাখ- পাখালির আওয়াজ নকল করে ওদের হাসালেন। তারপরে প্রজ্ঞা যখন বিকেলের চা-জল খাবারের জন্য ডাইনিং টেবিলে ডাকল, তখন কথাটা না বলে আর থাকতে পারলেন না। আর কীভাবে এত বড়ো কথাটা স্ত্রীর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবেন?পরোটা,আলুর দম এবং মিষ্টি খেতে খেতে লক্ষ্মীনাথ কথাটা বলল। বার্ড কোম্পানির বড়ো সাহেব আইরন সাইড তার কাজে নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার স্বীকৃতি স্বরূপ পদোন্নতি দিয়ে তাকে উড়িষ্যার সম্বলপুরেরর কাছে নতুন করে নেওয়া জঙ্গল পরিদর্শনের দায়িত্ব দিয়েছেন। বেতন বৃদ্ধি করার সঙ্গে থাকার জন্য বাংলো, চাকর-বাকরের খরচ এবং গাড়ির খরচ দেবার বন্দোবস্ত করেছেন। পরিবারের সঙ্গে এখন সম্বলপুরে থেকে জঙ্গলের কাজকর্ম চালাতে হবে। বড়ো সাহেবের অনুরোধ এড়াতে না পেরে সম্বলপুরে যাবেন বলে তিনি কথা দিয়ে এসেছেন। 

সমস্ত কথা শুনে লক্ষ্মীনাথ আশঙ্কা করা অনুসারে প্রজ্ঞা দুঃখ মন–খারাপে ভেঙ্গে পড়ল না। কারণ, ঘর সংসারের প্রতিদিনের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণ করার জন্য বিগত এক বছর ধরে লক্ষ্মীনাথকে যে কী পরিমানের পরিশ্রম করতে হচ্ছে, প্রজ্ঞা দেখতে পাচ্ছেন। মাসে দুবার করে কোম্পানির কাজে বাইরে গিয়ে সাত দিনের মতো বাইরে থাকেন। বাড়িতে থাকলেও উদয় অস্ত পরিশ্রম করতে হয়। নিজের পড়াশোনা লেখালেখি ছাড়া'বাঁহী' সম্পাদনার কাজ, হাওড়া কোর্টে বসে মামলার নিষ্পত্তির সঙ্গে সভা-সমিতিতে যোগদান, বিকেল থেকে রাত এক প্রহর পর্যন্ত বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে সাহিত্য আলোচনা, তারপরে আত্মীয় কুটুমের সঙ্গে সামাজিকতা রক্ষা করা… সংবেদনশীলা প্রজ্ঞা স্বামীর কষ্ট বুঝতে পারেন। সম্বলপুরে যাওয়া নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলে যেতে অস্বীকার করলে আর্থিক সংকটে পড়া স্বামীর কষ্ট আরও বাড়বে। তাই কলকাতায় থাকতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ না করে তিনি হাসিমুখে সম্বলপুরে যাওয়াটাকে সমর্থন করলেন।

পত্নীর অনুকূল মতামত পেয়ে লক্ষ্মীনাথ নিশ্চিন্ত হলেন। কিন্তু সম্বলপুর যাবেন বললেই তো আর যাওয়া যায় না। কারণ, এখন তিনি একা নন। প্রজ্ঞা ছাড়া তিনটি কন্যা সন্তান। ওরা তিনজনই কলকাতার ডায়োসেশন স্কুলে পড়াশোনা করছে। ওদের পড়াশোনার যাতে ক্ষতি না হয়, এবং তার জন্য কলকাতায় ওদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। ২২ নম্বর রোজমেরির 'লরেলস' বাড়িটা বন্ধকে আছে,সেটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত,সম্বলপুরে গিয়ে থাকার জন্য একটা বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে হবে। কেবল বাসস্থানের বন্দোবস্ত করলেই হবে না নতুন বাসস্থানে থাকার সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার সুবিধা করতে পারা যাবে কিনা সে সমস্ত দেখে তবেই প্রজ্ঞা, অরুণা, রত্না- দীপিকাদের নিয়ে যেতে পারবেন। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাঁর ' কলজের এক টুকরো' বাঁহী'র প্রকাশনার কী হবে? আসলে 'লরেলস' ঘরটায় তাঁর পড়াশোনা করার ঘরটাই হল 'বাঁহী'র অফিস, সম্পাদনা কক্ষ এবং বিতরণ কেন্দ্র। তিনি সম্বলপুরে থাকতে শুরু করলে,'বাঁহী'র এই সমস্ত কাজ কীভাবে করবেন? সম্বলপুরে বদলি হওয়ার জন্য যদি 'বাঁহী' প্রকাশ না হয়, তাহলে সেটা হবে তার মৃত্যুর সমান।

এ সমস্ত কথা বিবেচনা করে ১৯১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর লক্ষীনাথ প্রথমে একাই সম্বলপুরে গিয়ে আগে থেকে পরিচিত বন্ধু সরকারি উকিল যোগেন্দ্রনাথ সেনের বাড়িতে অতিথি হলেন। মিস্টার সেন সদাশয় ব্যক্তি। তাঁর পরিচিত স্থানীয় একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে বাস করার উপযোগী 'মিশনারি হাউস' নামে একটি বাংলোৰ  বন্দোবস্ত করলেন। পড়ে পাশেই থাকা অন্য একটি বাড়িতে লক্ষ্মীনাথ স্থায়ীভাবে থাকবেন বলে স্থির করলেন। স্থায়ী  ভাবে থাকতে চাওয়া বাড়িটা উড়িষ্যার প্রধান নদী মহানদীর তীরে। অনেকটা জায়গা নিয়ে টোলের মধ্যে খড়ের চালায় নির্মিত বাড়ির পরিবেশটি মনোরম। তবে পরবর্তীকালে কিছু মেরামত করতে হবে। সেইসব করে নিলে থাকার জন্য ভালোই হবে এবং এই বাড়িটা প্রজ্ঞারও পছন্দ হবে বলে তার মনে বিশ্বাস জন্মাল।

বাসস্থানের ব্যবস্থা করার পরেই কোম্পানি নতুন করে নেওয়া জঙ্গলের কাজের জন্য লক্ষীনাথ তৎপর হয়ে পড়লেন। তিনি মাসিক চল্লিশ টাকা বেতনে সুশীল কুমার মিত্রকে কেরানি, মাসিক ১০ টাকা বেতনে কুবেরকে মুন্সি এবং মাসিক ৭ টাকা বেতনে দুজন চাপরাশি নিযুক্ত করলেন। তার দুইদিন পরে এক টাকা অগ্রিম দিয়ে স্টেটসম্যান কাগজ নেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাছাড়া নতুন পরিবেশে থাকার জন্য আরও কিছু জিনিসের প্রয়োজন হল।

খাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ঠিক করে বিহার এবং উড়িষ্যা সরকারের কাছ থেকে পাঁচ বছরের জন্য নেওয়া জঙ্গলের প্রাথমিক খবরা-খবর নেবার জন্য লক্ষীনাথ দুজন চাপরাশির সঙ্গে কুবের মুনশিকে পাঠালেন। এদিকে নিজের বাংলোর ঘরোয়া কাজকর্মের জন্য একজন চাপরাশিকে নিযুক্ত করলেন। তারপরে জঙ্গলের গাছ কেটে স্লিপার  তৈরির জন্য করাতিদের কাজে লাগিয়ে তিনি কলকাতায় এলেন।

কলকাতার হাওড়ার বাড়িতে এসে দেখলেন, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রজ্ঞা বিছানায়। পরের দিন রত্নার ও জ্বর হল। তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে বার্ড কোম্পানির অফিসে এসে সম্বলপুর জঙ্গলে আরম্ভ করা কাজের অগ্রগতির বিষয়ে সবিশেষ জানালেন। সবকিছু শুনে মিস্টার কাৰ্কপেট্রিক সম্বলপুরে অফিস করার জন্য এক হাজার টাকা দেওয়ার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের মাসিক বেতন আরও ৫০ টাকা বৃদ্ধি করলেন। অবশ্য বেতন বাড়িয়ে দেওয়াটা এমনিতে নয়। কোম্পানি সম্বলপুরে থাকা গ্রাফাইটের কাজ দেখাশোনা করার দায়িত্বটাও লক্ষ্মীনাথের ওপরে চাপিয়ে দিল।

প্রজ্ঞা এবং রত্না সুস্থ হওয়া পর্যন্ত হাওড়া বাড়িতে থেকে লক্ষীনাথ রত্নাকে নিয়ে সম্বলপুরে এলেন। নতুন বাড়িতে রান্নাবান্না করে খাওয়ার অসুবিধা। তার জন্য নয় টাকা মাসিক বেতনে একজন রাঁধুনি ঠিক করলেন।

এতগুলি  বন্দোবস্ত করার পরেও লক্ষ্মীনাথ সুস্থির হতে পারলেন না। কিছু কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো, বাজার-টাজার করা, কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জানার জন্য বা কাজ সম্পর্কে করাতি বা শ্রমিককে নির্দেশ দেওয়ার জন্য ঘন ঘন জঙ্গলে যেতে হয়। তার জন্য একটা বাহনের প্রয়োজন। কিন্তু কলকাতার মতো সম্বলপুরে ঘোড়া গাড়ির এত প্রচলন হয়নি। সম্বলপুরে বাহন হল টাঙ্গা।

টাঙ্গা হল বলদ এবং একজোড়া গরুতে টানা গাড়ি। বলদ গরু ভালো হলে টাঙ্গা ঘোড়ার গাড়িকেও হারিয়ে যেতে পারে। এমনিতেও পাহাড়ি জায়গায় ঘোড়া গাড়ির চেয়ে টাঙ্গা বেশি কার্যকর। পাথুরে পথে ঘোড়া দ্রুত খোঁড়া হয়, কিন্তু বলদ গরুর ক্ষেত্রে এই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয় না। কিন্তু উড়িয়া টাঙাওয়ালাদের কথার কোনো দাম নেই। কথা দিয়েও কথার রক্ষা না করার জন্য লক্ষীনাথ কয়েকবার অসুবিধায় পড়েছে। তার জন্যই রাগ করে ৩০০ টাকার বিনিময়ে তিনি টাঙ্গা কিনে ফেললেন।

১৯১৭ সনের অক্টোবর মাস থেকে মেঘপাল নামের জায়গার কাছে থাকা একটা জঙ্গলে কাজ আরম্ভ হল। সম্বলপুর থেকে মেঘপালের দূরত্ব ত্ৰিশ  মাইল। জঙ্গলটার নাম পৰ্চলিখনম। বড়ো জঙ্গল। গাছ কেটে করাতিয়ারা শ্লিপার তৈরি করে গরুর গাড়িতে সেইসব শ্লিপার বহন করে সম্বলপুরের রেলস্টেশনের কাঠের ডিপোতে পাঠিয়ে রেলের ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে'পাস' করোনাটাই প্রধান কাজ। শুনতে খুব সহজ মনে হলেও এটা আসলে বর্ষাকালে ভরা ব্রহ্মপুত্রকে ডিঙি নৌকা নিয়ে পাড়ি দেওয়ার মতো প্রাণান্তকর। একদিন দুদিন নয়। কয়েক দিন ধরে লেগে থেকে রেলের ইঞ্জিনিয়ার এবং মুহুরিকে খিদমত করতে হয়। কিন্তু আশেপাশে থাকা খাওয়ার কোনো সুবিধা নেই। অবশেষে লক্ষ্মীনাথ বার্ড কোম্পানির বড়ো সাহেবকে অসুবিধা গুলি বুঝিয়ে বললেন। এদিকে জঙ্গলের বিবরণ শুনে তার মনে শিকার করার বাসনা জাগল। জঙ্গলের কাজ দেখার জন্য এসে সেই সুযোগে শিকার করা শুরু করে এই বাংলোয় তিনি দু চার দিন থাকতে পারবেন বলে বলায় সাহেব খুশি হলেন। এভাবে বড়ো সাহেবের অনুমোদন আদায় করে লক্ষ্মীনাথ মেঘপালে অন্তত তিন বছর থাকতে পারার মতো একটা বাংলো সাজিয়ে নিলেন।

এখন, সম্বলপুরে লক্ষ্মীনাথের কাজ প্রধানত জঙ্গলে। দিনের পর দিন জঙ্গলে থাকতে হবে। সাধারণ জঙ্গল নয়। একেবারে গভীর অরণ্য। এই অরণ্য, বাঘ ভালুক  শুয়োরের বিচরণ স্থল। রাতে তো কথাই নেই, দিনের আলোতেও এইসব হিংস্র জানোয়াৰৰা স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়। তাই এই ধরনের বিপদ সংকুল অরণ্যে আত্মরক্ষার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র নেওয়াটা শাস্ত্ৰ সম্মত। লক্ষ্মীনাথ একটা দুনলীয়া বন্দুক এবং ৪০৫ উইনচেস্টের রাইফেল কিনে নিয়ে বন্দুক চালানোর কলা-কৌশল শিখে নিল।

অবশ্য এর আগে হাওড়া ডবসন  রোডে থাকার সময় লক্ষ্মীনাথ একটা একনলীয়া বন্দুক কিনেছিলেন। সেটা আত্মরক্ষা অথবা জন্তু-জানোয়ার শিকার করার জন্য নয়। বন্দুকটা কিনেছিলেন চৌৰ্যকর্মে লিপ্ত হওয়া বাড়ির চাকরদের ভীতি প্রদর্শন করার জন্য।

ঘটনাটা বড়ো আমোদজনক।

ভায়রাভাই  ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরীর আমন্ত্রণ ক্রমে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাল্মিকী প্রতিভা মঞ্চস্থ করার জন্য লক্ষ্মীনাথ নাটকটির প্রধান চরিত্র প্রথম দস্যুর ভূমিকায় অভিনয় করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কন্যা অরুনা নিয়েছিল সরস্বতীর ভূমিকা। নাটকটির আখড়া করার জন্য লক্ষ্মীনাথ প্রতিদিন বিকেল বেলা সপরিবারে হাওড়া থেকে বালিগঞ্জে যেতেন। বাড়িতে চাকর কয়েকজনকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে বেরিয়ে যেতেন এবং বাড়ি ফিরতে রাত সাড়ে নটা দশটা বাজত। বিকেলে তিন চার ঘণ্টা সময় খোলা বাড়ি  চাকর বাকরদের মাথায় চৌৰ্য প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।

প্রথম কয়েক দিন লক্ষ্মীনাথ ওদের ষড়যন্ত্র বুঝতে পারলেন না। তারপরে যখন ওদের দৌরাত্ম তো বেড়ে গেল সচেতন হলেন। কাপড়ের আলমারির কাপড়গুলিকে কে উলটপালট করেছে, অলংকারের বাক্স থেকে অলংকার রূপবান কোথায় গেল— এই সমস্ত কথায় লক্ষ্মীনাথ-প্রজ্ঞা যখন নজর দিলেন তখন নিজেদের নির্দোষিতা প্রমাণ করার জন্য চাকরের দল বাইরে থেকে আসা চোরের ওপর দোষ চাপিয়ে দিল। চোর ধরার জন্য লক্ষ্মীনাথ পুলিশ ডেকে আনলেন। পুলিশ ওদের দুই একজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে থানায় নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু কোমল হৃদয়ের লক্ষ্মীনাথ নিজের চাকরের ওপরে পুলিশের অত্যাচারের কথা ভেবে বাধা দিলেন। তার মতিগতি দেখে পুলিশ বিরক্ত হয়ে চলে গেল। ফলে ষড়যন্ত্রকারী চোর কুলের জয় হল এবং তার পরেও নতুন নতুন পদ্ধতিতে বাড়ির জিনিসগুলি চুরি হতে লাগল।

একদিন দুদিন নয়। দীর্ঘ একমাস ধরে এটা চলতে লাগল। অবশেষে বন্ধু বান্ধবের পরামর্শ অনুসরণ করে লক্ষ্মীনাথ একটা বন্দুক কিনে আনলেন। সেই বন্দুকটা চোরকে গুলি করে মারার জন্য নয় ভয় দেখানোর জন্য। বন্দুক দেখে সত্যি সত্যি তারা প্রথমে ভয় পেল এবং ভয়ে ভয়ে বন্দুকধারী মালিকের আচরণ দেখতে লাগল। দুদিন পরে ধুরন্ধর ভৃত্য মণ্ডলী বুঝতে পারল যে হরিণের মাথার প্রকাণ্ড শিং যেরকম, ওদের মালিকের হাতে বিভীষণ বন্দুকটাও সেরকম।

অর্থাৎ বন্দুকের মতো একটি মারনাস্ত্র ব্যবহার করার জন্য বিশেষ মুহূর্তে যতখানি কঠোর বা নির্মম হওয়া প্রয়োজন, লক্ষ্মীনাথের সেটা নেই।এহেন লক্ষ্মীনাথ কীভাবে ওদের গুলি করবে?

এমনিতেও লক্ষ্মীনাথ জীবহত্যা এবং জীবের প্রতি নিষ্ঠুরতা সহ্য করতে পারতেন না। এমনকি রান্না করার জন্য আনা জীবন্ত কৈ মাছ, মাগুর মাছ, গরৈ মাছ আছড়ে মারাটাও তিনি দেখতে পারতেন না। মায়ের বকুনি খেয়েও সেই সমস্ত জীবন্ত মাছ পুকুরে ছেড়ে দিতেন। হাঁস, পায়রা, ছাগলী মারার কথা শোনা ছাড়া কখনও চোখে দেখেন নি। কারণ, তাঁরা হলেন মহাপুরুষীয়া মানুষ। সেইসব ভক্ষণ করা তাদের কাছে ছিল নিষিদ্ধ এবং যারা খায়, তাদের মনে মনে ঘৃণা করতেন। বৈবাহিক সূত্রে শাক্ত বংশের পরিবারের মেয়ে তাদের বাড়িতে এলে সেরকম বধুকে 'ছাগলী খাওয়া ঘরের’ বলে বাক্য বাণে প্রহার করতেন। এরকম সাত্ত্বিক মহাপুরুষীয়া পরিবারের সন্তান লক্ষ্মীনাথ হাতে বন্দুক নিয়ে গুলি করে জীব হত্যা করে তার মাংস ভক্ষণ করবেন?

কিন্তু অফুরন্ত প্রাণশক্তির আধার লক্ষ্মীনাথকে মহাপুরুষীয়া বৈষ্ণব নীতি-নিষ্ঠা বেঁধে রাখতে পারল না। কলকাতা থাকার সময় সাংসারিক, বৈষয়ি্‌ক, সামাজি্‌ক, সাংস্কৃতিক ব্যস্ততার মধ্যেও মনোরঞ্জনের জন্য তিনি ইন্ডিয়া ক্লাবে গিয়ে বিলিয়ার্ড খেলতেন, লন টেনিস খেলতেন, বৌদ্ধিক পরিতৃপ্তির জন্য কলকাতার বৌদ্ধিক সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রায়ই আলোচনা করতেন। টাউনহল বা অন্যান্য স্থানে ধর্ম সাহিত্য- দর্শনের কোনো বক্তৃতা হলে শুনতেন। তাছাড়া কলকাতার স্টা্‌র, জুবিলী থিয়েটার হলে নতুন নাটক উপভোগ করা ছিল তার জন্য নেশার মতো। সম্বলপুরে আসার পরে সেই সব থেকে বঞ্চিত হলেন। তাই নতুন পরিবেশে বিনোদনের উপায় রূপে তার মনে শিকার করার রাজসিক চেতনা জেগে উঠল। এভাবে লক্ষ্মীনাথ এক পা দু পা করে মৃগয়া নামক ব্যসনে আসক্ত হয়ে পড়লেন। নিরীহ পাখ-পাখালি থেকে শিকারের যাত্রা আরম্ভ হল। তাই একসময়ের জীব হত্যা বিরাগী লক্ষ্মীনাথ জীব হত্যানুরাগী হওয়ার দিকে পদক্ষেপ বাড়ালেন।

সম্বলপুরের জঙ্গলের বড়ো গাছ এবং মহুয়া গাছে দলেদলে হাইঠা পড়ে।বিশেষ করে বড়োগাছের ফল পাকলে এবং মহুয়া ফুল ফুটলে হাইঠা বেশি করে পড়ে।ওপরের দিকে বন্দুকের গুলি ছুঁড়লেই পটাপট গোটা পাঁচেক হাইঠা নিচে খসে পড়ে।হাইঠা খেতে ভালো।তারপরে শীতকালে হিমালয় থেকে অনেক প্রজাতির রাজহাঁস এসে মহানদী এবং মহানদীর পারের বিল ,বন্ধ পুকুর ইত্যাদিতে পড়ে।ধিতরাজ,লালমুণ্ডি,হুইচ,লিংটিল,চাকৈচকোৱা,ঘিলাহাঁস,ডাহুক,কোড়া,কাম চড়াই ইত্যাদি কোলাহল করে।ওরা জলচর জন্তু,মাছ,শামুকের সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ, পদ্ম,ভেট,শালুক,দলঘাস ইত্যাদি ভক্ষণ করে।লক্ষ্মীনাথ সেই সবও শিকার করতে লাগলেন।অবশ্য রন্ধন পটীয়সী গৃহকর্তৃী প্রজ্ঞাসুন্দরীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরে শিকার করা জীবের রসনাযুক্ত ভোজনের আনন্দ অথবা নিরানন্দ ঘটে।আসলে,প্রজ্ঞাও এই ধরনের নিরীহ জীবহত্যা ভালোবাসেন না।কিন্তু চাকর-বাকরদের এই ধরনের জীবের মাংস ভক্ষণের প্রবল আগ্রহ দেখে লক্ষ্মীনাথ উৎসাহিত হয়ে উঠেন।তখন পত্নীর বাধা নিষেধে ভ্রূক্ষেপ না করে উৎসাহী চাকরদের সঙ্গে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ শিকার করার জন্য বেরোতে লাগলেন।এভাবে অচিরেই তিনি একজন বিখ্যাত শিকারি হয়ে উঠলেন।

জঙ্গলের কাজ দেখার জন্য মাসে তিন-চারবার করে লক্ষ্মীনাথকে সম্বলপুর থেকে মেঘপালে যেতে হয়।কাজ-কর্ম বুঝে নেবার জন্য মেঘপালের বাংলোয় দুই-চারদিন,কখনও এক সপ্তাহ থাকতে হয়।মেয়ে তিনটি কলকাতায় থাকলে প্রজ্ঞা একা থাকে।তখন প্রজ্ঞা লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে্ মেঘপালে যেতে চান।এমনিতে ছুটিতে বাড়িতে এসে অরুণা,রত্না এবং দীপিকা জঙ্গলে কীধরনের জন্তু-জানোয়ার ঘুরে বেড়ায় দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে পড়ল।ওদের আগ্রহ-ইচ্ছা পূরণ করার জন্য লক্ষ্মীনাথ পরিবারের সঙ্গে্ মেঘপালের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।অরুণা-রত্নার জন্য ছোটো টাটু ঘোড়া একজন কিনে দিলেন।ওদের দুজনকেই টাটু ঘোড়ায় উঠিয়ে দিয়ে প্রজ্ঞা এবং দীপিকাকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ টাঙ্গায় উঠে মেঘপালে এলেন।

গরমের দিন।মেঘপালের বাংলোর বাইরের উঁচু বারান্দায় বসে মেয়ে তিনজন এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে বসে লক্ষ্মীনাথ বিকেলের চা খাচ্ছেন।এমন সময় একটা মানুষ এসে খবর দিলেন যে কাছেই একটা খালে একটা ভালুক জল খাচ্ছে। দুপায়া জন্তু শিকার করে হাত পাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের মনের মধ্যে ইতিমধ্যে চারপেয়ে জন্তু শিকার করার আগ্রহ জেগে উঠেছে।তিনি খপ করে কাছেই রাখা বন্দুকটা হাতে নিয়ে ভালুক মারার জন্য উঠলেন।

সঙ্গে সঙ্গে গৃহিনী প্রজ্ঞা এবং দুই কন্যারত্ন অরুণা-রত্না লক্ষ্মীনাথকে জড়িয়ে ধরল, ‘না,তুমি যাবে না।’

‘কেন,কেন যাব না?’

‘ভালুক ভয়ঙ্কর জানোয়ার।’প্রজ্ঞা বলল, ‘কোন মুহূর্তে কী হয়ে যায় ঠিক নেই।’

বন্দুক থাকলেও তুমি একা। তাছাড়া গুলি সঠিকভাবে না লাগলে বিপদ ঘটতে পারে। হিংস্র ভালুক আক্রমণ করে তোমাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলবে।

পত্নীর এই সাবধান বাণী, উৎসাহী শিকারী, লক্ষ্মীনাথের পুরুষত্বে আঘাত হানল কিন্তু দুই কন্যা অরুনা এবং রত্নার কোমল মুখ দুটির দিকে তাকিয়ে তিনি শান্ত হতে বাধ্য হলেন।

  আরেকদিন সন্ধের সময় লক্ষ্মীনাথ পরিবারের সঙ্গে মেঘপালের বাংলোতে বসে থাকার সময় চেঁচামেচি এবং ভাঙ্গা টিন বাজাতে শুনলেন। সঙ্গে কিছু মানুষকে হাতে খড়ের মশাল নিয়ে দৌড়াতে দেখা গেল। ঘটনাটা কী খবর নিয়ে জানতে পারলেন যে একটা বন্য হাতি কাছেই ধানক্ষেতের ভেতরে ঢুকে ধান খেতে শুরু করেছে।সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকটা নিয়ে লক্ষীনাথ সেদিকে দৌড়ে যেতে চাইতেই পুনরায় সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। প্রিয়তমা পত্নী প্রজ্ঞাসুন্দরী এবং স্নেহময়ী কন্যা অরুণা রত্নার হাতে তিনি বন্দি হয়ে পড়লেন অর্থাৎ পত্নী কন্যার স্নেহ ভালবাসার বাঁধন অস্বীকার করে লক্ষ্মীনাথ চারপেয়ে জানোয়ার শিকার করতে যেতে পারলেন না।

  এটা যে কেবল পত্নী এবং কন্যা দুজনের ভালোবাসার বাঁধন তাই নয় আসলে এখনও লক্ষীনাথ সম্পূর্ণভাবে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। হিংস্র জন্তু-জানোয়ার শিকার করার জন্য যে সাহস এবং গুলি করে বধ করার মুহূর্তে যতখানি নির্মম হওয়া প্রয়োজন এতদিন চেষ্টা করেও সেটা তিনি অর্জন করতে পারেন নি। শিকার করে মাংস ভক্ষণ করলেও এখনও জীবের রক্তাক্ত শরীর দেখলে প্রবল যন্ত্রণাবোধ হয়। তাই তিনি এখনও চার পায়ে জন্তুর ওপরে গুলি চালাতে সাহস অর্জন করতে পারেন নি। কিন্তু চারপেয়ে জন্তুর শিকার না করা পর্যন্ত লক্ষ্মীনাথ শিকারি হিসেবে জাতে উঠতে পারবেন না।

 সকালবেলা আটটা বাজে। মেঘপালের বাংলো থেকে টাঙ্গায় উঠে লক্ষ্মীনাথ একা সম্বলপুরের দিকে যাত্রা করছেন। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ। গভীর জঙ্গলের জন্য সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। এই সময়ে জন্তু জানোয়ার অবাধে বিচরণ করে বেড়ায়। এদিকে হিংস্র বাঘ ভালুকও দেখতে পাওয়া যায়। তাই আত্মরক্ষার জন্য লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দুনলীয়া বন্দুকটা থাকেই।

 কিছুদূর এগিয়ে যাবার পরে লক্ষীনাথ দেখলেন তার সামনে দিয়ে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশে প্রকাণ্ড শিং থাকা ফুটফুটে হরিণ যাচ্ছে এবং তার পেছনে পেছন যাচ্ছে পাঁচটি স্ত্রী হরিণ। বন্য জীব জঙ্গলের সবুজ পরিবেশে সবসময় সুন্দর। সত্যি কী অপরূপ দৃশ্য। নিবিড় বনের শান্ত পরিবেশে পুরুষ হরিণটির সঙ্গে পাঁচটি স্ত্রী হরিণের স্বচ্ছন্দ বিচরণের বিরল দৃশ্য দেখে লক্ষ্মীনাথের বড়ো ভালো লাগল। তিনি টাঙ্গা চালককে ধীরে ধীরে চালাতে বলে পরম তৃপ্তির সঙ্গে নয়নাভিরাম সেই দৃশ্যটি দেখতে লাগলেন।

 কিন্তু টাঙ্গার বলদ এবং গরু তাড়ানো যুবকটি নিজের বিবেচনা অনুসরণ করে টাঙ্গা রাখল। তারপরে লক্ষ্মীনাথের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন—হুজুর এটা চিতল। মারুন, মারুন।

 লক্ষ্মীনাথের মনে শিকারের বাসনা জেগে উঠল।তাঁর বসা সিটের কাছে রাখা বন্দুকটা নিয়ে ধীরে ধীরে টাঙ্গা থেকে নেমে এলেন।পুরুষ হরিণের দিকে বন্দুকের নিশানা করে একঝাঁক গুলিতে তাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেওয়ার কথা ভাবলেন। কিন্তু হরিণ গুলি বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে অবাক চোখে লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে রইল। আর তাদের চোখ গুলিতে সেই একই অকপট ভাব। জঙ্গলে বাস করা জানোয়ার যদিও ওদের চোখে মুখে স্বর্গীয় পবিত্রতা। তার চেয়ে আশ্চর্যের কথা বন্দুকের নিশানা করে দাঁড়ান শিকারি লক্ষ্মীনাথকে দেখেও তারা তাকে শত্রু বলে ভাবেনি অথবা জঙ্গলের প্রশান্তময় এই অঞ্চলে লক্ষ্মীনাথের এই সহিংস মূর্তি দেখে হরিণ পরিবারটি অবাক হয়ে গিয়েছে। 

শিং থাকা পুরুষ হরিণটার দিকে বন্দুক নিশানা করে আছে যদিও লক্ষীনাথের মনে তখন এক অদ্ভুত সামাজিক তত্ত্বের উদয় হল। এটা তিনি কী করতে চলেছেন? পুরুষ হরিণটা বহুবিবাহকারী। তিনি যদি তাকে গুলি করে হত্যা করেন তাহলে তার পাঁচটি স্ত্রী অকালে বৈধব্য গ্রহণ করে অনাথ হবে। ভারত থেকে এখনও বহুবিবাহ প্রথা উচ্ছেদ হয়নি। তাই এই পুরুষ হরিণটি কোনো অনৈতিক কাজ করেনি। ক্ষণিকের উত্তেজনা এবং সুখের জন্য এই ধরনের পাপকার্যে লিপ্ত হওয়াটা উচিত হবে কি?

 কিন্তু লক্ষীনাথ তখনও ভাবছেন স্বামীর অবর্তমানে অনাথা অবলা স্ত্রী পশুদের কী হবে? তার জন্যই তিনি বন্দুকের ট্রিগার টিপে গুলি চালাতে পারছেন না।

 ইতিমধ্যে শিং থাকা হরিণটির সম্ভবত বাস্তব চেতনা জেগে উঠল। সে বুঝতে পারল বিপদ সমাগত। তার জন্যই বাল্লালি বালাই কৌ্লীন্য প্রথার সমর্থক হরিণটি এক লাফে জঙ্গলে প্রবেশ করল। তার সঙ্গে তার পাঁচ জন স্ত্রী তখনই স্বামীকে অনুগমন করল।

‘ হুজুর এ আপনে কেয়া কিয়া? প্রচন্ড হতাশা এবং বিরক্তির সঙ্গে টাঙ্গাচালক বলল, ‘এইসা মৌকা ফির কাহা মিলেগা? ফায়ার না করকে আপনি ইতনা আচ্ছা মৌকা জানে দিয়া।’

 ইতিমধ্যে লক্ষীনাথের মন থেকে সামাজিক তত্ত্বের ভূতটি বিদায় নিয়েছে। নিজেকে ফিরে পাওয়ার পরেই তার মুখে গ্লানিময় যন্ত্রণা ভরে উঠল। তারপরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তিনি টাঙ্গাচালক যুবকটির দিকে তাকাতে পারলেন না।


       

    


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...