শুক্রবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৪৮ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das

হে আমার স্বদেশ- ৪৮

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudev Das



  লেখক পরিচিতি--এ সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


(৪৮)

" দাদু, আপনার জামাইয়ের ভাগ্যটা সত্যিই ভালো। অরুণার জামাই সত্যব্রত মুখার্জি অক্সফোর্ডের এম এ,এফ আর এ এস, এফ আর এস এস। বরোদা রাজ্যের ইলেকশন কমিশনার হয়ে চাকরিতে যোগদান করে নিজের কর্ম গুণে রাজ্যরত্ন উপাধি লাভ করেছে। এখন সত্যব্রত রাজ্যের ফাইনান্স ডিপার্টমেন্টে রয়েছে। এদিকে মেজ জামাই রোহিণী কুমার বরুয়া এডিন বরার এমএ, বাড়ি ডিব্রুগড়ে। পৈতৃক আমল থেকে তারা চা ব্যাবসায়ী। তবে অরুণাকে বিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি থেকে। রত্নার বিয়েটা যে সম্বলপুর থেকে দিলেন—?"

' এত বছর সম্বলপুরে বসবাস করে আমার একটা সোসাইটি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন সরকারি অফিসের অফিসার ছাড়াও সম্বলপুরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। এর সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির সঙ্গে জড়িত হওয়ার ফলে সম্বলপুর মিউনিসিপ্যালিটিতে সরকারের দ্বারা মনোনীত সদস্য হিসেবে কাজ করছি। এভাবেও পরিচিতি বেড়েছে। এদের বাদ দিয়ে বিয়েটা কলকাতায় আয়োজন করতে খারাপ লাগল। তাই বিয়েটার আয়োজন সম্বলপুরে করলাম।'

' রত্নার বিয়েটা অসমে আয়োজনের কথা ভেবেছিলেন—।'

' ভেবেছিলাম। বিয়েটা অসমে হলে আমাদের পরিবারের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে আশা করেছিলাম। তবে জানইত জ্ঞান, আমাদের সমাজ এখন ও পেছনে পড়ে আছে। অন্ধ সংস্কার-কুসংস্কার গুলি তাদের উদার হতে দেয়নি।। আত্মীয়দের একটা দলের কাছে আমি এখনও স্বধর্ম ত্যাগী, ম্লেচ্ছ ব্রাহ্ম। সাহিত্য লিখে নাম যশ হলেও এখনও তারা আমার বদনাম করে। এখনও তারা বলে থাকে, তোমার দিদিমণিকে বিয়ে করার জন্যই নাকি আমি ব্রাহ্ম হয়েছিলাম। আমি নাকি প্রজ্ঞা সুন্দরীর আঁচল ধরা, স্ত্রীর বশীভূত। প্রজ্ঞাসুন্দরীর রূপ যৌবনে এতই বিবশ যে তার সামনে আমার মুখে অসমিয়া কথা ফোটে না। এমনিতেই তারা আমার বদনাম করার সুযোগ ছাড়ে না। এমতাবস্থায় রত্নার বিয়ে অসমে আয়োজন করলে আত্মীয়রা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করেই আমি সেই চিন্তাটা বাদ দিয়েছি। যাই হোক না কেন, ডিব্রুগড় থেকে রোহিণীদের ১৫ জন বরযাত্রী সম্বলপুরে গিয়েছিল। জোড়া সাঁকো থেকে ঋতেনদা এবং গুয়াহাটি থেকে মাজিউ ও ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিল। অরুণার বিয়ের মতো এতটা জাঁকজমক না হলেও রত্নার বিয়েটা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। তারপরে জামাই পাওয়ার ভাগ্যের কথা বললে— হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ বিশেষ কোনো পণ্যের বলে এত ভালো জামাই পেয়েছি। সত্যিই সত্যব্রত, রোহিনী দুজনেই আমার কাছে দুটি রত্ন। ওরা বলে থাকে কাঠের ব্যাবসা ছেড়ে আমি ওদের সঙ্গে থাকা উচিত তবে জামাইরা যাই বলুক না কেন, মেয়ের বাড়িতে গিয়ে মাসের পর মাস ধরে থাকাটা—-।'

' তাতে কী হয়েছে? মেয়েদের শিক্ষিত এবং সংস্কৃতিবান করে তোলার জন্যই এই ধরনের উচ্চ শিক্ষিত ধনী জামাই পেয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে আপনাকে দেখাশোনা করাটা জামাইদের কর্তব্য।'

' ভবিষ্যতে কী হবে বলতে পারিনা। বার্ড কোম্পানি থেকে রিজাইন দেওয়ার পরে যে ব্যাবসা করতে শুরু করেছি, সেটা খুব একটা জমছে না। গত বছরের আগের বছর ঝাড়চোগোড়ার মাটি এবং সম্বলপুরের বাড়িটার কাগজপত্র জমা দিয়ে শতকরা ৯% সুদে পিসিকুমারের কাছ থেকে পাঁচ হাজাৰ  টাকা লোন নিয়েছিলাম ।লোনের টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। এদিকে আমার শরীরের ব্যালেন্স নাই হয়ে গেছে।টানাহেঁচড়া করে দেহটাকে লাইনে রেখে কোনো মতে চলছি।

' হ্যাঁ আপনি রোগা হয়ে গেছেন।'

'রোগা হয়েছি মানে অর্ধেক হয়ে গেছি। মার্চ মাস থেকে এরকম মনে হচ্ছিল যেন আমার ভেতরটা ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে রোহিণীবাপু গত মে মাসে আমাকে কলকাতায় নিয়ে এসেছে। আমাকে থার্টি ফোর বাই ওয়ান বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। এই ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুসারে মে মাসের পাঁচ  তারিখ থেকে পনেরো তারিখ পর্যন্ত কলকাতায় থেকে একদিন পরপর সাতটা ইঞ্জেকশন নিয়েছি।'

' এখন কীরকম আছেন?'

' আগের চেয়ে ভালো আছি। তবে নিজেকে আগের মতো সাউন্ড বলে মনে হচ্ছে না।'

' দাদু, আপনার রেস্ট দরকার। একনাগারে অন্তত এক মাসের জন্য আপনি রেস্ট নিন। ব্যাবসা ছেড়ে লেখালেখি ছেড়ে আপনি রেস্ট নিতে পারবেন না। এদিকে আপনার কলজের এক টুকরো 'বাঁহী' সম্পাদনা না করলেও সেটা প্রকাশ করা পর্যন্ত আপনাকে চিন্তাভাবনা করতে হয়। আপনি অমিয়কুমার দাসকে সম্পাদক করলেন। কম বয়সী অনভিজ্ঞ অমিয় দাস কীভাবে 'বাঁহী'র সম্পাদনা করবে বলুন তো?'

' দেখ জ্ঞান, ১৯২৯ সন থেকে সম্বলপুরে থেকে'বাঁহী'র সম্পাদনা ,প্রকাশ ,বিতরণ—- এই সবকটি দিক সামলানো আমার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছিল। এই বিষয়ে যদু বাপু এবং মাজিউর সঙ্গে কথা হল। এদিকে উৎসাহী লেখক অমিয়কুমার দাস নিজেই 'বাঁহী' প্রকাশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সেই কাজে জোর দিল বাণীকান্ত কাকতি। আমি তখন যদুবাবুকে চিঠি লিখলাম, কাকতির চিঠি পেলাম ,তোমারও চিঠি পেলাম। দু দিক থেকে দুজন যুবক অধিকারের তাপে বুড়ো অধিকার তখন নাজেহাল। তোমরা দুজনে যা ভালো দেখছ তাই কর। আমার অমতের কোনো কারণ নেই। কেবল মনে রাখবে —-'বাঁহী' আমার মানসপ্রতিমা, অযত্ন হলে আমি খুব কষ্ট পাব।'

তারপর থেকে অমিয়ের সম্পাদনায় 'বাঁহী' গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত হয়ে চলেছে।'

' পেয়েছি ,কিন্তু সম্পাদনার মান আপনার থেকে নিচু হয়ে গেছে।'

' হবে। ধীরে ধীরে ভালো হবে। অমিয়ের আগ্রহ আছে। তাছাড়া তার সঙ্গে আমাদের বিরহী কবি যতীন্দ্রনাথ মানে আমার আদরের যদু বাপু লেগে আছে। সঙ্গে আছে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যকে গার্ড দিয়ে চালিয়ে নিতে পারা প্রতিভাবান বাণীকান্ত কাকতি। আমার বিশ্বাস এক বছরের ভেতরে'বাঁহী' পুনরায় আগের মতো হয়ে উঠবে।'

' তবে দাদু,ক্রিয়েটিভ রাইটিং বাদ দিয়ে আপনি যে এখন কেবল ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন?'

' এই বিষয়ে'বাঁহী'র কিছু পাঠকও প্রশ্ন তুলেছেন। আমি নাকি 'বাঁহী'কে ধর্মীয় আলোচনায় রূপান্তরিত করার প্ৰয়াস করছি। তবে জ্ঞান, কবিতা- গল্প- উপন্যাস ,শিশু সাহিত্য, নাটক ,প্রহসন ,কৃপাবরী রম্য রচনা, জীবনী লিখেছি। তারপরে শংকরদেব মাধবদেবের জীবনচরিত লিখতে গিয়ে দেখলাম, আমাদের ভাগবত সাহিত্যে ধর্ম জ্ঞানের ঐশ্বর্যময় একটা ভান্ডার থেকে গেছে। এটা আমাদের সর্বসাধারণ মানুষের গোচরে আনার জন্য আমি আমার সাধ্য অনুসারে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।'

' আপনার এইসব তত্ত্বকথা পড়ে এরকম মনে হয় যেন আপনি ভাগবতের নীতি আদর্শ অনুসরণ করে বৈষ্ণব। সম্ভবত তার জন্যই আপনি প্রত্যেক বছর বাড়িতে নাম কীর্তনের আসর পাতেন। কিন্তু দিদিমণি যখন ব্রাহ্ম উপাসনার আয়োজন করেন, তখন ও আপনি বড়ো মনোযোগের সঙ্গে ব্ৰাহ্মগীত শ্রবণ করেন।'

' ব্রাহ্ম গীত শুনতে ভালোবাসি বলে তুমি ও আমাকে ব্রাহ্ম বলে ভাব নাকি?'

' আমি নিজে ব্রাহ্ম হয়ে আপনাকে এভাবে ভাবতে আমার ভালোই লাগবে। কিন্তু এই কথায় আপনার আসল স্থিতিটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।

' অস্পষ্ট বা বোঝার কোনো অসুবিধা নেই। আসলে আমি দেখলাম বৈষ্ণব এবং ব্রাহ্ম একটা বিন্দুতে গিয়ে এক হয়ে যায়। ব্রাহ্মরা সোজাসুজি ব্রহ্মের সাধনা করে। বৈষ্ণব ভক্তরা গোবিন্দ মহাপ্রভুর মাধ্যমে ব্রহ্মকে পাওয়ার জন্য নাম- কীর্তন সাধন- ভজন করে।'

' এবার গিয়ে কথাটা আমার বোধগম্য হল। তথাপি দাদু ,আমাকে খারাপ পাবেন না— রবি দাদু( রবীন্দ্রনাথ) এই সত্তর বছর বয়সেও তার সৃজনশীল সত্তাটা সক্রিয় রেখেছেন। এখনও  তার সৃষ্টিকর্মে অভিনবত্ব প্রকাশ পায়,তাঁর কবিতা গীতের ভাব গুলিও কী অভিব্যঞ্জনাপূর্ণ।'

' জ্ঞান, তুমি কার সঙ্গে আমার তুলনা করছ! রবি কাকা অনন্য, অসাধারণ। রবি কাকার হৃদয়-মন চেতনা-বোধ সৃষ্টির উন্মাদনায় দুরন্ত।তাঁর সৃষ্টির ধারা মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।'

' তবে আপনার অপূর্ব সৃষ্টি 'আমার জীবনস্মৃতি' খন্ড খন্ড ভাবে বেরিয়েছে— এটাও পড়তে খুব ভালো লাগে।'

' আসলে, আমি সেটা লিখতে চাইছিলাম না। আত্মীয় পরিজন বন্ধু-বান্ধবের অনুরোধে লিখতে হয়েছে। বিশেষ করে আমার হেড গার্জেন— মানে তোমার 'দিদিমনি', তিনি সবসময় লেগে থাকেন। তার জন্য কত কী কাগজপত্র আছে, কোন নোটবুকে কী টীকা লিখে রেখেছিলাম, তিনিই সেই সব খুঁজে বের করে আমার টেবিলে সাজিয়ে রাখেন। তবে নিজের কথা লিখতে ভালো লাগে না, বুঝেছ।'

' কেন?'

' আমার এই জীবন স্মৃতিটা,'বাঁহী'র দ্বাদশ বছরের আশ্বিন মাসের ষষ্ঠ সংখ্যায় লিখতে আরম্ভ করে চতুর্দশ বছরের আষাঢ় মাসের তৃতীয় সংখ্যায় শেষ করেছিলাম। কারণ জীবনটা আমার সমতলের সোজা পথ দিয়ে গতি করেনি। কত মানুষের সঙ্গে কত ঝগড়াঝাটি করলাম, আমার নিজের আত্মীয়রা ও আমার উপরে ক্রুদ্ধ হয়েছে। কথা বলতে গিয়ে কার নামে কী লিখে ফেলি, কে কোন কথায় ঝামেলা পাকাবে এই ভয়ে আমার হাতের কলম কাঁপতে শুরু করে। এদিকে গৃহিণী মানে তোমার দিদিমণি ও আমাকে ধরেছে, তোমার জীবনস্মৃতিতে আমাদের ঘরোয়া কথাগুলি কেন লিখেছ? তাকে যদিও বা বললাম, লেখার সময় আমি ঘরোয়া এবং পরের কথা গুলি বেছে বের করে আলাদা করতে পারি না। কিন্তু নিজের আত্মীয়দেরতো এভাবে বলতে পারি না। তাই ভবিষ্যতে আর লিখব না বলে ভাবলাম। তখন আমার অবস্থা জ্বর ছাড়লেও জলপট্টি না ছাড়ার মতো অবস্থা হল। অবশেষে অনেক কথা বাদ দিয়ে লিখছি। এভাবে লিখতে গিয়ে স্মৃতিকথাটা সিস্টেমেটিক হয়নি। যখন যা মনে এসেছে তাড়াহুড়ো করে লিখে গেছি।'

' কিন্তু এখন পর্যন্ত যতখানি লিখেছেন, তা অভিজ্ঞতার সঙ্গে জীবন বোধের রসের রসালো।' জীবনস্মৃতিতে আপনি নিজেকে সমালোচনা করেছেন,নির্মমভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। কৃপাবর বরুয়া হয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। দাদু, আমিও আপনাকে অনুরোধ করছি, যেভাবেই হোক না কেন এটাকে শেষ করবেন। এদিকে গতবছর( ১৯৩০ সন) জানুয়ারি মাসে কলকাতায় 'বেজবরুয়া সমিতি' গঠিত হয়েছিল—-।'

' হ্যাঁ বিরিঞ্চি কুমার বরুয়া এবং রোহিণী কুমার বরুয়া অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে গঠন করা এই সমিতিটি আমার লেখাগুলির প্রচারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।'

' কেবল প্রচারই নয়, আপনার সাহিত্য যাতে সাধারণ পাঠক বুঝতে পারে এবং যুবক লেখকদের মধ্যে যাতে আপনার রচনা প্রণালী এবং বর্ণবিন্যাসের বিস্তর অনুশীলন হয়, তার জন্যও তারা কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।'

' করুক, তারা যা ভালো বুঝে করুক। সেই বিষয়ে আমার দিক থেকে কিছু বলার নেই।'

আলোচনা চলছে জ্ঞানদাভিরামের বাড়িতে । অসাম সাহিত্য সভার বিশেষ আমন্ত্রণ অনুসরণ করে লক্ষ্মীনাথ কলকাতা থেকে শিবসাগরে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন । ডিসেম্বর মাসের বড়োদিনের আগের দিন লক্ষ্মীনাথ রেলে আমিনগাঁও এসে পৌঁছালেন। ফেরিতে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে সকাল আটটার সময় অন্যান্য বারের মতো এবারও তিনি জ্ঞানদাভিরামের দীঘলি পুকুরের পারে বাড়িতে এলেন। জ্ঞানদাভিরামের বাড়িতে রাতটা কাটিয়ে আগামীকাল তিনি শিবসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। 

শীতকাল। জ্ঞানদাভিরামের পত্নী ঠাকুর বাড়ির অন্য একজন কন্যা লতিকা লক্ষ্মীনাথের সেবা যত্নের জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন। লতিকার নির্দেশে চাকরানি করে দেওয়া গরম জলে লক্ষ্মীনাথ প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে স্নান করলেন। তারপর মুক্ত মন নিয়ে জ্ঞানদাভিরামের সঙ্গে বাইরের বিশাল বারান্দার আরাম চেয়ারে বসলেন। লতিকা পটে গরম চা নিয়ে এসে কাপে কাপে ঢেলে দিলেন। চা খেতে শুরু করে লক্ষ্মীনাথ  এবং জ্ঞানদাভিরামেৰ মধ্যে এইভাবের আদান-প্রদান।

প্রায় এক ঘণ্টা সময় এভাবে আলোচনা করার পরে ভেতরের মহল থেকে লতিকা পুনরায় বেরিয়ে এলেন। হাসতে হাসতে লক্ষ্মীনাথকে বললেন,' আসুন দাদু, ব্রেকফাস্ট করবেন, আসুন—-।'

'বাঃ!' উচ্ছ্বসিত কন্ঠে লক্ষ্মীনাথ বললেন,' ঠাকুরবাড়ির কন্যা হয়ে তুমি দেখছি অসমিয়াতে কথা বলছ!'

' আমি অসমিয়া পরিবারের পুত্রবধূ, অসমে থাকি। অসমিয়া বলতেই হবে।' মুচকি হেসে লতিকা বলল,' তবে দাদু, দিদিমণি এখনও আপনার সঙ্গে অসমিয়ায় কথা বলে না। আপনি দিদিমণিকে অসমিয়া শেখান না নাকি?'

' না, শেখাই না। কিন্তু তিনি অসমিয়া বুঝতে পারেন। প্রয়োজন হলে অসমিয়া থেকে বাংলা বা ইংরেজিতে ও অনুবাদ করেন।'

' তবু দিদিমণি আপনার সঙ্গে অসমিয়াতে কথা বলেন না!'

' সত্যিই বলেন না। আসলে, বুঝেছ লতিকা— তিনি আমার সঙ্গে অসমিয়ায় কথা বলতে হবে বলে আমি ফিল করিনা।' মুচকি হেসে লক্ষীনাথ বললেন ,' এটা নিয়ে অসমের কেউ কেউ আমার নামে নানান কটুক্তি করে। কিন্তু আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আমার স্ত্রীর সঙ্গে বাংলায় কথা বলে আমি অসমিয়া ভাষা সাহিত্যেৰ কোনো লোকসান বা অপমান করছি নাকি?'

লক্ষ্মীনাথের গলার স্বর চড়ছিল। কিন্তু সামনে গম্ভীর ভাবে বসে থাকা জ্ঞানদাভিরামের দিকে তাকিয়ে তিনি নিজেকে সংযত করে বাংলায় বললেন,' আমাদের এইসব সংকীর্ণমনা অসমিয়ারা অসমিয়া‐বাঙালির সম্পর্কটার ক্ষতি করছে। আজ তোমাদের এই ঘরে বসে আমি হলফ করে বলছি , কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ওই ভাইদের মনে থাকা হিংসা বিদ্বেষ দূর হবে। ভাষিক বিদ্বেষ ভুলে অসমিয়া বাঙালি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হবে।'

বড়োদিনের দিন লক্ষ্মীনাথ গুয়াহাটি থেকে রেলে করে শিবসাগরে যাত্রা করলেন। পরেরদিন সকালে শিমুলগুড়ি জংশনে পৌঁছালেন। শিমুলগুড়ি স্টেশনে অপেক্ষা করে থাকা চন্দ্রকান্ত ভূঞা এবং আনন্দরাম লক্ষীনাথকে অভ্যর্থনা জানালেন। তারপরে তারা আলাদা একটি ট্রেনে লক্ষ্মীনাথকে অন্য একটি ট্রেনে করে শিবসাগর শহরে নিয়ে এলেন। শিব সাগরের অনেক সংস্কৃতিবান ধনী ব্যক্তির বসবাস সত্বেও সম্বর্ধনা জানাবার জন্য সাহিত্য সভার কর্তা ব্যক্তিরা লক্ষ্মীনাথের থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত করলেন শিব সাগরের ডাকবাংলোয়।

ডিসেম্বরের ২৭ এবং ২৮ তারিখ( ১৯৩১ সন) কথা সাহিত্যিক জমিদার নগেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী দেবের সভাপতিত্বে সাহিত্য সভার অধিবেশন অনুষ্ঠিত হল। এই অধিবেশনে চৌধুরীদেব সভাপতি আসন থেকে লক্ষ্মীনাথকে 'রসরাজ' উপাধিতে ভূষিত করলেন।

লক্ষ্মীনাথকে মানপত্র দেবার জন্য দ্বিতীয় দিন অসম সাহিত্য সভা  বিশেষ একটি সভার আয়োজন করলেন। এই সভার ও সভাপতিত্ব  করলেন নগেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীদেব। সম্পাদক দেবেশ্বর চলিহা অভিনন্দনের সূচনা করে বললেন,' আজ আমাদের অসম সাহিত্য সভার জীবনে অত্যন্ত সুন্দর এবং অভিনব এক অনুষ্ঠান। তার সঙ্গে আমার—এই অভাজনের জীবনেরও এক স্মরণীয় দিন। আমাদের সাহিত্যিকদের ভেতরে উজ্জ্বল রত্ন যিনি আজীবন নিঃস্বার্থভাবে স্বদেশপ্রেমের অনুরাগে অসমিয়া ভাষার প্রাণ রক্ষা করে ভাষা সাহিত্যের ভিত দৃঢ় করেছেন। এবং যে অসমিয়া সমাজের জাতীয় জীবন পরিপুষ্ট করেছেন আমরা সমগ্র অসমিয়া জনগণের হয়ে একটি অভিনন্দন পত্র তার করকমলে অর্পণ করে তাকে সংবর্ধনা জানাতে চাইছি।'...

এভাবে ভূমিকা করে সম্পাদক দেবেশ্বর চলিহা অভিনন্দন পত্রটা পাঠ করলেন।

অভিনন্দন পত্রটা সাঁচিপাতে সুন্দর করে ছাপা হয়েছে। কারুকার্য করা হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি ছোট বাক্স একটাতে পত্রটা ভরিয়ে পিতলের শরাই সহ লক্ষ্মীনাথের হাতে তুলে দেওয়া হল।সভায় জ্ঞানমালিনীর কবি মফিজউদ্দিন হাজরিকা দেশনেতা কুলধর চলিহা এবং বাগ্নীবর নীলমণি ফুকন একটি করে সম্বর্ধনা সূচক বক্তৃতা দিলেন।

  এরপরে লক্ষ্মীনাথ লিখিত উত্তরপাঠ করলেন। অসম সাহিত্য সভার সভাপতি, সম্পাদক এবং সদস্যদের সম্বোধন করে তিনি বললেন, ...আমি অভিনন্দন পাবার যোগ্য নই। অসমিয়া সাহিত্যের ক্ষেত্রে আজ আমার চেয়ে যোগ্য মানুষ আছে তাদের ভেতর কেউ একজন এই অভিনন্দন পাওয়া উচিত ছিল। আর আপনারা সমূলে না করলেও কিছুটা ভুল করে একজন তৃতীয় শ্রেণির মানুষের মাথায় এই অভিনন্দনের মালতি ফুল অর্পণ করেছেন।

 নিজের লেখার বিষয়ে স্বভাবসিদ্ধ  রসবোধে তিনি ব্যক্ত করলেন,’শৈশব থেকে আমি কলম,দোয়াত কলম কলাপাতা, তারপরে তুলাপাতা হাতে নিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছি। কিন্তু কী লিখছি আজ পর্যন্ত আমি নিজেই ভালো করে বুঝতে পারিনি। কেউ বলছে সেই সব সাহিত্য হয়েছে কেউ বলছে সেসব নাকি আবর্জনার স্তূপ জমা হয়েছে। আবর্জনার স্তূপ হলেও আমার দুঃখ নেই। কারণ সেটাও গুরু সেবায় লাগবে। অন্তত এই পৌষ মাসের ঠান্ডায় সেই আবর্জনার স্তূপে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আগুন পোহালে সাহিত্য সভার সভ্যরা শীত থেকে রক্ষা পাবে। এবং তারা গলা খোলে বক্তৃতা দিতে পারবে।

 তারপরে আসাম সাহিত্য সভা রসরাজ উপাধি উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গে লক্ষ্মীনাথ গুরুত্বপূর্ণ এবং দূরদর্শী মন্তব্য করলেন।‘যখন এই সভা সাহিত্যিককে দেওয়া উপাধিগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধির মতো গণ্য করা হবে, সেরকম দিন এলে কোনো একটি টোলের বা টোলের বাইরের কোনো একজন মোষের আঠালো দই, মালভোগ কলা এবং গুড় দিয়ে এক বাটি কোমল চালের জলপানের পরিবর্তে, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাহিত্যিক বা অসাহিত্যিক সেই ভুরি ভোজনকারী ভট্টাচার্যের কাছ থেকে কবিগুনাকর বা ভাস্কর উপাধির মতো উপাধিতে বিভূষিত হয়ে সাহিত্যক্ষেত্রের ভেতরে বা বাইরে জ্বলজ্বল করে থাকার আর আবশ্যকতা থাকবে না।’

অসম সাহিত্য সভার পরে  শিব সাগরের পলিটেকনিক স্কুলেও লক্ষ্মীনাথকে সংবর্ধনা জানানো হল। তারপরে আমিনগাঁও থেকে রেলে সম্বলপুরের উদ্দেশ্যে  যাত্রা করলেন। 

আসাম থেকে বিদায় নিয়ে কলকাতা বা সম্বলপুর যাত্রা করার সময় প্রত্যেক বার লক্ষ্মীনাথের মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। অসম সাহিত্যসভা তাকে সভাপতি পেতে জাতীয় সম্মান দেওয়ার পর থেকে তাকে নিয়ে অসমিয়া মানুষের মনে নতুন এক আবেগ, নতুন এক উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক সভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে সম্বর্ধনা,রসরাজ উপাধিতে বিভূষিত করা...লক্ষ্মীনাথ নিজেও অভিভূত হয়ে পড়েছেন। এভাবে তার চিন্তা চেতনায় অসম অসমিয়া জাতি এবং অসমিয়া ভাষা সাহিত্য নিজের ব্যাবসায়িক এবং সাংসারিক কাজকর্মের বাইরে তার সত্তাটা স্বদেশ এবং স্বজাতির মঙ্গলের জন্য নিবেদিত। এখন বহু গুণমুগ্ধ তাকে বিনম্রভাবে অসমে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করছেন। লক্ষ্মীনাথের এরকম মনে হয় যে জীবনের বাকি দিনগুলি অসমে অসমিয়া মানুষের মধ্যে কাটিয়ে দিতে পারলে ভালো লাগবে। কিন্তু বৈষয়িক কথাগুলি বাধা দেয় বলে এই কথা মনের মধ্যে খুব একটা গুরুত্ব পায় না।

  উপাধি অভিনন্দনে বিভূষিত হয়েও বেদনা ভারাকান্ত মন নিয়ে লক্ষ্মীনাথ জানুয়ারির এক তারিখ সম্বলপুর পৌছালেন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি শেষ করে ব্যাবসায় মনোযোগ দিলেন। কিন্তু ব্যাবসাতে মন বসল না। ব্যাবসা থেকে তার মন উঠে গেছে। কাঠের ব্যাবসার জন্য ঘন ঘন এদিকে ওদিকে যেতে হয়,ঠিকা পাবার জন্য রেলের ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে দেখা করে খাতির যত্ন করতে হয়। এইসব আগের মতো আর পারছেন না ।অসম  থেকে আসার পর থেকে স্বদেশ স্বজাতিকে নিয়ে ভাব অনুভূতি গুলি তাকে কিছুটা উন্মনা উদাস করে ফেলেছে।

  তখনই একটি চিঠি পেলেন। লখিমপুর থেকে কুশল দুয়ারা লিখেছে।সেই কুশল দুয়ারা কলকাতা থাকার সময় যে ছেলেটি পড়াশোনার খরচ জোগাড় করার জন্য শনি রবিবার এবং ছুটির দিনগুলোতে বি বরুয়া কোম্পানিতে কেরানির কাজ করত। তারপরে গুয়াহাটি ছাত্র সম্মেলনের সভায় সভাপতিত্ব করার পরে বিদায় নিয়ে আসার দিন লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দেখা করার জন্য কুশল তাড়াতাড়ি করে ফেরিতে উঠেছিল। এবং মায়ের হাতে বোনা একটা চেলেং  চাদর তাঁর গলায় পরিয়ে দিয়ে শ্রদ্ধানতভাবে তাকে প্রণাম জানিয়েছিল। সেদিন কুশলও তাকে অসমে থাকার জন্য  বিনম্র কাতরতার সঙ্গে বলেছিল...।

‘রসরাজ শ্রীযুক্ত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া স্যার’ বলে সম্বোধন করে সশ্রদ্ধ প্রণতি জানিয়ে কুশল লিখেছে, ‘আপনি সদাশয়, আমার মতো অভাজনের প্রতি আপনি দয়াশীল। আপনাকে দুঃখ কষ্টের কথা বলতে সংকোচ হয় না। স্যার, মায়ের মৃত্যুর পরের বছর আমার  পরিবার গ্রহনীতে ওপারে চলে গেল। সে রেখে যাওয়া অনাথ সাত বছরের মেয়েটিকে বারো বছর লালন পালন করে গত মাসে বিয়ে দিয়ে কন্যাদায় থেকে মুক্ত হলাম। এখন ঘরে একা থাকি, নিজেই রান্না বান্না করে খাই।আমার অবস্থা দেখে গ্রামের কয়েকজন মানুষ আমাকে জগন্নাথ ধাম দর্শনের জন্য পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু পুরীতে যাওয়ার কথা ভাবতেই আপনার কথা মনে পড়ল। সভা-সমিতির আমন্ত্রণ রক্ষা করে আপনি সম্বলপুর থেকে অসমে আসেন বলে খবর পেয়ে থাকি। কিন্তু অনেকটা দূরে থাকি বলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি না। এখন জগন্নাথ ধাম মন্দির দর্শনের চেয়েও আপনাকে দেখা এবং কাছে বসে আপনার দুই একটি কথা শোনাটা আমার কাছে বেশি আনন্দের। তাই পুরীর জগন্নাথ ধাম দর্শন করার আগে এই বছর জানুয়ারি মাসের ষোলো তারিখ আপনি থাকা সম্বলপুরে আসার ইচ্ছা রাখছি কিছুক্ষণের জন্য দর্শন দিয়ে এই অভাজনকে কৃ্তার্থ করবেন বলে আশা করছি ইতি— কুশল দুয়ারা ।

অসমের লখিমপুর থেকে কুশলের এভাবে সম্বলপুরে আসাটাও তার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসার নিবেদন। কেউ শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাতে এলে তাকে অবহেলা করা যায় না। এমনিতেও কুশল বহুবছর থেকে তার পরিচিত, তার ভক্ত। কুশল আসার দিন টাঙ্গাটা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ নিজেই সম্বলপুর স্টেশনে এলেন।

  সকালে ঝাড়চোগোড়ায় গাড়ি বদল করে সাড়ে সাতটার সময় কুশল সম্বলপুর পৌছাল। গাড়ি থেকে নেমে প্লাটফর্মের বাইরে এসে লক্ষ্মীনাথকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কুশল অবাক হয়ে গেল, ‘স্যার আপনি!’

  বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি যদিও কুশলের চেহারার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি ।এখনও পায়জামা পাঞ্জাবি পরা সেরকমই পাতলা চেহারা। শুধু চুলে পাক ধরেছে। 

‘তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’

  ‘তা বলে আপনি নিজে স্টেশনে এসেছেন?’

  ‘সম্বলপুর তোমার অপরিচিত জায়গা। আমার বাড়ি খুঁজে বের করতে তোমার কষ্ট হবে। চল, টাঙ্গা নিয়ে এসেছি। টাঙ্গায় উঠ।’ 

কুশলের দুই চোখে অতলান্ত বিস্ময়! অসমিয়া ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক তার মতো মাধ্যমিক স্কুলের সাধারণ একজন শিক্ষকের জন্য এতখানি করছে। সে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। তারপরে লক্ষীনাথের পা দুটি স্পর্শ করে প্রণাম জানিয়ে টাঙ্গায় উঠে সসঙ্কোচে তার বাঁ পাশে বসল।

 কুশল দেখল  বলদ গরু টানা টাঙাটা বেশ সুন্দর। টাঙ্গায় বসে যাওয়াটা আরামদায়ক। এভাবে যাবার সময় লক্ষ্মীনাথ প্রথমে কুশলের মেয়ে জামাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন,লখিমপুরে ‘বাঁহী’র জনপ্রিয়তা কী ধরনের জানলেন এবং লখিমপুরের কারা কারা প্রতিশ্রুতিমান লেখক সেটাও জিজ্ঞেস করলেন। কিছুক্ষণের ভেতরে কুশলকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথ বাড়ি পৌঁছালেন।

উড়িষ্যার প্রধান নদী মহানদীর পারে লক্ষ্মীনাথের খড়ের চাল দেওয়া সুন্দর বাংলো। বাংলোটার পেছনদিকে নিম, আমলকি, আম, কাঁঠাল গাছ। সামনের দিকে সুন্দর ফুলের বাগানের সঙ্গে শাক সব্জির চাষ করার জন্য বাগান। বাগানের পেছনে লক্ষ্মীনাথ নিজ হাতে পাথর বালু এবং সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা একটি  বেঞ্চ। এই বেঞ্চে বসে লক্ষ্মীনাথ সকাল বিকেল সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানদী এবং মহানবীর ওপারে সবুজ পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করেন। দুই একরের চেয়ে অধিক ক্ষেত্রফল থাকা এই বাড়ির সামনের দিকে ইউরোপিয়ান ক্লাব বাঁদিকে সম্বলপুর পুলিশ অধিক্ষকের সরকারি বাসগৃহ এবং বাঁদিকে পলিটিক্যাল এজেন্ট যোগেন্দ্রনাথ সেনের বাংলো এবং ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিয়েশনের অফিস।

লক্ষ্মীনাথ অরুনা রত্নাকে বিয়ে দিয়েছেন। দীপিকা কলকাতার ডায়োসেশন কলেজের হোস্টেলে থেকে বিএ পড়ে, বাড়িতে প্রজ্ঞা লক্ষ্মীনাথ ছাড়া চাকর বাকর মালি এবং টাঙ্গাচালক থাকে। বাংলোয় এসে লক্ষ্মীনাথ ভেতর মহলে নিয়ে গিয়ে আত্মীয়ের মতো কুশলকে আদর করে নিলেন। কুশল ভেবেছিল লক্ষীনাথের সঙ্গে কথাবার্তা বলে চা জল পান খেয়ে পুরীতে যাত্রা করবে। যাবার কথা বলায় লক্ষ্মীনাথ ক্রোধের সুরে বললেন, ‘এত দূর থেকে এসে্‌ছ, দুদিন না থেকে কীভাবে যাবে?তারপর লক্ষ্মীনাথ নিজে কুশলের জন্য থাকা ঘর,স্নানের ঘর দেখিয়ে তার শোবার ঘর  প্রস্তুত করে দিতে চাকরানীকে নির্দেশ দিলেন।

 অতিথি অভ্যাগত এলে প্রজ্ঞাসুন্দরীদেবীও যত্ন করেন। গতরাতে রেলে থাকার জন্য কুশলকে অনাহারে থাকতে হয়েছিল। লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দুপুর বেলার ভাত খেতে বসে প্রজ্ঞা রান্না কয়েক ধরনের তরকারি খেতে গিয়ে কুশল অমৃতের স্বাদ পেল।

লক্ষ্মীনাথ এখন জীবনের প্রান্ত বেলায় পা রেখেছেন। তার শরীরে  আগের বাঁধন নেই। চলাফেরা ও আগের মতো গতিশীল নয়। কিন্তু তার মনের বড়ো একটা পরিবর্তন হয়নি। কুশল দেখল বিকেলে লক্ষ্মীনাথ ব্যাডমিন্টন খেললেন, বিকেলে তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানদীর  ধারে ভ্রমণ করলেন।রাতে ক্লাবে বসে স্থানীয় উড়িয়া বন্ধুদের সঙ্গে স্টেট এক্সপ্রেস ব্র্যান্ডের সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে ব্রিজ খেললেন। কুশল বয়সে লক্ষ্মীনাথের চেয়ে ছোটো। লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে কোনো দিকেই কুশলের তুলনা হয় না। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ সাক্ষাৎ করা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কুশলকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কুশল অন্যের কাছ থেকে অথবা কাগজে পত্রে সাহিত্যিক লক্ষ্মীনাথের কথা শুনেছিল। সেভাবে শুনে তাকে অসমিয়া জাতির অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ বলে মনে হয়েছিল। এখন বাড়িতে এসে তার সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করে কুশল বুঝতে পারল ব্যক্তি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া বেশি মহান বেশি আপন।

 ‘স্যার, আগেরবার ব্রহ্মপুত্রের বুকে ফেরিতে দেখা হওয়ার সময় আমি আপনাকে একটা কথা বলেছিলাম ...। রাতের আহার খাবার পরে মনে সাহস গুটিয়ে নিয়ে কুশল বলল, ‘তখন আপনি আমার সেই কথাটার উত্তর দেননি। এখন পুনরায় সেই কথাটা অনুচিত জেনেও বলছি—।’

ম্লান  হাসি হেসে লক্ষ্মীনাথ বললেন, ‘এখান থেকে অসমে গিয়ে অসমিয়া মানুষের সঙ্গে আমার থাকা উচিত এই কথাটাই তো বলতে চাইছ।’

 কুশল ঢোক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’

লক্ষ্মী নাথের মুখের হাসি শুকিয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললেন, ‘এবার শিবসাগর থেকে সম্বলপুরে আসার সময় আমিও এই কথাটা খুব অনুভব করেছি কুশল। অসমে থাকার সময় আমাদের মানুষের ভালবাসা পেয়ে মনটা সত্যি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন আমার অন্তরে এরকম মনে হচ্ছিল যে মাতৃভূমিতে থেকে জন্মভূমিতে থাকতে পারলে আমি বেশি সুখী হতে পারতাম। আমার আত্মা বেশি তৃপ্তি পেত। কিন্তু কুশল আমার যে সেরকম ক্ষমতা নেই ।আমার শরীরে এরকম শক্তিও নেই যে এই শরীর নিয়ে সপরিবারে অসমে ফিরে যাব।’

লক্ষ্মীনাথ এরকম বেদনার সুরে বলল যে কুশলের খারাপ লাগল। অপরাধীর মতো মুখ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার পুনরায় অসমে থাকার কথা বলে আমি আপনার মনে দুঃখ দিলাম নাকি?’

  ‘দুঃখ—না তুমি দুঃখ দাও নি। বরং এভাবে বলে তুমি আমার স্নেহের পাত্র হলে আর তুমি আমাকে ভালোবাস বলেই এভাবে বলতে পারলে। লক্ষ্মীনাথ বললেন,‘এমনিতেও কুশল বুঝেছ,কিছুদিন ধরে এরকম মনে হচ্ছে যেন অসমী মা আমাকে ডাকছে।আমাকে অসমে ফিরে যেতে হবে।আচ্ছা,এখানে আসার আগে চিঠিতে যে তুমি পুরীর জগন্নাথ বাবার চেয়ে আমাকে বেশি গুরুত্ব দিলে,কথাটা কী?’

 ‘স্যার,আপনি স্রষ্টা।আপনার সৃষ্ট সাহিত্য পড়ে হাজার হাজার ,লক্ষ লক্ষ মানুষ জেগে উঠছে।’অদ্ভুত এক মোহ-মুগ্ধতায় কুশল বলল, ‘ আমি একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক।আমি কোনো কিছুই সৃষ্টি করতে পারি না যদিও আপনার সৃজন শক্তির মহিমা কিছুটা বুঝতে পারি।তাছাড়া বাবা জগন্নাথ ভগবান যদিও তাঁর সঙ্গে এভাবে এত কাছাকাছি বসে কথা বলতে পারব না।তাই আমার কাছে আপনি বাবা জগন্নাথের চেয়েও মহান।’

 কুশলের মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ চুপ,কিছু পরিমাণে আত্মসমাহিত।

 আরও অনেক কথা বলার আছে।কথা না বললেও লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে থাকাটা আনন্দের,শান্তির।কিন্তু রাত গভীর হয়ে আসছে।লক্ষ্মীনাথের শোবার সময় হয়েছে।এদিকে কুশলের এখানে থাকা দুদিন হয়ে গেছে।লক্ষ্মীনাথের স্নেহ ভালোবাসার আশ্রয়ে থাকতে পেয়ে তার জীবনটা ধন্য হয়ে গেল।তার আরও দিন চারেক থাকার ইচ্ছে।কিন্তু ব্যাবসায়িক কাজের জন্য লক্ষ্মীনাথকে আগামীকাল ঝাড়চোগোড়া হয়ে কলকাতা যেতে হবে।তারপরেও তিনি দুদিন বাড়িতে থাকবেন না।তাই কুশল কাল সকালের রেলে পুরীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে।

সকালে কুশল জেগে উঠার আগেই লক্ষ্মীনাথ ঘুম থেকে উঠে তাকে ডাকল।সঙ্গে সঙ্গে উঠে প্রাতঃকৃ্ত্যাদি সেরে নিয়ে কুশল প্রস্তুত হল।লক্ষ্মীনাথ এবং প্রজ্ঞাকে প্রণাম করে কুশল বের হল।কিন্তু লক্ষ্মীনাথ তাকে একা যেতে দিল না।গাড়োয়ানকে ডেকে টাঙাটা বের করতে বললেন।তারপরে কুশলকে টাঙায় বসিয়ে লক্ষ্মীনাথ সম্বলপুর স্টেশনে এসে পুরীতে যাবার ট্রেনে উঠিয়ে দিলেন।

রেল ছাড়ার ঘন্টা বাজল।ইঞ্জিন উকি দিল।লক্ষ্মীনাথ জানালার পাশে বসা কুশলের দিকে নিজের ডানহাতটা বাড়িয়ে দিলেন।কুশলের হাতটা স্পর্শ করতেই লক্ষ্মীনাথের মানসপটে সবুজ গাছপালায় ভরা শ্যাম্ল মাতৃভূমির চির-স্নেহের রূপটা ভেসে উঠল।তিনি কিছু একটা বলতে চাইলেন।কিন্তু বলতে পারলেন না।অবুঝ এক আবেগে তাঁর কণ্ঠ্ররোধ হয়ে গেল।তারপরে তাঁর চোখদুটি অশ্রুসজল হয়ে উঠল।    




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...