শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

বিশেষ রচনা ।। অবলুপ্তির পথে চন্দ্রকোনার বনক মাটির চাষ ।। মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি ।। Mangalprasad Maity

বিশেষ রচনা

অবলুপ্তির পথে চন্দ্রকোনার বনক মাটির চাষ

মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি



ভারতবর্ষের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা-২ ব্লকের অধীন হরিসিংপুর, বাচকা, টোকাহাদুয়া, ডালিমা বাড়ি ইত্যাদি কয়েকটি গ্রাম। এই গ্রামগুলি একসময় বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল সেখানকার বনক মাটির চাষের জন্য। বনক মাটিকে অনেকে  ‘অ্যালামাটিও’ বলে থাকেন। বনক বা  অ্যালামাটি যাই বলা হোক না কেন একসময় এই বনক মাটির চাষ এখানকার বেশির ভাগ পরিবারেরই অন্যতম প্রধান জীবিকা হয়ে হয়ে উঠেছিল। বিরাট একটা অর্থ সংস্থান হত এই মাটির চাষ করে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে বনক মাটির চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আশ্চর্যের ব্যাপার এই মাটি শুধুমাত্র চন্দ্রকোনার এই গ্রামগুলিতেই পাওয়া যায় বিশেষ করে হরিসিংপুর গ্রামে।    

   চন্দ্রকোণা টাউন থেকে ঘাটাল যাবার পথে প্রায় দু’কিলোমিটার পূর্বে জয়ন্তীপুর বাসস্ট্যান্ড। এই জয়ন্তীপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে উত্তর দিকে আড়াই-দু’কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই পড়বে ডালিমাবাড়ি, টোকাহাদুয়া, বাচকা, এবং হরিসিংপুর গ্রামগুলি। ৩ নং বসনছোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন এই গ্রামগুলির মানুষজন আলু, ধান, সর্ষে, তিল ইত্যাদি চাষাবাদের পাশাপাশি এই একটি বিশেষ ধরনের চাষ ‘বনক মাটির’ চাষ করে থাকেন। সোনালি হলুদাভ বিশেষ এই ধরনের মাটি পাকাবাড়ি, হাঁড়ি, কলসি ইত্যাদিতে রঙ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। 



 



মালসায় করে রোদে শুকনো হচ্ছে বনক মাটি

   শীতের শেষ এবং গ্রীষ্মকাল এই সময়ে এই গ্রামগুলিতে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে রাস্তার দু’ধারে কিংবা ফাঁকা জায়গায় শ’য়ে শ’য়ে মাটির মালসা, বা সরা সারিবদ্ধভাবে বিছানো রয়েছে। তাতে মাটির ঘোলা জল শুকোতে দেওয়া হয়েছে। এই মাটিই শুকিয়ে হচ্ছে বনক মাটি। ভালো করে লক্ষ্য করলে আর দেখা যাবে এখানে-সেখানে সাদা-হলুদ রঙের মাটির স্তুপ। পাশেই বড়ো বড়ো গর্ত আর খাদ। দেখলেই মনে হবে ওই  গর্তগুলো থেকে মাটি তোলা হয়েছে। 

  সাধারণত শুকনো আবহাওয়ায় বিশেষ করে শীতের শেষ সময় থেকে গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত বণক মাটি তৈরির মূল কাজটি চলে। বছরের অন্য সময়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট নিচের থেকে মাটি খুঁড়ে সাদা-হলুদাভ বিশেষ ধরনের মাটিটি ঝুড়ির সাহায্যে মাথায় করে উপরে তোলা হয়। তারপর তা ভালোভাবে রোদে শুকনো করে গুঁড়ো করা হয়। যত ভালো গুঁড়ো হবে তত ভালো কাজ হবে। একটা আশ্চর্যের ব্যাপার এই নির্দিষ্ট মাটিটি এই এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি।   

   বছরের নির্দিষ্ট সময়ে শুকনো অবহাওয়ায় শুকনো গুঁড়ো মাটিটিকে একটি গর্তে ফেলে জল দিয়ে প্রচণ্ডভাবে গুলিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঘোলাটে জল ছেউনির সাহায্যে বা বালতি করে আর একটি গর্তে ফেলা হয়। সেখান থেকে আর একটি গর্তে নিয়ে যাওয়া হয় গাঢ় হলদে সোনালি রঙের জলটি। সেই জল পর পর বালতি করে তুলে সার সার করে রাখা মাটির তৈরি একটি নির্দিষ্ট সাইজের মালসাতে ঢালা হয়। একটিতে ঢালা হয়-পাশের মালসাটি খালি থাকে। যদি পাঁচশো মালসা থাকে তবে আড়াইশো মালসায় জল ঢালা হয়, বাকি আড়াইশো মালসা খালি থাকে। 

                  



   এরপর সারাদিন ফেলে রাখার পর মালসার জলের মাটিটি বসে যায়। উপরের জলটি পাশেই খালি রাখা অপর মালসাটিতে ঢেলে দেওয়া হয়। এরপর রোদের প্রচণ্ড তাপে মালসার মাটি শুকনো হয়ে গেলে সেই উজ্জ্বল সোনালি বর্ণের মাটিটিই বনক বা অ্যালামাটি রূপে পরিণত হয়ে যায়। আরো ভালো করে শুকনো করে তা বস্তায় ভরে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। এক হাজার মালসা বা সরা থেকে প্রতিদিন চার-পাঁচ বস্তা মাটি উঠে। দু’রকমের মাটি তৈরি করা হয়। একটা মোটা ধরণের আর একটা পাতলা। মোটা বনক মাটির পঞ্চাশ কেজির বস্তার দাম চারশো টাকা আর পাতলা একেবারে চকচকে সোনালি মাটির পঞ্চাশ কেজি বস্তার দাম সাতশো টাকা।  চন্দননগর, কলকাতা, রানাঘাট, বহরমপুর প্রভৃতি এলাকা থেকে খদ্দেররা এসে এই বনক মাটি কিনে নিয়ে যান। বেশির ভাগ ব্যবসাদাররা আসেন হুগলি জেলার চন্দননগর থেকে। 


 


   শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এখনো যারা এই বনক মাটির শিল্প বা চাষটিকে ধরে রেখেছেন তাদের কয়েকজন হলেন নেপাল ধাড়া, টেম্পু ধাড়া, নিতাই ধাড়া, অরুণ দোলুই, মৃত্যুঞ্জয় খাঁ, রমাপ্রসাদ ধাড়া, খোকন খাঁ , শ্যামাপ্রসাদ ধাড়া। সমস্যার কথা বলতে গিয়ে তারা জানালেন - একসময় এই বনক মাটির চাষ অত্যন্ত লাভজনক ছিল, অর্থনীতিতে একটা জোয়ার আনতে পেরেছিল। কিন্তু সেই সুসময় আজ আর নেই। নানারকম কৃত্রিম রঙ বাজারে এসে যাওয়ার ফলে এই বনক মাটির চাহিদা কমে গেছে একেবারে। যার ফলে বনকমাটির শিল্প আজ কঠিন সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে। এই শিল্পের কাঁচামাল হল মাটি। এই মাটি যদিও কিনতে হয় না তবু এই শিল্প চাহিদার অভাবে মার খাচ্ছে। দেড়শো-দুশো বছরের পুরনো এই বনক মাটির চাষ অবলুপ্তির পথে। এলাকার ৩০০ থেকে ৩৫০টি পরিবার এই বণক মাটি চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এই শিল্প থেকে তেমন আর আয় না হওয়ায় অনেক পরিবার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানে মাত্র আট ৮ থেকে ১০টি পরিবার এই বনক মাটির চাষ করে থাকেন। বনক মাটি কেনার আগেকার মতো সেই খদ্দের বা ব্যবসাদার নেই। 



  এই বণকমাটি শিল্পে আরো যে সমস্যাগুলি প্রকট হয়ে উঠে তা হল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য কাজ এটি। বর্তমানে প্রায় কুড়ি ফুট খুঁড়লে তবে এই মাটি পাওয়া যায়। এতটা নিচ থেকে মাটি তোলাটাই একটা কঠিন ব্যাপার। তারপর দিনকে দিন মালসা বা সরার দাম বাড়ছে। এই মাটি তোলা একটি বিপজ্জনক কাজ। গর্ত করে মাটি তুলতে গিয়ে অনেক সময় বড়ো বড়ো ধসের মধ্যে পড়তে হয়। ১৯৮৯ সালে ১২ পৌষ গ্রামের তিনটি শিশু ধসের মধ্যে মাটি চাপা পড়ে প্রাণও হারিয়েছে। তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর সমিতির পক্ষ থেকে ওই দিনটি শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে থাকে। বনকমাটি সংরক্ষণের জন্য একটি সমিতি গঠিত হয়েছিল। যা হরিসিংপুর গ্রামে অবস্থিত। সেই সমিতির অফিসে প্রত্যেকটি চাষির উত্‍পন্ন মাল জমা রাখা হয়। বনক মাটির চাষ কমে যাওয়ায় এই সমিতির অস্তিত্বও সংকটের মুখে। তবু সমিতি সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে এই বনক মাটির চাষ বা শিল্পকে ধরে রাখতে। তবে কতদিন এই শিল্প বেঁচে থাকবে সেই ব্যাপারে দেখা দিয়েছে বিরাট একটা প্রশ্নচিহ্ন।   

(*)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...