প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৩ মে, ২০২১

খনি শ্রমিক এবং কার্লাইল ৷৷ হোমেন বরগোহাঞি ৷৷ মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস

 খনি শ্রমিক এবং কার্লাইল

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে  বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস


 


বেশিরভাগ শিক্ষিত অসমিয়া মানুষই বই আলোচনা পত্রিকা পড়াটা অদরকারি কাজ বলে ভাবে ।স্কুল-কলেজ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ইতি পড়ে ।দেশ যখন পরাধীন ছিল এবং বর্তমানের মতো বাধ্যতামূলক সার্বজনীন শিক্ষার প্রচলন ছিল না তখন দুঃখী গ্রামবাসী মানুষ পাঠশালায় ছেলেদের পাঠাত একটিমাত্র উদ্দেশ্যে। আর তা হল ছেলে যাতে নিজের নামটা সই করতে পারে এবং মাটির দলিল নিজে পড়তে পারে ।সেই যুগে অসমে পাঠশালা তথা প্রাথমিক স্কুল যত ছিল এখন কলেজের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। গ্রামে গ্রামে ,প্রতিটি অঞ্চলে কলেজ ।অর্থাৎ দেশে উচ্চ শিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে ।কিন্তু তা বলে মানুষ প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হয়েছে কি ?আজ থেকে অর্ধশতাব্দী আগে গ্রামের চাষার ছেলে স্কুলে যেত নিজের নামটা সই করার উপযুক্ত হওয়ার জন্য এবং পাট্টা পড়তে সক্ষম হওয়ার জন্য। এখন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের  উচ্চতম ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মানুষ ও ফাইলে নিজের নাম সই করা এবং ফাইল  পড়া ছাড়া অন্য কী কাজ করে ?শিক্ষিতের সংজ্ঞা অনুযায়ী যে মানুষ জীবন ধারণের জন্য যত চিন্তা করা প্রয়োজন তার চেয়ে স্বেচ্ছায় বেশি চিন্তা করে একমাত্র তাকেই শিক্ষিত মানুষ বলা যেতে পারে ।এই অর্থে আমাদের সমাজে কতজন মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত বলা যেতে পারে?

অথচ এ কথা আমাদের  গভীরভাবে উপলব্ধি করা উচিত যে পড়ার অভ্যাস না করলে আমরা আধুনিক জগতের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না ।পনেরো শতকে ছাপাখানার আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যুগের সূচনা হল। ছাপাখানার আবিষ্কারের আগে জ্ঞান চর্চার সুযোগ সুবিধা সীমাবদ্ধ ছিল সমাজের কয়েকজন মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে ।তখন একেকটি হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি এত দুষ্প্রাপ্য এবং দুর্মূল্য ছিল যে ইউরোপের খ্রিস্টীয় মঠের গ্রন্থাগার গুলিতে সেই ধরনের পান্ডুলিপি গুলি চুরির ভয়ে লোহার শিকল দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হত। সাধারণ মানুষের জ্ঞান অর্জনের সুবিধা একেবারেই ছিল না বলেই তাদের নিজেদের মন বলে কোনো জিনিস ছিল না। ছাপাখানা রাতের ভেতরে অবস্থা একেবারে বদলে দিল। আগে অশেষ কষ্ট করে যে পুঁথি মাত্র দশ বারোটা কপি করা সম্ভব হত এখন ছাপাখানার সাহায্যে রাতের ভেতরে সেই পুঁথির লক্ষ-কোটি প্রতিলিপি করতে পারাটা সম্ভব হল। ব্যাপক উৎপাদনের ফলে গ্রন্থের দাম কম হল। আগে প্লেটো, এরিস্টটলের যে রচনাবলীর পাণ্ডুলিপি ছিল মহার্ঘ এবং মাত্র মুষ্টিমেয় মানুষের অধিগম্য এখন তা অত্যন্ত দুঃখী মানুষ ও মাত্র কয়েকটি টাকা খরচ করে সেই অমূল্য জ্ঞান ভান্ডারের মালিক হতে পারে। হেণ্ড্রিক উইলেম ভান লুনের  চিত্রময় ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়-'মুদ্রিত শব্দের সামনে মানবতাবাদ সমস্ত মানুষকে সমান এবং স্বাধীন করে তুলল ।'

ছাপাখানা গ্রন্থকে সুলভ করে তুলল বটে কিন্তু উনিশ শতক পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনের মতো দেশেও এত দুঃখী মানুষ ছিল যে প্রাচীন পান্ডুলিপির তুলনায় এখন জলের দামে পাওয়া ছাপা বই কেনার জন্য তাদের আর্থিক সামর্থ্য  ছিল না ।অথচ তাদের জ্ঞানপিপাসা এত তীব্র ছিল যে দারিদ্র তাদের নিরুৎসাহ করতে পারেনি ।এই জ্ঞানপিপাসু মানুষগুলি কিন্তু প্রত্যেকেই তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্র শ্রেণির মানুষ ছিল না ।কয়লা খনির অন্ধকার পাতালে যে সমস্ত অল্প শিক্ষিত মানুষ উদয়াস্ত পরিশ্রম করে তারাও জ্ঞান এবং রসের তৃষ্ণায় বইয়ের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করত। কিন্তু যেহেতু বই কেনার মতো তাদের আর্থিক সামর্থ্য ছিলনা সেই জন্য তারা অন্যের বই ধার করে অশেষ কষ্টে সেই সমস্ত বই হাতে নকল করে নিত। এই ধরনের একজন খনিশ্রমিক একজন ঐতিহাসিককে বলেছিল -'আমরা খনির নিচে কাজ করার জন্য মাটির নিচে নেমে যাওয়ার সময় কার্লাইল কিংবা মিলের একটি বই পকেটেভরে নিয়ে যাই। যখন খাবার সময় হয় তখন খেতে খেতে আমরা বইটির দুটি পাতা পড়ে নিই।'

কথাটা গভীরভাবে ভেবে দেখুন ।একজন দরিদ্র, অল্পশিক্ষিত খনি- শ্রমিক ,তিনি কিন্তু খনির নিচে অবসর সময়ে পড়ার জন্য একটি লঘু উপন্যাস নিয়ে যেতে চাননি, তিনি পকেটে ভরে নিয়েছেন কার্লাইল এবং জন স্টুয়ার্ট মিল এর মতো লেখকের গুরুপাক ইতিহাস এবং রাজনৈতিক দর্শনের বই। সেই বইটি কখন পড়ছেন? খনির ভয়াবহ অন্ধকারে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের মধ্যে দুপুরের আহার খাবার জন্য যে পনেরো মিনিট বা আধঘন্টা সময় পেয়েছেন সেই সময়। একজন শ্রমিকের জীবনে কঠোর জ্ঞানানুশীলন কী কাজে আসবে? সেই কাজে আসবে -যে কাজের দ্বারা মানুষ ইংরেজ জাতির মতো একটি সচ্চরিত্র বীর্যবান এবং বিশ্বজয়ী জাতি গড়ে তুলতে পারে। ইংল্যান্ডের খনি শ্রমিক শ্রেণির মধ্য থেকে কীভাবে এতগুলি প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিক এবং রাজনীতিবিদ বেরিয়ে এসেছেন সে কথা বোঝার জন্য এখন আর একটুও চেষ্টা করতে হবে না। যে জাতির অর্ধশিক্ষিত দরিদ্র খনিশ্রমিক বই কেনার জন্য টাকা নেই বলে বই না পড়ে থাকে না ,অন্যের বই হাতে নকল করে নিয়ে হলেও বই পড়ে ,দুপুরের আহার খাওয়ার সময়টুকু গল্প করার পরিবর্তে বই পড়ার জন্য ব্যবহার করে ,সেই জাতি বিশ্বজয় না করে আমরা অসমিয়ারা  করব-যে অসমিয়া সমাজের সম্পদ থাকা মানুষেরা বইয়ের জন্য টাকা খরচ করাটাকে  চরম অপচয় বলে ভাবে এবং ধন না থাকারা ধার করে হলেও দামি কাপড় চোপড় কেনে বা টিভি কেনে কিন্তু মরলেও বইপত্র কেনে না ?


লেখক পরিচিতি- ১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতা কে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’, ‘বিভিন্ন নরক’, ‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।  




সোমবার, ১৫ জুন, ২০২০

শীলাবতী নদীর অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি- ৩ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার

শীলাবতী নদীর অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃৃষ্টি- ৩
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি



১৮০০-১৮২০ খ্রিস্টাব্দে গড়বেতা ও চন্দ্রকোনা এলাকায় যে নায়েক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তাতে যত্রতত্র লায়কালি গড় বা গুপ্তঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। এইসব গড় বা গুপ্তঘাঁটিগুলিতে নায়েক বিদ্রোহীরা থাকতো তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। কথিত গড়বেতার এই গনগনি ডাঙাতেই ছিল নায়েক বিদ্রোহীদের প্রধান ঘাঁটি। যা ইংরেজরা বোমার আঘাতে ধ্বংস করে দেয়। শীলাবতী নদীর তীরে অবস্থিত এই গনগনি খুলাতেই সম্প্রতি শুটিং হয়েছে জনপ্রিয় বাংলা সিরিয়াল ‘কিরণমালা’র অনেকখানি অংশ যা অনেক দর্শকই দেখেছেন বা এখনো দেখছেন। শীলাবতী অববাহিকা সেই দিক দিয়েও একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে।
   গড়বেতার গনগনিডাঙার কথা বললেই চলে আসে এখানকার দেবী সর্বমঙ্গলার কথা। শীলাবতীর তীরে গড়বেতাতে দেবী সর্বমঙ্গলা এখানে দীর্ঘদিন ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন। এখানকার দেবী খুবই জাগ্রত। এই পুজোকে ঘিরেও ছড়িয়ে আছে অজস্র লোককাহিনি যা গড়বেতার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে মহিমান্বিত করেছে। এলাকার মানুষ দেবী সর্বমঙ্গলাকে খুবই ভক্তি-শ্রদ্ধা করে থাকেন। শুধু এলাকার মানুষ নন, বহু দূর-দূরান্ত থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত ও পূণ্যার্থী ছুটে আসেন এই সর্বমঙ্গলার মন্দিরে। ভক্তিভরে দেবীর চরণে পুজো দেন তারা।
 
   গড়বেতা থেকে আট কিলোমিটার পূর্বে শীলাবতী নদীর তীরেই অবস্থান করছে মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ি। ঐতিহ্যের দিক দিয়ে এটিও একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় এই মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ি আসলে ছিল রাজাদের আমোদ-প্রমোদের বাগানবাড়ি। যা বগড়ীর রাজা ছত্রসিংহ নির্মাণ করেছিলেন। প্রচলন করেছিলেন দুর্গাপুজোর। যা মঙ্গলাপোতার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো নামে পরিচিত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এখানে যে ঘটটি আছে তা আসলে গড়বেতার সর্বমঙ্গলার আসল ঘট। যেটি রাজা ছত্রসিংহ নিয়ে চলে এসেছিলেন জোরপূর্বক। সেই দেবীর ঘট আর ফেরত যায়নি। সেই ঘট এখানে পুঁতে রাজবাহাদুর ছত্রসিংহ এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন। দেবী সর্বমঙ্গলার ঘট এখানে পোঁতা হয়েছিল বলেই এখানকার নাম হয়েছে মঙ্গলাপোতা।
    ইতিহাস অবশ্য অন্য কথাও বলে। মঙ্গলাপোতার এই রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন রাজা গজপতি সিংহ। যাঁর রাজত্বকাল ছিল ১৩৯১-১৪২০ খ্রিস্টাব্দ। এই বংশের নবম রাজা যিনি ছিলেন তাঁর নামও রাজা ছত্রসিংহ। এই ছত্রসিংহের রাজত্বকাল ছিল ইং-১৬২২-১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দ। ইনিও মঙ্গলাপোতাতে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করতে পারেন। তা যাই শীলাবতী অববাহিকায় অবস্থিত এই মঙ্গলাপোতাতে সুপ্রাচীন কাল থেকেই রাজবাড়িতে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। রাজবাড়ির সে বনেদিয়ানা আজ আর নেই, নেই সে আভিজাত্যও। কালের গর্ভে রাজবাড়ি প্রায় ধ্বংসের মুখে। কিন্তু ঐতিহ্য হিসাবে রয়ে গেছে এখানকার পুজো। মঙ্গলাপোতার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো খুবই বিখ্যাত। বহুদূরদূরান্তের মানুষ একসময় এই পুজো দেখতে ভিড় করতেন। এই পুজোকে ঘিরে মানুষের  উত্সারহ ও উদ্দীপনা আর আনন্দের শেষ ছিল না। এখানে ঘটস্থাপন করার ফলে দুর্গাপুজোর সময় যা কিছু হয় তা প্রথমে মঙ্গলাপোতার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোতে হয়-তারপর এখানকার তোপধ্বনি শুনে গড়বেতাতে দেবী সর্বমঙ্গলার পুজো হয়, গড়বেতার সর্বমঙ্গলার পুজোর তোপধ্বনি শুনে গোয়ালতড়ে দেবী সনকা মায়ের পূজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় চারশো তিরিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুর্গাপুজোর এই নিয়মবিধি চলে আসছে এখানে। যা ঐতিহ্যের পরম্পরাকে রক্ষা করছে। মঙ্গলাপোতা রাজবাড়িতে দেবী সর্বমঙ্গলার আসল ঘট থাকা ছাড়াও এখানে আছে রাজবাড়ির নানান ইতিহাস। যা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ। আছে রাজবাড়ির ভগ্ন দেউল, লায়কলি আমলের তৈরি সুড়ঙ্গ অর্থাত্‍ লায়কালি গড়। আছে সেই তরবারি যে তরবারি দিয়ে রাজা সামসের জং বাহাদুর খয়ের মল্লকে পরাজিত করে রাজবাড়ি পুনরুদ্ধার করেন। আছে দেবী সর্বমঙ্গলার ঐতিহাসিক ঘট, কালীবুড়ি এবং রাধাকান্ত জিউ। ১৯৮০ সালে এই রাজবাড়ির অদূরেই জঙ্গল থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল যশোবন্ত সিংহের নাম খোদাই করা তিনটি কামান। দু’টি ব্রোঞ্জের, এবং একটি লোহার। পরে তা কলকাতার প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহশালায় সংরক্ষণের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে।                         
 
   শীলাবতী নদীর অববাহিকার হুমগড় এলাকার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-এলাকায় ‘রামাইত গোস্বামী’দের বসবাস। অনেকগুলি পরিবার এখানে রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় তারা মহারাষ্ট্র থেকে বাংলায় এসে বসবাস করে। আমরা সচরাচর যেটা জানি তা হল ‘গোস্বামী’ পদবী নামধারীরা সাধারণত বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী হয়ে থাকেন। কিন্তু এখানকার হুমগড় এলাকার গোস্বামীরা রামের উপাসক বা রামের ভক্ত। আর রামের উপাসক বলেই এখানকার



সোমবার, ৮ জুন, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃৃষ্টি || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার


শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃৃষ্টি
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

২)

 শীলাবতীর নখ ও চুল গঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে গঙ্গায় মিলিত হবার জন্য বইতে শুরু করে দিয়েছে। এই সংবাদ শুনে পণ্ডা মূর্ছিত হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে এক কূপ গঙ্গাজল ছিল তা উল্টে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সেও নদী হয়ে বইতে থাকে। সেই নদীই জয়পণ্ডা নামে পরিচিত”। 
   নিচের দিকে বইতে থাকে জয়পণ্ডা। কান্তোড় গ্রামের কাছে এসে শীলাবতী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। মূলত এই হল শীলাবতী ও জয়পণ্ডা নদী দুটির সৃষ্টির কাহিনি। এই কাহিনিতে আমরা অসবর্ণ প্রেম ও বিবাহের উপাখ্যান পাই যা অনেকটা প্রাচীন জনজীবনের বাস্তবতার উপর প্রতিষ্ঠিত।
   দ্বিতীয় আর একটি কাহিনি আছে যাতে অনেকটা মহাভারতীয় কচ ও দেবযানী উপাখ্যানের প্রভাব বিদ্যমান। এটি অমিয়বাবুর গেজেটিয়ারে বর্ণিত। কাহিনিটি এইরকম:-
   “জনৈক ঋষির আশ্রমে জয় নামে এক শিষ্য ছিল। জয় আশ্রমের বিদ্যা অর্জন করে পণ্ডিত হয়। তার নাম হয় জয়পণ্ডা বা জয় পণ্ডিত। ঋষি কন্যা শীলাবতীর ইন্দ্রমায়ায় পড়ে যায় জয় এবং তাকে বিবাহ করে নিয়ে যেতে চায়। শীলবতী তার অতি বৃদ্ধ পিতাকে অসহায় একা ফেলে যেতে রাজি ছিল না কিন্তু তত্সবত্ত্বেও জয় তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে নদী হয়ে বয়ে যায়। জয়পণ্ডাও তখন নদী হয়ে বয়ে গিয়ে তার সঙ্গে মিলিত হয়।”
   এর সত্যাসত্য যাই থাক শীলাবতীকে ঘিরে এরকম অজস্র লোককাহিনি ছড়িয়ে আছে যত্রতত্র।   
 
   পুরুলিয়া জেলা ছুঁয়ে বাঁকুড়া জেলার মধ্যে যে অংশটি আছে ঐতিহ্যের দিক থেকে বেশ সমৃদ্ধ। জানা যায় জৈনরা বাংলাদেশের যে অংশটিতে প্রবেশ করে তাদের প্রচার ও অবস্থান নির্দিষ্ট করেছিল তার মধ্যে এই অঞ্চলটিও অন্যতম একটি ক্ষেত্র। বাঁকুড়া জেলার মটগোদা, ভেলাইডিহা, কাপাসখেড়িয়া, সিমলাপাল, জোড়সা, শ্যামসুন্দরপুর প্রভৃতি এলাকায় এখনো যত্রতত্র জৈন মূর্তি ছড়িয়ে আছে। পার্শ্বনাথ, নেমিনাথ, অম্বিকানাথ প্রমুখ জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি গুলি থেকেই বোঝা যায় অনার্য অঞ্চলের সঙ্গেই কতটা জড়িয়ে গিয়েছিল উত্তর সংস্কৃতির জৈন কৃষ্টি। অঞ্চলটির বিভিন্ন গরাম থানে সিনি ঠাকুরের পুজো অর্চনাr প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। আর এই সিনি ঠাকুর সম্পর্কে গবেষকদের ধারণা জৈন তন্ত্র দেব-দেবী থেকেই এই দেবতার সৃষ্টি।
   জোড়শা, দেউলভিড়া(পাঁচমুড়া), হাড়মাসড়া প্রভৃতি জনপদের প্রাচীন দেউলগুলি নানান ইতিহাসের সাক্ষী। সিমলাপাল রাজবাড়ির মন্দিরের দেয়ালে জৈনমূর্তি রয়েছে। হাড়মাসড়ার প্রাচীন জৈন দেউলটির কাছেই পুকুর পাড়ে এক অপূর্ব জৈন মূর্তি পড়ে রয়েছে। এ সবই জৈন কৃষ্টির নিদর্শন।
   পরবর্তীকালে অনার্য সংস্কৃতির সঙ্গে আর্য সংস্কৃতির মিলনের নানা ছবি এই অঞ্চলের ইতিহাসকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। বৌদ্ধ সংস্কৃতিরও অল্প নিদর্শনও মেলে। হিন্দু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাব দশম একাদশ শতাব্দী থেকে পড়তে থাকে দ্রুত। এলাকা থেকে পাওয়া নানা পুঁথি বিষ্ণুপুরের ‘আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকৃতি ভবন’-এ সংরক্ষিত আছে। বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে বৈষ্ণব প্রভাবও যে ছিল তার নিদর্শন দেখি। মল্লভূমে শ্রীনিবাস আচার্যের আগমন ও তাকে ঘিরে সংস্কৃতির যে নব রূপায়ন তাও এই অঞ্চলে পড়তে দেখা যায়।
 
   বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমান্ত এলাকার অনেকখানি জুড়ে শীলাবতী নদী সংলগ্ন ভূমি। গড়বেতার অন্তর্গত বগড়ী, হুমগড়, কান্তোড় প্রভৃতি অঞ্চলগুলি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের মধ্যেই অবস্থিত। মঙ্গলাপোতা, দেউলকুন্দ্রা, সোনাদ্বিপা প্রভৃতি গ্রামাঞ্চলগুলিও আছে। বগড়ী ও হুমগড় অঞ্চলটির ইতিহাস উল্লেখযোগ্য ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস থেকে জানা যায় কয়েক শতাব্দী আগে এখানেই গড়ে উঠেছিল অচ রাজ্য। বগড়ীতেই ছিল তার রাজধানী। বিখ্যাত কৃষ্ণরায়ের(কিষ্ট রায়) দেউল শীলাবতীর ধারে আজও আছে। মায়তা গ্রামে তার একটি অংশ আজও বিদ্যমান। এই বগড়ীর দোলমেলা বিখ্যাত একটি মেলা রূপে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতিবছর দোল পূর্ণিমার সময় এই মেলা বসে।  বগড়ী রাজবাড়িরই রাজ সেনাপতি অচল সিং-এর নেতৃত্বে ইংরেজদের সঙ্গে বিখ্যাত ‘নায়েক বিদ্রোহ’ বা লায়কালি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই নায়েক বিদ্রোহের কথা বলতে গেলে গড়বেতার গনগনি খুলা বা গনগনি ডাঙার কথা এসে পড়বে। যে গনগনি খুলা বা ডাঙা আজ পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র বা গুরুত্বপূর্ণ পিকনিক স্পট হিসাবে প্রখ্যাতি লাভ করেছে। এই গনগনি ডাঙার অবস্থান একেবারে শীলাবতী নদীর তীর ঘেঁষে। স্থানীয় ইতিহাস বলছে – ভয়ঙ্কর অথচ আশ্চর্য সুন্দর এই যে গনগনি ডাঙা তা একসময় শ্বাপদসঙ্কুল ও বিপজ্জনক ছিল। মানুষজন এখানে খুব একটা আসত না। নেকড়ে বা অন্যান্য হিংস্র পশুর আবাস্থল ছিল এই জায়গাটা। শোনা যায়- গড়বেতা হাসপাতালে আগে কোনো মর্গ ছিল না। মানুষ মারা গেলে এই গনগনি খুলাতে ফেলে দিয়ে যাওয়া হত। একসময় বহু নরকঙ্কাল এখানে ঝুলে থাকতে দেখা গেছে।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...