রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রামলালের পথ ।। ড.সৌমিত্র রায় ।। ছোট গল্প, Short Story


ছোট গল্প 

রামলালের পথ  

ড. সৌমিত্র রায়



শালবনীর ভোর তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। শালপাতার ডগায় শিশির, দূরে মোরগের ডাক, আর কুয়াশায় ঢাকা জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল মড়মড় করে ডাল ভাঙার শব্দ। ফুলমণি দাওয়ায় দাঁড়িয়ে কান পেতে রইল। আবার শব্দ হল। সে ফিসফিস করে বলল, “দাদু, কে ওখানে?” ঘর থেকে হরিপদ বেরিয়ে এসে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। “ও তো রামলাল!” ফুলমণির চোখ আনন্দে বড় হয়ে গেল। “রামলাল! সত্যি?” কুয়াশার পর্দা সরতেই বিশাল শরীরটা দেখা গেল। ধীর পায়ে রাস্তার ধারে এগিয়ে আসছে রামলাল। ফুলমণি দৌড়তে যাবে, এমন সময় হরিপদ তার হাত ধরে ফেলল। “দূরে থাক!” “কেন দাদু? ও তো রামলাল! ও তো আমাদের চেনে।” হরিপদ মৃদু হেসে বলল, “চেনে বলেই তো দূরত্বটা মানতে হবে। মনে রাখিস, রামলাল আমাদের পরিচিত, কিন্তু পোষা নয়।” ফুলমণি একটু অভিমান করে বলল, “তাহলে সবাই ওকে এত ভালোবাসে কেন?” হরিপদ বলল, “ভালোবাসে বলেই ওকে নিজের মতো থাকতে দিতে হবে। ভালোবাসা মানে কাছে গিয়ে গায়ে হাত দেওয়া নয়। কখনও কখনও দূরে দাঁড়িয়ে তার পথটা খালি করে দেওয়াই ভালোবাসা।”

রামলাল ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের এক বৃদ্ধা নিজের বাড়ির দাওয়ায় একটি বড় পাত্রে জল রেখে সরে দাঁড়ালেন। ফুলমণি অবাক হয়ে বলল, “দাদু, দেখলে? ঠাকুমা ওর জন্য জল রেখে দিল!” হরিপদ বলল, “গরমের দিনে অনেকে জল দেয়। কেউ চাল দেয়, কেউ সবজি দেয়। রামলাল এই গ্রামের কাছে অন্যরকম।” “অন্য হাতিরা কি অন্যরকম?” হরিপদ এবার একটু গম্ভীর হল। “হ্যাঁ। রামলালকে মানুষ চেনে। অন্য হাতির পাল এলেই কিন্তু মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। ধান নষ্ট হয়, বাড়ি ভাঙে, রাত জেগে পাহারা দিতে হয়। কখনও মানুষ আহত হয়, কখনও প্রাণও যায়। আবার সেই হাতিরাও মানুষের তৈরি বিদ্যুতের তারে, রেললাইনে, রাস্তা বা যানবাহনের সঙ্গে সংঘাতে প্রাণ হারায়। তাই গল্পটা শুধু রামলালের ভালোবাসার গল্প নয়, ফুলমণি। গল্পটা মানুষ আর হাতি—দু’জনের বাঁচার গল্প।”

এই সময়েই জঙ্গলমহলে এল অর্কদীপ সেন। কলকাতার একটি সংবাদপত্রের তরুণ সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার। কাঁধে ক্যামেরা, পিঠে ব্যাগ, হাতে নোটবুক। অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে হাতির উপদ্রবের ছবি তুলতে। ফোনে সম্পাদক বলেছিলেন, “অর্ক, ভালো ছবি চাই। ফসলের ক্ষতি, বাড়িঘর ভাঙা, মানুষের আতঙ্ক—সব নথিবদ্ধ করো।” অর্কদীপ জিজ্ঞেস করেছিল, “হাতিদের দিকটাও লিখব?” ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সম্পাদক বলেছিলেন, “খবরের মতো কিছু পেলে লিখবে।” ফোন কেটে যাওয়ার পর অর্কদীপ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তাহলে দেখি, জঙ্গলমহল আসলে কী গল্প বলে।”

প্রথম দিনেই সে বুঝল, এই জঙ্গল শুধু হাতির নয়, মানুষেরও। ভোরে গ্রামের কয়েকজন মহিলা বাঁশের ঝুড়ি হাতে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিলেন। অর্কদীপ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছেন?” একজন মহিলা বললেন, “জঙ্গলে।” “কী আনবেন?” “ছাতু।” অর্কদীপ অবাক হয়ে বলল, “ছাতু?” মহিলা হেসে বললেন, “হ্যাঁ বাবু। বর্ষার পরে জঙ্গলে অনেক ছাতু ওঠে। চেনা ছাতু তুলে আনি। কিছু বাড়িতে রান্না হয়, কিছু হাটে বিক্রি করি।” “শহরেও যায়?” “যায় তো। ব্যবসায়ীরা নিয়ে যায়। ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর হয়ে শহরের বাজারেও যায়। আমাদের কাছে জঙ্গল শুধু জঙ্গল নয় বাবু—খাবার, রোজগার, জীবন।” অর্কদীপ ক্যামেরা তুলল। ক্লিক। ভেজা শালপাতা, বাঁশের ঝুড়ি আর তাতে সাজানো ছাতু তার ক্যামেরায় বন্দি হল।

দুপুরে হরিপদের বাড়িতে বসে অর্কদীপ সেই ছবি দেখাচ্ছিল। ফুলমণি পাশে বসে বলল, “সব ছাতু কিন্তু খাওয়া যায় না।” অর্কদীপ বলল, “তুমি চেনো?” ফুলমণি গর্ব করে বলল, “আমাদের গ্রামের সবাই চেনে। ভুল ছাতু খেলে কিন্তু বিপদ।” হরিপদ বলল, “জঙ্গলকে চেনা সহজ নয় বাবু। কোন ছাতু খাওয়া যায়, কোনটা বিষ, কোথায় সাপ, কোথায় হাতির পথ—সব জানতে হয়।” অর্কদীপ বলল, “শহরের মানুষ ভাবে জঙ্গল মানেই শুধু গাছ আর পশু।” হরিপদ হেসে বলল, “শহরের মানুষ জঙ্গলকে দূর থেকে দেখে। আমরা জঙ্গলের সঙ্গে থাকি।”

দুপুরে ফুলমণি অর্কদীপের সামনে পান্তাভাতের থালা রেখে দিল। সঙ্গে কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ, নুন আর আলুভর্তা। “নিন,” ফুলমণি বলল। অর্কদীপ হেসে বলল, “এটা আবার কী?” “পান্তাভাত। শহরে খাননি?” “খেয়েছি। কিন্তু এভাবে নয়।” হরিপদ বলল, “এখানে পান্তাভাত শুধু খাবার নয় বাবু। গরমের দিনে এটাই ভরসা।” অর্কদীপ একমুঠো ভাত মুখে দিয়ে বলল, “সত্যিই তো!” হরিপদ ধীরে ধীরে বলল, “এই মাটিতেই ধান হয়। এই মাটির ধান মানুষ খায়। আবার হাতিও সেই ধানের গন্ধ পায়। সেখান থেকেই অনেক ঝামেলা।” ফুলমণি প্রশ্ন করল, “দাদু, তাহলে দোষ কার?” হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। “শুধু মানুষকে দোষ দিলে সত্যি বলা হবে না। শুধু হাতিকেও দোষ দিলে হবে না। আসল কথা হল—দু’জনের পথ কোথায়?” অর্কদীপ নোটবুকে লিখল—“দু’জনের পথ কোথায়?”

সন্ধ্যায় অর্কদীপ অরুণবাবুর সঙ্গে দেখা করল। অরুণবাবু গ্রামের স্কুলের শিক্ষক, কিন্তু বইয়ের বাইরেও জঙ্গল, প্রাণী আর গ্রামের জীবন নিয়ে তার দীর্ঘদিনের আগ্রহ। অর্কদীপ জিজ্ঞেস করল, “স্যার, আমরা তো প্রতিদিন শুনি হাতির উপদ্রব। কিন্তু সমস্যাটা আসলে কত বড়?” অরুণবাবু বললেন, “ছোট নয় অর্ক। পশ্চিমবঙ্গে ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের দীর্ঘ সময়ের হিসাব দেখলে ছবিটা উদ্বেগজনক। মানব–হাতি সংঘাতের ২,০৫৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ১,৭৬১ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ২৯৮ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৭৫৩টি হাতির মৃত্যুর ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে।” ফুলমণি বিস্ময়ে বলল, “এত মানুষ? এত হাতি?” অরুণবাবু মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ। তাই এটাকে শুধু ‘হাতির উপদ্রব’ বললে পুরো সত্যিটা বলা হয় না।”

অর্কদীপ বলল, “হাতিগুলো কীভাবে মারা যায়?” অরুণবাবু বললেন, “বিভিন্নভাবে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, রেললাইনে ট্রেনের ধাক্কায়, মানুষের সঙ্গে সংঘাতে, কখনও শিকার বা বিষপ্রয়োগের মতো কারণেও। অর্থাৎ মানুষ যেমন হাতির কারণে প্রাণ হারায়, হাতিও মানুষের তৈরি নানা বিপদের শিকার হয়।” হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ফসল বাঁচাতে গিয়ে যদি হাতি মরে, আর হাতি তাড়াতে গিয়ে মানুষ মরে—তাহলে সেটা কেমন বাঁচা?” ঘরে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।

অর্কদীপ আবার জিজ্ঞেস করল, “শুধু হাতির ক্ষেত্রেই কি এমন?” অরুণবাবু বললেন, “না। হাতি বড় প্রাণী বলে তার সংঘাত আমাদের চোখে বেশি পড়ে। কিন্তু বনভূমি আর মানুষের বসতি যখন কাছাকাছি চলে আসে, তখন নানা বন্যপ্রাণের সঙ্গে মানুষের সংঘাত হতে পারে। কোথাও বুনো শূকর ফসল নষ্ট করে, কোথাও গৌর বা বাইসন লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, কোথাও চিতাবাঘকে ঘিরে আতঙ্ক তৈরি হয়। বনপ্রান্তে গবাদি পশু, খাবার, জল কিংবা মানুষের চলাচলও কখনও বন্যপ্রাণের সঙ্গে সংঘাতের কারণ হতে পারে।”

ফুলমণি বলল, “তাহলে সব প্রাণীই কি মানুষের শত্রু?”

অরুণবাবু হেসে বললেন, “না। আর মানুষও বন্যপ্রাণের শত্রু নয়। সমস্যা হয় যখন দু’জনের বেঁচে থাকার জায়গা একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে।”

অর্কদীপ বলল, “তাহলে হাতিরা বারবার গ্রামে আসে কেন?”

অরুণবাবু মাটিতে কাঠি দিয়ে একটা রেখা টেনে বললেন, “ধরো, এইটা জঙ্গল। এই পথ দিয়ে বহু বছর ধরে হাতিরা চলেছে। তারপর এখানে রাস্তা হল, এখানে বাড়ি হল, এখানে বিদ্যুতের লাইন গেল, এখানে ধান চাষ শুরু হল। হাতির কাছে কিন্তু সেই পুরনো পথের স্মৃতি মুছে যায়নি। ফলে যে পথ একসময় জঙ্গলের ছিল, সেটাই আজ মানুষের বসতি বা কৃষিজমির মধ্যে পড়েছে।”

“তাহলে করিডর?” অর্কদীপ প্রশ্ন করল।

“হ্যাঁ, হাতির চলাচলের নিরাপদ করিডর খুব গুরুত্বপূর্ণ। করিডর শুধু হাতির রাস্তা নয়, মানুষের নিরাপত্তার পথও। হাতির চলাচলের নিরাপদ সংযোগ থাকলে লোকালয়ে ঢোকার চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।”

ফুলমণি বলল, “হাতিরা কি এত দূর হাঁটে?”

অরুণবাবু বললেন, “খাবার, জল আর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হাতি অনেক দূর যেতে পারে। তাদের চলাচলের পথ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই একটা পথ বন্ধ করে দিলে সমস্যা শুধু সেই জায়গায় থেমে থাকে না।”

সেই রাতেই খবর এল—গ্রামের ধানক্ষেতে হাতির পাল ঢুকেছে।

চারদিকে চিৎকার পড়ে গেল।


“হাতি এসেছে!”

“সবাই বেরোও!”

“ধান শেষ করে দেবে!”

হরিপদ বাইরে এসে চেঁচিয়ে বলল, “কেউ কাছে যাস না!”

এক যুবক বলল, “কাকা, চুপ করে থাকলে তো সব ধান খেয়ে দেবে!”

হরিপদ বলল, “ধান আবার হবে। মানুষ মরলে মানুষ ফিরে আসবে?”

অর্কদীপ ক্যামেরা হাতে এগোচ্ছিল।

হরিপদ তাকে বলল, “তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

“ছবি তুলতে।”

“কতটা দূর থেকে?”

অর্কদীপ একটু হেসে বলল, “যতটা দূর থেকে বেঁচে থাকা যায়।”

“তাহলে যা। কিন্তু সাহস দেখাতে যাস না।”

অন্ধকারের মধ্যে হাতির পাল দেখা গেল। সামনে বড় কয়েকটি হাতি, মাঝখানে ছোট হাতি। ধানের গন্ধে তারা এগিয়ে এসেছে। গ্রামের মানুষের চিৎকারে হাতিরা অস্থির হয়ে উঠল। ফুলমণি অর্কদীপের পাশে এসে ফিসফিস করে বলল, “ছবি তুলছেন না?” অর্কদীপ ক্যামেরা নামিয়ে বলল, “না।” “কেন?” “ওদেরও ভয় লাগছে।” “হাতির আবার ভয় লাগে?” “যখন চারদিক থেকে মানুষ চিৎকার করে, তখন কার না ভয় লাগে?” ফুলমণি আর কথা বলল না।

পরদিন ভোরে ক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে কৃষক গদাধর মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিল। ধানের বেশির ভাগটাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। অর্কদীপ তার পাশে বসে বলল, “কতটা ক্ষতি হয়েছে?” গদাধর শুকনো গলায় বলল, “এই ধান দিয়ে মেয়ের বিয়ের খরচের কিছুটা মেটাব ভাবছিলাম। এখন কী করব জানি না।” অর্কদীপ ক্যামেরা তুলেছিল, কিন্তু ছবি তুলতে পারল না। গদাধর বলল, “ছবি তুলুন বাবু। কিন্তু শুধু আমার ভাঙা ধান দেখাবেন না। লিখবেন, এই ধানটাই আমার সংসার।” অর্কদীপ বলল, “লিখব।”

কয়েকদিন পর অর্কদীপ আবার অরুণবাবুর কাছে গেল। “মানুষের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেই কি সমস্যা মেটে?” অরুণবাবু বললেন, “ক্ষতিপূরণ জরুরি, কিন্তু শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে সংঘাত কমে না। আগে সংঘাত কোথায় হচ্ছে তা বুঝতে হবে। তারপর আগাম সতর্কবার্তা, দ্রুত বনকর্মীদের পৌঁছনোর ব্যবস্থা, নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, রেলপথে সতর্কতা, ফসল রক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং হাতির চলাচলের পথ রক্ষা—সব একসঙ্গে ভাবতে হবে।” অর্কদীপ বলল, “অর্থাৎ শুধু হাতি তাড়ালে হবে না?” অরুণবাবু মাথা নাড়লেন। “আজ তাড়ালে কাল আবার আসবে। কারণ পথটা তার। আমরা যদি তার পথ বন্ধ করি, সে আমাদের পথেই আসবে।”

তারপর এল সেই দুঃখের দিন। চ্যাংশোলের এক কিশোর রামলালকে দেখতে গিয়েছিল। রামলালকে ঘিরে মানুষের ভিড় জমেছিল। কে আগে দেখবে, কে কাছে যাবে—এই উত্তেজনার মধ্যে ট্রাক্টরের কাছে ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। কিশোরটি গুরুতর আহত হল। পরে আর বাঁচানো গেল না।

খবরটা শুনে ফুলমণি স্তব্ধ হয়ে গেল। “দাদু... রামলালকে দেখতে গিয়েই যদি কেউ মারা যায়, তাহলে রামলাল কি খারাপ?” হরিপদ বলল, “না রে। রামলাল খারাপ নয়।” “তাহলে?” “ভালোবাসারও নিয়ম আছে।” অর্কদীপ বলল, “রামলালকে দেখতে গেলে যদি আমরা খুব কাছে চলে যাই, বিপদ আমাদেরও, রামলালেরও।” ফুলমণি ধীরে বলল, “তাহলে ওকে ভালোবাসব কীভাবে?” হরিপদ বলল, “দূর থেকে।” “কত দূর?” “যতটা দূর থেকে ও নিজের মতো থাকতে পারে।”

এর কিছুদিন পর রামলালের পায়ে আঘাতের খবর এল। তার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। গ্রামের মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। ফুলমণি ছুটে এসে বলল, “দাদু, রামলাল অসুস্থ?” “হ্যাঁ।” “ও কি আবার হাঁটতে পারবে?” হরিপদ বলল, “বন দফতর দেখছে। আশা রাখ।” এক বৃদ্ধ বললেন, “রামলালের কিছু হলে জঙ্গলটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাবে।” অন্যজন বলল, “ও তো আমাদেরই একজন হয়ে গেছে।” অর্কদীপ শুনছিল। সে বলল, “আপনারা ওকে এত ভালোবাসেন?” বৃদ্ধটি বললেন, “ভালোবাসি বাবু। কিন্তু তাই বলে ওকে ঘরে পুষব নাকি? ওর ঘর জঙ্গলেই।” কথাটা অর্কদীপের মনে গেঁথে গেল।

কয়েকদিন পর রামলালকে আবার হাঁটতে দেখা গেল। ফুলমণি আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “দাদু! দাদু! রামলাল হাঁটছে!” হরিপদের চোখে জল এসে গেল। “হাঁটুক। নিজের জঙ্গলের পথে হাঁটুক।” অর্কদীপ ছবি তুলল। কিন্তু তার অনুসন্ধান তখনও শেষ হয়নি।

এক রাতে অফিসের নির্দেশ ছাড়াই অর্কদীপ আবার জঙ্গলে বেরিয়ে পড়ল। সহকর্মী ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিল, “এত রাতে কোথায়?” অর্কদীপ বলেছিল, “হাতির পথ দেখতে যাচ্ছি।” “অফিস তোকে বলেনি!” “অফিস খবর চায়। আমি গল্প খুঁজতে যাচ্ছি।”

জঙ্গলের ধারে গাড়ি থামতেই হরিপদ বলল, “আলো নিভিয়ে দে।” “কেন?” “সামনে হাতি আছে।” অর্কদীপ নিঃশব্দে ক্যামেরা হাতে নিল। দূরে গাছ ভাঙার শব্দ। তারপর হাতির ডাক।

চাঁদের আলোয় দেখা গেল একটি বড় পাল রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে মানুষের বসতি। পিছনে জঙ্গল। মাঝখানে রাস্তা, বিদ্যুতের খুঁটি আর মানুষের তৈরি বাধা।

অর্কদীপ ফিসফিস করে বলল, “এটাই কি ওদের পুরনো পথ?”

হরিপদ বলল, “ছিল।”

“এখন?”

“এখন রাস্তা।”

অর্কদীপের বুকটা হঠাৎ ভার হয়ে গেল। “তাহলে ওরা যাবে কোথায়?”

হরিপদ ধীরে বলল, “ওরা পথ হারায়নি বাবু। আমরা ওদের পথ বদলে দিয়েছি।”


হাতির পাল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে অন্যদিকে চলে গেল। অর্কদীপ ক্যামেরা তুলেছিল। কিন্তু ছবি তুলল না।


সে শুধু বলল, “এটাই তো আসল খবর।”


পরদিন অর্কদীপ তার সংবাদপত্রের জন্য দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখল। শিরোনাম দিল—“রামলালের পথ কোথায়?” প্রতিবেদনে সে লিখল, “রামলালকে জঙ্গলমহলের মানুষ ভালোবাসে। কিন্তু রামলালের মতো পরিচিত প্রতিটি হাতিকে মানুষ চেনে না। অনেক হাতির পাল ফসলের ক্ষতি করে, বাড়িঘর ভাঙে, মানুষের জীবনে আতঙ্ক তৈরি করে। আবার মানুষের তৈরি বিদ্যুতের তার, রেললাইন ও অন্যান্য বিপদের কারণে হাতিও প্রাণ হারায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বনভূমির খণ্ডিত হওয়া, রাস্তা, রেল, বসতি ও কৃষিজমির বিস্তার। একই ভূদৃশ্যের ওপর মানুষ ও বন্যপ্রাণের নির্ভরতা বাড়লে সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়ে। তাই সমস্যাটিকে শুধু ‘হাতির উপদ্রব’ বলে দেখলে পুরো সত্যিটা ধরা পড়ে না।”


সে আরও লিখল, “জঙ্গলমহলের মানুষের জীবনও জঙ্গলের সঙ্গে জড়িত। পান্তাভাতের ধান আসে এই মাটি থেকে, বর্ষার ছাতু অনেক পরিবারের খাবার ও আয়ের উৎস, মহুয়া ও অন্যান্য বনজ সম্পদও বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তাই বন সংরক্ষণ মানে শুধু প্রাণী সংরক্ষণ নয়; বননির্ভর মানুষের জীবন ও জীবিকাকেও বোঝা।”


প্রতিবেদনের শেষ লাইনে অর্কদীপ লিখল, “মানুষের জন্য নিরাপদ জীবন, হাতির জন্য নিরাপদ পথ এবং বন্যপ্রাণের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখলে সমাধান মিলবে না। সহাবস্থান কোনও আবেগের কথা নয়; এটি পরিকল্পনা, বিজ্ঞান, সতর্কতা এবং মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়।”


পরদিন সকালে সম্পাদক ফোন করলেন।

“অর্কদীপ।”

“হ্যাঁ, স্যার।”

“তুই অফিসের নির্দেশের বাইরে গিয়েছিলি।”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু একটা কথা বলি—এই রিপোর্টটাই আমাদের দরকার ছিল।”

অর্কদীপ হেসে বলল, “স্যার, আমি প্রথমে হাতির ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম, আসলে মানুষেরও ছবি তুলছি।”

কয়েক মাস পর গ্রামের স্কুলে অরুণবাবু নতুন ক্লাস নিলেন।

“বল তো ফুলমণি, হাতি দেখলে কী করবে?”

“দূরে থাকব।”

“আর?”

“ভিড় করব না।”

“আর?”

“দৌড়ে কাছে যাব না।”

“আর?”

“বন দফতরকে খবর দেব।”

অরুণবাবু হাসলেন। “খুব ভালো। আর রামলাল হলে?”

ফুলমণি একটু হেসে বলল, “ও হলেও একই নিয়ম।”

“কেন?”

ফুলমণি এবার নিজেই উত্তর দিল, “কারণ রামলাল আমাদের চেনে, কিন্তু ও হাতি। আর ওর নিজের একটা পথ আছে।”

অরুণবাবু বললেন, “এই কথাটাই মনে রাখবে।”


সেদিন বিকেলে ফুলমণি দাওয়ায় দাঁড়িয়ে দেখল, রামলাল ধীরে ধীরে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে দৌড়াল না।


হরিপদ বলল, “আজ কাছে যাবি না?”

ফুলমণি মাথা নাড়ল।

“না দাদু। ওর পথটা খালি রাখব।”

অর্কদীপ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা হাতে সেই দৃশ্য দেখছিল।

ফুলমণি তাকে দেখে বলল, “ছবি তুলছেন না?”

অর্কদীপ মৃদু হেসে বলল, “আজ না।”

“কেন?”

“আজ ছবির চেয়ে মুহূর্তটা বড়।”

রামলাল ধীরে ধীরে শালের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বাতাসে পাতার শব্দ। দূরে পাখির ডাক। ফুলমণি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

হরিপদ ধীরে বলল, “মানুষ বাঁচুক, হাতিও বাঁচুক।”

ফুলমণি বলল, “আর দু’জনেরই নিজের নিজের পথ থাকুক।”

অর্কদীপ নোটবুক বন্ধ করল।

তার মনে হল—এতদিন সে খবর লিখেছে। আজ সে একটি পথের গল্প লিখল।

রামলালের পথ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...