শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

বঙ্গতীর্থ ( এক ভূখণ্ডের ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও পুনর্জাগরণের মহাযাত্রা ) । ড. সৌমিত্র রায়, উপন্যাস, Bangoteertha, Dr. Soumitra Roy,

বঙ্গতীর্থ

(এক ভূখণ্ডের ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও পুনর্জাগরণের মহাযাত্রা)

ড. সৌমিত্র রায়

প্রথম পর্ব ।। নতুন সকাল 



  পৌষের শেষ দিকের সকাল। পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে তখনও শীতের আমেজ পুরোপুরি কাটেনি। রাতের শিশিরে ভিজে রয়েছে ধানখেতের আল, পুকুরপাড়ের ঘাস এবং গ্রামের মেঠো রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাশবনের শুকনো ডগাগুলি। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দূরে শালবনের মাথার উপর দিয়ে একঝাঁক পাখি উড়ে গেল। কোনও একটি বাড়ির উঠোনে শোনা গেল ঢেঁকির শব্দ। আর একটু দূরে মাটির উনুনে সকালের চায়ের জল বসিয়েছেন গ্রামের এক বৃদ্ধা।

গ্রামটির নাম শালডাঙা। মানচিত্রে নামটি খুব বড় করে খুঁজে পাওয়া যাবে না। জেলার সদর শহর থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে, পাকা রাস্তা ছেড়ে একটি সরু লালমাটির পথ ধরে এগোলে গ্রামটি চোখে পড়ে। গ্রামটির একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে শাল, পিয়াল ও মহুয়ার জঙ্গল। মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছে একটি ছোট নদী। বর্ষায় নদীটি যৌবন ফিরে পায়, শীতকালে তার বুকে জেগে ওঠে বালির চর।

এই গ্রামেই আজ একটি হিন্দু সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রস্তুতি চলেছে। স্থানীয় স্বয়ংসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন, আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বিভিন্ন পাড়ার মানুষকে। সম্মেলনটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের স্থানীয় কর্মীরা। গ্রামের স্কুলমাঠের পাশে বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়েছে মঞ্চ। মঞ্চের পিছনে গেরুয়া রঙের কাপড়, সামনে বসার জন্য শতরঞ্চি। মাঠের একদিকে পানীয় জলের ব্যবস্থা, অন্যদিকে রান্নার আয়োজন।

সকাল আটটার আগেই লোকজন আসতে শুরু করল।

কেউ এসেছেন সাইকেলে, কেউ মোটরবাইকে, কেউ আবার হেঁটে। পাশের গ্রাম থেকে কয়েকজন বৃদ্ধ এসেছেন লাঠিতে ভর দিয়ে। মহিলাদের একটি দল নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে মাঠের দিকে এগিয়ে চলেছেন। কয়েকজন তরুণের হাতে গেরুয়া পতাকা। তাদের চোখেমুখে উৎসাহ।

এই সমস্ত দৃশ্য থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনিরুদ্ধ মিত্র।

বয়স সাতচল্লিশ। জন্ম এই পশ্চিম মেদিনীপুরেরই এক গ্রামে। পড়াশোনা কলকাতায়। পেশায় গবেষক ও লেখক। দীর্ঘদিন ধরে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর বিশেষ আগ্রহ বাংলার গ্রামীণ সমাজের ইতিহাস, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিচয় এবং ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরা নিয়ে।

অনিরুদ্ধ কোনও রাজনৈতিক দলের পদাধিকারী নন। কোনও সংগঠনের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবেও আসেননি। তাঁর কাছে প্রতিটি সামাজিক সমাবেশ একটি চলমান সমাজকে বোঝার সুযোগ। মানুষের মুখের ভাষা, চোখের অভিব্যক্তি, পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশ্বাস এবং অবিশ্বাস—সবকিছুই তিনি পর্যবেক্ষণ করেন।

আজও তাঁর কাঁধে একটি পুরনো চামড়ার ব্যাগ। ব্যাগের ভিতরে একটি ডায়েরি, দুটি কলম, কয়েকটি বই এবং ছোট একটি ক্যামেরা।

তিনি মাঠের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন, বাংলার গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু প্রতিটি সময়ে তার প্রকাশের ভাষা বদলায়। কখনও তা মন্দিরকে কেন্দ্র করে, কখনও সামাজিক সংগঠনকে ঘিরে, কখনও আবার রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে সামনে আসে।

সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে পাশের চায়ের দোকানে গেলেন তিনি।

দোকানটির মালিক নিতাই দোলুই। বয়স পঞ্চান্ন। বহু বছর ধরে এই দোকান চালাচ্ছেন। গ্রামের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের কর্মীই তাঁর দোকানে চা খান। নিতাই নিজে কোনও রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন। তাঁর কাছে ক্রেতার পরিচয়ের চেয়ে চায়ের দাম মিটিয়ে দেওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অনিরুদ্ধকে দেখে নিতাই বললেন, “আরে, আপনি এসেছেন! আজ তো বড় সম্মেলন হবে। অনেক লোক আসবে শুনছি।”

অনিরুদ্ধ হাসলেন। “তোমার দোকানের ব্যবসাও ভালো হবে নিশ্চয়ই।”

“সে আর বলতে! তবে শুধু চা বিক্রি করে কি আর সংসার চলে? ছেলে কলকাতায় কাজ খুঁজছে। মেয়েটার বিয়ে দিতে হবে। ধান চাষে লাভ নেই। সার, বীজ, ডিজেল—সবকিছুর দাম বেড়েছে।”

অনিরুদ্ধ চায়ের কাপ হাতে নিলেন।

দোকানে তখন আরও কয়েকজন বসে আছেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক, নাম হরিপদ জানা। আরেকজন স্থানীয় কৃষক, গোপাল মাহাতো। তৃতীয়জন তরুণ, নাম সুমন বাগদি। সুমন কলেজে পড়ে, পাশাপাশি একটি ছোট ব্যবসা করে।

হরিপদবাবু খবরের কাগজ ভাঁজ করতে করতে বললেন, “রাজনীতি নিয়ে যত কথা হচ্ছে, গ্রামের স্কুলটার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। শিক্ষক কম, পড়াশোনার মান কমছে। ছেলেমেয়েরা মাধ্যমিকের পর শহরে চলে যাচ্ছে। গ্রামের উন্নয়ন শুধু রাস্তা বানালে হয় না।”

গোপাল মাহাতো সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “রাস্তা না থাকলে আবার ফসল বাজারে নিয়ে যাব কী করে? আগে রাস্তা হোক, তারপর স্কুল হবে।”

সুমন এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার বলল, “আমাদের প্রজন্মের সমস্যা অন্য। আমরা পড়াশোনা করছি, কিন্তু কাজ কোথায়? গ্রামের ছেলেরা চাকরি না পেলে শহরে যাবে। শহরে গিয়েও সবাই কাজ পাবে না।”

অনিরুদ্ধ তাদের কথা শুনছিলেন।

একটি সম্মেলনের সকাল, অথচ গ্রামের মানুষের আলোচনায় উঠে আসছে শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক প্রত্যাশা। ধর্মীয় পরিচয় তাদের জীবনের একটি অংশ, কিন্তু জীবন কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে কয়েকজন স্বয়ংসেবক এগিয়ে গেলেন। তাঁদের একজন দোকানে এসে নিতাইকে বললেন, “কাকু, সম্মেলনে আসবেন কিন্তু। আজ সমাজের ঐক্য নিয়ে আলোচনা হবে।”

নিতাই বললেন, “যাব বাবা, একটু পরে যাব।”

অনিরুদ্ধ এবার সুমনের দিকে তাকালেন।

“তোমাদের পাড়ায় কতজন আসছে?”

সুমন বলল, “অনেকেই যাবে। আমাদের পাড়ার ছেলেরা প্রস্তুতিতে সাহায্য করেছে। তবে একটা কথা বলি, দাদা—সমাজের ঐক্যের কথা বলা সহজ। কিন্তু আমাদের সমাজের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে বড় হলে তাদের নেতৃত্বের জায়গায় কতটা দেখা যায়, সেটাও তো ভাবতে হবে।”

অনিরুদ্ধ প্রশ্ন করলেন, “কী বলতে চাইছ?”

“আমরা বাগদি। আমাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে কত ইতিহাসের কথা শুনি। রাজা ছিল, দুর্গ ছিল, যুদ্ধ ছিল—কিন্তু স্কুলের বইয়ে এসব কোথায়? এখন আমাদের পরিচয় বলতে শুধু তপশিলি জাতি। আমাদের ইতিহাস, আমাদের গৌরব, আমাদের দুঃখ—সবকিছু নিয়েই তো গবেষণা হওয়া উচিত।”

হরিপদবাবু কথায় যোগ দিলেন, “ইতিহাসের একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, যে ইতিহাস লেখা হয়নি, পরবর্তী প্রজন্ম তাকে জানবে কী করে?”

অনিরুদ্ধের চোখে আগ্রহ ফুটে উঠল।

“তোমরা কোন বাগদি রাজার কথা শুনেছ?”

সুমন একটু ভেবে বলল, “ফুরফুরার দিকের এক বাগদি রাজার কথা শুনেছি। আবার আমাদের এখানে অনেকে গড়বেতার বাগড়ী রাজ্যের কথা বলেন। আদি মল্লের কথাও শুনেছি। তবে কোনটা ইতিহাস, কোনটা লোককথা, সবটা জানি না।”

অনিরুদ্ধ বললেন, “এই জানার আগ্রহটাই গুরুত্বপূর্ণ। লোকস্মৃতি ইতিহাসের একটি সূত্র। কিন্তু সেটাকে দলিল, প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য এবং সমকালীন বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। বাংলার আঞ্চলিক রাজশক্তির ইতিহাসে অনেক বিষয় এখনও আরও গবেষণার দাবি রাখে।”

সুমন বলল, “আপনি লিখবেন এসব নিয়ে?”

অনিরুদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “চেষ্টা করছি। বাংলার ইতিহাস শুধু রাজধানীর ইতিহাস নয়। গ্রামের ইতিহাসও বাংলার ইতিহাস।”

সকাল সাড়ে দশটার দিকে সম্মেলন শুরু হল।

মাঠে তখন বেশ ভিড়। আশপাশের কয়েকটি গ্রাম থেকেও মানুষ এসেছেন। মঞ্চে উপস্থিত স্থানীয় সংগঠক, কয়েকজন অতিথি এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি। উদ্বোধনের আগে শঙ্খধ্বনি শোনা গেল। তারপর প্রদীপ প্রজ্বলন।

একজন প্রবীণ সংগঠক বক্তব্য শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ছাপ।

তিনি বললেন, হিন্দু সমাজের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। জাতপাতের বিভাজন, সামাজিক দূরত্ব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর না হলে সমাজের ঐক্য সম্ভব নয়। ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সেবা এবং সামাজিক দায়িত্বের কথাও তিনি বললেন।

এরপর বক্তৃতা করলেন এক তরুণ শিক্ষক। তিনি বললেন, “আমরা যদি শুধু অতীতের গৌরব নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু বর্তমানের দুর্বলতা দূর না করি, তাহলে ভবিষ্যৎ তৈরি হবে না। গ্রামের শিশুর শিক্ষা, মেয়েদের নিরাপত্তা, যুবকদের কর্মসংস্থান, মাদকবিরোধী সচেতনতা—এসবকেও সামাজিক কাজের অংশ করতে হবে।”

অনিরুদ্ধ মন দিয়ে শুনছিলেন।

সম্মেলনের এক পর্যায়ে জাতপাতের প্রশ্ন উঠে এল। এক বক্তা বললেন, “একই সমাজে জন্মেও মানুষ যদি একে অন্যের বাড়িতে যেতে সংকোচ বোধ করে, একসঙ্গে খেতে না পারে, তাহলে ঐক্যের কথা শুধু মঞ্চেই থেকে যাবে।”

সামনের সারিতে বসে থাকা কয়েকজন বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

অনিরুদ্ধ লক্ষ্য করলেন, মাঠের শেষ দিকে বসে থাকা সুমনও মনোযোগ দিয়ে শুনছে।

কিন্তু সব মানুষের প্রতিক্রিয়া এক নয়। কেউ উৎসাহিত, কেউ সন্দিহান, কেউ আবার কেবল কৌতূহলবশত এসেছেন। সম্মেলনের মঞ্চে উচ্চারিত আদর্শ বাস্তব জীবনে কতটা কার্যকর হবে, তার উত্তর সময়ই দেবে।

দুপুরের দিকে সম্মেলন শেষ হল। মাঠের পাশে খিচুড়ি ও সবজির প্রসাদ বিতরণ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ একসঙ্গে বসে খাচ্ছেন। অনিরুদ্ধের চোখে পড়ল, রান্নার কাজে গ্রামের কয়েকটি পরিবারের নারী-পুরুষ সমানভাবে ব্যস্ত। কেউ জল দিচ্ছেন, কেউ থালা এগিয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার বয়স্ক মানুষদের বসার ব্যবস্থা করছেন।

সুমন এসে বলল, “দাদা, খেয়ে যান।”

অনিরুদ্ধ বললেন, “তোমরা খাও। আমি একটু ঘুরে দেখি।”

তিনি মাঠের বাইরে চলে এলেন। দূরে শালবনের মাথায় রোদ পড়েছে। গ্রামের মাটির বাড়িগুলির দেওয়ালে কোথাও আলপনা, কোথাও পুরনো ক্যালেন্ডার। একটি বাড়ির উঠোনে তুলসীমঞ্চ। আরেকটি বাড়ির সামনে শুকোতে দেওয়া হয়েছে মহুয়ার ফুল।

হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল, কলকাতার এক আলোচনাসভায় কয়েক দিন আগে এক অধ্যাপক বলেছিলেন, বাংলার সমাজকে বুঝতে হলে শুধু রাজনৈতিক দলগুলির ইতিহাস জানলেই চলবে না; জানতে হবে মানুষের দীর্ঘ সামাজিক স্মৃতি।

সেই স্মৃতির মধ্যে আছে জমিদারি, কৃষক আন্দোলন, বামপন্থী রাজনীতি, দলীয় সংঘর্ষ, উদ্বাস্তু জীবন, ধর্মীয় আন্দোলন, জাতিগত আত্মপরিচয় এবং বহু প্রজন্মের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা।

অনিরুদ্ধ জানেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসন, পরবর্তী তৃণমূল সরকারের উত্থান এবং বিজেপির বিস্তার—সবকিছুই গভীর সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। এই ইতিহাসের মধ্যে রয়েছে মানুষের আশা, হতাশা, রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন।

কিন্তু তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অন্য।

রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলালে কি মানুষের জীবন বদলায়? নাকি মানুষের জীবন বদলানোর জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও প্রয়োজন?

বিকেলের দিকে অনিরুদ্ধ গ্রাম থেকে বেরিয়ে নদীর পাড়ে গেলেন।

নদীটির নাম কংসাবতীর একটি ছোট শাখা। শীতের জলে তার গভীরতা কম। বালির চর ধরে কয়েকটি গরু ঘাস খাচ্ছে। দূরে এক মাঝি নৌকা বাঁধছেন।

নদীর পাড়ে একটি পুরনো বটগাছ। তার নিচে বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ।

নাম নীলমাধব বাগদি। বয়স আশির কাছাকাছি। একসময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতেন। এখন অবসরজীবন। গ্রামের ইতিহাস, লোককথা ও পারিবারিক স্মৃতি নিয়ে তাঁর আগ্রহ।

অনিরুদ্ধকে দেখে তিনি বললেন, “আপনি শহর থেকে এসেছেন?”

“হ্যাঁ। কলকাতায় থাকি। বাংলার গ্রাম ও সমাজ নিয়ে কিছু কাজ করছি।”

বৃদ্ধ বললেন, “তাহলে বাংলার পুরনো ইতিহাস জানেন নিশ্চয়ই?”

অনিরুদ্ধ বললেন, “জানার চেষ্টা করছি। সবটা জানা হয়ে ওঠেনি।”

নীলমাধববাবু একটু হেসে বললেন, “আমাদের বাগদি সমাজের ইতিহাস জানেন?”

“কিছুটা। আরও জানতে চাই।”

বৃদ্ধ নদীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত আছে। রাজা ছিল, যোদ্ধা ছিল, দুর্গ ছিল। আমাদের গ্রামের বুড়োরা বলতেন, একসময় এই অঞ্চলে বাগদি রাজাদের প্রভাব ছিল। কিন্তু এখনকার ছেলেরা সেসব জানে না। তারা জানে শুধু চাকরি নেই, কাজ নেই, সংরক্ষণ আছে কি নেই—এইসব।”

অনিরুদ্ধ বললেন, “ইতিহাসকে ফিরিয়ে আনতে হলে স্মৃতির পাশাপাশি প্রমাণও সংগ্রহ করতে হবে।”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, “প্রমাণ খুঁজবেন। কিন্তু আমাদের মুখের কথাগুলোও লিখে রাখবেন। কারণ আমরা চলে গেলে এই কথাগুলো আর কেউ বলতে পারবে না।”

অনিরুদ্ধ তাঁর ব্যাগ থেকে ডায়েরি বের করলেন।

নীলমাধববাবু এবার একটু কাছে ঝুঁকে বললেন, “আপনি কি জানেন, ফুরফুরা অঞ্চলের বাগদি রাজার কথা? আমাদের এখানে তার গল্প শোনা যায়। আবার গড়বেতার বাগড়ী রাজ্যের কথাও শুনেছি। আদি মল্লের নামও শুনেছি। কত ইতিহাস মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে কে জানে!”

অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে লিখতে লাগলেন।

বৃদ্ধের কথা শেষ হলে তিনি প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি কোনও পুরনো দলিল বা পুঁথি দেখেছেন?”

“নিজের চোখে নয়। তবে আমাদের বাড়িতে একসময় একটা পুরনো খাতা ছিল। আমার ঠাকুরদা রাখতেন। পরে বাড়ি মেরামতের সময় হারিয়ে গেছে। তাতে নাকি জমির হিসাবের সঙ্গে কয়েকজন পুরনো মানুষের নাম লেখা ছিল।”

অনিরুদ্ধের মনে হল, এই ছোট্ট কথোপকথন হয়তো তাঁর গবেষণার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।

সন্ধ্যা নামছিল। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আলো। দূরে গ্রামের মন্দিরে ঘণ্টা বাজল। কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে এল। নদীর ওপারে কয়েকটি বাড়িতে একে একে আলো জ্বলে উঠছে।

অনিরুদ্ধ ব্যাগ থেকে ডায়েরিটি বের করলেন। দিনের সমস্ত অভিজ্ঞতা লিখে রাখার অভ্যাস তাঁর বহুদিনের।

তিনি লিখলেন—

“শালডাঙার সম্মেলনে আজ একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠল—বাংলার সমাজকে বোঝার জন্য শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। মানুষের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, জাতিগত পরিচয়, অর্থনৈতিক সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা—সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে।

হিন্দু সমাজের ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেই ঐক্য কতটা বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে সামাজিক বৈষম্য দূর করার উপর। বাগদি, নমঃশূদ্র, রাজবংশী, মতুয়া, মাহাতো, আদিবাসী এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের নিজস্ব ইতিহাস ও মর্যাদাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। শিক্ষিত তরুণদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বহু সংঘাত আছে। বামফ্রন্ট আমলের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা, পরবর্তী সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের উপর হামলা ও হত্যার অভিযোগ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার প্রশ্ন—সবকিছুর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন। কোনও মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় তার জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নিতে পারে না।

কিন্তু বাংলার ভবিষ্যৎ কি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে?

নাকি আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে—মানুষের চেতনা, শিক্ষা, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং সামাজিক দায়িত্বের দিকে?”

ডায়েরির শেষ পাতায় তিনি আরেকটি বাক্য লিখলেন—

“বাংলাকে বুঝতে হলে বাংলার মাটির কাছে ফিরে যেতে হবে।”

দূরে তখন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। শালবনের ভিতর থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।

অনিরুদ্ধ জানতেন না, এই একটি দিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে কত দূর নিয়ে যাবে। পশ্চিম মেদিনীপুরের এই ছোট্ট গ্রাম থেকে তাঁর যাত্রা একদিন পৌঁছে যাবে কলকাতার বাবুঘাটে, গঙ্গাসাগরের মকর সংক্রান্তির মেলায়, সুন্দরবনের নদীপথে, উত্তরবঙ্গের চা-বাগানে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।

তিনি জানতেন না, তাঁকে সাক্ষী থাকতে হবে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের।

কিন্তু সেদিন রাতেই তাঁর মনে একটি উপলব্ধি জন্ম নিয়েছিল—

বাংলার পুনর্জাগরণ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; তা মানুষের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং আত্মচেতনার পুনরাবিষ্কার।

সেই অনুসন্ধানের নামই- বঙ্গতীর্থ।


(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)




প্রয়োজনীয় কথা: এই প্রথম পর্বে শালডাঙা ও তার চরিত্রগুলি কাল্পনিক। বাগদি রাজশক্তি সম্পর্কে উল্লিখিত কথাগুলি স্থানীয় স্মৃতি ও অনুসন্ধানের সূত্র; প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে চূড়ান্ত দাবি করা হয়নি। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...