সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি~ ৫ || মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি || প্রতি সোমবার

শীলাবতী অববাহিকার ইতিহাস ও কৃষ্টি~ ৫
মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি

আমার নিজের গ্রাম রাজবল্লভপুর সহ বৃকভানুপুর, কিশোরপুর, গড়বেড়িয়া, এলনা, লাউমারা, রঘুনাথপুর, বড়াই, দেওয়ান, কালিন্দীপুর, পাঁচামি, নিত্যানন্দপুর, চৈতন্যপুর, ধর্মপোতা ইত্যাদি গ্রামগুলি এই শীলাবতী নদী এবং তার খালের মধ্যবর্তী স্থানে অর্থাত্‍ বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থান করছে। স্বাভাবিকভাবেই বর্ষাকালে এই গ্রামগুলির মানুষজনের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। প্রায় বছরই শীলাবতীর বন্যায় প্লাবিত হয়ে পড়ে গ্রামগুলি। বাইরের সঙ্গে তখন সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এলাকাগুলি। যাতায়াতের একমাত্র যোগাযোগ তখন নৌকা। বন্যাতে প্রায় প্রতি বছরই এলাকার ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। ১৯৭৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার কথা ভাবলে তো শিউরে উঠতে হয়। সেবার শীলাবতীর বিধ্বংসী বন্যায় সে যে কী ক্ষতি হয়েছিল তা এককথায় অবর্ণনীয়।
কাঁচা মাটির বাড়ি একটিও ছিল না সেবার। সব বন্যার জলে তলিয়ে গিয়েছিল। কত নিরীহ গবাদি পশুর যে প্রাণহানি ঘটেছিল তার ইয়ত্তা নেই। বিঘার পর বিঘা চাষযোগ্য জমি সেই বন্যাতে বালিচাপা পড়ে গিয়েছিল। তার রেশ এখনো এত বছর পরেও এলাকার মানুষজনকে বহন করে বেড়াতে হচ্ছে। ১৯৭৮ সাল। তখন এই প্রবন্ধকারের বয়স ছিল ১৩ বছর। ক্লাস এইটের ছাত্র ছিলাম। সচোক্ষে দেখেছিলাম সেই প্রলয়ঙ্করী বন্যার মারাত্মক রূপ। মনে পড়ছে সেই বন্যার সময় আমাদের পরিবারকেও বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র উঁচু ভিটায়
গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। প্রায় এক মাস অন্যত্র বসবাস করতে হয়েছিল। শুধু আমাদের নয় এরকম দুর্ভোগ অসংখ্য মানুষকে পোয়াতে হয়েছিল। এখনো পোয়াতে হয়। এমনিতেই শীলাবতী বেশ শান্ত, ধীর। কিন্তু বর্ষার জল পেলেই সে ফুলে ফেঁপে উঠে। ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে আছড়ে পড়ে গ্রামগুলিতে। আমরা প্রতি বছরই ঘাটালে যে বন্যার কথা শুনি, শুনি ঘাটাল বন্যায় ভেসে গেছে তা এই শীলাবতী নদীর জন্যই।
   একসময় শীলাবতী নদী এবং তার খালের মধ্যবর্তী গ্রামগুলিতে রাস্তাঘাট বলতে কিছু ছিল না। হাঁটু অব্দি, কোথাও কোমর অব্দি কাদায় ভরাট থাকত। মোটর বাইক তো দূরের কথা সাধারণ বাই সাইকেল পর্যন্ত নিয়ে যাতায়াত করা যেত না প্রায় অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত। এখন রাস্তাঘাটগুলির অনেক উন্নতি ঘটেছে। প্রায় প্রতিটি গ্রামের মানুষই যে যার এলাকায় সারাবছর নদী পারাপার হওয়ার জন্য বাঁশের সেতু বানিয়েছে। কিন্তু বর্ষাকালে সে সেতু আর থাকে না। বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায়। বন্যার জল সরে গেলে গ্রামের মানুষ নিজেদের উদ্যোগে আবার সে সেতু বানায়। সারা বছর ভাঙাগড়ার খেলা চলে। ভাঙাগড়ার অনন্য নজির বোধহয় এই এলাকাতেই আছে।
 
 
   যাইহোক শীলাবতী নদী তীরবর্তী জমিগুলি বেশ পেলব এবং উর্বর। যার ফলে নদীর দুধারের জমিগুলিতেই ব্যাপক চাষবাস হয়ে থাকে। ধান, আলু গম, তিল সর্ষে, মটর, মুগ ইত্যাদির রমরমা চাষ এখানে। আর হয়ে থাকে ব্যাপক শাক-সবজি ও কাঁচা আনাজপতির চাষ। কপি, বেগুন, মূলো, পালং, করলা, উচ্ছে, বরবটি, সিম, ওল, কচু, তরমুজ, কুঁদরি, পটল ইত্যাদি। কী চাষ নেই এখানে? সব চাষ হয়ে থাকে শীলাবতীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। আর সেসব বাজারজাত করার জন্য যত্রতত্র গড়ে উঠেছে সবজিবাজার। এখান থেকে প্রচুর শাকসবজি কলকাতা হয়ে অন্যত্র দূর-দূরান্তে চলে যাচ্ছে। এই কাঁচা আনাজপাতির চাষবাস করে এলাকার অনেকেই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠছে। তবে বর্তমানে এখানে অর্থনৈতিক কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে মূলত আলু চাষের উপর। শীলাবতীর অববাহিকা জুড়ে আলুর ব্যাপক চাষ। টন টন আলু এখানে উত্পমন্ন হয়। তা সংরক্ষনের জন্য গড়বেতা, হুমগড়, গোয়ালতোড়, চন্দ্রকোণা, ঘাটাল, আরামবাগ প্রভৃতি এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য হিমঘর। আলু চাষ হওয়ার জন্য এই সব এলাকায় অনেকেই আলু ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। গড়ে উঠেছে আলু ব্যবসায়ী সমিতি। তাই যে বছর আলুর দাম থাকে সে বছর এলাকার চাষিদের মুখে আনন্দের সীমা পরিসীমা থাকে না, কিন্তু যে বছর আলুর দাম ঠিকমতো থাকে না সে বছর চাষিদের মাথায় হাত পড়ে যায়। আলু চাষের পাশাপাশি ধান চাষও হয়ে থাকে প্রচুর। আউশ, আমন এবং বোরো এই তিন রকমেরই ধান চাষ হয়ে থাকে বিভিন্ন এলাকায়। বর্ষাকালে যেহেতু ঘাটাল এলাকাটি শীলাবতীর জলে ডুবে থাকতো তাই এখানে বর্ষাকালে তেমন ধান চাষ হোত না, হোত বোরো চাষ। যা শীতের মরশুমে হয়। তবে ইদানিং বন্যার প্রকোপ কিছুটা কম হওয়ার এই এলাকাতেও আমন ধানের চাষ হচ্ছে।
  একসময় শীলাবতীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আখ এবং পাট চাষ হোত প্রচুর। জমির পর জমি আখ চাষ হোত। বছর শেষে শাল বসত, গুড় তৈরি হোত। কিন্তু সেসব আজ ইতিহাস। আলু চাষ এসে যাওয়ায় আখ ও পাটের চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। একবছর তো আর একটা চাষের জন্য একটা জমিকে ফেলে রাখা যায় না। আলু চাষ আসায় আর একটা সুবিধা হল, জমিগুলো প্রায় তিনফসলি হয়ে গেল। যার ফলে এখনকার বেশির ভাগ জমিই তিনফসলি, কোনো কোনো জমি দোফসলি। একফসলি জমি আর নেই বললেই চলে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কিছু বই কিছু কথা ২৬৭ । নীলাঞ্জন কুমার || অন্বীক্ষা । রথীন দাশগুপ্ত । সমাকৃতি প্রকাশ

কিছু বই কিছু কথা  ২৬৭ । নীলাঞ্জন কুমার অন্বীক্ষা । রথীন দাশগুপ্ত । সমাকৃতি প্রকাশ । দেড় টাকা । ' ঘাসের শিশির/  সূর্যকে ডেকে বলে/  আমি ত...