শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০

সবাই মিলে সিনেমা হলে ~১৭ || কান্তিরঞ্জন দে || অক্ষর ও দৃশ্য ।। সাহিত্য ও সিনেমা

সবাই মিলে সিনেমা হলে ( ১৭)

কান্তিরঞ্জন দে



  অক্ষর ও দৃশ্য ।। সাহিত্য   ও     সিনেমা   ।


        প্রচলিত  সব শিল্পমাধ্যমের   ভেতরের আসল বস্তুগুলোকে  হজম করে তবেই  সিনেমা মাধ্যমটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে---- এ কথা আগেই বলেছি । সাহিত্য দিয়েই শুরু করা যাক।

     সাহিত্যরসিক  জাতি হিসেবে  বাঙালি  মহলে  সিনেমার  সঙ্গে   সাহিত্যের আজও কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি রয়ে গেছে । অনেক অভিজ্ঞ সাহিত্যিকও অনেক সময়  সাহিত্য-ভিত্তিক সিনেমার স্বাতন্ত্র্য  মানতে চান না , অথবা আসল ব্যাপারটা তার জানা নেই বলে , বুঝতে ভুল করেন।


       সাহিত্যের যতগুলো শাখা আছে ------- কবিতা , গল্প , উপন্যাস , নাটক, প্রবন্ধ --------- তার   সবক'টি  তৈরি হয় , অক্ষরের পর অক্ষর  , অর্থাৎ শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে । আর সিনেমা তৈরি হয় , দৃশ্যের ( শট ) পর  দৃশ্য সাজিয়ে । এইখানেই দুটো মাধ্যমের মধ্যে একেবারে মৌলিক তফাৎ হয়ে যায় ।

     অক্ষর বা শব্দ ব্যাপারটা তো বুঝি , কিন্তু শট ( Shot ) কি জিনিস ? এ হচ্ছে দৃশ্যের একেবারে মৌলিক একক । ক্যামেরা একবার খুলে বন্ধ করার আগে একবারে যা রেকর্ড  করে নিতে পারল , তাকেই আমরা বলতে পারি শট । সংক্ষেপে একে বলা যেতে পারে দৃশ্যাংশ । সাহিত্যে যেমন ---প্যারাগ্রাফ , সিনেমায় তেমনি   সিন  ( Scene )। সাহিত্যে  যেমন ------ পরিচ্ছেদ  বা পর্ব , সিনেমায় তেমনি সিকোয়েন্স ( Sequence ) । সিকোয়েন্সের পর সিকোয়েন্স সাজিয়ে সাজিয়েই গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ সিনেমা ।


       সাহিত্য ও সিনেমা দুটি মাধ্যমই মূলত গল্প বলার কাজ করে থাকে । তথ্য, তত্ত্ব , যুক্তি দিয়ে গদ্য সাহিত্যে  যখন কিছু প্রকাশ করি ---- তখন তাকে বলি , প্রবন্ধ। আর সিনেমাতেও দৃশ্য পরম্পরার মধ্য দিয়ে তথ্য, তত্ত্ব , যুক্তি হাজির করতে পারি । তখন তাকে বলব ----তথ্যচিত্র । কথাটা ইংরিজি ডক্যুমেন্টারী শব্দের বাংলা অনুবাদ । বাংলাদেশের চলচ্চিত্র রসিক বন্ধুরা আরও সুন্দর করে বলেন ----- প্রামান্য চিত্র বা দলিল চিত্র । 


      সাহিত্য এবং সিনেমা দুই-ই  গল্প করার কাজ করলেও মাধ্যম ভেদে তাদের উপস্থাপনার পদ্ধতি ,খুব  স্বাভাবিক কারণেই আলাদা । গল্প বা উপন্যাসে চরিত্রের মনের মধ্যে কি ঘটছে , সেটা বোঝাবার জন্য লেখককে অনেক সময়ই পাতার পর পর বর্ণনা দিতে হয় । সিনেমায় যেহেতু সবটাই  চাক্ষুষ করা যায় ,  সেক্ষেত্রে পর্দায় হয়তো একটা ছোট কোনও ঘটনা বা কাজ ( অ্যাকশন ) দিয়েই বিষয়টা চট্ করে বোঝানো যেতে পারে । 

     এখানে একটা জিনিস পরিস্কার করে নিই ।  কাঁচা বাণিজ্যিক  হিন্দি সিনেমার কুপ্রভাবে আজকাল অ্যাকশন বললেই ঢিসুম ঢিসুম মারপিট বোঝেন । কিন্তু ইংরিজি " অ্যাকশন " শব্দের আসল অর্থ তো ---- কাজ । ঢিসুম ঢিসুম মারপিট থেকে চোখের  পলক ফেলার মতো সূক্ষ্ম জিনিস ---- সব কিছুই তাই সিনেমায় অ্যাকশন । 


       এ কারণেই , অভিনয় ------- যা গল্প বলা সিনেমার অন্যতম হাতিয়ার , তাকে ইংরিজিতে বলা হয়----- অ্যাক্টিং। আমি যা নই , আমার চলন-বলন , আচরণ , কথাবার্তা , অর্থাৎ সামগ্রিক  কাজের মধ্য দিয়ে  সেটাকে ফুটিয়ে তোলাটাই হল , অভিনয়  অথবা অ্যাক্টিং।


       সিনেমায় অভিনয়ের অন্যতম উপাদান  হল সংলাপ বা ডায়ালগ ------- যা  গল্প-উপন্যাসেরও  প্রধান উপাদান ।  সিনেমা যেহেতু দৃশ্যগত মাধ্যম, তাই সেখানে সংলাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সংযমী এবং সতর্ক থাকতে হয় ।  সিনেমায় যদি শ্রুতিনাটক , মঞ্চনাটক কিংবা যাত্রার মতো একগাদা " ডায়ালগ " থাকে , তবে তা অতিকথন দোষে দুষ্ট হতে বাধ্য । যতই মারকাটারি হোক , কিংবা শুনতে যতই  জমকালো হোক , সিনেমায় বাড়তি  সংলাপ একেবারেই চলে না । 


     সাহিত্যের শাখাগুলোর সঙ্গে সিনেমা মাধ্যমটির  সম্পর্ক এবং তফাৎ নিয়ে আরও কিছু কথা  আছে । কিন্তু , সে সব  বলব , রয়ে সয়ে , ধাপে ধাপে । একবারে টানা বলে গেলে , আপনাদের ধৈর্যচ্যূতি ঘটতে পারে ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আশ্চর্য সহবাস || শ্রাবণী গুপ্ত || কবিতা

আশ্চর্য সহবাস শ্রাবণী গুপ্ত একটা গোটা জীবন আমরা গাছের বেড়ে ওঠা দেখলাম জাফরীর মতো আলো-ছায়া এসে পড়ল আমাদের গায়ে, হৃদয়ে তবু ঘৃণা করতে গিয়ে আম...