বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০

একজন বুড়ো মানুষ-৮ ,নিরুপমা বরগোহাঞি,বাসুদেব দাস,

 


একজন বুড়ো মানুষ

নিরুপমা বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস,




(৮)

পোনাকে নিয়ে ইলা যে সমস্ত কাণ্ড করে, দেখে দেখে বিজয়ের হাসি উঠলেও মনটা সঙ্গে সঙ্গে বেদনায় ভারী হয়ে যায়। পোনার জন্মের সময় ইলাকে কোনো মতে বাঁচানো গেল যদিও তাঁর পুনরায় মাতৃ হতে পারার ক্ষমতা ডাক্তার চিরদিনের জন্য ধ্বংস করে দিতে বাধ্য হয়েছিল-ইলাকে বাঁচাতে গিয়ে। প্রথমে ইলা না জানলেও বিজয়ের সে কথা ইলার কাছ থেকে বেশিদিন গোপন করে রাখতে ইচ্ছা হল না। কথাটা শুনে ইলা প্রথমে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল, কিন্তু জীবনের সমস্ত কথা হাসি মুখে নিতে চেষ্টা করার একটা আশ্চর্য গুন ছিল ইলার। অতি সামান্য কথায় কাঁদলেও জীবনের গভীর দুঃখ গুলি হাসিমুখে সহজভাবে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল সব সময়। সেদিনও কথাটা শুনে সে মুখে হাসি টেনে বলেছিল –‘ঈশ্বর আমাদের যা দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত- নয় কি? একেবারে তো বঞ্চিত করে রাখে নি, সেটাও কি কম অনুগ্রহ?’

পরে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছিল কিনা বিজয় জানেনা। কিন্তু একটা কথা লক্ষ্য করেছে যে পোনার প্রতি ইলার আদর অত্যাচার যেন দিন দিন বেড়ে যেতে লাগল। পোনা একটু কাঁদলেই ইলা অস্থির হয়ে পড়ে। নানা ধরনে ফুসলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে, আদর করে সহস্র নামে ডাকে, সেই নামগুলির অর্থ খুঁজতে গেলে একটা দুটোর বাইরে বাকিগুলি অর্থ খুঁজে বের করা কষ্টকর হবে। সারাদিনে সময় নেই, অসময় নেই, এটা ওটা খাওয়ানোর জন্য জোর করে থাকে। ক্ষুধা না থাকা অবস্থায় না খাবার জন্য পোনা কান্নাকাটি করলে ইলা গভীর আক্ষেপের সঙ্গে জানায় যে কোনো কোনো ছেলে মেয়েকে সে পোনার মতো না খেয়ে থাকতে দেখেনি। কিন্তু এই না খাওয়া ছেলেটিও খুব সুন্দর স্বাস্থ্যবান,গোলগাল হওয়ার পরেও ইলার চোখে সে না খেয়ে ক্ষীণ হয়েই রইল। ইলা নিজে যথেষ্ট রোগা ছিল, তাই পোনার মতো একটা শক্ত সমর্থ শিশুকে যখন অনবরত কোলে নিয়ে থাকত, বিজয়ের সেই দৃশ্য দেখে ইলার জন্য খুব মায়া হত। কিন্তু ইলা কখনও বেশিক্ষণের জন্য বিশ্বাস করে চাকরের হাতে পোনাকে ছেড়ে দিত না। আর এভাবে অতি আদর এবং প্রশ্রয়ের মধ্য দিয়ে চার বছর পর্যন্ত পোনা ইলার কোল জুড়ে রইল। তাঁর পাঁচ বছরের সময়ও মাঝে মধ্যেই তাকে কোলে নিয়ে আদর করার চেষ্টা করেনি তা নয়, কিন্তু তখন পোনা নিজেকে বড় বলে ভাবতে শিখেছে, সে ইলা চুমু খাওয়া গাল দুটি সজোরে মুছে ফেলে ‘ছি’বলে জোর করে কোল থেকে নেমে দৌড়ে চলে যায়।

শাসন কাকে বলে পোনা প্রায় কোনোদিনই জানতে পারল না। বিজয় মাঝেমধ্যে বলে-‘এত আদর করে করে, এত প্রশ্রয় দিয়ে তুমি ছেলেটিকে নষ্ট করবে ইলা। মাঝেমধ্যে ওকে শাসন করার দরকার।‘ তখন ইলা প্রত্যুত্তরে বিজয়কে উল্টোভাবে বুঝিয়েছিল-‘ আদর পেয়ে ছেলে মেয়ে খারাপ হয় বলে আমি কখনও মনে করি না,মা-বাবা ভালো হলে, ঘরের পরিবেশ ভালো হলে, সেই মা-বাবার বাড়ির ছেলে মেয়ে ভালো হবেই। আমাকে বাবা সেদিনও বুঝিয়েছে-পোনাকে যেন আমরা বেশি শাসন না করি, আমরা কেবল আমাদের ঘরটিকে আদর্শ ঘর করে গড়ে তুললেই পোনার জীবন ও আপনা থেকেই সৎপথে পরিচালিত হবে। বাবা আরও কী বলেছে জান-গর্বে ফুলে উঠনা যেন- বাবা বলেছে- আপনার মতো মানুষের ছেলে নাকি কখনও খারাপ হতে পারে না।’

কিন্তু তবুও একদিন দুদিন যে ইলা পোনাকে শাসন করেনি এমন নয়, দু'একদিন মেরেছিল- কিন্তু পোনাকে মেরে উঠে ইলা নিজেই কেঁদে ফেলেছিল।

একটিমাত্র ছেলে হওয়ার জন্যই নাকি পোনা ছোট থেকেই খুব ভাবুক এবং তার সঙ্গে ধর্মভীরু ছিল। পাঁচ ছয় বছরে সে বই পড়তে শুরু করে, তার মধ্যেই বেশি করে আকৃষ্ট হয় রামায়ণ এবং  মহাভারতের প্রতি। তারপর একদিন সে মাকে হেসে হেসে বলল যে মৃত্যুর পরে সে যখন স্বর্গে যাবে তখন মহাভারত-রামায়ণের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে  তার দেখা হবে। তখন তার খুব মজা লাগবে। আর তার সবচেয়ে মজা লাগবে ধুর্ত নারদের সঙ্গে দেখা হলে। পোনার বয়স তখন ছয় বছর। তার কিছুদিন পরে তার মা রবীন্দ্রনাথের ‘লিপিকার’ ‘প্রশ্ন’ পড়লে বিছানায় শুয়ে শুয়ে এবং বালিশে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল।পোনা মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল তাঁর কী হয়েছে- কোথায়  দুঃখ পেয়েছে। বাবা তো অফিস গিয়েছে, তাহলে মায়ের সঙ্গে কে রাগ করল? সে তো কখনও মায়ের সঙ্গে রাগ করে না। এই সমস্ত কিছুর উত্তরে মা তাকে কিছু বলল না। কেবল তাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে আরও বেশি করে কাঁদতে লাগল। বিজয় এসে কথাগুলি শুনে গম্ভীর হয়ে গেল, আর ইলাকে বলল-‘তুমি ছেলেটিকে আরও বেশি সেন্টিমেন্টাল করে তুলবে ইলা। এটা ভালো কথা নয়। ভাবপ্রবণতা মানুষকে অনর্থক কিছু দুঃখ এনে দেয়। পোনার এভাবে আরও বেশি ভাবুক হয়ে উঠাটা আমার ভালো লাগেনা। তুমি যে তাকে বাড়িতে পড়িয়ে উঁচু ক্লাসে নাম ভর্তি করার কথা ভাবছ,সেটাতে আমার আপত্তি রয়েছে। কালকেই ওকে আমি স্কুলে ভর্তি করে দেব। সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করে স্বভাবের কিছুটা পরিবর্তন ঘটবে। 

পরেরদিন বিজয় পোনাকে স্কুলে ভর্তি করে দিল। পোনার সঞ্জয় নামটা ইলা বিজয়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ততদিনে সেই নামটা অব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এখন স্কুলের ছেলেদের মুখে সঞ্জয় নামটা প্রচলিত হতে লাগল। তারপর একদিন পোনা হাসতে হাসতে মাকে বলল- ‘মা,মা  তোমরা আমাকে সঞ্জয় নামটা দেওয়ায় আমি খুব খুশি হয়েছি। মহাভারতের সঞ্জয় খুব জ্ঞানী এবং ধার্মিক ছিল তাই না মা? একটা কথা জান মা, আমাদের স্কুলের ছেলেগুলি বড় গাধা, ওরা মহাভারতের সঞ্জয়কে জানে না।’ 

প্রায় সাত বছর বয়সে পোনা স্কুলে গিয়েছিল- এক বছর পরে, তার প্রায় আট বছর বয়সের সময় তার মায়ের মৃত্যু হল। সে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল-‘বাবা,বুড়ো হলে মানুষ মরে স্বর্গে যেতে পারে কি? আমার মতো শৈশবে মরে স্বর্গে যাওয়া যায় না?’ ইলার মতো যখন তখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে বিজয় পোনাকে জড়িয়ে ধরে নি, সেদিন কিন্তু এই কথাগুলি শুনে সে পোনাকে সজোরে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিল।

পোনার তিন বছর বয়সে দু কাঠা জমি কিনতে পারার মতো টাকা ইলা জমাতে পেরেছিল। কিন্তু টাকা জমানোর সঙ্গে সঙ্গেই তো আর  জমি কেনা যায়না। ভালো মাটি খুঁজে দেখতে হয়। আর তারপরেই কেনা যায়। ওরা গুয়াহাটিতে জমি কিনবে বলে ঠিক করেছিল। ইলার পিতা অবশেষে একদিন দুকাঠা  ভালো জমি দেখে দিয়েছিল। আর বিজয় একদিন তার কর্মস্থল থেকে গিয়ে সেই মাটি কিনে এসেছিল। জমি কেনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির জল্পনা-কল্পনা বেড়ে গিয়েছিল। ওদের ভবিষ্যতের ঘরের বর্ণনা শুনে শুনে বিজয়ের যেন মনের মধ্যেই সেই বাড়ির একটি ছবি আঁকা হয়ে গেছিল। একটি সুন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছবির মত বাড়ি। তার জানালা-দরজাগুলি কাঠ গুলিতে পাতলা সবুজ রং। পাঁচটা ঘর। তার মধ্যে একটি ওদের শোবার ঘর,একটি পোনার,একটি অতিথিদের জন্য,একটি খাবার ঘর,আর পঞ্চমটিতে  ইলার জন্য সাজানো একটা সুন্দর লাইব্রেরী। রান্নাঘরের সংলগ্ন আরও একটি ছোট ঘর অবশ্য থাকবে। সেটা হবে ইলার ঠাকুরঘর।এই বাড়ির জন্য দুকাঠা  জমির এক কাঠাও লাগবেনা। কিন্তু সামনের দিকে ফুলের বাগান এবং পেছনে সবজির বাগান মিলিয়ে দুকাঠা পূর্ণ হবে।

বাড়ি তৈরি করার জন্য আরও টাকার প্রয়োজন। তাই ইলা স্বপ্ন সিদ্ধির দ্বিতীয় এবং শেষ ধাপে উঠার জন্য পুনরায় টাকা জমাতে শুরু করল। তারপর যখন সেই টাকা প্রায় সম্পূর্ণ জমা হয়ে গেল তখনই হঠাৎ মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে ইলা বিজয় আর পোনাকে ছেড়ে স্বর্গে চলে গেল। স্বর্গে চলে গেল, কারণ বিজয়ের ধারণা স্বর্গ ছাড়া ইলা আর কোথাও যেতে পারে না। ইলার ক্ষেত্রে তার পোনার মতোই একই ভাবে ভাবতে ইচ্ছা করে যে মানুষ মৃত্যুর পরে স্বর্গে যায়।

বিজয় নিজেই বড় করে ইলার কপালে সিঁদুরের ফোটা দিয়ে দিয়েছিল। উজ্জ্বল মুখটা যেন মৃত্যুর পরেও হাসির স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছিল। এই মুখে হাসি কখনও কোনো অসন্তুষ্টিতে বা কাউকে খারাপ পেয়ে মলিন হয়নি। এখন মৃত্যুর পরেও একই থেকে গেল l ইলার এই মুখটা স্মরণ করে তারপরে অনেকদিন বিজয় মনে মনে গুনগুন করে উঠেছে-‘ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যাম ধরা,তোমার হাসিটি ছিল বড় সুখে ভরা-‘

  ইলার সেই মাটিতে আজ কমলা বাড়ি তৈরি করতে চলেছে। 

রোদটা ধীরে ধীরে বড় প্রখর হতে চলেছে। বিজয় ভরালী তাঁর টাক মাথায় হাত বুলালেন।

ভেতরে কমলা হাসতে হাসতে সঞ্জয় কে বলল-‘আজ বাবার কাণ্ড দেখেছ? আমি বাড়ির নক্সা দেখিয়ে আসার পর থেকে সামনে বই নিয়ে কিছু একটা ভাবছেন। অন্যান্য দিন যিনি সব সময় দশটায় নিয়মিতভাবে স্নান করেন,সে কথা আজ ভুলেই গেছেন। কমলা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন, তারপর আবার হাসতে হাসতে বলল-‘আজ আমাদের বাড়ির নক্সা দেখে জীবনের প্রায় শেষ অবস্থায় বোধহয় এখন প্রথম বাড়ি তৈরি করার জল্পনা-কল্পনা করছেন। 

‘বুড়ো বয়সে তো অনিয়ম শরীর সহ্য করে না। তুমি সময় মত কেন বাবাকে ডেকে দিলে না? কমলা কিছুটা উদ্বিগ্নতার সুরেই সঞ্জয় বলল।

‘ বাবার স্বাস্থ্যের জন্য যদি এতই চিন্তা তুমি নিজেই কেন ডাকলে না? আমি কীভাবে সব দিকে লক্ষ্য রাখব। সকাল থেকে যে মেয়েদের হোমটাস্কের এই খাতাগুলি নিয়ে  আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি তা কি তুমি দেখতে পাচ্ছ না? আমার প্রতি যদি তুমি কখনও বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখাতে। আমাদের সঙ্গে কত বিবাহিতা শিক্ষার্থীকে যে তাদের স্বামীরা কতভাবে সাহায্য করে- এমনকি রবিবার হোমটাস্কের খাতাগুলি দেখে দেয়। আমি তো আর সেরকম ভাগ্য করে আসিনি।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ- ৪/৪ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু Debjani Basu

  আটপৌরে কবিতাগুচ্ছ- ৪/৪ || "আই-যুগ"-এর কবিতা দেবযানী বসু Debjani Basu আটপৌরে ৪/৪ ১. পুকুরের মুকুর উল্লাস প্রমাণ । সাক্ষ্য। অমিল- ...