শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১২, নিরুপমা বরগোহাঞি, অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,

 একজন বুড়ো মানুষ-১২,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,


(১২)
পরম তিক্ততা এবং ধিক্কারে ভরা মন নিয়ে কমলাদের কথামতো বিজয় ভরালী বৌমা দেখিয়ে এবং বুঝিয়ে দেওয়া দেওয়া মতে ঘরের ভিত এবং অর্ধেক তৈরি দেওয়াল গুলি দেখে যেতে লাগল এবং মুখে তৃপ্তির আওয়াজ তুলে দেখে যেতে লাগল- এবং মাথা নাড়াতে লাগল। কমলা পরম উৎসাহে শ্বশুরকে বুঝিয়ে যেতে লাগল- ‘এটা হবে ড্রইংরুম, এটা করিডর, আগের দিনের ঘর গুলিতে এই করিডর বলে কোনো জিনিস থাকত না বাবা, করিডরই বা কেন-কী প্লেন করে  যে বাড়িগুলি বানানো হত।রান্নাঘরগুলি এক মেইল দূরে,বাথরুম গুলি আরও দূরে, পায়খানার তো কথাই নেই, এদিকে সামনের দিকে ফুল গাছের সঙ্গে যেখানে সেখানে সুপারি গাছের চারা, নারকেল গাছের চারা, কলাগাছের ঝোপ,বিশেষ করে কিছু মানুষ জানালার কাছে এভাবে কলাগাছ গুলি রোপণ করে  যে তার ফলে ঘরের ভেতরে অন্ধকার এবং অস্বাস্থ্যকর হয়ে যায়। সত্যিই আগের মানুষগুলি অবাক হওয়ার মত ছিল। কোনোরকমে ঘরবাড়ি তৈরি করে থাকতে হয় বলে থাকত, কিন্তু সেই বাড়ি গুলিকে সুন্দর করে সুরুচিসম্পন্ন এবং স্বাস্থ্যকর ভাবে তৈরি করতে হয় সেই সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না, কেয়ারও করত না। গরু মোষের মত খেয়েদেয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলেই হল-’ বিতৃষ্ণা এবং অবজ্ঞায় কমলার সুন্দর মুখটা যেন বিকৃত হয়ে পড়েছিল,কমলা আরও বলে যাচ্ছিল-‘করিডোরের একদিকে দুটো বেডরুম, বাথরুমের সঙ্গে লাগোয়া সেনিটারি, এদিকে পাকঘর, বর্তমানে চিমনির ব্যবস্থা করে রাখব, কিন্তু পরে গ্যাস নিতে পারলে চিমনিটা উঠিয়ে দিলেই হবে।– এদিকটায়, এদিকটায় পাকা নালা করতে হবে-’ কমলার অনেক উৎসাহ এবং সঙ্গে সঙ্গে অনেক হিসেব অনেক প্ল্যান। ওদের নির্মাণরত বাড়ির পেছনের জমিতে শ্বশুর এবং স্বামীকে নিয়ে গিয়ে কমলা বলল-‘এখানে ছোট একটি ঘর ভাড়া দিতে পারা যাবে। পেছনের জমি হলেও ঘরের সামনের দিকটা সাইডের দিকে করে দেব, সেদিকে একটা ছোট আঁকাবাঁকা রাস্তা করে দেব যাতে আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে মেইন রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়া যায়। আজকাল গুয়াহাটিতে ঘরের ভাড়া যেভাবে বেড়ে চলেছে এই ছোট ঘর থেকে আমরা কম করেও দেড়শো থেকে দুশো টাকা ভাড়া পাব-’ নিজের  হিসেববুদ্ধি পরিকল্পনার জন্যই হোক বা ভবিষ্যতের সম্ভাবনার জন্যই হোক কমলার মুখে তৃপ্তির একটা সুন্দর হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বিজয় ভরালীর মনে হল তিনি নিজে যেভাবে কমলার কোনো কথায় কথা বলেননি ছেলেও ঠিক সেভাবেই নীরব হয়ে রয়েছে। তিনি সেটা শুভ লক্ষণ বলেই ধরে নিলেন। বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে সব ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রীর সমান উৎসাহ না থাকলেও মতভেদ না থাকাটা বাঞ্ছনীয়। 
বাড়ি তৈরি দেখে ফিরে আসতে প্রায় রাত হয়ে গেল অবশ্য তারা সেই হিসেব করেই গিয়েছিল। কারণ সেদিন ছিল ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষের দিন, বিকেলে বেড়িয়ে বাড়ি ফিরতে ভালোই লাগবে। 
ফিরে আসার পথে বিজয় ভরালীর  এর আগের বার মাটি দেখতে আসার কথা মনে পড়ল। জীবনে কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্তি অবাক করে দেয়। ইলার সঙ্গে শেষবার তিনি যখন মাটি দেখতে এসেছিলেন সেদিনও ছিল ফাল্গুন মাসের জ্যোৎস্না রাত। কেবল জ‍্যোৎস্নাই নয় পূর্ণিমাও, আগের দিন  দোলের উৎসব হয়ে গিয়েছিল। ওরা তখন মঙ্গলদৈ ছিল। সেদিন ছিল সোমবার। তাই ইলার অনুরোধে পড়ে সোমবার  সঙ্গে আরও একটি দিন ছুটি নিয়ে বিজয়রা মঙ্গলদৈ থেকে শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। দোলের দিন বিকেলে ইলা প্রস্তাব করল যে ওদের মাটিটা একবার দেখে আসা যেতে পারে। পূর্ণিমার দিন রাতের বেলা সুন্দর জ্যোৎস্না থাকবে, পায়ে হেঁটে আসতে বড় ভালো লাগবে। আপত্তির কারণ ছিলনা। পোনা তখন ছয় বছরের, সারাটা দিন মনের আনন্দে দোল খেলার পরে সে তখন ক্লান্ত, গল্প বলার লোভ দেখিয়ে দিদিমা তাকে আটকে রাখল।
মাটি দেখে ওরা সেদিন প্রায় একই সময়ে ফিরেছিল। চারপাশে ঘন জঙ্গল, ওদের জমিতেও সেই একই জার্মান বনের জঙ্গল। ওরা আঁকাবাঁকা ছোট রাস্তা দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জমিটা দেখছিল। পশ্চিম দিকে থাকা মানুষের বাগানটা দেখতে দেখতে ইলা ভবিষ্যতে সেখান থেকে বকফুল, চাঁপা ফুল আনার কথা বলেছিল। তারপর বিকেল হতেই জোছনার আলোতে সেই আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে ওরা ফিরে এসেছিল। চারপাশে মুক্ত আকাশ, বাড়িঘর কম থাকা মুক্ত আকাশের নিচে জ‍্যোৎস্নার বিস্তার। ওরা দুজন নীরবে কিছু দূর এগিয়ে যাবার পরে একঝাঁক বাতাসের সঙ্গে বনফুলের মৃদু সৌরভ এসে ওদের নাকে বারবার লাগতে লাগল। আর ইলা উচ্ছ্বসিত সুরে বলে উঠেছিল-‘বসন্তকালে বিকেলের দিকে রাস্তা দিয়ে যেতে থাকলে এভাবে মাঝে মাঝে যে সুন্দর বকুল ফুলের গন্ধ পাওয়া যায় তাতে মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। তখন তার উত্তরে বিজয় কেবল গুনগুন করে উঠেছিল-‘হঠাৎ কখন সন্ধ্যাবেলায় নাম হারা ফুল গন্ধ এলায়-’ বিজয় ভরালী একটা দীর্ঘশ্বাস রোধ করলেন। মোটরটা ধীরে ধীরে চালাচ্ছিল সঞ্জয়। পেছনের সিটে বসে কমলা বাড়ির নানা কথা বলতে বলতে যাচ্ছিল। সামনের বারান্দায় কীধরনের মোজাইক করা হবে, খরচ পড়লেও পড়বে,দুটিতে না হলেও অন্তত ড্রইংরুমের সঙ্গে একটা লাগোয়া বাথরুমেতো মোজাইক করতেই হবে, জানালা দরজা গুলিতে ‘আইভরি’ রঙ্গের পেইন্ট লাগাতে হবে আর তারপরে হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য একটা তীব্র মধুর ফুলের সুগন্ধ চলন্ত গাড়ির ভেতরে ঢুকেই আবার নাই হয়ে গেল। অবাক হয়ে গেল, যেন গাড়ির গতি বেগে সেই সুগন্ধ বহনকারী মলয় বাতাস পরাজয় স্বীকার করে পিছিয়ে গেল। কিন্তু ক্ষণিকের সেই সৌরভ হলেও বিজয় ভরালী সেই গন্ধটা চিনতে পারলেন।বাতাবী লেবুর ফুলের গন্ধ। নামহীন বন‍্য ফুলের সন্ধ্যার সুবাস পাওয়ার ভাগ্য কি অজস্র বাড়ি ঘরের চাপে মহানগরের মানুষগুলির জন্য হারিয়ে যায়নি? এখনও যে বাতাবী লেবুর ফুলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে -এটা একটা ভাগ্যের কথা। এরকম দিন আসবে যখন শহরের প্রতিটি বাতাবী লেবুগাছ কাটা পড়ে গিয়ে সেই জায়গায় ছোট হলেও একটি ঘর বাড়ি তৈরি করে এতদিন ধরে অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকা মাটিটার একটা সদ্গতি করতে পারা গেল বলে মালিক মনে মনে তৃপ্তি লাভ করবে। এভাবেই মানুষ একদিন অরণ্য সভ্যতা প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনে ক্রমে ক্রমে ধ্বংস করে ফেলবে। প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ থেকে ক্রমশ বঞ্চিত হতে চলা এই দুর্ভাগা মানুষগুলির প্রতি বিজয় ভরালীর হঠাৎ খুব করুনা জাগল। ফাল্গুন মাসের সেই মায়াময় জ্যোৎস্নার সন্ধ্যেবেলা মলয়া বাতাসকে ক্রমশ পিছনে ফেলে সঞ্জয়ের গাড়ি গুয়াহাটি তেল শোধনাগারের বিরাট বিরাট বাড়ি গুলির দিকে এগিয়ে চলল। তৈরি হতে চলা বাড়িটি সম্পর্কে কমলার নানা জল্পনা-কল্পনা, পরিকল্পনা চলতে থাকল কীভাবে ঘরটি অতি-আধুনিক, অতি আরামপ্রদ, অতি সুবিধার করা যেতে পারে। আর কিছু একটা করুন অনুভূতিতে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়া মন নিয়ে বিজয় ভরালী ছেলের কাছে স্তব্ধ হয়ে বসে বাইরের পৃথিবীটা দেখতে লাগলেন।
কমলার বাড়ি তৈরির কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এদিকে ওদের জীবনে নতুন অতিথির আগমনের সময় ও প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছিল। ইতিমধ্যে সঞ্জয় এবং কমলার   অন্তর্জীবনের অনেক কথাই বিজয় জানতে পেরে গিয়েছিল। শুনব না শুনবো না করেও তিনি অনেক কথা শুনে ফেলেছিলেন। নিজের মনকে কঠোরভাবে শাসন করার চেষ্টা করেও নিজের উপরই বিতৃষ্ণায় তিতি বিরক্ত হয়েও, কমলা খারাপ পায় জেনেও বাইরের ড্রয়িংরুমের সোফায় সংকুচিত হয়ে বসে অনেক কথা বিজয় ভরালী শুনতে পেল। অবশ্য তিনি শোনা মতে সঞ্জয় কোনোদিন বেশি কথা বলে না। কিন্তু কখনও যদি দুজনের মধ্যে কথা নিয়ে বাক প্রতিবাদ চলে তখন প্রথম প্রথম সঞ্জয় দুই-একটি স্পষ্ট এবং রূঢ়কথা বলতে শুনতে পান কিন্তু তারপর সঞ্জয় চুপ করে যায়। কমলা তারপর অনেক কিছু বলে যায় কিন্তু তিনি সঞ্জয়ের কথা খুব কম শুনতে পান। অবশ্য ওদের প্রতিটি কথা তার কানে যায় না কারণ তিনি সেই সমস্ত কথা না শোনার চেষ্টা করেন এবং দেওয়ালের ও পাশের সেই দূরত্ব থেকে প্রতিটি কথা খুব মনোযোগ দিয়ে না শুনলে স্পষ্টভাবে শোনা সম্ভব নয়। আস্তে করে বললে তো কথাই নেই। এভাবে শুনতে থাকা অবস্থায় বিজয় ভরালী একদিন কমলা সঞ্জয়কে বলতে শুনল –‘সারাদিন স্কুলে কাজ করে এখন এই অবস্থায় খুব ক্লান্ত লাগে। তোমার মতো কেবল বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। এমনকি উঠে গিয়ে ভাত খেতে শরীরটা নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছা করে না।’ 
তুমি স্কুলের কাজটা ছেড়ে দেও না কেন কমলা? এত কষ্ট করে কাজ করার কী দরকার তোমার? আর এরপরে তুমি স্কুলে যেতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যতের শিশুটির কী দুর্গতি হবে ভেবেছ? কোমল কন্ঠে সঞ্জয় বলল।
বিজয় ভরালী অনুমান করলেন, কমলা বোধহয় এবার উত্তেজনায় বিছানায় উঠে বসেছে, কারণ কিছুক্ষণ পরেই কমলাকে  চিৎকার করে বলতে শুনেছিল-‘ চিরদিন, চিরকাল মেয়েদের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখতে চাওয়া পুরুষের দলের একেবারে উপযুক্ত কথাটাই তুমি বলছ। গরু-ছাগলের মতো সন্তানের জন্ম দিয়ে ওদের প্রতিপালন করে জীবনটা শেষ করে দিই, জীবনের লেখাপড়া অন্য সমস্ত কথা ধ্বংস হয়ে যাক। এটাই যদি তোমার মনোবৃত্তি, সাধারণ অশিক্ষিত একটি মেয়েকে বিয়ে করলে না কেন?’ প্রায় করুন হয়ে ওঠা সঞ্জয়ের কন্ঠ পুনরায় শোনা গেল-‘ তোমার ধারনা ভুল কমলা। জীবনের কোনো কাজেই ক্ষুদ্র তুচ্ছ নয়। জীবনকে যদি তুমি ভালোবাসতে শেখ সারাটা দিন ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে থেকেও তুমি যে জীবন কাটাতে পারবে, সংসারের সমস্ত কাজে আনন্দ লাভ করতে পারবে, বাইরের জগতের হাজার কাজও হয়তো তোমার জীবনে ততটা মোহনীয় সুখের করে তুলতে পারবে না। ঘরের ক্ষুদ্র সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে এমন কিছু কাজ করতে  পারা যায় যা হয়তো মানুষের জীবন পূর্ণ করে তুলতে পারে, সুন্দর করে তুলতে পারে, ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে তুলতে পারে-’ 
ছেলের কথা শুনে বিজয় ভরালী চমকে উঠলেন।মানুষ অনেক সময় সন্তানের কথা বলতে গিয়ে বলে যে মায়ের মতো হয়েছে বা বাপের মতো হয়েছে। সঞ্জয়ের চেহারা কিন্তু তাদের দুজনের মধ্যে কার মতো হয়েছে সঠিকভাবে বলা কঠিন। কিন্তু এই মুহূর্তে সঞ্জয়ের কথাগুলি বিজয় ভরালীর মনে পুনরায় ইলার ছবিটা জাগিয়ে তুলল। সঞ্জয়ের চেহারা দেখে বিজয় ভরালীর কখন ও ইলাকে মনে পড়েনি। কিন্তু আজ তার হঠাৎ দেখা সঞ্জয়ের এই মানসিক রূপ খুব বেশি করে ইলাকে মনে করিয়ে দিল। ইলার সঙ্গে সঞ্জয়ের এত বেশি মিল রয়েছে কোনো দিন আগে জানতে পারেননি।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বিদেহ নন্দিনী || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস || Bideha Nandini- 20

বিদেহ নন্দিনী ডঃমালিনী  মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস    (বিশ) চিত্রকূট ছেড়ে আসার পর থেকে দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়ছে না। মাঝ...