রবিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২১

নরকে এক সন্ধ্যা || মিনতি চৌধুরী || মূল অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস

 নরকে এক সন্ধ্যা

মিনতি চৌধুরী

মূল অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস



তীব্র রোদের তাপটা কখন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে এল,মানুষের ব্যস্ততা, কোলাহল কখন ধীরে ধীরে শীতল হয়ে পড়ল জয়ন্ত বলতে পারে না।  তার গলাটা শুকিয়ে কড় কড়ে হয়ে পড়েছিল। ক্লান্তিতে তার সমস্ত শরীর জড় করে ফেলেছিল। আর অপ্রকাশ্য কান্নাটা ভারী পাথরের মতো হয়ে বুকে এভাবে ঝুলছিল যে মাঝেমধ্যে সে অনুভব করছিল অল্প নাড়াচাড়া করলে প্রচণ্ড শব্দ করে বুক ফেটে পাথরটা খসে পড়বে। বড় কষ্টে,বড় ধৈর্যে সে বোঝাটা বয়ে বেড়াচ্ছিল। এখন তার জন্য সমস্ত কিছুই যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। সেও একটা যন্ত্র। যে যা করতে বলছে যন্ত্রের মতো সে বিরামহীন ভাবে একটার পর আরেকটা করে গেছে। ডাক্তারের খোঁজ করেছে, ফার্মেসিতে দৌড়েছে, অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করেছে এবং অহরহ যন্ত্রের মত সে নিঃশব্দে সেই বোঝা বহন করে নিয়ে বেড়াচ্ছে

এতক্ষণ পর্যন্ত বেশ কিছু সহকর্মী বন্ধু-বান্ধব তার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। দৌড়াদৌড়ি করার মতো কাজ গুলিতে তারা জয়ন্ত কে যথেষ্ট সাহায্য করছিল। এখন দুই-একজন করে তারা বিদায় নিল। পঙ্কজ এবং দীপক এখনও রয়েছে। দুজনেই একটা গাড়ির খোঁজে বেরিয়ে যাওয়া এক ঘন্টার বেশি হয়েছে। 

একটু দূরের একটি বেঞ্চে বসে থাকা শইকীয়া নাকি আরক্ষী অফিসার বারবার হাত ঘড়িটার দিকে তাকাতে সে কয়েকবার দেখেছে। মানুষটা জয়ন্তের দিকেও মাঝেমাঝে তাকাচ্ছে। জয়ন্তের প্রতি তার সমবেদনা জাগছে নাকি? নাকি সমগ্র পরিস্থিতিটার সঙ্গে বাধ্য হয়ে জড়িয়ে যাওয়ায় বিরক্ত হয়েছে? তার মুখে কিন্তু সমবেদনা অথবা বিরক্তি কোনো কিছুরই এই অভিব্যক্তি ফুটে উঠেনি। নাকি সেও তাঁর মতোই যন্ত্র হয়ে পড়েছেন?

পাশেই থাকা  সিস্টারদের ডিউটি রুমে কেউ চিৎকার করে কথা বলছিল। কিছুক্ষণ পরে নিতান্তই স্বাভাবিক গতিতে  সিস্টার দুজন আলাদা ওয়ার্ডে বেরিয়ে গেল। ওদের জয়ন্তের  দিকে তাকানোর যেন অবকাশ নেই। এই কিছুক্ষণ আগে যে প্রচন্ড তুফান এসেছিল,সেই তুফান যে একটি সবুজ পৃথিবীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলেছিল, সেই তুফানে খসে পড়েছিল সূর্য, খসে পড়েছিল আকাশ,… এই সবকিছুর, এই দুর্যোগ গুলির, বিন্দুমাত্র আভাস নেই ওদের মুখে।

বারান্দার দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে জয়ন্ত কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে  দাঁড়িয়ে রইল।

জয়ন্তদা ।

তার হাতে কারও স্পর্শ।

তার ভাতৃপ্রতিম ডাক্তার সুনীল।

  -গাড়ি এল। আমাদের সমস্ত কিছু রেডি। চলুন ।

ভাড়া করে আনা একটি ট্যাক্সির পাশে সুনীল তাকে নিয়ে এল। সে দেখল ট্যাক্সির পাশে তার সহকর্মী দীপক এবং পঙ্কজ অপেক্ষা করে রয়েছে। সুনীল নিজে দরজা খুলে পেছনের সিটে তাকে বসিয়ে দীপক এবং পঙ্কজকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আমার বিকেলের দিকে ইমারজেন্সি ডিউটি রয়েছে। ছেড়ে যেতে পারলে কোনো কথাই ছিল না, কিন্তু সঙ্গের জন নেই। যদি কিছু ম্যানেজ করতে পারি তাহলে আমি কিছুক্ষণ পরে যাব। এমনিতে আমি ফোন করে বলে দিয়েছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছেড়ে দেবার জন্য। 

জয়ন্ত একবার এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যেতেই  দীপক ড্রাইভারকে বলতে শুনল, ডিকি বন্ধ করেছ কি? দেখে নাও, দেখে নাও। যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি কর। যেখানে যাচ্ছি সেখানে বা কি ঝামেলা অপেক্ষা করে রয়েছে।

জয়ন্তের  শরীরে মুহূর্তের মধ্যে একটা শিহরন বয়ে গেল। তার বুঝতে বাকি রইল না যে ডিকিতে সমস্ত কিছু ভরানো হয়েছে। সমস্ত কিছু- তার জীবনের, তার …প্রচন্ড পাথরটি যেন বুক ভেঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।আঃ কী যন্ত্রনা! জয়ন্ত ঠোঁটদুটি কামড়ে চোখ বুজে ফেলল। গাড়িটা কখন এসে দাঁড়াল জয়ন্ত জানতে পারল না।

ইতিমধ্যে শহরে হালকা অন্ধকার নেমেছে। বিদ্যুতের আলোতে চারপাশ তিরবির করছে। শহরের এই সন্ধ্যাবেলা, বিদ্যুৎ এর আলোর ঝলকানি মানুষের এই ব্যস্ততা, এই পরিবেশ তার কত পরিচিত। এর প্রতিটি ঘর, প্রতিটি দোকান তার পরিচিত। কোন দোকানের বেড়ায় কী পোস্টার রয়েছে,কোন ঘরের জানালার কাঁচ একটা কাগজে মুড়িয়ে রাখা রয়েছে, কোন ঘরের সামনে গুলঞ্চ ফুল আছে, পথের কোন জায়গাটিতে নোংরা জমা করে রাখা আছে, এমনকি স্তূপীকৃত করে রাখা নোংরার গন্ধটা পর্যন্ত তার পরিচিত। অথচ এই মুহূর্তে সে সম্পূর্ন এক অপরিচিত গ্রহের প্রাণী। প্রশস্ত গেট দিয়ে গাড়িটা ভেতরে ঢুকে গেল। সে নামার আগেই দীপক এবং পঙ্কজ দ্রুত নেমে গাড়ির পেছন দিকে গেল। যাবার সময় তাকে বলে গেল,- জয়ন্তদা আপনি ডেকা না কোন ডাক্তারের কথা যেন বলছিলেন তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করুন, আমরা বাকিটুকু করছি।

গাড়ি থেকে নেমে ডাক্তার ডেকার সন্ধানে এক পা এগিয়ে জয়ন্ত থমকে গেল। একটা উৎকটগন্ধে পেটের সমস্ত নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসতে চাইল। ভাগ্য ভালো সকালে অফিসে আসার সময় পেটে ভাত ছাড়া আর কিছু পরে নি, সেটাও বোধ হয় অনেকক্ষণ  হজম হয়ে গেছে । অভ্যাসবশত প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে জয়ন্ত হতাশ । রুমালটা নেই, দুপুরবেলা দৌড়াদৌড়ির সময় নিশ্চয়ই কোথাও পড়ে গেছে। প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে ডক্টর  ডেকার সন্ধানে ঘুরে শেষে জয়ন্ত জানতে পারল ডেকার সঙ্গে এখন দেখা করা সম্ভব নয়। অনেকগুলো কেস রয়েছে। তাই স্যার ভীষণ ব্যস্ত। জয়ন্ত তার সমস্যার কথা, সুনীলের কথা বলে ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করার পথটা মুক্ত করতে চাইল। লোকটি কিন্তু জয়ন্তের কথায় বিশ্বাস করল না। আসলে জয়ন্তর কথা লোকটি কতটা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে, শোনা কথাটুকু বুঝেছে বা বুঝতে চেষ্টা করেছে সেই বিষয়ে জয়ন্তর সন্দেহ হল। গালের হনু বের হওয়া দীর্ঘ লম্বা মুখের মানুষটার লাল চোখ জোড়া অহরহ শিকারের অপেক্ষায় যেন জ্বলজ্বল করছিল। প্রায় কড়া সুরে  সে জয়ন্তের সামনে  ঘোষণা করল,-‘এখানে সব কাজ সিরিয়ালি হয়। যে  আগে আসবে তার আগে,যে পরে আসবে তার পরে  হবে। তাই লাইনে থাকলেই সব কাজ ঠিকঠাক ভাবে হয়ে যাবে।’ 

মানুষটার চেহারা এবং তার রুক্ষ ব্যবহার জয়ন্তকে এতটাই বিরক্ত করল যে দ্বিতীয়বার সে আর ডাক্তার ডেকার কথা জিজ্ঞেস করল না। জয়ন্তের মনে হল মানুষের জঘন্যতম, নিষ্ঠুরতম, নির্মম ঘটনার সঘন সান্নিধ্য, জীবনের রূঢ় বাস্তব এদের স্বভাব, এদের ব্যবহার -কথাবার্তা থেকে সমস্ত স্বাভাবিক কোমলতা এবং সহৃদয়তা  নাই করে ফেলেছে নাকি?

জয়ন্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে  বাস্তব জগত থেকে হারিয়ে যেতে চাইল। বুকের উপর চেপে থাকা  প্রকাণ্ড পাথরটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। চারপাশের গলিত দুর্গন্ধ ভেদ করে কোথা থেকে যেন এক কোমল সুবাস এসে তার নাকে লাগল। সুবাসের  মতোই একটি কোমল কণ্ঠস্বর-‘এখন,এখনও আমার সাহসে সন্দেহ আছে নাকি? নাকি এখনও বলবে আমার সাহস নেই?’

মা-বাবার একমাত্র সন্তান,পরিবারের সবার আদরের বড় হওয়া ইন্দ্রানীকে জয়ন্ত প্রায়ই বলত, এই অত্যধিক ভালোবাসা তাকে প্রকৃতই ভীরু করে তুলেছে। তাই জয়ন্তর চেয়ে উচ্চবর্ণের ইন্দ্রানীকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পারিবারিক বাধা অস্বীকার করে বা প্রতিকূল পরিস্থিতির  সম্মুখীন হওয়ার সাহস তার হবেনা বলে জয়ন্ত মাঝেমধ্যে ইন্দ্রানীকে খ্যাপানোই নয়, সত্যিই সেরকম একটি আশঙ্কা তাকে চিন্তিত করেছিল। কিন্তু বাস্তবে জয়ন্ত ভাবার মতো  পরিস্থিতি জটিল হল না। ইন্দ্রানী এবং জয়ন্তের সম্পর্কটা জানার পরে তারা জয়ন্তের সঙ্গে মাত্র কথাবার্তা বলতে চাইল এবং আনন্দের সঙ্গে তাকে জামাই হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত হল।

বিয়ের পরে তাই সেই প্রশ্নে ইন্দ্রানী প্রথম সম্ভাষণ জানিয়েছিল।–‘এখনও বলবে নাকি সাহস নেই? বেশ বোঝা পড়ার মধ্য দিয়ে বিশৃঙ্খলাহীন ভাবে তাদের সংসার চলছিল। কোনো কথায় কখন ও  কারও উপর নির্ভর করতে না ভালোবাসা জয়ন্ত ঘরোয়া জীবনে কীভাবে  ধীরে ধীরে সম্পূর্ণভাবে ইন্দ্রানীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল সে নিজেই জানতে পারল না। অফিসে যাবার জন্য বেরিয়ে একটা রুমালের খুঁজে হুলস্থুল  করা জয়ন্তকে  কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে ইন্দ্রানী একদিন বলেছিল-‘ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রুমাল রয়েছে।’

‘আমিও জানি সেখানে আছে।’ 

‘তাহলে হুলস্থুল করছ কেন?’

‘কেন হুলস্থুল করব না?’ কারণ অফিস যাবার আগে একটা রুমাল পকেটে ভরিয়ে দেওয়াটা তোমার কাজ। 

-ইস আমার কাজ? দাঁড়াও, এবার কলেজ বন্ধ হলে বাড়িতে গিয়ে অনেক দিন থেকে আসব। তখন বুঝবে মজা।

তার পকেটে রুমাল ঢুকিয়ে দিতে থাকা ইন্দ্রানী কে কাছে টেনে নিয়ে সে বলেছিল,’সাহস আছে?

-ও-

  -কতদিন? এক সপ্তাহ? এক মাস?

- সময় হলে দেখতে পাবে কতদিন।

জয়ন্ত ইতিমধ্যে দেখেছে, সে না থাকলে ইন্দ্রাণী দুদিন ও একা থাকে না। বাড়ির সকলের আদরের ইন্দ্রানীকে এভাবে তার প্রেমে বেঁধে ফেলতে পেরে জয়ন্ত মনে মনে গৌরব বোধ করে। 

ওদের প্রথম সন্তান মনমণির জন্মের আগের সেই দিনগুলি?

আঃ  কী যে সর্বনাশা একটা ভয়  ইন্দ্রানীকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

তার ঘুম একেবারেই  কমে গিয়েছিল। প্রায় রাতেই জয়ন্তকে জাগিয়ে দিয়ে তার বুকের মাঝখানে ঢুকে গিয়ে ছোট মেয়ের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত, আর বলত আমার ভয় করছে।

-ভয় করার কী আছে? আমি তো রয়েছি।

- না জয়, তুমি বুঝতে পারছ না। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমি যদি মরে যাই?

তার মুখে চাপা দিয়ে আলগোছে সে কপালেএকটা চুমু খেয়ে বলেছিল-‘আমার সাহসী মানুষটার মুখে এই সমস্ত কথা শোভা পায় কি? তার বুকের মধ্যে বিড়বিড় করে ইন্দ্রানী বলে উঠেছিল-‘ আমি মরতে চাই না জয়।’ 

আমি সব সময়, সব সময় তোমার কাছে এভাবে থাকতে চাই। ঘুম আসতে না চাওয়া  ইন্দ্রানীর চুলে কোমল শব্দের জাদু কাঠিতে সে ইন্দ্রানীর চোখে ঘুম এনেছিল । খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে আসা জ্যোৎস্নাকে সাক্ষী রেখে জয়ন্ত যেন মনে মনে বলেছিল-‘তোমাকে আমার বুক থেকে কেড়ে নেওয়ার সাহস কারও নেই। তুমি ভয় কর না।’

কিন্তু মৃত্যুভয় এতটা বিব্রত করে তোলা ইন্দ্রানীর এই দুর্দান্ত সাহস কীভাবে হল? সে একবারও জয়ন্তর কথা মনমনির কথা, রণমনির কথা ভাবল না।মনমণি,রণমণি ? এখন ওরা কি করছে? কাজের মেয়ে রমলা ছাড়া ওদের বাড়িতে আর কেউ নেই। ভুলেও কি রমলা এই নির্মম পরিস্থিতির কথা কল্পনা করতে পেরেছে? সে রণমণিদের কী বলেছে? বাড়িতে খবর দিতে বলা সহকর্মী সদানন্দও জানে না যে… হঠাৎ জয়ন্তের নাক  থেকে সুন্দর সুবাসটা চলে গেল। 

আগের দুর্গন্ধ নয়, নতুন এক দুর্গন্ধের স্তূপে  যেন সে ঢুকে পড়ল। একটা ঠেলা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। উৎকট দুর্গন্ধে তার শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল।

দুজন পেশাদারী লোক ঠেলাটা থেকে বাঁশের ধাড়িতে মোড়া পোঁটলা নামাচ্ছে। ওদের মুখে সুরার তীব্র গন্ধ। তা সত্বেও সম্ভবত ওদের ঘ্রাণশক্তি বিকল হয়ে পড়ে নি। দুজনেরই নাক রুমাল দিয়ে বাঁধা। ঠেলাটার এখানে-সেখানে জ্বালিয়ে দেওয়া মুঠো মুঠো ধূপ এবং সস্তার সেন্টের গন্ধের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ সমগ্র পরিবেশটা আর ও বেশি ভারী অসহনীয় করে তুলল।

সঙ্গে আসা অন্য কয়েকজনের কথাবার্তা থেকে জয়ন্ত জানতে পারল এক সপ্তাহ ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে থাকা এটা একটি বারো বছরের শিশুর মৃতদেহ। আজ একজন প্রতিবেশীর বাগানের এক কোণ  থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুটি পরিবারের মধ্যে জমি মাটির সম্পর্কীয় মনোমালিন্যের নির্মম বলি এই নির্বোধ শিশু। জয়ন্তের চোখের সামনে সমস্ত আলো যেন নিমেষের মধ্যে হারিয়ে গেল। চোখের সামনে ঘোরাঘুরি করতে থাকা মানুষের পরিচিত অবয়ব যেন ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত হল ভয়ঙ্কর কুৎসিত একটি রূপে। আমরা এই অন্ধকার দানবের  রাজ্যে বাস করছি নাকি?

-জয়ন্তদা, আপনার শরীর খারাপ লাগছে নাকি?

-না, না ঠিকই আছে। না, আপনি চোখ বুজে দেওয়ালে হেলান দিয়ে আছেন যে! চোখ বুজে নাই, এমনিতেই ।

আমরা ট্যাক্সিটা ছাড়িনি। একেবারে বাড়িতে নিয়ে যাব। কাজটা তাই তাড়াতাড়ি হয়ে গেলে ভালো ছিল। ডক্টর ডেকাকে পেয়েছেন কি?

না, আজ নাকি অনেক কেস রয়েছে। ডাক্তার ভেতরে ব্যস্ত রয়েছেন। সবকিছু নাকি সিরিয়ালি হবে। তাই একটু অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে হচ্ছে। জয়ন্ত নিজেকে বলার মতো কথাগুলো বলল। অন্যদিন হলে দীপক বোধহয় জয়ন্তকে মুখ ভেঙ্গিয়ে বলত-‘ আপনার দ্বারা মোটের উপর কিছুই হবে না।’ কিন্তু সে কিছুই বলল না। জয়ন্তর কাছ থেকে সরে গেল। বলল না যদিও জানত বুঝতে পারল দীপক কাজটা দ্রুত করার জন্য পথ খুঁজতে গেছে।

ইতিমধ্যেই জায়গাটাতে দৌড়োদৌড়ি, ব্যস্ততা দেখা গেল। নতুন একটি কেস ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছে। বাইরে নিয়ে আসা কেসটা  নিয়ে কয়েকজন লোক অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কেসটার ‘সঙ্গে আসা আরক্ষীর লোকজনের সঙ্গে মানুষগুলি বড় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করছে। জয়ন্তের  অনুভব হল তাদের চারপাশে যেন একটা রহস্যের ঘন ছায়া। আরক্ষীর লোকজন কিছুক্ষণ পরে বিপরীত দিকে একটা করিডরের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেল। চুম্বক টেনে নেওয়ার মতো তিনি দুজন মানুষকে পেছনে পেছনে টেনে নিয়ে গেলেন।

অশ্লীল কিছু কথা শুনে জয়ন্ত মাথা তুলে তাকাল। মুখে তীব্র সূরার গন্ধ  থাকা যুবক দুজনের একজন অন্যজনকে বলছে (অশ্লীল) কী হবে এসব? সব শালা ফুং ফাং। সাত বছর থেকে মেয়েটি রইল।কাজ কর্ম করাল। এখন খেয়েদেয়ে শেষ। প্রানে মেরে ফেলল। বুড়ো বাপ এসবের কী বুঝতে পারবে? এক বৃদ্ধ পিতার করুণ অসহায় মুখ জয়ন্তের চোখের সামনে ভেসে উঠল। কোথাও কিছু না হওয়া বৃদ্ধের কারুণ্যের  কারণ কী? অকাল মৃত্যু (না হত্যা?) নাকি চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া তার জীবিকার পথ- মেয়ের বেতনের সেই  টাকাগুলি?

জয়ন্ত একটু সরে এল। সিঁড়ির পাশের টগর গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ অস্পষ্টভাবে কথা বলছিল।–‘তার শরীরের আগুন লাগানোর সময় আমরা নিজেরা ছিলাম। তখনও মৃত্যু হয়নি। ওরা জ্বালিয়েছে বলে মেয়েটা নিজে বলে গেছে।’ 

-স্বামী ছিল না নাকি সেই সময়? স্বামী ঠিক সেই সময় ছিল না। কিন্তু ষড়যন্ত্রটাতে  সে নিশ্চয় ছিল। না হলে আগুন লেগে চিৎকার-চেঁচামেচি করার সময় সে আগুন নেভানোর দূরের কথা মুখে বার বার 

চাপা দিয়ে ধরতে চাইছিল। আর আমাদের দেখে গালিগালাজও করছিল।

- কারণ কি? যৌতুক?

তাই হবে। নাই নাই করেও আজকাল প্রচুর ঘটনা এভাবে ঘটছে। জনগণ তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এর সুবিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।

উড়নার মধ্যে স্বপ্ন ভরা একটি মুখ। প্রথম রাতে স্বামীর দুচোখে সে কি দেখেছিল? হত্যাকারীর সেইরূপ একবার কল্পনা করেছিল কি? অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তার আতুর কন্ঠ বারবার রুদ্ধ করার জন্য চেষ্টা করা সেই মানুষটির এই দুই হাতের স্পর্শে একদিন তার অনাঘ্রাত যৌবন প্রাণপেয়ে উঠেছিল। ব‍্যস্ততার সঙ্গে দীপক জয়ন্তের কাছে এগিয়ে এল।

  -সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। এবারের পরেই আমরা।

-কিন্তু…

-ওদের কথামতো কাজ করতে গেলে আজ সারারাত বসে থাকলেও হবে না। ইতিমধ্যে যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। অন্যান্য কিছু  কাজকর্ম ও বাকি রয়েছে।

  -শেষ পর্যন্ত কততে রাজি হল?

-‘দুশোর কমে কথাই শুনতে চায় না। কোনো মতে দেড়শো তে রাজি করিয়েছি। আজকে কেস বেশি তো, তাই ওদের চাহিদাও বেশি। কাজটা তাড়াতাড়ি হলেই হল।’

দীপক পঙ্কজকে দুটো দরকারি টেলিফোন করে আসতে বলল। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সে নাম এবং নাম্বার গুলি লিখে দিল। পঙ্কজ দ্রুত বেরিয়ে গেল। প্রস্তর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা জয়ন্ত ভাবল তার জন্য এখন আর এক অগ্নিপরীক্ষা সমাগত। আর কিছুক্ষণ পরই সে বাড়ি যাবে। বাড়ি তার পরিচিত বাড়ি। অথচ অপরিচিত একটি ঘরে এখন সে ঢুকবে। মনমণি রণরণির কাছে সে কীভাবে দাঁড়াবে? ওদের সে কী বলবে? প্রতিবেশী কেউ তার ঘরে আছে কি? তার তো বাড়িতে যাওয়াই হল না। সকালবেলায় সে বেরিয়ে আসা…

কত স্বাভাবিক এবং সুন্দরভাবেই না আরম্ভ হয়েছিল তার জীবনের আজকের সকাল। সকালে দুজন ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃভ্রমণ করে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল।মনমণি-রণমণি ঘুম থেকে উঠার পরে  ইন্দ্রানী ওদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তারপরে ওদের স্কুলে পাঠিয়ে জয়ন্তর সঙ্গে ইন্দ্রানী বেরিয়ে এসেছিল। আজ তার কলেজ বন্ধ। তাই কিছু দরকারি জিনিস কেনাকাটা করবে।

অন্যদিনের মতো আজও ইন্দ্রাণী নিজের টিফিন তৈরি করে তার ব্যাগে ভরে দিয়েছিল। পকেটে রুমালটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। রুমালটা ভাঁজ করে ঢুকিয়ে দেবার সময় তার দিকে বেশিক্ষন তাকিয়ে ছিল নাকি? তার আত্মা কি কিছু জানতে পেরেছিল? সে না শোনার মতো করে বলেছিল নাকি-‘আমার সাহস নাই বলতো? দেখবে নাকি? তোমার এই দুরন্ত প্রেমের বাঁধন ছিন্ন করে যাবার সাহস আমার আছে…

ইস! কী যে ভয়ঙ্কর ছিল সেই সময়টা। 

সঞ্চালক তাকে দ্রুত থেকে পাঠিয়েছিল। ইন্দ্রাণীর কথা জিজ্ঞেস করেছিল। তারপরে যতটা সম্ভব সহজ ভাবে তিনি জয়ন্ত কে বলেছিলেন-‘হাসপাতাল থেকে একটা ফোন এসেছে। একজন মহিলার ব্যাগে আপনার ঠিকানা থাকা চিঠি রয়েছে। একবার খবরটা নিয়ে আসুন তো। দুর্ঘটনা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানায়নি। ঈশ্বর না করুন আপনার শ্রীমতি নাও হতে পারে।’ 

জয়ন্তের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। বিন্দুমাত্র দেরি না করে সে আর জনা পাঁচেক বন্ধুকে নিয়ে তখনই হাসপাতালে ছুটে এসেছিল। ধীরে ধীরে অফিসের প্রায় সবাই এসে গেল। হাসপাতালের বিছানায় নিঃসার হয়ে  পড়ে থাকা মহিলাটি অন্য কেউ নয়-ইন্দ্রাণী- তার ইন্দ্রাণী। বাজার করে সে হয়তো অটোতে করে বাড়ি ফিরছিল। সামনে থেকে এসে থাকা …

ধাক্কাটা খাওয়ার সময় ইন্দ্রাণী কী ভাবছিল? জয়ন্তের অবর্তমানে কীভাবে কষ্ট সহ্য করল?  মনমণি-রণমণির জন্মের সময় ইন্দ্রাণী যে বলেছিল-‘তুমি আমার পাশে থাকলে সমস্ত যন্ত্রণা যেন দূরে চলে যায়।’ নিঃসার হয়ে পড়ে থাকা ইন্দ্রাণীর মুখের কাছে মুখ লাগিয়ে সে বিড়বিড় করে বলেছিল- ‘আমি তোমার কাছেই আছি। তোমার জয়, তোমার যন্ত্রণা কিছুটা কমেছে কি?’

প্রথমত সংজ্ঞা না থাকা ইন্দ্রানীর জ্ঞান ফিরে এসেছিল। কিছুক্ষণের জন্য তার দিকে তাকিয়েছিল, হাসার চেষ্টা করেছিল। কিছু একটা বলতে চেয়েছিল বোধহয়। সেই কথাটাই হবে-‘আমার সাহস নাই বলছিলে না, তোমাকে প্রমান দেখাব।’ 

দুইহাতে জয়ন্ত মাথার চুলগুলি খামচে ধরল।

-জয়ন্ত দা একটু আসুন তো, দীপক ডাকল।

- আপনার হাতে কত আছে?

পকেট হাতড়ে এখন তার খেয়াল হল আসার সময় ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে আনা দুই হাজার টাকা একইভাবে রয়েছে। পকেটে হাত ভরতে দেখে  দীপক বলল-‘বের করতে হবে না, আমার সঙ্গে কিছুটা আছে, দরকার হতে পারে বলেই জিজ্ঞেস করছি। এমনিতে আমাদের কাজ হয়ে গেছে। ডাক্তারের ল্যাঠাটাই মিটেনি। 

-ডাক্তারের ল্যাঠা মানে? 

দীপক কিছু বলল না। পেছনে পেছনে আসার ইঙ্গিত দিল। সংকীর্ণ একটা রাস্তা দিয়ে গিয়ে পোস্টমর্টেম করা রুমের পেছনের দরজা ঠেলে আস্তে করে ভেতরে ঢুকল। পঙ্কজ ডঃ ডেকাকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে। আর ডক্টর ডেকা বুঝতে চাইছেন না। একই কথায় ধরে বসে আছেন।

দরজা খোলার শব্দ শুনে ডঃডেকা মাথা তুলে তাকালেন। এবং অতি পরিচিত মানুষের মতো সম্ভাষণ জানিয়ে স্বাভাবিকভাবে বললেন-‘আপনার কাজ হয়ে গেছে। রিপোর্ট রেডি। আমার ফীসটা দিন এবং …’

-ফীসটা দেবার জন্যই তো অপেক্ষা করছি। পঙ্কজ বলল।

-‘দেখুন বাইরে কয়েকটা কেস রয়েছে। সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আসলে আমি খুব একটা বেশি চাইনি। এক হাজার টাকা দিন। রিপোর্টটা নিয়ে যান।

-এক হাজার?

জয়ন্ত  নিজের কন্ঠসুর শুনে যেন নিজেই চমকে উঠল। ডঃ ডেকা সামান্য হাসলেন।

দেখুন এটা আমি খুব একটা বেশি বলিনি। আমার এই সার্টিফিকেট আপনাদের পড়ে আরও অনেক কাজে সাহায্য করবে। তখন তো আর আমাকে মনে পড়বে না। তাই …অবশ্য, আপনার কোনো কাজে সাহায্যের দরকার হলে আমি সব সময় প্রস্তুত।

এরপরে অভ্যস্ত হয়ে পড়া চারপাশের দুর্গন্ধ হঠাৎ যেন সহ্যাতীত ভাবে বেশি হয়ে পড়ল।

জয়ন্তের পুনরায় বমি আসতে চাইল। যতটা সম্ভব দ্রুত হাজার টাকা দিয়ে সে বেরিয়ে এল।

ইস কী উৎকট গন্ধ। এটাতো গলা,পচা সেই পরিচিত গন্ধটা, নয় কি? তাহলে?

পাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে থাকা বলে বুঝতে পেরে জয়ন্ত মাথা তুলে তাকাল, আরক্ষীর সেই অফিসার। জয়ন্তের গায়ে হাত দিয়ে শান্ত সুরে তিনি বললেন-‘কাজ হয়েগেছে যখন আমি এখন যেতে পারি। আপনার পরে প্রয়োজন হলে আমাকে খবর দেবেন। ডঃ ডেকার কথাটা সহজভাবে নিন। যেভাবে আমাদের টাকা নেওয়াটা আপনারা সহজভাবে নেন বা ধরেই নেন যে আমরা সবসময় পয়সার পেছনে ঘুরি।’

দীপক এবং পঙ্কজকে বলে তিনি চলে গেলেন। 

সামনে পঙ্কজ, পেছনে জয়ন্ত আর দীপক এবং ডিকিতে ইন্দ্রাণী। 

ট্যাক্সি এগিয়ে চলেছে-।

দীপক এবং  পঙ্কজ এর পরের প্রস্তুতির বিষয়ে কথাবার্তা বলছে। জয়ন্ত নিজেকে জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের জন্য প্রস্তুত করার চেষ্টা করছে।

হঠাৎ হঠাৎ সেই উৎকট গন্ধ এসে লাগল। কোথা থেকে আসছে সেই গন্ধ?ডিকি  থেকে? ও- না-। সে অধৈর্য হয়ে নিজের শরীরে নাকটা লাগিয়ে শুঁকতে লাগল। কী হয়েছে তার? গন্ধটা,এই উৎকট গন্ধটা দেখছি তার নিজের শরীর থেকেই আসছে?

------------

 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Z - চেতনার কবিতা || অরুণ দাস

  Z - চেতনার কবিতা || অরুণ দাস .............................. Z - চেতনার কবিতা .............................. পঁয়তাল্লিশ . মাতাল সন্ধ্যায় এ...