রবিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২১

সুবাস || জেহিরুল হুসেইন || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস

 সুবাস

জেহিরুল হুসেইন

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস





বাগানের কোণে  শাক কুড়োতে  গিয়ে মিসেস চলিহা বুড়ি চাদরের কোন দিয়ে নাকটা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলেন, রাম !রাম! কী পচা গন্ধ ! কে জানে কী মরেছে। বুড়ি হাতে খড়াইটা নিয়ে প্রায় দৌড়াতে  দৌড়াতে  ঘরে ঢুকে গেলেন। বড় বউ বারান্দায় বসে মেশিনে কাপড় সেলাই করছিল। জিজ্ঞেস  করল ‘কি হয়েছে মা?’ 

মিসেস চলিহা বার তিনেক থুথু ফেলে বললেন,- ‘আবার কিছু একটা মরেছে। এবারও গরুই হবে।’ মারোয়াড়িটার জমির কাছে। ঘরবাড়ি তৈরি না করে ফেলে রাখায় দেখতে দেখতে বিশাল জঙ্গল হয়ে উঠেছে। দিনের বেলা কিছু ঢুকে থাকলেও দেখা যায় না। লোকেরা রাজ্যের মরা জন্তু এখানে এনে ফেলবে। রাম রাম কী পচা গন্ধ!' 

আপনি কেন গিয়েছিলেন মা?’

‘খুতরা,  মাটি কাদুরী গুলি সুন্দর বড় হয়েছে। দু-একটা ছিঁড়ে এনে রান্না করব ভেবেছিলাম।মাছ মাংস খেয়ে খেয়ে পেট গোলাচ্ছে। এরা তো বাজার থেকে শাক পাতা  আনে না।'

পুতুমনিকে বলে দিলেই সে ছিঁড়ে আনতে পারত?’

‘ রাখ রাখ মিসেস চলিহা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে  উঠলেন। ওদের কথা আর আমাকে বলিস না। সকাল আটটা থেকে ছয়টি মানুষের এঁটো বাসন ধুয়ে শেষ করতে পারছে না। ও আমাকে শাক ছিঁড়ে এনে খাওয়াবে? তোদের বাবা কোথায় গিয়েছে?'

'ড্রইংরুমে কাগজ পড়ছে বোধহয়।' 

মিসেস চলিহা সেখান থেকেই চিৎকার করলেন- 'এই যে শুনতে পাচ্ছেন? এদিকে আসুনতো। কাগজ পড়ে সময়  কাটাতে হবে না।’ 

রিটায়ার্ড জাজ  বৃন্দাবন চলিহা  স্ত্রীর চিৎকারে যেখানকার কাগজ সেখানেই ফেলে রেখে পেছনে এসে দাঁড়ালেন। ‘কী হল এত চিৎকার করছে যে?’

‘পেছনের বাগানের কোণটিতে গিয়ে লম্বা করে শ্বাস নিন তো?’

‘তুমিই বল না কথাটা কী?’ চশমা জোড়া খুলে হাতে নিয়ে বললেন।

  তখনই পুত্রবধূ বলে উঠলেন,‘মা শাক কুড়োতে গিয়ে খারাপ গন্ধ পেয়েছে। মরা গরু টরু কেউ ফেলেছে নাকি?’

‘ আমাদের বাগানের মধ্যে নয়তো?’

‘মাড়োয়ারির বাগানের মধ্যে ফেলেছে বোধহয়।’ 

মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে একটা খবর দিতে হবে। জঙ্গল কাটার জন্য নোটিশ দিন। এখানে লোকজন জীবজন্তুর মৃতদেহ ফেলবে  আর ভিকটিম হব আমরা। এটা কি ধরনের অন্যায় ? মিস্টার চলিহা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন-‘ বাড়িতে এতগুলো কাজের লোক থাকতে তোমার শাক কুড়োতে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিল?’

মিসেস  চলিহা রাগে গরগর করে উঠলেন‌- ‘রাখ রাখ চাকর বাকরের নামে যে কয়েকজন মহাপুরুষকে পুষছ। অকর্মার ঢেঁকিগুলোকে বলার চেয়ে নিজেই করা ভালো।’

বুড়ির চাকর চাকরানীদের সঙ্গে মিসেস চলিহার চির৲কালীন বিরোধ। তার মতে প্রতিটি চাকর চাকরানী অলস, ফাঁকিবাজ, চোর না হলে ঠগ।

মিঃ চলিহা স্ত্রীকে খ্যাপানোর উদ্দেশ্যে বৌমাকে বললেন-‘ বুঝেছ, ইভা মায়ের নাকটা আমাদের অন্যদের চেয়ে বেশ লম্বা। তোমার আমার নরমাল নাকের চেয়ে উনার নাক অনেক আগেই গন্ধ পায়। একবার কোকরাঝার থাকার সময় বুঝেছ...।’ 

চলিহা শেষ করার আগেই মিসেস চলিহা বাধা দিয়ে বললেন-‘ হবে হবে বৌমার সামনে পুরোনো মহাভারত খুলে বসতে হবে না।মেথর টেতর লাগিয়ে গরু  মরেছে না শুয়োর মরেছে ফেলার বন্দোবস্ত কর। না হলে আমি গন্ধ নিয়ে এখানে থাকতে পারব না। আগামীকাল দুলিয়াজান চলে যাব।’ 

চলিহার দ্বিতীয় ছেলে মৃগেন  দুলিয়াজানে  অয়েল ইন্ডিয়ার ইঞ্জিনিয়ার। সুবিধা পেলে মিসেস চলিহা দুলিয়াজানের ছেলের বাড়ির সুখ-সুবিধা গুলির কথা বলেন। মেজ বউয়ের সুখ ঐশ্বর্য বড় বউ খুব একটা সহ্য করতে পারে না। সে কথা মিসেস  চলিহা জানেন। সেই জন্যই দুলিয়াজানের কথা বলে মিসেস চলিহা বড় বউকে মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে থাকেন। অথচ মিসেস চলিহা নিজেই  বেশিদিন দুলিয়া জান থাকতে পারেন না। দুলিয়াজানের যান্ত্রিক জীবন দুদিনেই মিসেস চলিহাকে বিরক্ত করে তুলে। ছেলের অফিস, বৌমার ক্লাব, বিভিন্ন ফাংশন ইত্যাদি ব্যস্ততার মধ্যে বুড়ি খুব নিঃসঙ্গ অনুভব করেন। তারমধ্যে  মেজবউ বুড়িকে খুব একটা পাত্তা দেন না। মেজ ছেলেও বৌ এর পক্ষ নিয়ে কথা বলে। এই ধরনের সম্পর্ক বড় বউয়ের সঙ্গে নেই যদিও ইভার প্রতি বুড়ির একটা স্বাভাবিক ঈর্ষা রয়েছে। প্রত্যেকেই বড় বউকে ভালোবাসে। এমনকি চলিহাও ইভার পরামর্শ নেয়।  বড় বৌমার রান্না বুড়ো তৃপ্তির সঙ্গে খায়  এবং প্রশংসা করে। মিসেস চলিহা নিজে ভালো রান্না করতে পারেন বলে একটা অহংকার ছিল। কিন্তু  বড় বউমা রান্না ঘরে  প্রবেশ করার পরে তার সেই সম্মান ধুলোয় মিশে গেল।বড় বউয়ের প্রতি স্বাভাবিক ঈর্ষার কারণ সেটাই।

তখনই এক ঝাঁক বাতাস গন্ধটাকে বাড়ির ভেতর বয়ে নিয়ে এল।  বৌমা নাকে কাপড় চাপা দিয়ে অক অক করে ভেতরে দৌড়ে গেল। মিসেস চলিহা  নাকে কাপড় চাপা দিয়ে বললেন-‘কেন এখন,আমার নাকটা তো লম্বা বলেছিলে।’

বৃন্দাবন চলিহা সামনের দিকে গিয়ে কণ নামের কাজের ছেলেটিকে চিৎকার করে ডাকলেন। কণ বুড়োর কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাকে নির্দেশ দিলেন, মাড়োয়ারির বাগানটাতে কিছু একটা মরে পড়ে আছে। দেখে আয়তো কী মরেছে।’ 

‘একটা নয়, দুটো। কেউ দুটো মরা গরু ফেলে রেখে গেছে।’ ফেলার সময় তুই নিষেধ করলি না কেন বুর্বক?’

‘আমি আজকেই জানতে পেরেছি।’ 

‘কার গরু জানিস কি?’ মুজিদ স্যার বললেন-‘মেরাপানির নাগা তাড়ানো মানুষগুলির গরু। ক্যাম্পে আসার সময় গরু ছাগল গুলি সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। তারই কিছু মারা গেছে। মরলে চুপিচুপি কাছে কোথাও ফেলে দেয়।‘

চলিহার রাগ হয়েছিল-‘স্টুপিড কোথাকার।নাগারা এদের এমনিতেই তাড়িয়ে দেয় নি। ডিসেন্সি, ডেকোরাম, হাইজিন বলে কোনো জিনিস এদের মস্তিষ্কে নেই। আর আমাদের মিউনিসিপ্যলিটি বোর্ডের   কর্মকর্তারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। এই ধরনের একটি লোক্যালিটির মধ্যে মরা গরুর ফেলে গেছে কুকুরগুলির কোনো খবর নেই। মুজিদ মাস্টারকে আমি ডেকেছি বলে বলবি। তাড়াতাড়ি যা।‘

কণ দৌড়ে গেল। মুজিদ মাস্টার পাড়ার সবার পরিচিত সমাজকর্মী। কোথাও লাইট নেই, জল নেই, জাতীয় সমস্যার সমাধানে মুজিদ মাস্টার সবার আগে।অভিযোগ এলেই একটা দরখাস্ত নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সই সংগ্রহ করেন। অসম আন্দোলনের সময় মুজিদ মাস্টার বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে পাড়ার মহিলারা আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যসূচিতে অংশগ্রহণ করেছিল। পাড়াটিতে ধোবি, রিক্সাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা ইত্যাদি কিছু ছোট ছোট বস্তি রয়েছে। ভদ্রলোক অধ্যুষিত অঞ্চলে এরকম একটি ছোটলোকের বস্তি থাকলে পরিবেশ নষ্ট হবে বলে আশঙ্কা করে মুজিদ মাস্টার সংশ্লিষ্ট মহলে আবেদন করেছিলেন। চলিহা সহ কয়েকজন স্থানীয় ভদ্রলোক মুজিদ মাস্টারের এই কাজকে ভীষণভাবে উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু মুজিদ মাস্টার চলিহারা তাদের তাড়াতে পারলেন না। তীব্র সংগ্রামের সময় ওদের একটা লোমও নাড়াতে না পেরে চলিহা, মুজিদ মাস্টার ভেতরে ভেতরে গুমরে মরছিলেন। শেষে কোনো উপায় না পেয়ে মুজিদ মাস্টার ওদের পরামর্শ দিয়েছিলেন-‘তোরা আছিস থাক, কিন্তু ভদ্রলোকের পাড়ায় ভদ্রলোকের মতো থাকবি। মদ খেয়ে ঝগড়াঝাটি করলে কিন্তু কথা খারাপ হবে। থাকতে পারবি না।’ 

মুজিদ মাস্টার হাঁপাতে হাঁপাতে চলিহা জজের ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করলেন, ‘স্যার আমাকে নাকি ডেকেছিলেন?’ 

চলিহা ভূমিকা না করে সোজাসুজি বললেন,- ‘ওহে মুজিদ।মাড়োয়ারিটার  বাগানে কেউ কিছু একটা ফেলে গিয়েছে। গন্ধে টিকতে পারছি না। কিছু একটা কর। তুমি সবকিছুতে নেতৃত্ব দাও বলে এই কাজটা তুমিই কর। গলা পচা গরুর গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে আমার স্ত্রী দুলিয়াজান  যাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।’ 

জজ সাহেবের মৃদু প্রশংসায়  মুজিদ মাস্টার ভেতরে ভেতরে  খুশি হয়েছিল। ‘ইস,খুড়ি এই সাধারণ  কথায় দুলিয়াজান  যাবার জন্য  প্রস্তুত হয়েছে? আমি আজই মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে একটা অ্যাপ্লিকেশন জমা দেব। রিলিফ ক্যাম্পে থাকা  মানুষগুলির কাজ স্যার। ওদের অনেক গরু ছাগল মরেছে, সেইসব যেখানে-সেখানে ফেলে দিয়ে এসেছে। সেদিন মিশন রোডের পাশে দুটো গরু মরে পড়েছিল। মানুষ যাবার মতো রাস্তা ছিল না। শেষ পর্যন্ত যাইহোক পৌরসভা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

  চলিহা বললেন, আরও একটি অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়ে দাও। এই মাড়োয়ারিটা  জঙ্গল বানিয়ে রেখে  জনবহুল অঞ্চলে একটি সমস্যার সৃষ্টি করেছে। চোর জাতীয় মানুষ দিনের বেলাতেই লুকিয়ে থাকতে পারে।  জঙ্গল সাফা করুক আর না হলে বাড়ি তৈরি করুক।’  

‘হ্যাঁ স্যার,সেটা একটি ইম্পরট্যান্ট পয়েন্ট। আমি লিখব। স্যার তাহলে এখন আসি।’ মাস্টার নমস্কার করে বিদায় নিলেন।

ইতিমধ্যে আরও একটি দিন পার হয়ে গেছে। মরা গরু  এভাবেই পড়ে রইল।  গন্ধটা আরও তীব্রতর হয়ে উঠল। প্রচন্ড রোদে গরমে  মৃতদেহ  পচতে শুরু করেছে। রাস্তা দিয়ে মানুষ গেলে নাকে রুমাল গুজে দৌড়ে পার হতে হচ্ছে। মিসেস চলিহা বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছেন। দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে থাকেন। গন্ধটা সমগ্র ভদ্রপাড়াটিকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। পাড়ায় থাকা স্থানীয় যুবকদের ছোট ক্লাবটিতে বিকেলে সদস্যদের উপস্থিতি কমে গেছে।

গন্ধটা নাকে লাগলেই মিসেস চলিহা অস্থির হয়ে উঠেন। স্বামীকে শুনিয়ে বলেন-‘আমাদের পাড়ায় পুরুষ মানুষ নেই বলে মনে হচ্ছে। আমরা মহিলারা রাস্তায় বেরিয়ে স্লোগান দিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করব।’ 

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও। একটা দরখাস্ত দেওয়া হয়েছে। আজ কিছু একটা করতে হবে।’ চলিহা বললেন।

কে দিয়েছে? মুজিদ মাস্টার? সেটা একেবারেই মিথ্যা।তার কেবল মুখটাই সম্বল। রিক্সাওয়ালা, ঠেলাওয়ালাদের এখান থেকে তাড়ানোর জন্য সে কয়েকবারই সই সংগ্রহ করে নিয়েছে? কিন্তু কী হল? ওরা তো আগের মতো যেখানে ছিল সেখানেই এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

মানুষ তাড়াণো ব্যাপারটা এত সহজ নয় বুঝেছ। আন্দোলন করে কি পেলে দেখলে তো।’ 

যা করার করুন। তাড়াতাড়ি করুন। না হলে পেট ফুলে মরতে হবে। বড় বউয়ের শারীরিক সমস্যা না থাকলে আমি কবেই দুলিয়াজান চলে যেতাম।–’ 

বুড়ি বিড়বিড় করতে করতে সরে গেলেন।

পরেরদিন আবার মুজিদ মাস্টার চলিহার বাড়িতে এল। চলিহা  তখন ড্রইংরুমে। মুজিদ মাস্টারের   মুখ বিমর্ষ,স্যার অনেক বড় সমস্যা হয়ে গেছে। মিউনিসিপ্যালিটির হরিজনরা  কাল থেকে স্ট্রাইক শুরু করেছে। ইনডেফিনিট পিরিয়ডের জন্য স্ট্রাইক। চেয়ারম্যান আমাকে নিজেই কিছু একটা করে নিতে বলেছেন।’ 

‘আমরা নিজে কী করব।‘চলিহার রাগ হল- নিজে মরা ফেলতে হবে।’

চলিহা সমস্যা সমাধানের কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে  বললেন-‘একটা কাজ কর, মাস্টার। এই পাড়ার কেবল তুমি আমিই বাসিন্দা নই। অন্যেরাও মৃত গরুর গন্ধ পাচ্ছে। বাকিদের সঙ্গে দেখা কর। কে কী বুদ্ধি দেয় দেখ।’ 

‘হ্যাঁ,স্যার।কথাটা খারাপ নয়।’

চলিহা দ্রুত পায়জামা পাঞ্জামি পরার জন্য মুজিদের সঙ্গে বেরিয়ে এল। চল, প্রথমে ডাক্তার ব্যানার্জীর বাড়িতে যাই। ডাক্তার মানুষ। তিনি কি সাজেশন দেন শুনি।’ 

ব্যানার্জি বাড়িতেই ছিলেন। দু'জনকেই ব্যস্ত হয়ে বসালেন।চলিহা  প্রসঙ্গটি উঠালেন ‘আপনি কি গন্ধ পান নি, ডাক্তার? অবশ্য আপনার ঘরটা কিছুটা দূরে।’ 

ব্যানার্জি হাসতে হাসতে বললেন,’কী বলছেন মিস্টার চলিহা। গন্ধের অত্যাচারে আমার পেসেন্ট  কমে গেছে। মুজিদ সাহেবের অ্যাপ্লিকেশনে সই করেছি। আর কী করতে হবে বলুন। আই এম রেডি টু ডু। মোস্ট আনহাইজেনিক পরিবেশে বাস করছি। আমি তো বাড়ির চারপাশে ফিনাইল, লোশন, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি ছিটিয়ে দিয়েছি। বাড়ির ভেতরে প্যাকেট প্যাকেট ধূপ জ্বালাচ্ছি। সব বেকার। মিসেস ভাত খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।’ 

জজ বললেন, ‘চলুন আপনার গাড়িতে সিভিল এসডিওর সঙ্গে দেখা করে আসি।আমার  গাড়ি বড় ছেলে নিয়ে গেছে।’ 

ডঃ ব্যানার্জি তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হলেন। গাড়ি এগিয়ে চলল সিভিল এসডিওয়ের অফিসের দিকে। রাস্তায় স্থানীয় ক্লাবের সম্পাদক পঙ্কজ এবং স্থানীয় ছাত্র নেতা অনুপমকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হল। এসডিওর সঙ্গে তাদের কোর্টে দেখা হল। চেয়ারম্যানের মতো তিনিও অসহায়, ‘আপনারা স্থানীয়ভাবে কিছু একটা ব্যবস্থা করুন। চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভালোভাবে আলোচনা করুন। তিনি হয়তো কিছু সাজেশন দিতে পারেন।’ 

ছাত্রনেতা অনুপম মুখ ভ্যাংচিয়ে বলল, ‘এই সমস্ত যদি করতে না পারেন আপনাদের জনস্বাস্থ্য বিভাগটা  কিসের জন্য রয়েছে?’

এসডিও অনুপমকে বুঝিয়ে বললেন-‘দেখুন, এই বিভাগগুলি আপনার আমার মতো কিছু মানুষের সমষ্টি। এই মানুষগুলিই ধর্মঘট চালালে কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে বলুন।’ 

‘আপনার কর্মীরাতো স্ট্রাইক করেনি। স্ট্রাইক করেছে মিউনিসিপ্যালিটির হরিজনরা।’ 

জনস্বাস্থ্যবিভাগের কোনো সুইপার নেই। মিউনিসিপ্যালিটির সুইপার দিয়ে কাজ করানো হয়। তাই বুঝতেই পারছেন… হতাশ হয়ে চলিহারা পুনরায় চেয়ারম্যানের কাছে গেলেন- ‘কিছু একটা করুন।’ ‘দেখুন চলিহা আজ রাতের বেলা সুইপার এসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হবে। হয়তো আগামীকাল ধর্মঘট উঠিয়ে নেওয়া হবে। তাহলে তো কোনো চিন্তা নেই।’ 

চেয়ারম্যান অবশ্য একটা পরামর্শ দিলেন সুইপার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বীরজু বল্মিকের সঙ্গে দেখা করার জন্য। হয়তো এটি একটি ব্যক্তিগত সমস্যা বলে টাকা-পয়সা দিলে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে।–‘স্ট্রাইক চলে থাকা অবস্থায় আমাদের কোনো হাত নেই বুঝেছ চলিহা। এখন বীরজু বল্মিক সর্বময় কর্তা।’ 

ডাঃ ব্যানার্জির গাড়ি হরিজন কলোনিতে গিয়ে পৌঁছাল। কলোনির  শিব মন্দিরের সামনে থাকা বিশাল জরিগাছের গোড়া পাকা করে দেওয়া হয়েছে। পাকার উপরে বসে সুইপার এসোসিয়েশনের সম্পাদক বীরজু বল্মিক সহকর্মীদের ধর্মঘটের স্ট্র্যেটেজি বোঝাচ্ছিলেন। চলিহাদের দলটাকে দেখে বীরজু উঠে দাঁড়াল।সে জজ সাহেবকে জানে। উঠে দাঁড়িয়ে একটা সালাম দিয়ে সে বলল স্যার,’ কিছু কাজ ছিল কি?’ বাকি হরিজন সহকর্মীরাও উঠে দাঁড়াল।

চলিহা ভনিতা না করে  পুরো ঘটনাটা তার কাছে বর্ণনা করলেন। বীরজু এরকমই কিছু একটা আশা করেছিল।সে জানে যে ব্যক্তিগত স্বার্থ না হলে এই মানুষগুলি দুপুরবেলা কখনও হরিজন কলোনিতে আসত না। তার মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। সে চলিহাদের প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,’ না সাহেব। এটা হতে পারবেনা। হরতাল চলে থাকার সময়ে আমরা কেউ কোন কাজে হাত দেবনা। না খেয়ে থাকলেও আমরা সবাই একত্রিত হয়ে লড়াই চালিয়ে যাব। আমাদের জবান এক সাহেব। আমাদের মাঝখান থেকে কোনো কুত্তা কাজে হাত দিলে তার গর্দান উড়িয়ে দেব। বোর্ডের  বেইমানির কথা আপনারা তো জানেন, জজ সাহেব। এবার সব দাবী মেনে না নিলে কাজ বন্ধ ব্যস। বীরজুর চোখদুটি আবেগে  অঙ্গারের টুকরোর মতো জ্বলছিল। চলিহার দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস করার সাহস হল না। বুঝতে পারলেন কাজ হাসিল করার একেবারেই নেই। ব্যানার্জি, পঙ্কজ,মুজিদ, অনুপম প্রত্যেকেই একবার করে ওদের বোঝালো। কিন্তু ওরা পাথরের মতন অচল অটল।

চলিহা ব্যানার্জিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন উপায়, ডাক্তার? হোয়াট ইজ আওয়ার নেক্সট স্টেপ।’ গাড়ির ভেতরে বসার সময় অনুপম বলল,‘ওদের নেতার লেকচার শুনলেন জ্যাঠা।শালা বিষ্ঠা ফেলতে ফেলতে সারা জনম গেল, তার এখন রোয়াব দেখ। আন্দোলনের সময়ে একটা বড় ভালো কথা ছিল। এই মানুষগুলো অন্তত ঠান্ডা হয়েছিল। এখন ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখেছে।’

অনুপমের কথায় কান না দিয়ে ব্যানার্জি বললেন,‘আমি একটা উপায় ভেবেছি চলিহা। রেলওয়ে কলোনিতে কয়েকজন সুইপার আছে। ওরা বোর্ডের অধীনে নয়। তাই টাকা পয়সা বেশি করে দিয়ে কাজ করানো যেতে পারে না কি?’

এরপর চুপ করে বসে থাকা মুজিদ মাস্টার চিৎকার করে বলল,‘আইডিয়া ডাক্তারবাবু।’ 

গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে রেলওয়ে কলোনিতে গিয়ে দাঁড়াল। স্টেশনমাস্টার ডাঃব্যানার্জীর পরিচিত। মাস্টারবাবুর সাহায্যে সুইপারদের কোয়ার্টারগুলি খুঁজে পেতে দেরি হল না। কোয়ার্টারের চারপাশের জায়গাগুলি পঙ্কিলময়।মোটাসোটা শুয়োর গুলি চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দু-একটি মুরগি নোংরা খুঁটে খুঁটে খেয়ে চারপাশে ছড়িয়ে ফেলছে। তার মধ্যেই কয়েকটি মলিন ছেলে মার্বেল খেলছে। হঠাৎ একজন মানুষ তাড়িয়ে আনা শুয়োর একটা দৌড়ে মুজিদ মাস্টারকে ধাক্কা দিয়ে গেল। মুজিদ মাস্টার ঘৃণায় শিউরে উঠে তোবা তোবা বলে লাফিয়ে উঠল।

স্টেশনমাস্টার সূইপারের সর্দারকে ডেকে আনলেন। চলিহা তাকে কথাটা বললেন। পঞ্চাশের গণ্ডি পার হওয়া সর্দার চলিহার কথাটা মনোযোগ দিয়ে শুনল। কিন্তু ধর্মঘটের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সে লাফ দিয়ে উঠল।‘না সাহেব না। বীরজু মানুষ বড় খতরনাক। ঝগড়াঝাটি, খুনখারাপি হয়ে যেতে পারে। আমাদের মজদুর কম। আর তার মধ্যে ওরা আমাদের মতোই মজদুর। ইনসাফ চেয়ে আন্দোলন করছে। আমরাও এরকম আন্দোলন করি। গদ্দারি করাটা কি ঠিক হবে।’ শেষে হাত দুটো জোর করে সে চলিহার কাছে  মাফ চাইল।

অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওদের রাজি করাতে না পেরে চলিহার দল ফিরে গেল।

‘এখন কী করবে মুজিদ?’ ভগ্নমনোরথ চলিহা জিজ্ঞেস করল। শুয়োরের ধাক্কা খেয়ে মুজিদের  রাগ হয়েছিল।বলল-‘ স্যার এই ছোট জাতগুলিকে তেল মারার চেয়ে নিজেই কিছু একটা করা ভালো। আমার একেবারে অসহ্য লাগছে।’

ডাঃ ব্যানার্জি স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে মুজিদ মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন,’আপনি কখনও র চোলাই মদ খেয়েছেন মুজিদ সাহেব?’

অপমানে মুজিদ লাল হয়ে ওঠলেন-‘আপনি এসব কী বলছেন ডাক্তার? সাতজনমে মদ খাইনি, আপনি বলছেন র চোলাই মদের কথা।’

ডাক্তার হাসতে হাসতে বললেন, ‘তাহলে পারবেন না, মুজিদ সাহেব। ঘোর নেশা না হলে সেই পচা গলা গরুর মৃতদেহের দশ গজ  কাছে যেতে পারবেন না।’

চলিহা বললেন,‘দাঁড়াও,মুজিদ,আমাদের বস্তির মানুষগুলোকে বললে কেমন হয়? টাকা পয়সা বেশি করে দিলে ওরা হয়তো রাজি হয়ে যেতে পারে। চোলাই টোলাই খেয়ে ওরা না করা কাজও করতে পারে।’ 

হতাশ মজিদ মাস্টার বলল, ‘আমাদের বাংলায় একটি কথা আছে ‘টাকার কাছে গোপাল নাচে’ সবই তো রিক্সাওয়ালা আর ঠেলাওয়ালা। একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কি?’

কথা মতো কাজ। এবার নেতৃত্ব নিলেন পঙ্কজ। বস্তির দুটো রিক্সাওয়ালা তার পরিচিত। সন্ধ্যে সাতটায় পায়ে হেঁটে প্রত‍্যেকেই বস্তির ঝুপড়ি গুলির কাছে গিয়ে উপস্থিত হল। ঝুপড়ির ভেতর থেকে ল্যাম্পের ক্ষীণ আলো বেড়ার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। কেউ ভাত রাঁধছে, কেউ রান্নার আয়োজন করছে। 

একটা ঝুপড়ির সামনে দাঁড়িয়ে  পঙ্কজ চিৎকার করে ডাকল-‘ বদ্রীনাথ ও বদ্রী।’ভেতর থেকে উত্তর এল। ‘কৌন হো ভাই?’ পঙ্কজ বলল, ‘হিয়া আও। থোরা বাত হ‍্যায়।’ হাতে আলো নিয়ে বদ্রীনাথ রিক্সাওয়ালা বেরিয়ে এল। ল্যাম্পের আলোতে  মানুষগুলোকে দেখে সে হতভম্ব হল। ‘আরে পংকজ বাবু, মাস্টার বাবু। কী হয়েছে?’ পঙ্কজ তাকে ঘটনাটা খুলে বলল। ‘গন্ধটা তোরাও পেয়েছিস। কিছু একটা কর। না হলে পাড়ার সমস্ত মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। পয়সার চিন্তা করিসনা। যত টাকা লাগে আমরা দেব।’ চলিহা উৎসাহ দিল,পাড়াতে তো তোরাও  আছিস। তোদেরও তো একটা কর্তব্য আছে। নয় কি?’ বদ্রীনাথ কিছুক্ষণ ভেবে বলল যে সে মরা গরু ছুঁতে পারবে না।জাত যাবে। বস্তিতে কোনো চামার হরিজন থাকলে করতে পারে।

বদ্রীনাথ চিৎকার করে করে ছয়টা মানুষকে ডেকে আনল। বদ্রি তাদেরকে বলল,’ ইনবাবুকে  বাত  শোন।পারলে কাজটা করে দে। আমি তো পারব না।’ 

কেউ পারবেনা। জাতপাতের কথা। টাকা দিলেও হবে না।জাত যাওয়ার ভয়। এদের মধ্যে চামার হরিজন কেউ নেই। কেউ কেউ অহীর,ভূমিজ, কুর্মী, তাঁতি। অসমিয়া রিক্সাওলা কাছেই এল না। 

চলিহা বিড়বিড় করে বললেন- ‘এদের আমরা এমনিতে তাড়াতে চাইনি। সোসাইটির এরাই হল নেগেটিভ ফোর্স। বিন্দু মাত্র হেল্পফুল নয়। পয়সা পাতি দেব অথচ সামান্য কাজটা করে দেবে না। মরা গরু ছুঁবে না। নবাবের জাত! ওদের পরে দেখে নেওয়া যাবে। এখন চলুন ব্যানার্জি অন্য কোনো ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা যাক।

ছাত্রনেতা  অনুপমের ও রাগ উঠেছিল। সে কিছুই করতে পারল না। ফেরার পথে সে একটু জোরে জোরে সবাইকে শুনিয়ে বলল-‘এদের ঠান্ডা রাখতে হলে মাঝে মধ্যে চড়-চাপড়, ঘুষি দিতে হয়।’ 

বদ্রীনাথ বয়স্ক মানুষ। অনুপমের কথায় সে লজ্জায় অধোবদন হয়ে রইল। অনুপমদের বয়সের নতুন পুরুষের হাতে মাঝেমধ্যে থাপ্পড় খাওয়াটা নতুন কিছু নয়, কিন্তু ভেতরে থাকা তার স্ত্রী ছেলে-মেয়েদের সামনে সে আজ ভীষণ অপমান বোধ করল। তখনই হঠাৎ নিঁখুত অসমিয়া ভাষা চলিহাদের কানে পড়ায়  কান মাথা গরম হয়ে উঠল। কথাটা কোণের একটা ঝুপড়ি থেকে এসেছিল। কণ্ঠস্বরটা নেশাগ্রস্ত মানুষের-‘কে হে বদ্রীভাই।বস্তি থেকে তাড়াতে চাওয়া মানুষ হলে বলবি। রাম-দা টা ধার দিয়ে রেখেছি। এক কোপে গলা নামিয়ে দেব বেটার…..।’

অনুপম হঠাৎ থেমে গিয়ে ফিরে যেতে চাইছিল। তার চুলগুলি রাগে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ব্যানার্জি অনুপমকে বাধা দিল, কী হবে ওদের সঙ্গে ঝগড়া করে। তোমার আমার ইজ্জত যাবে। ওদের ইজ্জত বলতে তো কিছু নেই। ব্যানার্জির অনুরোধে অনুপম থেমে গেল। সে পুনরায় দলের সঙ্গে বাড়িমুখো হল। দলটির  একজনের মুখেও কোনো কথা নেই। বিরক্তি, অপমান, ব্যর্থতার গ্লানিতে সবাই চুপ।

পরেরদিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও মিসেস চলিহা দুলিয়াজানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। বড় বৌমাকে দুদিনের জন্য বাপের বাড়িতে পাঠানোর বন্দোবস্ত করা হল। অন্তঃসত্ত্বা। দুর্গন্ধের ভাপ পেতে থাকলে অপকার হতে পারে। কাজের মেয়েটি মিসেস চলিহার সঙ্গে যাবার জন্য তৈরি হল। বাড়িতে থাকবে চলিহা,বড় ছেলে এবং ড্রাইভারটি নেই। গাড়ি নিয়ে ডিব্রুগড় গিয়েছে। কবে ফিরে আসবে তার ঠিক নেই। মরা গরুর পচা গন্ধ আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত শকুন পরে নি যদিও কাকেরা জঙ্গলের উপরে চক্রাকারে ঘুরছে। মাঝেমধ্যে কুকুরের ঘেউঘেউ। চলিহা বিরক্তির সঙ্গে বললেন,খা-খা ,তোরাই খেয়ে শেষ কর। আমাদের মানুষগুলি তোদের চেয়েও অধম।’ ব্যানার্জি আরও কয়েক লিটার লোশন, ফিনাইল, বিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিয়েছেন।  পাড়ার সমস্ত মানুষের ঘরের দরজা বন্ধ। কোনো মানুষকে বাইরে দেখা যাচ্ছে না। রাস্তা দিয়ে যাওয়া মানুষেরা নাকে কাপড় চেপে ধরে ওক ওক করে রাস্তা পার হচ্ছে।চলিহা বাইরে বেরোনো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন। দরজা-জানালা বন্ধ করে বই পড়ার চেষ্টা করছেন। ভেতর থেকে মাঝেমধ্যে স্ত্রী এবং বৌমার বমির শব্দ তার কানে ভেসে আসছে। মানুষদুটি বাড়ি ছেড়ে গেলেই তিনি সবচেয়ে শান্তি পান।

নাকে রুমাল চাপা দিয়ে মুজিদ মাস্টার চলিহার বাড়িতে দৌড়ে এল। চলিহা মাস্টারকে  ড্রইং রুমে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন-‘মুজিদ কোনো নতুন খবর আছে কি?’

‘না স্যার।কিন্তু আজকের দিনটা অপেক্ষা করুন। চেয়ারম্যান ধর্মঘটকারী হরিজনদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা ছিল। হয়তো কিছু একটা হবে।’

চলিহা বললেন-‘তাড়াতাড়ি কিছু হবে না বলে মনে হচ্ছে। আমি আজ এই বিষয়ে ডিসপুরে  ফোন করব। মন্ত্রীরা কী বলেন দেখি। ইয়ার্কি পেয়েছ নাকি ওরা?’

মুজিদ কিছু বলল না।চলিহার যে ভীষণ রাগ উঠেছে দেখেই বুঝা যায়। ‘গিন্নি আজ রাতের গাড়িতে দুলিয়াজান যাবে।বৌমাকেও বাপের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি।’

‘দাঁড়ান স্যার এত অধৈর্য হবেন না।একটা দিন অপেক্ষা করুন।’ 

দুজনেই কিছু সময় বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলেন। চলিহা পাড়ার অন্য বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া মুজিদ মাস্টারের কাছ থেকে জেনে নিলেন। ‘অনুপম তো স্যার একেবারে গরম। সে নাকি বস্তিটা  উঠিয়ে দিয়ে ছাড়বে।’ 

‘করতে দাও। এই বস্তির লোকদের অনুপমই ঠিক করতে পারবে। ওদের বাহাদুরি সেদিন দেখলে তো? যতসব ভিখারির দল।’

তখনই সাইকেলে করে পঙ্কজ এসে উপস্থিত হল। চৌহদের বাইরে সে সাইকেলটা রেখে  দৌড়ে ভেতরে এল। দরজার কাছ থেকেই সে চিৎকার করে বলল, ‘ভালো খবর আছে। সুইপারদের স্ট্রাইক শেষ হয়েছে। বোর্ড ওদের সমস্ত দাবি মেনে নিয়েছে। আজ থেকে কাজ শুরু করবে। আমাদের কাজটা নাকি প্রথমে করবে। চেয়ারম্যান অ্যাসুরেন্স দিয়েছে।’

চলিহার ক্রোধিত গম্ভীর মুখে হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়েছিল। ভেতরের দিকে তাকিয়ে বললেন –‘তোমাকে আর যেতে হবে না। মৃতদেহ ফেলার জন্য এখন সুইপার আসবে।’

মিসেস চলিহা,বৌমা প্রত্যেকেই আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ড্রইংরুমে এল। মেজো ছেলে স্কুল লিভিং পরীক্ষায় স্টার পেয়ে পাশ করাতেও বোধহয় মিসেস চলিহা এতটা আনন্দিত হন নি। 

‘ইস সত্যিই? কখন আসবে। তাড়াতাড়ি আসবে কি?’ ইত্যাদি নানা প্রশ্নে মুজিদ, পঙ্কজকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল।

কথাবার্তা চলার সময় দূরে মিউনিসিপ্যালিটির  ট্রেক্টর এর ঘর ঘর শব্দ শোনা গেল। মুজিদ মাস্টার চিৎকার করে উঠলেন-‘ঐ যে এসেছে।’ সবাই উৎকণ্ঠার সঙ্গে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। মিউনিসিপ্যালিটির  ট্রাক্টর সবসময় যাওয়া আসা করে। কিন্তু আজ যেন সঙ্গীতের ঝংকার। চলিহা একবার সন্দিহা হয়ে জিজ্ঞেস করল,’সত্যি সত্যিই  ট্রেক্টর তো? 

মুজিদ বলল-‘হ্যাঁ,স্যার হতেই হবে।’ মিউনিসিপ্যালিটির ট্রেক্টরের শব্দ তো আমি চিনি।’ 

ট্রেক্টর চলিহাদের বাড়ির সামনে এসে থেমে গেল। পাড়ার সবাই জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল। চারজন হরিজন। নোংরা লং প্যান্ট গুলি হাটু পর্যন্ত গোটানো, পায়ে ভারী জুতো। হাতে লম্বা বাঁশ এবং  বস্তা।ট্রেক্টরের স্টিয়ারিং হুইল  ধরে বসে আছে স্বয়ং বীরজু।চোখ লাল, মুখ গম্ভীর, ভাবলেশহীন  তার দৃষ্টি কেবল সামনের রাস্তায় নিবন্ধ।বাকি কয়েকজন হরিজন ইতিমধ্যে জঙ্গলে  মধ্যে ঢুকে পড়েছে।কাকগুলি  চিৎকার করে করে উড়তে লাগল। ঘেউ ঘেউ করতে থাকা কুকুরগুলি যে  যেদিকে পারে ছিটকে পালাল। নাকে চাদর চাপা দিয়ে মিসেস চলিহা এবং বৌমা ড্রইং রুমের জানলা দিয়ে উঁকি দিল।মিসেস চলিহা বললেন-‘ওদের ইন্দ্রিয়গুলি মরে গেছে নাকি? গন্ধ টন্ধ পাচ্ছে না? ওরা কিভাবে ঐ নোঙরা জায়গায় চলে গেল? যেন কিছুই হয়নি। ওরা কীভাবে মরাগুলি  তুলবে? ইস রাম!’

বৌমা ঘৃণায় শিউরে উঠে ভেতরে দৌড়ে গেল। চলিহা বললেন, ‘ইন্দ্রিয় গুলি মরে যাওয়াই ভালো বুঝেছ। তোমার আমার মতো লম্বা নাকের মানুষগুলিরই যত সমস্যা।’ 

এবার ট্রেক্টরটা সশব্দে স্টার্ট হল এবং মরা গরু দুটি নিয়ে চলে গেল। ট্রেক্টরের ঘর্ঘর  শব্দ দূরে মিলিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে গন্ধটাও নাই হয়ে গেল। ভদ্রলোকের পাড়ার ঘরগুলির দরজা-জানালা একটি-দুটি করে খুলে গেল।  মানুষগুলির গোমরা মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সবাই দীর্ঘশ্বাস নিয়ে অনেকখানি অক্সিজেন ফুসফুসের ভেতর টেনে নিল।

মিসেস চলিহা বুড়ি হাসতে হাসতে বললেন, ‘মেথর নয় হে’। পাড়ায় আজ স্বয়ং গোঁসাই ঈশ্বর এসেছিল।’

------

লেখক পরিচিতি-১৯৪১ সনে অসমের গোলাঘাট শহরে গল্পকার জেহিরুল হুসেইনের জন্ম হয়।শিক্ষতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে শ্রী হুসেইন কার্বি আংলং,নাগালেণ্ডের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকতা করেন। হোমেন বরগোহাঞি সম্পাদিত ‘নীলাচল’পত্রিকায় শ্রী হুসেইনের প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। লেখকের গল্প সঙ্কলন গুলি যথাক্রমে ‘দুবরি বনর জুঁই,রাং কুকুরর টুপি,জেহিরুল হুসেইনের নির্বাচিত গল্প। ২০০৫ সনের মে মাসে লেখকের মৃত্যু হয়।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নস্টালজিয়া ৩২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

  নস্টালজিয়া ৩২ পৃথা চট্টোপাধ্যায় নস্টালজিয়া ৩২ পৃথা চট্টোপাধ্যায়  আমার শৈশবের বেশ কিছুটা সময় কেটেছিল সাগরদিঘিতে। বাবা তখন ওখানে  বিডিও অফিস...