বৃহস্পতিবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২১

একজন বুড়ো মানুষ-১০ || নিরুপমা বরগোহাঞি || অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস, (৯)

 একজন বুড়ো মানুষ-১০,

নিরুপমা বরগোহাঞি,

অসমীয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,



(১০)
 
‘কিন্তু প্রফেসর হলে তোমার বাবা তো আমার সঙ্গে তোমার বিয়ে দিত না, কমলা?’ সঞ্জয় হাসতে হাসতে বলা কথাটা বাবা শুনতে পেল।
‘এসব  বাজে কথা ছাড়। তুমি হয়তো মনে মনে ভাবছ বাবা সোফায় বসলে কী এমন অপরাধের কথা হল- আমাকে হয়তো মনে মনে খারাপ পেয়েছ। কিন্তু তোমরা তো আমার কষ্ট বোঝনা, সোফার ঢাকনি গুলি ধুয়ে পরিষ্কার করে আমাকে ইস্ত্রি করে রাখতে হয়। একটি রবিবার মাত্র সময় পাই। আমার কত কাজ থাকে, তার মধ্যে যদি একজন মানুষ অনবরত বসে থাকে, ঘনঘন ঢাকনি নোংরা হবে,ইস্ত্রি ভাঙবে, আমার পরিশ্রম দ্বিগুণ হবে- সেইসব তোমরা কেউ ভাবনা-’ 
‘কমলা! হঠাৎ সঞ্জয়ের চিৎকারে বিজয় ভরালী প্রায় চমকে উঠেন।–‘তোমার সেই ঢাকনিগুলি আমি এখনই গিয়ে ছিঁড়ে ফেলব। তোমারও পরিশ্রমও কমবে আর আমার বাবাও আরামে বসে বই পড়তে পারবে। মনে রাখবে আমার বাবার একটু সুখ,একটু আরামের কাছে আমার সমস্ত কিছু তুচ্ছ-’
কমলা এরপরে কী বলে তা শোনার জন্য বিজয় ভরালী সেখানে দাঁড়াল না। খুব নিঃশব্দে চোরের মতো পা টিপে টিপে  গিয়ে তিনি আবার ড্রইংরুমে উপস্থিত হলেন। যে বইয়ের খুঁজে তিনি তার ঘরে ঢুকে ছিলেন, সেই বই কিন্তু আনাই হল না। ড্রইং রুমে ঢুকে তিনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন এবং শূন্য দৃষ্টিতে সুসজ্জিত সোফাগুলির  দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন-‘ তোমার কাছে আমাকে কেন ডেকে নিচ্ছ না ইলা, আমার তো পৃথিবীতে আর কোনো কাজ বাকি নেই, আমি তো এখন সংসারের ভার মাত্র…’
কিন্তু আশ্চর্যের কথা, বিজয় ভরালীর মনে কিন্তু কোনো দুঃখের অনুভূতি জাগল না। হঠাৎ যেন মনটা এক ধরনের নতুন সুখের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
‘ সঞ্জয় তাহলে তার বুড়ো অকর্মণ্য বাবার জন্য এত বেশি চিন্তা করে?’
এই কথাটা ইলার মৃত্যুর আজ এত বছর পরে প্রথমবারের জন্য বিজয় ভরালী জানতে পারলেন। কিন্তু কমলাকে এভাবে চিৎকার করে প্রায় চুপ করিয়ে দেওয়ার মতো করে কথা বলা সঞ্জয়ের উচিত হয়নি। একেবারেই উচিত হয়নি। অবশ্য আজই তিনি সঞ্জয়কে এত জোরে কথা বলতে শুনলেন। বোধহয় তার কথা বলেই সঞ্জয় ধৈর্য ধরতে পারেনি- তার কথা বলেই। বিজয় ভরালীর  মনটা অনেকক্ষণ অভিভূত হয়ে রইল।
  কিন্তু কিছুক্ষণ পরে অন্য একটি কথা এবার তার মনটা অধিকার করল। সঞ্জয়ের যে বাড়ি তৈরি করার প্রতি কোনো উৎসাহ, উদ্দীপনা নেই, সেটা তো আজ ভালো ভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ল। যেখানে মনের প্রেরণা থাকে না তাতে অল্প কাজ করে ক্লান্ত লাগে। নিজের অতীত জীবনের কথা বিজয় ভরালীর মনে পড়ে গেল। কোদাল দিয়ে মাটি কোপানোর অভ্যাস তার ছিল না, কিন্তু কী প্রেরণার বলে অফিসে কাজ করে আসার পরেও বিকেলে আবার কোদাল চালিয়ে বাগানে কাজ করে করে সারা বিকালটা পার করে দিতে পারত- কীভাবে?  আজ তো তিনি নিজের কানে শুনলেন যে সঞ্জয়ের অফিস থেকে বাড়ি ফিরে বাড়ি তৈরির কাজ দেখতেও ক্লান্ত লাগে। এই ক্লান্তির কারণ কী শরীর না মনের? দুটিই চিন্তার কারণ। যুবক বয়সে একজনের যদি এতই ক্লান্ত লাগে যে অফিস থেকে এসে বাড়ির মোটর গাড়িতে গিয়ে একবার বাড়ি তৈরির কাজ দেখে এসে বিছানায় শুয়ে পড়তে হয় তাহলে নিশ্চয় কোনো অজানা অসুখ ভেতরে ভেতরে জীবনীশক্তি ধ্বংস করে আনছে, বড় ভয়ের কথা। কিন্তু দ্বিতীয় কারণটা হলেও কম ভয়ের কথা নয়। শরীরের চেয়ে মনের অসুখ কম ভয়াবহ নয়। তার নিজের মন নামক জিনিসটার বোধহয় কবেই মৃত্যু হয়েছে- মনের প্রয়োজন, মনের ইচ্ছা, এই ধরনের কথাগুলি তিনি প্রায় ভুলেই গেছেন। কিন্তু তার জন্য তার কারণ আছে। মন-প্রাণ সমর্পণ করে দেওয়া কথাটা একদিন তার কাছে আক্ষরিকভাবেই সত্য ছিল। যাকে সমর্পণ করেছিল তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই তার মন প্রাণেরও অপমৃত্যু ঘটেছে। একদিন জগত কেবল জেনেছিল যে ইরা নামের মেয়েটির জীবনটা শেষ হয়ে গেল- কিন্তু এটা কেউ জানতে পারল না যে তার সঙ্গে তার স্বামীর জীবনটাও শেষ করে রেখে গেল। কিন্তু তার কথা সম্পূর্ণ আলাদা- তাছাড়া তিনি এখন জীবনের অপরাহ্নে উপনীত হয়েছেন। কিন্তু জীবনের এই শুরুতে যদি সঞ্জয়ের মনের এই অবস্থা হয় যে সামান্য কাজ একটা করে ক্লান্ত লাগে,বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে- তাহলে এটা তো বেশ চিন্তার বিষয়। বিজয় ভরালী  হঠাৎ কিংকর্তব‍্য বিমূঢ় হয়ে পড়েন। এখন তিনি কী করবেন? কার সঙ্গে পরামর্শ করবেন? নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ, বড় অসহায় মনে হয় তার। কমলাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন সঞ্জয়ের কি হয়েছে? সঞ্জয়ের এই অবস্থা সম্পর্কে তার কি ধারণা? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে একটা কথাও মনে পড়ে গেল যে কমলার জন্যইতো সঞ্জয়ের এরকম হতে পারে। কোনো কারণে হয়তো কমলাকে নিয়ে সঞ্জয় সুখী হতে পারেনি, হয়তো কমলা বাড়ি তৈরি করার প্রেরণা জোগাতে পারেনি। বিজয় ভরালীর মনটা ছটফট করে উঠে। সেই অসহায় এবং নিঃসঙ্গ ভাবটা যেন আরও বেড়ে যায়। কিন্তু কেন এরকম হল? এরকম তো হওয়ার তো কথা ছিল না- কমলাকে তিনি অনেক দেখে শুনে পছন্দ করে ঘরের লক্ষী করে এনেছিলেন। এরকম স্ত্রীকে পেয়ে সঞ্জয় খুব খুশি হয়েছে বলেই ধারণা ছিল তার। তিনি একাই নন অন্যান্যরা ও সেভাবেই ভাবে। অনেকেই এখনও মুখ ফুটে প্রশংসা করে যে বিজয় ভরালীর পছন্দ একেবারে ঠিক- কোথা থেকে এই ধরনের একজন রূপে-গুণে লক্ষ্মী-সরস্বতী মেয়ে খুঁজে নিয়ে এসেছে। কিন্তু পুনরায় মনটা তার ধড়ফড় করে উঠে। ভেতরে যদি সমস্যা থাকে বাইরের হাজার প্রশংসা তো সেই সমস্যা দূর করা যায় না। বিজয় ভরালী  নিজের চিন্তায় এতই মগ্ন ছিলেন যে তিনি কখন যে সোফার এক কোণে বসে পড়েছেন, কখন যে বই হাতে তুলে নিয়েছেন সে খেয়াল ছিলনা। খেয়াল হল কারও একজনের কণ্ঠস্বরে। প্রথমে কিন্তু মানুষটা কি বলছেন তা তিনি হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। এতটাই অন্যমনস্ক ছিলেন। দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস করায় শুনতে পেলেন, সঞ্জয় ঘরে আছে কিনা মানুষটা জিজ্ঞেস করছে। এবার তিনি বসা থেকে লাফ মেরে উঠলেন এবং বললেন-‘ আছে, আছে। আপনি ভিতরে এসে বসুন। আমি ডেকে  দিচ্ছি-’ ভেতরে যেতে গিয়েও কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ায় বিজয় ভরালী কিছুক্ষণের জন্য থমকে নিচের দিকে ঝুঁকে সোফার কোনগুলি টেনেটুনে ঠিক করে রেখে ভেতরে ঢুকে গেলেন। আমি তাহলে আবার নিজের অজান্তে সোফায় বসে পড়েছিলাম বিজয় ভরালী মনে মনে ভাবলেন। অথচ না বসেই বা তিনি কি করেন? আজকে যদি হঠাৎ তিনি আবার নিজের ঘরে বসে পড়তে শুরু করেন, বিশেষ করে উজ্জ্বল আলোর নতুন বাল্ব লাগিয়ে দেবার পরে কমলারা সন্দেহ করবে না যে তিনি ওদের দুজনের কথাবার্তা শুনেছেন। সেই লজ্জা তিনি কোথায় রাখবেন? অন্যদিকে কমলার অসন্তুষ্টির কথা জেনে  সোফায় বসতেও ইচ্ছে করে না। বিজয় ভরালীর মনটা অশান্তিতে ভরে যায়। অতি সামান্য কথা নিয়ে জগতে মানুষের এই ধরণের বিপদও হতে পারে?
ভাবতে ভাবতে সেই প্রসঙ্গে পুনরায় সঞ্জয় কমলাকে বলা কথাগুলি তার মনে পড়ে যায়-‘ মনে রাখবে কমলা বাবার একটু সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কাছে আমার সমস্ত কিছুই তুচ্ছ।’ কথাগুলি কানে বাজতে থাকে। সঞ্জয় তার জন্য এত ভাবে? তার সুখ-দুঃখের প্রতি সঞ্জয়ের এত নজর? মনটা সুখী হতে গিয়েও কিন্তু পুনরায় অশান্তিতে ভরে ওঠে। স্বার্থপরের মতো তিনি কেবল নিজের সুখের কথা ভাবছেন। কিন্তু ছেলের দেওয়া সুখের বিনিময়ে তিনি ছেলেকে কি দিয়েছেন? ছেলের জন্য তিনি এমন একটি সংসার পেতে  দিলেন- যার বিনিময় ফল হল এই যে আজ তার ছেলে অকালে বুড়ো হয়ে পড়ছে, অল্প কাজ করে ক্লান্তিতে বিছানা নিতে হচ্ছে। মনের মধ্যে আবার একটা ছটফটানি জেগে উঠে। নিজের ছেলের, অত্যন্ত আদরের একমাত্র ছেলে, ইলার অস্তিত্বের একমাত্র চিহ্ন- তাই ভাগ্যকে মেনে নেওয়া বিজয় ভরালী আজ আর নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারেননা যে তিনি তো ভালো হবে ভেবেই অনেক কিছু চিন্তা করে সঞ্জয়ের সংসার পেতে দিয়েছিলেন, তার থেকে অমৃতের সৃষ্টি হবে বলে বিশ্বাস করে তিনি তার কর্তব্য সম্পাদন করেছিলেন। কিন্তু এখন যদি অমৃত না ফলে বিষের জন্ম হয় তার জন্য তো তিনি দায়ী নন। তার ছেলের ভাগ্য দায়ী।
রাতে ভাত খাওয়ার পরে বিজয় ভরালীর বাড়িটা একটা নির্জন শ্মশানের মতো মনে হতে লাগল। একা একা বসে তিনি কিছুক্ষণ ভাত খেলেন তারপরে আর খেতে পারলেন না। উঠে গেলেন, ভাবিত এসে জিজ্ঞেস করল-‘ ভাত খেলে না কেন তুমি? রান্না খারাপ হয়েছে? তিনি ভাবিতকে আশ্বাস  দিয়ে বললেন যে কোনো কিছু খারাপ হয়নি, অন্য দিনের মতোই বেশ ভালো হয়েছে রান্না, তার শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না। আর একটি কথা, পরের মুহূর্তে সাবধান হয়ে বিজয় ভরালী ভাবিতকে বললেন তার শরীর ভালো নেই এ কথা যেন ভুলেও সঞ্জয়কে না বলা হয়। মিছামিছি এই রাতের বেলা চিন্তা করবে।তার আসলে শরীরটা ভালোই আছে, তার মানে হল বিকেলে কিছু একটা খেয়ে যেন তার পেটটা একটু খারাপ হয়েছে। ভাবিতকে সত্য মিথ্যা কিছু বলে বুঝিয়ে দিয়ে বিজয় ভরালী কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। আজ তার কী হয়েছে?
এরপরে সঞ্জয় আর কমলা ভাত খেতে আসবে। এটাই নিয়ম।প্রত্যেকদিনই বিজয় ভরালীকে প্রথম খেতে দেওয়া হয়,তারপরে সঞ্জয়েরা খেতে আসে। অবশ্য এটা রাতের ব্যবস্থা। দিনে সবার আগে কমলা ভাত খায়,কারণ তার স্কুল আছে।তারপর শ্বশুরকে ভাবিত খেতে দেয়। বিজয় ভরালীর ইচ্ছা করে তিনি ছেলের জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু সঞ্জয় হয়তো তাতে খুব আপত্তি করবে ভেবে তিনি মুখ ফুটে কিছু বলেন না। সবার শেষে খায় সঞ্জয়। দুপুরে খাবার জন্য তাদের কিছুক্ষণের বিরতি থাকে। বিজয়ের ভাবতে খারাপ লাগে যে সঞ্জয় ভাত খেতে খেতে হয়তো ভাত ঠান্ডা কড়কড়ে হয়ে যায়।তিনি ভাবিতকে গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করেন-‘পোনার ভাত তরকারিটা গরম করে রাখার ব্যবস্থা করেছ তো? অবশ্য এই কথাটিও ভাবেন যে কমলা নিশ্চয় ভাবিতকে শিখিয়ে রেখে গেছে যে সঞ্জয় অফিস থেকে এলে ভাত তরকারি যেন গরম করে দেওয়া হয়।









কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নস্টালজিয়া ৩২ || পৃথা চট্টোপাধ্যায় || ন্যানো টেক্সট

  নস্টালজিয়া ৩২ পৃথা চট্টোপাধ্যায় নস্টালজিয়া ৩২ পৃথা চট্টোপাধ্যায়  আমার শৈশবের বেশ কিছুটা সময় কেটেছিল সাগরদিঘিতে। বাবা তখন ওখানে  বিডিও অফিস...