বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস || Bideha Nandini- 20

বিদেহ নন্দিনী

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 



 (বিশ)

চিত্রকূট ছেড়ে আসার পর থেকে দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়ছে না। মাঝেমধ্যে দুই চারটে দিন আনন্দে পার হয়েছিল যদিও বেশির ভাগ সময় আমি চিন্তামগ্ন ছিলাম। অনবরত আমি নিঃসঙ্গ অনুভব করছিলাম। যদিও দুজন করে বীরশ্রেষ্ঠ পুরুষ সব সময় আমার সঙ্গে ছিল তবু আমার মানসিক উদ্বেগের অংশীদার হওয়ার কেউ সঙ্গী ছিলনা। মানসিক চিন্তা চোখে দেখা যায় না। তাই বীরশ্রেষ্ঠ স্বামী এবং দেবর আমার মনের ভেতরটা পড়তে পারছিল না। দণ্ডকারণ্য নামের বিশাল অরণ‍্যটিতে পা রাখার থেকেই আমার চিন্তা, উদ্বেগ,শঙ্কা সমস্ত কিছ বেড়েই চলছিল। অবশ্য অরণ‍্যটিতে থাকা ঋষিদের আশ্রম গুলি আমার মানসিক পীড়া কিছুটা কমিয়ে ছিল। 

আশ্রম গুলি ছিল অতি মনোহর। নানা প্রজাতির পাখ- পাখালি হরিণ, আশ্রমগুলির সৌন্দর্য  আরও বৃদ্ধি করেছিল। সব সময় হোম যজ্ঞ ছাড়াও সঙ্গীতের মতো সুন্দর বেদমন্ত্রের উচ্চারণে আশ্রম মুখরিত হয়েছিল। এই সমস্ত আশ্রমে মহর্ষিতে উত্তরণ ঘটা ঋষিরা বসবাস করতেন।

এই গভীর অরন্যের এক জায়গায় রাক্ষসদেরও অবস্থান ছিল। রাক্ষসরা মহর্ষিদের আশ্রমে  উৎপাত করাতো দূরের কথা, এমনকি তাকানোরও সাহস করে নি। আশ্রমের উজ্জ্বলতা ওদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। এবং মহর্ষিদের চাহনিতে রাক্ষসেরা ভস্মীভূত হয়েছিল। তাই এই আশ্রমগুলিতে রাক্ষসের কোনো উপদ্ৰব   ছিল না।

আমাদের দেখে ঋষিরা আনন্দিত হল এবং সুমধুর বচনে আশীর্বাদ দিল। সেই রাতে আমরা ঋষিদের আতিথ্য গ্রহণ করে আশ্রমে কাটালাম। পরের দিন তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা গভীর অরণ্যে প্রবেশ করলাম। কিছু দূর পর্যন্ত হরিণ পাখ-পাখালি দেখেছিলাম। কিন্তু তারপর থেকে পশুপাখি দেখাতো বাদই,কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম না।অনেকটা  রাস্তা অতিক্রম করার পরে আমরা হিংস্র জন্তু জানোয়ারে ভরা অঞ্চলে প্রবেশ করলাম। আমরা অত্যন্ত সতর্কভাবে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম  প্রকাণ্ড শরীরের একটি রাক্ষস। তার বিশাল মুখের গড়ন বলতে কিছু নেই। চোখ দুটো বড় বড় এবং কোটরে ঢুকানো। পেট ভয়ঙ্কর। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। পরনে  বাঘের কাঁচা ছাল। শরীরে ভীষণ  দুর্গন্ধ । ডান হাতে ছিল একটি লোহার শূল।শূলটিতে  বাঘ, হাতি, সিংহ ইত্যাদি জন্তুর মাথা সেলাই করে রাখা ছিল। রাক্ষসটা এক লাফে আমাদের কাছে চলে এল। সে আমাকে খপ করে ধরে উপরে তুলে নিল।  আমি ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগলাম। রাক্ষসটা তর্জন গর্জন করে বলতে লাগল-‘ তোরা দুটি কে? তোর মাথায় জটা বেঁধেছিস,পরনে  গাছের বল্কল,অন্যদিকে হাতে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সঙ্গে মহিলা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। তোদের মতো মহাপাপীরাই ঋষিদের কলঙ্ক স্বরূপ।’ তারপরে রাক্ষসটা  নিজের পরিচয় দিল- ‘আমার নাম বিরাধ। ঋষি মুনিদের মাংসে পেট পরিপূর্ণ করে  আমি এই অরণ্যে বিচরণ করি। আজ তোদের দুজনের রক্ত পান করব। তোরা সঙ্গে নিয়ে বেড়ানো এই মহিলা আমার স্ত্রী হবে।’ 

রাক্ষসের কথা শুনে আমি ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। এতক্ষণ ধরে আমাকে রাক্ষসের কবল থেকে উদ্ধার না করায় দুজনের ওপরেই আমার রাগ হল। মনে মনে ভাবলাম এরা রাক্ষসকে আক্রমণ করতে ভয় করছে নাকি? না হলে আমাকে এতক্ষণ ধরে রাক্ষসের হাত থেকে মুক্ত করছে না কেন? আমি দুই চোখে চোখের জল বইয়ে স্বামীর দিকে তাকালাম। স্বামী হতাশ মনে লক্ষণকে বলতে শুনলাম-‘ দেখেছ লক্ষ্ণণ, জনক রাজার কন্যা আমার সতী সাধ্বী পত্নীর কী ধরনের অবস্থা হয়েছে। জানকীকে কেউ কু-অভিপ্রায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করবে বা স্পর্শ করবে এ কথা আমার সহ্যের বাইরে। মাসিমা কৈকেয়ী  নিজের পুত্রের জন্য রাজ সিংহাসন স্থায়ী করার জন্য এই অভিসন্ধি করেছিল। আজ তার জন্যই জানকীকে একটি পিশাচ লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভার্যা করব বলে বলা কথাটা ও আমাকে সহ্য করতে হচ্ছে।’

স্বামীর বিলাপ শুনে আমার রাগ হল। সেই সময়ে তার কর্তব্য ভুলে  এই ধরনের সাধারণ মানুষের মতো কথা শুনে আমার ধৈর্য হারিয়ে গিয়েছিল। আমি আর্তনাদ করে বলতে লাগলাম-‘ হে নাথ, আমাকে রাক্ষসের কবল থেকে উদ্ধার করায় এত দেরি হচ্ছে কেন? লক্ষ্ণণ ছলছল চোখে দাদাকে বলল –‘দাদা তুমি তো নিজেই ইন্দ্রের মতো শক্তিশালী। এই ক্ষুদ্র রাক্ষস কোন ছার। আমি একাই এই ক্ষুদ্র রাক্ষসকে নিপাত করছি। তুমি তাকিয়ে দেখ। ভ্রাতৃ ভরতের ওপরে যে ক্রোধ হয়েছিল তা আজ রাক্ষসের ওপরে পূর্ণ  করব।’ আমি দাদা ভাই দুইজনের মানসিকতা দেখে অবাক হয়েছিলাম। এইতো মাত্র সেদিন সমস্ত ক্রোধ ভুলে গিয়ে দুই দাদাভাই ভরতকে জড়িয়ে ধরে যত গুলি মধু বর্ষণকারী কথা বলেছিল, সেগুলি কি তবে শুধু মুখের কথা ছিল?ভেতরে এখনও কপটতা রেখে দিয়েছে নাকি?  কথাগুলি ভেবে আমি মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম যে আমি তখনও রাক্ষসের হাতের মুঠিতে রয়েছি। 

রাক্ষসটা পুনরায় তর্জন-গর্জন করতে লাগল-‘ তোদের পরিচয় দিচ্ছিস না কেন? তোরা কোথায় যাবার জন্য এসেছিস বলছিস না কেন?’

স্বামী নম্রভাবে বললেন –‘শোনো রাক্ষস বিরাধ। আমরা ক্ষত্রিয় এবং দুজনেই দাদা ভাই। এক বিশেষ কারণে বনবাসে কাটাতে হচ্ছে। তবে এই অরণ্যে কেন তুমি অত্যাচার করে বেড়াচ্ছ? রাক্ষসটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল-‘ এই সুন্দরী যুবতিকে ফেলে রেখে তোরা দুজনে পালিয়ে যা, না হলে তোদের প্রাণনাশ হবে। আমার সঙ্গে যুদ্ধ করার আশা ত্যাগ কর। কারন আমি তপস্যায় ব্রহ্মাকে তুষ্ট করে বর আদায় করেছি। কোনো অস্ত্রের দ্বারা আমার মৃত্যু হবে না।’

রাক্ষসের কথা শুনে আমি ভয়ে বিহ্বল পড়লাম। যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে বলে ভেবে আমি কাঁদতে লাগলাম। মনে মনে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর কে প্রার্থনা জানালাম-‘হে দেব মহাদেব, তোমরা লোক পালক হতে পার না। তোমরা  মর্ত্যে কোনো একজন তপস্যা করলে ভয় পাও। হয়তো সে তোমাদের চেয়ে উচ্চশক্তিসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে। তাই দ্রুত বর দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়। কত অনুপযুক্ত লক্ষ লোককে বর দিয়ে মর্ত্যে সন্ত্রাসের সৃষ্টি করেছ তার খবর জান কি?’ রাক্ষসটির কথা শুনে স্বামীর রাগ হল এবং তাকে ধারালো অস্ত্রের দ্বারা আক্রমণ করতে লাগল। কিন্তু সে ভ্রুক্ষেপই করল না। রাক্ষসটি ভয়ঙ্কর শূল স্বামীর দিকে নিক্ষেপ করল। তবে শূলটা  স্বামী খন্ড-বিখন্ড করে ফেললেন। ক্রোধে  রাক্ষসী আমাকে মাটিতে আছাড় মেরে ফেলে রেখে স্বামী এবং লক্ষ্ণণকে কাঁধে তুলে অরণ্যের দিকে দৌড়ে  গেল। আমি ভয় পেয়ে কাঁদতে লাগলাম। কাঁদতে কাঁদতে পেছন পেছন দৌড়ে গিয়ে রাক্ষসটাকে মিনতি করলাম-‘হে রাক্ষস শ্রেষ্ঠ। তুমি দাদাভাই দুজনকে ছেড়ে দাও। লাগলে আমাকে নিয়ে যাও। বাঘ ভালুকের  হাতে মরলেও মরা, তোমার হাতে মরলেও মরা।’

আমার হৃদয় ভাঙ্গা কান্না শুনে স্বামী হাত তুলে আমাকে অভয় দিলেন। তারা দু'জনেই হয়তো সেই সময় বুঝতে পারলেন যে রাক্ষসের কথা সত্যি। কোনো অস্ত্রই তার দেহে কাজ করে না। সঙ্গে সঙ্গে দুজন শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে রাক্ষসটাকে প্রহার করতে লাগল। রাক্ষসের হাত দুটি দুজন দুদিক থেকে ধরে পাকিয়ে পাকিয়ে ছিঁড়ে নিল। যন্ত্রণায় রাক্ষসটা চিৎকার করতে লাগল। মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। অস্ত্রের দ্বারা  যেহেতু রাক্ষসীর মৃত্যু ঘটানো যাবে না তাই তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল। লক্ষ্ণণকে গর্ত খুঁড়তে বলে স্বামী রাক্ষসের গলাটা টিপে ধরলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটা  আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। রাক্ষস  বিরাধ একজন গুণী জ্ঞানী পুরুষের মত বলতে লাগলেন-‘ হে নরশ্রেষ্ঠ, আমি তোমাকে চিনতে  পারিনি বলে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলাম। তোমার চরণ আমার দেহ স্পর্শ করায় আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হল। এখন বুঝতে পারলাম, তুমি সেই কৌশল্যা নন্দন রাম। তোমার পত্নী সীতা এবং এইজন সুমিত্রা পুত্র লক্ষ্ণণ,তোমার ভ্রাতা।’ একথা বলে পড়ে থাকা অবস্থায় আমাদের সম্ভাষণ জানাল। তারপর পুনরায় বলল –‘হে রাঘব,প্রকৃতপক্ষে আমি একজন গন্ধর্ব। ধনপতি কুবেরের অভিশাপে রাক্ষস হয়ে  দিন কাটাচ্ছিলাম। আমার দোষ ছিল, আমি স্বর্গের অপ্সরী রম্ভার সঙ্গে মাতাল হয়ে থাকার সময় একদিন কুবেরের সেবা-শুশ্রূষা সময় মতো করতে পারিনি। তাই তিনি আমাকে রাক্ষস হয়ে জীবন কাটানোর অভিশাপ দিয়েছিল।আকুতি মিনতি করায় কুবের বলেছিল যে রঘুবংশের রামচন্দ্র আমাকে বধ করলে আমি শাপ মুক্ত হব এবং স্বর্গে ফিরে যেতে পারব। হে রঘুনন্দন তুমি আজ আমাকে শাপমুক্ত করলে।’ তারপর বিরাধ  আমাদের শরভঙ্গ মুনির আশ্রমে যাবার উপদেশ দিয়ে চোখ বুজলেন।

সমগ্র ঘটনাটি আমার চোখের সামনে ঘটল। আমার সামনে স্বামীর চরণ স্পর্শে নরখাদক রাক্ষস শাপমুক্ত হয়ে তুম্বরু নামে একজন গন্ধর্বে পরিনত হল। আমি মনে মনে ভাবছিলাম আমার স্বামী এতটাই ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী? আমার বিয়ের সময় তো শুনতে পেয়েছিলাম তিনি নাকি গৌতম ঋষি পত্নীকে ও শাপমুক্ত করেছিলেন। কথাগুলি আমার কাছে বড় জটিল হয়ে পড়েছিল। মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল যদি স্বামী রাম শাপমুক্ত করতে পারা ঐশ্বরিক গুণ সম্পন্ন ব্যক্তি অথবা অবতারী পুরুষ বা ভগবানের অংশ, মাঝেমধ্যে তার সেই গুণগুলি লোপ পেয়ে যায় নাকি? না হলে কখনও কখনও তিনি সাধারণ মানুষের চেয়েও অধমের মতো কথাগুলি বলেন কেন?’ আমার মনের ভাব মনের মধ্যে লুকিয়ে স্বামীর চরণ স্পর্শ করে ধন্য হয়ে ছিলাম।

আমরা তিনজন দুর্গম পথের মধ্য দিয়ে শরভঙ্গ ঋষির  আশ্রমের অভিমুখে রওনা হলাম। আমরা যখন ঋষির আশ্রমে পৌঁছলাম তখন তিনি পূজাস্থলীতে হোম সম্পন্ন করেছিলেন। ঋষির সেই বয়সেও তেজস্বী চেহারা, তিনি তপস্যার বলেই পরম ব্রহ্মের সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন । আমরা ঋষিকে প্রণাম জানালাম। ঋষি আমাদের বসতে দিয়ে বললেন-‘রাম  আমি ইতিমধ্যে তপস্যার বলে ব্রহ্মলোকে বাস করার অধিকার লাভ করেছি। তুমি আসার কিছুক্ষণ আগে স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্র নিজে এসেছিল আমাকে ব্রহ্মলোকে নিয়ে যাবার জন্য। তবে আমি ইতিমধ্যে তুমি আসার খবর পেয়েছিলাম। তাই ভাবলাম তোমার সঙ্গে দেখা না করে ব্রহ্মলোকে যাব না।’ 

ঋষির কথা শুনে স্বামী বললেন-‘হে মুনিশ্রেষ্ঠ, আপনার কাছ থেকে জানতে চাইছি এই অরণ্যের কোথায় আমরা শান্তিতে বাস করতে পারব।’ 

ঋষিএকটু দ্রুততার সঙ্গে বললেন-‘ এই যে ঝরনাটা দেখছ, তার তীর ধরে এগিয়ে যেতে থাকলে ঋষির আশ্রম পাবে। তিনি একজন মহা তপস্বী। তিনি তোমাকে কোন জায়গায় বাস করলে নিরাপদ হবে সে কথা ভালোভাবে বলতে পারবেন। কথাটা বলে মুনি শরভঙ্গ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। তারপর পুনরায় বললেন-‘ রাঘব, তুমি আমার জন্য কিছু সময় ব্যয় কর। আমি তোমার সামনে দেহান্তর ঘটাতে চাইছি। যেভাবে সর্প পুরনো ছলম ছাড়ে , ঠিক তেমনই আমিও আমার এই জরাজীর্ণ শরীর ত্যাগ করব।’ 

ঋষির কথা শুনে আমি ভয় পেলাম। মনে মনে ভাবলাম-‘ ইনি বা কীভাবে শরীর পরিবর্তন করবেন ? সেই দৃশ্য আমি প্রত্যক্ষ করতে পারব কি? রাক্ষস পরিবর্তিত হয়ে জ্ঞানীগুণী পুরুষে রূপান্তরিত হওয়ার দৃশ্য মন থেকে সরে না যেতেই পুনরায় কী বা দেখতে হয়। তথাপি অন্তরের ভয়, উদ্বেগ প্রকাশ না করে আমি ধীর-স্থিরভাবে থাকতে চেষ্টা করলাম। কারণ রামচন্দ্রের পত্নী এই সমস্ত কথাবার্তায় ভয় পাওয়াটা অশোভনীয় হবে।’

কিছুক্ষণ পরে ঋষি শরভঙ্গ অগ্নি প্রজ্জ্বলন করে নিয়ম অনুসরণ করে মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। ঘী এবং অন্য পবিত্র দ্রব্যসমূহ আগুনে অর্পণ করে তিনি নিজে সেই আগুনে প্রবেশ করলেন। ঘটনা দেখে আমি শিউরে উঠলাম। অগ্নিশিখা তাকে এক দিক থেকে পুরো ভস্ম করে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে সেই  অগ্নিশিখার ওপরে সুন্দর সুঠাম শরভঙ্গের আবির্ভাব হল। আমার বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ভয়, ভক্তিতে নিজে থেকেই মাথা নত হয়ে আসছিল। আমি সেই অগ্নির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ছিলাম।ঋষি শরভঙ্গ সেই রূপে ব্রহ্মলোকে উপস্থিত হলেন।

শরভঙ্গ ঋষির প্রয়াণের পরে স্বামীকে অনেক মুনি ঋষি ঘিরে ধরল। তারা স্বামীকে প্রণাম জানিয়ে বড় কাতর স্বরে প্রার্থনা নিবেদন করলেন। তাদের প্রার্থনা ছিল এই ধরনের-‘হে বিখ্যাত  ইক্ষাকু বংশের শ্রেষ্ঠ বংশধর,এই তিনলোকে  আপনার যশস্যা শুনতে পাওয়া যায়। আমরা প্রত্যেকেই একটি প্রার্থনা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। যদিও এই প্রার্থণাটি আমাদের স্বার্থের খাতিরে, তবুও আপনার সামনে নিবেদন না করে আমার গত্যন্তর নেই। এই ক্ষেত্রে আপনার বাইরে আমাদের রক্ষা কর্তা আর কেউ নেই।  তাই হে রাঘব, আমাদের প্রার্থনা নিবেদন করতে চাইছি।’ 

স্বামী মুনিদের কথা শোনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করায় তারা বললেন-‘ হে দশরথ নন্দন, আমরা বেশির ভাগই বামপন্থী মুনি। এই অরণ্যে ঝরনার জল এবং গাছের ফলমূল খেয়ে জীবনধারণ করছি। ঈশ্বর চিন্তার বাইরে আমাদের মনে অন্য কোনো কিছু  স্থান পায় না। কিন্তু আমাদের তপস্বী জীবন বড় দুঃখের হয়ে উঠেছে। আমাদের তপস্বীরা বহুসংখ্যক রাক্ষসের হাতে নিহত হয়েছে। মুনি ঋষিদের হাড়ের স্তূপ গড়ে উঠেছে। তাই হে রাঘব আপনি আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে হবে।’ 

ঋষিদের দুঃখের কথা শুনে স্বামী বললেন-‘ হে মুনিঋষিগণ, আপনারা আমাকে অনুরোধ করতে হবে না। মাত্র আদেশ দেন। আমি আপনাদের কথা দিলাম এই দৌরাত্ম্যকারী রাক্ষসদের আমার ভাই লক্ষ্ণণের সঙ্গে মিলে নিপাত করব। পিতার  প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার জন্য এসে যদি আপনাদের উপকার করতে পারি তাহলে আমার জীবন ধন্য হবে।

স্বামী এভাবে মুনিদের কথা দেওয়ায় আমি বড় উদ্বিগ্ন হলাম। মনে নানা ধরনের চিন্তা এল। তবে তাদের সামনে আমার মনের ভাব প্রকাশ না করে নীরবে রইলাম। ঋষিদের অভয় প্রধান করার পরে আমাদের পুনরায় গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে যাত্রা আরম্ভ হল । 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শব্দব্রাউজ ৩০২ ৷। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-302, Nilanjan Kumar

  শব্দব্রাউজ ৩০২ ৷। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-302, Nilanjan Kumar শব্দব্রাউজ ৩০২ || নীলাঞ্জন কুমার বিপাশা আবাসন । তেঘরিয়া মেন রোড । কল...