রবিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২১

পাখিদের পাড়া পড়শী || পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস , Pankaj Gobinda Medhi

পাখিদের পাড়া পড়শী 

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস 



প্রথম অধ্যায় 

(১)

তুফানে উপড়ে পড়া একটি মৃত গাছের গোড়ায় আমি বসে আছি। কান্ডের আধা অংশের চেয়ে কম পরিমাণে মাটিতে এবং বাকি অংশ জলাশয়ে ডুবে আছে।

প্রায় কুড়ি বছর বয়সের শিশু গাছটা তুফানে উপড়ে পড়েছে। শিশু গাছের শিকড় মাটির খুব গভীরে প্রবেশ করে না। জলাশয়ের তীরে থাকার জন্য এবং ডাল পাতায় গাছের শীর্ষ ভাগ ভারী হয়ে পড়ার জন্য গাছটা তুফানে উপড়ে পড়ল।

বয়সের হিসেবে গাছটা বেশ বড়সড়, আমার দুহাতে জড়িয়ে ধরলে গাছের গোড়াটা নাগাল পায় না, অনেকটাই উঁচু। শিশুগাছটাকে  ইংরেজিতে শিশুই  বলা হয় হয়তো, আমি জানি না ।কেবল জানি এর বৈজ্ঞানিক নাম 'ডালবারগিয়া শিশু'।

গাছটার অর্ধেকেরও বেশি অংশ জলে ডুবে থাকা একটি নদীর অংশবিশেষ।

নদী সময়-অসময়ে নিজের গতিপথ পরিবর্তিত  করে।

নদীর গতিপথের পরিবর্তন হওয়ার ফলে পুরোনো গতিপথের আবদ্ধ জলটুকু একটা জলাশয়ে পরিবর্তিত হয়। এই বদ্ধ জলাশয়কে খাল,বিল ,ডোং  ইত্যাদি কোনো নামেই অভিহিত করা যায় না । জলাশয় অথবা বেশ পুরোনো হয়ে মরা বন,গাছের পাতা পচে গর্তে জমা হলে কখনও বা ডোবাও বলা যেতে পারে।

আমি বসে থাকা গাছের এই গোড়া থেকে এখন নদীটা প্রায় আধা কিলোমিটার বা তার চেয়েও কিছুটা দূর দিয়ে বয়ে চলেছে। সেই হিসেবে এই বদ্ধ জলাশয় আধা কিলোমিটারের চেয়ে কিছুটা কম দৈর্ঘ্যের। জলাশয়টা বুমেরাং আকৃতির। পেটের অংশটার প্রস্থ বাকি অংশ থেকে বেশি।জলাশয়টার জন্ম হওয়ার কয়েক বছর হয়েছে, দেখলেই বুঝা যায়। জলাশয়ের  তীর থেকে জলভাগের মধ্যভাগ পর্যন্ত কিছুদূর ডোবাটায়   একটা স্তর পড়েছে। জঙ্গল মরেছে, তার ওপরে পুনরায় গজিয়ে উঠেছে। বছর বছর ধরে এই  প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার ফলে ডোবাটা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ডোবা না থাকা মুক্ত জলাশয়ের জলের অংশ দূর থেকে কালো বর্ণের দেখায়। মুক্ত আকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাশবনের মেঘগুলি সেই কালো জলের ওপর দিয়ে যাওয়া-আসা করে।

জলভাগের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের গাছপালার একটি অরণ‍্য। সেই গাছগুলির বেশিরভাগ প্রাকৃতিক ভাবে গজিয়ে ওঠা এবং কিছু অংশ সামাজিক বনানীকরনের অংশ হিসেবে রোপণ করা। সামাজিক বনানীকরনের অংশ হিসেবে রোপণ করা গাছ গুলির মধ্যে শিশু, সেগুন, তিতা চঁপা, বনসোম এবং দু-একটি ইউক্যালিপটাস গাছ দেখতে পাওয়া যায় ।শিমুল, জরী, কদম, অশ্বত্থ,নাহর, এজার গাছগুলি অসমের যে কোনো অরণ্যে দেখতে পাওয়া যায় । নদীর তীরের দিকে কয়েকটি খেজুর গাছের সারি। খেজুর গাছ গুলির বয়স প্রায় এক । দেখলে মনে হয় গাছগুলি যেন কেউ পরিকল্পনা করে সেভাবে রোপণ করেছে। খেজুর গাছে বাবুই পাখির শুকনো বাসাগুলি থোপে থোপে ঝুলে আছে। রোদ বৃষ্টি তুফান পাখিদের পড়শীর এই পরিত্যক্ত অট্টালিকাগুলি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে পারেনি।

নদীটির নাম পাগলাদিয়া। সময়ে অসময়ে গতিপথ পরিবর্তন করা নদীটির প্রকৃতি পাগলের মতো। বর্ষায় এটি রুদ্র মূর্তি ধারণ করে। দুপারে তাণ্ডব চালায়। সেই জন্যই অতীতে  নাকি কে নাম রেখেছে পাগলাদিয়া।

– উহু! তা নয় ।

একদিন একজন অপরিচিত লোক আমাকে পাগলাদিয়া নামের উৎপত্তির  কথা সেভাবে বলায় আমি বললাম–' নদীটা পাগল বলে এর নাম পাগলাদিয়া নয়। ভূটান পাহাড় থেকে পাগলা এবং দিয়া নামের দুটি ঝরণা এসে সমতলে মিলিত হয়েছে, সঙ্গে ওদের নাম দুটিও জোড়া লাগিয়ে নদীটির নাম রাখা হয়েছে পাগলাদিয়া। পাগলা এবং দিয়া জনজাতীয় ভাষার শব্দ ।

মানুষটা আমার কথা কতটা মেনে নিয়েছিল, আমি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করিনি। কেননা আমি দেখেছিলাম, যা জেনেছিলাম সেকথা মানুষটিকে বুঝিয়ে বলার প্রয়াস করেছিলাম। সুয়নখাটা থেকে কিছু দূরে এগিয়ে এটা হল উত্তরকুছি। উত্তরকুছি থেকে এটা ভেতরের ঘন ইকরা  এবং গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে গিয়ে চকী  নামের একটি জায়গা পাওয়া যায়। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শীতকালে এখানে বনভোজ খেতে আসা মানুষের ভিড় হয়। ভুটান পাহাড় থেকে চকী পর্যন্ত সমান্তরালভাবে দুটি তটিনী   কুলকুল স্বরে বয়ে চলেছে। দেখলে মনে হয় দুই  তটিনী যেন দুই  সতিনী।পাহাড়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়ার শেষ নেই আর সমতলে নেমে এসে স্বামীর বুকে দুজনে নতশিরে লীন হয়ে যায় । দুই তটিনীর নাম পাগলা এবং দিয়া।হিমালয় পর্বতমালার  কোনো নির্দিষ্ট পাহাড়ের ওপর থেকে ক্রমশ নিচের দিকে বয়ে আসা একটি আলোক চিত্র আমি সাধ্য অনুসারে নিয়েছিলাম। শিলাময় পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বয়ে আসার সময় তটিনী দুটির  কষ্ট হচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল। দুটি তটিনীর মধ্যে কোনো কোনো জায়গায় দূরত্ব কেবল কয়েক ফুট মাত্র । পাগলা এবং দিয়ার বক্ষ অগভীর। দুই এক জায়গায় জলের ঘূর্ণিপাকের ফলে সৃষ্টি হওয়া দহ , গভীর গর্ত এবং স্থানীয় ভাষায় বলা কুঁর দেখতে পাওয়া যায়। নদীটি সমতল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যথেষ্ট চঞ্চল গতিতে বয়ে এসে ব্রহ্মপুত্র নদীতে বিলীন হয়ে পড়েছে। বর্ষায় মদমত্ত হয়ে ক্রোধে এই নদী দুই তীর খসিয়েছে, গতির পরিবর্তন করেছে। দু পাশের মানুষের চোখের জল বহন করে আত্মগর্বে ফুলে ওঠে এই নদী পরবর্তী সময়ে মানুষের ব্যথা অনুধাবন করার জন্য যত্নবান হয়েছে। পলি মাটির সৃষ্টি করে সারবান করে তুলেছে  জীবনের কর্ষিত ভূমি। উর্বর করে তুলেছে দুপারের মানুষের দৈনন্দিন যৌবনযাত্রা।

গত কিছুদিন ধরে সন্ধ্যেবেলা আমি এই মৃত গাছের ওপরে বসে ভোরবেলা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। কখনও একদৃষ্টিতে জলের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। মৃত গাছটা যে অংশে জল স্পর্শ করছে, সেই অংশে সাদা রঙের কিছু ব্যাঙের ছাতা গজিয়ে উঠেছে। ব্যাঙের ছাতার সেই একটুখানি অরণ্যও আমাকে যথেষ্ট আকৃষ্ট করছে। ব্যাঙের ছাতার ছোট অরণ্যটিতে প্রকৃতির খেয়াল খুশিকে নিয়ে জীবন নির্বাহ করা কয়েকটি ব্যাঙের ছাতার মধ্যে বসে আমিও একটি ব্যাঙের ছাতায় পরিবর্তিত হয়েছি। পঁচা কাঠের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে ভাবতে শুরু করেছি। অন্তত ব্যাঙের ছাতা হয়ে হলেও কোনোভাবে পৃথিবীতে জন্ম লাভ করার  আহ্লাদটা অনুভব করতে পেরে আমি ধন্য।

ব্যাঙের ছাতাগুলির দিকে  তাকাতে তাকাতে আমি একজন পরীকে দেখতে পেলাম। পরীটি জনসাধারণের কাছে' ডে'সট্ৰইয়ং এ'নজেল ' নামে পরিচিত। মানুষকে মৃতকে সাজানো এই পরীটি হল ব্যাঙের ছাতার একটি গণ। নামটিও একটি সুন্দরী রমণীর মতো–অমানিটা। পৃথিবীতে অমানিটার অজস্র প্রজাতি রয়েছে।এমাট'নি সম্বলিত অমানিটা দিনের অর্ধেক সময়ের মধ্যে এক একটি মানবের  প্রাণ হরণ করে নিতে পারে।এই বিষাক্ত ব্যাঙের ছাতা ভক্ষণ করা মানেই নিশ্চিত অপঘাত মৃত্যু।  অমানিটা হল আমরা সাধারণত দেখা ব্যাঙের ছাতা। ব্যাঙের ছাতা গুলি নানা ধরনের বড় জাতের ছত্রাক। ম্যাক্রো ফাংগাই। 

প্রকৃতিতে বিরাজিত ব্যাঙের ছাতা দুই ধরনের। বিষাক্ত এবং অবিষাক্ত। অবিষাক্ত  ব্যাঙের ছাতা সমূহ ভক্ষণযোগ্য। তারমধ্যে অরিকুলারিয়া,গেনোডারমা ইত্যাদি ঔষধি গুণসম্পন্ন। অসমের অরণ্যে অনেক ভক্ষণযোগ্য ব্যাঙের ছাতা পাওয়া যায়। অসমের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোক লেনঝাইট, লেন্টিনাছ, কেন্থেরেলাস,ব'লেটাস ইত্যাদি  প্রজাতির ব্যাঙের ছাতা ঘন অরণ্য থেকে সংগ্রহ করে খাদ্য হিসেবে আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করে । হাতির পা পিছলে মৃত্যুমুখে পড়ার মতো বিষধর ব্যাঙের ছাতা সনাক্তকরণে হওয়া মানবীয় ভুলের জন্য পরিবার সহ মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া লোকের  খবর মাঝেমধ্যে খবরের কাগজের শিরোনাম হয়ে উঠে । 

আমার চোখের সামনে ব্যাঙের ছাতার এই অরণ‍্যটিতে মাঝেমধ্যে দু'একটি কাঠঠোকরাকে চড়ে বেড়াতে আসতে আমি দেখতে পাই । ফালভাস ব্রেস্টেড উডপেকার এবং ব্ল্যাক রাম্পড ফ্লেইমবেক দুই ধরনের পাখি মনের আনন্দে গাছের পচা খোড়ল থেকে পোকামাকড় বের করে ধরে খায় ।ফালভাস ব্রেস্টেড উডপেকার পাখিগুলিকে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম । এই পাখিগুলি বড় বড় গাছ থাকা অরণ্যের পাখি। এর স্থানীয় নাম বিচিত্র বর্ণের কাঠঠোকরা। পাখিগুলির উপস্থিতি আমাকে ঘন অরণ্যের  মধ্যে নিয়ে গেল । ব্ল্যাক  রাম্পড ফ্লেইমবেক পাখিগুলি আবার সবখানে পাওয়া যায় । বাগান-বস্তি, সাধারণ জঙ্গল ইত্যাদি সব জায়গায়। স্থানীয়ভাবে এই ধরনের পাখিকে সোনালি কাঠঠোকরা  বলা হয়ে থাকে। এই দুই ধরনের পাখির মধ্যে যথেষ্ট মিল দেখা যায় । ভালোভাবে পাখি শনাক্ত করতে না পারা লোকের  পক্ষে নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে । দুই ধরনের পাখির মাথার উপরের অংশ লাল রঙের। পাখির রঙ দেখে এই দুই ধরনের পাখিকে সুন্দর ভাবে সনাক্ত করা যায় ।ফালভাস ব্রেস্টেড উডপেকার পাখির ডানা কালো, তাতে উপর থেকে নিচে সাদা রঙের সমান্তরালভাবে আট নয়টি চটা বা পটি থাকে। তার বিপরীতে ব্ল্যাক রাম্পড ফ্লেইমবেকের ঘাড় কালো রঙের, ডানা মুগা বর্ণের। এই দুই ধরনের পাখি তাদের শক্তিশালী ঠোঁট দিয়ে কাঠে খটখট শব্দ তুলে গাছে খোড়ল তৈরি করে আর তার ভেতরে থাকা পোকামাকড় ধরে খায়। আমি দূরে  বসে পাখি দুটির ভোজন বিলাস লক্ষ্য করছি। ওরা আমার উপস্থিতি জানতেই পারেনি। ভালোলাগা ধরনে ওরা উৎসাহে শরীরটা নাচাচ্ছে। বিহগ জীবনের অপূর্ব সৌন্দর্যের কী বাংময় প্রকাশ।

দিনের এবং রাতের বিভিন্ন সময়ে অরণ‍্য বিভিন্ন রূপ লাভ করে। সেই রূপের মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজতে চেষ্টা করি। এরকম কোনো কথা নাই যে আমি আমার কাছে বিতুষ্ট হয়ে অরণ‍্যের আশ্রয় নিয়েছি। অরণ্যের মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পাই– তার মানে এরকম নয় যে আমি মানুষের সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকতে চাই। আমি সান্নিধ্যের  খোঁজে আসা  এই অরণ্য অঞ্চল সেরকম কোনো গভীর অরণ্য নয়, জায়গাটা জন বসতির কাছে। আমি মানুষকে ভালোবাসি, মানুষের সান্নিধ্যে থেকে নিজেকে উপভোগ করতে চাই। অরণ্য এবং মানুষের সান্নিধ্যের ভেতরে আমি কোনটাকে বেশি অগ্রাধিকার দিই, সে রকম প্রশ্ন উত্থাপিত হলে আমি কখনও দোদুল্যমানতায়  ভুগি। তবে মানসিক শান্তির কথা এলে আমি মহানগরের চেয়ে অরণ্যকে অনেক বেশি প্রাধান্য দিতে পছন্দ করব।

জীবন যুদ্ধের দৌড়ে কিছু প্রশ্ন নিজেকে জিজ্ঞেস করলে সাধারণত প্রত্যেককেই দোদুল্যমানতায় ভুগতে দেখা যায়। আমিও ভুগি।বহু প্রশ্নের কখনও কোনো উত্তর পাই না। বহু প্রশ্নের আবার উত্তরই থাকে না। মানুষের জীবনে এই ধরনের বহু প্রশ্ন উত্তরহীন হয়েই থেকে যায়। 

সেরকম উত্তরহীন প্রশ্নের সন্ধানে আমরা জীবন অতিবাহিত করি। 

– কেন করি? 

সেই প্রশ্নেরও কোনো উত্তর আমাদের হাতে  থাকে না।

দূরে দুই তিনটি  মাছরাঙা পাখিকে  সুন্দরভাবে নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে থাকতে দেখেছিলাম।

মাছরাঙা পাখিকে আমরা টি টি হুট ও বলে থাকি। এই পাখিগুলি এভাবেই ডাকে যে– সেই জন্য। পাখিগুলি ইংরেজি নাম রেড ওয়াটলড লেপ উইং। বৈজ্ঞানিক নাম ভেনেলাছ  ইণ্ডিকাছ।

সদাহাস্যময় যুবতির মতো চঞ্চল পাখিগুলি আমার খুব ভালো লাগে , আপন আপন বলে মনে হয়। শৈশব থেকে স্বচক্ষে কি এই পাখিগুলি আমার অত্যন্ত পরিচিত, প্রিয়। নড়ার মধ্যে ছোট ছোট আলপথ গুলিতে নানা ধরনের পাখিগুলি হেলেদুলে ফুর্তি করে। টি টি হুট টি টি হুট করে কিছুটা দূরে উড়ে গিয়ে পুনরায় মাটিতে পড়ে। ডানা নাচায়। পাখিটির ঠেঙ হলদে রঙের, মাথাটা কালো, গলার নিচের অংশ থেকে লাবণ্য ঝরে পড়া সাদা রঙের ডানায় আবৃত। পেট এবং ডানার  প্রাথমিক পাখনাগুলি কালো যদিও দেখতে মেটে বর্ণের।ঠোঁটের সূঁচলো অংশটুকু কালো এবং বাকিটুকু লাল রঙের।চোখের সামনে আবার লাল ডানায় সৃষ্ট একটা লাল দাগ।মোটের ওপর পাখিটির শরীর লাল হলদে এবং কালো বর্ণের পালকের অপূর্ব সমাহারে সজ্জিত।

রেডওয়াটলড লেপউইং দলের উচ্ছৃ্খল চেঁচামিচি আমার ম্নে এই মুহূর্তে স্তূপীকৃত হয়ে শূন্যেই ভেসে থাকা চিন্তা-রাশিকে উচ্ছৃঙ্খল করে তুলল।

আমি এদিকে ওদিকে তাকালাম।ধীরে ধীরে দিনের পৃ্থিবী রূপ পরিবর্তন করতে শুরু করেছে।

অন্ধকারের একটা জামা এনে পরার জন্য অরণ্যটা আকাশের দিকে দুহাত মেলে দিয়েছে।

সূর্যের হেলানো কিরণ গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে এসে আমার গালে মুখে পড়েছে।সূর্যের এই কিরণ দুপুরের রোদের মতো রাগি নয়। শান্ত সৌম্য।স্নেহময়।নিযুত বছরের একজন বৃ্দ্ধ তাঁর দুধে আলতা হাতে আমার অন্তঃকরণ স্পর্শ করতে চাইছে। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতো  ধীর স্থির ভাবে আমি উপভোগ করছি অনন্ত কালের সেই স্নেহ-স্পর্শ।

দিন আর রাতের সন্ধিক্ষণের সময়টুকু আমার কাছে দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্টকর সময়।যেখানেই থাকি না কেন এই সময়টুকুতে একেবারে অসহায় হয়ে পড়ি।চাকরি জীবনের আশ্রয়স্থলে থাকলে এই সময়টাতে শহরের কোনো জায়গায় অবস্থিত দূরের মন্দিরে অনুষ্ঠিত হওয়া সান্ধ্য ভজন এবং আরতি শুনতে পাই।আমার বুকের ভেতরের অদৃশ্য কোনো অংশ মোচড় খেয়ে উঠে।জানি না কেন এরকম হয়।দেড়শো দুশো বছরের আগে চা বাগানে কাজ করার জন্য আগত ব্রিটিশ সাহেবদের কথা মনে পড়ে।কোন দূরদেশে নিজের স্ত্রী-পুত্র পরিবারকে ফেলে আসা মানুষের সংস্পর্শ থেকে বহু যোজন দূরে থাকা উঁচু উঁচু চাং-বাংলোগুলিতে সন্ধ্যার সময়টুকু তাঁরা কীভাবে কাটায় কল্পনা করি।এত নিঃসঙ্গতার মধ্যে তাঁরা কীভাবে সময় অতিবাহিত করত ভাবলে আমি চমকে উঠি।সারাদিন ব্যস্ততা এবং রাতে ঘুমের মধ্যে থাকা সময়টুকু ছাড়া বাকি অকারণের সময়টুকু মানুষকে দেওয়া কষ্ট আমি উপলদ্ধি করতে চেষ্টা করি।

দূর দিগন্তে রঙিণ মেঘের ছটাটুকু ছাড়া পৃ্থিবী থেকে সূর্যের আলোর শেষকণা অস্তিত্বও নাই হয়ে গেল।

আমি বসে থাকা গাছের গোড়া থেকে নদীর ঠিক বিপরীত তীরে কাঁটা বাঁশের একটি গভীর বন।দিনের বেলা সাধারণত চোখে না পড়া বাঁশবাগানটা এই সময়ে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ে।বাঁশবাগানে বসবাস করে বকের একটি বড় পরিবার।কাঁটা বাঁশের বাগানটা বক পরিবারের একটি পাড়া।লিটল ইগ্রেট পাখিগুলির এই সময়টুকু ব্যস্ততার সময়।সারা দিন শিকারের সন্ধান করে পাখিগুলি বাসায় ফিরেছে।রাতটা কাটানোর জন্য পছন্দের জায়গার খোঁজে উদ্বেল হয়েছে।কোট কোট শব্দ করে, দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটা থেকে একটি পাখি কিছুটা উপরে উড়ে গিয়ে পুনরায় এক জায়গায় পড়েছে। অন্য কোনো একটি পাখি, পাখিটিকে পুনরায় তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ায় আবার উপরে উড়েছে এবং নির্দিষ্ট এক জায়গায় স্থান নিয়েছে। ধবধবে সাদা রঙের পাখি। ঠোঁট এবং ঠেং কালো। পায়ের আঙুলগুলি হলদে। দেখতে সুন্দর। বৈজ্ঞানিক নাম ইগ্ৰেট্টা গারজেট্টা। মাঠ,ছোট বড় জলাশয় লিটল ইগ্ৰেটের বিচরণ ভূমি।

আমার বিপরীত দিকে থাকা বাঁশ বাগান ছাড়াও পাশের ছোট বড় গাছ এবং ঝুপড়িগুলিতে নিজের নিজের আশ্রয়স্থল খুঁজে বিভিন্ন পাখিগুলি ফিরে এসেছে।

সন্ধ্যার অন্ধকার জড়িয়ে  নদীর তীর থেকে উড়ে আসা শীতল বাতাস আমার শরীরকে স্নিগ্ধ করে তুলছিল।

ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ আমার শরীরে একটু একটু করে কম্পন তুলেছে।

–উ হু হু।

আমার মুখ দিয়ে অস্ফূট  ভাবে উচ্চারিত হয়েছে সেই স্ফুরণ। দুই হাতের তালুতে ঘষে আমি শরীরটাকে একটু গরম করে তোলার চেষ্টা করে বসা থেকে উঠে এলাম। নভেম্বর মাসের শেষ ভাগ। শীতের প্রকোপ এখনও এতটা বৃদ্ধি পায়নি। তবে নদীর তীরের বাতাস ঠান্ডা বহন করে আনছে।

বাতাসের অবাধ গতিকে বাধা দেবার জন্য আমার পরে থাকা জ্যাকেটটা ঠিকঠাক করে নিলাম এবং দুটি হাত জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে আমার শরীরটাকে সজোরে জড়িয়ে ধরলাম ।

মাঝেমধ্যেই আমি নিজেকে জড়িয়ে ধরে পরম পুলক অনুভব করি ‌। এভাবে নিজেকে ধরে রেখে  আমি জ‍্যাকেটটার কথা ভাবতে লাগলাম। তন্ময় হয়ে  আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকা জ্যাকেটটার সঙ্গে স্মৃতির পটে কিছু কাহিনি লুকিয়ে রয়েছে। পাইন গাছের সবুজ শিসধ্বনিতে আমি অনুরণিত হই।আমার হতভাগা শরীরটাকে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা করে থাকা জ্যাকেটটা আমাকে প্রায়ই মারবানিয়ান স্যারের কাছে নিয়ে যায়। সঙ্গে ভেসে আসে রাতের শিলঙে বেশ্যার খোঁজে যাওয়া সিকিমের নেপালি অফিসার কয়েকজনের মুখগুলি।

মারবানিয়ান স্যার এবং সিকিম থেকে আসা নেপালি অফিসার কয়েকজনের সঙ্গে আমার  গুয়াটিতে অনুষ্ঠিত হওয়া কম্পিউটার বিষয়ক একটা প্রশিক্ষণ শিবিরে সাক্ষাৎ হয়েছিল। প্রশিক্ষণকালে মারবানিয়ান স্যার আমার কাছে বসে ছিল। কিন্তু আমরা দুই জনেই প্রথম দুই দিন কোনো কথা বলিনি। মারবানিয়ান স্যার আমাকে নিয়ে কোনো ঔৎসুক‍্য দেখান নি। প্রশিক্ষণের জন্য যাওয়া দলটির ভেতরে কেবল আমার কাছেই একটা ল্যাপটপ ছিল এবং আমি ল্যাপটপের মাধ্যমে কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম পরিচালনা  করায় কিছু পরিমাণে দক্ষ ছিলাম। মারবানিয়ান সাবের কম্পিউটার বিষয়ে কোনো পারদর্শিতা ছিল না। একজন প্রশিক্ষক ব্যবহারিক কম্পিউটারের প্রশিক্ষণকালীন আমাকে এবং মারবানিয়ান স‍্যারকে একই দলের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আমি ধীরে ধীরে মারবানিয়ান স্যারের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। অপ্রয়োজনে একটিও বাক্য ব্যবহার না করা  মারবানিয়ান স্যারও আমার কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। আমি স্যারকে কম্পিউটারের প্রাথমিক জ্ঞানটুকু সম্পর্কে ধারণা দেবার জন্য  যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম। কথা গুলি মনে রাখা এবং বুঝতে পারায় স্যার কঠিনতার  সম্মুখীন হয়েছিলেন কিন্তু মানুষটা কোনোমতেই ছেড়ে দিতে চাইছিলেন না ।

প্রশিক্ষণের শেষে মারবানিয়ান স্যার আমাকে তিনি থাকা ঘরে ডেকে নিয়ে ছিলেন । স্যারের ঘরের টেবিলের ওপর আমি একটা ল্যাপটপ দেখতে পেয়েছিলাম। সোনি কোম্পানির ভালো মডেলের ল্যাপটপ। দামের দিক দিয়ে আমার সাধ্যের বাইরের। কম্পিউটারের শেষধাপের  কারুকার্য সম্বলিত ল্যাপটপটাকে আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে স্যার কে জিজ্ঞেস করেছিলাম –স্যার আপনার? 

আমি স্যারকে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করা উচিত হয়নি।স‍্যারের ঘরের টেবিলের ওপরে স্যার অন্যের মহামূল্যবান একটি ল্যাপটপ এনে কেন সাজিয়ে রাখবেন!

– না আমার নয়। আমাদের বিভাগের। তবে আমি এটি ব্যবহার করতেই জানিনা। আপনি আমাকে একটু–

বেঁটেখাটো মানুষটি লাফিয়ে লাফিয়ে চলার মতো স্যার ইংরেজি ভাষায় কথাগুলি বলে গিয়েছিলেন। মারবানিয়ান স্যারের কথা বলার ধরণটা আমার ভালো লেগেছিল।

কেবল দুই দিনে মারবানিয়ান  স্যারকে যতটুকু কম্পিউটার শেখানো যেতে পারে আমি ততটুকু শেখানোর চেষ্টা করেছিলাম । কেবল দুই দিনে যতটুকু কম্পিউটার শেখানো  যেতে পারে ততটা কম্পিউটারে জ্ঞান আয়ত্ব করার জন্য যত্নের ত্রুটি  ছিল না।

প্রশিক্ষণের শেষে আমরা যে যার বাড়ি ফিরে যাবার কথা। তবে মারবানিয়ান স্যার আমাকে তার সঙ্গে শিলং-এ যাবার জন্য অনুরোধ জানালেন । সিকিম থেকে  আসা অফিসার কয়েকজন শিলং শহরটি দেখতে চাইছে। আমাকেও তাদের সঙ্গে একসঙ্গে শিলং যেতে হবে। এটা মারবানিয়ান সারের আন্তরিকতা । শিলং বললেই আমরা বুঝি প্রকৃতির অকুণ্ঠ মহামেলা। সরল গাছের পাতার মধ্যে বাতাসে গুনগুন ধ্বনি।

 মারবানিয়ান স্যার জেলা গ্রামীন বিকাশ অধিকরণের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার । শিলং শহরে স্যারের বিভাগের একটি সুন্দর অতিথি গৃহ আছে।আমরা নাকি রাতটা সেখানে থাকতে পারব।

শিলংয়ের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে হাতে গিটার নিয়ে পাইনের মধ্য দিয়ে হেঁটে বেড়ানো মোনালিসা লিংডোকে  আমি আবছা  ভাবে দেখতে শুরু করলাম। মোনালিসার হাত ধরে সাদা মেঘগুলি উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি অস্থির হয়ে পড়লাম।

পড়াশোনা করার সময়ে আমাদের শিলঙে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হলে আমি পাইন গাছের ছায়ার মধ্যে মোনালিসাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।

গিটারের সুরে একটি বাড়ি তৈরি করে শিলঙে সারা জীবন বসবাস করার কল্পনা করেছিলাম।

মারবানিয়ান শিলঙের কথা বলার সময় আমার চোখের সামনে শিলং শহরটা আসা যাওয়া  করতে শুরু করেছিল।

– স্যার আমি গরম কাপড় আনিনি যে!

– কোনো কথা নেই । কিছু একটা কিনে নিলেই হবে ।

মারবিয়ান স্যার অতি সহজ ভাবে কথাটা বলেছিলেন।

আমার হাতে পয়সা ছিল না, কিন্তু এটিএম কার্ডটা ছিল। সেটা আমি সবসময় পকেটেই নিয়ে ঘুরে বেড়াই। নিজেকে প্রবোধ দেবার জন্য আমি প্যান্টের পকেটটা হাতড়ে   দেখলাম।

মারবানিয়ান স্যারের  ব্যক্তিগত অ্যাম্বাসেডর গাড়িটায়  বসে আমি এবং মারবানিয়ান স্যার শিলং থেকে ফোন করে নিয়ে আসা সরকারি গাড়িটিতে সিকিমের কয়েকজন অফিসার । পথে আমি মারবানিয়ান স্যারের সঙ্গে কী কথা বলেছিলাম তা আমার মোটেই মনে নেই। আমার যে কথাটা মনে আছে সেটা হল– আমি স্যারকে শিলংয়ের একটি এটিএম বুথে গাড়িটা রাখতে বলেছিলাম।

আমি এটিএম কার্ড ব্যবহার করি বলে জানতে পেরে স্যার অবাক হয়েছিলেন।

– তাহলে আপনি পয়সা থাকা মানুষ!

আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম– কেন স্যার?

– আপনি এটিএম কার্ড ব্যবহার করেন।

আমি একটু  হেসে ছিলাম।

এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলার শুরুর দিকের কথা এটি।

আমি কীভাবে এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা বের করি স্যার দেখতে চান নি। অ্যম্বাসেডর গাড়িটির নির্দিষ্ট আসনে বসে স্যার আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

আমি এটিএম থেকে বের করে আনা টাকা দিয়ে স্যার পুলিশ বাজারে দরদাম করে আমাকে এই জ্যাকেটটা কিনে দিয়েছিলেন। গত আট নয় বছর এই জ্যাকেটটা আমাকে শীতকালে সাহচর্য দিয়ে আসছে। ধন্যবাদ মারবানিয়ান স‍্যার।

জ্যাকেট চেনার কথা মনে পড়লেই আমার সিকিমের অফিসার কয়েকজন রাতে বেশ্যা খুঁজতে যাওয়া শিলংয়ের রাজপথে ঘুরে বেরিয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে আসার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে অতিথি গৃহে পাঁঠার মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার কথা। মনে পড়ে ফিরে আসার পরে শিলংয়ের পথে-ঘাটে গিটার নিয়ে ফিলিপিনি মিউজিক বাজানো মোনালিসাকে মনে মনে খুঁজতে থাকার কথা।

সন্ধ্যাবেলা শিলং এর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ফুরফুরে বাতাসের মতো নদীর এক ঝাঁক বাতাস আমাকে নিরন্তর খেপিয়ে চলেছে ।আমি স্বপ্নের শিলং থেকে ফিরে এসে শুকনো গাছের ওপরে অপেক্ষা করে রয়েছি।

রেড ওয়াটলড লেপউইং  পাখিগুলি ইতিমধ্যে নদীর পাড়ের ঝোপের মধ্যে নিজের নির্জন ঘরে একান্ত মনে আশ্রয় নিয়েছে । কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা ক্যানন ডি ছশো ক্যামেরাটা আলগোছে হাত দিয়ে খামচে ধরে আমি একপা দুপা করে আমার জীবন গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠা উল্টে অরণ্য থেকে বেরিয়ে এলাম ।

  


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Anandamangal, Soumitra Roy।। আনন্দমঙ্গল ।। সৌমিত্র রায়

আনন্দমঙ্গল ।। সৌমিত্র রায়