বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ৩৬ ।। ডঃমালিনী ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস Dr.Malini

 বিদেহ নন্দিনী~ ৩৬

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 


(৩৬)
দুশ্চরিত্র রাবণের দুষ্কর্ম সমর্থন করে স্বামী রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাওয়া প্রতিটি লঙ্কা বাসীকে আমি শত্রু বলে গণ্য করেছিলাম যদিও ব্যতিক্রম ছিল কুম্ভকর্ণ। আমি কুম্ভকর্ণের ছায়া ও দেখিনি যদিও সরমা,ত্রিজটা, কলা এবং প্রহরীদের মুখে যা শুনেছিলাম তা থেকেই এই মহাবীরের প্রতি আমার অন্তরে এক ধরনের শ্রদ্ধা জন্মেছিল । তাই কুম্ভকর্ণের মৃত্যুসংবাদ আমার অন্তরকে স্পর্শ করে গেল। 
কুম্ভকর্ণের মৃত্যু সমগ্র লঙ্কা মহানগরীকে বিষণ্ন করে তুলেছিল। সেই কারুণ্য আমি অশোক বনে বসেও অনুভব করছিলাম। এই কয়েকদিন আমার সঙ্গে কারও দেখা হয়নি। ত্রিজটাও ব্যস্ত ছিল  কুম্ভকর্ণের পত্নী বজ্রজ্বালার সঙ্গে। পতি হারা বজ্রজ্বালা নাকি বারবার অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। মাঝখানে একদিন সময় বের করে ত্রিজটা আমার কাছে উপস্থিত হল। এসেই  চোখের জল ফেলে কুম্ভকর্ণের বিষয়ে বলেছিল-' বুঝতে পেরেছ মা, লঙ্কাপুরী বর্তমানে সজ্জনের রাজত্ব নেই। মহাবীর কুম্ভকর্ণ বছরের মধ্যে অর্ধেক সময় শুয়ে কাটাত যদিও তিনি রাজ্যের প্রতিটি মানুষকে জানতেন কে ভালো ,কে খারাপ । দাদা রাবণের পরের স্ত্রী হরণ, বলাৎকার, দর্প ইত্যাদি কথাগুলি কুম্ভকর্ণ মোটেই পছন্দ করত না ।তবুও দাদা রাবণ তার প্রাণ ছিল। তোকে হরণ করে আনার পরে কুম্ভকর্ণ দাদাকে সহস্রবার বলেছিল তোকে রামের হাতে পুনরায় অর্পণ করার জন্য । সেদিন যুদ্ধে যাওয়ার আগের মুহূর্তে কুম্ভকর্ণ দাদা রাবণকে বলেছিল-' হে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আজ দেশে যে অশান্তি হয়েছে, ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠেছে, তার জন্য দায়ী তুমি। ত্রিভুবন জয় করার পরে তুমি সুখে শান্তিতে নিজেও থাকা উচিত ছিল এবং প্রজাবর্গদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত ছিল। তোমার এতগুলি সুন্দরী স্ত্রী থাকতে তোমার লালসা সম্বরণ  না করে পরের স্ত্রী  হরণ করে ভীষণ অন্যায় কাজ করেছ। একথা আমি তোমাকে ঘুমোতে যাবার আগে বলেছিলাম। এখনও  বলছি বৌদি মন্দোদরী এবং ভাই বিভীষণ ভালো কথা বলার জন্য তুমি খারাপ পেয়েছিলে। বিভীষণকে তো রাজ্য থেকেই তাড়িয়ে দিলে। রাম লঙ্কা আক্রমণ করে কোনো দোষ করেনি। ঝগড়াটা তুমি সৃষ্টি করেছ। কুম্ভকর্ণের কথা শেষ না হতেই রাবণ ক্রোধে জ্বলে ওঠে বলেছিল-' আমার ভুল হোক ,বল বিক্রমের জন্যই হোক বা মোহে পরেই হোক যা করেছি সেখান থেকে আর ফিরতে পারব না। আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট মনে কষ্ট পেয়েছি ।এই সমস্ত কথা বলে আমাকে আর কষ্ট দিস না। এখন যা করা উচিত তাই কর।’
দাদার কথা শুনে কুম্ভকর্ণ বলেছিল-' হে ভাতৃ আমি তোমার সহোদর ভাই বলেই এ কথা বলছি। শত্রু হলে তোমাকে উসকে দিতাম। তোমার কুকর্মের জন্য খারাপ পাই যদিও বিপদে তোমাকে কখনও ছেড়ে যাব না। আমি এখন যুদ্ধে যাব। তুমি চিন্তা কর না, তোমার জয় অনিবার্য। আমি কিছুক্ষণ পরে রামচন্দ্রের শির তোমাকে এনে উপহার দেব।' একনাগাড়ে কথাগুলি বলে ত্রিজটা কিছুক্ষণের জন্য অপেক্ষা করল। তারপর চোখের জল মুছে পুনরায় বলল-' কুম্ভকর্ণকে রাবণ নিজ হাতে সাজিয়ে দিলেন। তারপর আলিঙ্গন করে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওনা করে দিলেন।' কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে ত্রিজটা পুনরায় বলতে শুরু করল-' বুঝেছ রাঘব ঘরনী, কুম্ভকর্ণ যুদ্ধে যে পরাক্রম দেখাল সে কথা রাম লক্ষ্ণণও ভুলতে পারবেনা । সেই পরাক্রম আমি নিজ চোখে দেখি নি যদিও যারা দেখেছে প্রত্যেকেই বলেছে কুম্ভকর্ণ রণক্ষেত্রে নামার সঙ্গে সঙ্গে নাকি বাঁদর সেনা ভয়ে এদিক ওদিক ছিটকে পালালো। কুম্ভকর্ণ বাঁদর সেনা গুলিকে আছড়ে মারার সঙ্গে সঙ্গে  মুঠো মুঠো করে ধরে খেতে লাগল। হনুমান আকাশ থেকে একটা পর্বত নিয়ে কুম্ভকর্ণকে আঘাত করেছিল।কিন্তু কুম্ভকর্ণ তাতে ভ্রুক্ষেপ করল না, উল্টো হনুমানকে এরকম একটি আঘাত করল যে হনুমান রক্ত বমি করতে লাগল। তারপর মহাবীর বালির পুত্র অঙ্গদ কুম্ভকর্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এল। দুজনের মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হল।একবার অঙ্গদ কুম্ভকর্ণের বুকে এত জোরে আঘাত করল যে কিছু সময়ের জন্য কুম্ভকর্ণ অচেতন হয়ে পড়ল ।কিন্তু চেতনা ফিরে পেয়ে অঙ্গদের  দেহে কুম্ভকর্ণ এরকম একটি কিল বসিয়ে দিল যে অঙ্গদ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তা দেখে সুগ্রীব তখনই কুম্ভকর্ণের উদ্দেশ্যে এক প্রকাণ্ড পর্বত তার বুকে নিক্ষেপ করলেন। কুম্ভকর্ণ হাতে থাকা শূল  সুগ্রীবের দিকে নিক্ষেপ করলেন।কিন্তু হনুমান শেষ পর্যন্ত শূল ধরে ফেলে ভেঙ্গে ফেলল। মহাক্রোধে কুম্ভকর্ণ মলয় পর্বতের শিখরটা তুলে নিয়ে সুগ্রীবকে আঘাত করল। সেই আঘাতে সুগ্রীব মাটিতে অচেতন হয়ে পড়ে গেল ।কুম্ভকর্ণ দ্রুত সুগ্ৰীবকে কাঁধে তুলে নিয়ে নগরে ফিরে এল। যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে রাজাকে বন্দি করতে পারলে যুদ্ধে সেখানেই ইতি পড়ে। সুগ্ৰীব যেহেতু রাম বাহিনীর রাজা,তাই তাকে  বন্দি করায় যুদ্ধের সেখানেই শেষ হল।
রাজাকে বন্দি করে যুদ্ধে ইতি টানায় রাক্ষসেরা কুম্ভকর্ণের জয়ধ্বনি দিতে লাগল। এদিকে কুম্ভকর্ণের কাঁধে এভাবে যেতে থাকার সময় সুগ্রীব ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পেল। তিনি কুম্ভকর্ণের নাক কান কামড়ে ছিঁড়ে ফেললেন। বগলের নিচ দুটি ছিন্নভিন্ন করে ফেললেন। সুগ্ৰীব এতটাই যন্ত্রণা দিতে লাগল যে সহ্য না করতে পেরে কুম্ভকর্ণ সুগ্রীবকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সুগ্ৰীব তৎক্ষণাৎ এক লাফে রামচন্দ্রের কাছে গিয়ে হাজির হল। নিজের অসাবধানতার জন্য সম্পূর্ণ ঘটনাটা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় লজ্জা, অপমান ক্রোধে কুম্ভকর্ণ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে এলেন। এদিকে নাক কানের আঘাতের রক্ত, পেটের ক্ষুধা তাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। তাই প্রথমে দুই হাতে যতটা পারে কতগুলি বানর সেনা মুখে ভরিয়ে দিলেন। কুম্ভকর্ণের এই কার্যকে বাধা দেবার জন্য লক্ষ্মণ এগিয়ে এল। লক্ষণের তীব্র বাণ বর্ষণকে কুম্ভকর্ণ ভ্রুক্ষেপই করল না। তখন লক্ষ্মণ উগ্ৰবাণ মেরে কুম্ভকর্ণের কবচ খসিয়ে ফেলল। লক্ষ্মণের বীরত্ব দেখে কুম্ভকর্ণ বলেছিল -'লক্ষ্ণণ তোমার বীরত্ব দেখে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি ।আমার সামনে ইন্দ্র, বরুণ, যম কেউ দাঁড়াতে পারে না। ‌তুমি সামান্য বালক হয়েও এতক্ষণ ধরে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করছ। কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি সময় খরচ করব না ।আমি রামের সঙ্গে যুদ্ধ করব ।'লক্ষ্মণ কুম্ভকর্ণের কথা শুনে বলল-'  আচ্ছা ঠিক আছে ।রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করে তোমার মনের আশ মিটিয়ে নাও ।ঐ যে রামচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে। এই যুদ্ধই তোমার জীবনের শেষ যুদ্ধ হবে।'
কুম্ভকর্ণকে  ক্ষিপ্র পদক্ষেপে রামের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে বিভীষণ হাতে গদা  নিয়ে তার পথরোধ করে দাঁড়াল। ভাইকে দেখে কুম্ভকর্ণ কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল -'বৎস তুমি ভ্রাতাদের ছেড়ে রাঘবের পক্ষে যোগ দিয়েছ যখন তখন আমাকে প্রহার করতে পার।আমি আজ নিশ্চিত যে রাক্ষস কুলের মধ্যে তুমি বেঁচে থাকবে। কারণ তুমি ধর্মাত্মা। তোমার কখনও দুঃখ হবে না। এখন তুমি আমার পথ থেকে সরে দাঁড়াও। কারণ আমি দেশরক্ষার জন্য শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করছি ।আমার বিচার বুদ্ধি লোপ পেতে পারে। আমি ভুলেও তোমাকে বধ করতে চাইনা। কিন্তু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আমি কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারি। তাই আমার স্নেহের ভাই, তুমি আমার সামনে থেকে সরে দাঁড়াও। কারণ জ্যেষ্ঠ হিসেবে তোমাকে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। দাদার কথা শুনে বিভীষণ চোখের জল ফেলতে ফেলতে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে রইল।
রামের সম্মুখীন হয়ে কুম্ভকর্ণ প্রথমে নিজের পরাক্রমের কথা ব্যাখ্যা করল। তারপর রামচন্দ্র কে বলল -' আমি জানি তুমি বিনা কারণে যুদ্ধ করছ না ।তুমি নিষ্কলুষ।আমি যেহেতু ভ্রাতার হয়ে যুদ্ধ করতে এসেছি তাই তোমাকে বধ করাটা নিশ্চিত ।মাত্র একবার তোমার বীরত্ব দেখতে চাইছি।'
  তারপর যুদ্ধ আরম্ভ হল। রাম ঝাঁকে ঝাঁকে বাণ মেরেও কুম্ভকর্ণের  কোনো ক্ষতি করতে পারল না। শেষে বায়বাস্ত্র  নিক্ষেপ করে কুম্ভকর্ণের ডান হাতটা কেটে ফেলল। তখন কুম্ভকর্ণ নাকি বা হাতে একটা গাছ উপড়ে নিয়ে রামের  দিকে তেড়ে গেল। রাম তখন ইন্দ্রমন্ত্রপুত অস্ত্র ছেড়ে কুম্ভকর্ণের বাঁ হাতটা কেটে ফেলল। তখন কুম্ভকর্ণ মুখ হা করে রামের দিকে এগিয়ে গেল। রাম শক্তিশালী বাণ মেরে দুই পা কেটে ফেলায় কুম্ভকর্ণ মাটিতে ছিটকে পড়ল। তারপর রামচন্দ্র কুম্ভকর্ণের মাথা বিচ্ছিন্ন করে একেবারে রাবণের নগরে ফেলল। কুম্ভকর্ণের মৃত্যুর পরে রাজা রাবণ আর সমস্ত রাক্ষস কুল ভেঙে পড়েছে। কথাটা বলে ত্রিজটা কাঁদতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে শোক সামলে নিয়ে বলল-' বুঝেছ মা,কুম্ভকর্ণ ইচ্ছা করলে মায়া যুদ্ধ করে প্রাণ রক্ষা করে থাকতে পারত। কিন্তু তিনি তা করলেন না। কারণ মায়া যুদ্ধকে কুম্ভকর্ণ অন্যায় যুদ্ধ বলে মনে করতেন। তাই ইন্দ্রজিৎ মায়া যুদ্ধ করে জয়লাভ করলে তিনি নাকি তাতে কোনো গৌরব নেই বলেছিলেন।
  ত্রিজটার কাছ থেকে কুম্ভকর্ণের বিষয়ে শুনে আমারও চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। মনে মনে  ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানালাম, কুম্ভকর্ণের আত্মা যেন শান্তি লাভ করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Student Registration (Online)

STUDENT REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...