চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২২

হে আমার স্বদেশ- ৯ ।। সন্তোষ কুমার কর্মকার ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস , He Amar Swadesh

 হে আমার স্বদেশ- ৯

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস




  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।



(নয়)

'ভোকেন্দ্র দাদা, তোমার যে দেখাই পাওয়া যায় না!'

'কী আর দেখা হবে, বিনন্দ। এখন আমি আগের সেই কলেজ স্ট্রিটের মেসে থাকি না।'

' তাহলে থাক কোথায়?'

' শিয়ালদা স্টেশনের কাছের একটি হোটেলে। মান্থলি সিস্টেমে একটা রুমে আছি।'

' হোটেলে থাকতে শুরু করেছ!'

' হোটেল অনেক ভালো। ঝামেলা নেই। সুবিধাও অনেক। নিজের ঘরের ভেতরে ঢুকে যা কর, যেভাবে থাক– কেউ অসুবিধা করবে না, কেউ কমপ্লেন করবে না। অসম থেকে কলকাতায় এসে মেস করে থাকা আমাদের অসমিয়া ছেলেরা বড় ব্যাকওয়ার্ড। আর হবে নাই বা কেন? বেশিরভাগই একেবারে ভেতরের গ্রামে জন্ম।গায়ে কলকাতার বাতাস লাগার পরেও ওদের শরীর থেকে গ্রামের গন্ধটা বের হতে থাকে। সবকটা গ্রাম্য ইডিয়ট। কিছু আবার 'কবিরাজ'! এতটাই 'কবিরাজ 'যে বইয়ের বাইরে কিছুই বুঝতে পারে না। কলেজের শিক্ষা লাভ করার জন্য কলকাতায় এসেছি যখন নো ডাউট আমাদের বই পড়তেই হবে। তা বলে বই আমাদের সব কিছু দেয় কি? শুধুমাত্র বইয়ের মধ্যে ডুবে থেকে এখানে যেসব এনজয়েবল জিনিস আছে, সেইসব এনজয়  করব না?'

' নিশ্চয় করবে।'

' আমি সেইসব কিছুটা এনজয় করি বলে আমাদের মধ্যে অপদার্থরা আমাকে খারাপ পায়। আমি নাকি রসাতলে যাচ্ছি।'

' শুনি কে তোমাকে খারাপ পায়?'

' সে হল লক্ষী, কলকাতায় পড়তে আসা অসমিয়া ছাত্রদের মধ্যে গজিয়ে ওঠা লিডার।'

'অ.ভা.উ.সা. সভার সম্পাদক। অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সেবক!'

' এখন তারা একটি পত্রিকাও বের করেছে।'

'জানি। অসমিয়া জাতীয় জীবনে নেমে আসা অন্ধকার দূর করার জন্য জোনাক– জোনাকী!'

' তার মানে সূর্যের আলো অসমিয়া জাতীয় জীবনে নেমে আসা অন্ধকার দূর করতে পারবে না। অন্ধকার দূর করার জন্য তারা সূর্যের আলোর বদলে জ্যোৎস্না কে অস্ত্র করে নিল ।ভালো, বেশ ভালো কথা !'

দুজনেই হাসতে লাগল।

কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস।

বিকেলবেলা।

এই সময়ে কফি হাউসে ভিড় কিছু  কম থাকে। তবু টেবিলে টেবিলে যুবক ছাত্ররা বয়স্করা বসে কথা বলছে । মাথায় লাল পাগড়ি এবং উর্দি পরা বেয়ারারা  টেবিলে টেবিলে ঘুরে নোটবুকে অর্ডার লিখে নিচ্ছে। একদল আবার ট্টেতে চা ,কফি ,চপ,কাটলেট, জলের গ্লাস ইত্যাদি এনে যত্ন করে পরিবেশন করছে।

ভোকেন্দ্র- বিনন্দের টেবিলেও একজন বেয়ারা এল।

' কী খাবি, বিনন্দ? এখন আমাকে এক কাপ কফি খেতেই হবে। কাল নেশাটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। এখনও হ্যাংওভার কাটেনি। কপালটা ঝিমঝিম করছে। তুই কাটলেট অমলেট কিছু একটা খা।'

ভেজিটেবিল চপ এবং এক কাপ কফির অর্ডার দেওয়া হল।

' আচ্ছা বিনন্দ, সেই যে মারোয়াড়ি  ছেলেটা– চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা, চন্দ্রকুমারের মাধ্যমে লক্ষ্মী জোনাকী বের করে অসমিয়া ভাষার সেবা করছে বলে যে এত ফুটানি মারছে– সত্যিই কি অসমীয়া ভাষার কোনো ভবিষ্যৎ আছে?'

' আমি কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি না।' বিনন্দ বলল,' আর তুমি তো জানোই, শুরু থেকেই এদের এই কথা কান্ডগুলি আমি পছন্দ করিনি। আসলে ওদের ভাব,ধারণাগুলি খুবই ন‍্যারো,সংকীর্ণ। কেবল অসমিয়া জাতি, কেবল অসমিয়া সাহিত্য। ভাষা সাহিত্যের কথা উঠলেই বাঙালি আমাদের ভাষা সাহিত্যের সর্বনাশ করল, এভাবে চললে বাঙালি সম্প্রসারণবাদ আমাদের ভাষা  সাহিত্যকে গ্রাস করে ফেলবে, একদিন আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব বলে বিলাপ করতে থাকে। কিন্তু তারা এটা কখনও বুঝতে চেষ্টা করে না যে ভাষা সাহিত্য নিয়ে আমাদের জাতি কীভাবে দাঁড়াবে? আমরা যে এখনও পরাধীন। আমাদের যে ইংরেজরা শাসন করছে। পরাধীনতার শিকল পরিয়ে ইংরেজ আমাদের লুণ্ঠন–।'

' ধীরে, ধীরে বল।' সন্ত্রস্তভাবে ভোকেন্দ্র বিনন্দকে সাবধান করল,' এটা কফি হাউস। পাবলিক প্লেস।কেউ শুনলে ঝামেলা হবে।'

কণ্ঠস্বর নামিয়ে এনে বিনন্দ  বলল,'না, এখানে কেউ অসমিয়া ভাষা জানেনা। মানে, আমি বলছিলাম পরাধীন জাতির জন্য ভাষা-সাহিত্যের উন্নতির আগেই চাই জাতির রাজনৈতিক অধিকার। অথচ আমাদের এরা, অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের এই মহান সেনানীরা, এদের মুখ্য লক্ষ্মী সেদিন ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরীকে বলল,' এ সাবজেক্ট ন্যাশন হ্যাজ নো পলিটিক্স'! এই ব্যারিস্টার চৌধুরী কে জানেন, ভোকেন্দ্র দাদা?'

' নামটা শুনেছি। তার বিষয়ে বিশেষ কিছু জানিনা।'

' ইনি হলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জামাই। ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা আগে থেকেই ইংরেজ ভক্ত। এখন যতই বিদ্বান হোক না কেন, ইংরেজ ভক্তরা ইংরেজদের পক্ষেই কথা বলবে। ভারতীয়রা পলিটিক্স করাটা অথবা রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারতীয়রা সচেতন হওয়াটা ইংরেজদের কাছে নিরাপদ নয়। আর লক্ষ্মী যে প্রায়ই গুণাভিরাম বরুয়ার কথা বলে, অসমের ইতিহাস লিখলে  কী হবে– তিনি তো একজন রাজভক্ত কর্মচারী। নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন করার জন্য ইংরেজ তাকে রায়বাহাদুর উপাধি প্রদান করেছে। তাকে নিয়ে লক্ষ্মীনাথদের গর্ব। আসলে এরা ভয়াতুর। ভয়ে ইংরেজদের অনুগত প্রজা। এটা দেশ প্রেম নয় এটা হল পরাধীনতার দাসত্বকে বরণ করে নেওয়া। তার জন্যই এরা জাতীয় কংগ্রেসের কথা উঠলে ভয়ে শিউরে উঠে । কেউ কংগ্রেসের সঙ্গে জড়িত রয়েছে জানতে পারলে এরা তাকে এড়িয়ে চলে। আর আমি যে  জাতির –।' 

ভোকেন্দ্র পুনরায় সন্ত্রস্ত হয়ে বিনন্দকে থামিয়ে দিয়ে চাপা কন্ঠে বলল,' ওই যে তিন মূর্তি মূর্তি আসছে।'

' তিন মূর্তি!'

অসম মাতৃর তিন  রত্ন। লক্ষ্মী, চন্দ্র এবং হেম।' মাথা তুলে নিমেষের মধ্যে মুখের ভাব বদলে আপ্যায়নের সুরে ভোকেন্দ্র তিন মূর্তিকে অহ্বান জানাল,' এসো, এসো–।'

লক্ষ্মীনাথ ভোকেন্দ্রকে পছন্দ করে না । বিনন্দকেও সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে, ভোকেন্দ্রকে দেখেই লক্ষ্মীনাথের অন্তর জ্বলে উঠল। চন্দ্রকুমারের স্বভাবটা অমায়িক । সে সবার সঙ্গে ভদ্রতা করে চলতে পারে । এদিকে নিরীহ হেমচন্দ্র উদ্ধত চরিত্রহীন ভোকেন্দ্রের সঙ্গে কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত নয়। সে ভোকেন্দ্রর কাছ থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করে।

এমনিতেও  তো গত এক বছর ধরে বিশেষ করে জোনাকী প্রকাশের কাজ শুরু করার পর থেকে তিনজনের মধ্যে একটা মেলা প্রীতির ভাব সৃষ্টি হয়েছে । প্রীতি ভালোবাসার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সঙ্গে মনের মিল না থাকা চতুর্থ কেউ থাকলে তারা অস্বস্তি অনুভব করে। কিন্তু যতই যা হোক না কেন,ভোকেন্দ্র - বিনন্দও অসম থেকে আগত অসমিয়া ছাত্র। তাদেরকে সোজাসুজি বাদ দিয়ে কফি হাউসের আলাদা একটি টেবিলে বসে কীভাবে? 

টেবিলের কাছে দুটি চেয়ার খালি ছিল। সেই দুটিতে চন্দ্রকুমার এবং হেমচন্দ্রকে বসতে বলে লক্ষ্মীনাথ কাছ থেকে একটা চেয়ার টেনে বসল।

' লক্ষ্মী, তোমরা তো কফি হাউসে আস না–।' ভোকেন্দ্র বলল,' আজ যে  হঠাৎ!'

' আমার দুর্ভাগ্য যে আমি কফি হাউসে আসাটা তোমার চোখে পড়ে না।' ভোকেন্দ্রকে জ্বালানোর জন্য লক্ষ্মীনাথ বলল, ' তুমি তো জানোই, আদরের বাঙালি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে আমি আর কিছু বলতে পারি না। আর ওরা আমাকে কফি হাউসে টেনে আনবেই। এমনিতো এখানে এসে আর ওদের সঙ্গে বসে আড্ডা মেরে আমার বড় ভালো লাগে।'

' তোমার কথাটা অবশ্য আলাদা।' লক্ষ্মীনাথ খোঁচা মেরে বলা কথাটা হজম করে ভোকেন্দ্র বলল,' এদিকে বাঙালি বন্ধুদের সঙ্গে তুমি তাল মিলিয়ে চলতে পার। তবে তোমার সঙ্গে আজ যে চন্দ্র এবং হেমও এল!'

'মাজিউ আমার সঙ্গে দুবার এসেছে। হেমগোঁসাঁই আগে কফি হাউসে আসেনি। কফি হাউসের ভেতরের মহল দেখানোর জন্য আজ তাকে জোর করে নিয়ে এলাম ।'

'সে গোঁসাই মানুষ । এখানে বিজাতি করা কফি খাবে কি?'

'আমি শুধু দেখব।' হেমচন্দ্র বলল,'খাব না।'  

' কিন্তু পাশে বসে তোমার সঙ্গী খেলে তুমিতো গন্ধ পাবে। ঘ্রাণেন অর্ধ ভোজনং।'

ভোকেন্দ্র হেসে উঠল।বাকি সবাই হাসতে লাগল।

তাদের পেছনের টেবিলে বসা চারজন বাঙালি যুবক বঙ্কিমচন্দ্রের 'আনন্দমঠ' নিয়ে কথা বলছে। একজন উপন্যাসে বর্ণিত সন্তান দলের স্বদেশ প্রেমের ব্যাখ্যা তুলে ধরল। অন্যজন বন্দেমাতরম গীতের বিষয়ে বলল। তৃতীয়জন আনন্দমঠ উপন্যাসটিকে ইংরেজদের বিরোধী  রচনা বলে অচিরেই বাজেয়াপ্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করল। লক্ষ্মীনাথের কানে কথাগুলি ভেসে এল।

' তারপরে, তোমার খবর বল তো, বিনন্দ।' চন্দ্রকুমার জিজ্ঞেস করল।

' আছি আর কি! নীরস সুরে বিনন্দ বলল, মাঝখানে ভূপালে গিয়েছিলাম। কংগ্রেসের অধিবেশন হল। চার দিন কাটিয়ে এলাম।'

' কীরকম হল অধিবেশন?'

' কেন্দ্রীয় নেতারা সংগঠনের ওপরে জোর দিল। সদস্যভুক্তি এবং নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হওয়া সদস্যদের মধ্যে কীভাবে জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি করা যেতে পারে এই বিষয়টির ওপরে  বিশেষভাবে গুরুত্ব দেবার জন‍্য  একদিনের একটি কর্মশালা হল। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে আমাদের অসম অনেক পেছনে পড়ে আছে । অসমে কাজ করার জন্য কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হল।'

' তুমি তাহলে সত্যিই কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করবে?'

' আমার মনে হয়, জাতির মুক্তির জন্য এখন কংগ্রেসকে শক্তিশালী করে তোলাটাই আমাদের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত।'

তখনই ভোকেন্দ্র অর্ডার দেওয়া অনুসারে বেয়ারা কফি চা এবং অমলেট এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখল।

' তোমরাও কিছু খাবে নিশ্চয়–।' কফির কাপটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে ভোকেন্দ্র বলল।

' তোমরা খাও তো।' চন্দ্রকুমার বলল,' আমরা আস্তে ধীরে  কিছু একটা নেব । কিছুক্ষণ বসব। বেশ কিছু কথা বলার আছে।'

'ও তোমরা তো আবার অসমিয়া সাহিত্যের উন্নতির জন্য একেবারে কোমর বেঁধে লেগেছ।'

এবার ভোকেন্দ্রর  কন্ঠে ব‍্যঙ্গের সুর,' সেই সবই  নিশ্চয় তোমাদের আলোচনার বিষয়?'

লক্ষ্মীনাথের   মাথায় রাগ চড়ে গেল।ক্রোধে  তার মুখটা  শক্ত হয়ে উঠতে দেখে চন্দ্রকুমার আশঙ্কা করল যে লক্ষ্মীনাথ ভোকেন্দ্রকে বাজে ভাবে গালিগালাজ করবে। হাত ধরে লক্ষ্মীনাথকে শান্ত করে চন্দ্রকুমার ধীরে ধীরে বলল,' তুমি ঠিকই অনুমান করেছ, ভোকেন্দ্র। পড়াশোনার সঙ্গে এটাকেও আমরা আমাদের পরম  কর্তব্য বলে সংকল্প গ্রহণ করেছি।'

 ' আর এই ক্ষেত্রে আমরা কিছু সফল হয়েছি।' লক্ষ্মীনাথ বলল,' আমাদের জোনাকীতে মাজিউ লেখা' বনকুঁয়রী' পড়ে রায়বাহাদুর জগন্নাথ বরুয়া  এবং মানিক চন্দ্র বরুয়া উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে । তাঁরা ভাবতেই পারেননি যে কলেজে পড়া একজন অসমিয়া ছাত্র অসমিয়া ভাষাতেও ইংরেজ কবি ওয়র্ডসওয়র্থের মতো এই ধরনের মনোমুগ্ধকর একটি কবিতা রচনা করতে পারে। দ্বিতীয় সংখ্যা জোনাকীতে এই হেম গোঁসাইর 'কাউকে আর হৃদয় বিলাব না' নামে একটি প্রেমের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে । এটিও একটি বিশেষ কবিতা। ঘনশ্যম বরুয়ার প্রবন্ধ ‘আত্ম শিক্ষা', কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের 'পাহরণি' পড়লেও তোমরা ভুলতে পারবে না। তাই, এতটা উন্নাসিক না হয়ে দুই আনার বিনিময়ে পত্রিকাটি কিনে পড়ে দেখ। আমরা দাবি করছি না যে আমরা বড় কিছু একটা করতে পেরেছি অথবা এই পত্রিকা প্রকাশ করে সাংঘাতিক কিছু সফলতা লাভ করেছি । তথাপি আমাদের এটাই আত্মসন্তুষ্টি যে আমরা চেষ্টা করেছি।'

' চেষ্টা করেছ ঠিকই।' কফির কাপটা নিয়ে বাঁকা হাসিতে ভোকেন্দ্র বলল,' তোমাদের চেষ্টার প্রশংসা করতেই হবে। কিন্তু এত কিছু যে করছ, অসমিয়া সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী?'

' ভবিষ্যৎ মানে?' লক্ষ্মীনাথের কণ্ঠস্বর চড়ে গেল,' এই যে ভোকেন্দ্র, নিজের লাইফ স্টাইল আর তোমার শিক্ষায় তুমি আমাদের কাজ- কর্মকে বিচার করতে যাওয়া উচিত হয়নি। দুর্ভাগ্যের কথা এটাই যে তুমি আহরণ করা শিক্ষা কতটা শুদ্ধ, সেটাই তুমি জাননা। তাই তুমি আমাদের কাজের মূল্য কী বুঝবে!'

' আরেকটি কথা–।' এতক্ষণ হেমচন্দ্র  চুপ করে ছিল। এবার সে সরব হয়ে উঠল,' তুমি যে অসমিয়া ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুললে, অসমিয়া হয়ে অসমিয়া ভাষার অতীতের বিষয়ে তুমি নিজে কিছু জান কি? আর যে যুবক মাতৃভাষার অতীত জানে না, তার বিবেচনায় ভাষা সাহিত্যের ভবিষ্যতের কোনো অর্থ আছে কি? তবু শোন, ভাষা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে বর্তমানকালের সাহিত্য কর্মের মাধ্যমে। তার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। সঙ্গে তোমাদেরও আহ্বান জানাচ্ছি– এসো, আমরা সকলে মিলে মিশে আমাদের ভাষা সাহিত্যের সেবা করি।'

ভোকেন্দ্র দেখল, বেশিক্ষণ বসে থাকলে ত্রিমূর্তি এভাবে শাণিত শর নিক্ষেপ করতেই থাকবে। তাই দ্রুত এখান থেকে প্রস্থান করাটাই নিরাপদ। চোখের ইশারায় বিনন্দকে দ্রুত চা অমলেট  শেষ করতে বলল। তারপর বিল দিয়ে ম্লান  হাসি হেসে দুজনেই দ্রুত কেটে পড়ল।

' এটাই হল আমাদের অসমিয়া বীরপুঙ্গবদের স্বভাব–।' হেমচন্দ্র বলল,' ভালো কিছু একটা করতে গেলে সাহায্য তো করবেই না, কেবল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর উপহাস!'

' এটা কমবেশি সব জাতির মধ্যেই থাকে, হেম গোঁসাই।' চন্দ্রকুমার বলল,' আসলে ওরা নিজেরা কিছুই করতে পারেনা। অন্যদের করতে দেখলেও ওদের গায়ে জ্বালা ধরে। অবশ্য এই অপশক্তি গুলি আমাদের উপকারই করেছে।'

' কীভাবে?' হেমচন্দ্র  জিজ্ঞেস করল।

' এদের ব্যঙ্গ উপহাস আমাদের বেশি করে অনুপ্রাণিত করেছে। এখন আমাদের আরও বেশি যত্ন আরও বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে জোনাকীর কাজ করতে হবে।' চন্দ্রকুমার বলল,' নবীনদের সঙ্গে প্রবীণ লেখকদের কাছ থেকেও রচনা চাইতে হবে। কমলাকান্ত ভট্টাচার্য ছাড়াও রত্নেশ্বর মহন্ত, লম্বোধর বরা, গুণাভিরাম বরুয়ার কাছ থেকে রচনা সংগ্রহ করে জোনাকীকে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে।' 

' আমিও ভাবছি,'লিটিকা' শেষ হওয়ার পরে কিছু অন্য ধরনের লেখা লিখব ।' ভাবনা বিভোর কন্ঠে লক্ষ্মীনাথ বলল।

' কীধরনের লেখা, বেজ?'

' ডিকেন্সের' পিকুইক পেপারস' পড়েছ কি ?'

'পড়িনি।'

' বঙ্কিমচন্দ্রের 'কমলাকান্তের দপ্তর'?' 

' পড়েছি।'

'ঠিক সেই ধরণের লেখা।'

' রম্য রচনা?'

' ঠিকই ধরেছ। রম্য রচনায় আমাদের এই ভোকেন্দ্র , বিনন্দদের ভালোভাবে ঝাড়ব।' কথাগুলি বলার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ যেন কিছু একটা ভাবছেও। ভবিষ্যতের জন্য একটা নতুন পরিকল্পনা করেছি,' তার জন্য আমি একটা ছদ্মনাম গ্রহণ করব।'

' ছদ্মনাম!কী ছদ্মনাম?'

' কৃপাবর বরুয়া।'

' বা, সুন্দর, খুব সুন্দর হবে।' হেমচন্দ্র বলে উঠল।

' এরকম রচনা বের হলে জোনাকী আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।'

' আরও একটি কাজ করলে ভালো হবে নাকি,মাজিউ?'

' কী কাজ?'

' তোমরা দুজনেই আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে থাক, আমি থাকি কলেজ স্ট্রিটে। এত দূরে থেকে জোনাকী প্রকাশনার কাজ করাটা অসুবিধাজনক হয়ে পড়েছে। তিনজন একসঙ্গে থাকতে পারলে ভালো ছিল।'

' চন্দ্রকুমার বলল,' আমিও সে কথাই ভাবছি। কুঠিতে থাকলে আমাকে ব্যবসার সময় দিতেই হবে।এভাবে  বিশেষ পড়াশোনা সম্ভব নয় । তিনজন একত্রে থাকার মতো একটা মেস বাড়ি খুঁজে দেখ।'

' আচ্ছা, আমি দেখব।' 

' আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকব।' হেমচন্দ্র বলল,' ভালো হবে।' খুবই ভালো হবে। আমাদের কাজগুলি আগের চেয়েও অনেক শৃংখলাবদ্ধ ভাবে হতে পারবে।

' আমারও দৃঢ় বিশ্বাস,এই ত্র‍্যয়স্পর্শের ফলে আমাদের জোনাকী সাহিত্য সম্পদে উন্নত হয়ে উঠবে।'

হেমচন্দ্র এখনও হরিবিলাস আগরওয়ালার কুঠির একটি ঘরে বসবাস করে স্বপাক খায়। তাই কফি হাউসের চপ কাটলেট খেতে তার অসুবিধা হল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ' আমি বামুন হয়ে জাতির বিচার করছিনা যখন, গোঁসাই  হয়ে তুমি আর কতদিন জাতির বিচারটা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে বলতেই হেমচন্দ্র  এক কাপ চা এবং একটা ভেজিটেবল কাটলেট অনিচ্ছা  সত্ত্বেও খেল। তারপরে তারা জোনাকীর পরবর্তী সংখ্যার জন্য কোন কবির  কবিতা, কোন লেখকের প্রবন্ধ এবং গল্প নির্বাচন করবে ,অ.ভা.উ.সা সভার কার্যসূচি এবং কোন বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদকীয় লিখবে, পত্রিকাটির প্রচার, বিক্রির জন্য কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, কোন কোন সংস্থার বিজ্ঞাপন ছাপাবে ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করল।

ইতিমধ্যে বিকেল পার হয়ে গোধূলি নেমে এসেছে। কফি হাউসের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। কলেজ ইউনিভারসিটির ছাত্রের সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠ বাঙালি ভদ্রলোকরা এসে টেবিলে টেবিলে বসেছে। এদের অধিকাংশই কলকাতার যাত্রা থিয়েটার, সঙ্গীত কলা শিল্প এবং সাহিত্য জগতের মননশীল ব্যক্তি। চেয়ার টেনে নিয়ে বসে সহাস্যে কুশল বিনিময়ের পরেই আরম্ভ হল নিজের নিজের ক্ষেত্রের সৃজন কর্ম নিয়ে আলোচনা । চা অথবা কফির কাপ হাতে নেওয়া বাবুমশাইদের আলোচনা ক্রমান্বয়ে তাত্ত্বিক হয়ে উঠল। কফি হাউসের উত্তর পূব কোণে  টেবিলে বসেছে ছয়জনের একটি তরুণ দল । ন্যাশনাল পাবলিক হলে জাতীয় সমাজবাদী নেতা লালবাহাদুর ত্রিপাঠী তুলে ধরা বক্তব্য নিয়ে তাদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক আরম্ভ হল। সমাজবাদ সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ রাজশক্তিকে প্রতিরোধ করাই নয় একদিন এই রাজ শক্তির ধ্বংস আনবে বলে তারা তাদের বিশ্বাস ব্যক্ত করল। ত্রিমূর্তির পাশের টেবিলে বসা বাবুমশাইরা সাম্প্রতিক কলকাতার ইংরেজ বিরোধী ঘটনা একটির প্রাসঙ্গিকতার ব্যাখ্যা করে ফ্রান্সের রাজদ্রোহের একটি ঘটনার সঙ্গে তার তুলনা করল। এদিকে লক্ষ্মীনাথ কাছের একটি টেবিলে বসা চারজন যুবক তাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম প্রণয় নিয়েও আলোচনায় মগ্ন  হয়ে পড়েছে… সবকিছু মিলিয়ে কফি হাউসের সান্ধ্যকালীন পরিবেশটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

কলকাতার এই কফি হাউস গুলি মূলত রেস্তোরাঁ। কফি বা চা খেতে এসে এক একটি টেবিল দখল করে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতে থাকাটা হাউসের মালিকের কাছে চূড়ান্ত অব্যবসায়িক। কিন্তু তার জন্য মালিকের তরফ থেকে কোনো বাধা-নিষেধ নেই। শিক্ষা সংস্কৃতি সচেতন মালিকরাও যেন বুঝতে পারে, এই কফি হাউস গুলি হল কলকাতার বৌদ্ধিক প্রাণকেন্দ্র, এখানে এসে প্রত্যেককেই প্রত্যেকের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের নিজের প্রাণের বিস্তার করে, প্রাত্যহিক কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি অবসাদ কাটিয়ে জীবনের গতিশীলতা বাড়ায়।

  বিল দিয়ে কফি হাউস থেকে ট্রিনিটি বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল। এমন সময় ফিনফিনে ধুতি পরা দুজন বাঙালি যুবক তাদের দিকে এগিয়ে এল। তাদের পরনের পাঞ্জাবী গিলে করানো। ধুতির এক প্রান্ত বা পকেটে ভরিয়ে নেওয়া। বুকের বোতাম গুলি সোনার। পায়ে বাদামী রঙের হালকা চপ্পল ।

' তুমিই সেই লক্ষ্মীনাথ! 'লম্বা যুবকটি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল।

লক্ষ্মীনাথ কিছু বলার আগেই বেঁটে যুবকটি বলল,' সেই যে গো  তুমি যখন রিপন কলেজের ছাত্র,আজ থেকে প্রায় দু বছর আগের কথা। তোমার সঙ্গে আমাদের দেখা হল । সেই ক্ষনিকের দেখা, মনে পড়ে?' 

মুচকি হেসে লক্ষ্মীনাথ বলল,' হ্যাঁ, মনে পড়েছে।'

' এসো ভাই, এসো– তোমার সঙ্গে কথা আছে।'

কফি হাউস থেকে বেরিয়ে আসা হল না। বাঙালি যুবক দুজন এক রকম হাতে ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে তাদের পাশেই খালি হওয়া টেবিলের চার পাশের চেয়ারে বসাল । আগেরবার তারা লক্ষ্মীনাথের নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করেছিল। এবার তারা নিজেরাই নিজেদের পরিচয় দিল। তারা হল জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সন্তান, সুধীন্দ্রনাথ এবং বলেন্দ্রনাথ।

ইতিমধ্যে লক্ষ্মীনাথ ঠাকুরবাড়ির বিষয়ে আরও কিছু জানতে পেরেছে। ঠাকুরবাড়ির জমিদার প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম ধর্মের প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায়ের বিশিষ্ট বন্ধু ছিলেন। সেই যুগে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংরেজ এবং ফরাসিদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাহাজের ব্যবসা করে প্রচুর ধন উপার্জন করেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাচ্য-পাশ্চাত্য উভয় ক্ষেত্রে পন্ডিত এবং উদার ব্রাহ্ম। দেবেন্দ্রনাথ নারী শিক্ষা প্রচলনের জন্য অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এদিকে মহর্ষির পুত্র কন‍্যারাও এক একটি রত্ন। নিজের নিজের পেশায় থেকেও ত়াঁরা সাহিত্য-সংস্কৃতির সেবক। মহর্ষির ত্রয়োদশ সন্তান রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রশংসিত কবি। এমনিতে লক্ষ্মীনাথ মাইকেল মধুসূদনের ভক্ত। কিন্তু সে রবিবাবুর কবিতাও পড়ে। রবিবাবুর কবিতাগুলির সৌন্দর্যবোধ এবং মানবীয় ভাব- অনুভূতি তাকে মোহিত করে।

'সেদিন আমাদের বাড়িতে অনুষ্ঠিত  প্রার্থনা সভায় রায়বাহাদুর গুণাভিরাম বরুয়ার পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী এসেছিলেন। সঙ্গে এসেছিল ওদের কন্যা বেথুন কলেজের ছাত্রী স্বর্ণলতা।' সুধীন্দ্রনাথ বলল, 'স্বর্ণলতার যেমন রূপ তেমনই তার অমায়িক কথাবার্তা। অত্যন্ত ভদ্র, এই বয়সেই  মেয়েটি বেশ সপ্রতিভ! প্রার্থনা সভার শেষে জলযোগের সময় তাদের সঙ্গে কথা হল। তখন তোমার কথা উঠল। তা ভাই, তুমি বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর আত্মীয়। ওর মুখেই শুনলাম, তোমারও সাহিত্যে রুচি রয়েছে। লেখালিখি কর। কী একটা সাহিত্য পত্রিকাও বের করছ।'

লক্ষ্মীনাথ  বিনয়ের সঙ্গে হেসে বলল,' এই একটু-আধটু চেষ্টা করছি আর কী।'

তারপরে সে সংক্ষেপে জোনাকী পত্রিকা বের করার বিষয়ে বলল। তাঁর সঙ্গে চন্দ্রকুমারও পত্রিকাটির  বিষয়ে কিছু কথা জানাল। ক়াঁধে নেওয়া কাপড়ের ব‍্যাগ থেকে জোনাকীর সংখ্যা বের করে বলেন্দ্রনাথের হাতে দিল। আগ্রহের সঙ্গে পত্রিকাটা নিয়ে তা উল্টে দেখে বলেন্দ্রনাথ বলল, 'এটাতো 'আসামি' ভাষায় লেখা। আমরা যে 'আসামি' ভাষা জানিনা।'

' না জানলেও বুঝতে পারবেন।' চন্দ্রকুমার বলল,' অসমিয়া -বাংলা এই ভাষা দুটির প্রায় ৭০ শতাংশ শব্দ কমন, লিপিও প্রায় একই।'

' ঐ কেবল তোমরা 'ব'য়ের পেট কেটে 'র' লেখ, আর আমরা 'ব'য়ের নিচে শূন্য বসিয়ে 'র' লিখি। 'র' লেখার  থেকে 'ব'য়ের পেট কেটে দেওয়া ভালো। কলমের একটানেই 'র' লেখার কাজটা হয়ে যায়।

কথাটা বলে বলেন্দ্রনাথ হা হা হেসে উঠল।বাকিরাও সেই হাসিতে যোগ দিল।

বলেন্দ্রনাথ জোনাকী পত্রিকার পাতা উল্টে দেখছে। দেখতে দেখতে তার কপালে ভাঁজ পড়ল।

' কলকাতায় পড়াশোনা করতে এসে সাহিত্য চর্চা–। সে বলল, এভাবে'আসামী' সাহিত্যের কতটুকু কী হবে, বলতো?'

' হবে। নিশ্চয় হবে।' সুধীন্দ্রনাথ বলল,' কলকাতায় থেকেও যে ওরা ওদের মাতৃভাষার সেবা করছে, এটা কী কম কথা! তুমি যাই বল, ওদের এই উদ্যমকে প্রশংসা করতেই হবে। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ, তোমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা কী, বলতো?'

লক্ষ্মীনাথ কী বলবে বুঝতে পারল না। সে প্রথমে চন্দ্রকুমার তারপরে হেমচন্দ্রের দিকে তাকাল। তারাও বেকায়দায় পড়ল।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কারও কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে সুধীন্দ্রনাথ নিজেই বলতে লাগল। সে বলল যে রাজা রামমোহনের সময়  থেকেই ভারতবর্ষে একটি জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। রামমোহনকে অনুসরণ করে ভারতবর্ষের  প্রতিটি প্রান্তের শিক্ষিত মহল এই জাগরণকে স্বাগতম জানিয়েছে । তারপরে তারা এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়ে সংস্কার মুলক সাংস্কৃতিক কর্মের মাধ্যমে নিজের নিজের জাতিকে জাগ্রত করে তুলেছে। তাছাড়া শিক্ষিত এবং বৌদ্ধিক দিকে উন্নতরা বৌদ্ধিক ঔৎসুক‍্য নিয়ে মানব জীবনের রহস্য অনুসন্ধান করতে শুরু করেছে। তার জন্য ভারতবর্ষে উদারবাদী মানবীয়তার বাতাস বইছে। এক কথায় বলতে গেলে বর্তমান ভারতবর্ষেও একটি রোমান্টিক চেতনা এসেছে । এটা ভারতবর্ষের কাছে আশার কথা। যুগের যে ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে শুধু প্রাচ্য নিয়ে যে জীবন চলবেনা – এটা দেশের সচেতন শ্রেণি উপলব্ধি করতে পারছে । কিন্ত এই রোমান্টিক চেতনার সঙ্গে বিচারহীন অন্ধ অনুকরণও অসংস্কৃত উপাদান কিছু ঢুকে পড়তে দেখা যাচ্ছে । এই সমস্ত পরিহার করে ভারতবর্ষের বিশাল বৈচিত্র্যময় জনজীবনের শাশ্বত সরলতাকে সাহিত্য এবং শিল্পকলায় রূপ দিতে হবে ।’

বয়সে সে লক্ষ্মীনাথের চেয়ে তিন চার বছরের বড়। এই বয়সে অভিজ্ঞতায় জ্ঞানে নিজেকে এতটা সমৃদ্ধ করে তুলেছে। এটা নিশ্চয় তাদের পারিবারিক পরিবেশ থেকে লাভ করা শিক্ষা। সুধীন্দ্রনাথের কথাগুলি লক্ষ্মীনাথের মন  স্পর্শ করে গেল। চন্দ্রকুমার হেমচন্দ্র তার দিকে তাকিয়ে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ল।

' সুযোগ পেয়ে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে ফেললুম। একটা নিঃশ্বাস ফেলে সুধীন্দ্রনাথ বলল,' ও হ্যাঁ, তোমরা এমন সুন্দর বাংলা বল, ইচ্ছা হলে তোমরা বাংলাতেও  লিখতে পার। কবিতা গল্প প্রবন্ধ লিখে আমাদের 'ভারতী'পত্রিকার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিও। ছাপিয়ে দেওয়া যাবে।' 

' আচ্ছা, চেষ্টা করব। এখন আমরা আসি।'

' এসো। আবার দেখা হবে।'

























কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...