চলো পাল্টাই

চলো পাল্টাই
চিন্তন। মন্থন। চিরন্তন।

সোমবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২২

হে আমার স্বদেশ- ২৩ সন্তোষ কুমার কর্মকার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস

হে আমার স্বদেশ- ২৩

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস







  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(২৩)

একত্রিশ জন ভক্তের উপস্থিতিতে নাম-প্রসঙ্গ সমাপ্ত হওয়ার পরে অদ্ভুত এক প্রসন্নতায় লক্ষ্মীনাথের মনটা ভরে উঠল।ভক্তদের চারজনের বাইরে প্রত্যেকেই অসম থেকে কলকাতায় পড়তে আসা ছাত্র। ছাত্ররাই উৎসাহ এবং অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আগের দিন ভিজিয়ে রাখা বুট-মুগ ধুয়ে, নারকেল-কলা কেটে, আঁখের খোসা ছাড়িয়ে আপেল-শসা কেটে, আদা-নুন মেখে প্রসাদ তৈরি করল। সুন্দর গামছা দিয়ে ঢাকা ভাগবতটা রাখা আসনের সামনে প্রসাদের থালা নিবেদন করল। নাম-প্রসঙ্গের পরে সুরভিকে কোলে নিয়ে বসা প্রজ্ঞা এবং লক্ষ্মীনাথ নাম গান করা ভক্তদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিল। তারপরে ছাত্র ভক্তরা কলাপাতায় ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করল। কিছুক্ষণ পরে চিড়া দই এবং মিষ্টি সহযোগে জলখাবার খেয়ে সন্তোষিত মনে প্রত্যেকেই বিদায় নিল।

সবাইকে বিদায় দিয়ে লক্ষ্মীনাথ বিছানায় এল। আর বিছানায় পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর নিদ্রায় ডুবে গেল।তাঁর মুখে ফুটে উঠা ক্লান্তি লক্ষ্য করে প্রজ্ঞা ডাকল না। একনাগরে পাঁচ ঘন্টা ঘুমোনোর পরে লক্ষ্মীনাথের ঘুম হালকা হয়ে এল এবং সে স্বপ্ন দেখতে লাগল।

স্বপ্নের মধ্যে লক্ষ্মীনাথ লক্ষ্মীমপুরে অতিবাহিত করা শৈশবের দিনগুলিতে ফিরে গেল ।

দীননাথ বেজবরুয়া তখন ইংরেজ সরকারের মুন্সেফ।তাঁর আহ্বানে কমলাবারী সত্রের ভক্তরা বাড়িতে এসে জরাসন্ধ বধ অভিনয় করল। সেই অভিনয় দেখে আট বছরের লক্ষ্মীনাথের কী যে আনন্দ হয়েছিল। অভিনয়ের পরের দিন থেকে অভিনেতার সংলাপ গুলি সময়ে অসময়ে নানা স্থানে আউরে বেড়াত। লক্ষীনাথ এবং তাঁর দাদা শ্রীনাথ কলা পাতার মধ্যসিরা দিয়ে তৈরি গদা দিয়ে বাড়ির উঠোনে বীরত্বব‍্যঞ্জক সংলাপ উচ্চারণ করে পরম বিক্রমের যুদ্ধ করত। এই গদা দিয়ে ধুপ ধুপ করে পিটিয়ে গদা দুটি জরাজীর্ণ করে ফেলত। এখন লক্ষ্মীনাথ স্বপ্নে সেই দৃশ্যই দেখছে। স্বপ্নে শ্রীনাথ জরাসন্ধ, লক্ষ্মীনাথ ভীম।যুদ্ধে ভীমের আঘাতে জরাসন্ধের মৃত্যু হওয়ার কথা, অথচ অনেকক্ষণ যুদ্ধ করার পরেও শ্রীনাথ মৃত্যুবরণ করার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। কারণ, মৃত্যুবরণ করা মানেই গদাযুদ্ধের সমাপ্তি। শ্রীনাথের আরও কিছুক্ষণ এভাবে খেলার ইচ্ছা। গদা যুদ্ধ করে করে বালক লক্ষ্মীনাথ ক্লান্ত হয়ে পড়ল। শেষে উপায় না পেয়ে হাতের গদাটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে লক্ষ্মীনাথ চিৎকার করে উঠল, 'দাদা তুমি এখন মরার কথা। তুমি মরছ না কেন?'

তখনই লক্ষ্মীনাথ জেগে উঠল। চোখ মেলে হাসতে লাগল। এদিকে সুরভি জেগে যাবার ফলে তার কাছে গিয়ে প্রজ্ঞা তাকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে।

'কী হল?' কপাল কুঁচকে প্রজ্ঞা জিজ্ঞেস করল, ঘুম থেকে উঠে এভাবে হাসছ! স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি?'

' হ্যাঁ, পরি। বড়ো মজার স্বপ্ন।'

'কী স্বপ্ন, শুনি?'

' বেঙ্গলে যেমন যাত্রাপালা হয়, আমাদের অসমে তেমনই ভাওনা হয়। ভাওনা দেখার পরদিন থেকে প্রায় এক-দেড় মাস শ্রীনাথ দাদার সঙ্গে আমি সেই যাত্রার পাত্রদের সংলাপ আউরে দুই ভাই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম । সেটাই আজ স্বপ্ন দেখলাম। শৈশবের ওইসব ঘটনা সত্যিই বড় মজার, বুঝেছ।'

' যাই বল বাপু, কাল নামকীর্তনের সময় তোমাকে কিন্তু আমি অন্যরকম দেখলাম।'

' অন্যরকম দেখলে! কী অন্যরকম দেখলে?'

'ঐ যে নাম- কীর্তন চলছিল, হঠাৎ রোগা চেহারার ছাত্রটির কাছ থেকে খোলটি নিয়ে তুমি নিজেই জোরে জোরে বাজাতে শুরু করলে। তার সঙ্গে সবাইকে ছাপিয়ে উদাত্ত সুরে পদ গাইতে শুরু করলে, তখন তোমার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক আবেগ, কেমন একটা দীপ্তি দেখতে পেলাম। তখনই তোমাকে অন্যরকম লাগল, কেমন যেন অচেনা হয়ে গেলে।'

লক্ষ্মীনাথ স্থির ভাবে পত্নীর উৎকণ্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরে বিছানা থেকে নেমে চিন্তিত ভাবে এগিয়ে এল। প্রজ্ঞার গায়ে গা লাগিয়ে বসে বলল,' দেখ পরি, আমাদের নাম-কীর্তনের পদগুলি বৈষ্ণব রসে শ্রীকৃষ্ণের লীলা কথার বর্ণনা। খুব সম্ভব সেই ভাবের রসটাই আমাকে তখন কিছুটা আবিষ্ট করে ফেলেছিল। তাই বলে আমি অন্যরকম হয়ে গিয়েছিলাম, এটা ঠিক নয়।তারপর তুমি বললে, আমি অচেনা হয়ে গেলাম, তোমার চোখে আমি অচেনা! না না– প্লিজ অমন করে বলবে না, ডার্লিং। তুমি যে আমার মনে, আমার প্রাণে, আমার সত্তায়।'

কাঠ জোগানের ঠিকাদারী কাজটা এরকম যে এক জায়গায় থেকে করা যায় না। কোন রাজ্যের কোন অঞ্চলে কী কী কাঠের জঙ্গল আছে, তার যেমন খবর রাখতে হয়, সেভাবে কখন কোন কোম্পানি অথবা রেল বিভাগ কোন জায়গায় নতুন করে রেললাইন পাতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রেললাইন কর্মের সঙ্গে রেলের কোন কোন অফিসার অথবা ইঞ্জিনিয়ার জড়িত হয়ে রয়েছে– সেই সমস্ত খবর নিতে হয়। খবর নিয়ে তৎকালে সেই কোম্পানির কর্মকর্তা অথবা বিভাগীয় ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলতে হয় এবং কী ধরনের উপঢৌকন দিয়ে তাদের বশ করতে হয়, তারও পরিকল্পনা করতে হয়।

অবশ্য বি ব্রাদার্স কোম্পানির জন্য সুখের কথা এটাই যে অভিজ্ঞ ভোলানাথ সেই সব তৎপরতার সঙ্গে সম্পাদন করে। তার জন্য খবর পাওয়া মাত্র তিনি আসানসোল, সমস্তিপুর, সম্বলপুর, বিলাসপুর, চক্রধরপুর, গাংপুর, নাগপুর, ঝাড়চোগড়া ইত্যাদি জায়গায় যান। আলাদা আলাদা জায়গায় আলাদা পরিস্থিতিতে থাকা- খাওয়াটা প্রায়ই অসুবিধাজনক। তাছাড়া কী শীত কী গ্ৰীষ্মে গভীর রাতে রেল অথবা রোদ-বৃষ্টিতে বাসে ভ্রমণ করাটা কষ্টদায়ক। কিন্তু ভোলানাথের ক্লান্তি নেই। লক্ষ্যে স্থির থেকে সে উদ্দেশ্যে সফল হবেই। তার জন্যই ব্যবসায়িক কথায় লক্ষ্মীনাথের কোনো শিথিলতা বা ভুল করা দেখলে তিনি সতর্ক করে দেন।

কাঠের ব্যবসায় কলকাতায় ভোলানাথ অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট হবে বলে জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে। তা বলে ব্যক্তি হিসেবে ভোলানাথ একেবারে নীরস-নিরীহ নয়। ব্যবসার জন্য ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গে তিনি দেশ ভ্রমণের আনন্দ ও উপভোগ করেন।গত কয়েক মাস ব্যবসায়ের কাজে খুবই ব্যস্ত থাকলেন। তার মধ্যে ভেতরে ভেতরে কিছু পরিমাণে ক্লান্ত ভোলানাথ নিজেই লক্ষ্মীনাথকে দার্জিলিং ভ্রমণের কথা বলল। এমনিতেই মে মাসে কলকাতায় উৎকট গরম। গায়ে জ্বালাধরা এই গরমে কিছুদিন দার্জিলিঙে থাকতে পারলে সত্যিই ভালো লাগবে। তবে এখন ব্যবসার যে ধরনের বিস্তৃতি, যাব বললেই যাওয়া যায় না। পাওনাদারদের টাকা দেওয়া, সাব-কন্টাকটারদের কাজের ধরন বুঝিয়ে দেওয়ার সঙ্গে অগ্রিম ধন দেওয়া, সুরভি এবং প্রজ্ঞাকে জোড়াসাঁকোয় রেখে আসা ইত্যাদি করতে দুদিন পার হয়ে গেল। তারপরে দারোয়ান এবং চাকর-বাকরদের ওপরে বাড়ি দেখাশোনা করার দায়িত্ব সমঝে দিয়ে ভোলানাথের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ দার্জিলিঙের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল।

১৮৯৭ সনের মে মাসের ১৭ তারিখ। দার্জিলিঙে আসার সময় ব্রিটিশরা ভারতের শৈল শহর গড়ে তোলার কথাটা ভেবে লক্ষ্মীনাথ অবাক হয়ে গেল। শীত প্রধান ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের শাসনভার নিয়ে কেবল কলকাতা মাদ্রাজ মুম্বাই মহানগর গড়ে তোলেনি, দেশের কত কত প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদের ভান্ডার আছে সেই সব খুঁজে বের করেছে। এইসব আনা-নেওয়ার জন্য রেললাইন নির্মাণ করে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি করেছে। ভারতবাসীকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। শাসন কার্যের সঙ্গে এই দেশের স্বাস্থ্যকর এবং অপেক্ষাকৃত শীত প্রধান স্থান খুঁজে বের করে দার্জিলিং ,শিলং, শিমলার মতো শৈল শহর গড়ে তুলেছে। লক্ষ্মীনাথ এটাও ভাবল যে ব্রিটিশ শাসনভার না নিলে এই দেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-দর্শনের দরজা উন্মোচিত হত না। দার্জিলিঙের মতো শৈল শহরও গড়ে উঠত না। কোনো কোনো অঞ্চলের বিকাশের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করার জন্য(অসমে একটি কলেজ স্থাপন করা নিয়ে এখনও টালবাহনা করছে।) ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তারও ক্ষোভ প্রকাশ পায়। তবু সে মনে মনে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের পোশকতা করে। তার জন্যই লক্ষ্মীনাথ সাম্প্রতিককালে জাতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশ শাসনকে 'বিদেশীর শাসন' এবং বঙ্গ- পঞ্জাব- মহারাষ্ট্র আদি রাজ্যে উগ্রপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনকে উৎখাত করার জন্য চালানো কার্যকলাপ সমর্থন করে না।

বিশাল হিমালয়ের একটি অংশে গড়ে উঠা শৈলশহর দার্জিলিঙের নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু… চারপাশে অপূর্ব শ্যামলিমা মাথার উপর দিয়ে বেশি বেড়ানো হালকা মেঘ, কিছুক্ষণ পরে পরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পাতলা হালকা এক ঝাঁক বৃষ্টির পরেই পুনরায় ঝলমলে রোদ… দর্জিলিং এসে লক্ষ্মীনাথের সত্যিই ভালো লাগল। পরে প্রজ্ঞার অনুপস্থিতিটা অনুভব করল। প্রিয়তমা প্রজ্ঞা সঙ্গে থাকলে বিশ্বপ্রকৃতির অনুপম এই দৃশ্য গুলি তার কাছে আরও বেশি উপভোগ্য হত।

ভোলানাথ বহু জায়গা ঘুরে বেড়ানো অভিজ্ঞ মানুষ। তিনি লক্ষ্মীনাথকে দার্জিলিঙের বিখ্যাত লুই জুবিলী সেনেটারিয়ামে নিয়ে এল। দুপাশে অনুচ্চ সবুজ পাহাড়ের মধ্যে অভিজাত হোটেল।তাঁরা প্রতিদিন ছয়টাকা ভাড়ায় হোটেলের প্রথম শ্রেণির আবাসী হল। হোটেলের ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ভোলানাথ বেরিয়ে গেল। সামনের বেলকনি দিয়ে ঘুরে পুনরায় রুমে এসে বলল,'শোন বেজ, প্রফেসর বোস এসেছেন।'

' প্রফেসর বোস!'

'সায়েন্টিস্ট জগদীশচন্দ্র বোস। দুদিন আগে থেকেই তিনি এই হোটেলে আছেন।'

অবশ্য আগে থেকে বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের যোগাযোগ রয়েছে। বিজ্ঞান সাধক প্রফেসর বসু নিরহংকারী, সদালাপী এবং অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা হল চেতনা বোধের জগতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন দিক উন্মোচন । কথা বলতে শুরু করলে কীভাবে যে সময় পার হয়ে যায়, বলতেই পারিনা। এবারও তার সঙ্গে কথাবার্তা হবে বলে ভেবে লক্ষ্মীনাথের ভালো লাগল।

অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের যোগাযোগ হয়েছিল বিশেষ একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে।

১৮৯৪ সনে রায় বাহাদুর গুনাভিরাম বরুয়ার মৃত্যুর পরে শ্রীবরুয়ার বিষয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কে,তা নিয়ে বিবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। দ্বিতীয়া পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া কমলাভিরাম, করুণাভিরাম, স্বর্ণলতা এবং জ্ঞানদাভিরাম (কমলা-করুণা তখন প্রয়াত)।বিয়ে হয়েছিল যদিও স্বর্ণলতার স্বামী ডঃ নন্দকুমার রায়ের অকাল মৃত্যু হয়েছিল।তাই স্বর্ণলতা-জ্ঞানদাভিরামের কোনো অভিভাবক ছিল না। এদিকে গুনাভিরাম কোনো উইল করে যাননি। রায় বাহাদুরের বংশের একজন গণ‍্য-মান্য মানুষ ( রাধাকান্ত বরুয়া) আদালতে মামলা করে প্রমাণ করতে চেষ্টা করলেন যে প্রথমা পত্নীর মৃত্যুর পরে শ্রীবরুয়া বিধবা বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিয়ে করাটা আইনসিদ্ধ নয় । কলকাতা হাইকোর্টের উকিল বাবু দুর্গামোহন দাস ছিলেন গুণাভিরামের পারিবারিক বন্ধু। বিপদের কথা শুনে তিনি এগিয়ে এলেন। দুর্গামোহন বাবু আশ্বাস দিয়ে বললেন যে তিনি স্বর্ণালতাদের এস্টেটের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করে দেবেন। তার জন্য দুজন সাক্ষীর আবশ্যক। তখন তিনি নিজে একজন সাক্ষী হয়েছিলেন এবং অন্য একজন সাক্ষী ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। দুর্গামোহন বাবু মৃত্যু পর্যন্ত গুনাভিরাম বরুয়ার বিষয় সম্পত্তি সুন্দরভাবে দেখাশুনা করলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে ইউরোপ থেকে রাধাকান্ত বরুয়া এসে পুনরায় গুনাভিরামের বিষয় সম্পত্তি হস্তগত করার চেষ্টা চালালেন। এদিকে জ্ঞানদাভিরাম তখন বিলেত গিয়েছিলেন এবং বিলেতে পড়াশোনার জন্য জগদীশচন্দ্র বসু কেমব্রিজ অথবা অক্সফোর্ডে পড়ার জন্য বন্দোবস্ত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কথায় সেটা কার্যত হয়ে ওঠেনি। তারপরে স্বদেশে ফিরে এসে স্বর্ণলতার কাছ থেকে লক্ষ্মীনাথের বিষয়ে শুনে জগদীশচন্দ্র তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন। তখনই জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের পরিচয় এবং আলোচনা। আলোচনার পরে জগদীশচন্দ্র স্বর্ণলতা এবং জ্ঞানদাভিরামের অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য লক্ষ্মীনাথকে অনুরোধ জানালেন।

তারপরেও জগদীশ চন্দ্রের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। বয়সে লক্ষ্মীনাথের চেয়ে প্রায় সাত বছরের বড়ো জগদীশচন্দ্র কলিকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে তাঁর মৌলিক গবেষণা পত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে।'দ‍্য ইলেকট্রিশিয়ান' পত্রিকায় তাঁর গবেষণা পত্র প্রকাশ পেয়েছে। গবেষণা চালিয়ে যাবার জন্য লন্ডনের রয়েল সোসাইটি তাকে অর্থসাহায‍্য দিয়েছেন এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি (বিজ্ঞানাচার্য) উপাধিতে ভূষিত করেছেন । ১৮৯৬ সনে ভারত সরকারের অর্থ সাহায্যে ইউরোপের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বিজ্ঞান বিষয়ে মত বিনিময়ের জন্য তিনি সস্ত্রীক বিলেতে গিয়েছিলেন।

এত প্রতিভা, প্রতিভার গুনে এত খ্যাতি, দেশ-বিদেশের বিদ্বৎ মহলে তাঁর এত সম্মান ! কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমবয়সী এই বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র কথাবার্তায় সাধারণ, তেমনই আন্তরিক।

লুই জুবিলী স্যানেটোরিয়াম হোটেলের সামনের বিশাল ব্যালকনিতে বসে অধ্যাপক বসু বিজ্ঞানের একটি পত্রিকা পড়ছেন। নিজের রুম থেকে লক্ষ্মীনাথ তার সামনে গিয়ে সবিনয়ে নমস্কার জানাল। পত্রিকা থেকে মাথা তুলে দেখে চিনতে পেরে অধ্যাপক বসু সহাস্যে বললেন,' হ্যালো মিস্টার বেজবরুয়া , হাউ লাকি আই এম দ্যাট আই মিট ইউ হেয়ার। হাউ ইউ ডু ?'

' ফাইন স্যার, আপনি?'

' এই চলছে আর কি।হিয়ার, এনি বিজনেস অর ট‍্যুর?'

' কলকাতার উৎকট গরমে অতিষ্ঠ হয়ে কয়েকদিনের জন্য এই পাহাড়ে ছুটে এলাম।'

' হ্যাঁ, এই সময়ে কলকাতার অনেকেই এভাবে এই দার্জিলিঙে এসে থাকে। প্লিজ বী সিটেড।'

লক্ষ্মীনাথ জগদীশচন্দ্রের বাঁ পাশে একটা আরাম চেয়ারে বসল। সামনের দিকে কিছুটা মুক্ত জায়গা। তারপরেই পাহাড় । অনুচ্চ পাহাড়ের ওপাশে নীল আকাশ। সবুজ পাহাড়ের গায়ে ছোটো ছোটো কাঠের ঘর- দরজা। এখন বৃষ্টি হচ্ছে না। ঘর- দুয়ার গাছ-পালার ওপরে সকালের সূর্যের কোমল কিরণ।

স্বাভাবিকভাবেই দুজনে স্বর্ণলতা এবং জ্ঞানদাভিরামের কথা বলতে শুরু করলেন। শোক-দুঃখ প্রকাশ করে জগদীশচন্দ্র বললেন যে বিধাতার কীরকম অভিশাপ যে একই পরিবারের প্রথমে স্বর্ণলতার স্বামী নন্দকুমার রায়, গুনাভিরামের পত্নী বিষ্ণুপ্রিয়া, গুণাভিরাম নিজে এবং শেষে কমলাভিরামকে অকালে এই সংসার ছেড়ে যেতে হল। অথচ এই পরিবারটি সব দিক দিয়ে পরিপূর্ণ এবং শিক্ষা দীক্ষায় কলকাতার অভিজাতদের অন্যতম হয়ে উঠেছিল। গুনাভিরাম অসমিয়া হয়েও তাঁর উদার মানবীয় চেতনায় কলকাতার অভিজাত বাঙালি সমাজে শ্রদ্ধা-সমীহের পাত্র হয়ে উঠেছিলেন।

লক্ষ্মীনাথ জানাল যে অসীম ধৈর্য এবং সহনশীলা হওয়ার জন্যই বৈধব্যের যন্ত্রণা নিয়েও স্বর্ণলতা এই চরম দুর্যোগের সময়ে সুস্থির থাকতে পেরেছে। স্বর্ণলতার পুনর্বিবাহের জন্য চেষ্টা চালানো হয়েছে । জগদীশচন্দ্র আশা ব্যক্ত করলেন যে বিধবা হলেও সুন্দরী, শিক্ষিতা, নারীর সমস্ত গুণে গুণবতী স্বর্ণলতার পুনর্বিবাহ হবে এবং মেধাবী জ্ঞানদাভিরামও সাফল্যের সঙ্গে ব্যারিস্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিলাত থেকে ফিরে আসবে।

'মিস্টার বেজবরুয়া আপনি তো ঠাকুরবাড়ির স্নেহের জামাই।' মুচকি হেসে জগদীশচন্দ্র বললেন,' এদিকে শুনলাম আপনিও সাহিত্য চর্চা করেন। রবিবাবুর সঙ্গে আপনার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয়?'

'হয়। তবে খুব কম।'

'ওঁর লেখা পদ‍্য পড়েন?'

' সম্পর্কে তিনি আমার কাকা শ্বশুর। না পড়ে কি উপায় আছে বলুন? গিন্নি যেমন রবি কাকার ভক্ত, তিনি কখন কী লিখলেন– সেই নিয়ে আলোচনা আরম্ভ হলে আমি যদি কিছু না বলি তাহলে জামাই হিসেবে আমার যে মান- মর্যাদা থাকে না।'

লক্ষ্মীনাথ যেভাবে রস লাগিয়ে বলল, জগদীশচন্দ্র হেসে ফেললেন।

' এমনিতেও পড়ি। ভালো লাগে। রবি কাকার পদ‍্য মানেই তো চিন্তা-চেতনার জগতের এক একটি দুয়ার উন্মোচন।'

' ঠিক বলেছেন। উপনিষদের রসে আপ্লুত পদ‍্য,গান–ওঁর পদ্য-গানগুলি আমাদের আত্মার কথা বলে।'

' স্যার, আপনার 'ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে' লেখাটা পড়ার আমার সৌভাগ্য হয়েছে।' লক্ষ্মীনাথ বলল,' আপনার ভাষাও খুব সুন্দর। বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের এমন সুন্দর মিশ্রণ আমি আগে কখনও পড়িনি।'

' ওই ভাগিরথী নদীর কথা ভাবতে ভাবতে মনের মধ্যে ভাব এল, লিখলাম আর কি। আর ও লিখতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সময়ের বড়ো অভাব।'

' স্যার ইউ হেভ জাস্ট রিটার্নড ফ্রম ইংল্যান্ড শোয়িং ইউর ডিসকভারি ইন দ‍্য ব্রিটিশ সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন, লিভারপুল।'

লক্ষ্মীনাথ বলল,' উইল ইউ প্লিজ শেয়ার উইথ মি সামথিং এবাউট ইওর ভেলুয়েবল এক্সপেরিয়েন্স?'

' আন কম্পায়েয়ারয়েবল এক্সপেরিয়েন্স। সত্যিই কোনো তুলনা হয় না মিঃ বেজবরুয়া। এণ্ড একচুয়েলি ,স্টেয়িং হিয়ার অর বিয়িং এ প্রফেসর অফ প্রেসিডেন্সি কলেজ অফ ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি– ইউ উইল নট বী এবল টু ইমাজিন হাউ মাচ ডেভেলপ এন্ড এনরিচড ইজ দ্যা সাইন্টিফিক এনভাইরনমেন্ট হোয়াট দ‍্য প্রফেসরস দেয়ার ডুয়িং এন্ড হাউ দে আর থিংকিং!'

' অবশ্য কলকাতায় আপনার সঙ্গে প্রায় সমান্তরালভাবে পিসি রায় স‍্যারও রসায়নে ভালো কাজ করছেন।'

' হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। মারকিউরিয়াস অক্সাইড আবিষ্কার করার পর প্রফুল্ল চন্দ্র রায়তো এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রসায়নবিদ। এখন বিদেশে ওঁকে 'মাস্টার অফ নাইট্রেটস' বলে।তাছাড়া প্রফুল্লচন্দ্রের লেখা ' হিন্দু রসায়ন শাস্ত্রের ইতিহাস' একটি মূল্যবান গ্রন্থ।'

তাছাড়া রায় স্যার' বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল' স্থাপন করেছেন।'

' এটা সত্যিই একটা বড়ো ব্যাপার। কলেজ- ইউনিভার্সিটির ক্লাস ল্যাবরেটরীতে শুধু থিওরি নিয়ে ব্যস্ত না থেকে প্র‍্যাকটিকেল ফিল্ডে রসায়নের এপ্লিকেশনের জন্য যে ওরকম একটা শিল্প সংস্থা গড়ে তুলেছেন, এতে দেশের আরও বেশি উপকার হবে। তাছাড়া প্রফুল্লচন্দ্র রায়, কেমন জাতীয়তাবাদী পুরুষ সেটাও নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন। নিজের সমস্ত উপার্জন উদারভাবে দেশ-জাতির জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। এদেশে এমন আত্মত্যাগী ব্যক্তি বিরল।'

তারপরে অধ্যাপক জগদীশ বসুর কণ্ঠস্বরটা বেদনা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল। সম্মানীয় বিজ্ঞানাচার্য সেরকম বেদনাভরা কণ্ঠেই ভারতীয় বিজ্ঞানের দৈন্য দশা, বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে ভারতবাসীর সচেতনহীনতার কথা বললেন। বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত না হওয়ার জন্যই যে ভারতের সমাজ থেকে সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ইত্যাদি অন্ধসংস্কার- কুসংস্কার এবং অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদের মতো কলঙ্ক থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না এসব কথাও বললেন।

অনেকক্ষণ শুনে লক্ষ্মীনাথ বলল,' স্যার এসব ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কার মূলক কাজ করেছেন।'

' সেসব এখনও অনেকটাই সরকারি আইন-কানুন হয়ে আছে,মিঃ বেজবরুয়া। গ্রাসরুটে বিশেষ কিছু হচ্ছে না।'

' তার জন্য কী করা যায়, বলুন তো?'

' এডুকেশন, এডুকেশন ইন অল লেভেলস। সর্বস্তরে শিক্ষা বিস্তার না হলে আমাদের জাতির মুক্তি নেই।'

তারপরেই জগদীশচন্দ্র কিছু সময় নীরব হয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে নিজেই নীরবতা ভেঙ্গে ধীরে ধীরে বললেন,' কিন্তু সেটাই বা কেমন করে সম্ভব? দেশটা যে বিদেশি ব্রিটিশের অধীন।'

' কিন্তু স্যার, এডুকেশনের জন্য সাহেবরা আমাদের দেশে স্কুল- কলেজ- ইউনিভার্সিটি স্থাপন করে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছে।'

' খুব সামান্য, প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।' তারপরে পুনরায় নীরব। জগদীশচন্দ্রের চিন্তিত মুখটাতে পুনরায় বিষন্নতার ছায়া,' আর ইংরেজ সরকার এতটা করবেই বা কেন, বলুন? ভারতবর্ষ তো আর ওদের জন্মভূমি নয়। তার মধ্যেও দু-চার জন যারা আমাদের এই ভারতের উন্নতি চান তারা দেশের বাস্তব চেহারাটা দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন দেড় হাজার বছরের কুপমুণ্ডকতাতো আছেই- তারপর দরিদ্র, অপুষ্টি, বেকারত্ব ইত্যাদি অর্থনৈতিক দৈন‍্যদশা–ইস, কী যে ভয়াবহ অবস্থা!মিঃবেজবরুয়া , ইউরোপে গিয়ে ওখানকার জনজীবন দেখে বুঝতে পারলাম আমরা কতটা পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের এই দেশটার যে কী হবে? কেমন করে উন্নতি হবে?কে দেশের উন্নতি করার দায়িত্ব নেবে?'

লক্ষ্মীনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক এদিকে তাকিয়ে কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল,স‍্যার, জাতীয় কংগ্রেস দেশবাসীর মনে যেভাবে জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলছে- ওরা তো দেশের উন্নতি চায়।'

' উন্নতি চাইলেই তো আর উন্নতি হবে না। কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শাসন ক্ষমতা লাগবে। শাসন ক্ষমতা না পেলে কিছুই করতে পারবে না।'

' ওদের লক্ষ্য তো স্বরাজ।'

' সে বহু দূরের কথা।'

' এদিকে বেঙ্গল, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাবের মেধাবী কিছু ছেলে বোমা বন্দুক দিয়ে সাহেবদের মেরে তাড়াবে বলে উঠে পড়ে লেগেছে।'

' ওসবের কোনো মানে নেই। ১৮৫৭ সনে ভারতবর্ষের প্রায় প্রত্যেকটি রাজ্যেই সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিল। ব্রিটিশ রাজশক্তি সেই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করেছিল। তারপরে তো ব্রিটিশ এদেশে আরও শক্তিশালী হয়েছে। এদিকে ইউরোপের বাইরে ভারত, চিন আমেরিকা আফ্রিকায় ওদের শাসন কায়েম হয়েছে। উগ্রবাদী যুবক কয়েকটি বন্দুক আর কিছু বোমা নিয়ে ব্রিটিশদের কিছু করতে পারবে না।'

লক্ষ্মীনাথ জগদীশচন্দ্রের এই কথায় খুব খুশি হল। কারণ ছাত্র জীবন থেকেই সে এই ধরনের উগ্রবাদী রাজনীতির সমর্থন করে না। তার মধ্যে আজকের আধুনিক মনন বীক্ষায় উন্নত বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী সেই বিষয়ে যেভাবে স্পষ্ট ভাষায় নিজের মনোভাব প্রকাশ করলেন, তাতে লক্ষ্মীনাথের সেই বিশ্বাসটা আরও দৃঢ়মূল হল।

' স্যার, আপনার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলে সত্যিই অনেক কিছু জানতে পারলাম। আপনি যদি আমার একটি ছোট্ট অনুরোধ রক্ষা করেন‐।'

'বলুন।'

চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' ইফ ইউ বি কাইন্ড এনাফ টু প্লিজ ডাইন উইথ আস টুডে এট নুন‐।'

' দ্যাট ইজ আই এম টু টেক লাঞ্চ!'

' প্লিজ স্যার ,ইট ইজ জাস্ট এ অনার টু ইউ।'

' ওয়েল। কিন্তু আমার সঙ্গে মিসেস এসেছেন।'

' তিনিও থাকবেন।' মুচকি হেসে লক্ষ্মীনাথ বলল,' এমনিতেও আপনি নিশ্চয় আমার সঙ্গে একমত হবেন যে ম্যাডাম লেডি অবলা বসু ছাড়া আপনি কমপ্লিট নন।'

জগদীশচন্দ্র হাসতে লাগলেন। দিলখোলা দরাজ হাসি। হাসতে হাসতেই বললেন,' রিয়েলি ইউ হ্যাভ এ গুড সেন্স অফ হিউমার!

দার্জিলিঙের নাগরিক সমাজ সেনেটারিয়াম হলে বিজ্ঞানাচার্যকে সংবর্ধনা জানাল। ইতিমধ্যে ভোলানাথের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ ঘোড়ায় উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘায় গিয়ে সূর্যোদয়ের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করল। ঘুম স্টেশনে যাওয়ার কথাও ভেবেছিল। কিন্তু বৃষ্টি পড়ে থাকার জন্য ঘুমে যাওয়া বাদ দিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক শিবনাথ শাস্ত্রী সেনেটারিয়াম হলে' 'ভারতবর্ষের অতীত-বর্তমান' শীর্ষক বিষয়টির উপরে এক মনোজ্ঞ বক্তব্য তুলে ধরলেন।তাঁর বক্তৃতায় ভারতীয় শাসকদের বীরগাথা, ধর্মীয় উদারতা, ভারতের আধ্যাত্মিকতাবাদী দর্শন এবং ভারতের গৌরবোজ্জ্বল প্রাচীন সাহিত্য- সংস্কৃতির কথা প্রকাশ পেল। পরবর্তীকালের রাজনৈতিক সংঘাত, ধর্মীয় অনাচার, সামাজিক কুসংস্কারের নানা অনাচার, নৈতিক পতন হতে হতে ভারতবাসীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেল, ভারতীয়রা ভারতমাতাকে রক্ষা করতে পারল না, ভারত বিদেশির পদানত হল। বিদেশি ব্রিটিশ আসার পরে ভারতীয়রা পশ্চিমের শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভারতবর্ষের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থাটা বুঝতে পারল। তবে এই বোধ-বিবেচনাটা কেবল একদল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতবাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে । দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে এখনও এই সচেতনতার সৃষ্টি হয়নি। শেষে অধ্যাপক শিবনাথ শাস্ত্রী স্বামী বিবেকানন্দের কথা উল্লেখ করে বললেন যে যতদিন পর্যন্ত দেশের সর্বসাধারণ লোক এবং যুবসমাজ সচেতন না হবে, ততদিন পর্যন্ত দেশের উন্নতির পথ প্রশস্ত হবে না।

বক্তৃতা শুনে থাকার সময় লক্ষ্মীনাথের মনটা বেদনাক্রান্ত হয়ে পড়ল। স্যানেটারিয়াম হল থেকে বেরিয়ে সে আর বাইরে বেরোলো না । ভোলানাথের সঙ্গে হোটেলের রুমে চলে এল।

' প্রফেসর শাস্ত্রী এনলাইটেনড লেকচার দিয়েছেন-।' ভোলানাথ বলল, অথচ তোমার মন খারাপ!'

'দাদা–।' ভোলানাথের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' সেদিন প্রফেসর বসুর সঙ্গেও অনেক কথা বললাম। আর কথাগুলি পশ্চিমে বিকশিত বিজ্ঞান প্রযুক্তির জ্ঞানে মননে সমৃদ্ধ। তাঁর সঙ্গে কথা বলার পরে আমার মেন্টাল ডাইমেনশন অনেকটা খুলে গেল। আজ যে প্রফেসর শাস্ত্রী লেকচার দিলেন, এসব কম বেশি জানি। কিন্তু প্রফেসর শাস্ত্রীর যুক্তিপূর্ণ কথাগুলিতে মাতৃভূমির প্রতি তার যে প্রবল অনুরাগ, দেশবাসীর প্রতি যে গভীর ভালোবাসা… এটা আমাকে অসমের কথা মনে করিয়ে দিল। কলকাতা, কলকাতার বাইরে এই দার্জিলিং অথবা অন্যত্র এইসব চলছে। পরাধীনতার নাগপাশ নিয়েও বেঙ্গলি একদল কয়েক শতকের অন্ধ সংস্কার- কুসংস্কারের গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকা দেশবাসীকে জাগানোর চেষ্টা করছে। এদিকে আমাদের অসমের অসমিয়া– ওরা আরও বেশি অশিক্ষিত, দেশ বিদেশের খবরাখবর না রেখে অচেতন হয়ে আছে। ওরা অলস, আফিম খেয়ে খেয়ে কর্ম বিমুখ নিষ্কর্মা হয়ে পড়েছে। ওরা কবে জেগে উঠবে?আমাদের অসমিয়াদের জাগাবার জন্য আমরা কী করেছি?'


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...