মঙ্গলবার, ৩০ মে, ২০২৩

পাখিদের পাড়া পড়শি- ১২ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pakhider Para Porshi

পাখিদের পাড়া পড়শি- ১২

পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider para porshi








দ্বিতীয় অধ্যায়, 


(বারো)

সাতাশ তারিখ প্রজাপতি বিষয়ক প্রকৃতি শিবিরটার পরিবর্তে পক্ষী বিষয়ক প্রকৃতি শিবিরের ব্যবস্থা করা হল। আঠাশ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে প্রজাপতি বিষয়ক প্রকৃতি শিবির। অর্থাৎ এবারের প্রকৃতি শিবির দুদিনের জন্য অনুষ্ঠিত হবে। একনাগাড়ে কাজগুলি সম্পন্ন করতে হবে। না হলে ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার সময় এসে যাবে। অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীদের অনুরোধের প্রতি উদয়শঙ্করকে গুরুত্ব দিতেই হবে। অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীরাই তার কাছে মূলধন ,সামাজিক পুঁজি।

শিবিরের ব্যস্ততার মধ্যেও উদয়শঙ্কর বকের আস্থানার আশেপাশে একবার হলেও পদার্পণ করছে। দিনে কিছুক্ষণের জন্য না গেলে সে মনের মধ্যে অনুভব করে অসহ্যকর যন্ত্রণা।

বকগুলি প্রজননের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। উদয়শংকর অতি মনোযোগের সঙ্গে ওদের লক্ষ্য করার সময় আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়েই থাকে। পুরুষ বকটি ঠোঁটের দুই অংশ দিয়ে টক টক শব্দ করে ধীরে ধীরে স্ত্রী বকটির কাছে হাজির হয়েছে। তারপর দীর্ঘ ঠোঁট দিয়ে গাছের একটি কোমল ডাল ভেঙে নিয়ে স্ত্রী বকটিকে অর্পণ করে প্রেম নিবেদন করছে, কোনো যুবক ছেলে একজন যুবতিকে প্রদান করা একটি গোলাপ ফুলের মতো। প্রজনন সক্ষম হওয়ার সামর্থ্য প্রদর্শন করে ধীরে ধীরে পুরুষ বকটির পায়ের সামনের ভাগ হলদে হয়ে পড়েছে । উদয়শঙ্করের জন্য দুঃখের বিষয় এটাই যে বক গুলির ডিম পাড়া পর্যন্ত ডিম থেকে বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত– এই সুদীর্ঘ  সময় সে ওদের সঙ্গে থাকতে পারবে না । থাকতে পারবে না পাখিদের পাড়া-প্রতিবেশীতে। পাড়ায় অত‍্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে পাঁচটি বকের পরিবার ওদের ঘর তৈরি করেছে। গাছের ডালের শাখায় মঞ্চের মতো করে  গাছের ছোটো ছোটো ডাল বাঁশের মোড়ার টুকরো এবং গাছ পাতা দিয়ে তৈরি করেছে এক একটি ঝুপড়ি। ঝুপড়িতে ওদের সংসার দেখতে সত্যিই মনোরম ।

সুনন্দ সকাল বেলা চিৎকার চেঁচামেচি করায় সুনন্দের কণ্ঠস্বর শুনে বিছানা থেকে ধড়মড়  করে উঠে বসল উদয়শংকর।

– ঘুমাচ্ছিলেন উদয়দা?

–উহু। বিছানায় শুয়ে সঞ্জয়ের দৃষ্টি দিয়ে বকের বাসা নিরীক্ষণ করছিলাম।

– কী দেখলেন?

উদয়শঙ্কর  কী দেখতে পেল, কী দেখছিল সুনন্দকে বোঝানোর চেষ্টা করল।

– তুমি কখনও এখানে দাঁড়িয়ে ওদিকে তাকিয়ে থাকলে গুয়াহাটি দেখতে পাও কি?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সুনন্দ বলল– হ্যাঁ। দেখতে পাই। পরিষ্কার রাতে দূর দূরান্তে সাদা বিস্তৃত অঞ্চল দেখলে গুয়াহাটি মহানগরের আলো বলে মনে হয়। দীঘলী  পুকুরের পাড়ের কথা মনে পড়ে যায়। সেই জায়গাটা আমার ভালো লাগে। আর বর্ষার দিনে সে দিকে মেঘ দেখলে গুয়াহাটিতে বৃষ্টি পড়ছে বলে থাকি।

– এভাবে বিছানায় পড়ে থাকলে দেখতে পাই 'পাখিদের পাড়া পড়োশী' এবং প্রকৃতিশিবিরে অংশগ্রহণ করা অংশগ্রহণকারীদের। দেখতে পাই পাগলাদিয়ে নদীর দুই পার অধিক সবুজ হয়ে ওঠা, দেখতে পাই বড়শি বাইতে থাকা বিদেশি পর্যটক, উপন্যাস লিখতে আসা কোনো ভারতীয় লেখককে। আর, আর দেখতে পাই এখানকার ছেলেদের অভিধানে বেকার নামের শব্দটা নাই হয়ে যাচ্ছে, প্রকৃতি তাদের ভাত দিচ্ছে, কাপড় দিচ্ছে, বেঁচে থাকার বাসনায় নতুন রঙ এবং মাত্রা দিচ্ছে। উদ্ধত যুবকদের মনে এসেছে কর্ম তৎপরতার উদ্দাম স্পৃহা।

– উদয়দা। এই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে হলে কত বছর কত যুগ লাগবে?

সন্ধিহান হয়ে জিজ্ঞেস করে সুনন্দ ।

– আরে বাবা। কাজ করা মানুষের জন্য জীবনটা অনেক ছোটো। বছর-যুগ লাগতে হলে দেখছি আমাদের জীবনের অর্থহীন আত্মাকে দায়িত্ব সমূহ সঁপে দিতে হবে। শিবিরে অংশগ্রহণ করা ছেলে মেয়েদের উৎসাহিত করে কাজে লাগাতে পারলে আগামী বছরে আমরা হয়তো কোনো সুফল দেখতে পাব।

সুনন্দ উদয়শংকরের কাছ  থেকে আগে এই ধরনের কথা শুনতে পায়নি। মানুষটা নিজের কল্পনাগুলি বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য বেশি তাড়াহুড়ো করছে হয়তো, তার জন্য সেও কখনও না ভাবা কথাও বলে ফেলেছে। মানুষটা মনের মধ্যে কী পরিকল্পনা পুষে রেখেছে জানার জন্য সুনন্দ ইচ্ছা প্রকাশ করায় ওদের সংকট ধীরে সুস্থে মনের কথাগুলি দুই একটা করে বলে গেল। উদয়শঙ্করের কথা শুনে সুনন্দের এমন মনে হল– সে যেন ধীরে ধীরে অন্য একটি পৃথিবীতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কল্পনার পৃথিবীটি বাস্তবের পৃথিবীতে পরিবর্তন করার অপ্রতিম ইচ্ছা পোষণ করে ওরা দুজন আগামী সপ্তাহে শিবিরে দুইদিন কীভাবে সুকলমে পার করবে তার পরিকল্পনা করতে লাগল।

– সুনন্দ, পাখি বিষয়ক প্রকৃতি শিবিরটা পরিচালনা করবে সৌম‍্যদা এবং প্রজাপতি বিষয়ক শিবিরটা পরিচালনা করবে প্রণব কুমার ভাগবতী।

–দুজনেই আসবে কি? কী বলেছে আপনাকে?

– আসবে। আসবে। আমি ফোন করেছিলাম। সৌম্যদা আসতে পারবে বলেছে। কিন্তু তিনি বলেছেন এবারের শিবিরটা নাকি বন্ধ ঘরে করার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রজেক্টর ব্যবহার করলে একটা জেনারেটর লাগবে। কারেন্ট কখন যাবে কখন আসবে তার ঠিকানা নেই। সৌম‍্যদা ব্যবস্থা করা যাবে কিনা বলে জিজ্ঞেস করায় আমি বললাম–হবে। সুনন্দই করবে। সুনন্দ হবে কি? আমি সৌম্যদাকে সম্মতি জানিয়ে বিপদে পড়লাম না তো!

– কোনো বিপদে পড়নি। ব্যবস্থা করা যাবে। অল্প হয়তো কষ্ট হবে। নদীতে মাছ মারতে আসার সময় যে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম পখিনদা, তার ভাই প্রদীপের টেন্টহাউস থেকে জেনারেটর নিতে পারব। আমাদের লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য জানতে পারলে খুব কম ভাড়া নেবে, হয়তো না নিতেও পারে। প্রজেক্টরও পাব। আমার একজন বন্ধু আছে, গুয়াহাটিতে ক্যামেরা, প্রজেক্টর আদির ভাড়ার ব্যবসা করে। তাকে বললে সে নিয়ে আসবে। কুছিয়া মাছ তার খুব প্রিয়, তাকে শুধু কুছিয়া মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ালেই হবে।

– তাহলে এগুলির ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম।

– হবে আমি আজই তাদের দুজনকে বলে প্রজেক্টর এবং জেনারেটরের ব্যবস্থা করব।

সুনন্দের আশ্বাসে উদয়শংকর নিশ্চিত হল। উদয়শঙ্করের ভয় হয়েছিল– প্রজেক্টররের ব্যবস্থা করতে না পারলে সৌম্যদাকে কী বলবে।

সেদিন সন্ধেবেলা উদয়শঙ্করের ঘরে এসে সুনন্দ শিবিরের প্রথম দিনের দুপুরের আহার জোগাড় হওয়ার কথা উদয়শঙ্করকে জানাল। সুনন্দ বলল যে বিকেলের দিকে সে বগলস চকে  যাবার সময় বিপিন ডেকার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। মানুষটা বগলছ চ'ক বণিক সংস্থার সম্পাদক। সে সুনন্দকে জিজ্ঞেস করল–' তোমরা নাকি আজকাল থানে কীসব কাজ করছ। সুনন্দু তাকে তারা কী কাজ করছে, কীভাবে করছে তা বিস্তৃতভাবে জানাল। প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপরে ডেকা, তার পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার কিছু অংশ বর্ণনা করল। জায়গাটা এক সময় কীভাবে গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল, পাখ-পাখালিতে পরিপূর্ণ ছিল, এমনকি বিভিন্ন বন্য জীবজন্তুর মধ্যে একটা সন্তুলনের ভার দেখা যেত– মানুষের উপদ্রব্ পেয়ে সেই সমস্ত কীভাবে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল।তাঁর মন্তব্য অনুসারে তোমরা তরুণরা দায়িত্ব না নিলে শেষ রক্ষা করা যাবে না‌। জলাশয়ের বিভিন্ন পাখিগুলিও একদিন আমাদের মধ্য থেকে শকুন নাই হওয়ার মতো নাই হয়ে যাবে। সুনন্দ তখন বিপিনদাকে ২৭-২৮ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে চলা প্রকৃতি শিবিরের কথা জানাল এবং বলল–' দাদা যদি পারেন একবার এসে দেখে যাবেন। সুনন্দের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে বিপিন ডেকা তাকে জিজ্ঞেস করল— সুনন্দ, কতজন ছেলেমেয়ে হবে বলে মনে হয়। সুনন্দু তাকে জানাল যে ত্রিশ-চল্লিশ জনের মতো হতে পারে ।এখনই নির্দিষ্ট সংখ্যাটা বলা একটু মুশকিল। সুনন্দকে মানুষটা অনুরোধ করার সুযোগই দিল না, তিনি নিজে থেকে বললেনঃ তাদের জন্য দুপুরের খাওয়া দাওয়া ব্যবস্থা করতে হবে। নয় কি? সুনন্দ লাগবে বলে জানাল। তখন বিপিন ডেকা বলল–– তাহলে সেদিনের দুপুরবেলার খাবারটা আমিই দেব। জীবনে কোনোদিন কোনো পুণ্যের কাজ করিনি। ভালো কাজ করতে ইচ্ছা বা ছেলেমেয়েগুলিকে এক বেলা খাইয়ে নিজের জীবনটাকে কিছুটা ধন্য করতে চেষ্টা করি। না কি বল! সুনন্দ মানুষটাকে মুচকি হেসে একটা ধন্যবাদ জানাল।

– ভালোই হয়েছে। এক বেলার সমস্যার সমাধান হল। পরের দিনে অবশ্য ছেলেমেয়ে কম হবে। সেদিনের সমস্যাটা আমিই সমাধান করে দেব।

সুনন্দ উদয়শঙ্করকে কী বলবে ভেবে পেল না।

– সুনন্দ। খাদ্য, প্রজেক্টর এবং জেনারেটরের ব্যবস্থা হল। আচ্ছা পাখির শিবিরটার কথা নিয়ে ভেবেছ?

– হ্যাঁ। বলতে ভুলে গেছি। পাখির শিবিরটা যেহেতু ব্যবহারিক না হয়ে বিদ্যায়তনিক হবে সেই জন্য আমি গঙ্গাপুখুরি হাইস্কুলের কথাই ভাবছি। স্কুলের হলঘরটিতে হলে খারাপ হবে না। আমি হেড স্যারের কানে কথাটা দিয়ে রেখেছি। স্যার বলেছেন প্রতুলকে বলে রাখবে। সে আমার থেকে চাবি নিয়ে নেবে এবং তোমাদের প্রয়োজনীয় ঘরটা তোমরা খুলে নেবে।

– সুনন্দ তুমি দেখছি ভেতরে ভেতরে সব ঠিক করেই ফেলেছ

– উদয় দা, আপনাকে জানাতে ভুলে যাওয়াটা ঠিক হয়নি।

সুনন্দের মনে জেগে ওঠা অপরাধবোধ দূর করার জন্য উদয়শঙ্কর বলল– এভাবে কেন ভাবছ। করার কাজ তুমি করে গেছ। এর মধ্যে জিজ্ঞেস করার তো কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না।

– তবু। ঘরটা পছন্দ হবে কিনা জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল।

– হয়তো ছিল। জনগণের কাজ সম্মতি সাপেক্ষে করা ভালো। তোমার যদি ভুল করেছ বলে মনে হয়ে থাকে, তাহলে তুমি শিখতে কৃপণতা করছ না। সামাজিক কাজের জন্য এটা হয়তো তোমার কাছে প্রথম পাঠ। অংশগ্রহণকারীদের জানানো হয়েছে কি?

– নবদা এবং কীচককে দায়িত্ব দিয়েছি। জেপিও দায়িত্ব নিয়েছে।

‐- ত্ৰিশ জনের বেশি যেন না হয়। আর দেখবে যাতে, একটু বেশি সচেতন অংশগ্রহণকারীর অংশগ্রহণ যেন সুনিশ্চিত করা যায়।

‐- সেই কথায় আমি একটু বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছি। যাতে ভবিষ্যতে তারা এই ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করতে পারে।

সুনন্দ এই কয়েকদিন প্রতিদিন সন্ধেবেলা এসে  উদয়শঙ্করকে  খবরা খবর জানিয়ে গেছে। নবদাএবং কীচকও এসেছিল । তারাও শিবিরের প্রস্তুতির বিষয়ে খবর নিয়ে গেছে । মোটের উপর প্রত্যেকেই উৎসাহী এবং উদ্বিগ্ন। 

শিবিরের দিন সকাল বেলা সৌম্যদা সোজাসুজি গঙ্গাপুখুরি হাই স্কুলে এল। গুয়াহাটিতেই একটু দেরি হওয়ায় তাড়াতাড়ি এসে বগলস চকে পৌঁছাতে পারল না। সৌম্যদা এসেই প্রজেক্টর এবং জেনারেটরের ব্যবস্থা কী ধরনের একবার দেখে নিল। সৌম্যদা সন্তুষ্ট হয়েছে বলে মনে হল উদয়শঙ্করের।

‐- ছেলেমেয়েরা আসার আগে একবার প্রজেক্টরটা স্টার্ট করে দেখ তো।

‐- দাদা ।আমি সবকিছু সংযুক্ত করে একবার দেখে নিয়েছি। ঠিকই আছে।

সুনন্দের বন্ধু বলীন বলল।

‐- আছে তো!

– হ্যাঁ আছে।

বলীন আশ্বাস দেওয়ায় সৌম্যদা উদয়শঙ্করকে  জিজ্ঞেস করল – কতজন প্রকৃতি কর্মী অংশগ্রহণ করবে ।

— ত্রিশ জন পঞ্জীয়নের টাকা দিয়েছে। আরও দুজন হয়তো বাড়তে পারে।তাঁরা আজ পঞ্জীয়ন করার কথা ছিল।

নটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে শিবির আরম্ভ হল। বন্ধুরা কি করছে একবার দেখে যাই আর তিনি বলা অনুসারে তাঁর ছেলেগুলি দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করেছি কিনা দেখতে এসে শিবিরে উপস্থিত হয়েছিল বিপিন ডেকা। উদয়শঙ্কর বিপিন ডেকাকে শিবির উন্মোচনের দায়িত্ব দেওয়ায় মানুষটা আপত্তি করল– সবাইকে নমস্কার জানিয়ে বলছি, আমি ব্যবসায়ী মানুষ, এই সমস্ত কিছু বুঝি টুঝি না। এত সম্মানের দায়িত্ব আমাকে দেবেন না।

সুনন্দ এবং উদয়শঙ্কর মানুষটার উপরে জোর করায় তিনি  বললেন– উপস্থিত জনগণ। আপনাদের শত কোটি প্রণাম। এই অভাজনকে এই দায়িত্ব দেওয়ায় আপনাদের শ্রদ্ধা এবং আমার চেয়ে বয়সে ছোটো সবাইকে ভালোবাসা জানাচ্ছি। সঙ্গে এই অভাজন দোষ ত্রুটির মার্জনা চেয়ে এই শিবিরটা উদ্বোধন করা হল বলে ঘোষণা করলাম।

হলঘরটা হাততালিতে ভরে গেল।

মানুষ কতটা আন্তরিক এবং সৌজন্যমুখী হলে নিজেকে হেয় করে দেখাতে পারে– বিপিন ডেকা সম্ভবত তার নৈষ্ঠিক উদাহরণ।

শিবিরের দ্বিতীয় পর্ব হিসেবে সৌম্যদা নিজের ধরনে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে পরিচিত হয় ক্রম সংখ্যা দাঁড়াল তেত্রিশ জন।

তৃতীয় পর্বে সৌম্যদা শিবিরের নির্দিষ্ট কার্য আরম্ভ করল।

পাখি কাকে বলে? বল, তোমরা কে জান? সব সময় দেখছ।

কী বলবে। সব সময় দেখছে অথচ বলার যেন কিছু নেই।

– বলার দায়িত্ব আমাকেই দিয়েছে নাকি প্রত্যেকে? যাই হোক পাখি মানে হল– বিশেষ ধরনের ডানা, ঠোঁট থাকা ডিম পারা এক ধরনের উষ্ণ রক্তের মেরুদন্ডী প্রাণী যার উড়ার ক্ষমতা আছে। তার মধ্যে হয়তো দুই একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। তার মধ্যে বাদুর ডিম পারে না, বাচ্চা দেয়, উটপাখি উড়তে পারেনা।

সৌম্যদা অংশগ্রহণকারীদের প্রাগ ঐতিহাসিক সময় থেকে পাখির বিবর্তনের সম‍্যক জ্ঞান দিতে চেষ্টা করলেন-থেকোডেন্ট ডাইনোসর থেকে আরম্ভ করে প্র-আভিছ ,আর্কেয়রনিস এবং শেষে আধুনিক পাখির জন্ম কাহিনি। স্লাইডে দেখিয়ে দিলেন পাখিগুলির 'কম্পিউটার ইমেজ'। সৌম্যদা কিছু প্রাগ ঐতিহাসিক পাখির নাম বলল। সেইসব ক্রমে– জলচর পাখি হেছপেরোরনিছ, বৃহৎ আকৃতির স্থলচর  পাখি ডায়াট্রাইমা, ডায়াট্রাইমার পরবর্তী সময়ের বৃহৎ আকৃতির পাখি জলাভূমির অরণ্যে বাস করা পাখি হোয়াটিজিন ইত্যাদি অনেক। হোয়াটিজিন পাখির যে আলোকচিত্র সৌম্যদা স্লাইডে দেখাল সেটা সবাইকে বিস্মিত করে তুলল। এত সুন্দর এবং শক্তিশালী ছিল পাখিগুলি!

তারপরে সৌম্যদা আরম্ভ করল বর্তমানের পাখির ওপরে আলোচনা।

– তোমরা জান কি পাখি কেন উড়তে পারে? পাখির উড়তে পারার রহস্য কী, সে কথা প্রতিটি পক্ষীপ্রেমী তথা পক্ষী পর্যবেক্ষকের জানা উচিত।

অংশগ্রহণকারী প্রকৃতিপ্রেমিকদের মাঝখান থেকে কেউ সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ধৃষ্টতা করল না। কাকাবাবুর বৌমা অনামিকার চোখে চোখ পড়ল সৌম‍্যদার। দুজনেই দু'পাশে চোখ ঘুরিয়ে আনল–সৌম্যদাও  বলল না তুমি বল এবং বৌমা অনামিকাও বলার প্রয়াস করল না।

– পাখির দেহের গঠন, অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ, ওজন, ডানা এবং তার বিন্যাস, দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সজ্জা ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জীব বিজ্ঞানীরা পাখির এই অসাধারণ ক্ষমতার মূল উৎসের সন্ধান বের করতে সমর্থ হয়েছে। পাতলা অথচ শক্তিশালী শরীর, ডানার গঠন, ডানার বিন্যাস, পুচ্ছাংশ,ঠেং, ঠোঁট ইত্যাদি পাখির উড়ার কাজে সাহায্য করে। পাখির উড়ান প্রক্রিয়ায় ডানার ভূমিকা অনবদ্য। ডানা ঝাপটে পাখি বাতাসে উড়ে থাকতে এবং ডানা না ঝাপটে পাখি বাতাসে গ্লাইডারের মতো ভেসে থাকতে সক্ষম। পাখির ডানাটা মেলে ধরে পাখির বিন্যাস ডানার বিন্যাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাওয়া যায় যে ডানার প্রথম অংশটা একটু স্থুল, তারপরে ক্রমান্বয়ে ডানাটা নিচের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ফলে উড়তে থাকার সময় পাখি বাতাসকে বেশিদূর পেছনদিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে পাখির গতিবেগ বৃদ্ধি পায় এবং এই বক্রতার জন্য ডানা ঝাপটে বাতাসের চাপ পাখির পিঠের উপরে কম পড়ে।

উড়তে শুরু করা এবং উড়তে থাকা পাখির ডানার সঞ্চালন দুটি শ্লাইডের সাহায্যে দেখিয়ে সৌম্যদা বুঝিয়ে বলা কথাটা আর ও সহজ সরলভাবে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করল। তারপরে সৌম্যদা প্রজেক্টরের মনিটরে প্রক্ষেপ করলেন বিভিন্ন পাখির বিভিন্ন আকৃতির পাখি। পাখির শ্লাইডটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে সৌম্যদা পুনরায় বলতে শুরু করলেন।

– ডানা পাখির এক বিশেষ ধরনের আবরণ। সাধারণভাবে পাখির সংজ্ঞা দিলে বলা হয় ডানা থাকা সমস্ত প্রাণীই পাখি। আমাদের নখ আর চুলের মতো পাখির মূল উপাদান হল কেরাটিন। ডানা পাখির দেহের তাপ নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন রঙে রঙিন করে প্রকৃতি পাখির বিভিন্ন সামাজিক তথা নৈসর্গিক দিককে প্রভাবিত করে, পাখিকে মসৃণ করে রাখে। পাখির প্রজাতিভেদে পাখির রং আলাদা হয় বলে পাখির পর্যবেক্ষণ এবং সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে ডানা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পাখির ডানা সময়ে সময়ে খসে পড়ে এবং সেই জায়গায় পুনরায় একই বর্ণের ডানা গজাতে দেখা যায়। পাখির ডানাকে প্রধানত তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়– সেগুলি হল কনটুর বা আচ্ছাদন পাখি, ফিলোপ্লুম বা সূতালাহি পাখি আর প্লুমিউল বা কপাহী পাখি।

শ্লাইডে সৌম্যদা তিন শ্রেণির ডানার চিত্র প্রদর্শন করে বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করে গেলেন। সঙ্গে বর্ণনা করলেন ডানার গঠন প্রণালী। শ্লাইডে দেখানোর জন্য অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি প্রেমিকদের বুঝতে যথেষ্ট সুবিধা হয়েছে।

প্রতিটি ডানার মধ্য দিয়ে একটি কাঠি বা সেফট থাকে, তার দুপাশে কিছুটা ঊর্ধ্বগামী অবস্থায় কয়েকশো কোমল সুতোর মতো ফিলামেন্ট থাকে। প্রতিটি ফিলামেন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে বারবিউল  অথবা ছোটো ফিলামেন্ট। কাছের ফিলামেন্টকে খামচে ধরে রাখার জন্য প্রতিটি বারবিউলের সঙ্গে আছে কয়েকশো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অতি ক্ষুদ্র হুক।

সৌম্য দা স্ক্রিনে উদ্ভাসিত হওয়া প্রতিটি অংশ সুন্দর করে দেখাচ্ছে ।

–এখন আসছি পাখির পুচ্ছাংশে।পুচ্ছাংশের সাহায্যেই পাখি বাতাসে তীব্র গতিতে বিচরণ করার সময় দিক পরিবর্তন করে বাতাসে নিজের গতিবেগ  কমানো বাড়ানো করতে পারে, এমন কি বাতাসে ভেসে থাকার জন্য ও পাখি তার পুচ্ছাংশ ব্যবহার করে । প্রজাতি ভেদে পাখির পুচ্ছাংশের ব্যবহারে ধরন ধারন ভিন্ন । শরীরের ভর প্রয়োগ করে পাখি গাছের ডালে ভারসাম্য বজায় রাখতে জলের নিচে প্রবেশ করার জন্য ক্ষিপ্রতা বাড়ানোর আবশ্যক হিসেবে পাখি পুচ্ছাংশের  ব্যবহার করে। অভিব্যক্তি সূচক তথা ভাব বিনিময়ের জন্য প্রজাতিভেদে পাখির পুচ্ছাংশের গতিবিধি ভিন্ন । কিছু পাখির প্রজাতির পুরুষ এবং স্ত্রী পাখির পুচ্ছাংশ ভিন্ন অবয়ব এবং ভিন্ন রংয়ের হতে দেখা যায়। কোনো কোনো প্রজাতির পুচ্ছাংশ পূর্ণবয়স্ক হওয়ার তথা প্রজনন ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় । পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য এই সমস্ত এড়িয়ে চলতে না পারাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা আমি বলা কথাগুলি তোমরা প্রত্যেকেই বুঝতে পেরেছ কি ?

সৌম্যদা শ্লাইডে প্রত্যেকেই সাধারণত দেখতে পাওয়া দশটা প্রজাতির পাখির ভিন্ন আকৃতির পুচ্ছাংশের রেখাচিত্র দেখালেন । এই রেখাচিত্রগুলিতে অঙ্কিত বিভিন্ন আকৃতির পুচ্ছাংশ সাধারণভাবে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তারপরে সৌম্যদা  পরবর্তী শ্লাইডটি স্ক্রিনে প্রক্ষেপ করলেন। তার মধ্যে অঙ্কিত রয়েছে দশ ধরনের ভিন্ন পাখির ঠ্যাঙের রেখাচিত্র । রেখাচিত্র সমূহের নিচে পাখি গুলির নাম লেখা আছে । প্রথমটিতে লেখা আছে কাঠঠোকরা পাখির ঠেং এবং শেষেরটিতে লেখা আছে বন্য মোরগের ঠেং। সৌম্যদা পাখির ঠেং গুলির দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর সময় হঠাৎ প্রজেক্টর চালানো ছেলেটির অসাবধানতাবশত একটা হাত প্রজেক্টরে লেগে স্ক্রিন থেকে ছবিগুলো নাই হয়ে গেল। 

– তোমার নাম কি?

প্রজেক্টর চালানো ছেলেটির দিকে তাকিয়ে সৌম্যদা জিজ্ঞেস করল।

– দাদা, বলীন। ছেলেটি সমীহের সঙ্গে বলল।

– বলীন, তুমি কাজটা ভালো করলে না। একটু দেখেশুনে–

সৌম্যদা অসন্তুষ্ট মনে বাইরে বেরিয়ে এলেন। সৌম‍্যদাকে বেরিয়ে আসতে দেখে উদয়শঙ্কর পেছন পেছন বারান্দায় বেরিয়ে এল। বলীন অবশ্য বেশি সময় নিল না। দৌড়াদৌড়ি করে প্রজেক্টরটা ঠিক করতে সে সমর্থ হল।

– একটা মুডে কথা গুলি বলা হয়। মুড অফ হয়ে গেলে খারাপ লাগে।

বলীন প্রজেক্টরটা পুনরায় সঠিক অবস্থানে আনার পরে সৌম্যদা পাখির ঠেঙের ওপরে বলতে শুরু করলেন।

– পাখি যে  প্রাগ ঐতিহাসিক কালের কোনো একটি যুগে সরীসৃপ ছিল তার আভাস আমরা পাখির ঠেঙে দেখতে পাই। সেটা হল– প্রায় সমস্ত পাখির ঠেঙে আমরা ছাল বা স্কেল দেখতে পাই। সরীসৃপের শরীরে ছালগুলি বেশিরভাগ পাখির ডানায় রূপান্তরিত হলেও ঠেঙের দিকের ছাল সেরকমই থেকে গেল। পাখির ঠেং অধ্যয়ন অথবা পর্যবেক্ষণ করে পাখি গুলির বাসস্থান সম্পর্কে ধারণা করা যায়। সেভাবে ঠেং পর্যবেক্ষণ করে পাখির জীবনযাত্রা প্রণালীর অনেক কথা জানতে পারা যায়। পাখির ঠেঙ কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাতের মতো কাজ করে। ভূমি থেকে বাতাসে উড়ার সময় কিছুটা দৌড়ে যায়, ফলে পাখির শরীর বাতাসে ভেসে থাকায় সুবিধা হয়। এর জন্য পাখির ঠেঙের প্রয়োজন যথেষ্ট। পাখি সাঁতরানোর জন্য ঠেং ব্যবহার করে। মাংসাহারী পাখিগুলি শিকার ধরার জন্য ঠেঙের ব্যবহার করে।

শ্লাইডে থাকা এক একটি ঠেং দেখিয়ে সৌম্যদা পাখির ঠেঙের ব্যবহারের উপর বক্তব্য রাখলেন । পাখির ঠেঙের ওপরে  বলার পরে সৌম্যদা ল্যাপটপের ' এন্টার বাটনে' আঙ্গুল দিয়ে আস্তে করে টোকা দিয়ে শ্লাইডটা পরিবর্তন করে নিলেন । শ্লাইডটাতে দেখতে পাওয়া গেল পাখির কয়েক ধরনের ঠোঁটের রেখাচিত্র।

–এবার তোমাদের পাখির ঠোঁটের বিষয়ে কিছুটা আভাস দেবার চেষ্টা করব। আমাদের হাত, পাখির ঠোঁট। ঠোঁটের  সাহায্যে পাখি শিকার করে, খাদ্য গ্রহণ করে বা খাদ্য তুলে নেয়, আত্মরক্ষা, সন্তান লালন- পালন করা, ঘর তৈরি করা, শরীরের যত্ন নেওয়া এমনটি ঠোঁটের সাহায্যে পাখি নিজের স্বরের তারতম্য ঘটিয়ে বিভিন্ন ধরনের কণ্ঠস্বর বের করে।

সৌম্যদা শ্লাইডটার পরিবর্তন করল। শ্লাইডটাতে  দেখতে পাওয়া গেল বিভিন্ন পাখির রেখাচিত্র। সৌম‍্যদা এক এক করে বিভিন্ন পাখির ঠোঁটের বর্ণনা দিল এবং প্রতিটি ব্যবহারের বিষয়ে বলে গেল।

– বিভিন্ন খাদ্য খাওয়ার জন্য পাখির ঠোঁটের গঠন প্রণালী বিভিন্ন। এখানে তোমরা তাকিয়ে দেখ এই ধরনের ঠোঁট জল বা কাদা থেকে খাদ্য খাওয়ার জন্য, এগুলি ঠোঁট আবার পোকা ধরার জন্য, এই ঠোট গুলি বীজের অভ্যন্তর ভাগ খাওয়ার জন্য, এই ঠোঁটগুলি কাঠ ফুটো করার জন্য, এগুলি মাংস কাটার জন্য, এগুলি পোকা এবং গুটি খাওয়ার জন্য, এগুলি শস্য খাওয়ার জন্য, এগুলি ফল খাওয়ার জন্য, এগুলি মধু চোষার জন্য, এগুলি গভীর কাদা থেকে পোক ইত্যাদি খাবার জন্য, এগুলি মাছ শিকারের জন্য, এগুলি সবকিছু ভক্ষণের জন্য উপযোগী।

প্রতিটি ঠোঁটের খাদ্য উপযোগিতার বিষয়ে বলে যাবার সময় সৌম‍্যদা প্রতিটি ঠোঁটের উপরে হাতে থাকা ছোটো একটি লাঠি দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছেন। ফলে অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যেকেরই ঠোঁট গুলি চিনতে সুবিধা হয়েছে।শ্লাইডে থাকা কয়েকটি ঠোঁট দেখে প্রতিজন প্রকৃতিপ্রেমী সেটা কোন পাখির ঠোঁট সহজে চিনতে পারতে সক্ষম হয়েছে।

– পাখির দৃষ্টিশক্তি, ঘ্রাণ শক্তি এবং শ্রবণশক্তির বিষয়ে পাখি পর্যবেক্ষকরা প্রথমেই একটু জেনে নেওয়া আবশ্যক। পাখির দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর। পাখির তীব্র গতি, আকাশ থেকে নিচের ভূপৃষ্ঠে দৃষ্টিপাতের প্রয়োজনীয়তা, অরণ্যে উড়ে বেড়ানোর সময় বাধাহীন ভাবে গাছের ডাল এবং শিলের পাহাড় গুলিকে স্পর্শ না করে বা ধাক্কা না খেয়ে উড়ে বেড়ানোর দক্ষতা, শিকার খুঁজে বেড়ানো অথবা নিজে শিকার হয়ে আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে বেড়ানোর সময় পাখির তীব্র দৃষ্টিশক্তির অতীব প্রয়োজন। পাখি দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে বস্তুর দূরত্ব মাপতে পারে, সেই দূরত্ব কত গতিতে অতিক্রম করবে সেটা ঠিক করে। পাখির দৃষ্টিশক্তি যেমন প্রবল তেমনি ঘ্রাণ শক্তি বড়ো দুর্বল। ব্যতিক্রম হিসেবে নিউজিল্যান্ডের কিবি পাখির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কিবি পাখি প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন, ঘ্রাণ শক্তির উপরে নির্ভর করেই এই ধরনের পাখি গুলি জীবন যাপন করে। পাখির ঘ্রাণশক্তি ক্ষীন হলেও শ্রবণশক্তি অত্যন্ত প্রবল। লক্ষ্মী পেঁচা ইঁদুরের ক্ষীন শব্দ শুনে ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও শিকার করতে পারে। সদ্য জন্মানো পাখির শাবক গুলির ও শ্রবণশক্তি প্রবল। উদাহরণ হিসেবে মা ঠোটে খাবার জিনিস এনে সাংকেতিক শব্দ করার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় থাকা সবগুলি শাবক খাবার জন্য ঠোঁট মেলে চিৎকার করতে শুরু করে। পাখির শ্রবণশক্তি পাখির অন্যতম প্রধান ইন্দ্রিয়শক্তি।

পাখির দৃষ্টিশক্তি, ঘ্রাণ শক্তি এবং শ্রবণ শক্তির বিষয়ে বলার পরে সৌম্য শ্লাইডের পরিবর্তন করল।

– এগুলি পাখির বাসা। তোমরা প্রত্যেকেই জান পাখি ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হলে সেই বাচ্চাকে লালন পালন করে গড়ে তোলার জন্য পাখি বাসা তৈরি করে। প্রজননকার্য সম্পন্ন হওয়ার আগে থেকেই অথবা প্রজননকালে পাখির স্বভাবে বাসা তৈরি করার প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়। প্রজাতি ভেদে এই বাসা তৈরি করার দায়িত্ব তথা প্রবণতা পুরুষ এবং স্ত্রী উভয়ের মধ্যে দেখা যায়। কিছু প্রজাতির মধ্যে তৈরি করার কাজটা কেবল পুরুষ পাখিকে করতে দেখা যায়, কিছু প্রজাতির মধ্যে আবার স্ত্রী পাখি বাসা তৈরি করার কাজ করে। কিছু পাখির প্রজাতির মধ্যে স্ত্রীপুরুষ উভয়েই  বাসা তৈরি করার কাজ করে । সাধারণত দেখা যায় বড়ো আকৃতির পাখিগুলি মুক্ত স্থানে বাসা তৈরি করে এবং ছোটো পাখিগুলি তুলনামূলক ভাবে গুপ্ত অঞ্চলে বা লুকিয়ে চুরিয়ে বাসা তৈরি করতে পছন্দ করে।প্রজাতি ভেদে এবং বসবাস করার পদ্ধতি ভেদে পাখিগুলি বিভিন্ন স্থানে বাসা তৈরি করে। কিন্তু প্রত্যেকটি প্রজাতি যখন বাসা তৈরি করে তখন তার আশেপাশে প্রাকৃতিক খাদ্য ভান্ডার আছে কিনা সেদিকেও লক্ষ্য রাখে। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল নিরাপত্তা। শুধুমাত্র পাখির বাসা সম্পর্কে দুই ঘন্টা বলা যেতে পারে। পরবর্তীকালে এই বিষয়ে আমরা তথ্য সহকারে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করব। আজ আমাদের কম সময়ের মধ্যে পাখির ওপরে সম্যক ধারণা একটা গ্রহণ করতে হবে।

সৌম্যদা শ্লাইডটা বদলে দিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল পাখির কয়েকটি ডিম। পাখির ডিমগুলি প্রকৃতি কর্মীদের দেখিয়ে সৌম্যদা পুনরায় শ্লাইডটা বদলে দিল। এবার শ্লাইডে ভেসে উঠলো ডিমের গঠন এবং চার ধরনের ডিমের আকৃতি।

– তোমরা প্রত্যেকেই পাখির ডিম দেখেছ। খাবার জন্য আনা হাঁস বা মুরগির সিদ্ধ ডিমের কথা মনে কর। তারপরে ডিমের গঠন প্রণালীর এই রেখাচিত্রটির দিকে তাকাও। ডিমের বাইরের কঠিন আবরণটিকে ডিমের খোসা এবং ইংরেজিতে বলা হয় সেল। ডিমের খোসাটা ছাড়ানোর পরে একটা অত্যন্ত পাতলা ত্বক আমরা দেখতে পাই। তাকে অভ্যন্তরীণ বলে বলা হয়। ডিমের ভোঁতা অংশের দিকে একটি বাতাসের থলে থাকে। সিদ্ধ ডিমের সূঁচলো অংশের বিপরীত অংশ বাতাসের থলের মতো ভোঁতা।দেখেছ তো! তারপর দেখতে পাবে ডিমের সাদা অংশ । এটিকে এলবুমিন বলা হয়।অধিকাংশ প্রোটিন দিয়ে এই অংশ গঠিত । সাদা অংশের মাঝখানে থাকে ডিমের কুসুম বা ইয়ক। এটা ডিমের শক্তি ভান্ডার । এখানে থাকে ভ্রুণ । ভ্রুণ থেকে পাখির বাচ্চার জন্ম হয়। এটা অতি সাধারণ ব্যাখ্যা। তোমাদের মধ্যে যারা ডিমের আকৃতি শুধু গোলাকার বলে ভেবেছ– তোমরা এই আকৃতি চারটি দেখ। ডিমের আকৃতি চার ধরনের। গোলাকার, ডিম্বাকার, আপেক্ষিক ডিম্বাকার এবং প্রায় শঙ্কু আকারের। প্রকৃতিতে যে সমস্ত পাখি বেশি বিপর্যস্ত অথবা খাদ্য শৃংখলায় যে সমস্ত পাখির যোগদান অত্যন্ত বেশি সেই সব পাখি ছোটো ছোটো ভাগে বছরের বিভিন্ন সময় একাধিক ডিম পাড়ে। আকারের বড়ো পাখির ডিমও বড়ো আকারের । খাদ্যের প্রাচুর্যতার ওপরে নির্ভর করে পাখি একবার পাড়া ডিমের সংখ্যার তারতম্য হতে দেখা যায়। ডিমের বর্ণ সাধারণত সাদা হলেও প্রজাতি অনুসারে পাখির ডিমের বর্ণ নীল ,নীলাভ, সবুজ ,সবুজ মেটে রংয়ের,খয়েরি এবং ফুটফুটে হতে পারে।

সৌম্যদা পাখির ডিমের সমস্ত দিকের ওপরে আপাতদৃষ্টি নিক্ষেপ করে সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করে গেলেন।

– তোমাদের পাখির বিষয়ে আদ্যোপান্ত বলার মতো আজ সময় হবে না। একেবারে সাধারণ ব্যাখায় এভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে যাতে তোমরা একটি ন্যূনতম ধারণা করতে পার। তোমাদের পাখির শ্রেণীবিভাজনের কথা বলতে চাইনি। সেটা পাখির পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এড়িয়ে চলা যায়। তোমাদের জানানোর জন্য এখন পাখি পর্যবেক্ষণের সময় মনে রাখার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথার ওপরে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

তখনই উদয়শঙ্কর সৌম্যদার কাছে এসে কানে কানে বলল– চায়ের বিরতি দেওয়া যাবে নাকি?

– তোমাদের জন্য দশ মিনিটের চা বিরতি। কেউ বাইরে থেকে আসতে চাইলে যেতে পার। কী নাম ছিল তোমার–বলীন– তুমিও তাড়াতাড়ি এক কাপ চা খেয়ে নাও।

তিন ঘন্টা সময় কীভাবে পার হয়ে গেল অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীরা বুঝতে পারল না। তাদের মধ্যে দুজন বাইরে গেল। দুজন জায়গায় বসেই আড়মোড়া ভেঙ্গে নিল। সবাইকে নিজের নিজের বসা জায়গায় চা এবং একটা করে সিঙ্গারা দেওয়া হল। সিঙ্গারা গুলি বিপিন ডেকা তার একজন কর্মচারীর মাধ্যমে তুলিকা মিঠাই ঘর থেকে আনিয়েছে। চা- সিঙ্গারা পর্ব দশ মিনিটের মধ্যেই শেষ হল। সৌম্যদা পুনরায় শিবিরের আলোচনা আরম্ভ করল।

– তোমাদের পাখি পর্যবেক্ষণের কয়েকটি দরকারি কথা বলার প্রয়োজন আছে। পাখি পর্যবেক্ষণের অভ্যাস বর্তমানে প্রকৃতি বিজ্ঞানের অন্যতম অপরিহার্য এক কার্যক্রম। পাখি পর্যবেক্ষণ এবং অধ্যয়নকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয় – অরিন্থোলজি আর যে সকল ব্যক্তি এই কাজের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে বলা হয় অরিন্থোলজিস্ট।তোমাদের জেনে রাখা ভালো যে একটা পাখিকে দেখলে বা তার নাম জানলেই পাখির পর্যবেক্ষণ করা বোঝায় না। একটা পাখিকে পর্যবেক্ষণ করা মানে পাখিটির বাহ্যিক ক্রিয়া কলাপ , ভাব-ভঙ্গি ,ব্যবহার, জীবন-চক্র তথা জীবন নির্বাহের পদ্ধতিগত জ্ঞান এবং সর্বোপরি একটা পাখির সঙ্গে তার পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধ এবং সম্পর্কের বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানার প্রয়াস করা। তার জন্য পাখি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একাত্ম হতে হবে, অধ্যবসায়ের সঙ্গে পাখিটিকে অনুসরণ করতে হবে এবং পাখিটার সঙ্গে প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানের সম্পর্ক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হতে হবে।

পাখি পর্যবেক্ষণের শুরু করতে হবে পাখিটাকে শনাক্তকরণের মাধ্যমে। পাখিটা কী প্রজাতির তার নাম কী জানতে হবে। একজন পাখি পর্যবেক্ষক হিসেবে তুমি দেখতে হবে তুমি দেখতে পাওয়া পাখিটা দেখতে কী ধরনের, পুরুষ না মহিলা, একা আছি না দলের মধ্যে আছে, খাদ্য সন্ধানে আছে না বিশ্রাম নিচ্ছে, ডানার যত্ন নিচ্ছে নাকি, পাখিটা কোথায় বসে আছে, কীভাবে বসে আছে, চুপচাপ বসে আছে না মুখ দিয়ে শব্দ করছে, তার কন্ঠস্বর কী ধরনের, হাঁটার সময় কীভাবে হাঁটছে, উড়ে যাবার সময় কীভাবে উড়ছে, একনাগারে কতটা উড়ে যাচ্ছে, গিয়ে কোথায় বসছে ইত্যাদি অনেক কথা নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করে দেখা ব্যক্তিকে আমরা ভালো পর্যবেক্ষক হিসেবে অভিহিত করতে পারি।

সৌম্যদা বিরতিহীন ভাবে বলে চলেছেন।

‐ প্রথম কথা হল পাখিটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। অপরিচিত একটি পাখির সঙ্গে পরিচিত হতে হলে প্রথমেই পাখিটার আকৃতি কী রকম নোট বইয়ে  তা  লিপিবদ্ধ করবে। তার জন্য কিছু পাখিকে তুলনামূলক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ছোট্ট চড়ুই একটা ছয় ইঞ্চির হলে, শালিক পাখি নয় ইঞ্চির, পায়রা তেরো ইঞ্চির, কাক সতেরো ইঞ্চির, শকুন ছয়ত্ৰিশ ইঞ্চির‐ এসব পাখিকে মাধ্যমিক হিসেবে নিয়ে তুমি দেখতে পাওয়া পাখিটা এর মধ্যে কোন মাপের ভেতরে পড়ে তা বের করে নেওয়া যেতে পারে। চড়ুই পাখির চেয়ে বড় হলে লিখবে‐- চড়ুই পাখি আর পাশে একটা যোগাত্মক চিহ্ন। ছোটো হলে লিখবে চড়ুই পাখি এবং পাশে লিখবে একটি বিয়োগ চিহ্ন। সমান হলে যোগ চিহ্নের  নিচে একটা বিয়োগ চিহ্ন বসিয়ে দেবে। এভাবে শালিক, পায়রা, কাক এবং শকুনের মাধ্যমে পাখি পর্যবেক্ষণের সময় তুমি দেখতে পাওয়া পাখিটির আকৃতির মান বের করে নিতে পারবে। ক্রিকেট খেলার একজন দর্শক খেলার মাঠের কোন স্থানকে কী নামে জানা যায় না জানলে, কোন খেলোয়াড় কোথায় অবস্থান করছে জানতে অপারগ হয়। ফলে সে পরিশীলিত দর্শক হতে পারে না। সেভাবে একজন  পাখি পর্যবেক্ষক পাখির শরীরের কোন স্থানকে কী নামে জানা যায় তা না জানলে তাকে পরিশীলিত পর্যবেক্ষক বলা যায় না। এবং সেই ব্যক্তি পক্ষীর পর্যবেক্ষণে কোনো মতেই সফল হতে পারেনা।

পাখির শরীরের অংশগুলির নাম মনে রাখতে পারলে অপরিচিত একটি পাখির নির্দিষ্ট স্থানগুলিতে কী বর্ণের পাখি আছে তোমরা স্থান অনুসারে নোট বইয়ে টুকে নিতে পারবে। পাখিটার শরীরে কোন রঙের প্রাধান্য বেশি, পাখির ঠোঁটটা কী রংয়ের, কত লম্বা এবং কত ছোটো তোমাদের নোট বইয়ে তা লিপিবদ্ধ করতে হবে। তারপর তোমরা লক্ষ্য করবে পাখিটার পুচ্ছাংশ। পুচ্ছাংশে কী রংয়ের প্রাধান্য লাভ করেছে, কতটা দীর্ঘ অথবা কতটা ছোটো, কোনো বিশেষত্ব রয়েছে কিনা, পুচ্ছাংশ নাচাতে থাকে না স্থির করে রাখে  ইত্যাদি কথাগুলি একাদিক্রমে নোট বইয়ে লিপিবদ্ধ করবে। এভাবে লিপিবদ্ধ করার ফলে তোমার নোট বইয়ে পাখিটা সম্পূর্ণরূপে ধরা দেবে। পাখি  পর্যবেক্ষণের কোনো গ্রন্থের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে অথবা কোনো অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করলে পাখিটাকে শনাক্ত করতে তুমি সক্ষম হবে।

সৌম্যদা অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি প্রেমিকরা কীভাবে তার কথাগুলি  গ্রহণ করছে অনুধাবন করার জন্য কিছুক্ষণ মৌন হয়ে রইল। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী আগ্রহের সঙ্গে তার কথা শুনে গিয়েছে এবং বোঝার চেষ্টা করেছে।

– তোমরা বুঝতে পেরেছ কি?

– হ্যাঁ পেরেছি।

অস্ফুট কন্ঠে সবাই সমস্বরে বলে উঠল।

– তোমরা আর ও মনে রাখবে– পাখি পর্যবেক্ষণ কেবল চাক্ষুষ মাধ্যমেই করা হয় না, শ্রবণের  মাধ্যমেও করা হয়। সঙ্গে পাখি পর্যবেক্ষকের নিজের বুদ্ধিমত্তা ছাড়াও কিছু বিশেষ গুণ থাকা দরকার । তোমাকে লক্ষ্য রাখতে হবে কীভাবে নিঃশব্দে অরণ্যে অথবা পাখি থাকা অঞ্চলে ঘোরাফেরা করতে পারা যায় । তোমাদের বলেছি যে পাখির শ্রবণশক্তি অত্যন্ত প্রবল। তাই তুমি করা অত্যন্ত সাধারন একটা শব্দে একটা পাখি উড়ে চলে যেতে পারে। তুমি পরিধান করা জুতো জোড়ার ওপর গুরুত্ব দেবে, হাঁটার সময় যেন খটখট করে শব্দ না করে । আরক্ষী বা সৈনিকের প্রয়োজনীয় পোশাক- পরিচ্ছদের কিছু দোকান থাকে। তোমাদের কাছে রঙ্গিয়ার রেল জংশনের কাছে সেই ধরনের দোকান আছে । সৈনিক ব্যবহার করা কাপড়ের জুতো কিনতে  পাওয়া যায়, সেটা ব্যবহার করতে পার। মনে রাখবে, পাখি পর্যবেক্ষণের সময় তুমি গুরুত্ব দিতে হবে তুমি পরিধান করা পোশাক- পরিচ্ছদের ওপরে। এ কথাও তোমাদের জেনে রাখা দরকার যে পাখির শ্রবণ শক্তির সঙ্গে পাখির দৃষ্টিশক্তিও খুব প্রখর। তাই তুমি পরিধান করা উজ্জ্বল রংয়ের পোশাক দেখলে পাখি পর্যবেক্ষণ তোমার পক্ষে সুখকর হবে না। সেই জন্য অরণ্যের সবুজের সঙ্গে খাপ খাওয়া খাকি, খয়েরি, অনুজ্জ্বল ,মেটে হলদে জলপাই সবুজ , ছাই রং ইত্যাদি অনুজ্জল রঙের পোশাক পরিধান করবে । সঙ্গে তুমি পরিধান করা কাপড় একেবারে ঢিলেঢালা হলে ভালো। অঙ্গ সঞ্চালন করার জন্য এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যেমন বুকে ভর দিয়ে এগোনোর জন্য, লাফানোর জন্য সুবিধে হয়। যতটা সম্ভব তুমি খালি চোখে পাখি পর্যবেক্ষণ করবে। বাইনোকুলারের অতিরিক্ত ব্যবহার তোমার চোখের ক্ষতি করতে পারে। পাখি পর্যবেক্ষণের সময় আলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাখির ডানার সঠিক রং প্রত্যক্ষ করতে হলে পাখি পর্যবেক্ষণের সময় আলো সবসময় পর্যবেক্ষকের মাথার পেছন দিক থেকে এলে ভালো হয়, মুখোমুখি আলো হলে অর্থাৎ সূর্যের দিকে পাখি পর্যবেক্ষণ অসুবিধা জনক। পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ঋতু বা সময়  নেই। দিনের বা বছরের যে কোনো সময় পাখি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। তবে সকালের দিকে এবং সন্ধ্যের সময় পাখি বেশি সক্রিয় হয়ে থাকে বলে সেই সময় পাখি পর্যবেক্ষণ করা ভালো। শীতের দিনে আমাদের এখানে পাখির প্রব্রজন ঘটে বলে শীতের দিনে প্রব্রজনকারী পাখি পর্যবেক্ষণ করতে সুবিধা। তোমরা সেই সুবিধা গ্রহণ করতে পার। ফাগুন চৈত্র মাসে শীর্ণ গাছে পাখি দেখতে ভালো,গাছের পাতার আড়াল নিতে পারেনা বলে পাখিকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। পাখি যখন বাসা তৈরি করে, ডিম পেড়ে তা দেয় তখনও পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য উপযুক্ত সময় । শেষে তোমাদের জানিয়ে রাখি – কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে নিয়মিত ভাবে পাখি পর্যবেক্ষণ করতে হলে কৃত্রিম ঝোপের আড়ালে আত্মগোপন করে থেকে সহজে পাখি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে । স্থানীয়ভাবে উপলব্ধ গাছ- পাতা- লতা ব্যবহার করে তৈরি ঝোপের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে অতি সন্তর্পনে কাছ থেকে পাখি পর্যবেক্ষণ করলে খুব সুফল পাওয়া যায়।বাজারে এলুমিনিয়াম রড এবং প্যারাসুট কাপড়ের তৈরি এক ধরনের কৃত্রিম ঝোপ কিনতে পাওয়া যায় ।

সৌম্যদা সাবলীল ভাবে বর্ণনা করে গেল । তার বর্ণনা শুনে অংশগ্রহণকারীরা কৃত্রিম ঝোপের ভেতরে প্রবেশ করে পাখি পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা লাভের আনন্দ অনুভব করল ।সৌম্যদা পাখি পর্যবেক্ষণের সময় পাখির প্রতি গ্রহণ করা সাবধানতার কথাও বলল। ডিম পাড়া পাখি এবং ডিমের কোনোভাবেই অনিষ্ট করা অনুচিত ।সঙ্গে সৌম্যদা বলল কোনো কারনে পাখির ডিম বা বাচ্চা যাতে পর্যবেক্ষণকারীরা সংগ্রহ না করে । একটি একটি শ্লাইড পরিবর্তন করে সৌম্যদা বিভিন্ন পাখি দেখিয়ে গেল। সঙ্গে বলল– পাখিগুলি বিভিন্ন অবস্থানে বসবাস করে। তার মধ্যে জলাশয়, মাটি,তরুতৃণ, ঝোপ,খোড়ল,গুল্মে , বৃক্ষে বা জঙ্গলে বাসা তৈরি করে বসবাস করা পাখিগুলিকে শ্লাইডে আলাদা আলাদা ভাবে দেখানো হয়েছে। অবশ্য তার মধ্যে কিছু পাখি যেমন বার্ড বাটন কোয়েল, এক ধরনের মেটে  রঙের পাখি অরণ্য, তৃণভূমি এবং এমনকি ঝোপ ঝাড়ে ও বসবাস করে।সৌম্যদা প্রায় তিনশো পাখি শ্লাইডে দেখিয়ে পাখিগুলি শনাক্তকরণের ভিত্তি এবং ইংরেজি নামগুলি মনে রাখার জন্য কী করা উচিত তার আভাস দিয়ে গেলেন।

-এই পাখিটা দেখ।কী নাম?

– বুলবুলি।

অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীরা সমস্বরে বলল।

‐- এই পাখিটার ইংরেজি নাম হল  রেড- ভেনটেড বুলবুল । ভেন্ট মানে ফুটো বিষ্ঠা বের হওয়ার ফুটো। এই পাখিটাৰ বিষ্ঠা বের হওয়া ফুটো থাকা জায়গাটা লাল। তার থেকে নাম হয়েছে রেড ভেন্টেড। এভাবে এই পাখিটা টুনি পাখি। এটাও তোমরা সচরাচর দেখতে পাওয়া পাখি। ইংরেজি নাম স্কেলি-ব্রেস্টেড  মুনিয়া। স্কেলি ব্রেস্টেড মানে বুকে ছাল থাকা। পাখিটা মুনিয়া ধরনের। তাই বুকে ছাল থাকা টুনি পাখির এই প্রজাতিটার ইংরেজি নাম স্কেলি ব্রেস্টেড মুনিয়া। পুনরায় একটি উদাহরণ দিচ্ছি‐ এই পাখিগুলো তোমরা দেখে থাক। অসমিয়া নাম নাচুনি চড়াই। ইংরেজি নাম হোয়াইট থ্ৰোটেড ফেন টেইল। থ্ৰোট মানে গলা। এই পাখির গলার দিকটা সাদা। অন্যদিকে ফ্যান মানে হাওয়া করা। নৃত্যরত পাখিটার পুচ্ছাংশ দেখতে পাখার মতো। এভাবে অনুবাদ করে নিলে পাখিগুলির নাম মনে রাখতে সুবিধা হবে। চেষ্টা করে দেখতে পার।

সৌম্যদা অংশগ্রহণকারী প্রকৃতি কর্মীদের দুই চারটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সেদিনের মতো প্রশিক্ষণ শিবির শেষ করল। সঙ্গে বলল যে আগামী বছরে ব্যবহারিকভাবে পাখির বিষয়ে শেখার জন্য পুনরায় একটি পর্যবেক্ষণ শিবিরের ব্যবস্থা করা হবে ।শিবির সমাপ্ত করার পরে বিপিন ডেকা সৌম্যদার কাছে এগিয়ে এল এবং সৌম্যদার হাত দুটি জড়িয়ে ধরল। পাখির বিষয়ে জানতে পেরে মানুষটা আপ্লুত ।

‐চোখের সামনে দেখতে থাকা কথা অথচ আমরা জানি না ।আপনি আজ আমার জীবনটা ধন্য করে দিলেন। সৌম্যদা বিপিন ডেকাকে শিবিরে উপস্থিত থাকার জন্য ধন্যবাদ জানালেন ।পাখির সঙ্গে আগে পরিচিত করে দেওয়ার জন্য এবং সৌম্যদার বই ইতিমধ্যে পড়ার জন্য সৌম্যদার বলা কথাগুলি সুনন্দ সহজে বুঝতে পারল ।সৌম্যদা বলা কথাগুলি 'অসমের পাখি পর্যবেক্ষণ'এর হাত পুঁথিতে সাবলীল ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বইটি থেকে সুনন্দ যথেষ্ট উপকৃত হয়েছে।

শব্দব্রাউজ ৮৩৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-835, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮৩৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-835, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮৩৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১৭। ৫। ২৩। সকাল আটটা পঁচিশ ।



শব্দসূত্র: আহা-রে বাহারে মন


আহা-রে প্রতিদিনের

লীলাখেলা

কিভাবে যে সরে সরে যায় ।



বাহারে মন

আমার গড়ে তোলা নিয়ম

ছারখার করে ।



এ এক আশ্চর্য অভ্যাস ...


আটপৌরে ৫৪৭|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 547 by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৫৪৭|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 547 by Sudip Biswas






আটপৌরে ৫৪৭

প্যারেলাল


দিও। আমার।প্রেম। 


 মিসেস 


চেয়েছে শুধু তার প্রতিফলন।

সোমবার, ২৯ মে, ২০২৩

শব্দব্রাউজ ৮৩৪ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-834, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮৩৪ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-834, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮৩৪ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১৬। ৫। ২৩। সকাল সাতটা ।



শব্দসূত্র: অবাক পৃথিবীর কাছে



অবাক পৃথিবীর কাছে

আমার অক্ষর

কতদিন ধ্বংস থেকে

বাঁচবে?



অবাক সময় আমায় যোগায়

শব্দ

অবাক থেকে বাকপ্রতিমার

খেলা নাচায়!



শব্দের পর শব্দ দিয়ে

গড়ি ভাঙি

ভাঙি গড়ি ।


রবিবার, ২৮ মে, ২০২৩

শব্দব্রাউজ ৮৩৩ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-833, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮৩৩ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-833, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮৩৩ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১৫। ৫। ২৩। সকাল সাতটা ।



শব্দসূত্র: হাজারো শব্দের ভীড়ে



হাজারো শব্দের ভীড়ে

আমি কোনদিন

দিশেহারা হয়নি ।

বরং শিকার করি

নিহিত শব্দসম্ভার।



হাজারো শব্দের ভীড়ে

সারাদিন সারারাত

প্রাণপ্রতিষ্ঠা করি

কবিতার ।


অন্য কোন মন্ত্র লাগে না ।

শনিবার, ২৭ মে, ২০২৩

শব্দব্রাউজ ৮৩২ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-832, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮৩২ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-832, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮৩২ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়ার মেন রোড কলকাতা । ১৪। ৫। ২৩।



শব্দসূত্র : ঠিকঠাক শব্দ এলে



ঠিকঠাক শব্দের সঙ্গে

অবাক বন্ধুত্ব

কফি হাউসের কোলাহলে

মুছে যায় না।



কালো কফি খেতে খেতে

সে শব্দ আরও জোরালো হয়ে যায় ....



ঠিকঠাক শব্দ হলে

বিমূর্ত কি সুন্দর

মূর্ত হয়ে ওঠে!


শুক্রবার, ২৬ মে, ২০২৩

শব্দব্রাউজ ৮৩১ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-831, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮৩১ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-831, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮৩১ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১৩। ৫। ২৩। সকাল আটটা ।



শব্দসূত্র: ঝরো ঝরো বৃষ্টির অপেক্ষায়



ঝরো ঝরো বৃষ্টি

এখন

স্বপ্নে ধেয়ে আসে ।



টিনের চালের জল শব্দ

গ্রীষ্মের চাতক মন

ছুঁয়ে থাকে ।



বৃষ্টি শব্দ এখন সবচেয়ে প্রিয় ....



আটপৌরে- ১৪৫|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 145, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ১৪৫|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 145, by Pankaj Kumar Chatterjee 






আটপৌরে কবিতা-১৪৫

বৃহস্পতিবার, ২৫ মে, ২০২৩

শব্দব্রাউজ ৮৩০ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-830, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮৩০ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-830, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮৩০ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১২। ৫। ২৩। সময় সকাল ৬টা ৫০মিনিট ।



শব্দসূত্র: শান্তি, শান্তি



বাস্তবতার ক্ষতস্থানে

যে ভোর লাগায় প্রলেপ

তাকে নাম দিই

শান্তি ।



নিশ্চিন্ত সুখ কাঁধে হাত রাখলে

যে স্বাদ

তাকে অনায়াসে বলে দিই

শান্তি ।


আটপৌরে- ১৪৪|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 144, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ১৪৪|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 144, by Pankaj Kumar Chatterjee 






আটপৌরে কবিতা-১৪৪


বন্ধু


কিছু পাওয়ার জন্য

হা-হুতাশ

আমি সমুদ্র পরস্পরকে বুঝি

আটপৌরে ৫৪৬|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 546 by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৫৪৬|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 546 by Sudip Biswas






আটপৌরে ৫৪৬

ব্রীজমোহন


ইনিংস। মেরামতের। রসদ। 


ব্রজবাসী 


ওভার শেষে সামান্য রাখাল।

বুধবার, ২৪ মে, ২০২৩

কিছু বই কিছু কথা - ৩১২ । নীলাঞ্জন কুমার হৃদি- জোছনার জল। মালা চক্রবর্তী,Hridi Jochonar Raat

 কিছু বই কিছু কথা - ৩১২ । নীলাঞ্জন কুমার





হৃদি- জোছনার জল। মালা চক্রবর্তী । বই টার্মিনাস,  বারাসাত,  কলকাতা- ১২৫। মূল্য ১৭৫ টাকা ।



একজন তরুণী কবি যখন তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশ করে,  তখন তাতে আবেগী প্রধানত আবেগের পাল্লা বেশি থাকে , প্রেমের দিকে জোর দেন বেশি , আর অহেতুক প্রচুর কথা বলার প্রবণতা লক্ষ্যণীয় । কবি মালা চক্রবর্তীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'হৃদি - জোছনার জল ' এ এই তিনটি প্রভাব দারুন ভাবে স্পষ্ট । তাঁর কবিতাতে তাই উঠে আসে ' কেউ জানবে না,  শুধু আমরা জানব/  আমরা একসাথে কি ভীষণ ভিজছি ....' ( ' কোনও একদিন ') , ' নোনা জলে আজ সে বিস্তৃত/  কামাতুর সাগর তার সর্বাঙ্গ ছুঁয়েছে ।' ( ' পাহাড় নদীর রূপকথা '), 'সুনীল সমুদ্দুর , শোন/  তোমার মতো প্রেমিক পেলে/  কোন নারী না নীরা হতে চায়! ' ( ' সুনীল সমুদ্দুর ' ) ইত্যাদি ইত্যাদি ।
               যা হোক ' হৃদি-  জোছনার জল ' তে কবি তাঁর  নিজের প্রেমাতুর আবেগ উজাড় করার চেষ্টা করছেন । কিন্তু তার মধ্যে কিছু পংক্তির সন্ধান পাই যা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে : ' বর্ষার ফলার মতো রোদ্দুর নেমে এসেছিল পশ্চিমের আকাশ থেকে? ' ( বিসর্জনের বিকেল '), ' রাতারাতি ভিজে চলে,  ভেসে যায় জেব্রা ক্রসিং- / তবুও পদচিহ্ন মোছে না/  থামে না ম্যান্ডোলিন । ' ( 'থামে না ম্যান্ডোলিন ') , তাকে চন্দ্রকলা বলে রায় দাও তুমি/  প্রকাশ্য এজালাসে ।' ( ' চন্দ্রকলা')।
          কবি মালা চক্রবর্তীর এখনও নেশা কবিতা । তা যখন সাধনাতে পর্যবসিত হবে তা প্রকৃত কবিতা হয়ে উঠবে । কবি নিজেকে শব্দ শ্রমিক ভাবতে পছন্দ করেন,  তা ভালো কিন্তু উত্তরণের প্রয়োজন আছে । ভবিষ্যতে আশা করব তাঁর প্রকৃত সাধনার ফসলের জন্য । সমীর দেবনাথের প্রচ্ছদ মন ভরায় ।

আটপৌরে- ১৪৩|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 143, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ১৪৩|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 143, by Pankaj Kumar Chatterjee 






আটপৌরে কবিতা-১৪৩


চেনা


মানুষ চিনতে বাতেলা

নয়

কাজের খতিয়ান বিচার করো

আটপৌরে ৫৪৫|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 545 by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৫৪৫|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 545 by Sudip Biswas






আটপৌরে ৫৪৫

মধুযাম


বসন্তগান। ব্যাকুল।আম্রকাননে।


কুলায়ভরা


সখীনীড়ে সকল হৃদয় গান।

শব্দব্রাউজ ৮২৯ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-829, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮২৯ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-829, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮২৯ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১১।৫। ২৩। সময় সকাল ৬ টা ৫০ মিনিটে ।



শব্দসূত্র: অসহ্য আগুন দিন



আগুন দিনে

সকালে ভৈরবী তান

বিস্বাদ।


অগ্নিবীণা বাজানো থামাই ।


হয়ে উঠি

চাতকের মত

বৃষ্টি পিয়াসী ।



সব স্বপ্ন কেমন উধাও!


মঙ্গলবার, ২৩ মে, ২০২৩

আটপৌরে- ১৪২|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 142, by Pankaj Kumar Chatterjee

 আটপৌরে- ১৪২|| পঙ্কজ কুমার চ্যাটার্জির আটপৌরে কবিতা, Atpoure 142, by Pankaj Kumar Chatterjee 






আটপৌরে কবিতা-১৪২


দিব্যজ্ঞান


ফালি করতে থাকো

সরু

হলেও পাবে দুই পাশ

আটপৌরে ৫৪৪|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 544 by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৫৪৪|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 544 by Sudip Biswas






আটপৌরে ৫৪৪

বৈশাখী


অশোভন। মন্তব্যের। শেষাঙ্ক।


সহকার


অম্লমধুর দিনে কালবৈশাখী সহচর।

শব্দব্রাউজ ৮২৮ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-828, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮২৮ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-828, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮২৮ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ১০। ৫।২৩। সময় ৮টা ।


শব্দসূত্র: হায় দিন যায়




হায় দিন যায়

নিষ্ফল জীবনের

সঙ্গে!



হায় দিন যায়

সব অন্ধকার সামনে

রেখে !


দিন যায় হাওয়ায়

মিশে

আমার সঙ্গে ছলনা করে ।

রবিবার, ২১ মে, ২০২৩

হে আমার স্বদেশ- ৩৬ ।। সন্তোষ কুমার কর্মকার ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudeb Das

হে আমার স্বদেশ- ৩৬

সন্তোষ কুমার কর্মকার

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস





  লেখক পরিচিতি-- সন্তোষ কুমার কর্মকার একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, শিশু সাহিত্যিক এবং অনুবাদক।বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় ১৯৫৩ সনে শ্রীকর্মকারের জন্ম হয়।পিতা কানাইলাল কর্মকার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে সপরিবারে ভারতে চলে আসেন। প্রাথমিক শিক্ষা অসমের বরপেটায়।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত  বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রচিত উপন্যাস গুলি যথাক্রমে গৃহভূমি, শঙ্খ ধ্বনি, পদাতিক, সুবর্ণরেখা,অ  মোর আপোনার দেশ, কালান্তরর কথকতা, শিপার সন্ধানত, ইত্যাদি। ছোটগল্প,বেশ কিছু শিশু উপন্যাস এবং অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করেন।২০২১ সনের এপ্রিল মাসে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।১৯৯৬ সনে ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ১৯৯৮ সনে অসম সাহিত্য সভার সীতানাথ ব্রহ্ম  পুরস্কার এবং ২০২০ সনে সাহিত‍্যাচার্য সৈয়দ আব্দুল মালিক উপন্যাসশ্রী পুরস্কার লাভ করেন ।


   আলোচ্য উপন্যাস ' হে আমার স্বদেশ' (অ’ মোর আপোনার দেশ) অসমের অন্যতম সাহিত্যিক, ঠাকুর পরিবারের জামাই, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।এই উপন্যাসে বেজবরুয়ার চেতনায় কীভাবে জাতীয়তাবাদ অঙ্কুরিত হয়েছিল, বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের স্বরূপ, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে  বেজবরুয়ার জাতীয়তাবাদের তুলনা, ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ভারত তথা অসমের নবজাগরণের উন্মেষ, জাতীয়তাবাদী বেজবরুয়ার  সংগ্রাম, অসম বাংলার সাংস্কৃতিক সমন্বয় আলোচিত হয়েছে।এই উপন্যাসের চরিত্র রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ঠাকুরবাড়ির মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ,প্রজ্ঞাসুন্দরী ,অন‍্যদিকে অসমের হেমচন্দ্র গোস্বামী, গুণাভিরাম বরুয়া,চন্দ্রকুমার আগরওয়ালা -উনবিংশ শতকের অসম বাংলার অনেক স্বনামধন্য পুরুষই উপন্যাসের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি শ্রীমতী কর্মকার উপন্যাসটির প্রায় আড়াইশো পাতার মতো অনুবাদ করেছিলেন।তবে আমি প্ৰয়োজন অনুসারে উপন্যাসটিকে আবার নতুন করে একেবারে প্রথম থেকে অনুবাদ করেছি। বলাবাহুল্য শ্রীমতী কর্মকারের  অনুবাদ আমাকে অনেকটাই সাহায্য করেছে। এই সুযোগে আমি তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পরিশেষে দৈনিক বাংলা পত্রিকা(অন লাইন)উপন্যাসটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করতে আগ্ৰহী হওয়ায় তাদেরকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

(৩৬)

 'বাঁহী' প্ৰকাশ করার আয়োজন শুরু হল। কিন্তু একটা পত্রিকা বের করা সাধারণ কাজ নয়। তারমধ্যে এখন আবার সঙ্গে সুপরামর্শদাতা এবং টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করা মাজিউ নেই, উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সাহায্য করার হেম গোঁসাই নেই। বের করতে হলে সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় পত্রিকাটা বের করতে হবে। কষ্ট হবে। খুবই কষ্ট হবে। কষ্ট হলেও 'বাঁহী' বের করতে হবে। এখন 'বাঁহী' বের করাটা তার কাছে, তার লেখক জীবনের জন্য একটি বড়ো প্রত্যাহ্বান। লক্ষ্মীনাথ মনে মনে কঠোর সংকল্প গ্রহণ করল।

একটা সাহিত্য পত্রিকার জন্য প্রথম কাজটা হল লেখক- কবি- প্রবন্ধকারের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করা। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেখা দেবার জন্য অনুরোধ করতে হবে। তারা লেখবে, লেখার পরে সম্পাদককে পাঠাবে, লেখা পাওয়ার পরে সেগুলির সম্পাদনা… পর্যায়ক্রম পরিক্রমা গুলি সময় সাপেক্ষ। লক্ষ্মীনাথের হাতে এত সময় নেই। সে সকাল, বিকেল, গভীর রাত পর্যন্ত লিখতে লাগল। কবিতা,প্রবন্ধ,রম্য রচনা ইত্যাদি নিজের লেখা। লেখাগুলি আলাদা আলাদা নামে লিখবে। এই কাগজটাও বত্রিশ পৃষ্ঠার হবে। হরিনাথকে পাঠিয়ে ঘরের কাছে থাকা 'সালকিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস' এর মালিককে ডেকে আনল। লক্ষ্মীনাথ কেবল কাঠের ব্যবসায়ী নয় বা ঠাকুর বাড়ির জামাই নয়। হাওড়া কোর্টের সম্মানীয় ম্যাজিস্ট্রেট। ইতিমধ্যে বহু জটিল মামলার রায় দিয়ে সুনাম অর্জন করেছে। অসমিয়া হয়েও সে এখন হাওড়ার বাঙালি সমাজে একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। তাই সালকিয়া প্রেসের মালিক দায়িত্ব সহকারে ‘বাঁহী’র মুদ্রণের কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিল।

 এই সময় রোহিণী এবং যতীন্দ্রনাথ কলকাতার কলেজে পড়তে থাকা অসমিয়া ছাত্রদের কাছ থেকে প্রবন্ধ সংগ্রহ করে লরেলসে এল। লক্ষ্মীনাথের হাতে সেসব তুলে দিয়ে রোহিণী বলল,' স্যার আপনি তিন মাসের মধ্যে আঠারোটা প্রবন্ধ চেয়েছিলেন। এখানে তেইশটা প্রবন্ধ আছে।'

 'তেইশটা প্রবন্ধ!'

 'আপনি নিজে কাগজ বের করবেন শুনে আমাদের ছাত্ররা এতটাই উৎসাহিত হয়ে পড়েছে যে অনেকেই লেখা দিয়েছে। আরও দুই চার জন দেবে।তাঁরা লিখছে।'

 'বড়ো আনন্দের কথা। আপ্লুত হয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল, 'তবে তোমরা দেখছি বড়ো দুষ্টু ছেলে। আমি সেদিন তর্জন গর্জন করে তোমাদের প্রস্তাবটা উড়িয়ে দিলাম, এখন তোমরা আমাকে ভালো ফাঁদে ফেলেছ।'

 মুচকি হেসে যতীন্দ্রনাথ বলল' আমাদের দিকে হাতির দাঁত একবার বের হলে আর ভেতরে ঢোকে না, তবে আপনাদের কলকাতার হাতির দাঁত কী ধরনের, সেটা বলতে পারছি না।'

 'কলকাতার হাতির দাঁত তোমাদের দিকের মতোই। কিন্তু আমি যে 'বাঁহী'র প্রথম সংখ্যার জন্য লেখার তালিকা ঠিক করে ফেলেছি। এদিকে আমাকে আবার পরশুদিন ঝাড়চোগড়া যেতে হবে। আচ্ছা প্রবন্ধ গুলি রেখে যাও। দেখা যাক কী করা যায়।

 স্বনাম খ্যাত লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার সম্পাদনায় প্রকাশ পেতে চলা'বাঁহী'তে লেখা বের হবে, রোহিণী এবং যতীন্দ্রনাথ মনে আশা নিয়ে চলে গেল। লক্ষ্মীনাথ যুবক মনের আশা আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারে। তবে এখন আর উপায় নেই। তাছাড়া 'বাঁহী'র প্রথম বছরের প্রথম সংখ্যা‐ লেখাগুলি ভালো হতে হবে। নতুন লেখকের লেখাগুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে সময় লাগবে। তাই লক্ষ্মীনাথ রোহিণী যতীন্দ্রনাথ দিয়ে যাওয়া লেখাগুলি দেখল যদিও সেগুলি থেকে কোনো প্রবন্ধ নির্বাচন করল না। রাত দুটো পর্যন্ত নিজের লেখাগুলি সম্পাদন করে চূড়ান্ত রূপ দিল। পরের দিন সকালে ঝাড়চোগড়ায় চলে যাওয়ার সময় চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা লেখার ফাইলটা 'সালকিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস' এ  দিয়ে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠল।

 ঝাড়চোগড়া যাওয়াটা হল ব্যবসায়িক কারণ।ব্যবসা হল লক্ষ্মীনাথের জীবিকা।জীবিকার উপায় ঠিক না রাখলে পত্নী,তিনটি কন্যার সঙ্গে নিজের বেঁচে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।আরও একটি বড়ো প্রশ্ন।এই প্রশ্নটির সমাধান না থাকলে কীভাবে সাহিত্য চর্চা করবে?এদিকে স্বদেশ-স্বজাতির জন্য নিজের চেতনা-বোধ কর্মশক্তি বিনিয়োগ করলেও বিনিময়ে বৈষয়িক লাভ কিছুই পায় না।স্বদেশের অবস্থা এতই শোচনীয় যে স্বজাতির কেউ সাহিত্যিকের জীবিকার সংস্থান দেয় না।তাই সাহিত্যের মাধ্যমে দেশ-জাতির জন্য যতই যা করুক না কেন,সেটা হল ত্যাগ।চিন্তা-চেতনা উজার করে দিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করা।এই নেশা,দেশ-জাতিকে ভালো্বাসার নেশা।ভালোবাসার স্বর্গীয় নেশাটাই অন্তরে সৃষ্টি করে এক দেবসুলভ প্রেরণা।তারজন্যই ঝাড়চোগড়া গিয়ে ব্যবসায়িক কাজটা করতে গিয়েও লক্ষ্মীনাথ অনবরত ‘বাঁহী’র কথা ভাবল।

 আর বারো দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরে সালকিয়া প্রেছ থেকে ‘নহি জ্ঞানেন সদৃশংপবিত্রমিহ বিদ্যতে’মন্ত্রের সাহায্য নিয়ে ১৮৩১ শকের আঘোন মাহে (১৯০৯ সনের নভেম্বর মাস )ডিমাই আকারে মাসিক কাগজে ‘বাঁহী’বের হল। 

 ‘বাঁহী’র প্রচ্ছদ পরিকল্পনা লক্ষীনাথ বেজবরুয়ার প্রচ্ছদটা হল নদীর তীরে একটা গাছের নিচে একজন নারী বসে বাঁশী বাজাচ্ছে।গাছটার ডালে বসে আছে একটা দীর্ঘ পুচ্ছধারী ময়ূর।প্রকাশক হল,লক্ষ্মীনাথের ভাই হরিনাথ বেজবরুয়া।প্রকাশকের ঠিকানা হল –আসাম-বেঙ্গল স্টোর্স,২ নং লালবাজার স্ট্রীট,কলকাতা।মূল্য-বছরে এক টাকা আট আনা।প্রচ্ছদের পরে পত্রিকাটি একটি কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছে।পত্রিকাটির নাম প্রতিপন্ন করা কবিতাটি হল,

‘ত্রিভুবন মাঝে যত বস্তু মধুময় 

সে সবের সারবস্তু করে এক জায়গায় ,

পূরণ করলি উদর তোর বাঁহী অমিয়া; 

প্রেমকে মাগিছে কণা পূর্ণ করি হিয়া।...’

 আর বিষয় সূচি হল –রসাল গল্প ‘জগরা মণ্ডলের প্রেমাভিনয়’,বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ‘রেডিয়ামের কথা’, ‘আনন্দরাম বরুয়ার জীবন চরিত’,কৃপাবর বরুয়ার ছয়টি কবিতা,এবং প্রবন্ধ ‘অসমিয়া ভাষা সম্পর্কে দুই একটি কথা’।প্রথম সংখ্যার বাঁশিতে সম্পাদকীয় লিখল না যদিও শেষের প্রবন্ধটিতে লক্ষ্মীনাথ অসমিয়া জাতিকে উদ্দেশ করে অনুপ্রেরণামূলক একটি বাণী প্রকাশ করল,

 ‘...আমাদের অসমিয়া বন্ধুদের একটা কথা কঠিনভাবেই বলছি যে আপনারা মূল্যবান বলে জানবেন যে –অসমিয়া ভাষার উন্নতি ,অসমিয়া সাহিত্যের উন্নতি অসমের উন্নতির প্রথম সোপান।আমরা একান্তমনে পরিশ্রম করে তার উন্নতির অর্থে লেগে পড়লে নিশ্চয় আমাদের যত্ন ফল ফলাবেই।আমাদের শরীর থেকে মিথ্যা অসম্মান গিয়ে তার জায়গায় প্রকৃত আত্মসম্মান এলে আমরা এভাবে মুজরা লেগে থাকতে পারি না। এসব  পাবার প্রধান উপায় জ্ঞান উপার্জন, বিদ‍্যা উপার্জন এবং মাতৃভাষার উন্নতি সাধন। স্বদেশ এবং স্বজাতির উন্নতি এবং মঙ্গল মন্দিরের সিংহ দুয়ার হল মাতৃভাষা। এই মাতৃভাষার সেবক হয়ে প্রগাঢ় ভক্তি ভরে তার কুশলের অর্থে নিজের এই নশ্বর দেহের সমস্ত ক্ষমতা সমর্পণ করে আমরা আমাদের কর্তব্য কর্ম করে গেলে নিশ্চয় অচিরে মঙ্গল রূপ উন্নতির কীরিটি অসম মাতৃর  মাথায় শোভা পাবে।

 ২নং লালবাজার আসাম বেঙ্গল স্টোর্স থেকে প্রকাশিত 'বাঁহী' হাতে নিয়ে কলকাতায় পড়তে আসা অসমিয়া ছাত্রদের সেকি আনন্দ বর্ণনা করা যায় না। লক্ষ্মীনাথ ছাত্রদের জমা দেওয়া কোনো প্রবন্ধই প্রথম সংখ্যায় প্রকাশ করেনি। তার জন্য ছাত্রদের মনে কোনো ক্ষোভ নেই। অবশ্যই দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে সেগুলোর মধ্যে বেছে নিয়ে প্রবন্ধ গুলি 'বাঁহী'তে প্রকাশিত হতে লাগল। তারপর ছাত্রদের অনুরোধে আগে ইংরেজি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত হওয়া 'বাঁহী' অসমিয়া মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রকাশিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

 গতকাল রাতে এক প্রহর পর্যন্ত লেখার কাজ করল। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হল। আজ রবিবার। অত্যন্ত জরুরী কিছু না থাকলে লক্ষ্মীনাথ রবিবার ব্যবসার কোনো কাজ করে না। ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠে সাহেবদের মতো বাসিমুখে এক কাপ চা খেয়ে একটা সিগারেট জ্বালায়। আজ চা খেয়ে সিগারেট অগ্নিসংযোগ করে রাতের পোশাকেই ঢাকাই চপ্পল জোড়া পরে  বাইরের ফুলবাগানে বেরিয়ে এল। বাগানের প্রতিটি গাছ ,নতুন করে লাগানো প্রতিটি চারার সে নিজের হাতে যত্ন নেয়। বুড়ো মালি হরি বাগানের দেখাশুনা করে যদিও কোন গাছ কোথায় লাগাবে, কোন গাছের গোড়ায় সার দেবে, কোন গাছের কলম দিয়ে নতুন করে লাগাতে হবে, লক্ষ্মীনাথ শৈশব নির্দেশ দেয়। সিগারেট হাতে নিয়ে ছোটো ছোটো করে টান দেয় এবং অদ্ভুত মমতায় গাছের চারা গুলি, গাছে ফুটে থাকা ফুলগুলির দিকে তাকিয়ে থাকে। আজও তাই করছিল। একটি কাশ্মীরি গোলাপ গাছকে হেলে পড়তে দেখল। একটা কামি খোঁজ করে এনে হাতের সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে ধরে হেলে পড়া গাছটাকে নিজেই দাঁড় করিয়ে দিল।

 এমনিতেও নিজের পরিকল্পনা অনুসারে 'বাঁহী' প্রকাশ করতে পেরে এবং'বাঁহী'কে ছাত্র তথা শিক্ষিত অসমিয়া জনগণ সাদরে বরণ করে নেওয়ায়'উষা' থেকে পাওয়া অপমানের জন্য অস্থির হওয়া লক্ষ্মীনাথ মানসিকভাবে শান্ত হয়ে পড়েছে। ব্যবসা চালানোর অতিরিক্ত  নিয়মিতভাবে 'বাঁহী'র প্রকাশ করার জন্য দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হচ্ছে। অথচ তার জন্য খুব একটা ক্লান্তি অনুভব করে না। উল্টে অন্তরের গভীরতা থেকে একটি শক্তি পায়। হেম গোঁসাইয়ের বক্তব্য অনুসারে, সত্যিই তার জীবন আগের চেয়ে গতিশীল হয়েছে। তার হাত দিয়ে প্রকাশিত লেখাগুলি আগের চেয়ে পরিণত হয়ে উঠছে মনে হয়।

রবিবারের দিনটা লক্ষ্মীনাথ বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে কাটায়। পয়তাল্লিশ বছর অতিক্রম করা মধ্য বয়স্ক উঁচু মজবুত স্বাস্থ্যের অধিকারী লক্ষ্মীনাথ এমনিতেই ছোটোদের মতো করে তিন মেয়ের সঙ্গে  খেলাধুলা করে। বিচ্ছেদের দিকে নিজের ঘোড়া গাড়ি নিয়ে সবাইকে নিয়ে বেড়াতে বের হয়। গাড়িতে লক্ষ্মীনাথ প্রজ্ঞা একসঙ্গে বসে, অরুণা বসে মায়ের বাঁ পাশে, রত্না বসে বাবার ডান পাশে এবং ছোটো দীপিকা বসে মা অথবা বাবার কোলে। কলকাতার রাজপথ দিয়ে ঘোড়ার খুরের খটখট শব্দ তুলে গাড়ি এগিয়ে যায়। গাড়িতে বসে উৎফুল্লিত রত্না এবং দীপিকা পথের দুপাশের দোকানপাট অট্টালিকা দেখে এটা ওটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। কন্যাদের প্রশ্নের উত্তর দেবার মতো প্রজ্ঞার এত ধৈর্য থাকে না। অথচ বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে লক্ষীনাথ ওদের কৌতূহল ভরা প্রতিটি প্রশ্নের মনোযোগ সহকারে উত্তর দেয়। লক্ষ্মীনাথের নির্দেশ অনুসারে কোচোয়ান কোনোদিন গাড়ি নিয়ে যায় ইডেন গার্ডেনের দিকে, কোনোদিন গঙ্গার পারে, কোনোদিন বোটানিক্যাল গার্ডেনে, কোনোদিন জোড়াসাঁকোতে অথবা অন্য কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে…।

 আজও সেভাবে প্রত্যেকেই বের হওয়ার কথা। কিন্তু প্রজ্ঞার শারীরিক অসুবিধা হওয়ার জন্য বের হল না। এদিকে ক্লাবে গিয়ে বিলিয়ার্ডস খেলা নেই, ক্লাবে যেতে ইচ্ছা করল না। বাইরের বাগানে উত্তর দিকে কোমল ঘাসের মধ্যে তিন মেয়ে এবং কাজের ছেলে ফটিক দৌড়াদৌড়ি করছে। গোধূলি নেমে আসার সঙ্গে অন্য দিনের মতো সামনের গেট খুলে যতীন্দ্রনাথ ভেতরে চলে এল। তাকে দেখে অরুণা- রত্না খুব খুশি হল। তার মানে অরুণা- রত্না বুঝতে পারল, আজও বাবা নিশ্চয়ই যতীন্দ্রনাথকে নিয়ে শুরু করবে অথবা অন্য কোনো উপায়ে তাকে নিয়ে ফুর্তি করবে। তার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ বলল,' ও বাবা যদু, এসো–।'

 লক্ষ্মীনাথ তারপরে যতীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ব্যবহারের জন্য রাখা ঘরে গিয়ে বসল।

 যতীন্দ্রনাথ দুয়ারার  জন্ম ১৮৯২ সনের ৪ মার্চ। সেও শিব সাগরের। ১৯০৯ সনে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। ইতিমধ্যে গুয়াহাটিতে কটন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কলেজটি  ভালোভাবেই চলছে। অসমে কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়া সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষার্থে যতীন্দ্রনাথ  কলকাতা এল। এখন সে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের বি এ ক্লাসের ছাত্র। স্কুলের ছাত্র অবস্থায় যতীন্দ্রনাথ কবিতা লিখতে শুরু করে। সে ব্যক্তি লক্ষ্মীনাথের ভক্ত এবং সাহিত্যিক লক্ষ্মীনাথের একজন অনুরাগী পাঠক।

 কলকাতা আসার পরই যতীন্দ্রনাথ লক্ষ্মীনাথের বাড়ি খুঁজে বের করে। উনিশ-কুড়ি বছরের শান্ত এবং ভাবুক প্রকৃতির সুদর্শন যুবক যতীন্দ্রনাথকে লক্ষ্মীনাথ ভালোবেসে ফেলে।'বাঁহী' সম্পাদনার কিছু কিছু কাজ যতীন্দ্রনাথ করে দেওয়ার ফলে দুজনের সম্পর্ক আন্তরিক হয়ে পড়ে। বয়সের এত পার্থক্য যদিও লক্ষ্মীনাথ যতীন্দ্রনাথের সঙ্গে সমবয়সী বন্ধুর মতো আচরণ করে। জ্ঞান বুদ্ধির সঙ্গে রস-বোধ থাকা আধুনিক মনের অধিকারী লক্ষ্মীনাথের প্রতি যতীন্দ্রনাথও নিবিড় এক আকর্ষণ অনুভব করে। প্রায় প্রতিদিন গোধূলি বেলা লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে সাহিত্য ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলে। আলোচনা করতে গিয়ে কখন যে রাত সাড়ে আটটা নটা বেজে যায় জানতেও পারে না। সঙ্গে চলে প্রজ্ঞা পরিবেশন করা চা-জল খাবার আহার। কোনো কোনো দিন রাতের আহার খেয়ে যতীন্দ্রনাথ মেসে ফিরে যায়। এভাবে জ্ঞানদাভিরামের মতোই যতীন্দ্রনাথও লক্ষ্মীনাথের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে পড়ে।

 ' তারপরে, এবারের 'বাঁহী'তে প্রকাশিত লেখাগুলি পড়ে তোমাদের মেসের যুবকদের কীরকম লেগেছে?'

 যতীন্দ্রনাথ বলল' ভালোই পেয়েছে। তবে কাল আমাদের মেসে প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত' অসমিয়া ভাষার সম্পর্কে দু একটি কথা' প্রবন্ধটির শেষের দিকে আপনি যে' স্বদেশ এবং স্বজাতির উন্নতি এবং মঙ্গল মন্দিরের সিংহ দুয়ার  হল মাতৃভাষা' বলে একটা বাক্য লিখেছিলেন সেটা নিয়ে পুনরায় আলোচনা হল। কথাটা মন্ত্রের মতো হয়ে পড়েছে। আমাদের ছাত্ররা কথাটা উচ্চারণ করে জাতীয়তা বোধে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠে।'

 ' দ্বিতীয় সংখ্যার'বাঁহী'তে যে উষার সম্পাদককে উদ্দেশ্য করে' আত্মকথা'য় লিখেছিলাম–?'

 ' কোন কথাটা কাকাবাবু?'

 ' এই যে‐।' বলেই টেবিলের বাঁ পাশে রাখা দ্বিতীয় সংখ্যা'বাঁহী'ৰ পাতা উল্টে লক্ষ্মীনাথ পড়তে লাগল,' কাগজে অনেক কর্তব্যের ভেতরে গ্রাহক-পাঠক' সৃজন' করা ও উচিত। কাগজ সেই কাজে অক্ষমতা দেখিয়ে, দোষের পাহাড়টা শুধু নিরুপায় গ্রাহকের ওপরে'হুঃ' বলে ফেলে দেওয়াটা মস্তিষ্কের সাহায্য বিবর্জিত বীরত্ব হতে পারে; কিন্তু ধর্মবুদ্ধির কাজ যে নয় সেটা আমরা নির্ভয়ে বলতে পারি।'

 ' মোক্ষম। আপনি মোক্ষম আঘাত হেনেছেন। তবে তার প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ পেয়েছে। আপনার লেখাটা প্রকাশিত হওয়ার পরেই পদ্ম বরুয়া'উষা'য় ' পুরোনো কথায় নতুন রং' বলে একটি প্রবন্ধের দ্বারা আপনাকে সাবধান করে দিয়েছে।’

 'ক্রোধ প্রকাশ করেছে। এভাবে রাগ দেখালে তো হবে না। কথাগুলি যুক্তির সাহায্যে প্রতিপন্ন করতে হবে। আর এখানেই শেষ নয়। অপকর্মের জন্য পদ্ম বরুয়াকে আর ও কিছু পেতে হবে। আচ্ছা, এখন তোমার কথা বল। তুমি কবি। কবিতা লেখায় তোমার মন। আমিও কবিতা লিখি। লিখি মানে লেখার চেষ্টা করি। তবে সেগুলি কবিতা হয়ে উঠে না বলে মনে হয়। ভালো কবিতা লিখতে হলে কী কী গুণ দরকার বলতো?'

 ‘ইস কাকাবাবু আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন।আমি আপনাকে কবিতা লেখার জন্য কী কী গুণের দরকার সেকথা বুঝিয়ে বলতে পারব?’

 ' তুমি যে 'বাঁহী'র এই বছরের প্রথম সংখ্যায় ' মাঝি' বলে কবিতাটি লিখেছিলে, সেটা আমি লেখা কবিতা থেকেও ভালো হয়েছে। আসলে, তুমি একটা বিষয়ে ভালোভাবে বুঝে নিয়ে নিজের চেতনায় উপলব্ধি করে কবিতা লেখ। আমি এত ভাবনা-চিন্তা করে কবিতা লিখিনা, লিখতে পারিনা।'

 কিছুক্ষণ চিন্তা করে যতীন্দ্রনাথ বলল,' গত বুধবার আমাদের ইংরেজির সুধীন বোস স্যার ক্লাসে রোমান্টিক কবিদের কথা বুঝিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, অনুভবের আন্তরিকতা, ভাবের সৌকুমাৰ্য, প্রকাশভঙ্গির মাধুর্য এবং ছন্দের সাবলীল গতি কবিতা হৃদয়সংবাদি হয়ে ওঠে।'

 'বাহ! সুন্দর! সুন্দর কথা বলেছেন বোস স্যার। তুমিও বোস স্যারের ভাব গম্ভীর কথাগুলি অক্ষরে অক্ষরে মনে রেখেছ। এটাই প্রমাণ করে, তুমি কথাগুলি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছ। বড়ো সুখী হলাম। তোমার মধ্যে আমি অসমিয়া সাহিত্যের একজন প্রতিভাবান কবিকে খুঁজে পেয়েছি। তুমি লেখ, কবিতা লেখ।'

 এমন সময় রেকাবিতে মালপোয়া, মিষ্টি সুন্দর করে সাজিয়ে নিয়ে কাজের মেয়েটি ভেতরে প্রবেশ করল। যতীন্দ্রনাথের দিকে খাওয়ার জিনিসের রেকাবিটা এগিয়ে দিয়ে খেতে বলে সে বেরিয়ে গেল।

 যতীন্দ্রনাথ খেতে শুরু করেছে মাত্র, তখনই লক্ষ্মীনাথ শিখিয়ে দেওয়া মতে কাজের ছেলে ফটিক চুপিচুপি ঘরের ভেতরে এসে তাদের সামনের টেবিলের নিচে ঢুকে গেল। তারপর মশার মতো গুনগুন শব্দ করে ফটিক যতীন্দ্রনাথের পায়ে চিমটি কাটল।

 চমকে উঠে যতীন্দ্রনাথ বলল,' কাকাবাবু আমাকে কিছু একটা কামড়েছে।'

কিছুক্ষণ পরে ফটিক আবার চিমটি কাটতেই যতীন্দ্রনাথ খাওয়ার জিনিস ফেলে লাফিয়ে উঠল। ঘরের ভেতর থেকে এক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ফোঁপাতে লাগল।

 যেন কিছুই জানে না এরকম একটা ভাবে লক্ষ্মীনাথ' কী হয়েছে যদু বাবা, তোমাকে কিসে কামড়াল' বলে যতীন্দ্রনাথকে সান্তনা দিতে লাগল। কিন্তু যতীন্দ্রনাথ এতই ভয় পেয়েছে যে সে আর শান্ত হচ্ছে না। লক্ষ্মীনাথ তাকে ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে এল। গ্লাসে এক পেগ মদ ঢেলে দিয়ে যতীন্দ্রনাথকে  খেতে দিয়ে বলল,' তুমি আসলে ভয় পেয়েছ। খাও, এটা খেয়ে নাও। তাহলেই তোমার মনের ভয় নাই হয়ে যাবে।'

 কিন্তু মদ খাওয়ার পরে যতীন্দ্রনাথ আরও বেশি উত্তেজিত  হয়ে পড়ল। ভয় উত্তেজনায় অস্থির যতীন্দ্রনাথ কে শান্ত করার জন্য লক্ষ্মীনাথ তারপরে এক ঘটি জল এনে তার মাথায় ঢেলে দিল। দৃশ্যটা দেখে অরুণা, রত্না ,প্রজ্ঞা ফটিকের সেকি হাসি! তারপরে প্রত্যেকের সঙ্গে লক্ষ্মীনাথও হাসতে লাগল।

 ভাই হরিনাথকে ম্যানেজার বানিয়ে ব্যবসার উন্নতি হল না। নিজে কাজ না করে সে কর্মচারীর ওপরে বেশি নির্ভর করে। তার জন্য লক্ষ্মীনাথ তাকে গালিগালাজ করে। তবু হরিনাথের চরিত্রের সংশোধন হল না। এদিকে লেখালেখি এবং 'বাঁহী'প্রকাশের কাজকর্মের জন্য তাকে হরিনাথের ওপর নির্ভর করতেই হয়। তাই ব্যবসায় যতটুকু আয় হওয়ার কথা সেটা হচ্ছে না।

 আয় হচ্ছে না যদিও লক্ষ্মীনাথের সাংসারিক খরচ কমেনি। আয়া, রাঁধুনি কোচো য়ান ,মালিকে বেতন দিতে হয়। অরুণা এবং রত্নাকে খরচ বহুল সেন্ট এজেন্স স্কুলে ভর্তি করিয়েছে । ওদের সাজ- পোশাক, বইপত্রের খরচ ছাড়াও প্রাইভেট টিউটরের বেতন দিতে হয়। অরুণা যাতে পিয়ানো শিখতে পারে তার জন্য ব্রিটিশ শিক্ষয়িত্রী  মিসেস ব্রাউনকে নিযুক্ত করেছে।

 এমনিতেও লক্ষ্মীনাথের খরচের হাত লম্বা। উপার্জনের পরিমাণ চিন্তা করে সে খরচ করতে পারে না, করতে জানেও না। অন্যদিকে কিছুদিন ধরে দেশ ভ্রমণের শখটাও বেড়েছে। আর্থিক অবস্থা এত সুবিধাজনক নয় যদিও মে মাসের কলকাতার গরমে অতিষ্ঠ হয়ে লক্ষ্মীনাথ পুরী যাত্রা করল। এই যাত্রা একা নয়। প্রজ্ঞা এবং মেয়ে তিনটি কে সঙ্গে নিয়ে। তাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে ভোলানাথ আনুষ্ঠানিকভাবে দত্তক নেওয়া পুত্র ভুবনও সঙ্গী হল।

 পুরী বলতেই অসমিয়াদের মনে ভেসে উঠে পুণ্যতীর্থ জগন্নাথ ধাম মন্দিরের বৈকুণ্ঠ ধাম। লক্ষ্মীনাথের মনেও সেই ভাব রয়েছে। কিন্তু মন্দিরের চেয়ে তাকে বেশি আকর্ষণ করে সাগর। দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল বঙ্গোপসাগর। তার জন্যই পুরীতে এসে ১৫০ টাকায় বন্দোবস্ত করা ' অনাথ কটেজ'এ সবাইকে নিয়ে উঠেই লক্ষ্মীনাথ সাগর পারে চলে এল। অনন্ত পর্যন্ত প্রসারিত সফেন সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে এতটাই আহ্লাদিত হয়ে পড়ল যে তখনই জলে নেমে পড়ল। উত্তাল সাগরে অনেকক্ষণ সাঁতার কেটে পরম তৃপ্তি লাভ করল।

 খবর পেয়ে লক্ষ্মীনাথের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা পান্ডার বংশধর ভুটু পান্ডা ' অনাথ কটেজ'এ এল। ভুটু পান্ডা অসমিয়াতে কথা বলল। অসাম থেকে সুদূর উড়িষ্যায় অবস্থিত জগন্নাথ মন্দিরের পান্ডার মুখে অসমিয়া ভাষা শুনে লক্ষ্মীনাথের খুব ভালো লাগল। ভুটু পান্ডার সঙ্গে মন্দিরের বিষয়ে অনেকক্ষণ কথা বলল। তিনিই মন্দির দর্শন করিয়ে বিকেলের দিকে' মহাপ্রসাদ' পাঠিয়ে দিলেন।

 দুদিন পরে ভুটু পান্ডা মন্দির থেকে পুনরায়' মহাপ্রসাদ' আনার সঙ্গে পনেরোজন ব্রাহ্মণ ডেকে আনলেন। ব্রাহ্মণভোজন করালে নাকি চৌদ্দ পুরুষের পুণ্য হয়। শুধু ভোজন করানোই নয়, ভোজনের পরে ব্রাহ্মণদের দক্ষিণাও দিতে হবে। পনেরো জন ব্রাহ্মণের সঙ্গে পরিবার এবং ভুবনের সঙ্গে  বসে লক্ষ্মীনাথ' মহাপ্রসাদ' ভোজন করল। লক্ষ্মীনাথ এবং ভুবনকে তার জন্য আট টাকা এবং পাঁচ টাকা দক্ষিণা দিতে হল। তারপর তারা পান্ডা দেওয়া 'ঘোটা' পান করল। কম মাত্রায় পান করেও কাঢ়া ' ঘোটার' নেশায় দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়ল। লক্ষ্মীনাথের অবস্থা দেখে বিরক্তি- ক্রোধে প্রজ্ঞা 'এত বয়স হল তথাপি মানুষটার কাণ্ডজ্ঞান হল না! তীর্থ করতে এসে কী সব ছাইপাশ গিলছ!' বলে বকাবকি করল। লক্ষ্মীনাথের খারাপ লাগল। অনুতপ্ত সুরে বলল,' ভেরি সরি, পরী এসব আর খাব না।'

 পরের দিন সকালে জেগে উঠার পরেও লক্ষ্মীনাথ মাথা তুলতে পারল না। জোর করে উঠে সাগরে স্নান করার পরে কিছুটা সুস্থ বোধ করল। সেদিনই বিকেল ছটার ট্রেনে কটক থেকে হাওড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।

 বাড়িতে এসেও লক্ষ্মীনাথের শরীর ভালো হল না। পুনরায় জ্বর এল। পরিবারের ডাক্তার সত‍্যব্রত মিত্রকে ডেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে ঔষধ খাওয়ার দুদিন পরে সুস্থ হল। তখনই খবর পেলেন গোলাঘাটে মা ঠানেশ্বরী বিছানায় শয্যাশায়ী। মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে লক্ষ্মীনাথ অস্থির হয়ে পড়ল। অফিসে গিয়ে গত কয়েকদিনের কাজকর্ম দেখে আগামী ১৪-১৫  দিনে কী কী করতে হবে, হরিনাথ এবং কেরানি সুধন্য বসাককে শিখিয়ে পরিয়ে দিয়ে লক্ষ্মীনাথ গোলাঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হল ।

 দীননাথ বেজবরুয়া মহাশয়ের কনিষ্ঠা পত্নী ঠানেশ্বরী হল কবি অনন্ত কন্দলির কুলের সন্তান। ঠানেশ্বরীর পিতা ছিলেন তনু বরপূজারী। লক্ষ্মীনাথের শৈশবে মাতা ঠানেশ্বরীর  খুব একটা ভূমিকা ছিল না। কারণ তখন একদল ছেলেমেয়ে নিয়ে তাদের ছিল ভরা সংসার। ঘর সংসারের দায়- দায়িত্ব পালন করে লক্ষ্মীনাথের জন্য ঠানেশ্বরী সময় দিতে পারত না। তা বলে লক্ষ্মীনাথ যে স্নেহ ভালোবাসা পায়নি তা নয়। জন্মের পরেই বড়মা( দীননাথের প্রথমা পত্নী) তাকে দেখাশোনা করেছিল। বড়ো মায়ের সঙ্গেই খাওয়া-দাওয়া করত, ঘুমোত। তার জন্য ঠানেশ্বরীর কোনো দুঃখ ছিল না। শিবসাগর ছেড়ে কলকাতায় চলে আসার পরে লক্ষ্মীনাথ মায়ের স্নেহ ভালোবাসা উপলব্ধি করল। নিজে যখন পিতা হল, প্রজ্ঞার মধ্যে যখন নারীর মাতৃত্বের রূপ প্রত্যক্ষ করল, তখন মায়ের প্রতি স্নেহের আকর্ষণটা আরও নিবিড় হয়ে উঠল। দুই বছর আগে বড়ো বৌদি এবং শ্রীনাথ দাদার সঙ্গে পুরী, গয়া আদি তীর্থস্থান দর্শন করে ঠানেশ্বরী  কলকাতায় এসেছিলেন। তখন লক্ষ্মীনাথ মাকে কিছুদিনের জন্য এখানে থাকতে বলেছিল। কিন্তু ঠানেশ্বরী কলকাতায় থাকলেন না। সঙ্গে রেখে সেবা-যত্ন করার সুযোগ না পেলেও লক্ষীনাথ মায়ের কাছে প্রায়ই টাকা পাঠাত।

 দুদিন পরে গুয়াহাটি, গুয়াহাটি থেকে রেলে ফরকাটিং, ফর কাটিং স্টেশন থেকে গরুর গাড়িতে বিকেল তিনটের সময় গোলাঘাটে শ্রীনাথ দাদার বাড়িতে এসে দেখল, ঠানেশ্বরী শয্যাশায়ী। অসুখ-বিসুখে শুকিয়ে দুর্বল হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। মুখটা কালো হয়ে গেছে। চোখ দুটো বসে গেছে। সাদা চুলগুলি বিবর্ণ-ধূসর। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে লক্ষ্মীনাথ ডাকল,' মা–।'

 ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকিয়ে ঠানেশ্বরী লক্ষ্মীনাথকে চিনতে পারল। শুকনো ঠোঁট দুটি থরথর করে কেঁপে উঠল। ক্ষীন কন্ঠে বলল,' লখী, কলকাতা– কলকাতা থেকে এলি–।'

 'হ্যাঁ মা।'

 'বৌমা, নাতনি তিনজন?'

 লক্ষ্মীনাথ নিজেকে আর সামলাতে পারল না। দুই চোখ জলে ভরে উঠল। কোনোমতে বলল,' ওরা ভালোই আছে।'

 এটা ঠানেশ্বরীর অন্তিম অবস্থা। দাদা শ্রীনাথ মায়ের চিকিৎসার কোনো ত্রুটি করেনি। কিন্তু ডাক্তার- বৈদ্য আশা ছেড়ে দিয়েছে। লক্ষ্মীনাথ অসহায় বোধ করল। জন্মদাতৃর অন্তিম অবস্থায় তাঁর কিছুই করার নেই।

 বুকে গভীর বেদনা নিয়ে লক্ষ্মীনাথ গোলাঘাটে থাকতে লাগল। লক্ষ্মীনাথের সম্মানার্থে ই.এ.সি বেনুধর রাজখোয়া গোলাঘাট ক্লাবে চা- পানের আয়োজন করল। সেখানে লক্ষ্মীনাথ অসমিয়া ভাষার ওপরে দীর্ঘ বক্তৃতা দিল। উপস্থিত শ্রোতা মন্ডলী উচ্চ প্রশংসা করে লক্ষ্মীনাথকে অভিনন্দন জানাল। পরের দিন গোলাঘাট বেজবরুয়া হাইস্কুলে' শিক্ষা' শীর্ষক বিষয়ে অন্য একটি বক্তৃতা দিল।

 গোলাঘাটে থাকা সাত দিন হয়ে গেল। দাদা ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত এবং সরল মনের মানুষ হল শ্রীনাথ। তিনি বর্তমানে অসমিয়া ভাষা সাহিত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব আদরের ভাই লক্ষ্মীনাথের ব্যস্ততার কথা জানেন। শ্রীনাথ বলল,' এইরকম অবস্থায় মাকে রেখে যাওয়াটা তোর পক্ষে কত কঠিন তা আমি বুঝতে পারছি লখী। তবে এখন মায়ের অন্তিম ক্ষণটির জন্য কেবল অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এদিকে তোর তো আর চাকরি নয়। কলকাতায় হরিনাথকে রেখে এসেছিলি। মায়ের এই অবস্থা শুনে সেও চলে এসেছে। তাই তোর ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে। তুই কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হ। এখানে যাই হোক না কেন, আমরা সামলে নেব।'

 অবশেষে লক্ষ্মীনাথ মৃত্যু শয্যায় শায়িত ঠানেশ্বরীর কাছে এল। নিথর হয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে অবরুদ্ধ কন্ঠে বলল,' মা ছোড়দাদা আমাকে কলকাতায় যেতে বলেছে, যাব কি?'

 ঠানেশ্বরী আকুল নয়নে লক্ষ্মীনাথের  দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরে ধীরে ধীরে শীর্ণ  ডান হাতটা তোলার চেষ্টা করল। সেটা না পেরে শুকনো কন্ঠে বলল,'যা, আয় গিয়ে–।'

 লক্ষ্মীনাথের এরকম মনে হল যেন নাড়ির বন্ধন ছিড়ে গেল। শয্যাগত ঠানেশ্বরীর পা দুটি স্পর্শ করে প্রণাম জানিয়ে নিস্তেজ পদক্ষেপে বেরিয়ে এল।

 সেপ্টেম্বর ১৯ তারিখ(১৯১০ সন)। দুপুর ১ টার সময় গুয়াহাটি পাওয়ার পরে অনেক ব্যক্তি লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে দেখা করতে এল। তাদের মধ্যে দেবেন ফুকন, অধ্যাপক পিসি রায়, ইএসি যোগেন্দ্র বরা, রাধানাথ ফুকন এবং হেমচন্দ্র গোস্বামী। তাঁদের ক্লাবে গিয়ে সত্যনাথ বরা এবং রায় বাহাদুর ভুবন চন্দ্র দাসের সঙ্গে দেখা হল। কিন্তু লক্ষ্মীনাথ কারও সঙ্গেই সেভাবে কথা বলল না। কেবল হেমচন্দ্র গোস্বামীর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করল। সেদিন সুযোগ পেল না। পরের দিন গুয়াহাটি ঘাট থেকে বিদায় জানাতে এসে হেমচন্দ্র 'বাঁহী'র প্রসঙ্গ তুলে প্রশংসামূলক কথা কিছু বলে লক্ষ্মীনাথকে অভিনন্দন জানাল। তখন ক্ষোভ প্রকাশ করে লক্ষ্মীনাথ বলল–' গোঁসাই তোমার প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু 'উষা'র সম্পাদকের কাছ থেকে যে অপমান পেলাম, সেটা এখনও ভুলতে পারিনি।'

 'আমি তোমার অপমানের কারণটা বুঝতে পারছি,বেজ। কিন্তু তখন পদ্মবরুয়ার কোনো উপায় ছিল না।'

 'তা বলে সতীর্থ একজনের লেখক সত্তায় আঘাত দিয়ে ইংরেজের এই ধরনের নির্লজ্জ দাসত্ব!'

 লক্ষ্মীনাথের কণ্ঠস্বরে উষ্মার আভাস পেয়ে হেমচন্দ্র তার হাত ধরল।

 'উষা' বের হওয়ার আগে পদ্ম বরুয়া কলকাতায় আমার বাড়িতে গিয়ে আমার সঙ্গে পরামর্শ করেছিল। রাজরোষে পড়ার পরে গর্ডন স্যার যখন আমার 'এংলো ইন্ডিয়ান' উঠিয়ে নেবার পরামর্শ দিল, তখন পদ্ম বরুয়া আমাকে কথাটা জানানোর প্রয়োজন বোধ করল না। ইংরেজের প্রতি দাসত্ব মানুষটাকে এত নিচে নামিয়ে নিয়ে গেল!'

' প্লিজ বেজ, তুমি শান্ত হও।' কাতর কন্ঠে হেমচন্দ্র বলল,' আমি পুনরায় বলছি, তখন পদ্ম বরুয়ার উপায় ছিল না? তবে দুর্ভাগ্যজনক এই ঘটনাটির জন্যই তোমার মানস কন্যা 'বাঁহী' জন্ম নিয়েছে। আর আমার মনে হয় এখন 'উষা'র চেয়ে 'বাঁহী' উন্নতমানের অসমিয়া সাহিত্য পত্রিকা।'

 লক্ষ্মীনাথের মনটা কিছুটা শান্ত হল। কিন্তু সকালবেলা সাড়ে দশটায় গুয়াহাটি জাহাজ ঘাট থেকে যখন বিদায় নিল,ভাঁটির দিকে যাত্রা— নিজের টেবিলে বসে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথের মনটা পুনরায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল। অসম থেকে বিদায় নিয়ে এভাবে কলকাতায় যাত্রা করার সময় প্রতিবার লক্ষ্মীনাথের মনটা বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তবে তার অন্তরে অনুভূত হওয়া এইবারের বেদনাটি আলাদা। অন্যান্যবার মনের মধ্যে থাকে শুধু মাতৃভূমি থেকে বিদায় নেওয়ার বেদনা। এবার সেই বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাতৃ বিয়োগের আশঙ্কা। না এরপরে অসমে এসে সে আর মমতাময়ী মায়ের কায়িক অস্তিত্ব খুঁজে পাবে না, শুনতে পাবে না স্নেহ  মাখানো মায়ের কোমল কণ্ঠস্বর।তাঁর অন্তরের গভীরতা থেকে মন খারাপের ভাব উঠে এল। মানসপটে ভেসে উঠল শৈশবকালে অনুষ্ঠিত উপনয়নের সেই দৃশ্যটি।

 শিবসাগরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পন্ডিত ত্রিলোচন শর্মা ছিলেন লক্ষ্মীনাথের উপনয়নের আয়োজনের প্রধান দ্রষ্টা। উপনয়নের অন্তিম অনুষ্ঠানে টাক মাথা কিশোর ব্রহ্মচারী লক্ষ্মীনাথের হাতে পলাশ গাছের ডালের একটি দন্ড, কমন্ডুল আর কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে মাতৃ ঠানেশ্বরীর সামনে উপস্থিত হয়ে ' ভবতি মাতর ভিক্ষাং দেহি' বলে ভিক্ষা চেয়েছিল। তাকে ঘিরে থাকা মহিলারা তখন ' যেওনা বৈরাগী হয়ে–' বলে করুণ রসাত্মক গান গাইছিল। লক্ষ্মীনাথের দিকে তাকিয়ে মাতৃ ঠানেশ্বরীর দুই চোখ ছল ছলে হয়ে উঠেছিল এবং তিনি রিহার আঁচলে চোখ মুছে ছিলেন। মায়ের সেই রূপটির দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথেরও দুই  চোখ থেকে জলের ধারা নেমে এসেছিল।

 অশ্রু প্লাবিত চোখে লক্ষ্মীনাথ তারপরে নদীর দক্ষিণ পাড়ে দৃষ্টি প্রসারিত করল। ভাটার যাত্রা যদিও জাহাজটা এখন এত দ্রুত যাচ্ছেনা। তীরের দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে সবুজ ধান, ধানকে দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে মলায়া বাতাস, পশ্চিমে ঢলে পড়া শারদীয় সূর্যের কোমল কিরণ আকাশটাকে বর্ণিল  করে তুলেছে। সেদিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীনাথ দেখল, এক ঝাঁক সাদা বক সারি  পেতে পশ্চিম থেকে পূর্বের দিকে উড়ে যাচ্ছে, এভাবে দল বেঁধে উড়ে গিয়ে দূরের কোনো পাহাড় অথবা জঙ্গলে রাতের জন্য বিশ্রাম নেবে।… এই হল জন্মভূমি। জন্মভূমির এই রূপটির সঙ্গে লক্ষ্মীনাথ পরিচিত। তবু চেয়ে রয়েছে, চেয়েই রয়েছে, এত করে দেখেও তার আগ্রহ মিটছে না। লক্ষ্মীনাথ ইতিমধ্যে বিহার, উড়িষ্যা ,উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের অনেক জায়গায় বেড়িয়েছে, উত্তর পশ্চিম ভারতের বোম্বাই গিয়েছে, দার্জিলিং, সিমলা, শ্রীনগর, ভূস্বর্গ কাশ্মীর, রাওয়ালপিন্ডি লাহোর  দেখেছে। এইসব জায়গা অসমের চেয়ে উন্নত কিছু কিছু জায়গা ঐতিহাসিক কীর্তি চিহ্নে ঐশ্বর্য মণ্ডিত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতিশয় মনোরম। তবু জন্মভূমি অসমের কথাটা আলাদা। সমস্ত জায়গা থেকে অসম আলাদা। অসমের সঙ্গে আপন বোধটা ব্যঞ্জনাময় এক অনুভূতিতে আনন্দময়। নয়ন ভরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লক্ষ্মীনাথের মনে এক অদ্ভুত ভাবের দোলা লাগল। তারপরে তার সমগ্র সত্তায় এক কম্পনের সৃষ্টি হল। সঙ্গে সঙ্গে ঐশ্বর্যময় এক বিভূতিতে জন্মভূমি অপরূপ এক রূপ ধারন করল। তারপরে লক্ষ্মীনাথ নিজের অজান্তে গুণগুণ করে উঠল–

'অ' মোর আপোনার দেশ,

অ'মোর চিকুণি দেশ,

এনেখন শুয়ালা ,

এনেখন সুফলা,

এনেখন মরমর দেশ।

অ'মোর সুরীয়া মাত।

অসমর সুয়দী মাত।।

পৃথিবীর কতো

বিচারি জনমটো 

নোপোয়া করিলেও পাত।।

অ'মোর ওপজা ঠাই।

অ'মোর অসমী আই।।

চাই লওঁ তোমার

মুখখনি একবার

হেঁপাহ পলোয়া নাই।।'

(হে আমার জন্মভূমি,সুজলা সুফলা,শস্য শ্যামলা দেশ।সারা পৃ্থিবী খুঁজেও তোমার মতো একটি দেশ পাওয়া যাবে না।তোমাকে দেখে দেখে আমার আর আশ মিটে না।)


 

শব্দব্রাউজ ৮৫৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-855, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮৫৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-855, Nilanjan Kumar






শব্দব্রাউজ- ৮৫৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার

সোমবার, ১৫ মে, ২০২৩

শব্দব্রাউজ ৮২৭।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-827, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮২৭।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-827, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮২৭ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়ার মেন রোড কলকাতা । ৯। ৫। ২৩। সময় সকাল ৯টা ।



শব্দসূত্র: শব্দবাঁধন আপনি জড়ায়



শব্দবাঁধন

জড়িয়ে রাখে

মিষ্টি যন্ত্রণায় ।



আপনি আসে

জড়িয়ে রই

মুক্তি কে চায় ?



জড়ায় জড়ায়

আশ্চর্য

বিপুলা পৃথিবীর

সব রহস্য ।


ছুঁয়ে থাকি

শব্দ জব্দ হতে দেয় না ।

শব্দব্রাউজ ৮২৬ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-826, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮২৬ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-826, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮২৬ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়ার মেন রোড কলকাতা । ৮।৫। ২৩। সময় সকাল ৭টা ৪০মিনিট ।



শব্দসূত্র: হৃদয় মাঝে রাখব



শব্দ বাক্য গঠন

হৃদয় মাঝে রাখলে

কে অসুখী? 



অবিরাম প্রিয় দিন

সামনে এসে দাঁড়ায়

সৃজনে ।



আমি তার জন্য

শিতলপাটি বিছাই

খেতে দিই প্রিয় খাবার ।



বুঝে ফেলি সে

আজীবন হৃদয় জুড়ে

থাকতে চায় ।

শব্দব্রাউজ ৮২৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-825, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮২৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-825, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮২৫ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়ার মেন রোড কলকাতা । ৭। ৫। ২৩। সময় সকাল ১০টা ১০মিনিট ।



শব্দসূত্র: দাও যাপন, শব্দের সঙ্গে



দাও, দাও আমায়

শব্দযাপন

ম্যাজিক হয়ে ছুটে আসুক

প্রকৃত শব্দশৃঙ্খল

শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে ।



দাও, দুরন্ত ইচ্ছে

যাকে নিয়ে যেন

ছুটি ছুটি হাজার বছর

সকলের মনে ।


আটপৌরে ৫৪৩|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 543 by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৫৪৩|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 543 by Sudip Biswas






আটপৌরে ৫৪৩

আটপৌরে ৫৪২|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 542 by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৫৪২|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 542 by Sudip Biswas






আটপৌরে ৫৪২

আটপৌরে ৫৪১|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 541 by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৫৪১|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 541 by Sudip Biswas






আটপৌরে ৫৪১

শুক্রবার, ১২ মে, ২০২৩

শব্দব্রাউজ ৮২৪।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-824, Nilanjan Kumar

 শব্দব্রাউজ ৮২৪।। নীলাঞ্জন কুমার || Shabdo browse-824, Nilanjan Kumar




শব্দব্রাউজ- ৮২৪ ।। নীলাঞ্জন কুমার

বিপাশা আবাসন তেঘরিয়া মেন রোড কলকাতা । ৬।৫। ২৩।


শব্দসূত্র: সুখ রাঁধি, দুঃখ খাই



সুখকে রেঁধে বেড়ে

মুখে তুলতে গেলে

দুঃখ ছুঁয়ে থাকে ।



সুতরাং অবলীলাক্রমে

দুঃখ খাই

ঢেকুর তুলি

আর এঁটো বাসন মেজে যাই ।

আটপৌরে ৫৪০|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 540 by Sudip Biswas

 আটপৌরে ৫৪০|| সুদীপ বিশ্বাস-এর কবিতা, Atpoure 540 by Sudip Biswas






আটপৌরে ৫৪০

দ্বিপ্রহর 


অবউষ্ণ। লেন্টিসেল। ঘনীকরণ। 


জনজীবনে 


 বাষ্পায়ন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে রৌদ্রদিন।

Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...