বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

বিদেহ নন্দিনী~ ২৮ || ডঃমালিনী || মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস,Badudeb Das.

 বিদেহ নন্দিনী~ ২৮

ডঃমালিনী 

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদঃ বাসুদেব দাস 

(আঠাশ)

  হনুমানকে বিদায় দিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় ভুগছিলাম। সমস্ত বাধা অতিক্রম করে হনুমান গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে পারবে বলে যদিও আমার বিশ্বাস ছিল তবু এক অজানা ভয়ে আমার বুক কাঁপছিল। চিন্তা,ভয়, দুঃখ, মন খারাপ নিয়ে আমি মানুষটা স্তব্ধ হয়ে ছিলাম। এদিকে রাবণ ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যেকোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটাতে পারে বলেও শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমার সময় যেন আর যাচ্ছিল না। তাই হনুমান স্বামী রামচন্দ্রের বিষয়ে বলা কথাগুলি রোমন্থন করে সময় অতিবাহিত করছিলাম। হনুমানের সঙ্গে রাম লক্ষ্মণের কীভাবে দেখা হয়েছিল, আমার বিরহে স্বামী রামচন্দ্র কীভাবে উন্মাদ হয়ে পড়েছিল, সেই সমস্ত কথা বড় সুমধুর ভাষায় আমাকে বলেছিল। লক্ষ্মণের কাছ থেকে শোনা কথাগুলি হনুমান যেভাবে আমার সামনে বর্ণনা করেছিল সেই দৃশ্য যেন সে নিজের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল।
আমাকে আশ্রমে একা ফেলে রেখে চলে যাওয়ায় স্বামী রামচন্দ্র নাকি লক্ষ্ণণের উপরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি নাকি ভাইকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন-'ভাই লক্ষ্মণ তুমি বৈদেহীকে একা কেন ফেলে রেখে এলে?আমি ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত জানকীকে  রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছিলাম। তুমি আমার আদেশ কেন অমান্য করলে? সীতার উপরে আক্রমণ করা হয়তো রাক্ষসদের উদ্দেশ্য। না হলে আমার মতো অবিকল শব্দ কন্ঠ থেকে বের করে মারীচ ওভাবে নিশ্চয় চিৎকার করত না।তুমি এই সামান্য কথাটা বুঝতে পারলে না যে রাক্ষস আমাকে বিনাশ করতে পারবে না।এখন যদি ফিরে গিয়ে আশ্রমে সীতাকে না পাই আমি বেঁচে থাকব না।'
লক্ষ্ণণ নাকি দাদাকে আমার করা ব্যবহার এবং বাক্যবাণ সহ্য করতে না পেরে চলে গিয়েছিল বলায় রামচন্দ্র পুনরায় অসন্তোষের সঙ্গে বলেছিল -'বৌদি তোমাকে এভাবে বললেও এভাবে তাকে নিঃসঙ্গ ফেলে রেখে আসা উচিত হয়নি। মেয়ে মানুষ রাগ করে কোনো কথা বললেই তুমি তোমার দায়িত্ব পালন থেকে সরে আসাটা উচিত হয়েছে কি ?এভাবে ক্রোধ, ভয়,শঙ্কা নিয়ে  আশ্রমে  ফিরে এসে যখন আমাকে দেখতে পেল না স্বামী নাকি হাহাকার করতে লাগল। তিনি চিৎকার করে করে লক্ষ্মণকে বলেছিলেন-' দেখ লক্ষ্মণ সীতাকে নিশ্চয় রাক্ষস ধরে নিয়ে খেয়ে ফেলেছে। তোমার ভুলের জন্য সীতা আর নেই। না হলে আশ্রমের চারপাশে এরকম নিস্তব্ধ পরিবেশ কেন? অন্যদিকে জীবজন্তুরা এভাবে স্তব্ধ হয়ে  রয়েছে কেন? হরিণগুলি কেমন মন খারাপ করে আছে দেখেছ? চারপাশটা কেমন শূন্য মনে হচ্ছে। একথা বলেই তিনি নাকি আমাকে চারপাশে খুঁজতে লাগলেন। স্বামী উন্মাদের মতো হাতি, বাঘ, ভালুক, হরিণ এবং যত গাছপালা  আছে তাদের কাছে আমার কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন।স্বামীর চোখজোড়া নাকি লাল হয়ে পড়েছিল। কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসছিল। কেউ আমার খবর দিতে না পারায় তিনি নাকি কাঁদতে কাঁদতে লক্ষ্ণণকে বলেছিলেন-' ভাই,আমার জন্য মৃত্যুই শ্রেয়। আমি সীতাকে রাক্ষসের আহার হওয়ার জন্য এনেছিলাম। আমি মৃত্যুবরণ করব। তুমি অযোধ্যায় গিয়ে এই খবর দিও। কথাটা বলে তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার বলেছিলেন-' তবে লক্ষ্মণ আমি মরেও শান্তি পাব না। পরলোকে পিতৃদেব বলবে --'বাছা, তোমাকে বনবাসের আদেশ দিয়েছিলাম আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে। সেটাও তুমি সম্পূর্ণ করতে পারলে না। এখন আমার বাক্য কে রক্ষা করবে? এটাই কি পুত্রের কর্তব্য? কিন্তু সীতা অবিহনে আমি তো বেঁচে থাকতে পারব না।
দাদাকে এভাবে ব্যাকুল আর হতাশ হয়ে পড়তে দেখে লক্ষ্মণের নাকি খুব চিন্তা হয়েছিল। সে বলেছিল-' দাদা তুমি এই জগতের শ্রেষ্ঠ পুরুষ।তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে বাকি সাধারণ মানুষ কীভাবে শোক সামলাবে ।প্রকৃতপক্ষে শোক করার চেয়ে বৌদির সন্ধানে যাওয়া ভালো হবে। অন্তত আমরা জানতে পারব বৌদিকে কোনো রাক্ষস বধ করেছে নাকি কেউ হরণ করে নিয়েছে। তাই মন দৃঢ় করে আমার সঙ্গে চল।আমার বিশ্বাস আমরা  নিশ্চয় কোনো না কোনো খবর পাব।'
লক্ষ্ণণের উৎসাহজনক কথা স্বামীর মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করল। তিনি লক্ষ্মণের সঙ্গে আমাকে খুঁজতে বের হলেন। দুজনেই নাকি পঞ্চবটী বন, দণ্ডকারণ্য, সমস্ত জায়গা গোদাবরী নদীর ঘাট, বালুচর, সমস্ত জায়গায় আমার খোঁজ করেন। হঠাৎ তাদের মনে হয়েছিল একটা হরিণ যেন কোনো খবর দিতে চাইছে। হরিণটা বারবার আকাশের দিকে তাকায় আর দক্ষিণ দিকে দৌড়ে যায়। তবে তারা তাঁকে অনুসরণ না করার জন্য আবার ফিরে আসে। প্রথম লক্ষ্মণই নাকি ব‍্যাপারটা লক্ষ‍্য করে দাদাকে বলেছিল-' দাদা এই হরিণটা নিশ্চয় আমাদের কিছু বলতে চাইছে। না হলে সে কেন বারবার একবার আকাশের দিকে আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে দক্ষিণ দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। লক্ষ্মণের কথাটা নাকি দাদা ও সমর্থন করায় দুজনেই হরিণটাকে অনুসরণ করল।কিছুদূর যাবার পরে তারা নাকি কিছু ফুল পড়ে থাকতে দেখল। ফুলগুলি দেখেই নাকি স্বামী চিনতে পারল‌। কারণ সেদিন সকালে তিনি নিজেই সেই ফুল আমাকে খোঁপায় বাঁধার জন্য এনে দিয়েছিলেন। ফুলগুলি দেখে স্বামী নাকি পুনরায় শোকে ভেঙ্গে পড়লেন। চোখের জল ফেলে পুনরায় এগিয়ে গেলেন ।কিছুদূর যাবার পরে তারা নাকি পায়ের ছাপ দেখতে পেলেন। পায়ের প্রকাণ্ড ছাপ এবং মাঝে মধ্যে আমার ছোট পদচিহ্ন। পায়ের ছাপ অনুসরণ করে আর একটু দূরে যেতেই তারা একটা ভাঙ্গা রথ, ধনুর টুকরো, সোনার কবচ, ছত্র, অজস্র রক্তের ফোঁটা দেখতে পেলেন। সেইসব দেখে নাকি স্বামী নিশ্চিন্তে হয়েছিলেন যে হয়তো আমাকে নিয়ে দুটো রাক্ষসের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। ঝগড়ায় জয়ী হয়ে  রাক্ষসটা হয় আমাকে হরণ করেছে না হয় খেয়ে ফেলেছে। সেই সময় স্বামী নাকি ক্রোধে অধীর হয়ে দেবতাদের দোষারোপ করে বলেছিল-' জানকীকে আমি আর ফিরে পাব না। অসহায় বৈদেহীকে ধর্ম ও রক্ষা করল না। দেবরাজ ইন্দ্র বা দেবতারা নিশ্চয়ই তাকে রক্ষা করতে পারত কিন্তু তারা সাহায্য করল না। দেবতারা নিশ্চয় আমাকে দুর্বল ভাবে। আমি আজ বুঝতে পারলাম যে আমার দয়া, দাক্ষিণ্য, সরল অন্তর এই সমস্ত কিছুই দোষে পরিণত হয়েছে। না হলে আমার স্ত্রীকে কোনো দুর্বৃত্ত অপহরণ করার সময় বা মেরে খেয়ে ফেলার সময় রক্ষা করার জন্য কোনো দেবতাই  এগিয়ে এল না কেন?'
তারপর নাকি তিনি ক্রোধের সঙ্গে বলেছিলেন-' লক্ষ্ণণ এখন থেকে আমার কাছ থেকে দয়া, করুণা, সরল শান্ত স্বভাব আর আশা কর না। জগত এখন থেকে আমার কেবল প্রতাপই দেখতে পাবে। আমার শর তিন লোকে জীবের জীবন স্তব্ধ করে দেবে। দেবতা, গন্ধর্ব, দৈত্য-দানব কেউ রেহাই পাবে না। আমি সৃষ্টি বিনাশ করব। পর্বতের শিখর  চূর্ণ-বিচূর্ণ করব, সমুদ্র শুকিয়ে ফেলব।' স্বামীর চোখ ক্রোধে নাকি লাল হয়ে উঠেছিল। ঘামের বিন্দু স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি লক্ষ্ণণের কাছ থেকে তীর-ধনুক নিয়ে শর যোজনা করতে যেতেই লক্ষ্মণ হাতজোড় করে প্রার্থনা করে-' হে দাদা রামচন্দ্র, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আপনি এই কাজ করবেন না। আপনার  গুণ রাশি আপনার ভূষণ ।এইগুলি আপনার যশ বাড়িয়েছে। কোনো একজন দুরাত্মার জন্য সমস্ত জগৎ ধ্বংস করবেন না। আপনি লোক পালক দাদা ।আপনার দয়া, ক্ষমা, করুনা, সরলতা এই গুণগুলি আপনার পরিচয় হয়ে থাকতে দিন। এভাবে লক্ষ্মণ অনেকক্ষণ বোঝানোর ফলে স্বামী নাকি শান্ত হয়। তার কিছুক্ষণ পরেই দুজনে নাকি পুনরায় আমার সন্ধানে খোঁজখবর শুরু করে। কিছুদূর গিয়ে নাকি তারা দেখতে পায় রক্তে মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকা পক্ষীরাজ জটায়ুকে। স্বামী নাকি প্রথমে জটায়ু পাখির রূপে কোনো রাক্ষস বলে ভেবেছিল। কোনোমতে হাঁফাতে হাঁফাতে জটায়ু বলে -'রাম তুমি ব্যাকুল হয়ে খুঁজে বেড়ানো তোমার পত্নী সীতাকে রাবণ হরণ করে নিয়েছে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেও প্রতিরোধ করতে পারলাম না ।তারপর নাকি জটায়ুর সঙ্গে রাবণের কী ধরনের যুদ্ধ হয়েছিল আর রাবণ কীভাবে তার পা দুটি এবং পাখা কেটে ফেলে রেখে গেছে সে কথা বলেই জটায়ু প্রাণ ত্যাগ করে। জটায়ুর মৃত্যুতে দুজনেই খুব কান্নাকাটি করে‌ নিয়ম অনুসারে দাহ কার্য সমাধা করে, পিণ্ড আদি কার্য সমাধা করেন।তারপর দুজনেই পুনরায় আমার খোঁজে  দুর্গম অরণ্যের মধ্যে যাত্রা শুরু করেন। যেতে যেতে  তাঁরা একটা গুহা দেখতে পেল। ওটার ভেতর নাকি ভীষণ অন্ধকার। দুজনে গুহার সামনে দিয়ে পার হয়ে যাবার সময় একজন ভয়ঙ্কর চেহারার রাক্ষসী তাদের দিকে এগিয়ে এসে সোজা লক্ষ্মণের হাত ধরে বলল-' আমার নাম আয়োমুখী। আমি তোমাকে পতি হিসেবে গ্রহণ করছি। আমাকে পতি হিসেবে পাওয়াটা তোমার পরম ভাগ্য বলে ভাববে। তুমি আমার সঙ্গে এই অরণ্যে বিচরণ করতে পারবে।'
এমনিতেই দুজন আমার চিন্তায় ম্রিয়মাণ হয়েছিল। তারমধ্যে রাক্ষসী এসে উপস্থিত হল। রাক্ষস রাক্ষসী বললেই ওদের মনটা তিক্ততায় ভরে উঠছিল। লক্ষ্ণণ নাকি মুখে কিছু না বলে সোজা তরোয়াল বের করে তার নাক কান আর স্তন কেটে ফেলল।যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে আয়োমুখী পালিয়ে গেল।
হনুমানের কাছ থেকে ঘটনাটা শোনার পরে আমার মনটা যেন কেমন হয়ে গেল।রাগ, দুঃখে মন খারাপ ছিল বলেই একজন মহিলাকে এভাবে অত্যাচার করাটা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না ।কিন্তু সেই সময় আমাকে কীভাবে উদ্ধার করতে পারবে সেই কথায় চিন্তামগ্ন হয়ে থাকার জন্য  সেই ঘটনায় সেই সময় আমি গুরুত্ব কম দিয়েছিলাম। তবুও হনুমানকে বলেছিলাম, হে বীর, আমার স্বামী আমার জন্য আকুল হয়ে  ঘুরে বেড়াচ্ছে তার চেয়ে সুখের কথা আমার কাছে আর কিছু হতে পারে না। তাই আমাকে এই ধরনের কথাই বলে যাও। দুই দাদা ভাই মহিলার অঙ্গচ্ছেদ করার কথা আমাকে বল না।'
হনুমান পুনরায় আরম্ভ করেছিল। এই ঘটনার পরে রাম লক্ষ্মণ আরও গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে কোন দিকে যেতে হবে সেটা বুঝতে পারছিল না। এভাবে যেতে যেতে হঠাৎ তারা কিছু শব্দ শুনতে পেল। শব্দ গুলি গাছপালা ভাঙ্গার মতো। দুজনে এদিকে ওদিকে তাকাতেই একটা বীভৎস চেহারার রাক্ষসের ওপরে চোখ পড়ল।রাক্ষসটার মাথা ছিল না। পেটে একটি প্রকাণ্ড মুখ। চোখ দুটো লাল আর বড়। তার হাত দুটি বেশ লম্বা। শরীরটা নাড়াচাড়া না করে বসে থাকা থেকে অনেক দূরের জিনিস ও নাগাল পায়। রাক্ষসটার নাম কবন্ধ। রাম লক্ষণ সাবধান হতে না হতেই কবন্ধ হাতের দ্বারা দু'জনকেই কাছে টেনে আনল। তারপর নাকি গর্জন করে বলল -'তোরা দুটি কে? সন্ন্যাসীর সাজপোশাক পরেছিস। কিন্তু হাতে তরোয়াল, কাঁধে  ধেনু।এই অরণ্যে কী কাজে এসেছিস? তাদের উত্তরের অপেক্ষা না করে রাক্ষসটা পুনরায় বলেছিল-' আচ্ছা ভালোই হয়েছে। তোরা আজ আমার মুখের সামনে এসে উপস্থিত হলি।  কী খাব কী খাব বলে মনে হয়েছিল। এখন তোরা দুজনেই আমার আহার হবি ।'
দুজনেই নাকি যথেষ্ট ভয় পেয়েছিল।লক্ষ্মণ দাদাকে রাক্ষসের হাত দুটি কাটার কথা বলায় কবন্ধ  রেগে উঠে লক্ষণকে মুখের ভেতর ঢোকাতে  যেতেই রাম তরোয়াল দিয়ে তার ডান হাতে কোপ বসাল। সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণও এক কোপে বাঁ হাতটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। তারপর এক আশ্চর্য কান্ড ঘটল। কবন্ধ নাকি  জ্ঞানী মানুষের মতো বলতে লাগল-' হে নরশ্রেষ্ঠ, আমি এখন বুঝতে পারলাম আপনারা কে? আপনারা আমার দুটি হাত কেটে রাক্ষস জীবন থেকে মুক্তি দিলেন। অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ আমার কথা শুনে যান।এভাবে বলে কবন্ধ তার  কথা বলতে লাগল। আগে নাকি কবন্ধ এরকম কুৎসিত চেহারার  ছিলনা।বড় সুন্দর পুরুষ ছিল। লোকসমাজে তার প্রভাব ছিল অসীম। কিন্তু তার মতিগতি ভালো ছিলনা। শৈশবে ভয়ানক রাক্ষসের রূপ ধরে সবাইকে ভয় দেখিয়ে আনন্দ পেত।বিশেষ করে ঋষি মুনিদের । একদিন স্থূলশিরা নামের একজন  মহর্ষিকে ভয় দেখাতে যেতেই ঋষি অভিশাপ দিলেন-'  দুরাত্মা,  তুই যে বীভৎস চেহারা সেজে মানুষকে ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছিস তোর সেই চেহারা স্থায়ী হোক। ঋষিকে কাকুতি-মিনতি করায়   তিনি নাকি বললেন যখন রাম লক্ষ্ণণ দুই ভাই  তোর দুটি হাত  কেটে তোকে জ্বালিয়ে দেবে তখনই তুই তোর পূর্বের রূপ ফিরে পাবি।'
ঋষির শাপে কবন্ধ রাক্ষস হয়ে পড়ল। এবার নাকি দীর্ঘজীবী হওয়ার জন্য  কবন্ধ তপস্যায় বসল।  ব্রহ্মা তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে সেই আশীর্বাদ প্রদান করলেন।  দীর্ঘজীবী বর লাভ করার পরে কবন্ধ নাকি আরও অত‍্যাচারী  হয়ে উঠেছিল । এমনকি দেবরাজ ইন্দ্রকে জয় করার জন্য স্বর্গ আক্রমণ করেছিল। ইন্দ্র তার বজ্র নিক্ষেপ করে কবন্ধের  মুখ, মাথা চোখ আদি শরীরের বিভিন্ন অংশ ভেতরে ঢুকিয়ে চিহ্ন নাই করে দিল।কবন্ধ অনেক প্রার্থনা করার পরে ইন্দ্র নাকি তার হাত দুটিকে লম্বা করে দিল যাতে নাড়াচাড়া না করে বসা থেকেই শিকার ধরে খেতে পারে। মুক্তির বিষয়ে দেবরাজ ইন্দ্র নাকি সেই একই কথা বলল। কবন্ধের কথা শোনার পরে দুই দাদা ভাই নিজেদের দুর্দশার কথা  জানাল।তাদের কথা শুনে কবন্ধ নাকি বলল-' আমার আত্মা  রাক্ষস দেহে আবদ্ধ হয়ে থাকা পর্যন্ত আমি পূর্বের দিব্য দৃষ্টি লাভ করতে পারব না আপনারা আমার দেহটা দাহ করলে আমি হয়তো আপনাদের উপকারে আসা কিছু কথা বলতে পারব। রাম লক্ষ্ণন কবন্ধের ইচ্ছা পূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গে দিব্যরূপী কবন্ধ বলতে লাগল-' হে রাঘব, দুর্দশা ভুগতে থাকা একজন ব্যক্তি একজন দুর্দশাগ্রস্ত লোকের কাছ থেকেই সাহায্য লাভ করে এই নীতিকে সমস্যা বলা হয় । সীতাদেবী কে খুঁজে পাবার জন্য যার কাছ থেকে সাহায্য খুঁজে নিতে হবে তার নাম হল সুগ্রীব। একজন বাঁদর। তিনি বর্তমানে ঋষ্যমূক পর্বতের একটি গুহায় চারজন সহচরের  সঙ্গে বাস করছে। দাদা বালী তাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সুগ্ৰীবই হবে  তোমার মিত্র। সুগ্রীব সূর্যদেবতার পুত্র। এই জগতে যত রাক্ষস আছে সবাই সুগ্রীবের কথা জানে । তাই তোমার সীতাকে উদ্ধার করায় কোনো অসুবিধা হবে না। তোমরা এই জায়গা থেকে পশ্চিম দিকে যেতে থাক। যেতে যেতে একটা পদ্ম ফুলের মনোরম সরোবর দেখতে পাবে।নাম পম্পা সরোবর।তার ফুল কখনও মূর্ছা যায় না।আর কেউ ছি়ঁড়ে না।পম্পা সরোবরের পূব দিকে ঋষ‍্যমূক পর্বত। তুমি সুগ্রীবের সঙ্গে মিত্রতা করলেই সুফল পাবে। আর সেও তার হারানো রাজ্য ফিরে পাবে।একথা বলে কবন্ধ অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর নাকি রাম লক্ষ্মণ তাদের প্রতীক্ষায় থাকা তপস্বিনী শবরীর আশ্রমে প্রবেশ করে তার আতিথ্য গ্রহণ করলেন।
হনুমানের  মুখে কথাগুলি শোনার পরে আমি ভাবুক হয়ে পড়েছিলাম। এতদিন আমার মনে গুমড়ে থাকা কিছু কথা মনে পড়ছিল। আমাকে রাবণ হরণ না করলে স্বামী কখনও শবরী  আশ্রমে বা কবন্ধ বাস করা সেই গভীর অরণ্যে প্রবেশ করতেন না ।কারণ জনস্থানের রাক্ষস বধ করার পরে আমরা তিনজনেই আলোচনা করে বনবাসের শেষের বছরটা কেবল পঞ্চবটীতে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাকে কথা দেওয়ার পরে স্বামী পুনরায় পঞ্চবটী ছেড়ে কোথাও যাবার প্রস্তাব দিতেন না । রাম কবন্ধকে রাক্ষস জীবন থেকে মুক্তি দিতে পারবে বলে উচ্চারণ করা মহর্ষি ব্রহ্মা এবং ইন্দ্রের  কথা সত্যে প্রতিষ্ঠা করার কোনো সুবিধাই থাকত না। ঠিক সেভাবে রাম লক্ষ্মণ শুশ্রূষা করার পরে দেহত্যাগ করার জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকা তপস্বিনী শবরীর বিষয়ে শোনার পরে আমার সন্দেহ দৃঢ় হল যে রাবণের দ্বারা  আমাকে হরণ  করানোর কার্য করিয়েছে দেব দেবতারা সবাই মিলে। তাদের ইচ্ছায় আমরা নেচেছি। তারা চেয়েছেন যে আমার স্বামীর দ্বারা পরম প্রতাপী রাবণের সঙ্গে জগতের সমস্ত রাক্ষসকুল নিধন হোক।তার জন্য প্রয়োজন হলে আমার জীবনের অন্ত হোক বা কাল পর্যন্ত কলঙ্ক থাকা ঘটনা ঘটুক বা আমি পথের ভিখারী হই তাতে দেব-দেবতাদের কোনো ক্ষতি হবে না ।কথাটা ভেবে আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম।কিন্তু পরে হনুমান স্বামীর সঙ্গে তার প্রথম দর্শনের কথা বলতে আরম্ভ করায় আমি বাস্তবে ফিরে এলাম। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Anandamangal, Soumitra Roy।। আনন্দমঙ্গল ।। সৌমিত্র রায়

আনন্দমঙ্গল ।। সৌমিত্র রায়